#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
পর্ব-৭
আরশী বাড়ি ফিরে স্বস্তি পায় না। বারবার আরহামের বলা কথাগুলো কানে বাজছে তার। এর আগে কোনো পুরুষ তাকে এভাবে কিছু বলেনি। কিছু একটা আছে আরহামের কথায়, কথাগুলো জাদুর মতো টানে তাকে। আরশী শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছে আর মিটিমিটি হাসছে। এক অজানা সুখ কিলবিল করছে তার মনে।H
কলেজ থেকে ফিরে আরশী ঘরের বাইরে যায়নি। তাই রুদ্রাণী আরশীর রুমে এসে লাইট জ্বালালেন। বললেন, “শরীর খারাপ নাকি আরশী? কলেজ থেকে এসে চুপ করে আছো?”
আরশী উঠতে উঠতে চুল ঠিক করলো। মায়ের প্রশ্নের পিঠে উত্তর দিলো, “এমনি মা। ভালো লাগছিল না।”
রুদ্রাণী আরশীর কপালে হাত রেখে বললেন, “জ্বর-টর তো হয়নি। বিকেলে শুয়ে থাকা ভালো নয়। উঠো, এসো—চুলে বিলি কাটি।”
আরশী রুদ্রাণীর সাথে ছাদে যায়। নিচে ফু দিয়ে আরশী বসে। রুদ্রাণী বসেন পিড়িতে। রুদ্রাণী যখন বিলি কাটেন তখন আপনাআপনি চোখে ঘুম চলে আসে আরশীর। এত ভালো বিলি কাটেন উনি। আজও ঘুম জড়ো হলো আরশীর চোখে কিন্তু আরশী ঘুমালো না। সে আশেপাশে যতদূর দেখা যায় চোখ বুলাচ্ছে ভালো করে। মনে মনে খুঁজছে পাগলটাকে। সেই রাতের পর থেকে পাগলটাকে সে আর দেখেনি। ওইদিন সত্যি পাগলটা ছিল তো? নাকি চোখের ভ্রম ছিল? আরশী ওসব আর ভাবতে যায় না। তার সাথে কত অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো, এসব আর সে ভাবতে চায় না।
পশ্চিম আকাশে সূর্য মামা হেলে পড়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির দল নিজ নিজ বাসায় ফিরছে। দূরে বিলের পুকুরে একটা সাদা বক দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে দেখে আরশী উঠে চলে গেল। রুদ্রাণী যেতে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর সরাসরি সামনে একটা বড় আমগাছের মোটা ডালে পা ছড়িয়ে বসে আছে পাগলটা। রাগ্বানিত চোখে তাকিয়ে আছে রুদ্রাণীর দিকে। রুদ্রাণী পলকহীন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন পাগলটার দিকে। তারপর এক মলিন হেসে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।
_____________
সকাল দশটা বাজে। আরশী কলেজের কাছে এসে দেখে পুরো কলেজ প্রাঙ্গণ মানুষে ঠাসা। বড় গেট দিয়ে বের হচ্ছে এক বিশাল মিছিল। শ-শ ছাত্র সাথে। তাদের হাতে বড় ব্যানারে লেখা—“হেমন্ত ভাইয়ের সন্ধান চাই, সন্ধান চাই।”
আরশী থমকে দাঁড়ায়। হেমন্ত—সেদিনের ওই ছেলেটাই তো! ওর আবার কী হলো?
আরশীকে দাঁড়ানো দেখামাত্র হৈচৈ শুরু হয় চারদিকে। অনেকে বলতে থাকে, “এই তো ওই মেয়েটার সাথে সেদিন ওর ঝামেলা হয়েছে, এর পর থেকে ওর খোঁজ নেই!” সবাই এগিয়ে এসে ঘিরে ধরে আরশীকে। কয়েকটা বদমেজাজী রাগী ছেলে রীতিমতো ধমকাতে শুরু করে—“কই রেখেছো হেমন্ত ভাইকে? হেমন্ত ভাই কই?”
আরশীর বুক ধড়ফড় করে। কাঁপে। সবাই কেন তাকে ঘেরাও করল—সে তো জানে না ছেলেটা কোথায়! তার চোখে পানি টলমল করছে। অসহায় চোখে সে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে বারবার।
ভিড়ের মধ্যে কাউকে দেখে ভয়ের মধ্যেও মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটলো আরশীর। যেন পানিতে ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে কেউ হাত বাড়িয়ে দিলো। আরশী দেখতে পাচ্ছে, আরহাম ভিড় ঠেলে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। আরশী হাফ ছেড়ে বাঁচে। সে জানে, আরহাম তার ওপর একটা আঁচড়ও লাগতে দেবে না।
আরহাম আরশীর সামনে এসে দাঁড়ায়, আরশীর হাতটা ধরে আশ্বস্ত করে, “ভয় পেয়ো না। আমি এসে গেছি। চোখের জল মুছো। শক্ত হও।”
আরহাম এবার আরশীকে আড়াল করে ছেলেগুলোর সামনে দাঁড়ায়। গলা উঁচু করে, হাত ঘুরিয়ে বলে, “কার কি বলার, আমাকে বলো। মেয়েটার দিকে কেউ এক আঙুল তুললে তার আঙুল আমি তুলে ফেলব।”
আরহামের মধ্যে কিছু একটা আছে, সে যখন গলা উঁচু করে ধমকায় তখন এক ভয়ংকর রূপ তার মধ্যে জেগে ওঠে। যে ভয় পাওয়ার নয়, সেও ভয় পায়। ছেলেগুলোর গলা নেমে আসে। কয়েকজন আঙুল তুলে আরহামকে দেখিয়ে বলে, “এই তো, এই ছেলেটাও সেদিন ছিলো!”
ভিড় ঠেলে পুলিশ ঢুকে।
অফিসার রুক্ষ গলায় আরহামকে জিজ্ঞেস করে, “ তোমার সাথেই শেষ ঝামেলা হয়েছিল হেমন্তের। একটা মানুষ রাতারাতি তো উধাও হতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চয় তুমি আর এই মেয়েটা আছো।”
আরহাম গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দেয়, “আমার ঝামেলা হয়নি ওর সাথে। মেয়েটাকে সে যা ইচ্ছে তাই বলছিল। আমি মেয়েটার পক্ষ নিয়েছিলাম। মেয়েটাকে যে হাত দিয়ে মারছিল,ওই হাতটা জাস্ট মুচড়ে দিয়েছিলাম। পরে সবার সামনে ছেলেটা চলে যায়, আমরাও চলে যাই। এর থেকে বেশি কিছু জানি না। কিছু না। আর হে, এর থেকে কিন্তু প্রমাণ হয় না আমরা এর পেছনে আছি। দলবল করে, দেখুন, কে এ সুযোগ কাজে লাগালো।”
অফিসার আবার বলে, “আপনারা আমাদের সাথে থানায় চলুন।”
আরহাম দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ে, “যাবো না। কোনো প্রমাণ নেই যে এর সাথে আমরা জড়িত। যদি প্রমাণ হয় তবে অ্যারেস্ট করবেন। আমি শহরেই আছি। এবার আমি গেলাম।”
আরহামের কথায় একটা আলাদা গাম্ভীর্য আর সাহসিকতা ফুটে উঠেছে। তাছাড়া কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। আরহাম সবাইকে উপেক্ষা করে আরশীকে কোলে তুলে নেয়। আরশী আঁতকে উঠে তার শার্ট আঁকড়ে ধরে, “আরে ছাড়ুন! হাঁটতে পারব!”
“কথা কম বলো আরশী। এত ভিড়—এইটুকুন ছোট্ট মেয়ে তুমি। মানুষের পায়ের তলে পড়ে ভর্তা হয়ে যাবে।”
আরশী চোখ বড় বড় করে বলে, “কি! আমি ছোট্ট মানুষ?”
আরহাম চলতে চলতে বলে, “অবশ্যই। ছোট্ট মানুষ। কোলে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যাবে।”
“হোয়াট?”
আরহাম হাসে জোরে। হাসতে হাসতে জিভে কামড় বসায়। নিজে নিজে বুলি আওড়ায়, “মুখের লাগাম নেই… কি বলে ফেললাম!”
আরশীর রাগ হচ্ছে না আরহামের কোনো কিছুতেই। সে মিটিমিটি হেসে আরহামের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে—
মানুষটা হুট করে আমার জীবনে এলো। ভালো লাগা তৈরি করলো। সব বিপদ থেকে কোথা থেকে জানি সে চলে আসে। সে পাশে থাকলে সব ভয়ডর উধাও হয়ে যায় আমার। মানুষটা যদি সারাজীবন এভাবে আমার পাশে থাকতো!
শিমুল গাছের ছায়ায় এসে আরশীকে কোল থেকে নামায় আরহাম। বাইরে পুরোদমে মিছিল চলছে। আরশী প্রশ্ন করলো, “আপনি এত সাহস কোথা থেকে পান? কীভাবে সবার মুখ চুপ করে দিলেন? আমার ভয়ে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।”
আরহাম ঝুকে, “তারপর???”
“তারপর আপনি এলেন। আর হিরোর মতো আমাকে বাঁচিয়ে নিলেন।”
“পছন্দ হচ্ছে আমাকে?”
আরশী মাথা নিচু করে স্মিত হেসে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ায়।
“কাল কি ভাবলে? কি উত্তর পাব তোমার থেকে?”
“আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করেন। আমার আপত্তি নেই। তবে একটা কথা… আমি একা একা কিছু করব না। যা করি-না-করি, আমার মায়ের পারমিশন নিয়ে।”
আরহাম চোখ সরু করে হাসে, “বেশ তো। মাকে বলেই করব। আমি আমার ভাইবোন সবাইকে নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাব তোমার বাড়ি। আচ্ছা, তোমার বাড়িতে কারা কারা আছে?”
আরহামের এই প্রশ্নে নিভে গেলো আরশী। ভয় হলো মনে, রহস্যময় পরিবারের কথা শুনে আরহাম আবার চলে যাবে নাতো। তার যে এক মা ছাড়া আর কেউ নেই।
“কি হলো আরশী? বলো।”
“মা… শুধু মা আছেন। বাবা, ভাইবোন কেউ নেই। আমার বাবা ভিনদেশী ছিলেন। তাই দাদা-দাদী, বংশ সবাই ভিনদেশে। কেউ আমার খোঁজ নেয়নি আর আমিও কাউকে চিনিনা।”
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ থাকল।
আরশী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো, “পছন্দ হয়নি? আ… আমাকে ছেড়ে দিবেন?”
আরহাম চোখ কুঁচকে আরশীর দিকে তাকায়, “পাগলী একটা। আত্মীয় না থাকা তো দোষের না। আমার নিজেরও মা-বাবা নেই। আমি কালই ভাইবোন নিয়ে তোমার বাড়িতে যাব। তোমার মতো তুলতুলে মিষ্টি একটা মেয়েকে তাড়াতাড়ি বউ করে ঘরে তুলতে চাই বুঝলে?”
“ পড়াশোনা করব না?”
আরহাম মজা করে বলে, “আমি তোমাকে ব্যক্তিগত ক্লাস করাবো। প্রেমের ক্লাস। ভালোবাসার ক্লাস। পিএইচডি করাব এসবের উপর। কলেজের কি দরকার?”
“ইশশশ… কি যে বলেন!”
ঠিক তখনই আরশীর অগোচরে আরহামের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে। মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। এই চেহারায় সে আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না। রোজ মানুষ হচ্ছে সে। প্রতিবার মানুষ হওয়ার সময় তার শরীর থেকে কালো রক্ত বের হয়ে যায়, যার মাধ্যমে অনেক শক্তি কমে যায় আরহামের। সে নিজেকে সামলে আরশীকে বলে, “চলো, গাড়িতে তুলে দেই। আজ ক্লাস করার দরকার নাই। আমি চলে গেলে তোমাকে জ্বালাবে এরা। আমার জরুরি কাজ আছে। তুমি বাড়ি চলে যাও।”
আরশী মাথা কাত করে, “ঠিক আছে।”
চলমান…!
