#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা( ডার্ক ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া
৩.
ধপাস করে কারও পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে চমকে উঠলেন আরশীর মা রুদ্রাণী। শব্দটা বাইরে থেকে আসছে। নির্জন রাতে বেশ জোরে শুনালো তা। রাক্ষস রাজ্যের অধিপতি কায়ান রাত্রেশের কানে পৌঁছালো সেই শব্দ। সে চোখের ইশারায় তার দুই অনুচর দ্রোহান আর রাভানকে বলল,ল
“বাইরে কে আছে দেখে এসো। কোনো মানুষ হলে নিয়ে এসো, রাতের খাওয়াটা সেরে নেই। তরতাজা রক্ত না খেলে ঘুম হারাম হয়ে যাবে আমার।”
দ্রোহান ও রাভান বাইরে গেল। রুদ্রাণী তখনও কায়ানের পা ঘেঁষে বসে আছে। তার আঙুলের ডগা কাঁপছে, কাপা আঙুলে আঁচল মুঠো করে রেখেছে। তার মস্তিষ্কে দোলা দিচ্ছে ভয়ংকর চিন্তা— বাইরে যে শব্দটা হলো, সেটা আরশী নয়তো? না, না… তা হবে না। ধূসর চোখওয়ালা আমার মেয়েটা এখন নিশ্চয়ই তার রুমে ঘুমাচ্ছে। তাও বুকের ভেতর এক ঝাপটা আতঙ্ক ছটফট করতে লাগল।
রুদ্রাণীর চোখে ভেসে উঠল পুরনো স্মৃতি..
আরশী যখন দুমাসের ছিল, তখন কায়ান রাত্রেশের দৃষ্টি পড়েছিল আরশীর ওপর। মনে মনে স্থির করেছিল কায়ান, আরশী আরেকটু বড় হলে সে আরশীকে খাবে। বছর পাঁচেক হলে কায়ান রুদ্রাণীকে বলল,
“মেয়েকে নিয়ে এসো, আমি খাব ওর পাতলা রক্ত ।”
তখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা রুদ্রাণীর। তারপর মেয়েকে বাঁচানোর জন্য অমানবিক সিদ্ধান্ত নিলো সে। একের পর এক জ্যান্ত মানুষকে অপহরণ করে নিয়ে যেত নিশাভীতির অন্ধকারে। কায়ান রাত্রেশের রাতের খাবার ছিল মানুষগুলো। নিজের কোল রক্ষার জন্য অন্য মায়েদের কোলে শূন্যতা ঢেলে দিয়েছিল রুদ্রাণী।
******
নিশির নিস্তব্ধ জঙ্গলে হালকা বাতাসে কাঁপছে শুকনো পাতা। শব্দ হচ্ছে মর্মর করে। নিস্তব্ধতা ভেদ করে দূর থেকে শেয়ালের ডাক মিলিয়ে যেতেই যেন আরও গভীর হয়ে উঠল রাতের আঁধার। গাছগাছালিতে ভরা এই ঘন অরণ্যের এক কোণে, মরা এক অশ্বত্থ গাছের নিচে অচেতন হয়ে পড়ে আছে আরশী। চাঁদের খণ্ড খণ্ড আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে এসে পড়ছে তার মুখে।
আরশীকে দেখে দ্রোহান নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“মানুষ মেয়ে! এত রাতে এদিকে এলো কোথা থেকে?”
রাভান ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে জবাব দিল,
“ওসব ভাবার দরকার নেই। সর্দারের কাছে নিয়ে চল। ভাগ চাইলে আমরাও পাব।”
আলো ছায়ার মাঝে লাল চোখে দাঁড়িয়ে আছে কায়ান রাত্রেশ। দ্রোহান আর রাভান কায়ানের কাছে এসে কাঁধ থেকে ফেলে দিল আরশীকে। বাতাসের আলতো ঝাপটায় আরশীর সিল্ক ওড়নাটা মুখে পড়ে মুখ ঢেকে গেল। দূর থেকে রুদ্রাণী দেখেই চিনতে পারলেন এটা তার মেয়ে। বুকের ভেতর হিম হয়ে উঠল তার। কাপতে কাপতে দৌড়ে গিয়ে কায়ানের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন।
“এই মেয়েটা আমার, সর্দার। জানি না এদিকে কীভাবে আসলো। আপনার দোহাই লাগে, ছেড়ে দিন আমার মেয়েকে।”
রুদ্রাণীর কথা শুনে বিচ্ছিরি লম্বা দাঁত বের করে ভয়ংকরভাবে হাসল কায়ান। গম্ভীর গলায় বলল,
“যাকে এত বছর ধরে খাওয়ার বাসনা ছিল… আজ বুঝি ভাগ্য নিজেই সামনে এনে দিয়েছে।”
রুদ্রাণী কেঁদে ফেললেন। কায়ানের পায়ের কাছে আবার পড়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন। কিন্তু কায়ান পা দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল তাকে মাটিতে। ঠান্ডা মাটিতে লুটিয়ে পড়েই তিনি বুঝলেন, আরশীকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। বুকের ভেতর তীব্র ধকধক শুরু হলো, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল… আর এক মুহূর্ত পরই জ্ঞান হারিয়ে অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন রুদ্রাণী।
কায়ান রাত্রেশ ভয়ংকর দাঁত-নখ বের করে জিহ্বা চাটল। মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত গর্জন তুলে আরশীর কাছে গেল। লম্বা দাঁত বের করে কামড়াতে চাইল আরশীকে। ঠিক তখনই অদ্ভুত এক কান্ড হলো। আপনাআপনি কায়ানের নখ ছোট হয়ে গেল, দাঁত গুটিয়ে এলো, গর্জন থেমে গেল।
কি হচ্ছে বুঝতে না পেরে কায়ান মুখ কুঁচকে আরশীর দিকে তাকাল। পা দিয়ে আরশীর মুখের ওড়নাটা সরিয়ে দিল। চাঁদের সরু আলো গাছের পাতার ফাঁক গলে এসে পড়েছে আরশীর মুখে। ক্লান্ত মুখ, ফ্যাকাশে ঠোঁট, কপালে কাটা দাগ থেকে বিন্দু রক্ত ঝরছে। কাঁধে ছড়ানো চুল, চোখজোড়া বন্ধ। চাঁদের আলোয় ফ্যাকাশে মুখের আরশীকে মায়াবতী রাজ্যের সেরা মায়াবতী লাগছে! মায়া উপচে পড়ছে মুখ থেকে।
তীব্র মায়াবী মুখটা দেখে পাপিষ্ঠ রাজার বুকের ভেতর কিছু যেন ধপ করে নড়ে উঠল। মানুষের তরতাজা রক্তের গন্ধ পেরিয়ে এক সুঘ্রাণ এসে আঘাত করল কায়ানের নাকে। এ যেন বৃষ্টির পর ভেজা মাটির সাথে মিশে থাকা ফুলের সুবাসের থেকেও গভীর। জীবনে এরকম সুঘ্রাণ সে আর পায়নি।
ভেতরে ভেতরে অবাক হলো কায়ান—
“এ কেমন মানুষ? এমন অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ কেন তার গায়ে?”
কায়ান নুয়ে পড়ে আরশীর মুখের কাছে। সাথে সাথে নিশ্বাসে কাঁপন ধরে তার। আলতো করে ছোঁয় আরশীকে। এক শীতল কাঁপুনি বয়ে যায় তার শিরদাঁড়া বেয়ে। সে কপাল স্পর্শ করে আঙুলের ডগায় এক বিন্দু রক্ত নিয়ে নাকের কাছে ধরল। নাকে টানল, না, কোনো রক্তের গন্ধ নেই!
সে বিড়বিড় করল,
“এ হচ্ছে টা কী আমার সাথে? আমার ভয়ংকর রূপ জেগে উঠছে না কেন? এই মানবী এত নিস্পাপ, এত অকথ্য সুন্দর কেন? কেন তাকে আমি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে পারছি না? কী এমন আছে তার মধ্যে, যার জন্য শতাব্দীর নরখাদক রাক্ষস হৃদয় প্রথমবারের মতো স্পন্দিত হচ্ছে!”
কায়ান চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। চোখে তার অদ্ভুত বিভ্রম। দ্রোহান আর রাভান হতবুদ্ধির মতো একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সর্দার কায়ান রাত্রেশের এমন আচরণ তারা জীবনে দেখেনি। সামনে তাজা রক্তমাংসের এক মানবী পড়ে আছে, অথচ কায়ান স্থির, নির্বিকার। মানবীকে খাওয়ার কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না তার মধ্যে।
রাভান এবার বলল,
“সর্দার, এসব কী করছেন আপনি? মেয়েটাকে এখনই খেয়ে নিন। আমরা তো ক্ষুধায় পাগল হয়ে যাচ্ছি! ও তো একদম টাটকা!”
কায়ানের মুখে কোনো উত্তর নেই। তার দৃষ্টি তখন গুহার দিকে আটকে আছে। ভেতরে ভেতরে তোলপাড় হচ্ছে তার।
দ্রোহান ফোঁস করে বলল,
“সর্দার, আপনি চুপ কেন? এখনই শেষ করে ফেলুন ওকে। আমি আপনার ভোজের আয়োজন করি?”
বজ্রের মতো গর্জে উঠল কায়ান—
“কেউ… কেউ এক ফোঁটা ছুঁবে না ওকে!”
সেই গর্জনে জঙ্গল কেঁপে উঠল, পাতাগুলো থরথর কাঁপল।
রুদ্রাণী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, মুখে ধুলোর স্তর জমে গেছে। কায়ান রাত্রেশ এগিয়ে গিয়ে এক লাথি মারল তার পাঁজরে। রুদ্রাণীর অচেতন দেহটা একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু চোখ খুলল না।
কায়ান মুখ বিকৃত করে থুথু ছুড়ে দিল তার মুখে। তবুও রুদ্রাণী জেগে না উঠলে কিছুটা থেমে আদেশ করল কায়ান,
“দ্রোহান! পানি দে।”
দ্রোহান কুণ্ঠিতভাবে একপাটি কুঁচো মাটির কলস বাড়িয়ে দিল। কায়ান সেটা তুলে রুদ্রাণীর মুখে ছুড়ে দিল জল। ঠাণ্ডা জলে চমকে উঠে কেঁপে উঠল রুদ্রাণী। চোখ খুলে চিৎকার করে উঠল,
“আরশী!”
ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েকে জীবিত দেখে সে দৌড়ে গেল মেয়ের দিকে। রুদ্রাণী কাঁপতে থাকা হাতে মেয়ের মাথাটা তুলে বুকে টেনে নিল।
কায়ান গম্ভীর স্বরে বলল,
“তোর মেয়েকে নিয়ে চলে যা। এই জঙ্গলে আর কখনো তোদের ছায়াও যেন না দেখি। তুই আর তোর মেয়ে আজ থেকে মুক্ত।”
শেষ বাক্যটা বলে কায়ান পিঠ ফিরিয়ে হাঁটতে লাগল অন্ধকার গুহার দিকে।
চলমান……!
