#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা (ডার্ক ফ্যান্টাসি রোমান্স)
#শারমিন_প্রিয়া
২.
বেশ ঠান্ডা পড়ছে। গা শিহরণ দিয়ে উঠছে। আমি ঘর থেকে গিয়ে একটা পাটি, একটা বালিশ আর ছোট একটা কম্বল নিয়ে বারান্দায় জায়গা করে দিলাম। মা বের হয়ে এসব দেখে রাগ দেখিয়ে পা*গ*লটাকে বললেন, “এই তুমি এখানে থাকতে পারবে না। এখনই চলে যাও।”
আমি বাধা দিলাম, “এমন করছো কেন? শীতের রাত, বেচারার ঠান্ডা লাগছে। থাকুক না এখানে। সে তো চুপচাপ শুয়ে থাকে। সকাল হলেই চলে যাবে।”
মা কোনোভাবে আমার কথা শুনলেন না। উনার এক কথাই, লোকটা এখানে থাকবে না। “পুরুষবিহীন বাড়ি, এলাকার মানুষজন বলবে কী?”
“একা জঙ্গলের ধারে বাস করি আমরা, আবার এখানে লোক আসলো কোথা থেকে, মা?”
“উফ! আরশী, বড্ড বেশি কথা বলছো তুমি! খাবার দিলে দাও, খাইয়ে বিদায় করো।”
জানি মা উনার কথা ফিরাবেন না। তাই লোকটাকে খাবার দিলাম। খাইয়ে বললাম, “চলে যাও।”
সে যেতে চায় না। একপ্রকার জোর করে বাহিরে বের করলাম তাকে। সঙ্গে কম্বলটাও দিয়ে দিলাম। মা দাঁড়িয়ে আছেন বারান্দায়; মুখে রাগ উপচে পড়ছে। আমি চুপচাপ ঘরে গেলাম। মায়ের রাগান্বিত মুখ দেখলে আমার ভীষণ ভয় লাগে।
ক্লান্ত লাগছিল ভীষণ। বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কখন চোখ লেগে গেল টেরই পেলাম না। মাঝরাতে ঘুম ভাঙল। নিশুতিরাতে শুনতে পাই, সেই পা*গ*ল মানুষটা গান গাইছে, “দয়াল আমি কোন চরে বাঁধিব রে নতুন ঘর, সেই চরে নি যাইবা তুমি রে….. ওরে বাঁধন লইবা নি আমার দুঃখের খবর, আমি কোন চরে বাধিব রে নতুন ঘর……..!”
এই নিশুতিরাতে গানটা বুকের মধ্যে এসে বিধছে। এত সুন্দর মানুষের কণ্ঠস্বর! মাশাআল্লাহ। আমি শোয়া থেকে উঠে বাতায়ন খুলে দিলাম। গানের গলাটা ভেসে আসছে রাস্তা থেকে। তার মানে, লোকটা রাতটা সেখানে কাটাচ্ছে। ইশ্ এই শীতে মানুষটা রাস্তায়! রাগ হলো মায়ের ওপর।
নড়েচড়ে উঠলাম আমি। একদম ভুলেই গিয়েছি, আজ মায়ের পিছু পিছু যাওয়ার কথা। প্রায়ই বলি যাব, তারপর সাহস কুলায় না আমার; অথবা ঘুমিয়ে পড়ি; অথবা যাওয়ার জন্য বের হলেই দেখি মা হাজির। ওড়না দিয়ে গা ভালো করে ঢেকে পা টিপে টিপে মায়ের ঘরে গিয়ে উঁকি দিলাম। রুমের মধ্যে ফ্যান চলছে, শা শা শব্দে। বাইরে জুতোও রাখা। ভেতরে শান্তি পেলাম একটু—তার মানে মা ঘরে আছেন। শীতের রাতে ফ্যান কেন চলছে! হয়তো মা দিয়েছেন তারপর ঘুমিয়ে পড়েছেন, বন্ধ করার কথা মনে নেই। আমি মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকে ফ্যানটা বন্ধ করলাম। সন্দেহবশত গতদিনের মতো মায়ের গায়ে আলতো করে হাত রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে আবারও শক খেলাম প্রচন্ড! মা নেই ওখানে।
দ্রুত বের হলাম আমার দরজা দিয়ে। মাঝরাত, চারপাশ নীরব, নিস্তব্ধ। জঙ্গলের ভেতর থেকে শেয়ালের ডাক ঘনঘন আসছে। আরও কি একটা পাখির শব্দও শোনা যাচ্ছে। শেয়ালের ডাকে ভয় লাগলো আমার। সামনে এক পা এগোতে পারছি না। আচ্ছা, মা যে রোজ রাতে কোথাও চলে যান, মায়ের কি এই জঙ্গল দেখে ভয় লাগে না?
ভয় ঝেড়ে এক পা উঠোনে ফেলতেই কয়েকটা কুকুর একনাগাড়ে ঘেউঘেউ করতে লাগলো। আমি পিছিয়ে গেলাম; আর সাহস হল না সামনে যাওয়ার। ভয়ে চুপসে পড়লাম। মেয়েরা প্রায় নিখোঁজ হয়, যদি কেউ আমাকে ধরে নিয়ে যায়। আত্মা শুকিয়ে আসে। দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ি। পা*গ*লটা গান বন্ধ করেছে। জানলা লাগিয়ে আধা খোলা রেখে দিলাম। দশ–বিশ মিনিট পর মা ফিরে আসেন গতরাতের মতো। আমি উঠে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম। মা বাথরুমে ঢুকার আগে আমি যা দেখলাম—আমার গায়ের প্রতিটি লোমকূপ শিউরে ওঠে। হৃদস্পন্দন জোরে চলতে থাকে। কাঁপতে থাকি। ভয়ে চিৎকার করতে গিয়ে মুখে পর্দার কাপড় গুজে দিলাম।
মায়ের মুখে, হাতে, কপালে সারা গায়ে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ, একদম তাজা রক্ত। মা কি কাউকে খু*ন করে এসেছেন? এত রক্ত কেন মায়ের গায়ে? মা কি খু*নি? দুনিয়ার যত নিকৃষ্ট জিনিস আছে সব মনে হতে লাগলো আমার। সাথে মায়ের প্রতি ভয় বাড়তে লাগলো। মা বাথরুমে গিয়ে গোসল করলেন। আমি বিছানায় গিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে পড়লাম। একটু পরে টের পেলাম মা আমার রুমে আসছেন। কোনোভাবে নিজেকে সামলে ঘুমানোর ভান করলাম—পাশ ফিরে। মা আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলালেন, কপালে একটা চুমু খেলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে চলে গেলেন। মা রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ার পর আমি উঠে বসি। কান্না করি, মুখে কাপড় গুঁজে। আমার একমন মাকে ভয় পায়, দোষী ভাবে। আবার মায়ের আদরে অন্যমন মাকে সেরা মা হিসাবে বিবেচিত করে। মাথা যন্ত্রণা শুরু হয় আমার।কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। মা আসলে কি, কেন এত রহস্য মাকে ঘিরে। এ কেমন জীবন আমার!
পরের দিন সারাটা বেলা আমার মনমরা হয়ে কেটে গেল। মায়ের দিকে তাকাতে ভয় লাগে, চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারি না। মনে হয়, ইনি বোধহয় মা নন; হয়তো আমাকে মেরে ফেলার জন্য ঠিক করেই বড় করছেন। একবার ক্লাসে স্যার বলেছিলেন, না ঘুমানোরও ওষুধ পাওয়া যায়। আমি স্কুলের কথা বলে স্কুলে যাই। ক্লাস করার মন নেই। ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধটা কিনে নিয়ে আসি। আজ রাত যেভাবেই হোক, মা আসলে কে, আমি ধরবই। ভুলেও ঘুমানো যাবে না। কোনো বিপদ হলে হোক, এই রহস্য আমি বের করেই ছাড়ব।
বরাবরের মতো বিকেল হলো, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। আমার মুখ শুকিয়ে আছে। মা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি হয়েছে? এ অবস্থা কেন?”
“মাথা ব্যথা, মা।”
মা তখন উঠে গিয়ে ঠান্ডা তেল নিয়ে এসে মাথায় লাগিয়ে দিলেন। বললেন, “চুলে শুধু শ্যাম্পু দিলে হয় না; তেলও দিতে হয়। তেল হলো চুলের খাবার। তেল না দিলে চুল লম্বা হয় না। আর মাথাও ব্যথা করে।” তারপর চিরুনি দিয়ে সুন্দরভাবে চুল আঁচড়ে দিলেন। রাত দশটার দিকে গরম গরম খাবার বেড়ে দুজনে একসাথে খেলাম।
মা শুয়ে পড়লেন। আমিও আমার রুমে এলাম। জানি মা শুয়ে থাকার ভান করছেন, নিশ্চিত একটু পরে বেরিয়ে পড়বেন। আমি ঘুম না হওয়ায় ওষুধটা খেয়ে নিলাম। দরজা লাগিয়ে কতক্ষণ শুয়ে বসে থাকলাম যেন সময়টা কাটে। বাতায়ন আধা খোলা রেখেছি; সেকেন্ড পরপর সেখানে গিয়ে তাকাচ্ছি— মা বের হচ্ছেন কিনা।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো। মায়ের সাড়াশব্দ পেলাম। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম জানলায়। চোখ রাখলাম বাহিরে। মা গায়ে চাদর জড়িয়ে বের হলেন। রাত তখন বারোটা বাজে। মা রাস্তায় গিয়ে উঠলেন। আমিও বের হলাম। এত ধীরে পা ফেলছি যে, আমার সঙ্গে কেউ থাকলে টের পাবে না। মাকে কবরস্থানের দিকে যেতে দেখলাম। এতরাতে কবরস্থানে মা, ভাবতেই পারছি না আমি। হৃদস্পন্দন থেমে আসছে; সামনে পা চলে না। নিজেকে বললাম, “থামলে হবে না, আরশী। আজই সব রহস্য খুঁজে বের কর। ভয় পাস না।” মা থামলেন। আমিও থামলাম। একটা বড় গাছের নিচে দাঁড়ালাম। শেয়াল ডাকছে, শেয়ালের ডাকে গা ছমছম করে উঠছে। মা সদ্য মারা যাওয়া এক লোকের কবরে গিয়ে বসলেন। লোকটার বাড়ি রাস্তার পাশেই; গত দুইদিন আগে উনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। উনার কবরে মায়ের কি কাজ হতে পারে?
চাদরের ভিতর থেকে মা বড় কোনও কিছু বের করলেন। তারপর মাটি খুঁড়ে লাশটা বের করলেন? পায়ের নিচ থেকে মাটি চলে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো আমার। মা একজন মহিলা হয়ে একা কীভাবে এই লাশটা তুলে নিলেন এত সহজেই? এত শক্তি কী করে হলো মায়ের? আর লাশটা নিয়ে বা করবেন কী?
মা লাশটা তারপর কাঁধে তুলে নিলেন। আমার চোখ বিস্ময়ে ফেটে পড়ছে। যা দেখছি চোখের সামনে সবই সত্যি মনে হচ্ছে না।
মায়ের পিছু নিলাম আবার। লাশটা নিয়ে মাকে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে দেখলাম। কবরস্থান পেরিয়ে আমি জঙ্গলের ধার পর্যন্ত এলাম, কিন্তু জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে সাহস হলো না। মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাব এখনি।
জঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। খনিক পর ভয়ংকর কণ্ঠে কে যেন চিৎকার করে বলল, “এই মৃত লাশ দিয়ে আমি কি করব? আমি রক্ত চাই! তরতাজা রক্ত!”
মায়ের করুণ কণ্ঠ কানে বাজলো। মা বলছেন, “ এত মানুষ দু’দিন পরপর হারিয়ে যায়, এজন্য তারা সাবধান হয়ে গেছে। আমি রোজ রেজ কোথায় পাব জীবিত মানুষ?”
লোকটা বাজখাই কন্ঠে বলে, “তোর মেয়ে। আমার তো তাকে খাওয়ার আজন্ম সাধ।”
মা এবার কান্না করে উঠলেন, “সর্দার, আমার একটা মাত্র মেয়ে আছে। আপনি আমার মেয়েকে খেতে চেয়েছিলেন বলে তরতাজা মানুষজন এনে আপনাকে খাওয়ালাম। আপনি আমার মেয়েকে ছেড়ে দিন। ওর দিকে আর নজর দেবেন না।”
এসব কি শুনছি আমি! কান ভোঁতা হয়ে উঠলো আমার। মাথা ঘুরছে, পৃথিবী চারপাশে ঘুরছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। টাল খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম আমি।
চলমান…..!
