#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া(১)
রোজ রাতে মা কোথাও একটা চলে যান। কবে থেকে এমনটা চলছে সঠিক জানা নেই আমার। তবে আমি টের পেয়েছি সপ্তাহ খানেক হলো।
এই তো, গত মাঝরাতে ভীষণ পানির তৃষ্ণা পেয়েছিল। উঠে দেখি, রুমে পানি নেই। তারপর বাধ্য হয়ে রান্নাঘরে যাই। পানি খেয়ে ফেরার সময় এমনি একটু উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম মাকে।
শীতের রাত। সুন্দরভাবে কম্বল মোড়া দেখে ফিরে যেতেই আচমকা মেঝেতে চোখ থেমে গেল। সবসময় রুমের বাহিরে মায়ের জুতো থাকে। এখন নেই! আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রুমে ঢুকে মা ডাকতে ডাকতে লাইট জ্বালালাম।
মায়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে গায়ে হাত রাখতে গিয়ে দেখি, ওখানে অন্য কিছু রাখা। ঝটপট কম্বলটা সরিয়ে দেখি, ওখানে লম্বা করে বালিশ রাখা! প্রচণ্ড শক খাই আমি।
চিন্তা করতে থাকি, এত রাতে মা কোথায় গেলেন? কী হলো মায়ের? নানান কথা ঘুরতে থাকে মাথায়। মায়ের ফোনও টেবিলে রাখা। কল দিয়েও পাব না।
লাইট অফ করে বাইরে বের হলাম। ছাঁদে গিয়ে দেখব মা ওখানে আছেন কিনা। কিন্তু বারান্দায় বের হওয়ার সাথে সাথেই দূর থেকে মাকে আসতে দেখি। চাদর দিয়ে ভালো করে মুখ ঢাকা মায়ের। চাঁদের আলো কিছুটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে আশেপাশে। এই আলোয় যে কাউকে সহজে দেখা যাবে। তাই আমি তাড়াতাড়ি বারান্দার পিলারের পেছনে লুকালাম।
দেখলাম, মা এদিক-ওদিক চোরের মতো তাকিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন। আমিও পা টিপে টিপে আমার রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে রইলাম। কান খাড়া করে রাখলাম। রান্নাঘরে থালা-বাটির শব্দ শুনা যাচ্ছে। তারপর বাথরুমে পানির শব্দ।
বেশ কিছুক্ষণ পর মা বাথরুম থেকে বের হয়ে রুমে গেলেন। তারপর নীরব হয়ে পড়লেন। বুঝলাম, মা শুয়ে পড়েছেন।
আমার ঘুম আসছে না চোখে। মা রোজ রোজ কোথায় যান, আমার জানতে ইচ্ছে করে। মাকে যখন জিজ্ঞেস করি তখন মা এড়িয়ে যান। বলেন,
“তোকে জ্বিন জ্বালাচ্ছে নিশ্চয়ই! আমি আবার কোথায় যাব? ওসব এমনি দেখিস মা। রাত হলো ঘুমানোর জন্য। সারারাত ঘুমাবি, কোনো নড়াচড়া পেলেও উঠবি না। আমি সব সামলাব।”
আমি জানি, আমাকে জ্বিন ধরেনি আর মাথাও খারাপ হয়নি। মা ভুল। মাকে আর জিজ্ঞেস করেও লাভ নাই। সিদ্ধান্ত নিলাম, এক রাত না ঘুমিয়ে মায়ের সাথে চুপিচুপি যাব, দেখতে হবে মা কোথায় যান এতদিন ধরে।
নিজেকে সামলাতে না পেরে সকালে মাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, “গতরাতে প্রস্রাব করতে উঠে তোমাকে ঘরে দেখতে পাইনি মা। কোথায় ছিলে? তারপর পানির শব্দও শুনলাম।”
মা বললেন, “কোথায় আর থাকব! ছাদে গিয়েছিলাম।”
“এত রাতে?”
“মনটা খারাপ ছিল রে মা।”
মায়ের মুখে মিথ্যা কথা শুনে মেজাজ গরম হলো। নিজেকে সামলে চুপচাপ খেয়ে স্কুলের জন্য রেডি হলাম। মাকে বললাম,
“স্কুল যাচ্ছি।”
মা বললেন, “যাও, সুন্দরভাবে ক্লাস করিও। মানুষের সাথে বেশি মেশার দরকার নেই।”
আমি বের হলাম। মাথার মধ্যে একটা কথা ঘুরপাক খেতে লাগল, “মানুষের সঙ্গে বেশি মেশার দরকার নেই।”
আচ্ছা, মানুষ মানুষের সাথে না মিশলে আর কার সাথে মিশবে? মায়ের কাজকর্ম যেমন অদ্ভুত, মায়ের কথাগুলোও অদ্ভুত।
রাস্তায় বের হয়েই প্রথমে চোখ গেল উত্তর দিকের ঘন জঙ্গলের দিকে। এই জঙ্গলটা এতটাই ঘন যে, একটা পাতা নড়লেও ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যায়। বছরে কেউ একবারও এ জঙ্গলে ঢোকে না। জঙ্গলের পাশ দিয়ে কেউ গেলে দোয়া-দরুদ পড়ে পড়ে যায়। লোকমুখে প্রচলিত একটা কথা শোনা যায়, এই জঙ্গলে নাকি যে যায়, সে আর ফিরে আসে না।
আমার মাথায় আসে না, এই জঙ্গলের ধারেই কেন আমাদের বাড়ি বানাতে হলো? মায়ের ভয় লাগে না? আমার তো লাগে। আমাদের বাড়ির বাঁ পাশে জঙ্গলটা, তার থেকে দূরে কবরস্থান। আর খানিক দূরে বাড়িঘর। মোটকথা, আমাদের ঘরের আশেপাশে কোনো ঘর নেই।
মাকে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করি,
“আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজন নেই মা?”
মা উত্তর দেন, “তোর বাবা ভীনদেশী ছিল। সে ভয়ংকর রোগে মারা যায়। তার সবাই বিদেশে থাকে।”
“আর তোমার মা-বাবা? আমার নানা-নানু?”
মা তখন মুখ কালো করে বলেন, “তোর বাবাকে বিয়ে করায় তারা আমাকে ত্যাজ্য করেছে। আমারও কেউ নেই।”
“তুমি আমাকে কারও সাথে মিশতে দাও না কেন?”
তখন মা উত্তেজিত হয়ে উঠেন, ধমকে বলেন, “আমি আছি তো! আর কাউকে কেন লাগবে?”
আমি তখন চুপসে যাই।
মা আর আমার কথা ভাবতে ভাবতে স্কুলে পৌঁছে যাই। পুরো ক্যাম্পাসে হইচই দেখে ঘাবড়ে যাই। রিপা ফিরে তাকালে চোখ উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করি, “কি হয়েছে?”
রিপা এগিয়ে এসে বলল, “সুমনা আছে না, ক্লাস নাইনের, গতকাল রাত থেকে সে নিখোঁজ।”
এ খবরে আমি তেমন একটা শক খাই না। কারণ এই ঘটনা ঘটে প্রায়ই। কয়েকদিন পরপর কেউ না কেউ উধাও হয়ে যায়। পরে আর তার খোঁজ পাওয়া যায় না। দেশে এত প্রশাসন থাকতে এমন কেউ নেই যে এগুলোর রহস্য খুঁজে বের করবে? মানুষের জীবনের কি কোনো মূল্য নেই?
ক্লাস আর হলো না। সবাই মিলে সুমনার বাড়ি গেলাম। কান্নার শব্দে ভরে গেছে পুরো বাড়ি। সুমনার মা বারবার বেহুশ হয়ে পড়ছেন। পুলিশ ঘুরাঘুরি করছে বাড়িতে।
অনেকক্ষণ ধরে হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়ে নিজ বাড়ি ফিরলাম। আসরের আজান হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। গোসল সেরে এসে দেখি, মা খাবার বেড়ে রাখছেন টেবিলে।
খেতে বসে ভাত মুখ দিয়ে ঢুকছে না। আনমনে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম।
মা ডাকলেন, “আরশী, কি হলো তোমার? খাচ্ছো না যে?”
“জানো মা, ক্লাস নাইনের সুমনা নামের একটা মেয়ে নিখোঁজ। আচ্ছা মা, কদিন পরপর যে কেউ নিখোঁজ হয়, পরে তাদের কেন আর খুঁজে পাওয়া যায় না?”
মা আমার দিকে গভীর চোখে তাকালেন। তারপর কন্ঠ নামিয়ে বললেন,
“কি করে বলব বলো তো? তুমি কিন্তু একমাত্র মেয়ে আমার। সাবধানে থাকবে। কারও সাথে মিশবে না, একা কোথাও যাবে না। এখন খেয়ে নাও ঝটপট।”
আমি কয়েক লোকমা খেয়ে হাত ধুয়ে নিলাম। টাওয়ালে হাত মুছে ডাকলাম,
“মা, আমি কি আজ রাতটা তোমার সাথে ঘুমাতে পারব? ভয় লাগছে।”
মা হাসলেন, বললেন,
“মেয়েরা বড় হওয়ার পর তার সাথে ঘুমাতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।”
তারপর মাথায় নরম হাত বুলিয়ে বললেন,
“ভয়ের কিছু নেই। আমি থাকতে তোমার কিছু হবে না। কারও সাহস হবে না কিছু করতে।”
মা উঠে রুমে চলে গেলেন। আমার ভেতর ভেঙে কান্না আসছে। ছোটবেলায় মায়ের বুকে ঘুমিয়েছি কিনা তেমন একটা মনে নেই আমার। তবে বুঝ হওয়ার পর থেকে মনে নেই কখনও মায়ের সাথে ঘুমিয়েছি। অথচ বাড়িতে দুইজন মাত্র মানুষ আমরা, মা আর আমি। মা কেন আমায় এত দূরে রাখেন, একমাত্র তিনিই জানেন।
মানুষ বলে, বাচ্চাদের মন খারাপ হলে মায়েরা নাকি সব বুঝে ফেলে। তবে আমার মা কেন বোঝেন না? আমার মনে হয়, মা সব বোঝেন, বুঝেও এড়িয়ে যান।
মন খারাপ করে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম টেবিলে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। উঠে উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দূরে দূরে বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। জঙ্গলের ভেতর থেকে ঝিঁঝি পোকার অজস্র ডাক ভেসে আসছে।
একা বাড়ি বলে সন্ধ্যা হলেই মনে হয় মাঝরাত। কেমন নিরিবিলি, নিস্তব্ধ পরিবেশ। হঠাৎ কেউ দেখলে মনে হবে, কতকাল বোধহয় মানুষজনের আনাগোনা পড়েনি এদিকে।
আকাশ আলো করে চাঁদ উঠেছে। থাকে থাকে সাজানো আছে মেঘের দল, কেউ উড়ে যাচ্ছে, কেউবা আঁকাবাঁকা হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। হাত বাড়িয়ে অপূর্ব মেঘকে ছোঁয়ার বৃথা চেষ্টা করি আমি।
কারও পায়ের শব্দে মনোযোগ ভাঙল আমার। দেখি, একজন পাগল দাঁড়িয়ে আছে। বয়স ত্রিশ-বত্রিশ হবে। বেশ চেনা সে। গত তিন মাস ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় সে। এই বাড়ি, সেই বাড়ি যায়, খাবার খায়, গল্প করে, গান গায়।
এমনভাবে কথা বলে, মনে হয় খুব শিক্ষিত সে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের কত উপন্যাস আছে সে অবলীলায় বলতে পারে। এমন একটা মানুষের মাথায় কীভাবে সমস্যা হতে পারে কে জানে!
আমাদের বাড়িতে মাঝেমধ্যে আসে সে। মা তাকে তেমন একটা পছন্দ করেন না, তাই তার আনাগোনা কম। যখন আসে, তখন আমার সাথে এক-দু’টো কথা বলে, খাবার খায়, তারপর চলে যায়।
আমাকে সে নতুন একটা নাম দিয়েছে—লাবনী। সে আমাকে লাবনী বলে ডাকে।
আমাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“ওখানে কি করছ, লাবনী?”
“আকাশ দেখি। তুমি দেখবে?”
“তুই-ই দেখ,” এই বলে সে বারান্দায় বসে পড়ল।
চলমান……..!
