#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি)
#শারমিন_প্রিয়া
৪.
জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কায়ান রাত্রেশ। রাত্রির বাতাসে তার লম্বা কেশ উড়ছে, চোখে রক্তাভ দৃষ্টি, চোয়াল শক্ত, কপাল ও গালের হাড়ে ছায়া পড়েছে চাঁদের। রাগে দপদপ করছে শরীরের প্রতিটি শিরা। মুখ থেকে গরম নিশ্বাস বেরুচ্ছে। দাঁত আর তীক্ষ্ণ নখগুলো অদ্ভুতভাবে ঝলসে উঠছে চাঁদের আলোয়। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে। গম্ভীর গলায় সে নিজেকেই বলল,
“কত বড় সুযোগ হাতছাড়া করলাম আমি… এক যুগ ধরে যাকে ভেবেছি ভোজ করব, তাকে পেয়ে হাত ছাড়লাম! কেন এমন হলো? কে আমার ভেতরে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে? কেন এই মানুষ মেয়েটা আমাকে ঘায়েল করল? মানুষের প্রতি আমি কেন আকৃষ্ট হচ্ছি।”
চিৎকার করে উঠে কায়ান। তার চিৎকারে রাক্ষস রাজ্যের ঘুমন্ত রাক্ষসরা জেগে উঠে। দ্রোহান দৌড়ে এলো। উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে, সরদার? গুহায় চলুন। বিশ্রামের প্রয়োজন আপনার।”
কায়ান গম্ভীর মুখে ধপাস করে বসে পড়ল এক মরা অশ্বথ গাছের গোড়ায়। কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে রইল, তারপর গভীর নিশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার ভেতরে অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করছি, দ্রোহান। মেয়েটাকে দেখার পর থেকে এমন হচ্ছে। আমি বিশ্রাম করতে পারছি না। ঘুমাতে পারছি না। চোখ বুজলেই মানুষ মেয়েটার চোখ-মুখ ভেসে উঠছে।”
কায়ানের গলা ভারি হয়ে আসে। সে থামে। কায়ান রাত্রেশের মুখে এমন অবিশ্বাস্য কথা শুনে দ্রোহান হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম সে তার সর্দারকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখছে। সে তার মাথার টুপিটা পেছনে সরিয়ে কায়ানের মুখের দিকে ঝুকল, কায়ানকে বুঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কোন কিছুতে নরপিশাচ কায়ানকে আজ সে বুঝতে পারছে না। জঙ্গলের উত্তর দিকে তাকিয়ে দ্রোহান ধীরে বলল,
“আমি কি করে বলব, সরদার? আপনার থেকে আমার জ্ঞান অনেক নগণ্য। আমি যাচ্ছি, আপনি আসেন।”
এই বলে দ্রোহান উঠে চলে গেল।
শেষরাতের নিস্তব্ধ জঙ্গলে জোনাকপোকা ভেসে বেড়াচ্ছে আলোর বিন্দুর মতো। কোথাও দূরে দু’একটা শেয়াল ডাকছে, কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠছে। কুয়াশায় মোড়া গাছের ছায়াগুলো নড়ছে বাতাসে।
কালো লম্বা পোশাক পরিহিত কায়ান রাত্রেশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সারারাত তার খাওয়া হয়নি, ক্ষুধায় পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। কোনো উপায় না দেখে সে রুদ্রাণীর নিয়ে আসা মৃতদেহটির দিকে এগিয়ে গেল। হাঁটু মুড়ে বসে ঠান্ডা মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে পুরতে লাগল।
নিঃশব্দ পেছনে এসে দাঁড়াল রাভান। সেও মাংসের এক টুকরো ছিঁড়ে মুখে দিয়ে মুখ বিকৃত করে বলল,
“পাংসে হয়ে গেছে।”
কায়ান থেমে যায়, নিচু স্বরে প্রশ্ন করে,
“আমরা মানুষ কেন খাই, রাভান?”
রাভান হালকা হেসে উত্তর দেয়,
“মানুষ খেতে ভালো লাগে, সর্দার। তাদের রক্তে আছে নেশা ধরানো স্বাদ। তাছাড়া মানুষের রক্ত খেলে শক্তি হয় প্রচুর। আর কচি বাচ্চার পোড়া মাংস—সেই টেস্টের কোনো তুলনা নেই।”
“মানুষ ছাড়া আমাদের খাবার নেই?”
“আপনি তো সব জানেন, সর্দার। তাহলে কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
কায়ানের গলা গভীর হয়ে আসে,
“মানুষ না খেয়ে আমরা বাঁচতে পারব তো?”
রাভান এইবার চমকে ওঠে,
“হঠাৎ এসব কী প্রশ্ন করছেন, সর্দার! বাঁচা যাবে হয়তো, কিন্তু শক্তি থাকবে না।”
কায়ান মুখ মুছে উঠে দাঁড়ায়।
“আমি আর মানুষ খাব না।”
রাভান থমকে যায়,
“কি বললেন?”
গুহার দিকে হাঁটতে হাঁটতে কায়ান বলে,
“ঠিকই শুনেছো। আমি আর মানুষ খাব না।”
রাভান দৌড়ে এসে পাশাপাশি দাঁড়ায়,
“সর্দার, ছোটবেলা থেকে মানুষ খেয়ে আসছেন আপনি! পারবেন না, এটা অসম্ভব।”
“মানুষদের মুখে শুনেছি, পৃথিবীতে কিছুই অসম্ভব নয়। রুদ্রাণীর মেয়ে আমাকে পাগল করে দিয়েছে। সারারাত ভাবতে ভাবতে একটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি—ও আমার জন্যই তৈরি। শুধু আমার জন্য। কিছু একটা ওর মধ্যে আছে, নয়তো আমার মতো নরখাদক কীভাবে ঘায়েল হয়ে পড়ল?”
রাভানের গলায় কৌতূহল,
“কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সর্দার?”
“মানুষ মেয়েটাকে আমার চাই-ই-ই।”
রাভান বিস্ময়ে ফিসফিস করে,
“কিন্তু ও মানুষ কীভাবে, সর্দার? ও তো রুদ্রাণীর মেয়ে! রুদ্রাণী তো অর্ধরাক্ষস।”
কায়ান ধীরে বলে,
“ও রুদ্রাণীর মেয়ে নয়।”
রাভান থেমে যায়,
“আশ্চর্য! তাহলে কার?”
কায়ান গর্জে ওঠে,
“এটা জানা তোমার দরকার নয়। চলে যাও।”
রাভান মাথা নিচু করে বলে,
“যাচ্ছি, সর্দার। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনি এই গুহার প্রধান, আমাদের রাজা। আপনার এই কথা যদি আপনার বাবা জানেন, অথবা পুরোনো গুহার লোকেরা, তাহলে মহাযুদ্ধ লেগে যাবে।”
কায়ানের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে ওঠে,
“তাহলে করব কী? কাউকে ভয় পাই না আমি! মানুষ মেয়েটাকে আমার পেতেই হবে যেভাবেই হোক।”
রাভান আস্তে বলে,
“আপনাকে দেখলে ও ভয় পাবে, সর্দার…”
কায়ান থেমে যায়, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেয়,
“মানুষ হব আমি। মানুষ হওয়া যায় তো? তাই না?”
রাভান হতবাক। দু’কদম পিছিয়ে যায়,
“আপনার মস্তিষ্ক ঠিক আছে তো? রুদ্রাণীর বাবা মারা গেছেন, তাঁর বরদান ছাড়া কেউ মানুষ হতে পারে না। বরদান না নিলে আয়ু কমে যাবে, মৃত্যুর মুখে পড়বেন আপনি।”
কায়ান স্থির গলায় বলে,
“যদি এটাই মূল্য হয় তাকে পাওয়ার, তবে আমি মৃত্যুও কিনে নেব তার নামে। আর শুনো, রাভান, সবাইকে বলো পুরোনো গুহায় চলে যেতে। এখানে থাকবে শুধু সিলথারা, দ্রাভীনা, তুমি আর দ্রোহান। আমরা কোনো সঙ্গ চাই না। এবার কোনো কথা নয়, চুপচাপ চলে যাও।”
কায়ান রাত্রেশের মুখ তখন অগ্নির মতো লাল। রাভান সেটা টের পেয়ে আর কিছু বলে না। জানে, এখন একটাও কথা বললে রাক্ষসরাজের ক্রোধের আগুনে পুড়ে মরতে হবে। তাই মাথা দুলিয়ে চুপচাপ পিছু হটে,অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
আরশীকে বাড়ি নিয়ে এসে রুদ্রাণী জ্ঞান ফেরালো। আরশী চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে, মাকে দেখছে বারবার। মুখে কিছু বলছে না। রুদ্রাণী আরশীর গায়ে হাত রেখে নরম গলায় ডাকলেন,
“আরশী, মা? আরশী।”
আরশী চোখের পাতা ফেলল। তার চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। রুদ্রাণী শাড়ীর আচল দিয়ে সেটা মুছে ফের ডাকলেন,
“আরশী।”
ঘোর কাটতেই লাফিয়ে উঠে। পেছনে সরে গুটিশুটি মেরে বসল আরশী। কাঁপছে সে। ভয়ার্ত চোখে মাকে দেখে বলে,
“তুমি আমার মা নও। কে তুমি?”
রুদ্রাণী থতমত খেয়ে পড়লেন। তিনি আরশীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে আরশী আরও পেছনে সরে। একদম দেয়াল ঘেষে বসল সে।
“আমার কাছে আসবে না। একদম আসবে না। তুমি ভয় পাচ্ছো কেন? আমি তোমার মা।”
আরশী কাপা কাপা গলায় বলল,
“আ..মি তো..মা..কে কবরস্থানে যেতে দেখেছি, তারপর লাশ নিয়ে ভয়ংকর জঙ্গলে। ওখানে আরেকজনও কথা বলেছে। সব শুনেছি আমি সব। আমার কাছে আসবে না। ছুবে না আমাকে।”
“শুনো, আমার কথা শুনো,” এই বলে রুদ্রাণী ঝাপটে ধরলেন আরশীকে। বুকের মধ্যে ডুকিয়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
“শান্ত হও। কেন ভয় পাচ্ছো? আমার কথা মন দিয়ে শুনবে? শুনবে?”
আরশী উত্তর দেয় না। রুদ্রাণী তবু বলতে শুরু করলেন,
“যা কিছু ঘটে, তার কিন্তু কিছু কারণ থাকে। এই পৃথিবীতে এমন অদ্ভুত অনেক কিছু থাকে, যা মানুষের জানার বাইরে। ওই যে জঙ্গলটা, সেটা ভয়ংকর জঙ্গল, এটা তো জানো? ওই জঙ্গলের গভীরে একটা গুহা আছে, হাজার বছর ধরে সেখানে রাক্ষসদের বসবাস। এখনও তারা আছে। তুমি যখন খুব ছোট ছিলে, তখন রাক্ষসরাজ্যের ছোট রাজকুমার তোমাকে দেখে। তখন সে বলে রাখে, তোমাকে খাবে কিছুদিন পর। তোমার বয়স পাঁচ হলে সে আমাকে জানালো তোমাকে নিয়ে যেতে। আমি অমানবিক কাজে জড়িয়ে পড়লাম। তোমাকে বাঁচাতে আমি একের পর এক অন্যায় কাজ করতে লাগলাম, মৃত মানুষ, জ্যান্ত মানুষ ধরে নিয়ে রাক্ষসের খাবার দিয়ে আসতাম।”
আরশীর কাঁপন বাড়ল। সে অদ্ভুত দৃষ্টি দিয়ে মাকে দেখছে। মনে হচ্ছে, তার কানের কাছে বিমান বিস্ফোরণ হচ্ছে। এত অদ্ভুত কথা সে জীবনে শুনেনি। ভেঙে ভেঙে জিজ্ঞেস করল,
“যে মেয়েগুলো হারিয়ে যেতো, তাদের তুমি নিতে? তুমি… কি? তুমি কীভাবে মানুষ হয়ে জ্যানৃত মানুষকে দিয়ে আসতে? আর রাক্ষস? এসব কি আদৌ সত্যি? কি সব মনগড়া কথা বলছো? নিজের কানে তো শুনলে।”
আরশী মায়ের কথা ফেলতে পারছে না, আবার অবিশ্বাসও করতে পারছে না। মাকে সে আগেই সন্দেহ করছিল। মায়ের কর্মকাণ্ড কিছুই ভালো ঠেকতো না। কয়েকদিন পরপর মেয়েরাও হারিয়ে যেত, কেউ হদিস পেতো না। তাহলে কি সব সত্যি?
আরশী দাঁত কিড়মিড় করে, চুল টানতে থাকে। রুদ্রাণী মেয়ের হাত ধরেন, বলেন,
“শান্ত হও। আমরা দ্রুত এই পাহাড়ী জায়গা থেকে চলে যাব। খোলামেলা জায়গায় বাসা বানাব। তোমাকে ছুয়ে কথা দিচ্ছি, আর কখনও এসব কাজে লিপ্ত হব না আমি।”
আরশী হাত ঝেরে ফেলে। রুদ্রাণী এক দম ছেড়ে উঠে দাঁড়ান,
“সব বললাম তোমাকে। মাকে মাফ করে দিও। আর কখনও এসব কাজে জড়াব না। তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি, আরশী। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আমার আপন আর কেউ নেই।”
মায়ের এ কথাটা আরশীর বিশ্বাস হলো না। এতবড় পৃথিবীতে কীভাবে একজনের মানুষের কেউ না থাকতে পারে। তিনি নিশ্চয়ই কত কিছু লুকাচ্ছেন।
“তুমি সিদ্ধান্ত নাও, আরশী। আর ভয় পেও না। আমি বেঁচে থাকতে কেউ একফোঁটা ছুঁতে পারবে না তোমায়।”
এই বলে রুদ্রাণী চলে গেলেন। আরশী লাইট অফ করে বসে থাকলো। সবকিছুর হিসাব মেলাতে গিয়ে তার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। মাথা টনটন করছে। ঘোরের মতো লাগছে।
ঠিক তখনি তার কানে ভেসে আসলো মধুর এক কণ্ঠস্বর,
“পরের জায়গা, পরের জমি, ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো সেই ঘরের মালিক নয়…”
এত এত টেনশন, দুশ্চিন্তার মধ্যে এই গলার স্বরটা স্বস্তি দিলো আরশীকে। নিশ্চয়ই পাগলটার গাইছে গান। নিশিরারাতে কী যে ভালো লাগছে শুনতে! হুট করে মাথায় আসলো একটা কথা আরশীর।
“এই যে পাগলটার রাতবিরাতে এখানে-ওখানে থাকে, রাক্ষস যদি সত্যি থাকে, তাহলে পাগলটাকে কেন ধরবে না?”
আরশী মাথা ঝাকালো, এসব কিছু ভাবব না।
সে চোখ বন্ধ করে পাগলের গান শুনতে লাগল।
চলমান….
