#মনের_অসুখ (শেষ)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
আপার কথা শুনে বাবা, মা নিশ্চুপ হয়ে যায়। বাবা, মা আপাকে আমাকে বোঝাতে নিয়ে আসছে। কিন্তু আপা আমাকে না বরং বাবা, মাকে বোঝানো শুরু করে। আপা বলে,“শুধু বিয়ে সংসার সন্তানই জীবন নয়। পৃথিবীতে অনেক মেয়ে আছে স্বাবলম্বী। তারা কি সংসার করছে না? বিয়ে হচ্ছে না? তাহলে তোমরা কেন মেয়েকে সেই সুযোগ দিতে চাচ্ছো না? আগে স্বাবলম্বী হোক তারপর যোগ্য পাত্র এমনি চলে আসবে।”
আপা বেশ সময় নিয়ে খুব ভালোভাবে বাবা, মাকে বোঝায়। অতঃপর না বুঝলে কঠিন করেই বলে,“মেঘা স্বাবলম্বী হবে তারপর বিয়ে করবে। এটা নাহলে আমি আর তোমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবো না।”
অতঃপর বাবা, মা বুঝলো। তারা এই কথায় রাজি হয়। আপা বাড়ি যাবার আগে আমার সাথে কথা বলে। সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“দোয়া করি তুই অনেক বড় হ। স্বাবলম্বী হয়ে বাবা, মায়ের পাশে দাঁড়া। আমি তো পারবো না।”
আপার মলিন গলা শুনে আমার কেমন লাগলো। আমি শান্ত গলায় বললাম,“তুমি সুখী আছো?”
“আছি।”
শান্ত গলায় এটা বলে। অতঃপর আপা বলে সংসারে সুখটা আসলে ওভাবে হয় না। নিজের চাওয়া বিসর্জন দিয়ে সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকাটাকে এখানে সুখ বলে। যদিও সব সংসার এমন নয়। সবার কপাল তো খারাপ নয়। আপা আমাকে আরও কিছু বলে। তবে বাবা, মাকে না বলতে জানিয়ে দেয়। সেই প্রথমদিন যতটা খারাপ আচরণ করেছে আপার শাশুড়ী, তারচেয়ে বেশি খারাপ হয় এই এক বছরে। ঘরের সমস্ত কাজ করার পরও এটা সেটা নিয়ে কথা শোনাতো। বাবা বাড়ি ভিখারি, কিছু দেয় না। এই সেই অনেক কথা। তবে বাবা, মায়ের সেসব দিতে কষ্ট হবে বলে আপা কখনো বলেনি। কিন্তু তাও বাবা মাস শেষে নিজেদের কৃষির অনেককিছুই পাঠাতো। বাবা মা হয়তো এতে মেয়ে খুশি হবে। কিন্তু কথায় আছে যার যত আছে তত চাই। সেভাবে যত দিবা তত চাইবে। তাই আপা তাদের কথা চুপচাপ শুনতো। কথা বাড়াতো না। মাঝে মাঝে অবশ্য ভাইয়াকে বলতো। ভাইয়ার এক কথা,“মা তো ওমনই। একটু মানিয়ে নাও।”
এই মানিয়ে নিয়েই বছর খানেক কাটিয়ে দিলো। তবে মাঝে একবার মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো তখন মুখ খুলে দু’টো কথা বলছিলো। সেদিন প্রথম ভাইয়া আপার গায়ে হাত তুলে। অতঃপর বলে,“আমার মাকে কষ্ট দেওয়ার সাহস কিভাবে হলো? মাফ চাও?”
সেদিনই আপা বুঝেছে এই স্বামীও তার নয়। পারবারিক শিক্ষা বলে একটা কথা আছে। যে মানুষ যে পরিবেশে বড় হবে সে তো তেমনই হবে। তাই ভাইয়া হয়তো তার মায়ের চাওয়া মতোই হয়েছে। সেজন্য আপাকে সবসময় সব মেনে মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়। প্রতিবাদ কোন ভরসায় করবে, স্বামী তো তেমন নয়। সেই সাথে নিজে কিছু করেও না। বিবাহিত হয়ে বাবার ঘাড়ে বোঝা কেন হবে? এসব শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। আপা শান্ত গলায় বলে,“অনেকে বলে চাকরিজীবি মেয়েদের সংসার টিকে না। টিকবে কিভাবে? এত মানসিক নির্যাতন যার নিজেকে চালানোর মতো ক্ষমতা আছে সে কেন মানবে? সংসারের স্বার্থে মানিয়ে নেওয়া যায় কিছুটা তাই বলে পুরোটা নয়। একপাক্ষিক সারাজীবন মানিয়ে তো স্বাবলম্বী মেয়ে নিবে না। আর এখানেই সবার জ্বা লা।”
আপা এই কথাগুলো যে কত কষ্ট নিয়ে বলেছে সেটা আমি বুঝতে পারলাম। আমার তো আজও আপার বাড়িতে যে প্রথমবার গেলাম সেই দিনটা মনে পড়ে। সেদিনের সেই কথাটা ধরে রেখেই তো আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি চাকরি করার। সেদিন আপার শাশুড়ী বলেছিলো,“ছেলে নেই মেয়ে জামাইয়ের পকেট ভাঙিয়ে খাবে?”
এখানেই আমার মনে হয়েছে আমিও যদি এমন এক পরিবারে যাই তবে আমার বাবা, মায়ের কি হবে? নিজের কিছু না থাকলে বাবা, মায়ের দায়িত্ব কিভাবে নিবো? ওমন স্বামী, শ্বশুড়বাড়ি থাকলে তো শেষ বয়সে সেবাটাও করতে পারবো না। কিন্তু আমি এমনটা চাই না। আমার বাবা, মা আমার দায়িত্ব। সন্তান হিসাবে তাদের ভালো রাখাই তো আমাদের উচিত। ছেলে নেই তো। থাকলে নাহয় শুধু সংসার নিয়েই ভাবতাম, তাই না? আপাও আমাকে এসবই বোঝালো। অতঃপর সে চলে যায়। আপা এভাবে মানিয়ে নিয়ে হয়তো বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিবে। তবে আমি এমনটা চাই না। ঐ পরিবারের বোঝা উচিত তারা যেটা করছে সেটা ঠিক নয়। কিন্তু বোঝাবে কে?
____
এতক্ষণ নিজের পরিবারের কথা বলে আমি রাহুলের দিকে তাকালাম। রাহুল আমার সব কথা শুনে বলে,“তোমার আপা এখন ভালো আছে?”
“বিয়ের তিন বছর চলে। সেভাবেই মানিয়ে নিয়ে আছে। একবার তো শুনলাম প্রচন্ড মে রেছেও। সেবার আপা রাগ করে আসছিলো। মুরব্বিরা আবার কথা বলে এক করে দিয়েছে। ভাইয়া মাফ চেয়েছে। তবে যে একবার গায়ে হাত তুলতে পারে সে বারবার পারে। কিন্তু এখানে কিছু করার নেই। আপা নিজেই চায় না বের হতে। এখন একটা সন্তান আছে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে এই সংসারটা করতে চায়। এখানে কার কি বলার আছে।”
আমি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথাটি বললাম। রাহুল শান্ত গলায় বলে,“আমি বর হিসাবে কাপুরুষ হবো না। তুমি যেমন চাও তেমনই হবো। আমি তেমন হলে তুমি আমাকে মানবে তো?”
রাহুলের প্রশ্নটা শুনে আমি থমকে যাই। এই মানুষটা বেশ কয়েক মাস ধরেই পিছনে ঘুরছে। অবশেষে মনে হলো সব ক্লিয়ার করা ভালো। সত্যি বলতে একটানা কেউ আপনার পিছনে কয়েক মাস ঘুরলে তার প্রতি আপনারও কিছু একটা তৈরি হবে। সেটা তৈরি হওয়ার আগে সবটা বলে নিলাম। আমি তার কথা শুনে মুচকি হেসে বললাম,“আমি এখন বিয়ে করবো না। সেই সাথে যাকেই বিয়ে করি না কেন সে আমার বাবা, মাকে দেখাশোনা করতে আমায় বাঁধা দিতে পারবে না? এই শর্তে রাজি হলেই করবো।”
“আমি রাজি। আমি অপেক্ষা করতে রাজি। সেই সাথে তুমি আমার পরিবারের সাথেও কথা বলে দেখতে পারো। তাদের চিনে নাও। মনে হয় ততটা খারাপ হবে। খুঁত কম বেশি সবার থাকে। আমার পরিবারেরও আছে। তবে অপছন্দ হওয়ার মতো নয়।”
এটা শুনে আমি ম্লান হেসে বললাম,“এত তাড়া কিসের? বিয়ে তো এখন করবো না। আর হ্যাঁ আমি কোন সম্পর্কেও জড়াতে চাই না। কারো সাথে কোন কথা দেওয়া নেওয়ায় নাই।”
“মানে?”
রাহুল বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে। আমি খুবই শান্ত গলায় বলি,“এই যে আপনি চান আমি আপনার সাথে যোগাযোগ রাখি। আমাদের কথা হোক। আমরা দেখা করি। তারপর যখন বিয়ে করার সময় হবে করবো। এসব হবে না। আমি এখন শুধুমাত্র আমার লক্ষ্যে মনোযোগ দিতে চাই। পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পাবো তারপর বিয়ে করবো। তখন অব্দি যদি আপনি থাকেন তবে ভেবে দেখবো।”
“মানে কোন আশা ছাড়াই এত বছর অপেক্ষা করবো?”
রাহুলের এই প্রশ্নই তার জবাব দিয়ে দেয়। অর্থাৎ সে পারবে না। এটা স্বাভাবিক। কয়েক মাসের পরিচিত একটি মেয়ের জন্য ভরসা করে থাকা যায় না। এটা আমিও মানি। তবুও আমি তাকে আমার বিষয়টা পুরোপুরি ক্লিয়ার করলাম। সেই সাথে বললাম,“আশা করি আপনি আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাবেন। যার ভাগ্যে যে আছে তার সাথেই বিয়ে হবে। সেটা নাই বা হই তবে সম্মান আশা করতেই পারি।”
রাহুল সম্মতি জানায়। পরক্ষণে বলে,“আমি অপেক্ষা করবো।” এটা শুনে আমি ম্লান হাসলাম। শান্ত গলায় বললাম,“মোহ কেটে গেলে জানাবেন। তখন দেখা যাবে।”
এটা বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম। রাহুল কিছু বলতে চাইছিলো তবে শুনলাম না। বরং বললাম,“সব কথা সেই সময়ে হবে। সেই অব্দি নাহয় সব কথা জমিয়ে রাখেন।”
রাহুল আপাতত মাথা নাড়ায়। এখন তার আমার প্রতি একটা ভালো লাগা রয়েছে যে। যেটা কয়েকদিন দেখা সাক্ষাৎ না হলে কেটে যাবে। তাই আমি জানি রাহুলও সেই সময়ে জীবনসঙ্গী খুঁজে নিবে। এখানে তার দোষ নেই। হতেই পারে এমন। এটা ভেবেই আমি সামনে হাঁটা ধরলাম। বুকের ভেতর শান্তি অনুভব করলাম। রোজ রোজ রাহুলের পিছু নেওয়া ভালো লাগছিলো না। এখন আমি অন্য কোনদিকে মন দিতে চাই না। শুধুমাত্র লেখাপড়া এবং লক্ষ্যে মনোযোগ দিতে চাই। কারণ আমি জানি যখন আমি উপরে উঠে যাবো তখন আমার হাত ধরার জন্য মানুষের অভাব হবে না। তবে হ্যাঁ সেই সময়ে আমি সেই মানুষেরই হাত ধরবো যে মানুষটি সঠিক হবে। সংসারের জন্য মানিয়ে নিতে তো হবেই। তবে সেই মানিয়ে নেওয়া শুধু একপাক্ষিক নয়। আমার জন্য তাকেও অনেককিছু মানিয়ে নিতে হবে। আর এই মানিয়ে নিতে পারা ছেলেটিই একজন পার্ফেক্ট স্বামী হওয়ার যোগ্য। যেকোন মেয়ের জন্য সেই যোগ্য। আমি সেই যোগ্য মানুষের অপেক্ষা করবো। আমাকে যে মাথায় রাখতে হবে আমার বাবা, মায়ের ছেলে নেই। তাদের জন্য আমরা মেয়েরাই সব।
(সমাপ্ত)
(অগোছালো একখান গল্প শেষ করলাম।)
