#মনের_অসুখ (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
প্রথমবার আপার বাড়িতে গিয়ে বাবাকে কান্না করতে হলো। নতুন বিয়ে হয়েছে আপার। সবে পনেরোদিন হলো। আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আপা এবং দুলাভাইকে নিয়ে আসতে গেলাম আমি এবং বাবা। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার শেষে এটাই আমাদের প্রথম আসা। আমরা সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে আপার শাশুড়ী বললো,“তা বেয়াই হঠাৎ কি মনে করে?”
শুরুতে এমন প্রশ্নে বাবা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। পরক্ষণে নিজেকে সামলে কুশল বিনিময় করে বলে,“মেয়েকে এবং জামাইকে কয়েকটা দিনের জন্য নিতে আসলাম।”
“বিয়ে হতে না হতেই আমার ছেলেকে হাত করার ধান্দায় লেগে পড়লেন? বাহ্। বুদ্ধি আছে মশাই আপনার।”
তার কথার ভাবার্থ বুঝতে না পেরে বাবা এবং আমি তার দিকে তাকালাম। আপাও আমাদের পাশে দাঁড়ানো ছিলো। সে লজ্জায় আঁচল দিয়ে মুখ লুকালো। নিজের শাশুড়ীর এমন কথায় সে যে লজ্জা পাচ্ছে সেটা আমরা বেশ ভালো বুঝতে পারলাম। তাই নরম গলায় বললো,“আম্মা বাবা খুশি সবে এলো। এসব আলোচনা নাহয় পরে হবে।”
“পরে কেন হবে?
আমি ভুল কিছু বলেছি? তোমার বাবা তো ভালোই বুদ্ধি করেছে পরের ছেলেকে হাত করার। নয়তো বিয়ের মোটে কয়েকটা দিন গেল, এরই মাঝে আসতে পারে মেয়ে জামাইকে নিতে?”
তার কথার কিছুই বুঝতে পারলো না বাবা। সে অবুঝের মতো বললো,“আপা আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আপনি কি বলছেন? আপনি বোধহয় ভুল বুঝছেন।”
“জ্বী না। কোন ভুল বুঝিনি। আমি তখনই জানতাম আপনারা এমন একটা ফন্দিই করবেন। বিয়ের আলাপ করার সময়ই আমি বলেছিলাম, এই বাড়িতে বিয়ে দিও না। মেয়ের কোন ভাই নাই। দুই মেয়ে। সারাজীবন শ্বশুড় শাশুড়ীকে আমার ছেলের টানতে হবে। কিন্তু না। কেউ আমার কথা শুনলো না। ছেলের পছন্দের মেয়ে। হাতছাড়া করা যাবে না। আপনারাও পেয়ে গেলেন একটা সুযোগ। এত ভালো ছেলে হাতছাড়া করা যায়? বাকি জীবন জামাইয়ের পকেট ভেঙেই খেতে হবে যে। তাই চলে আসলেন জামাইকে নিতে। আমার ছেলেকে বেড়াতে নেওয়ার বাহানায় নিয়ে মাথাটা চিবিয়ে খাবেন।”
একটু থেমে আবারও বলে,“আমি তো শুনেছি আপনাদের ওদিকের মানুষ কালোজাদু করে। আমার ছেলেটাকে না জাদু টাদু করে ফেলেন।”
বাবা এবং আমি এসব কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যাই। ইতিমধ্যে আপার শাশুড়ীর কর্কশ কন্ঠের কথা শুনে সেখানে আরও অনেকে উপস্থিত হয়। তার মাঝে দুলাভাই ছিলো। সে তার মায়ের কথা শুনে তাকে থামাতে যায়। এতে তার মা রেগে বলে,“জাদু করবে নাকি করা শেষ। আমি নিশ্চিত আমার সোনার টুকরো ছেলেটাকে তারা জাদু করেছে। নয়তো এই মেয়েকে আমার ছেলে বিয়ে করতে পারে?”
“মা থামো প্লীজ।”
ভাইয়া তাকে অনুরোধ করেও থামাতে পারছে না। তবে এই ঘটনায় আমি এবং বাবা খুবই হতবাক হলাম। নতুন আত্মীয় হওয়া মানুষের সাথে কেউ এমন ব্যবহার করতে পারে? তার কথায় অবশ্য বোঝা যাচ্ছে আমাদের কোন ভাই না থাকায় শেষ বয়সে বাবা-মায়ের দায়িত্ব আমাদের উপরই আসবে। আপার মাধ্যমে ভাইয়ার উপর। অর্থাৎ তার ছেলের উপর। তার ভয় হচ্ছে তার ছেলেকে বেড়াতে নিয়ে আমরা যদি হাত করে নেই। যতই এসব ভয় হোক। তাই বলে কি প্রথমবার বাড়িতে আসতে না আসতে এমন আচরণ করবে? এটা কোন মানুষ করতে পারে? এমন আচরণ কারো পরিবারের সাথে যায়? হয়তো দুই একটা পরিবার এমন। দূর্ভাগ্যক্রমে তার একটা আপার কপালে জুটেছে। এখানে আপার জীবন কতটা কষ্টের হতে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পেরে আমি এবং বাবা দুজনেই আতকে উঠলাম। আমাদের ভয়টা আরও বেড়ে গেল যখন দেখলাম আপা তার শাশুড়ীকে সামলাতে গেলে সে আপাকে ধাক্কা মে রে সরিয়ে দেয়। বাবা এমন দৃশ্য দেখে কষ্ট পেলেন। তার মেয়েরা তার বড় আদরের। তবে বিয়ের পর সব মেয়ের জীবনই বদলায়। তাই বলে নতুন অবস্থায় এমন? আমি কিছু বলতে নিচ্ছিলাম কিন্তু বাবার জন্য পারলাম না। সে থামিয়ে দিলো। সে হয়তো ভয় পাচ্ছে এখানে আমরা কিছু বললে বেশি ঝামেলা বাড়বে। আর সেটা আপার ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। এই ভয়টা বাবা পাচ্ছে। তাই সেখানে আর দাঁড়াতে পারলো না বাবা। শেষবার শুধু অনুরোধ করে বলে,“মেয়েটাকে ওর মা খুব দেখতে চায়। জামাই না যাক মেয়েটা দুটো দিন গিয়ে বেড়িয়ে আসুক।”
এখানে আপার শ্বশুড় কথা বলে। সে অবশ্য ভাইয়াকেও সাথে দিতে চাচ্ছিলো। কিন্তু আপার শাশুড়ী এটায় রাজি নয়। সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। তার এক কথা,“আমার ছেলে ঐ বাড়ি গেলে ওরা আমার ছেলেকে বশ করে নিবে। তাবিজ করবে। আমার ছেলেকে আমি কিছুতেই যেতে দিবো না।”
তাই বাধ্য হয়ে সেদিন আপাকে নিয়েই আসতে হয়। তবে সেদিন বাবা খুব আঘাত পেয়েছে। আপার শাশুড়ী আমাদের পরিবার সম্পর্কে খুবই বাজে কথা বলেছে। মেয়ের বাবা সবটা মুখ বুঝে মেনে নিতে হয়েছে। বাসায় আসার পর আমিও বাবার উপর রাগ দেখিয়ে বললাম,“মেয়ের বাবা বলে সব মেনে নিতে হবে? ওরা অকারণে আমাদের অপমান করলো আর আমরা চুপচাপ শুনলাম? তুমিও কিছু বললে না আমাকেও বলতে দিলে না। কেন? এমন একটা শাশুড়ীর সাথে আপা থাকবে কিভাবে বলো তো?”
“মাথা ঠান্ডা কর।
আমি বুঝে নিবো।”
আপার মুখে এই কথা শুনে আমার আরও রাগ হলো। অনেকটা কঠিন গলায় বললাম,“কি বুঝে নিবে? তোমার সামনে তোমার বাড়িতে বাবার এত অসম্মান হলো তখন যেমন বিড়ালের মতো মিনমিন করছিলে সেভাবে?”
এটা শুনে বাবা আমাকে ধমক দেয়। আমি ধমক শুনে রাগ করে ঘরে চলে যাই। এতক্ষণে মা সবটা বুঝে যায়। ঘরের মধ্যে থেকেই তাদের কথা শুনতে পাই আমি। আপা বাবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছিলো। বাবা তেমন কিছুই বলে না। শুধু বলে,“আমি জানি না এই সংসার তুই কিভাবে করবি? শুধু বলবো একটু মানিয়ে নিস। ধৈর্য ধরে একটু সংসারটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা কর। হয়তো সব ঠিক হবে।”
এটা বলে বাবা চলে যায়। মা সব শুনে আপাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে। তার মেয়েকে এটা কোথায় পাঠালো? এটা ভেবেই ভয় হচ্ছে। যেখানে নতুন আত্মীয় এই কথাটা মাথায় রেখেও এক ইঞ্চি পরিমান ছাড় দেয়নি কথা শোনাতে, সেই শাশুড়ীর সাথে টিকে থাকা কষ্টকর। তাছাড়া ভাইয়াকেও তো দেখলাম মায়ের সামনে অনেকটা নরমই ছিলো। ভবিষ্যতে এই ছেলে আপার দুঃখ বুঝবে? এটা এখন সবাই ভাবছে। সেদিন রাতেই ভাইয়া ফোন দেয়। সে বাবার কাছে তার মায়ের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চায়। সেই সাথে বলে,“বাবা কিছু মনে করবেন না। আশেপাশের মানুষ কেমন জানেনই তো? পাড়া প্রতিবেশী, মায়ের বোনেরা তাকে ভুলবাল বুঝিয়েছে। তারা মায়ের কানে বিঁষ দিচ্ছে এক প্রকার। তাই মায়ের ধারণা আমি যদি একা কখনো ও বাড়িতে যাই তাহলে আপনারা আমাকে পরিবার থেকে আলাদা করে দিবেন। এই ভয়টা পাচ্ছে মা। কিছুটা ভয় থেকেই একটু বেশি বকে ফেলেছে মা। আমি তার ব্যবহারের জন্য মাফ চাচ্ছি। ক্ষমা করবেন।”
আমার পরিবারও তার কথায় গলে যায়। এভাবে তিনদিন ভালোই কাটে। আপার সাথে ভাইয়ার ফোনে বেশ কথা হয়। আপা সংসার জীবন নিয়ে ভয় পেলে ভাইয়াকে তাকে সাহস দেয়, ভরসা দেয়। সে তার কোন ক্ষতি হতে দিবে না। এই ভরসায় আপাও খুশি থাকে। অতঃপর আপা তাকে নিতে আসতে বললে ভাইয়া রাজি হয়। তবে ঘন্টা খানেক পর ফোন দিয়ে বলে,“এখানে একটা ঝামেলা হয়ে গেছে মিতু।”
“কি?”
আপা বেশ ভয় পায়। ভাইয়া তার ভয়টা বুঝতে পেরে বলে,“তেমন ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। আসলে মা আমাকে একা ছাড়তে চায় না। বুঝতেই তো পারছো সেকেলে মানুষ। তেমনই চিন্তা। মানুষ সহজেই উল্টাপাল্টা বোঝাতে পারে। তো মা তোমাকে নিয়ে আসতে আমার সাথে যেতে চায়।”
“সে ভালো তো। মাও আসবে।”
আপা খুব স্বাভাবিকভাবে নেয়। তখন ভাইয়া বলে,“তবে মা প্রথমবার যাবে তো। বুঝতেই পারছো। সে তো একা যেতে পারবে না। আন্টিরা, কাকীরা সবাই সাথে যাবে। তাই গোটা বিশে মানুষ হবে।”
“বিশ?”
আপা এটা শুনে অবাক হয়। এই তো বিয়েটা গেল। তখন কত খরচ হলো। এখন আবার বিশ জন আসবে। বাবার উপর বাড়তি চাপ পড়বে। তাই সে কিছুটা ভয় পায়। তবে বাবাকে এই কথা বললে সে রাজি হয়ে যায়। সে চাপ নিতে বারণ করে। বাবা হয়তো ভেবেছে কুটুম বাড়ি, তাদের পেটপুরে ভালো মন্দ খাওয়ালে মেয়েটা সুখে থাকবে। তাই চাপের হওয়া সত্ত্বেও রাজি হয়ে যায়। তবে সমস্যা হয় তখন যখন তারা আসার আগের দিন ভাইয়া আপাকে বলে,“আমাদের পঞ্চাশ জনের মতো মানুষ হয়ে গিয়েছে।”
’
’
চলবে,
