#মনের_অসুখ (২)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
“পঞ্চাশ জন?”
বাবা কথাটি শুনে খুবই হতবাক হলেন। বিশ জনের জন্য বাজার সদাই করা শেষ। এই সময়ে এসে আরও ত্রিশজন। মধ্যবিত্ত এক বাবার জন্য খুবই চাপের। আমার কানে এই কথাটা আসলে আমি বাবাকে বলি,“তাদের আসতে না বলে দাও। আপা নিজেই শ্বশুড়বাড়ি যাবে। তাদের আসার দরকার নাই।”
“তা বললে কিভাবে হবে?
নতুন সম্পর্ক তাই হয়তো প্রথমবার সবাই আসতে চাচ্ছে। কাউকে না করতে পারে নাই।”
বাবার নরম স্বরে এই কথা শুনে আমার রাগটা বেড়ে গেল। কঠিন গলায় বললাম,“মাস পার হয়নি বিয়ের। তার মাঝেই তারা আবার একটা বরযাত্রীর সমান এসে হাজির হয় কোন আক্কেলে? আর যে প্রথমবার বলছো, প্রথমবার তো আমরাও গেলাম। এক গ্লাস শরবত ছাড়া কিছু জোটেনি।”
“চুপ কর বেয়াদব। ছোট ছোটর মতো থাক। কলেজ নাই সেখানে যা।”
মা ধমক দিয়ে কথাটি বলে। আমার রাগটা এতে আরও বেড়ে যায়। মা বাবাকে শান্ত গলায় বলে,“কিছু তো করার নাই তুমি পঞ্চাশ জনের ব্যবস্থা করো।”
“কেন অহেতুক এত খরচ করবে? টাকাটা তো সেই ধার দেনা করবে, ধার করে এতগুলো গ রু খাওয়ানোর কোন মানে হয়?”
মা এই কথাটি শুনে আমার দিকে রাগী চোখে তাকায়। আপা নিশ্চুপ সে কিছু বলতে পারে না। মা আপার সেই করুন চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,“মেয়ের বাবা, মাকে একটু নরমই হতে হয়। মেয়েটা সারাজীবন থাকবে ঐ বাড়িতে। তাদের যদি ভালোভাবে আপ্যায়ন না করি। তাহলে হয়? তারা খুশি নাহলে যে মেয়েটার কপাল পুড়বে। তুই এসব কি বুঝবি? বিয়ে হোক তাহলে বুঝবি।”
“আমি বিয়ে করবো না। করলেও এমন পরিবারে একদমই নয়।”
এটা বলে রাগ নিয়ে ঘরে গেলাম। মা বাবাকে সব ব্যবস্থা করতে বলে। আপা এসব দেখে বাবা, মায়ের দিকে করুণ চোখে তাকায়। কোথায় বিয়ে করে তাদের শান্তি দিবে। উল্টো ঝামেলায় ফেলছে। বাবা, মা তার মনের অবস্থা বুঝে সান্ত্বনা দেয়। এদিকে আমার এসব ভালো লাগছে না। বাবা, মা সার্মথ্যের বাহিরে গিয়ে কেন ধার করে এত লোক খাওয়াবে? এভাবে কি কারো মন পাওয়া যায়? তারা যা মানুষ। তাদের মনের এই অসুখ কিছুতেই কমবে না। মানুষগুলোই তেমন খারাপ। তাদের যতই মন প্রান উজার করে দেওয়া হোক মন গলবে না। তাদের মনটা সুখ পাবে না। কখনো না। এই ধরনের মানুষের মনটা সবসময় বিঁষিয়েই থাকে। তাদের ছেলেও বা কেমন? ভাইয়া নিজে আপাকে পছন্দ করেছে। অতঃপর পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। সেই মানুষটার উচিত ছিলো তার স্ত্রী বাবার যাতে কষ্ট না হয় সেটা দেখা। হয় পরিবারকে বুঝিয়ে কম লোক আসা নয় নিজে খরচ দেওয়া। যদিও খরচ দিলে তো সেই কথাই হবে, আমার বাবা তার টাকা খাচ্ছে? আমার পরিবারে ভাই নাই। জামাই ঘর টানবে? তো এটা বুঝি অন্যায়? এই প্রশ্নগুলো মাথায় আসলে থমকে যাই।
অতঃপর আপার শ্বশুড়বাড়ির এতগুলো লোককে বিশাল আয়োজন করে খাওয়ানো হলো। এত এত আয়োজন করা হলো তাও তাদের মন ভরেনি। আমি জানতাম মন ভরবে না। খেতে বসে খাবারের এত খুঁত ধরেছে। আপার শাশুড়ী তো ছেলেকে নজরে রেখেছে যাতে আমার পরিবারের সাথে তেমন সময় না দিতে পারে। এমন একটি ছোটলোক পরিবারে যে আপা খুশি থাকবে না সেটা বুঝেই আমার কেমন একটা লাগলো। সেদিন তারা আপাকে নিয়ে গেলো। তবে যাবার সময় আপার খালা শাশুড়ী মাকে হাসতে হাসতে বলে,“আপা মেয়েকে আবার কুমতলব দেননি তো? না মানে আজকাল তো অনেক মেয়ের মায়ই তাদের মেয়ের বিয়ের পর এত কুমতলব দেয়? কি বলবো আপা, আমাদের ওদিকে আছে। বউটা মায়ের পরামর্শে সংসারটা খুওয়ালো। আপনি আবার এমন পরামর্শ দিয়েন না। নয়তো দেখা যাবে তার মতো এখন সব হারিয়ে সমাজে একঘরে হয়ে থাকতে হবে।”
সে কথাটি বলার সময় ভাব এমন ধরলো যেন মজা করছে। সে কথাটি বলার সময় আমিও পাশে ছিলাম। আমিও মজার ভাব ধরে বললাম,“আমাদের এদিকেও তো এমন ঘটনা ঘটছে। সেতু নামে এক মেয়ে শ্বশুড়বাড়ির সবার অত্যা চারে প্রায় যায় যায় অবস্থা। এখন তো গুষ্টির সব জেলে আছে।”
“কি!”
আপার খালা শাশুড়ী বেশ অবাক হয়। পরক্ষণে মা আমাকে ধমক দিয়ে বলে,“বড়দের কথার মাঝে কি? যা আপার কাছে।”
মায়ের ধমক শুনে আমি উঠে আসলাম। তবে আপার খালা শাশুড়ীর মুখ দেখে মনে হচ্ছে মা ধমক না দিলে সে এখানে বেশ ঝামেলা করতো। এমনও মানুষ হয়। বিয়ের আগে পরিবার যাচাই করার সুযোগ থাকা উচিত। পরিবারের ভেতরগত কাহিনি না জেনে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে জীবনটা শেষ করছে। এদের যদি আগে চেনার উপায় থাকতো। তাহলে বোধহয় কেউ অশান্তিতে থাকতো না। তবে আপার কথা ভেবে বেশ কষ্ট হচ্ছে। আপা যাবার আগে আমি অবশ্য বলেছি,“তোমার যদি ওখানে কোন সমস্যা হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের জানাবে। আমরা গিয়ে তৎক্ষনাৎ নিয়ে আসবো তোমাকে।”
মা এটা শুনে অবশ্য ধমক দেয়। তার ধমকে আমি গুরুত্ব না দিয়ে বলি,“একটা নরকময় সংসার করার চেয়ে সারাজীবন একা থাকা ভালো।”
“চুপ। তুই কি বুঝবি? বিয়ে হোক তাহলে বুঝবি। স্বামীর সংসার মেয়েদের জন্য সবকিছু। একটা মেয়ে পরিপূর্ণ হয় স্বামী সন্তান নিয়ে। সংসার জীবন কারো জন্যই সহজ নয়। তবে একবার আকড়ে ধরতে পারলে টিকে থাকা খুব সহজ।”
মায়ের এই কথা শুনে আপা কি বুঝলো জানা নেই। তবে সেদিনের পর সে কখনো শ্বশুড়বাড়ি নিয়ে অভিযোগ করেনি। কয়েক মাসে একবার কয়েকদিনের জন্য এসেছিলো। আর আসেনি। তবে কখনো কোনদিন কোনকিছু নিয়ে অভিযোগ দেয়নি। মা যতবার ফোনে জিজ্ঞেস করতো,“তুই ভালো আছিস?” আপা সবসময় ভালো আছেই বলতো। তবে হ্যাঁ প্রথমদিকে একবার আপা বলেছিলো,“ভালো না থাকলে নিয়ে যাবে? বিবাহিত মেয়েকে সারাজীবন পালবে?”
“সবাই কি বলবে? এটা কি বলছিস? তুই ওখানে খারাপ আছিস মা? বল না আমাকে?”
মায়ের সব কথা আপা বোধহয় শোনেনি। সে শুধু শুনেছে ‘সবাই কি বলবে’। তাই তো সেদিনের পর সবসময় নিজের সুখটাই দেখাতো। তবে আমি বুঝতে পারতাম আপা হয়তো ভালো নেই। ওমন পরিবারে আদৌ ভালো থাকা যায়। আমি আলাদাভাবে আপার কাছে জানতেও চাইতাম,“আপা সত্যি করে বল না, তুই কি খুব খারাপ আছিস?”
আপা বলতো না। সে ভালো আছে। সে সবার সাথে মানিয়ে নিয়েছে। সংসারে মানিয়ে নিলে সুখে থাকা যায়৷ তাতে মনটা যতই অসুখে ভরা থাকুক না কেন? মনের অসুখের খোঁজ কে বা নেয়? এভাবে আপার বিয়ের বছর খানেক যায়। আমারও এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়। পরীক্ষা সবে সবে শেষ হয়েছে। তখনই ঘরে বাবা, মা আমার বিয়ের আলাপ ওঠায়। এটা আমার কানে আসতে আমি স্পষ্ট ভাষায় বলি,“আমি এখন বিয়ে করবো না।”
“মানে?”
বাবা, মা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করে। আমি খুব ভদ্রভাবে বলি,“আমার এখন বিয়ে করার ইচ্ছে নেই। আমি আগে নিজের পায়ে দাঁড়াবো। তোমাদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো যোগ্য হবো তারপর তেমন একটা ছেলেকে বিয়ে করবো যে ছেলেটা আমার দায়িত্ব পালণে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।”
বাবা, মা এই কথায় সন্তুষ্ট হলো না। তারা বিয়ে দিয়ে আমার একটি ব্যবস্থা করতে চায়। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে এক পা নড়ছি না। তাই এবার বাবা, মা আপাকে ফোন করে বাড়িতে আসতে অনুরোধ করলো। আপা শ্বশুড়বাড়িতে অনেক বুঝিয়ে একদিনের জন্য আসে। আপা আসলে বাবা, মা আমাকে বোঝাতে বলে তাকে। যখন আমি আপাকে বললাম,“আমার বাবা, মায়ের তো ছেলে নেই। আমারও যদি বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তাদের দেখবে কে? পরের ছেলের এত ঠ্যাকা পড়েছে যে দেখবে?”
“আমাদের চিন্তা তোর করতে হবে না। আমাদের একভাবে চলে যাবে।”
বাবা এই কথাটি বললেন। মাও তাল দিয়ে বললো,“তোর এখন বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। এখন বিয়ে না করলে লোকে কি বলবে? পরে বয়স বেড়ে গেলে ভালো পাত্র পাওয়া যাবে?”
“তোমরাই তো বলো বিয়ের জোড়া লেখা থাকে। তাহলে ওর বয়স হয়ে গেলে ওর সাথে যার জোড়া লেখা তার সাথে বিয়ে হবে না কেন? অবশ্যই হবে। আর বিয়ের কোন নির্দিষ্ট বয়স হয়? সবাইকে বিয়েই বা করতে হবে কেন? এটা ওর জীবন। ও সিদ্ধান্ত নিবে কখন বিয়ে করবে আর করবে না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ওর নেই? এটা কেমন কথা? তোমরা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কি বয়স, এই সেই নিয়ম নিয়ে বসেছো?”
আপার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। শুধু আমি নই বাবা, মায়ও। আপা খুব নরম গলায় বলে,“পাত্র ভালো হোক বা খারাপ শুধুমাত্র তার পছন্দেই সব হবে এমন নয়। তাকে মেঘারও পছন্দ হতে হবে। আর হ্যাঁ মেঘাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও। ও নিজের পায়ে দাঁড়ালে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করতে পারবে। তোমাদের ওর চাকরি টাকা প্রয়োজন নাহলেও ওর স্বাবলম্বী হওয়া ওর জন্য জরুরি।”
’
’
চলবে,
(ভুলক্রটি ক্ষমা করবেন। আশা করি খুব একটা খারাপ হয় নাই। তবে অগোছালো খুব।)
