#আটপৌরে
পর্ব:০৫ (শেষপর্ব)
বড়ো ভাবী একদিন আমাকে একলা ডেকে অসহায়ের মতো বললেন,নিতু তুমি একটু আম্মাকে বুঝিয়ে বলোনা।অনেক বছর তো হলো।তোমরা ভাই-বোনরা সবাই তো প্রতিষ্ঠিত হলেই।বাড়ি হলো।ধানী জমি হলো।যা যা দরকার সবই তো হলো।এখন মানুষটা নাহয় ফিরে আসুক।জানো তার চেহারাটা কেমন শুকিয়ে গেছে।এত ক্লান্তি!প্রায়শই অসুস্থ থাকে মানুষটা!
ভাবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কথাগুলো বলতে বলতে।
আমারও খারাপ লাগলো।আমি উনাকে আশ্বস্ত করলাম আমি মা’কে বুঝাবো।
কিন্তু,মা কি আর কোনো বুঝ মানার মতো মানুষ?
আমার কথা শুনে উনি গেলেন চরম ক্ষেপে।বললেন,বড়োবউ এর এতো সাহস? বড়োবউ এখন মুখ চালানো শুরু করছে? আবার, তোরে সুপারিশ ধরছে?
মুখ চালিয়ে কি পরিণতি হইছে বাকি বউদের ও কি দেখেনি? নাকি ওরও মনে স্বাদ জাগছে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার? একদম ঘাড়ধাক্কা মেরে বের করে দিবো……. যদি আমার ভোলাভালা ছেলেটার কানে বিষ ঢালে তো।
আমার খানিকটা বিরক্তই লাগলো।
বললাম,এত চেঁচাচ্ছো কেন মা? বাকি বউরা কি কষ্টে আছে? বরং, বাড়ি থেকে আলাদা থেকে ওরা আরো আরামে আছে।যারযার সংসার গুছিয়ে নিয়েছে।তাছাড়া,বড়োভাবী কই বিষ ঢেলেছে? এটা তো আমারও কথা ভাইয়া তো যথেষ্ট খেটেছে।আর কত? এখন তো তোমার সব ছেলেরাই ইনকাম করে।তিন জন মিলে তোমাকে অল্পস্বল্প করে দিলেও তো আমাদের ভালোই চলে যাবে।ভাইয়াকে বিদেশে থাকতে হবে কেন?
– চুপ কর মেয়ে।তুই কিছু বুঝস? অল্প-স্বল্প ভিক্ষা নেবার জন্য নি এত কষ্ট করে ছেলে পালছি? আর,তোর কি এখনো বিয়ে হইছে? তোর বিয়ে দিতে হবেনা? তোর বড়ো ভাইয়ের দায়িত্ব না তোকে ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া? নাকি সারাজীবন মায়ের ঘাড়েই পরে থাকবি?
আমি আর কথা বাড়ালাম না।কি দরকার? খামোখা গালাগাল শুরু করবে।
এরপর, মা বাকি দুই ভাইকে খবর দিয়ে আনলেন বাড়িতে।
উদ্দেশ্য আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলা।মা একটা পাত্র দেখেছে।ছেলে সরকারি চাকরিজীবী। পারিবারিক অবস্থাও ভালো।
সব শুনে মেঝোভাইয়া বললেন,ছেলে ভালো হলে তো আমার কোনো আপত্তি নেই।এখন, নিতুর মত আছে কিনা সেটাই মেইন কথা….
মা বিরক্তি নিয়ে বললেন,ওর আবার কিসের মত… যাইহোক, ছেলেকে কিছু টাকাপয়সা দিতে হবে।তাছাড়া, কিছু উপহার।বুঝিসই তো সরকারি চাকরিজীবী ছেলে।আমি সব কথাবার্তা এগিয়ে রেখেছি।তোদের কোনো ঝামেলায় পরতে হবেনা।শুধু তোরা টাকাটা দিলেই হবে।
মেঝোভাবী এবার কথা বললেন,যৌতুকলোভী ছেলে ভালো হবেনা।এমন পাত্রের কাছে আমাদের নিতুকে বিয়ে দিবোনা।
মা চেঁচিয়ে উঠলেন।বললেন,চুপ করো ফাজিল।তোমারে কথা বলতে ডাকছি আমি? তোমার পরিবারের মতো সবাই তো ছোটলোক না যে মেয়ের বিয়েতে কিছুই দিবেনা।এগুলো সব নরমাল বিষয়।
মেঝোভাইয়া ভাবীকে ইশারায় সরে যেতে বললেন।
এরপর নিজেই বললেন,জারিয়ার কথা কিন্তু ঠিকই।ছেলেকে তো আমার সুবিধা মনে হচ্ছে না।
– না মনে হলে নাই।আমি এই ছেলের কাছেই বিয়ে দিবো।ভালো পাত্র পাইছি এরজন্য তোদের সহ্য হচ্ছে না।চালচুলোহীন ছেলের কাছে বোনকে বিয়ে দিতে পারলে খুব ভাল্লাগতো তাইনা?
– তা নয় মা।তুমি তো মিতুর বিয়েও দিয়েছিলে নিজের পছন্দে।সে পাত্র তো ভালো পরেনি।খালি চাই চাই করে সারাক্ষণ।
– চুপ থাক।বেশি বুঝিস না।তোদের মতামত শুনতে আমি ডাকিনি।টাকা দিয়ে দিবি আমাকে ব্যাস।এমনিতেও তোরা মা বোনের কোনো খোঁজ তো রাখিস না।
মেঝোভাইয়া বিরক্ত হয়ে বললেন,কতো টাকা দিতে হবে?
আম্মা বললেন, ৫০০ জন মানুষ খাওয়াবো।আলোকসজ্জা থাকবে।বাদ্যবাজনা থাকবে।সবমিলিয়ে বুঝে শুনে খরচ দিয়ে যা তোরা দুইভাই।আর, পাত্রকে ক্যাশটাকা, যাবতীয় উপহার ওগুলো তোদের বড়োভাই দিবে।নিতুর গয়নাও ও দিবে।তোরা এতোটুকু তো করবি নাকি?
ছোট ভাইয়া একপ্রকার লাফ দিয়ে উঠলো।
বললো,অসম্ভব।আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি কয়টাকাই বা বেতন পাই….
মা ঝাঁঝিয়ে বললেন,হুম এখন তো এটা বলবিই।বউকে নিয়ে যখন ঘুরতে যাস তখন তো খুব টাকা থাকে।
– আজব তো মা।তুমি যা ইচ্ছা ভাবো।আমার পক্ষে সম্ভব না এত টাকা দেওয়া। আমি গেলাম।
মা এবার অসহায় চোখে মেঝোভাইয়ার দিকে তাকালেন।
– তুই তো ওর মত অবুঝ না। তুই বোনের ভালো ঘরে বিয়ে হোক তা চাস না?
– চাই।কিন্তু,সামর্থের বাইরে গিয়ে চাইনা।৫০ জন এর বেশি মানুষ খাওয়ানোর কোনো প্রয়োজন দেখিনা।আর এতো চাহিদাওয়ালা পাত্রের কাছে নিতুকে বিয়ে দিতে চাইনা।
মেঝোভাইয়াও চলে গেলেন।মা ঘরের মধ্যে সবসময় যা করেন, রাগারাগি -চেঁচামেচি তাই করলেন তখনও।
আমি মাকে বুঝাতে চাইলাম,এরকম পাত্র কি আসলে ভালো হবে?
মা উল্টা ধমকে উঠলেন। – তোকে কি কেউ পছন্দ করে? এত ভালো পাইছি যে এটাই বেশি।আর,বাড়তি কথা বলবিনা।
এরপর,আবার বড়ো ভাইয়াকে ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝাতে লাগলেন।
মা তো জানেন কোন সন্তানটা তার উপর বেশি দূর্বল।এই বিদ্যা কাজে লাগিয়ে তিনি, সব হাসিল করে নেন।
দেখতে দেখতে আরো কিছুমাস কাটলো।
মায়ের হুড়োহুড়িতে আমার বিয়েও হয়ে গেলো সরকারী চাকরিজীবী পাত্রের সঙ্গে।
বড়োভাইয়া কিভাবে কিভাবে সবকিছুই ম্যানেজ করলেন মায়ের কথা রাখতে গিয়ে।মা খুব কান্নাকাটি করে ভাইয়াকে রাজি করিয়েছিলেন।
তবে,বিয়ের পরপরই নিশ্চিত হয়েছিলাম এরা লোক ভালো নয়।সরকারী চাকরির অহংকারে মানুষটার মাটিতে পা-ই যেনো পরেনা।অন্যদিকে তার পরিবারের সবাইও বিশেষ একটা মিশুক না।বিয়ের আগেও বুঝেছিলাম, এরকম পাত্র আদতে ভালো হয়না।কিন্তু,মাকে তো বুঝানো সাধ্যে ছিলোনা।
ওবাড়ি থেকে বেড়াতে এসে মা’কে বললাম খুলে সবটা।
যে তোমার জামাই তো বিশেষ সুবিধার না।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।সংসারে ধৈর্য্য ধরতে হয়।
– যদি ঠিক না হয় তাহলে মা?
– নাহলে তো কিছু করার নাই।সবই তোর কপাল…
আমি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাসলাম।জেনে শুনে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে কপালের দোষ দিয়ে লাভ আছে?
যাকগে যাক সেসব কথা।এসব ভেবে আর কাজ নেই।মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে এসে বড়োভাবী ও বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে গেলাম।দেখলাম, ভাইয়ার সঙ্গেই কথা বলছিলো ভিডিও কলে ভাবী।বলছিলো দেশে ফিরার কথাই। ভাইয়া জানালো,অনেক টাকা তার ঋণ হয়েছে আমার বিয়েতে এত খরচাপাতি করে।এখনি সে ফিরতে পারবেনা।আরো,বছর কয়েক পরে ফিরবে।
প্রতিত্তোরে ভাবী কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ভাইয়া আমাকে দেখে জানতে চাইলেন,ওবাড়িতে সব ঠিকঠাক কিনা?
আমি আর সত্য কথা তাকে বললাম না।মিথ্যা করে ভালো আছি বলে ও ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। এবাড়িতে আমার কেমন দমবন্ধ লাগে।
দুদিন এখানে বেড়িয়ে মেঝোভাবীদের বাসায় গেলাম।
ওদের বাড়িতে গেলেই মনটা ভালো হয়ে যায়।কি সুন্দর সাজানো গোছানো সব কিছু।বাড়িটা যেনো ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে।
মেঝোভাবী সব শুনে বললেন,তোমার মেঝভাই কতো বুঝিয়েছে বড়োভাইয়াকে যেনো এইখানে বিয়ে না দেয়।
কিন্তু,উনি তো শুনলেন না।উল্টা আমাদেরই শত্রুজ্ঞান করলেন মায়ের কথায়।উনি ভেবেছেন,টাকা না দেওয়ার জন্য বুঝি তোমার মেঝো ভাই এমন করছে।এরপর,জেদ করে উনিই মায়ের কথা রাখতে যাবতীয় খরচ দিয়ে তোমার এইখানে বিয়েটাকে তরান্বিত করলো।আমরা তো চেয়েও আটকাতে পারলাম না।যেনো আমরা তোমার ভালোই চাইনা, মা এরকম ভাবে।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,আপনাদের আর কিইবা দোষ।কাউকে দোষ দিচ্ছি না ভাবী।
ভাবীর সাথে কথা শেষ হলে বাবুর ঘরে গেলাম।কি সুন্দর করে ও কথা বলে।ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে ওকে।মাসে মাসে বেশ খরচা।
মেঝোভাবী বললেন,বাবুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য খরচা তো করতেই হবে।বুঝোই তো আজকাল সব দিক দিয়ে পারদর্শী হতে হয়।
আমিও মাথা নাড়লাম।কথা সত্যি।কিন্তু,খারাপ লাগলো বড়ো ভাইয়ার বাচ্চাদের কথা ভেবে।ওরা গ্রামের স্কুলেই পড়ছে।ভাবীর সর্বক্ষণ মন খারাপ থাকে।তিনি নিজেও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।বাচ্চাদের পড়াশোনা কখনোই দেখাশুনা করতে পারেন না।ফলশ্রুতিতে,ওদের একদমই পড়াশোনা হচ্ছে না।
ওদিকে ছোট ভাইয়া ঢাকায় বেশ বিলাসবহুল ফ্লাট কিনেছেন।একদম উচ্চবিত্ত জীবন কাটাচ্ছেন তিনি স্ত্রীকে নিয়ে।বাড়ির কথা বেমালুম ভুলে গেছেন।মা নিজে থেকে ফোন না করলে তিনি করেনও না।
আর,তার বউ তো এবাড়িতে নাকি কোনোদিনই আসবেনা।কাজেই,মা আমাকে নিয়েই গেলেন ওর ফ্লাট দেখতে। আসলেই,দারুণ সুন্দর। আমরা দুদিন ছিলাম।ওর বউ বিরক্তই হয়েছে বলা চলে। দেয়ালে হাত দিলে ধমকে ওঠে, রং নাকি উঠিয়ে ফেলছে আম্মা।ট্যাপ নাকি জোরে ছাড়ে।সুইচ নাকি ভেজা হাতে ছুঁয়েছে।নানান ভুলত্রুটি তিনি ধরতে লাগলেন।মা বেসিনে পানের পিক ফেলেছেন কেন সেটা নিয়েও হৈচৈ করলেন।দুদিনেই একপ্রকার ক্লান্ত হয়ে পরলাম আমি।কিন্তু,মা বেশ খুশি।তার আদরের ছোট ছেলে এত ধনী হয়েছে।যদিও, ছোটভাবীকে তিনি অপছন্দ করলেন।
মাকে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। ছোট ভাইয়া যে জীবনে কখনো তার খোঁজ নেয়না তবুও ছোট ভাইয়ার প্রতি ভালোবাসার কিন্তু কমতি নেই। অন্যদিকে,বড়ো ভাইয়া এতো কিছু করছেন, বিনিময়ে মা তার কষ্টটুকু অনুভবও করতে পারছেন না।একবার বলছেনও না যে আর লাগবেনা তুই এবার দেশে ফির।
আর,বড়ো ভাইয়াও এমনি মায়ের অনুগত ছেলে যে মা না বললে সে ফিরবেনা। মাকে সে কষ্ট দিবে না কিছুতেই।
.
তবে,বড়ো ভাইয়াকে ফিরতেই হলো দেশে।মায়ের মতামত না নিয়েই ফিরতে হলো।
সেদিনও বড়ো ভাইয়া কিছুটা অসুস্থ ছিলো। কাজ শুরু করার পর থেকেই মাথা ঘুরাচ্ছিলো তার।তিনতলায় কাজ করছিলেন তিনি।ছোট কন্ট্রাক্ট তাই হারনেসও ছিলো না।তাপমাত্রা ছিলো প্রায় ৫০° সেলসিয়াসের কাছাকাছি। প্রচন্ড গরমে হঠাৎ কখন যে পরে গেলেন নিচে হয়তো তা নিজেও বুঝতে পারেন নি।ভাগ্য ভালো যে ঐদিন তুলনামূলক নিচের দিকে কাজ করছিলেন।নাহলে,তো জানে বাঁচতেন না।কিন্তু,বেঁচে থাকলেও ভাইয়া খুবই গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন।পায়ের গোড়ালি চিরদিনের মতোই অকেজো হয়ে গিয়েছিলো।ডাক্তার জানিয়েছে তিনি আর উচ্চতায় কাজ করতে পারবেনা।বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাও তার পক্ষে সম্ভব না।কাজেই,তার কাজ চলে যায়।আর,ওখানে খানিকটা চিকিৎসা নিয়েই ফিরে আসতে হয় দেশে।
এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে দেশে ফিরবে ভাইয়া আমরা কখনো তা ভাবিনি।
দেশে ফিরে যেনো আরো অসুস্থ হয়ে পরেন তিনি।তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।তার কোমড়ে অসহ্য ব্যাথা।ডাক্তার জানালো মেরুদন্ডের নিচের দিকে ডিস্ক সরে গেছে।পুরোপুরি ভাবে বিশ্রামে থাকতে বললেন।এছাড়া মাথায়ও আঘাত পেয়েছেন।হাত ভেঙেছে।আর গোড়ালির বিষয়টা তো চিরতরে থাকবেই।ভাইয়ার অবস্থা এক কথায় বেগতিক।
মা কেবল কাঁদতে লাগলেন।কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলেন,জানিনা কার নজর পরছে আমার সুখের সংসারে…..
বড়ো ভাইয়াকে দেখতে গিয়ে চোখের জল আর আটকাতে পারলাম না। এমন কষ্ট পেয়েছে মানুষটা!
মা যখন এলেন তাকে দেখতে, তখন ভাইয়ার জ্ঞান ছিলো।
তবে,মাথায় আঘাতের কারণেই বোধহয় তিনি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছিলেন।মা’কে দেখে হুট করে বলে বসলেন,,আমাকে মাফ করে দিও মা।আমি দেশে চলে এসেছি তবে আমি ইচ্ছে করে আসিনি।ঐ দেশে ওরা আমাকে আর রাখলো না।আর,তোমাকে টাকা পয়সা পাঠাতে পারবো না…ক্ষমা করে দিও।তোমার সোনার ডিম পাড়া হাঁসের আজকে মৃত্যু ঘটলো।
অদ্ভুত লাগছিলো তার গলার স্বর।মা বের হয়ে চলে এলেন।
বারান্দায় এসে কাঁদতে লাগলেন।সবাই কাঁদছে অথচ,কাঁদছেনা কেবল বড়ো ভাবী।তার চোখের জল যেন সব শুকিয়ে গেছে।কতোই তো চোখের জল ফেলে ভাইয়াকে দেশে আসতে বলতেন তিনি।সেই সময়ই হয়তো সব জল শেষ করে ফেলেছেন।
ভাইয়াকে পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক করতে হলে অনেক টাকা পয়সা চাই।তবেই,উনি অনেকটা আগের মতো হতে পারবেন।
বড়ো ভাবী আমায় ডেকে বললেন,আমাকে কখনো টাকা পাঠায়নি তোমার ভাই।কাজেই, আমার কাছে তো কোনো টাকা নাই।বুঝোই তো আমি পরের বাড়ির মেয়ে।আমাকে কেনইবা টাকা পয়সা পাঠাবে।যাহোক,মায়ের একাউন্টেই সব পাঠিয়েছে। এখন মা’কে দিতে বলো।দরকার হয় জায়গা জমি বিক্রি
করা হোক।উনার টাকা দিয়েই তো রেখেছেন মা সব।মানুষ বেঁচে থাকলে,সুস্থ হলে সব আবারও হবে।আগে তো মানুষটা নাকি?
আমি হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লাম।এরপর,ভাবীর কথাগুলো নিজের মতো করে মাকে গিয়ে বললাম।
মা জানালেন সব টাকা তো উনি খরচ করে ফেলেছেন সংসারের আয় উন্নতির পিছে।
আমি খানিকটা রেগেই বললাম,তাহলে, জায়গা জমি বিক্রি করো।ভাইয়ার টাকাতেই রাখা হয়েছিলো সব।
তখন মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
আমি বললাম,নাকি জমি আঁকড়ে ধরেই থাকবে? ছেলেকে সুস্থ করবেনা?
বড়োভাবীও সেসময় বাচ্চাদের নিয়ে এসে দাঁড়ালো মায়ের সামনে।
মা ঢোঁক গিলে বললেন,জায়গা তো আমি মিতু আর ছোটুর নামে রাখছি।
আমার মাথায় যেনো বাজ পরলো।
– মানে তুমি এসব কি বলছো?
মা চোখের পানি ফেলে বললেন, মিতুকে ওর জামাই দেখস না কিভাবে অবহেলা করতো,অপমান করতো আগে।খালি বের করে দিতো কথায় কথায়।এরজন্য, ওর তো একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার।কিছুটা জায়গা জমি থাকলে তো মেয়েটার একটা বল থাকে।এরজন্যই, আমি ওর নামে রাখছিলাম।আর,ছোটু তো তখনও চাকরি পায়নাই।ওর যা পড়াশোনার হাল ছিলো আমি তো ভয়ে ছিলাম যে আমার ছোট ছেলের তো কোনো চাকরিবাকরি হবেনা।ওর ভবিষ্যত কি হবে……এরপর,আমি তোর আর তোর মেঝোভাইয়ের নামেও রাখতাম কিন্তু সেই সুযোগ পাইনি।আগে,যারা বেশি বিপদে তাদের নামে রাখছিলাম।
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না।চেঁচিয়ে বললাম,আজব তো।বড়ো ভাইয়া তোমাকে তার এত কষ্টে উপার্জিত টাকা পাঠালো বিশ্বাস করে আর, তুমি সেগুলো দিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো অন্যদের নামে জায়গা রেখে ফেললা?তোমার কি বুদ্ধি-বিবেচনা নাই?
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,আমি তো জানতাম না যে এমন হবে।আমি তো ভেবেছিলাম ও আরো ১৫-২০ বছর বিদেশ থাকবে কমপক্ষে। আপাতত,ওর ছোট ভাইবোনদের জন্য সম্পদ করি কিছুটা।এরপর,ওর নামেও করবো। ও যে তার আগেই এমন করুন দশায় পরবে সেটা কে জানতো….
– মানে এটা কি মগের মুল্লুক পাইছো তুমি? একজন রক্ত পানি করে টাকা কামাবে আর সেই টাকা তুমি আরেকজনকে দিয়ে দিবে?
– আরেকজন বলছিস কেন? ওরা তো ওর ভাইবোনই।
– ফাইজলামি বন্ধ করো। এখন আপা আর ছোট ভাইয়াকে বলো জায়গা জমি বেঁচে টাকা দিতে।ভাইয়ার চিকিৎসা করতে হবে ভালো মতো।ছোট ভাইয়া তো একদম ধনী হয়ে গেছে।আর,আপার স্বামীও এখন ভালো হয়ে গেছে।ওদের তো কোনো সমস্যাই নাই।আরামে আছে একরকম।ওরা এসব জমি দিয়ে কি করবে?
মা এবার আরো কাঁদতে লাগলেন।বললেন,আমি ওদেরকে বলছি।কিন্তু,ওরা ওদের জমি দিতে রাজি না।
আমি বললাম,ওদের মানে? ওদের হলো কিভাবে?ওরা কি টাকা দিছে?
– ওরা টাকা না দিলেও।ওদের নামে তো জমি…..আমি তো সব ছেলেমেয়ের ভালোই করতে চেয়েছিলাম।আমি তো মা।
রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিলো মায়ের কথা শুনে।
কিন্তু,রাগ পরেও দেখানো যাবে।আমি নিজেকে ধাতস্থ করে বললাম,তাহলে দরকার হয় বাড়ি বিক্রি করো।
মা এবার বললেন,বাড়ি কিভাবে বেঁচবো? বাড়ি কি শুধু তোর বড়ো ভাইয়ের একার নাকি?
– আজব তো।ভাইয়া বাড়ি করলো না?
– তাতে কি হয়েছে…জায়গাটা তো তোর বাবার।অর্থাৎ, সব ভাইবোনেরই হক্ব আছে সেই বাড়িতে।তোর ছোট ভাই বলেছে,আইনত এই বাড়ির মালিক সবাই।কেউ চাইলেই সেই বাড়ি বেঁচতে পারবেনা।
আমার কেবল জোরে জোরে শ্বাস পরতে লাগলো।ছোট ভাইয়া আর আপা যে এতো শয়তানি করতে পারবে আমার ধারণাতেও ছিলো।কেবল,অন্যান্য পরিবারে শুনি এসেছি এধরণের কাহিনী কিন্তু নিজের পরিবারে কখনো দেখবো তা ভাবিনি। ওরা দুজন ভাইয়াকে দেখতেও এলোনা।
শেষে,ভাইয়ার কাছে যৎসামান্য টাকা ছিলো,ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া সেগুলো দিয়ে,তারপর, বড়ভাবীর শেষ কিছু গয়না বেঁচে আর মেঝোভাইয়াও কিছু টাকা দিয়েছিলো, ওসব মিলিয়ে ভাইয়াকে চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি আনা হলো।
তবে,আরো ভালো মানের চিকিৎসার প্রয়োজন ছিলো ভাইয়ার।অর্থাভাবে পুরোটা তো করানো হলোনা।
ডাক্তার বলেছে ভাইয়া আর কোনো সামান্যতম ভারী কাজও করতে পারবে না।
ভাইয়া বাড়ি ফিরলেন একদম নিশ্চুপ হয়ে।তিনি আর কারো সাথেই টু শব্দও বলেন না ।বাড়ির একপাশে তিনি থাকেন।একটা রুমেই একপ্রকার বন্দি জীবন কাটান।কারো সাথেই কথা বলেন না।এমনকি মায়ের সাথেও না।
মা হা-হুতাশ করেন।কান্নাকাটি করেন।বলেন,আমার কি দোষ? আমি তো মা।আমি তো সব সন্তানের ভালোই করতে চেয়েছিলাম। মায়ের উপর রাগ দেখিয়ে কি করে থাকছিস তুই?
মায়ের এসব কথায় এখন বড়ো ভাবী খুব রেগে যান।চিৎকার করে ধমক দিয়ে মা’কে থামিয়ে দেন।
মাও চেঁচান।তবে,আগের মতো আর পারেন না।বড় ভাইয়াকে তিনি মাঝেমাঝে বলেন,তোর বউ ইদানীং কেমন করে আমার সাথে দেখিস? ডাইনীটাকে কিছু বলিসনা কেন?
কিন্তু,বড়োভাইয়া আর কোনো কথাই বলেন না।
আসলেই,বড়ো ভাবীর মেজাজ সপ্তমে চড়ে থাকে ইদানীং। ভাইয়ার কোনো ইনকাম নেই।সংসারটা যে কোন হালতে চলছে……
ভাবী এখন একটা এনজিওতে চাকরি করেন।কাপড়চোপড়ও সেলাই করেন যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন।
কোনোরকম টেনেটুনে ভাবীই সংসারটা চালাচ্ছে।ভাইয়ার ওষুধ পত্রের খরচও চালাচ্ছে।
আর,মা এখানে এরকম শাক-সবজি খেয়ে কেবল দিন কাটাতে পারছেন না।তাছাড়া,বড়োভাবী চাকরিতে থাকলে তাকেই তো রান্নাবান্না করতে হয়।এসব তার ভাল্লাগে না।আমাকে তিনি বললেন,বয়স হয়েছে এসব কি আর পারি বল? এত কাজ করতে? তোর ভাবীর যে মেজাজ।দুই পয়সার চাকরি করে ভাব দেখায় আমার সাথে।তোর বড়ো ভাইও আমার সাথে কথা বলেনা।যেনো ও কাজ করতে গিয়ে পরে গেছে সেটা আমার দোষ।আচ্ছা, আমি কি ওকে ফেলেছি বলতো? কত মানুষ কাজ করে কেউ তো পরেনা।সবাইতো কমবেশি ছোট ভাইবোনদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে। ওর ভাগ্য খারাপ ছিলো বলে ও পরেছে।আমার উপর রাগ দেখিয়ে লাভ আছে? আমি বুড়ি মানুষ।
এসব কথা বলে,মা একসময় মেঝো ভাইয়ার বাড়িতে চলে যায় থাকতে।ওখানেই থিতু হয়েছেন তিনি।মেঝো ভাইয়ার আর্থিক অবস্থা ভালো।তাকে বেশ ভালো একটা ঘর দিয়েছেন।তার ঘরে এসি আছে।ছোট একটা ফ্রিজও আছে।আবার একটা টিভিও নাকি আছে।মা তো রাত জেগে নাটক সিরিয়াল দেখেন।আমাকে জানালেন,তিনি ভালোই আছেন।মেঝো ভাবীর সংসারে নাক গলানোর ইচ্ছা তার নেই। যা ইচ্ছে হয় করুক।তিনি মাছ,মাংস খেতে পারছেন।যা দরকার ছেলে এনে দিচ্ছে। ব্যাস আর কি লাগে?
আমি হেসে বললাম,চাইলেও তুমি মেঝোভাবীর সংসারে নাক গলাতে পারবে না মা…কারণ, মেঝোভাইয়ার মেরুদন্ড আছে।
মা আগের মতোই আমাকে ধমকান।বলেন, চুপ থাক বেশি বুঝিস না।
আমি আবারও হাসি।- বেশি আর বুঝলাম কই? বেশি বুঝলে তো এমন পরিবারে বিয়ে করে নিজের জীনন তছনছ করতাম না তোমার কথায়।
মা ফোন রেখে দেন।আমার এসব কথা তার ভাল্লাগে না।
ছোট ভাইয়া গাড়ি কিনেছেন।সেই উপলক্ষ্যে মস্ত পার্টি রেখেছেন।
সেখানে গিয়ে দেখি, মা খুব গর্ব করে সবাইকে বলছে যে তার ছোট ছেলেটি কত পরিশ্রম করে আজকে এই পর্যায়ে এসেছে। দেখলাম সেই পার্টিতে আপা এসেছে বাহারি সাজে।আপাও বর্তমানে যথেষ্ট উচ্চবিত্ত। মেঝোভাইয়াও এসেছেন দাওয়াত পেয়ে পরিবার নিয়ে।তার অর্থনৈতিক পজিশনও ভালো।নিজের বিজনেস ভালোই দাঁড় করিয়েছেন তিনি।এছাড়া,আমিও দাওয়াত পেয়েছি।আমার স্বামী ভালোমানুষ না হলেও তার অবস্থান তো ভালো।ধনীদের আত্মীয় স্বজন কিংবা বন্ধু তালিকায় বেশিরভাগ ধনীরাই থাকে।কাজেই,এই আয়োজনে বড়োভাইয়া স্বাভাবিক নিয়মেই দাওয়াত পায়নি।
আমি বললাম,ছোটভাইয়া তোমার জীবনের প্রথম বাইকটা কিন্তু বড়োভাইয়া কিনে দিয়েছিলো মনে আছে? আজ তুমি গাড়ি কিনলে,মানুষটাকে ডাকার প্রয়োজন মনে করলেনা?
সে হেসে বললো,কি দরকার বলতো? বড়ো ভাইয়া এসব পার্টির আদব কায়দা জানে? সারাজীবন বিদেশে কামলা দিয়েছে।কথা বলে অশুদ্ধ গ্রাম্য ভাষায়।পোশাক আশাকও কোথায় কি পরতে হয় জানেনা।মানুষজন কি বলবে……
মাকে বললাম,তোমার বড়ো ছেলের কথা মনে পরছেনা? খুব তো হাহাহিহি করছো…
মা রেগে বললেন,আজব কথা বলিস তো।মনে কেন পরবেনা? সেকি আমার সন্তান না? সবসময়ই মনে থাকে।কিন্তু,অসুস্থ শরীর নিয়ে ও এখানে এসে করবেটা কি?
আমি চলে এলাম পার্টি থেকে।এতো আলো,এত হৈচৈ আমার ঠিক হজম হচ্ছিলো না।
বড়ো ভাবীদের অন্ধকার আটপৌরে সংসারে ফিরে এসে তবে চেপে রাখা নিশ্বাসটা ছাড়লাম।
বড়ভাইয়া ইদানীং তার বন্ধুর দোকানে বসে।আর,ভাবী তো কাজ করেনই।তবুও,ছেলে মেয়েরা বড়ো হয়েছে।এখন তো ওদের কতো খরচ।সেসব কি আর এই অল্প টাকায় হয়?
ভাবী চেঁচামেচি করে অভাবের দুঃখবিলাস করতে লাগলেন আমাকে পেয়ে।আগের সেই নরম স্বর ভাবীর মধ্যে আর অবশিষ্ট নেই।
ছেলে-মেয়েরাও বাবা-মায়ের উপর যারপরানই বিরক্ত দেখেই বুঝলাম।
আমি ভাইয়ার ঘরে গেলাম।
অনেক দিন পর ভাইয়া আমার সাথে কথা বললেন।বললেন,জয়কালে সঙ্গীসাথীর অভাব হয়না।কিন্তু,ক্ষয়কালে কাউকেই আর ধারেকাছেও পাওয়া যায়না।এই সহজ সত্যটা আগে যে কেন বুঝলাম না।
বলে অদ্ভুত ভাবে হাসলেন তিনি।
আমি বললাম,ভাইয়া তুমি ঠিকাছো তো?
ভাইয়া হঠাৎ কন্ঠস্বর করুন করে বললেন, শান্তা সংসারের ভারে ক্লান্ত হয়ে গেছে জানিস।সারাক্ষণ ছেলে-মেয়েগুলোর উপর চেঁচায়।কথা শোনায়। ওকে আমি ঠিক চিনিনা।ওর সাথে আমার যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে রে।ও ওর গরিব বাপের কাছ থেকেই হাত পেতে টাকা আনে।আমার ভারী লজ্জা লাগে।ফোন করে যখন বলে,, তোমাদের জামাই তো পথের ফকির।করছে আরকি বিদেশ।সবই ক্ষুইয়েছে।কিছুই নেই। বিপদে আছি।পাঁচশোটাকা অন্তত দাও।
এসব কথা আমার কানে আসলে নিজেকে খুব ছোট লাগে।আরো ছোট লাগে যখন দেখি আমার বাচ্চারা কোনো বিলাসিতার জিনিশ তো চায়না। একজন একটা জ্যামিতি বক্স চাচ্ছে, আরেকজন ক্যালকুলেটর। এরকম পড়াশোনার সামগ্রীগুলো চাইলেও ওরা পাচ্ছেনা।উল্টা ওদের মা ওদের কথা শোনাচ্ছে। আর,আমি এতোই দূর্ভাগা যে নিজের সন্তানদের জীবনে এতটুকু সুখ-সচ্ছলতা এনে দিতে পারিনি।আমার সাথে ওরা দরকার ছাড়া কথাও বলেনা।বলবেই বা কি? আমি কি বাবা হওয়ার যোগ্য ওদের? এ জীবন তো আমার ষোলোআনাই মিছে হয়ে গেলো রে।সবাই তো তোরা ভালো আছিস।অথচ,আমি আমার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এমন মানবেতর জীবনযাপন করছি।কেউ ফিরেও দেখছেনা।আমার পাশে কেউই রইলো না।
আমি মাথানিচু করে রইলাম ভাইয়ার ছোট মুখটা দেখে।।
ভাইয়া নীরবতা ভেঙে পুনরায় বললো,তুই কি তোর মেঝোভাইয়ার থেকে কিছু টাকা চেয়ে আমাকে এনে দিতে পারবি? নিজের ছোট ভাইয়ের কাছে হাত পাততে লজ্জা লাগে রে। ও দিবে চাইলে আমি জানি।তুই একটু এনে দিস বোন।তাহলে,,ছেলে-মেয়েদের পরিক্ষার ফিসগুলো দেওয়া যাবে।ঘরে,অনেক দরকারি জিনিশ নেই।ওগুলো আনা যাবে। রোজই এসব নিয়ে তোর ভাবী বাচ্চাদের সাথে চেঁচায়।তুই একটু এনে দে না।
এরকম অনুনয় দেখে কি যে খারাপ লাগলো আমার!
আমি কথা দিয়ে এলাম আমি নিজের কথা বলেই মেঝো ভাইয়ার থেকে মাসে মাসে টাকা নিয়ে উনাকে পাঠাবো।
বড়োভাইয়ার চোখ দুটো আমি ভুলতে পারছিলাম না।অসুস্থ একজন মানুষ। কিছুটা তো পঙ্গুও হয়ে পরেছেন।
তার দুচোখে এই মাঝবয়সে এসে কি অসীম শূন্যতা।কেউ তার পাশে নেই।মা-বাবা,ভাই-বোন,আত্মীয়-বন্ধু কেউই নেই।দুঃসময়ে কাউকেই পাওয়া যায়না।
স্ত্রীর সাথে দূরত্ব তার অজস্র মাইলের।হওয়াই স্বাভাবিক। বড়ো ভাবীর মনেও যে রয়ে গেছে অসীম অভিমানের পাহাড়।অন্যদিকে বাচ্চাদের সাথে বাবার যে বন্ধন সেটা ভালো করে কখনো তৈরিই হয়নি।কেবল মা-কে নিয়ে অতি ব্যস্ত থাকার দরুন হয়তো বাচ্চাদের সাথে অজান্তেই দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলেছেন।সবার প্রতি ব্যালেন্স রাখতে পারেননি।কেবল,একদিকে ঝুঁকে গেছেন।বাচ্চাদের কাছে কেবল তাদের বাবা একজন ব্যর্থ পিতা।যার ব্যর্থতার দরুন এমন জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের……
অন্যদিকে,আপা কিংবা মেঝো ভাইয়া অথবা ছোট ভাইয়ার কথাও যদি বলি সকলে কিন্তু আজ সফল।
নিজেদের জীবনকে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবেই উপভোগ করছেন তারা।শেষবয়সে এসে ভাইয়ার অভাবের সংসারে কষ্ট করতে মাও রাজি নন।তাই তো,তিনিও ভিড়েছেন ওদের দলেই।
কেবল,একলা রয়ে গেলেন বড়োভাইয়া।
আসলে,কঞ্জুস হওয়া যেমন অনুচিত তেমন অতিরিক্ত
দয়ালু হওয়াও ক্ষেত্রবিশেষে উচিত নয়। কাকে, কোথায় আগে প্রাধান্য দিতে হবে তা বোঝা উচিৎ। পাশাপাশি, সবকিছুতেই একটা মাত্রা টানা উচিৎ।বোঝা উচিৎ, নিজেকে বিলীন করে অন্যকে ভালো রাখতে চাওয়া মানুষটা ভালোমানুষ নয় বরং বোকা।
নিজের দুঃসময় নিজেকেই পার করতে হয়,ঐসময় দুঃখের ভাগীদার কেউই হয়না।তাই,খানিকটা হলেও দুঃসময়ে একলা চলার প্রস্তুতি রাখা উচিৎ।
.
লেখিকা: লিলি
___সমাপ্ত___
