#আটপৌরে
পর্ব : ০৩
মেঝোভাবী সন্তানসম্ভবা।এখবর জানার পর আমি মা’কে কোনোরকম শান্ত করলাম।মা যদিও থামলেন তবে তখনো চেহারায় রাগের ছাপ রয়েই গিয়েছে।
মেঝো ভাবী নিজের ঘরে গিয়ে দরজা এঁটে বসে রইলেন।
বড়োভাবী অনেকক্ষণ ধরে দরজায় কড়া নেড়ে যাচ্ছে অথচ উনি কিছুতেই দরজা খুলছেন না।
মা নিজের ঘরে এসে আমাকে বললো,ঢং করে আরকি।আমাকে ইচ্ছা মতো অপমান করছে।এখন নিজে দুঃখী সাজার ভং ধরছে যেনো তোর ভাই এসে মনে করে আসল কালপ্রিট হলাম আমি।কত বড় ডাইনী….. শ্বাশুড়িকে কেমন করে মুখে মুখে জবাব দিলো।
আমি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।বললাম, থাক মা এখন এসব নিয়ে কষ্ট পেও না।কত বড় একটা সুখবর পেলে…..
মা আমার হাত জোরসে সরিয়ে বললেন, রাখ তোর সুখবর।তোর মেঝো ভাই কয় টাকা কামায়? ঐটুকু তো একটা ব্যবসা ওর।সেটা করেই নিজেকে ভীষণ বড় মনে করছে নাকি? সংসারে তো টাকাই দেয় একদম অল্প।এখন আবার ওর বাচ্চা হলে তো হইছেই।এক টাকাও আর দিবেনা।ওর কি নিজের মা-বোনের জন্য টান আছে?
আমি মায়ের কথায় কিছুটা একমত হলেও পুরোপুরিভাবে হতে পারলাম না।বললাম,মানছি বড় ভাইয়ার মতো অতো টাকা সে কামায় না।কিন্তু,তা বলে কি বাড়িতে একটা বাচ্চা আসবে,এতে আমরা খুশি হবো না?
– হ্যাঁ….হ্যাঁ তুই তো ওদের পক্ষেই কথা বলবি।তোর তো প্রাণপ্রিয় ভাবীজান।যখন লাত্থি মারবে তখন মজা টের পাবি।
আমি আর কোনো তর্কে গেলাম না খামোখা।মায়ের রাগ নয়তো আরো বাড়বে।
মা এবার আপাকে ফোন করে কিছুক্ষণ ফিরিস্তি দিলেন বাড়ির ঘটনার।এরপর ফোন করলেন ছোট খালাকে।
একই ঘটনা আবার রিপিট করলেন।হয়তো,এরপরের কলটা বড়ো খালাকে করবেন।
আমি বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে পরলাম।এসব শুনে কাজ নেই।তারচে বরং দেখি মেঝোভাবী বেরুলো কিনা……
ওঘরে গিয়ে দেখি মেঝোভাবী দরজা খুলেছেন।তবে,খাটের উপর বসে তিনি চোখের পানি ফেলছেন।পাশেই বড়ো ভাবী বসা।এতো দিন মেঝোভাবীর ঘরে না গেলেও আজ তিনি এসে তাকে স্বান্তনা দিচ্ছেন।
আমাকে দেখে থতমত খেয়ে গেলেন কিছুটা যেনো।
এরপর বললেন,আমি যাই পাকঘরে কাজ আছে।
হয়তো ভেবেছেন,আমি আবার মায়ের কাছে কিছু লাগাই কিনা উল্টাসিধা।
মেঝোভাবী আটকালেন।বললেন,বসুন ভাবী।আপনি কেন যাচ্ছেন? এবাড়ির সকলকে আপনি ভয় পান কেনো এত?
বড়ো ভাবী অনিচ্ছা নিয়েই বসলো।
আমি কিছু বললাম না।মেঝো ভাবীর কান্নার কারণ অবশ্য বুঝতে পারছি না।উনি কেনো কাঁদছেন? মায়ের সব কথায় তো উনি প্রতিবাদ করেছেনই।এখন আবার কাঁদার কি আছে।
তাই বললাম,ভাবী আপনি কেন কাঁদছেন? মা’কে তো বেশ কথা শুনিয়েছেনই।
হয়তো,মায়েরও ওভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি।কিন্তু,মা তো গুরুজন।মায়ের সাথে মেঝো ভাবীর কি এতো তর্ক ঠিক হয়েছে? আবার, এখন নিজেই কেনো কাঁদছে? যেনো সে কেবল বকুনি খেয়ে ব্যথিতই হয়েছে কোনো পাল্টা আঘাত করেই নি।
মেঝো ভাবী চোখের পানি মুছে আমার চোখে চোখ রেখে তাকালেন।
বললেন,নিতু তুমিও তো একজন মেয়ে।তুমি এখন যথেষ্ট বড়ো হয়েছো, এখনো যদি ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য না বুঝো তাহলে তো নিজের উপর ভবিষ্যতে অন্যায় হলে সেটার প্রতিবাদও করতে পারবে না।
আমি বললাম,আপনার প্রতি আমি সমব্যথী।তবে,আমি কি খুব ভুল কিছু বলেছি ভাবী? গুরুজনদের মুখে মুখে কথা বলা কি ঠিক?
– বয়সে বড়ো এই সূত্র ধরেই যদি সব গুরুজনকে তুমি অন্ধভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা শুরু করো তাহলে জীবনে পস্তাবে নিতু।বয়স দেখে নয় বরং একজন মানুষের ব্যবহার দেখে তাকে সম্মান করা উচিৎ।
– তার মানে বলতে চাচ্ছেন আপনি মা’কে সম্মান করেন না?
– সম্মান করবার চেষ্টা করি প্রাণপনে। তবে,তিনি অগুণিত অন্যায় কাজ করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। হয়তো বুঝেই কিংবা না বুঝে।সে যাই হোক,করছেন তো…
এবার আমার চট করে রাগ চড়ে গেলো।বললাম,কি এমন অন্যায় করেছেন আমার মা শুনি? আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে আমার মা ঘষেটি বেগম।
মেঝোভাবী খানিকটা হেসে বললেন,তার আগে তুমি ঠান্ডা হও।যদি সত্যি জানতে চাও তাহলে কিন্তু নিজেকে নিরপেক্ষ বানিয়ে শুনতে হবে।কারো প্রতি প্রবল মমতা থাকলে তার ভুলত্রুটি সচারাচর আমাদের চোখে পরেনা।
বড়ো ভাবী ইশারায় মেঝোভাবী-কে থামতে বলছেন।
কিন্তু,তিনি থামলেন না।আমার দৃঢ় ভাবে বসে থাকার ভঙ্গী দেখে বললেন, তোমার বয়েস কয়েকমাস বাদেই সতেরো হবে নিতু।ধরো তোমাকে আমরা তখন বিয়ে দিয়ে দিলাম….
আমি তাকে থামিয়ে বললাম,আমাকে বিয়ে দিবেন মানে? আমি কি কলেজে পড়বো না? আজব কথা তো।আমি কি অতো বড়ো হয়েছি?
মেঝো ভাবী হেসে বললেন, ঠিকই বলেছো।তোমার তো অতো ম্যাচুরিটি নেই যেহেতু তুমি ছোটো।এখনো ঠিকমতো চা-ই বানাতে পারোনা, অন্য রান্না তো দূরের কথা।খুবই মায়ের ন্যাওটা মেয়ে তুমি।বাচ্চাদের মতো টেবিলেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে যাও।নিজের জামা কাপড়ও তোমাকে বড়ো ভাবী ধুয়ে দেয়।তোমার ঘর আমি ক্লিন করে দিই।তুমি করলেও নাকি ভালোমতো হয়না।রাতে মশারি টানাতে ভুলে যাও।সকালে কেউ তোমাকে না ডাকলে জেগে উঠতে পারোনা।এখনো ঘরময় ছোটাছুটি করো।হাসাহসি করে বেড়াও।এটা চাই,সেটা চাই বলে বলে ভাইদের কাছে আব্দার করো।তোমার মা তোমাকে মাথা আঁচড়ে দেয়, খাইয়ে দেয়….
আমি হাত তুলে থামালাম।বললাম,আপনি কেনো এসব বলছেন জারিইয়াহ ভাবী? আমি কি খুব বেশি বুড়ি হয়ে গেছি নাকি? যে এভাবে খোঁটা দিচ্ছেন আমাকে।রান্না আমি শিখে নিবো পরে।সবই শিখে নিবো।পড়াশোনা আগে শেষ হোক।
– আচ্ছা তাই কোরো।আমি তো বাঁধা দিচ্ছি না।তবে,একটু ভেবে দেখো তো ঠিক তোমার বয়সী থাকতেই তো শান্তা ভাবীকে তোমার মা বউ করে এনেছিলেন। তিনি কিন্তু,এসএসসির পরে আর পড়াশোনা করতে পারেন নি।বলা বাহুল্য, তোমার মা দেননি। তোমার বয়সী থাকতেই তিনি এই পুরোটা সংসারের কাজ একা হাতে সামলেছেন। ভোর থেকে রাত অবধি কেবল এই কাজ,সেই কাজ,এর ফরমায়েশ, ওর হুকুম এইসব শুনে গেছেন। শুধু কি তাই,ইচ্ছে মতো গালি খেয়েছেন তোমার মায়ের কাছে।যেহেতু, গরীবের মেয়ে,তাকে যা ইচ্ছা তাই তো করা যায় তাইনা? গরীবের জীবনের কি দাম আছে? তাও,যদি হয় আবার মেয়ে মানুষ তাহলে তো কথাই নেই।এখন, নিজেকে উনার জায়গায় রাখো,আর ভাবো কালকে তোমাকে বিয়ে দিলে যদি তোমার শ্বাশুড়ি এমন ব্যবহার করে তোমার সাথে তখন তোমার কেমন লাগবে? তখনো কি সাপোর্ট করবে গুরুজন বলে? তোমার বড়ো ভাবী তো গুরুজন মেনেই আজীবন মুখবন্ধ রেখে, মাথাটা নুইয়ে বাঁচলো এবাড়িতে।অবশ্য,এটাকে ঠিক বেঁচে থাকা বলেনা,সার্ভাইব করেছে আরকি কোনোরকম। এত মান্যি করে শেষে উনি কি পেয়েছেন? উনার চেহারা দেখেছো? উনার চেয়ে কিন্তু আমি বয়েসে খানিকটা বড়োই হবো।অথচ,উনাকে আমার চেয়ে বয়স্ক লাগে।তেইশ বছরে এসেই উনাকে দেখায় তেত্রিশের মতো।
তোমার সাথে এমন হলে ভালো লাগবে তো? তুমি কি এমন সংসার করতে চাইবে? এটাকে কি সংসার বলে? স্বামী বিদেশে পরে থাকবে।বাচ্চারা বাবার আদর ছাড়া বড় হবে।নামে মাত্র বউ এর জের ধরে সারাজীবন খালি কথা শুনতে হবে আর রোবোটের মতো কাজ করে যেতে হবে। বিনিময়ে উনি কি পাচ্ছেন? দুমুঠো ভাত?দুমুঠো ভাতের কি এতো দাম যে তা নিজের জীবনের শখ-আহ্লাদ, স্বাদ-স্বপ্ন,আশা-আকাঙ্ক্ষা, রূপ-লাবণ্যে, আনন্দ-আরাম সব কিছু দিয়ে তবে চুকাতে হচ্ছে?
বড়ো ভাবীর চোখ দিয়ে কেবল ঝরঝর করে অশ্রু ঝড়ছিলো।তিনি ছাদের দিকে তাকিয়ে অশ্রুগুলো লুকানোর চেষ্টা করছিলেন।
আমি উপযুক্ত কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না।চুপ করে রইলাম অনেকক্ষণ। শেষে বললাম,বড়ো ভাবীর মতো কিন্তু আপনার সাথে কখনো হয়নি….
– হয়নি বলো না নিতু।বলো,হতে দেইনি আমি।যদি, আমিও শান্তা ভাবীর মতো শান্ত হয়েই থাকতাম তবে,আমারও এই হাল হতো। আমাকে তো কালসাপ ডাকো তোমরা তাইনা? তবে জানো কি, সাপ যতো বিষধরই হোক না কেনো সর্বদা মাথা নিচু করেই চলে।কিন্তু,যখন নিজের বিপদের আশংকা দেখে তখন আর ফণা না তুলে থাকতে পারেনা। তোমার মাকে অন্যায় কিছুই বলিনি।চেঁচামেচি তো আরো আগেই না।যাস্ট ঠান্তা গলায় যুক্তি দিয়ে কিছু কথা বলেছি।তাতেই,তোমার কষ্ট লাগছে আর আমার মা’কে যে উনি গালি দেন আমার কেমন লাগে বলো….তুমি তো মেয়ে।পরের বাড়িতে তোমাকেও যেতে হবে।যা আমরা ভোগ করছি সেই পরিস্থিতিতে হয়তো তোমাকেও পরতে হবে।যখন সব ছেড়েছুড়ে গিয়ে দেখবে ওরা তোমায় আপন না করে উল্টা কষ্ট দিচ্ছে তখনই কেবল আজকের এই আমাদের বিষয়টা বুঝবে তুমি।তবে,আমি চাইনা তোমার জীবনে অমন দিন আসুক।
আমি আর কোনো কথাই বললাম না।উঠে চলে এলাম।
মনে হচ্ছে দিক-দিশা হারিয়ে ফেলেছি।উনার সাথে আমি কিছুতেই কথা বলে পারবো না।
মা হয়তো আসলেই মাঝেমধ্যে বেশিই রাগারাগি করে ফেলেন।
.
বাড়িতে একজন ছুটা কাজের লোক রাখা হয়েছে।সে রান্না বাদে বাকি কাজ গুলো করে দিয়ে যায়।মা শুরুতে খুব রাগ করেছিলেন,শেষে কিনা ভদ্রলোকের বাড়ির জিনিশপত্রে ঝি এর হাত পরবে? বাড়ির বউদের কি হাতের বল সব হাওয়া হয়েছে নাকি?
মেঝোভাবী ইদানীং বেশ অসুস্থ থাকেন।বড়ো ভাবী অবশ্য বলেছিলেন,উনি একাই সবটা করতে
কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। শেষমেশ, কাজের লোক রাখাই হলো।
মেঝোভাবী আসার পরে আসলে এবাড়ির অনেক নিয়মই বদলেছে।মা সবসময়ই হা-হুতাশ করেন এ নিয়ে।
এরই মাঝে খবর এলো বড় ভাইয়া দেশে আসবেন।
প্রায় চার বছর পর বড়ো ভাইয়া দেশে ফিরছেন এখবর শুনে স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে একটা আনন্দের জোয়ার বয়ে গেলো।
সবাই বেশ খুশি হলেও খবরটা শুনে বড়োভাবী কেবলই কাঁদলেন।
আমি আর মেঝোভাবী তাকে স্বান্তনা দিতে লাগলাম।তিনি কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ বললেন,তোমাদের কাছে চারবছর হলেও আমার কাছে তো মনে হয়েছে চার যুগ পার হয়ে গেছে মানুষটাকে আমি সামনাসামনি দেখিনা।অপেক্ষার প্রহর যে এত দীর্ঘ হতে পারে আমি সেকথা আগে জানতাম না।
হঠাৎ, মা এঘরে এসে এই দৃশ্য দেখে বললেন,ইশশ ঢং দেখে আর বাঁচিনা।চার যুগের হিসাব দিতে আসছে।বলি,মায়ের চেয়ে কি মাসির দরদ বেশি? যেনো আমার চেয়েও সে বেশি কষ্ট পেয়েছে।
বড়ো ভাবী চোখ মুছে ফেললেন মাকে দেখে।তবে,চোখ মুছলেও কান্নার হেঁচকি সামলানো দায়….
মেঝোভাবী হেসে বললেন,তা আম্মা এতোই যখন কষ্ট পাচ্ছেন, তাহলে ভাইয়াকে আর বিদেশে পাঠানোর দরকার কি? এবার দেশেই তিনি কিছু একটা করুক।মায়ের চোখের সামনে ছেলে থাকবে এরচে ভালো আর কি হতে পারে!
মা রাগী চোখে তাকিয়ে প্রস্থান করলেন।
বড়ো ভাইয়া যখন ফিরলো তাকে দেখে আমি যেনো হঠাৎ করে চিনতে পারলাম না।কেমন অচেনা লাগছে আমার ভাইকে! অনেকটা যেনো বয়স বেড়ে গেছে।চেহারায় রুক্ষতার ছাপ।আগের সেই মায়াবী অবয়ব আর নেই।রং পুড়েছে।অনেকখানি শুকিয়েছেনও।
আসলে,বাবা বেঁচে থাকাকালীন কখনো তো কায়িকশ্রমের কাজ করতে হয়নি।ভাইয়ার তো অভ্যাস নেই।অমন বিদেশ বিভুইয়ে কি করে যে তিনি এত কষ্ট করে তবুও ছিলেন।অন্তত, আমি হলে তো জীবনেও পারতাম না।আমার খুব কষ্ট হলো ভাইয়াকে দেখে।
ভাইয়া অবশ্য আমাকে দেখে হেসে বললেন,আরে নিতু কতো বড়ো হয়ে গেছিস…..
বলতে বলতে চোখে জল জমলো তার।মা এসে ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলেন।কপালে চুমু খেলেন।বললেন,এই যে আমার সোনার টুকরা ছেলে চলে এসেছে এখন আর কোনো বান্দির ঝি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারবে না।
বলেই আঁচলে মুখ ঢাকলেন তিনি।ভাইয়া চিন্তিত হয়ে জানতে চাইলো,সে কি মা তোমাকে কে কি বলেছে?
মা তখন আড়চোখে ভাবীদের দিকে একবার তাকিয়ে এরপর বললেন,সে তুই এসেছিস নিজেই দেখতে পাবি।
ছোট ভাইয়া চেঁচিয়ে বললো,ভাইয়াকে ঘরেও ঢুকতে দিচ্ছো না, পাঁচালী শুরু করে দিয়েছো উঠানে দাঁড়িয়েই।অদ্ভুত…
একে একে বড়ো ভাইয়া এগিয়ে গিয়ে বাকি ভাইদের সাথে কোলাকুলি করলেন।আমাকে আর আপাকেও জড়িয়ে ধরলেন….
আপা তার বাচ্চা-কাচ্চা ও স্বামী সমেত চলে এসেছে এ বাড়িতে।সেই সঙ্গে আমার দুই খালাও এসেছেন।
আপা উদগ্রীব হয়ে বললেন,আমার জন্য যা যা বলছিলাম আনছো তো ভাইয়া?তার বাচ্চারাও আগ্রহ ভরে চেয়ে রইলো লাগেজ গুলোর দিকে।
মেঝোভাবী এসে ভাইয়াকে শরবত দিলেন সালাম করে।
বললেন,পরে সব ব্যাগ পত্র খোলা যাবে।এখন এগুলো নিয়ে শান্তা ভাবীর ঘরে রেখে আসো তো।ভাইয়া আগে জিরিয়ে নিক।
একথা তিনি বললেন,মেঝো ভাইয়াকে।
কিন্তু,পরক্ষণেই মা চেঁচিয়ে উঠলেন।
– সেকি কথা? এইসব বড়ো বউয়ের ঘরে রাখতে হবে কিজন্য? ও কি এসবের মালকিন হয়ে গেছে নাকি?
আপাও তাল মিলালেন সাথে।
বড়ো ভাইয়া বললেন শেষে, আচ্ছা এখানেই থাকুক।
আমি খুলছি এখনই।
ভাইয়া মালপত্র বের করতে লাগলেন।
মা বেছে বেছে তার মেয়ে-জামাইকে ভালো জিনিশগুলো দিতে লাগলেন।বোনদেরকেও দিচ্ছিলেন।
আমিও পাশে বসে দেখছিলাম, আমার জন্য আনা জিনিশগুলো।
বড়ো ভাবী তখন দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার ধারে।মা চোখ মটকে বললেন,যাও খানা লাগাও।দাঁড়ায় আছো কেন?
এরপর,আবার ভাগাভাগিতে মন দিলেন।
বড়ো ভাবী চলে গেলেন রান্নাঘরে।তার সঙ্গে তার বাচ্চারাও চলে এসেছে।বড়ো ভাইয়া ডেকেছিলেন কাছে।তবে ওরা কাছে যায়নি।আসলে বাবাকে এত বছর পর হঠাৎ দেখছে তো।তাই বোধহয় লজ্জা পাচ্ছে।ছোট মানুষ তো!
সারা বিকাল, সন্ধ্যা-রাত জুড়েই ভাইয়াকে ঘিরে কতো কি আলোচনা হলো।মা তার দুঃখের ঝাঁপি খুলে বসলেন।বউয়েরা তাকে মান্যি করেনা।ছেলেরা কেউই মায়ের দুঃখ দেখেনা। এরপর,বলতে লাগলেন আপার জামাইর জন্যেও একটা মোবাইল আনা উচিত ছিলো।আরো,কার জন্য কি কি আনা উচিৎ ছিলো সেসব ফিরিস্তি দেওয়া শেষ হলে পরে ভাইয়া ছাড়া পেলো সেঘর থেকে।
আমি আর মেঝোভাবী অবশ্য ওইসব আলোচনায় ছিলাম না,বহু আগেই উঠে এসেছিলাম।অন্যঘরে বসে ছিলাম।হঠাৎ, বড়ো ভাবী আমাদের ঘরে এলেন।
মেঝোভাবী অবাক হয়ে বললো,ওমা ভাবী?এখনো ঘরে যাননি?
তিনি মাথা নিচু করে লাজুক কন্ঠে বললেন, আমাকে একটু সাজায় দিবা?সারাদিন কাজ-কাম করে চেহারার যে হাল…
আমি বেশ আয়োজন করে উনাকে সাজাতে বসলাম।
সাজগোজ করানোয় বেশ পটু আমি।
মেঝোভাবী পাশেই বসে আচার খাচ্ছিলেন।
তিনি বললেন,সব তো নিয়ে গেলো ভাবী।আপনি তো ভাগে ভালো কিছুই পাইলেন না।
– আমার আর কিছু চাইও না জারিয়াহ।উনি ফিরে এসেছেন, এতেই আমি খুশি।
সেসময় মোটামুটি সাজ শেষ করেছি আমি।কিন্তু,
কিছুতেই কাজল পরাতে পারছিনা আমি বড়ো ভাবীর চোখে।বারবার চোখের পানির স্রোতে কাজল লেপ্টে যাচ্ছে।
অথচ,তবুও কি সরল, কি অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে!
.
লেখিকা : লিলি
