#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৭
গল্পদের সেন্ট মার্টিন আসার আজ দ্বিতীয় দিন। গল্প তার লাইফের বেস্ট টাইম টা বোধ হয় এখনই কাটাচ্ছে। এখন একদম কাক ডাকা ভোর গল্পর ঘুম ভেঙেছে এইতো মিনিট পাঁচেক হবে। ঘুম ভাঙতেই সে কটেজের বারান্দায় আসে আর সঙ্গে সঙ্গেই তার চক্ষু শীতল হয়ে যায়। তাদের বারান্দা থেকে সমুদ্রের পারের দৃশ্য পুরোপুরি দেখা যায়। সকালের রক্তিম আকাশ আর সমুদ্রের নীল পানির ঢেউ যেনো অন্য রকম অনিন্দ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করছে।
গল্পর হৃদয় লুটিয়ে পড়লো সৃষ্টিকর্তার প্রশংসায়।
‘তাহিয়াত এদিকে আসো ব্রেকফাস্ট করতে যাবো এখন, নয়টা বাজতে চললো।’
শুভ্রর ডাকে গল্পর ঘোর ভাঙে। নয়টা বেজে গেছে! এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কখন যে এতোটা সময় পেরিয়ে গেছে তা সে টেরই পায়নি। চটজলদি রুমে এসে ওড়না টা নিয়ে চুলটা একটা হেয়ার স্টিক দিয়ে আটকিয়ে শুভ্রর সঙ্গে বের হয়।
ডাইনিং এ আসতেই আচমকা শুভ্রকে কেউ জড়িয়ে ধরে। শুভ্র টাল সামলাতে না পেরে দু-পা পিছিয়ে যায়। সাব্বিরকে সরাতে চেয়ে বললো,
‘আরে ব্যাটা ছাড়, আমি তর বউ না– এবার দম আটকে মারবি নাকি।’
সাব্বির ছাড়লো তবে মুখ ফুলিয়ে বলল,
‘তোদের যে সেন্ট মার্টিন আসার প্ল্যান আছে, সেটা আগে আমাকে কেনো বললি না?’
শুভ্র সরু চোখে চেয়ে বললো,
‘না বললে কি তুই গন্ধ শুঁকে শুঁকে চলে এসেছিস?’
ফাহিম এগিয়ে সাব্বিরের পিঠে দুম করে থাপ্পড় মেরে বলল,
‘একদম এক্সকিউজ দিবি না। তোকে আমাদের সাথে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার জন্য এতো বললাম তুই কাজের বাহানা দিয়ে গেলি না। আর কাল আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় সেন্ট মার্টিন আসার পোস্ট দেখে এখানে হাজির হয়ে গেলি; বললিও না একবার যে আসবি!’
‘বললে কি আর সারপ্রাইজড হতি।’
ওদের কথার মধ্যে কেয়া আগ বাড়িয়ে বলল,
‘ভাই আমরা অনেক সারপ্রাইজড হয়েছি। এবার চল ব্রেকফাস্ট করতে হবে আমার প্রচুর ক্ষুধা পেয়েছে। আজ কিন্তু সী-ভিউ দেখতে দেখতে ব্রেকফাস্ট করব ভাই।’
গল্পও সায় দিয়ে বললো,
‘আমারও অনেক ইচ্ছে আপু সী-ভিউ দেখতে দেখতে সেন্ট মার্টিনে ব্রেকফাস্ট করা।’
সাব্বির উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
‘আরে ভাবি চিন্তা নেই আমি অলরেডি রেডি টেবিল বুক করেছি, সেখান থেকে সবচেয়ে বেস্ট সী-ভিউ দেখতে পারবেন।নাউ লেটস গো।’
___________________________
কেয়া গল্পকে শাড়ি পড়িয়ে দিচ্ছে। আজ তারা গ্যালাক্সি বিচে যাবে সেখান থেকে সূর্যাস্ত অনেক সুন্দর দেখা যায়। কেয়া নিজেও শাড়ি পড়েছে আর গল্পকেও তাই পড়াচ্ছে। শেষবারের মতো কুঁচি টা ঠিক করে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আগাগোড়া পরখ করে বলল,
‘ওকে পারফেক্ট। এবার চলো চলো সবাই বাইরে ওয়েট করছে।’
গল্প মাথা নাড়িয়ে কেয়ার সঙ্গে পা বাড়ালো। তাদের আসতে দেখেই আরাফ খুব আপ্লূত ভঙ্গিতে ভেঙিয়ে বললো,
‘আপনারা এসে পড়েছেন? মাত্র তো তিন ঘন্টা হলো সময়; আরেকটু সময় নিতেন আমরা ওয়েট করতাম।’
কেয়া কপাল কুঁচকে ফেলল,
‘বাজে কথা বলো না আরাফ। মোটেই তিন ঘন্টা হয়নি আর মেয়েদের তৈরি হতে সময় লাগবে না তো কাদের লাগবে!’
ওদের কথার মধ্যে ফাহিম বলে উঠলো,
‘ভাই থাম এবার তরা। এখন বের না হলে সানসেট আর দেখতে হবে না।’
ফাহিমের কথায় সবার টনক নড়ল। চটজলদি বের হলো কটেজ থেকে।
শুভ্ররা বের হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিচে পৌঁছে যায়। ওখানে পৌঁছাতেই সাব্বির সবার জন্য ডাব কিনে আনলো। গল্প একদম শুভ্রর পাশ পাশ হাঁটছে শুভ্রর গা থেকে একটা দারুণ মিষ্টি ঘ্রাণ আসছে। ঘ্রাণ টা গল্পর এতো ভালো লাগছে যে সে নাক টেনে বারবার তা নিচ্ছে –তার ইচ্ছে করছে শুভ্রর বুকে মুখ দাবিয়ে মন মতো ঘ্রাণ টানতে। আজকাল তার শুভ্রর পাশাপাশি থাকতে অদ্ভুত শান্তি শান্তি অনুভূতি হয়; মনে হয় তার জীবনে আর বিশেষ কিছু না থাকলেও চলবে শুধু শুভ্র থেকে যাক।
সবাই সূর্যাস্ত দেখতে বিচের কাছাকাছি আসলো। গল্প চারপাশটাও দেখলো ভালো করে এই বিচে অসংখ্য নারিকেল গাছ আর ঝাউবন রয়েছে; এ যেনো শিল্পির আকাঁ রং তুলি ছবির চেয়েও সুন্দর। গল্প সবকিছু মুগ্ধ চোখে আপ্লূত হয়ে দেখছে।
সূর্য ডুবার পর শুভ্ররা বিচের পাশেই গানের আসর জমিয়েছে। কেয়া আসার সময় একটা মাদুর আর কিছু খাবার প্যাকিং করে নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে। বিচের সাদা বালুর উপর মাদুর পেতে সবাই বসেছে। আরাফ গিটার নিয়ে টুংটাং করছে এর মধ্যে সাব্বির বলল,
‘ভাই এসব টুংটাং রেখে একটা জম্পেশ গান ধর তো।’
সাব্বিরের কথায় সবাই জেঁকে ধরলো আরাফকে। আরাফও সায় জানিয়ে গান ধরলো তার সঙ্গে বাকিরাও তাল মেলাতে লাগলো –
আজ দুঃখ টাকে দিলাম ছুটি আসবে না ফিরে
এক পৃথিবীর ভালোবাসা রয়েছে ঘিরে
মনটা যেনো আজ পাখির ডানা
হারিয়ে যেতে তাই নেই তো মানা
চুপি চুপি চুপি স্বপ্ন ডাকে হাত বাড়িয়ে
মন চায় মন চায় যেখানে চোখ যায় সেখানে যাবো হারিয়ে…..
ও… মন চায় মন চায় যেখানে চোখ যায় সেখানে যাবো হারিয়ে
দুপায়ে এসে ঢেউ দেয় ইশারা
হাজারো ইচ্ছে দিচ্ছে তাড়া
ভুলেছি পিছুটান ভেঙ্গেছি ব্যাবধান
পেয়ে সুখেরি ঠিকানা
গানের পুরো টা সময় গল্প বারবার খুব আড়চোখে শুভ্রর দিকেই তাকিয়ে ছিলো। শুভ্র যখন ঠোঁট মিলাচ্ছিল তখন তার গালের পাশটায় কি সুন্দর একটা গর্ত হয়। গল্পর কাছে সেটা ভীষণই মোহনীয় লাগলো। তার তাকিয়ে থাকার মধ্যেই শুভ্র হুট গল্পর হাত ধরে মৃদু টান দিয়ে তাকে কাছে আনল আর গল্পর কিছু বুঝে উঠার আগেই তার বা গালে চট করে চুমু খেলো। গল্প আৎকে উঠলো। শুভ্র বিস্তর হেসে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘কি হলো তাহিয়াত এ্যানি প্রবলেম? আপনি এমন স্ট্যচু হয়ে গেলেন কেনো!’
গল্প আশপাশে থাকিয়ে দেখলো সবাই যে যার মতো আড্ডায় মশগুল। সে এবার শুভ্রর দিকে চোখ গরম করে চাইলো কিছু বলার আগেই শুভ্র আগেভাগে বলল,
‘এতোক্ষন তো প্রেম প্রেম স্মুথ চোখে তাকিয়ে ছিলে এখন হুট করে এমন রেগে বম হচ্ছেন কেনো? আমি কি কিছু ভুল করলাম!’
গল্পর কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুভ্রর পাশ থেকে সাব্বিরের গলার আওয়াজ এলো,
‘না ভাই তুই কোনো ভুল করিস নি –বউকে চুমু খাওয়ার মধ্যে কোনো ভুল নেই। কিন্তু ব্যাচেলর বন্ধুর পাশে বউকে চুপিচুপি চুমু খাওয়া ঘোর অবিচার ভাই। এখন চুপ যা, কেটেজে গিয়ে যত খুশি চুমু খাস তখন কেউ ডিস্টার্ব করবে না।’
গল্প কেশে উঠলো লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো একপ্রকার। এখান থেকে উঠে গিয়ে কেয়ার পাশে বসলো। তবে শুভ্রর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিলো না বরং গল্প তার পাশ থেকে দূরে যাওয়ায় সে সাব্বিরের দিকে বিরক্তি চোখে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
‘তোকে কে বলেছে একটা ম্যারিড কাপলের দিকে নজর দিতে। নিজের কাজে মন দে। এখন সর এখান থেকে তর জন্য আমার বউ আমার থেকে দূরে গিয়ে বসেছে!’
জোস্না রাতে নীল সমুদ্রের তীরে শুভ্রদের আড্ডার আসর আর খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে প্রায় অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। এবার সবাই কটেজে যাওয়ার জন্য উঠে বসলো। গল্পর ইচ্ছে করেছিল বিচেই থেকে যেতে। কিন্তু তা তো আর এই রাতের বেলায় সম্ভব নয়।
কিন্তু শুভ্র থাকতে গল্পর ছোট ছোট ইচ্ছে গুলো অসম্ভব কীভাবে হয়? সবাইকে চলে যেতে বলে সে গল্পকে সঙ্গে নিয়ে আরও বেশ কিছুক্ষণ বিচের ধারে জোস্না রাতে ঠান্ডা বাতাসে হাতে হাত রেখে হাঁটল। গল্পর নিজেকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভাগ্যবতী রমনী মনে হচ্ছে; যার ছোট ছোট ইচ্ছে গুলো পূরণ করার জন্য একটা চমৎকার শুভ্র আছে। তার হৃদয় আবারও ভরে উঠলো এক গুচ্ছ ফুলেল ভালোবাসায়।
________________________
বিচে হাটাহাটি শেষ করে শুভ্ররা কটেজে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হলো তখন। শুভ্র ফিরেই ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ডুকে। গল্প কোনো এদিক ওদিক না থাকিয়ে সোজা করিডরে গেলো। কটেজের এই করিডর টা গল্পর দারুণ পছন্দ হয়েছে এখানে আসলেই তার মন যেনো ফুরফুরে হয়ে যায়। কি সুন্দর এখান থেকে সমুদ্র দেখা যায় চাঁদের আলোয় সমুদ্রের নীল পানি চিকচিক করছে। গল্প আনমনেই গুনগুন করে গান গাইছে। হুট করেই তার কাঁধে কারও শীতল হাতের স্পর্শে ঘোর ভাঙে। পিছন না ঘুরেই বুঝতে পারছে এটা শুভ্র। আজকাল গল্প শুভ্রর উপস্থিতি তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সহজেই ধরে ফেলে। রোজ রাতে ঘুমানোর সময় তাদের মাঝখানে যে কুশন টা থাকে গল্প ঘুমিয়ে গেলেই শুভ্র খুব সন্তপর্ণে সেটা সরিয়ে তার একেবারে কাছাকাছি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে –যতটা কাছাকাছি হলে একে-অপরের নিশ্বাসের শব্দ দুজনের মুখোমুখি ভারি খায়। অথচ সেসব গল্পর ঘুমন্ত মস্তিষ্ক কীভাবে যেন বিষয়টা কেচ করে ফেলে –আর তাই হয়তো গল্প ঘুমের ঘোরে তখন শুভ্রর বুকের কাছটায় আদুরে ভঙ্গিতে নাক ঘেঁষে আরেকটু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে। বিষয়টা আরও বুঝে আসে তখন– যখন সকালের ঘুম ভেঙে সে নিজেকে শুভ্রর এতোটা কাছাকাছি আবিষ্কার করে। নিজের অজান্তেই তখন সে তৃপ্তির হাসি হাসে। হুট করেই গল্পর কাঁধে শুভ্রর গরম নিশ্বাস পড়াতে সে শিউরে ওঠে। কাঁধে থুতনি টেকতেই গল্প নড়েচড়ে উঠে কোনোমতে বলে,
‘কি চাই?’
শুভ্র এবার গল্পকে ছেড়ে তার পাশাপাশি দাঁড়ায়। পকেটে দুহাত ডুকিয়ে গল্পর দিকে চেয়ে বলে,
‘আজকের ওয়েদার টা বেশ ঠান্ডা তাহিয়াত। তাই-না?’
গল্প করিডরে রাখা বেতের সোফায় আরাম করে বসতে বসতে বললো,
‘কিন্তু আমার তো বেশ ভালো লাগছে এই সমুদ্রের পারের এই ঠান্ডা ফুরফুরে হাওয়া।’
শুভ্র এবার হুট করেই গল্পর কোলে মাথা রেখে মুখটা তার পেটে গুঁজে শুয়ে পরে। শুভ্রর গরম নিশ্বাস শাড়ি বেদ করে গল্পর পেটে আছড়ে পড়ছে।
গল্পর পা থেকে মাথা অব্ধি শিরশির করে উঠলো। কোনোমতে অস্পষ্ট স্বরে বললো,
‘স..সরুন প্লিজ।’
শুভ্র তার মুখটা গল্পর শাড়ির আঁচলে গুঁজে নাক ঘেঁষে বলল,
‘উহুম… বললাম না আমার ঠান্ডা লাগছে। একটু উষ্ণতা প্রয়োজন।’
গল্প ত্যাছড়া কন্ঠে বললো,
‘তাহলে আপনি রুমে গিয়ে কমফোর্টার গায়ে দিয়ে শুন আমি বরং গরম গরম কফি বানিয়ে দেই।’
‘এই ঠান্ডা কফি কিংবা কমফোর্টারে যাবে না তাহিয়াত। অন্য কিছু চাই।’
গল্পর শ্বাস আঁটকে আসছে। শুভ্রর কথার ধরন কোনদিকে যাচ্ছে সে সেটা আন্দাজ করতে পারছে কিছুটা। বলল,
‘তবে, কি চাই?’
শুভ্র গল্পর কমোর আরেকটু জড়িয়ে ধরলো কেমন নেশালো গলায় বললো,
‘কারও উষ্ণ আলিঙ্গন। এই ঠান্ডা কারও উষ্ণ আলিঙ্গনেই কাটতে পারে তাহিয়াত।’
কথাটা বলেই হুট করে গল্পর শাড়ির আঁচলের উপর দিয়ে তার পেটে চুমু খেলো। গল্প হাসফাস করে উঠলো; লজ্জায় তার কান গরম হয়ে গেলো। চট করেই উঠে গেলো সোফা হতে। বারান্দার এক কিনারায় রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। শুভ্র ফিচেল হেসে গল্পর পিছনে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো –ঘাড়ের পাশে চুল গুলো সরিয়ে ঠোঁট ছুয়ালো। গল্প কেঁপে উঠলো তাত্ক্ষণিক শাড়ির আঁচল কামছে ধরলো। শুভ্র আবারও বলল,
‘এই শীতার্ত কে কি আপনার উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিবেন তাহিয়াত। আমি খুব যত্নে সেই আলিঙ্গন সাদরে গ্রহণ করব।’
কথাটা বলেই শুভ্র গল্পকে তার দিকে ঘুরালো। নেশালো চোখে তাকিয়ে তার গলায় মুখ ডুবাল –ভীষন আবেশে চুমু খেলো তার বিউটি বোনে। গল্পর পা থেকে মাথা অব্ধি ঝাঁকিয়ে শিরশির করে উঠলো। গল্প সরে আসতে চাইলো অসহ্য অনুভূতিতে। শুভ্র তাকে আরেকটু কাছে টেনে বলল,
‘ইটস ওকে তাহিয়াত তুমি না চাইলে আমি অবশ্যই ফোর্স করব না; আ’ম ওয়েটিং। আচ্ছা তাহলে এখন রুমে চলো অনেকটা রাত হয়েছে।’
শুভ্র ঘুরে ভিতরে যেতে চাইলে গল্প তার হাত ধরে আটকে দিল। শুভ্র প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে ভ্রু নাড়িয়ে জানতে চাইল –কি!
গল্প কিছু না বলে নিজ থেকে শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরলো ভীষণ আবেশে। অস্পষ্ট আওড়ালো,
‘আপনি তো এতোটাও অবুঝ নন সাহেব। সবকিছু মুখে বলে কেনো বুঝাতে হবে?’
শুভ্র বোকা বোকা কন্ঠে বললো,
‘তারমানে তোমার কোনো আপত্তি নেই।’
গল্প এবার রাগ দেখাল। এই শুভ্র এবার বেশি বেশি করছে –তাকে কি এখন সবকিছু ভেঙে বুঝাতে হবে নাকি? বিরক্তি নিয়ে বলল,
‘না। সরুন এবার, আমি ঘুমাব।’
গল্প যেতে চাইলে শুভ্র তার বাহু টেনে কাছে নিয়ে আসলো। আচমকা ঠোঁটে ঠোঁট ছুয়ালো ভীষণ আশ্লেষে চুমু খেলো বেশক্ষানিক সময় নিয়ে। তারপর হুট করেই পাজা কোলে তুলে নিলো – ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,
‘নেক্সট টাইম বুঝে নিবো –আই প্রমিস ডিয়ার ওয়াইফি।’
গল্প মুখ লুকালো শুভ্রর বুকে। রজনীগন্ধার সুবাসে তখন তাদের ঘরটা টইটম্বুর হয়েছিলো। সেই সুবাস আরও গাঢ়ও হলো তখন যখন –শুভ্র আর গল্পর জীবনের নতুন অধয়ায়টা পূর্ণ হলো। বাহির হতে শুনা গেলো সমুদ্রের গর্জন আর ভিতরে বয়ে গেলো দুজনের অনুভূতির নিশ্বাসের উঠানামা। সেই রাতটি শুভ্র গল্পর দুজনেরই স্বপ্নের মতো কাটলো যার সাক্ষী ছিলো কটেজের চার দেয়াল আর রজনীগন্ধার মিষ্টি সুবাস।
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৮
গতকাল শুভ্র-গল্পর এমন একটা আদুরে রাত কাটানোর পর সকাল সকাল শুভ্রর মেজাজ চুড়ান্ত খারাপ হলো। কারনটা গল্প। মেয়েটাকে সে ঘুম থেকে উঠার পর আর বিছানায় তার পাশে পায়নি। ঘরে না পেয়ে কোথায় আছে জানতে ফোন করলে কলও ধরলো না অবশেষে জানতে পারলো সে নাকি কেয়ার সাথে আড্ডায় মজেছে। শুভ্র শাওয়ার নিয়ে সেখানে গেলো। কিন্তু গল্প তার দিকে একবারও থাকায় নি। হঠাৎ গল্পর এমন পালাই পালাই স্বভাব শুভ্রর অদ্ভুত ঠেকল। মেয়েটা কি লজ্জা পাচ্ছে নাকি রাগ করেছে সেটা সে বুঝতে পারছে না।
শুভ্ররা আজকেও সবাই একসাথে ব্রেকফাস্ট করেছে। গল্প তখনও তার দিকে তাকায়নি যদিও কয়েকবার তাকিয়েছে শুভ্রর চোখে চোখ পড়তেই চট করে চোখ সরিয়েছে। শুভ্র এবার বিরক্ত হলো বিষয়টাতে; ও বুঝতে পারছে না এমন উইয়ার্ড বিহেভিয়ার এর মানে কি! সবার সামনে কিছু বলতেও পারছে না আর ওকে একাও পাচ্ছে না; মেয়েটাও কেয়ার সাথে কেমন যেনো চিপকে রয়েছে। তাদের গল্প বলার বাহার দেখে মনে হচ্ছে দিন-দুনিয়ার সমস্ত আলাপ আজই তারা শেষ করে ফেলবে। শুভ্র এবার একটা ফন্দি আটলো –হুট করেই নাস্তার পর মাথা চেপে মুখটা ভীষণ দুঃখী দুঃখী করে রাখল। আরাফ তা খেয়াল করলো চিন্তিত হয়ে বলল,
‘কি হয়েছে শুভ্র? এমন মাথা চেপে রেখেছিস কেনো?’
শুভ্র গলার স্বর ক্ষীণ করে বলল,
‘প্রচন্ড মাথা ধরেছে। গল্প মেডিসিন গুলো কোথায় রেখেছো?’
গল্প কিছু বলার আগেই আরাফ আগ বাড়িয়ে বলল,
‘আমার কাছেই আছে তুই বস এখুনি নিয়ে আসছি।’
শুভ্রর মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। কই সে গল্পকে রুমে নেওয়ার জন্য এমন একটা ভং ধরলো আর আরাফটা কিনা তা এসে ভেস্তে দিচ্ছে; নাহ কেয়া আর এই গাদা টাকে মানুষ করতে পারলো না। আরাফের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘তর আনার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি অন্যর মেডিসিন খাইনা।’
আরাফ অবাক হয়ে বলল,
‘এ্যহ! মেডিসিন আবার নিজের আর অন্যর…. ’
তার পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই কেয়া আরাফের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বললো,
‘তোমাকে এতো মাতব্বরি কেনো করতে হবে আরাফ? এ্যাই গল্প যাও তো শুভ্রকে মেডিসিন খুঁজে দাও।’
শুভ্র উঠে সামনে সামনে গেলো –গল্পও তার পিছন পিছন বেরিয়ে গেলো। ওরা যেতেই কেয়া আরাফের উপর ক্ষেপল। বলল,
‘আরাফ তোমার কি কোনো বোধ বুদ্ধি নেই! শুভ্র গল্পকে এখান থেকে নেওয়ার জন্যই বারবার ওর কাছে মেডিসিন চাইছিল। এতোটুকুও বুঝতে পারলে না!’
আরাফ বোকা বোকা গলায় বলল,
‘তো সেটা আমি কীভাবে বুঝব যে –ও ওর বউকে এখান থেকে নেওয়ার জন্য সিগন্যাল দিচ্ছিল, আশ্চর্য!’
তার কথায় ফাহিম ফোঁড়ন কেটে বলল,
‘না তুই তা কেমনে বুঝবি তুই তো কচি খোকা। এই সাব্বির আজকে আরাফের জন্য একটা ললিপপ আর বেলুন কিনে আনব ঠিকাছে!’
ফাহিমের কথায় আরাফ রাগলেও কেয়া আর সাব্বির হাসিতে ফেটে পড়ল।
_________________________
শুভ্র এবার সুযোগ পেলো গল্প ঘরে ডুকতেই, শুভ্র খপ করে দরজা টা লাগিয়ে দিল –আর বুকে দুহাত গুঁজে দরজার গায়ে টেস দিয়ে দাঁড়াল; তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গল্পর দিকেই স্থির। গল্প ভ্রু কুচকে থাকিয়ে বলল,
‘কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?’
শুভ্র নিরেট গলার বলল,
‘দেখছি।’
গল্প আহাম্মক হয়ে বলল,
‘দেখছেন? কি দেখছেন?’
শুভ্র এবার প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে এগুতে এগুতে একদম গল্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে আগাগোড়া পরখ করে বলল,
‘দেখছি –আপনার যে বর নামক একটা বস্তু আছে সেই খেয়াল আপনার আছে কিনা! তো মিসেস আহমেদ আপনার কি খেয়াল আছে –যে আপনার একটা আস্ত বর আছে!’
‘কি আশ্চর্য এটা খেয়াল না থাকার কি আছে? আপনি এমন উদ্ভট কথা কেনো বলছেন?’
শুভ্র এবার গল্পর দুবাহু ধরে নিজের সাথে সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
‘তাই? আপনার মনে আছে? কিন্তু আপনার হাবভাব তো অন্য কিছু বলছে!’
গল্প বুঝেও না বুঝার ভান করে বলল,
‘কি? আপনি এমনভাবে কথা বলছেন কেনো?’
শুভ্র হাসলো খানিক বলল,
‘তাহলে সোজাসাপ্টা বলি কেমন! আজকে এমন পালাই পালাই করছেন কেনো? কোনো সমস্যা?’
গল্প শুভ্রর থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে বললো,
‘কি সমস্যা থাকবে! আর পালাই পালাই কেনো করবো?’
শুভ্র এবার কেমন হেসে বললো,
‘আমি কি জানি– তুমি কেনো পালানোর পায়তারা করছো আমার থেকে! মেবি লজ্জা টজ্জা পাচ্ছো।’
‘আমি হুট করে কেনো লজ্জা পেতে যাবো?’
শুভ্র এবার গল্পর কপালে পড়া থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,
‘বলো কি– কাল রাত এতো কিছু হলো আর তুমি কিনা লজ্জা পেলে না! তাহলে সকাল থেকে আমি ভুল ধারণা নিয়ে ছিলাম যে – আমার বউ হয়তো রাতের ঘটনার পর লজ্জা পেয়ে আমার থেকে পালাই পালাই করছে! উফস…আমার ধারণা তবে ভুল।’
গল্পর কান গরম হয়ে এলো শুভ্রর এমন কথায়। নিজেকে ছাড়িয়ে পিছন ঘুরে বলল,
‘আপনার না মাথা ধরেছে? ঔষধ খুজে পাচ্ছেন না, আমি এনে দিচ্ছি।’
শুভ্র গল্পকে এক হাতে ধরে আঁটকে আবারও নিজের কাছে নিয়ে আসে বললো,
‘ঔষধ তো পেয়েছি।’
‘কোথায়?’
শুভ্র এবার আচমকা গল্পকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে তার বাম গালে ও কানের লতিতে চুমু খেলো আশ্লেষে। গাঢ় চোখে চেয়ে বললো,
‘এইতো মেডিসিন –এটারই অভাব বোধ করছিলাম এতোক্ষণ।’
গল্পর গাল গুলো লাল হয়ে এলো হাতের মুঠোয় চেপে ধরলো শুভ্রর বুকের কাছটায় শার্টের আংশটা। শুভ্র গল্পকে বেডে শুয়াতেই সে চমকে উঠলো। চমকানো টা আরেকটু বাড়লো যখন দেখলো শুভ্র তার শার্টের বোতাম গুলো একটা একটা করে খুলছে। গল্প একটা ঢুক গিলল তার গলা শুকিয়ে আসছে কোনোমতে বললো,
‘কি করছেন এখন?’
শুভ্র সাবলীলভাবেই উত্তর দিলো,
‘কেনো দেখছ না– শার্টের বোতাম খুলছি।’
‘শুভ্র আপনি কি পাগল হয়েছেন? এখন কিছু উল্টাপাল্টা করবেন না প্লিজ।’
শুভ্র মুখটা ইনোসেন্ট করে বলল,
‘উল্টাপল্টা মানে? আর কি ব্যাপার তোমার গাল গুলো এমন ব্লাশ করছে কেনো? লজ্জা টজ্জা পাচ্ছো নাকি? পেলে বলো কেমন!’
কথাগুলো বলেই শুভ্র শার্ট টা একটানে খুলে ফেললো। গল্পর দিকে উপুড় হয়ে ঝুঁকতেই গল্প একটু পিছিয়ে গেলো মুখে দুহাত দিয়ে ডেকে বলতে লাগলো,
‘প্লিজ শুভ্র এখন না; আমি এবার সত্যি লজ্জা পাচ্ছি। তাছাড়া একটু পরেই কেয়া আপুরা বাহিরে যাবে আমাদের ডাকতে আসবে।’
শুভ্র গল্পর পিছন থেকে টিশার্ট টা নিয়ে তা পড়তে পড়তে ঠোঁট চেপে হাসল। বলল,
‘তো তাতে কি? ওরা আসলে তখন নাহয় বের হবো তার আগের টাইমটা আমাদের একান্ত হোক।’
‘কিন্তু তখন…..’
গল্প চোখ মুখ থেকে তার হাত সরাতে সরাতে কথা গুলো বলতে বলতে থেমে গেলো। শুভ্র তার সামনে ঝুঁকে আছে ঠিকই কিন্তু তার পরনে শার্টের বদলে একটা টিশার্ট। শুভ্র মিটিমিটি হাসছে তার দিকে চেয়ে পরপরই বলল,
‘কিন্তু কি তাহিয়াত? তুমি আমাকে নিয়ে এতোক্ষণ কি কি ভেবে ফেলেছ?’
গল্প আমতা আমতা করে বলে,
‘আ…আমি ম..মানে আপনি… ক…কাছে…!’
‘ছিঃ ছিঃ তাহিয়াত তুমি আমাকে নিয়ে শুধু এসব ভাবো! অথচ আমি কতো ইনোসেন্ট ভেবেছিলাম তোমায়।’
গল্প এবার সরু চোখে চেয়ে বলল,
‘আপনি যেমনটা ভাবছেন তেমনটা মোটেই না। আমি মোটেই উল্টাপাল্টা কিছু ভাবি নি বরং আপনি উল্টাপাল্টা হাবভাব করে আমার দিকে আসছিলেন।’
শুভ্র ত্যাছড়া চোখে চেয়ে হাসলো বলল,
‘উল্টাপাল্টা হাবভাব, সেটা কেমন?’
গল্প বিছানা থেকে নামতে চেয়ে বলল,
‘ধুর…জানি না…’
গল্প নামার আগেই শুভ্র তার হাত ধরে একটানে বেডে শুইয়ে দিয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে চুমু খেলো। গল্প হাসফাস করে উঠলো। বলল,
‘স..সরুন আমি এখন কেয়া আপুদের সাথে বের হবো।’
শুভ্র মাথা তুললো আর হুট করেই গল্পর ঠোঁটে ঠোঁট ছুয়ালো বেশক্ষানিক সময়। পরপরই বলল,
‘আমার ঘুম পেয়েছে ভীষণ তাহিয়াত। এখন ঘুমাব; দেন ঘুরাফিরা করব। ঘুমাতে দাও –ডোন্ট ডিস্টার্ব মি!’
কথাগুলো বলেই আবারও গল্পর গলায় মুখ গুঁজল শুভ্র। গল্প এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুভ্রর একেকটা গরম নিশ্বাস তার গলায় আছড়ে পড়তেই তার ভিতর অব্দি কাঁপিয়ে দিচ্ছে –সারা অঙ্গ কেমন জানি ঝাঁকিয়ে শিরশির করে উঠছে। কিন্তু তার নড়চড় করার একচুলও শক্তি নেই কারন শুভ্র তাকে নিজের সাথে পুরোপুরি সাপের মতো পেচিয়ে রেখেছে। উফফ শুভ্রটা আসলেই ধুরন্ধর –কেমন ধুরন্ধরগিরি করে তাকে রুমে নিয়ে এসে আঁটকে দিলো!!!!
___________________________
গল্প তার দ্বারুচিনি দ্বীপে আসার পর থেকে একদম উড়ন্ত মেঘের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। তার দুটো ডানা থাকলে বোধ করি নিঃসন্দেহে উড়ে যেতো দিগন্ত থেকে দিগন্তে। এখানে এসে থেকে গল্পর পানির প্রতি ঝোঁক টা যেনো একটু বেশিই হয়েছে; সমুদ্রের ঢেউয়ের ছলছল শব্দে সে চঞ্চলা পায়ে শুধু সেদিকেই ছুটে যায়। শুভ্র বারবার নিষেধ করছে পানির এতো কাছে না যেতে কিন্তু গল্প তাকে দু আনা পাত্তা না দিয়ে সমুদ্রের টানেই ছুটে চলে। নিজেকে খাঁচায় মুক্ত পাখির মতো লাগছে। শুভ্র গল্পর এতো উচ্ছ্বাস দেখে আর বাঁধা দিলো না। ছুটতে দিলো তার প্রাণোচ্ছল বউটাকে। হঠাৎ করেই তার সেলফোনে একটা অফিসিয়াল কল আসে কলটা রিসিভ করতে একটু দূরে সরে তবে যাওয়ার আগে গল্পকে ঢেউয়ের এতো কাছে যেনো না যায়। কে শুনে কার কথা শুভ্র একটু সরতেই গল্প ছপছপ করে মনের সুখে ঢেউয়ের তালে এগুতে লাগলো।
শুভ্র মিনিট পাঁচেক ফোনে কথা বলার পর লাইন কেটে পিছন ফিরতে ফিরতে গল্পকে ডাক দেয়। কিন্তু ওদিক থেকে কোনো শব্দ আসে না শুভ্র ফোন হতে সামনে ভালো করে থাকাতেই একটা ধাক্কার মতো খায়। গল্প নেই সামনে –তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না আশপাশে। মুহুর্তেই শুভ্রর চারদিক বিষন্নতায় ভরে উঠলো; চারদিকে ভয়ংকর নিরবতা আছে শুধু সমুদ্রের দাম্ভিক তর্জন গর্জন। এক মুহুর্তের জন্য শুভ্র দিশেহারা হলো। ছুটে সমুদ্রের কিনারায় আসতেই চোখে পরে গল্পর নীলরঙা ওড়না টা সঙ্গে সঙ্গেই তার পিলে চমকে উঠে। হার্টবিট অসম্ভব রকম উঠানামা করছে। গল্প… গল্প কোথায়? তার গলা শুকিয়ে আসছে এবার সে চিৎকার করে ডাকল,
‘গল্প… এ্যই গল্প কোথায় তুমি? তোমাকে দূরে যেতে মানা করেছিলাম তো আমি!’
প্রতিত্তোরে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দই আসছে। শুভ্র এগুতে থাকল আবারও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে,
‘গল্প তুমি কি আমার সাথে হাইড এন্ড সিক গেইম খেলছো? যদি তা হয়; দেন আমি হার মানলাম। প্লিজ এবার সামনে আসো আমার কিন্তু এবার প্যানিক হচ্ছে। প্লিজ কাম।’
গল্প আসলো না একদমই; এমনকি কোনো সারাও দিলো না। শুভ্রর এবার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। কিছুক্ষণ পর সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে অস্পষ্ট নীলরঙা কিছু একটা অবয় ভেসে উঠলো তার চোখে সে ওটার দিকে তাকিয়ে একবার নিজের হাতে থাকা নীল ওড়না টার দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো ডুক গিলল। বিরবির করে বলতে লাগলো –না না এটা আমার ভ্রম, এমন কিছুই হয়নি।
কিন্তু সে পানির দিকে যত এগুতে থাকল সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে তালে ওই নীল অবয়টা ততই দূরে যাচ্ছে। এবার শুভ্র পাগলের মতো এগুতে থাকল কিন্তু হুট করেই বাঁধা পেয়ে তার পা থেমে যায়। শুভ্র পিছন ফিরে দেখে আরাফ, সাব্বির আর ফাহিম তাকে ঝাপটে ধরে আটকে রেখেছে। শুভ্রর রাগ হলো ভীষণ চেঁচিয়ে বললো,
‘তোদের প্রবলেমটা কি? ছাড় আমাকে ওটা গল্প; দেখ ঢেউয়ের তালে দূরে চলে যাচ্ছে। ভাই ও সাঁতার জানে না –ছাড় আমাকে ওকে আনতে হবে।’
সাব্বির কেমন নিস্তেজ দৃষ্টিতে থাকিয়ে বলল,
‘ভাই আর এগুলে তুইও ঢেউয়ের তালে ভেসে যাবি। এমন করিস না প্লিজ একটু বুঝ!’
শুভ্র মানলো না। কেমন ক্ষেপে গিয়ে বলল,
‘একদম বাজে কথা বলবি না। আমি না গেলে গল্প তীরে আসবে কি করে? বললাম তো ও সাঁতার জানে না।’
শুভ্র পাগলামি করছে, কোনোভাবেই তাকে আটকে রাখা যাচ্ছে না আরাফরা ওকে থামাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে। একপর্যায়ে শুভ্র ওদের তিনজনকে টেলে দিয়ে সামনে দৌড়ে যায় –কিন্তু বেশিদূর যাওয়ার আগেই আরাফরা আবারও তাকে ঘিরে ধরলো। ফাহিম শুভ্রকে জোর করে তার দিকে ঘুরিয়ে বুঝানোর মতো করে বলল,
‘সামনে এগুলে যদি ভাবিকে পাওয়া যেতো তবে কি আমরা তোকে আঁটকাতাম শুভ্র! একবার তো দেখ এতো উত্তাল ঢেউ –তার মধ্যে যদি তুইও যাস তবে নিজেও ভেসে যাবি ভাই। প্লিজ পাগলামি করিস না, একটু বুঝার ট্রাই কর।’
শুভ্রর সারা শরীর ছেড়ে দিলো। ধুপ করে পানির উপর বসে পড়লো সমুদ্রের নোনা পানির ঢেউ তখন তার নাক-মুখে বাড়ি খাচ্ছে নিজ গতিতে। শুভ্র এবার ফাহিমের দিকে করুন চোখ চেয়ে ভাঙা গলায় বললো,
‘ভাই ওটা গল্প ছিলো না, তাই না? না বল প্লিজ ভাই না বল। আর যদি থেকে থাকে তবে আমাকে ওকে আনতে যেতে দে আমার শরীর কাঁপছে দেখ; নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বাস কর গল্পর কিছু হলে –শুভ্রর অস্তিত্বও মুছে যাবে। আ..আমি আমি ওকে একা কেনো ছাড়লাম… আমার ভুল….’
শুভ্র কাঁদছে নিঃশব্দে কান্নার দমকে তার শরীর কাঁপছে। আরাফরা সবাই বিস্মিত; এই শুভ্রকে তারা কখনো দেখেনি। তারা তো সবসময় স্ট্রং শুভ্রকে দেখে এসেছে যে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে সামলে রেখেছে। কিন্তু আজকের শুভ্র এতো ভঙ্গুর! বন্ধুর এই পরিস্থিতি দেখে তাদেরও চোখ ছলছল করছে। শুভ্র আবারও উঠে দাঁড়াল ছুট লাগালো উত্তাল সমুদ্রের সম্মুখে। এবারও সে বেশি দূর যেতে পারলো না আরাফদের শক্ত বাহু বন্ধনে আটকা পড়লো। শুভ্র ওখানে বসেই চিৎকার করতে লাগলো,
‘গল্প কাম ব্যাক ডিয়ার। প্লিজ কাম ব্যাক প্লিজ.. আমার শ্বাস আঁটকে আসছে– নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কোথায় তুমি? প্লিজ কাম ব্যাক… ’
গল্প আসলো না, ধূধূ সমুদ্রের তীরে শুধু প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসলো শুভ্রর করুন চিৎকারের বিষাদ আওয়াজ। এতো সুন্দর প্রকৃতি শুভ্রর পাগলামিতে নিমিষেই ভরে গেলো বিষাদের তিক্ততায়।
#চলবে
