কল্পকথা নয় তো,
দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব
২
বিগত আট বছরে, মাওলানা আশরাফ আলীর তাহাজ্জুদের নামাজ বাদ যায় নাই।
ফজরের আযানের প্রায় ঘন্টাখানেক আগে উঠে লম্বা কেরাত দিয়ে তাহাজ্জুদ পড়া, তারপর অল্প কোরআন তেলাওয়াত এবং মোনাজাত করা… সব শেষে ফজরের আযানের জন্য মাদ্রাসায় চলে যাওয়া… এটাই আশরাফ আলীর দৈনন্দিন রুটিন ।
আযান অবশ্য বড় হুজুরও মাঝে মাঝে দেন। তখনও আশরাফ আলী বড় হুজুরের পাশে থেকে জামাতের বাকিসব বিষয়াদি দেখাশোনা করে। দীর্ঘ আট বছরে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় নি।
নিজের গ্রামের মসজিদটি আশরাফ আলীর বাড়ির পাশেই। এখানে সে মুসল্লি হিসেবেই যোগ দেয়। তবে বড় হুজুরের শিষ্য হিসেবে সবাই আশরাফ আলীকে বেশ সম্মান করে।
বাড়ি এলে তাহাজ্জুদ পড়েই মসজিদে চলে যায় আশরাফ আলী। ফজরের আগে এবং পরে বেশ অনেকটা সময় নিয়ে কোরআন এবং হাদীস নিয়ে ইমাম সাহেবের সাথে একান্ত আলাপ আলোচনা করে।
আজ আশরাফ আলীর তাহাজ্জুদ ছুটে গেলো।ফজরের আযান হয়ে গেছে, তবু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই ।
আশরাফ আলীর মা এবং বড় বোনের বিরক্তির সীমা নাই । বিয়ের পরদিনই ইবাদত বন্দেগিতে এইরকম অবহেলা!
তবে, বাড়ির রোজগেরে ছেলের সাথে রাগারাগি করার সাহস আশরাফ আলী মা বা বড় বোনের
নাই ।বাড়ির কলতলায় বালতি আর মগ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় শব্দ করা পর্যন্তই তাদের দৌড়।
নতুন বৌ আসা উপলক্ষে দু চারজন অতিথিও আছে বাড়িতে। আযানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই উঠে পড়েছে… প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা হচ্ছে… সব মিলিয়ে শোরগোল ভালোই।
এইসবের মধ্যেও আশরাফ আলীর ঘুম ভাঙেনি… সবাই অবাক।
মাইকে ফজরের নামাজের ইকামাতের শব্দে, আশরাফ আলী জেগে উঠলো।
অন্যান্য দিনে সামান্য দেরি হলে যেভাবে ধরমর করে উঠে বসে যায় সে, আজ সেটা করতে পারছে না।
আশরাফ আলীর শরীর পাথরের মত ভারী হয়ে আছে।মনে মনে আয়াতুল কুরসি আর তিন ক্বুল পড়লো সে… পড়তে পড়তে রাতের সবকিছু আশরাফ আলীর মনে পড়ে গেলো।
যা কিছু মনে পড়ছে সেসব কি সত্যি? নাকি কোনো দুঃস্বপ্ন?
ভাবতে ভাবতে উঠে বসলো, আশরাফ আলী ।
খাটের নীচ, বিছানা, ঘরের মেঝেতে কেউ আছে কিনা খুঁজে দেখলো।
হারিকেনটা সারারাত জ্বলে জ্বলে পুরোপুরি নিভে গেছে ।ঘরে সেরকম কোনো আলো নেই ।তবু, ঘরে যে সে আর সালমা বানু ছাড়া আর কেউ নেই, সেটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে।
সালমা বানুর মুখটা অন্ধকার ঠিক দেখা যাচ্ছে না। কেবল গভীর ঘুমে থাকা নিঃশ্বাসের শব্দ।
ফজরের সময়ে, এই বয়সী মেয়েদের ঘুম গাঢ় হয়।
স্ত্রীর ঘুম ভাঙাতে, আশরাফ আলী শব্দ করে গলা ঝাড়লো।
সালমা বানুর ঘুম ভাঙলো না ।চাইলে ডেকে তোলা যায়, কিন্তু সেটা করতে আশরাফ আলীর মন সায় দিলো না।
বড় হুজুরের মেয়েকে বিয়ে করে মনের মধ্যে যে তীব্র একটা সুখের হাওয়া বইছিলো, সেটা কমে গেছে ।
ঘোমটা পরা মহিলা এবং উল*ঙ্গ শরীরের ছেলেটিকে আশরাফ আলী পরিস্কার দেখেছে। এটা নিশ্চিত সালমা বানুর কোনো দু*ষ্ট পরিকল্পনার অংশ ।
এই বিয়েতে তার মত ছিল না, আশরাফ আলী সেকথা জানে ।তবে বড় হুজুর বলেছিলেন, বিয়েতে মেয়েরা এইরকম বলেই থাকে।এটাই মেয়েদের হায়া ।তারা মনের কথা মুখে আনতে পারে না। বিয়ের পর সেইসব কিছু মনেও থাকে না।মনের আনন্দে সংসার করতে থাকে।
আশরাফ আলী পরিস্কার বুঝে গেছে, ঘটনা খারাপ।বিয়েতে সালমা বানুর আপত্তি করার কারণটা, এতো সহজ নয়।
বড় হুজুরের বাড়িতে সে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রিত। সালমা বানু সম্ভবতঃ তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না।
দীর্ঘ আট বছরে, সালমা বানু কখনো আশরাফ আলীর সঙ্গে কথা বলেনি। আশরাফ আলীও বড় হুজুরের মেয়ে হিসেবে সবসময় সম্মান দেখিয়েছে।
আশরাফ আলী বরাবর নরম স্বভাবের, সাদাসিধে ছেলে ।সালমা বানু সেটাকে দূর্বলতা ভেবেই কি, এতো জঘন্য একটা কাজ করলো?
না বুঝে, এতো ভয় পেয়েছে ভেবে… নিজেকে ধিক্কার দিলো আশরাফ আলী। সালমা বানুর এই জঘন্য কর্মকান্ডের ফলস্বরূপ, তার এতো বছরের ইবাদত বন্দেগির নিয়ম ভঙ্গ হলো ।
বিয়ের পরদিন ফজরের জামাত ছুটে যাওয়ার কষ্টে… নতুন বৌয়ের কাছ থেকে পাওয়া অপমানে… মাওলানা আশরাফ আলী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ।
সবাই জানে, আশরাফ আলী নতুন বৌ নিয়ে বাড়ি এসেছে । দুপুরবেলা ইমাম সাহেব এবং মসজিদ কমিটির সকলে বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রিতও ছিলেন। অথচ আজ সে জামাতে যোগ দিতে পারলো না।এটাতো দূর্বল পুরুষের কাজ।
এতো বছরের অর্জন করা সম্মানে এইভাবে আঘাত করলো, সালমা বানু!
ফজরের জামাত ছুটে যাওয়া তো, যেনতেন বিষয় না।
সকলকে মুখ দেখাবে কেমন করে?
আশরাফ আলীর নাক টানার শব্দে, সালমা বানু উঠে বসেছে।সে চোখ কচলাতে কচলাতে অবাক গলায় বললো,
__মাওলানা সাহেব, আপনে কি কানতেসেন নাকি ? কি হইসে আপনের? শরীল খারাপ লাগতাসে নাকি?
সালমা বানুর কথা শুনে, আশরাফ আলীর মন আরো খারাপ হয়ে গেলো।
একজন মাওলানার ফজরের জামাত ছুটে গেছে, অথচ তার স্ত্রী বুঝতে পারছে না কি হয়েছে!!
এতো বড় একটা ঘটনা ঘটিয়ে, এখন স্বাভাবিক গলায় কথা বলছে মেয়েটা।
এইটুকু বয়সে এতো দুষ্ট বুদ্ধি মেয়েটার মাথায়!
বাইরে একটু একটু আলো ফুটেছে।
আশরাফ আলী ধীরে ধীরে উঠে ওযু করলো ।তারপর, মসজিদের দিকে এগিয়ে গেলো।
কথা ছিল, নতুন বৌকে নিয়ে মা আর বড় বোনের সাথে দুতিন দিন থাকবে আশরাফ আলী। কিন্তু গতকাল রাতে যা হলো, তারপর আর এখানে থাকা চলে না।
রাস্তায় যেতে যেতে আশরাফ আলী ঠিক করলো, মসজিদ থেকে ফিরেই সালমা বানুকে নিয়ে তার বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাবে।
সমস্ত ঘটনা বড় হুজুরকে না জানানো পর্যন্ত, আশরাফ আলীর শান্তি নেই।
৩
আশরাফ আলী যখন সালমা বানুকে নিয়ে বড় হুজুরের বাড়িতে এসে পৌছালো, তখন আসরের ওয়াক্ত প্রায় শেষ।
একদিন পরেই মেয়ে, মেয়ে জামাই ফেরত চলে এসেছে… ফয়জুল খান সাহেব এবং বাড়ির কাজের লোকজন সবাই অবাক।
সামান্য বিশ্রাম নিয়ে, মাগরিবের নামাজ শেষে মক্তব খানায় এসে বসলো আশরাফ আলী ।
ফয়জুল খান সাহেব মক্তবখানার মেঝেতে বসে রয়েছেন। উনার চোখ বন্ধ, কপালে গভীর চিন্তার ছাপ।
আশরাফ আলী তার পাশে বসে গতকালের সমস্ত ঘটনা বর্ননা করলো। তাহাজ্জুদ আর ফজরের জামাত ছুটে যাওয়ার কথা বলতে বলতে, মাওলানা আশরাফ আলী আবারো কেঁদে উঠলো।চোখ মুছতে মুছতে বললো,
__হুজুর, আপনি সালমা বানুকে ডাকেন ।জিজ্ঞাসা করেন তারে বিস্তারিত… শ্বশুরবাড়িতে গিয়া কারে সে ঘরের ভিতরে জায়গা দিছিলো?জীবনে প্রথম বার মাথানিচু কইরা বাড়ির মসজিদে গেসি।মাথানিচু কইরা নিজের গ্রাম থেইকা বিদায় নিসি ।আপনার মাইয়া না হইলে, আমি তারে আজকেই ত্যাগ দিতাম। নিজের মরহুম মা আর ভাইরে নিয়া, নিজের স্বামীর সাথে এইরকম তামাশা করা কি তার সাজে? সে কার মাইয়া, কার স্ত্রী, একবারও চিন্তা করলো না?
ফয়জুল খান সাহেব সব শুনে অপরাধী মুখ করে বললেন,
__ মেয়েটারে তুমি ক্ষমা করো, বাপ। কথা দিতাসি, আমি নিজে তারে বুঝায়ে বলবো। বুঝোই তো, মা মরা মেয়ে। বেশি শাসন করতে পারি নাই… এইটা আমারই ব্যর্থতা । অনেক ভাবনা চিন্তা কইরা, তারে আমি তোমার হাতে দিসি। তুমি ধর্ম মাইনা তারে গ্রহন করসো। সে এখন তোমার বিবাহিতা স্ত্রী ।তারে ইচ্ছামত তুমি শাসন বারন করো। কিন্তু তার উপর তুমি বেজার হইয়ো না । কথা পাঁচকান হইতে সময় লাগবো না। এমনেই এই বাড়ি নিয়া মানুষ নানান কুকথা বলে।
বলতে বলতে… বড় হুজুরের গলা ভারী হয়ে এলো।
যার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত, তাকে এইরকম নতমস্তক হতে দেখে, আশরাফ আলীর কষ্টের সীমা রইলো না। বড় হুজুরের হাত ধরে, আমৃত্যু সালমা বানুর পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করলো সে।
এশার নামাজে বিশেষ মন দিতে পারলো না আশরাফ আলী। এমনকি রাতের খাবারও ঠিক মতো খেতে পারলো না।
খোলাখুলি কথা বলার পরিকল্পনা নিয়ে, স্ত্রীর ঘরে ঢুকলো আশরাফ আলী ।
তাকে দেখেই, চেঁচিয়ে উঠলো সালমা বানু।
হারিকেনের আলোটা কমিয়ে দিয়ে বললো,
__ এইটা কেমন আদব কায়দা আপনের? ঘরে ঢুকবেন, ইকটু অনুমতি নিবেন না? আম্মাজান আছে ঘরে, জানা নাই আপনের? ভাইজানও আপনেরে ডরায়…
আশরাফ আলী অবাক হয়ে দেখলো,
__ঘোমটা পরা মহিলাটি, উল*ঙ্গ শরীরের ছেলেটাকে নিয়ে হুড়াহুড়ি করে খাটের নীচে ঢুকে যাচ্ছে।
এতক্ষণ ধরে করা হাজারটা পরিকল্পনা ভুলে গিয়ে, আশরাফ আলী ভয়ে শক্ত হয়ে গেলো আবারো।
খাটের নীচ থেকে মুখ বের করে মেয়েলী গলায় ছেলেটা বললো,
__ভয় লাগতাসে আমার… খুব ভয় লাগতাসে।আব্বাজানরে আসতে মানা করো। আমি কারো সামনে যামু না, আর… কারো সামনে যামু না।
আশরাফ আলীর সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকলো ।
সালমা বানু ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে, তাকে খাটের নীচে ঢুকিয়ে দিলো ।হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দ্রুত পায়ে আশরাফ আলীর কাছে এসে বললো,
__ভয় পাইসেন? আমার আম্মাজান আর ভাইজানরে সক্কলে ভয় পায়… এই কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারি না।আব্বাজানের দিলটা তো পাথ্থর। আপনে আমারে বিবাহ করসেন, আপনে অন্তত আমার কষ্টটা বুইঝেন, মাওলানা সাব ।নিজের মা, ভাইরে তো আমি ফালাইতে পারমু না।আসেন আপনে, আমার ভাইজানরে একটু আদর করেন… ভয় পাইয়েন না… আসেন।
আশরাফ আলীর শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরটাকে খাটের কাছ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলো সালমা বানু। খাটের নীচ থেকে ছেলেটাকেও টেনে বের করে আনলো।
আশরাফ আলী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
ছেলেটার শরীর ধবধবে সাদা ।মায়াবী মুখে হালকা দাড়ি আর গোঁফের রেখা…কিন্তু কি অবাক কান্ড, ছেলেটার পুরু*ষাঙ্গ নেই।
আশরাফ আলীর হাতটা টেনে, ছেলেটার হাতে ছোঁয়ালো সালমা বানু ।ছেলেটার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা।
আশরাফ আলীর জিভ পর্যন্ত শক্ত হয়ে গেছে, সে কোনো দোয়াও পড়তে পারছে না।
অবাক হয়ে ছেলেটা তাকিয়ে আছে… সেই দৃষ্টি দেখতে দেখতে, জ্ঞান হারালো আশরাফ আলী ।
তাহাজ্জুদের সময় শেষ হয়ে, ফজরের আযান হলো। আশরাফ আলীর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না।
কল্পকথা নয় তো,
শেষ পর্ব
৪
আজ ছয়দিন, মাওলানা আশরাফ আলী শয্যাশায়ী ।একেক সময়ে জ্বরে তার শরীর পুড়ে যাবার
যোগাড় ।
দুদিন হলো চোখ মেলে তাকানোও বন্ধ করে দিয়েছে। ডাক্তার কবিরাজের দেয়া সবরকম ওষুধ ব্যর্থ ।
ফয়জুল খান সাহেব দিনরাত পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করে গেছেন, কিন্তু আশরাফ আলী কোনো সাড়া পাওয়া যায় নি ।
কিছুক্ষণ আগে কবিরাজ মশাই এসেছিলেন ।তিনি বললেন,
__হাতে সময় বেশি নাই। নাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। আপনারা মাওলানা সাহেবের বাড়িতে লোক পাঠান। ভাগ্য ভালো হলে, হয়তো শেষ দেখাটা দেখতে পারে।
ফয়জুল খান সাহেব আশরাফ আলীর পাশে এসে বসলেন।গম্ভীর মুখে সবাইকে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বললেন। প্রিয় ছাত্রের সাথে একটু একান্ত সময় চান তিনি।
সালমা বানু ঘরেই রইলো।তাকে বের হতে বলার সাহস কারো নাই।
ফয়জুল খান সাহেব বললেন,
__ আমাকে তুমি ক্ষমা করো, বাবা। আমি সত্য গোপন করেছি তোমার কাছে ।শরীরে প্রাণ থাকতে সত্যিটা তোমার কাছে স্বীকার না করলে, আমার তো ক্ষমা হবে না।
ছয়দিন ধরে যে মানুষ অচেতন, বড় হুজুরের কথার জবাব দিলো সে। যেন কোন বরফ হয়ে যাওয়া শরীর থেকে রুহ কথা বলছে। আশরাফ আলীর চোখ বন্ধ কিন্তু গলার স্বর স্পষ্ট। সে বললো,
__ আমিও তো সেই অপেক্ষায় আছি, হুজুর। আপনে বলেন, কি বলবেন।
ফয়জুল খান সাহেব বুঝলেন, তার সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নাই। সত্য তাকে বলতে হবেই।
তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
__আমার স্ত্রী এবং সন্তানরে আমি নিজেই হত্যা করেছি।ওই অসুস্থ সন্তানরে আমি আমার জীবনের অভিশাপ মনে করছি।অর্ধেক ছেলে আর অর্ধেক মেয়ে… আমার ঔরসে জন্ম নিসে… এইটা আমি মানতে পারি নাই। সমাজে মান ইজ্জত খোয়া যাবার ভয়ে, তারে আমি হত্যা করেছি।আমার সিদ্ধান্তে স্ত্রীরে পাশে পাবো না জানি , তাই তারেও বাইধ্য হইয়া….
আমি অন্যায় করেছি, পাপ করেছি… স্রষ্টার ইচ্ছারে সম্মান করতে পারি নাই। তোমরা আমারে শাস্তি দেও…
কান্নার তীব্রতায়, ফয়জুল খান সাহেবের গলা আটকে এলো।নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন,
__আমি স্বপন দেখলাম, এই বাড়িতে ফরিদুল আবার জন্ম নিতেসে ।সে তার অধিকার ছাড়বো না। আমার পাপের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত এই বাড়ি সে ছাড়বো না।
বড় হুজুরের কথা শেষ হবার আগেই , ব্যাকুল হয়ে আশরাফ আলীর মা ঘরের মধ্যে ঢুকলেন । সাথে বাড়ির বাকি লোকজন।
কিন্তু কি অবিশ্বাস্য ব্যাপার !
আশরাফ আলী চোখ মেলে চেয়ে আছে। তার গায়ে কোনো জ্বর নেই।
সবার সামনে উঠে বসলো আশরাফ আলী ।সালমা বানুর দিকে তাকিয়ে বললো,
__ খুব খুদা লাগসে আমার। একটু কিসু খাইতে দিবা?
সালমা বানু শীতল গলায় বললো,
__ জি, মাওলানা সাব… খাবার দিতাসি। খাইয়া উইঠা থানায় যান ।আমার আম্মাজান আর ভাইজানরে একটু শান্তি দেন এইবার ।
একবছর পর…
ফয়জুল খান সাহেবের বিরূদ্ধে করা মামলার রায় হবে আজ।পুকুরে গোসল করতে নামার কিছুক্ষণ আগে, দুধের সঙ্গে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে স্ত্রী এবং সন্তানকে খাইয়েছিলেন ফয়জুল খান ।পুকুর থেকে তারা আর উঠে আসতে পারে নি। এইসব কিছু স্বীকার করে, নিজের জবানবন্দি দিয়েছেন বড় হুজুর ফয়জুল খান সাহেব।
এতদিন ধরে রায়ের অপেক্ষায় থেকে, আজ আশরাফ আলী আদালতে যেতে পারে নি।
ভোর রাতে সালমা বানুর প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে।তার শরীর ভালো নয়, কিছু জটিলতা রয়েছে। ধাত্রী বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে জানিয়েছে, তার পক্ষে সন্তান প্রসব করানো সম্ভব নয়। তাই হাসপাতালে আনতে হয়েছে।
এখন সন্তানের মুখ দেখার অপেক্ষায় আছে আশরাফ আলী।
সেদিনের পর থেকে, সালমা বানুর মরহুম আম্মাজান আর ভাইজানকে দেখা যায় নি ।
তবে, নিজের স্ত্রী এবং সন্তানের কথা ভেবে আশরাফ আলীর মন বড় অস্থির।
ফরিদুল বা তার মতো কেউ যদি জন্ম নেয় সালমা বানুর গর্ভে… সে ও কি বড় হুজুরের মতো আচরন করবে?__ এই দুশ্চিন্তা, সালমা বানুকে তাড়া করছিলো কেবল ।
আশরাফ আলী পরিস্কার করে বারবার বলেছে, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাকে সম্মান জানানোর মতো মজবুত ঈমান তার রয়েছে। তাই,এ নিয়ে যেন সালমা বানু দুশ্চিন্তা না করে।
কিন্তু, জীবনে এতো কিছু দেখেছে যে মেয়ে… তার মন শান্ত করা, সহজ কাজ নয়।
হাসপাতালের এককোনায় জায়নামাজ বিছিয়ে, নফল নামাজ আদায় করলো আশরাফ আলী ।দুহাত ভরে দোয়া চাইলো, নিজের স্ত্রী এবং সন্তানের জন্য ।
__মাওলানা সাহেব,আপনার একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে হয়েছে। মা এবং মেয়ে সুস্থ আছে আলহামদুলিল্লাহ।ভিতরে যান আপনি ।
ডাক্তারের কথা শুনে, দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরলো আশরাফ আলীর ।
অনেকের জীবনে যে ঘটনা একেবারে স্বাভাবিক, সেই ঘটনাই কারো কারো জীবনে অস্বাভাবিক আনন্দ নিয়ে আসতে পারে।
আশরাফ আলী নিজের সদ্যোজাত মেয়েকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছুটলো… মেয়ের এককানে আযান দিতে হবে আর অন্য কানে ইকামাত।
কতবছর ধরে আযান দিচ্ছে, মাওলানা আশরাফ আলী ।তবে, আজকের মতো আযান… কখনো দিতে পারেনি সে।
এরকম আনন্দিত সুরের আযান… প্রথম সন্তানের বাবাই কেবল দিতে পারে।
সমাপ্ত
রুচিরা সুলতানা
