#হিমেল_রাতের_অতিথি।
পর্ব:- চার।
লেখা:- সিহাব হোসেন।
রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেছে। দেয়াল ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ ছাড়া বাড়িটা অস্বাভাবিক রকমের নীরব। তুষারের এখনো ফেরার নাম নেই। অধরা ধীর পায়ে সায়নের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠে চাপা উদ্বেগ।
– “খেয়ে নাও। অনেক রাত হয়েছে।”
– “তুষার ভাই আসুক, তারপর সবাই একসাথে খাবো।” সায়ন ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল।
অধরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নরম স্বরে বলল,
– “ওর আশা করো না। তুমি খেয়ে নাও।”
তার কণ্ঠের অসহায়ত্বটুকু সায়নের কান এড়ালো না। সে ফোনটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালো। অধরা নিঃশব্দে খাবার বাড়তে শুরু করলো। সায়ন ডাইনিং টেবিলে বসতেই অধরা খাবার বেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই সায়ন তাকে থামালো।
– “আমি জানি, তোমাদের মধ্যে কিছু একটা চলছে। বাইরে থেকে তোমাকে যতটা স্বাভাবিক দেখায়, ভেতরে তুমি ততটাই বিধ্বস্ত। সত্যি করে বলো, কী হয়েছে?”
সায়নের সরাসরি প্রশ্নে অধরার এতক্ষণের চেপে রাখা বাঁধটা যেন ভেঙে গেল। তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
– “কোনো কিছু বলার মতো শক্তি বা সাহস আমার নেই। আমি নজরবন্দী। তুমি যখন থাকো না, তখন সে পুরো বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখে।”
কথাটা বলেই সে প্রায় ছুটে নিজের ঘরে চলে গেল।
সায়নের মাথায় যেন বাজ পড়লো। তাহলে তার সন্দেহই সত্যি! কিন্তু অধরার সাথে সে কথা বলবে কীভাবে? সিসি ক্যামেরা এড়িয়ে কথা বলার তো কোনো উপায় নেই। আর এই তুষার লোকটা আসলে কে? কেন সে নিজের স্ত্রীকে এভাবে বন্দী করে রেখেছে? আর তার এত বড় সাহস যে তার অনুমতি ছাড়াই তার বাড়িতে গোপন ক্যামেরা লাগায়? হাজারো প্রশ্ন সায়নের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। সে কোনোমতে খাবার শেষ করলো। অধরা যখন প্লেটগুলো সরাতে এলো, তখন প্রায় ঠোঁট না নাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
– “প্লিজ, আমার সাথে কোনো কথা বলার চেষ্টা করো না। ও সন্দেহ করবে।”
– “চিন্তা করো না। আমি একটা ব্যবস্থা করছি।’ সায়ন তাকে আশ্বস্ত করলো।
নিজের ঘরে ফিরে এসে সায়ন দরজা বন্ধ করে ভাবতে লাগলো। কীভাবে এই নজরদারি এড়ানো যায়? পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিতে পারলে কেমন হয়? কিন্তু এই এলাকায় সহজে বিদ্যুৎ যায় না। আর তুষার কখন ফিরবে তারও ঠিক নেই। কথা বলার মাঝখানে যদি সে এসে পড়ে, আর দেখে শুধু এই বাড়িতেই বিদ্যুৎ নেই, তাহলে সন্দেহ আরও বাড়বে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার চোখ পড়লো ঘরের বাইরে, ওয়াশরুমের পাশের দেয়ালে লাগানো সার্কিট ব্রেকারের ওপর। একটা বুদ্ধি তার মাথায় খেলে গেল। সে ক্রু*র হাসলো।
মুহূর্তের মধ্যে সায়ন একটা শর্ট সার্কিট তৈরি করলো, আর সাথে সাথেই ‘খট’ করে একটা শব্দ হয়ে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। নিকষ কালো অন্ধকারে সে দ্রুত অধরার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো।
– “অধরা, এখন বলো কী হয়েছে?”
অধরা কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই বাড়ির সামনে একটা গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো জ্বলে উঠলো। গাড়ি এসে থামার শব্দে সায়ন এক মুহূর্তও দেরি না করে ছুটে গিয়ে সার্কিট ব্রেকারটা অন করে দিল। সাথে সাথেই আলো জ্বলে উঠলো। সেই আলোয় সায়ন দেখলো অধরার ফ্যাকাশে মুখটা, যেন এক ঝলক আশার আলো খুঁজে পেয়েও তা নিভে গেল। সায়ন ইশারায় তাকে আশ্বাস দিল, – “আমি সুযোগ বের করবোই।”
তুষার ভেতরে এসে সায়নের কাঁধে হাত রেখে এক রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
– “কী খবর? আজ ফিরতে একটু দেরি হয়ে গেল।”
– “দিনকাল খুব খারাপ যাচ্ছে। সাবধানে থাকবেন।” সায়ন সতর্ক করলো।
– “আমার কিছু হবে না, ব্রো। টেনশন নিও না।”
এই বলে সে অধরাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল। সায়ন আর কিছু না বলে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লো।
পরদিন সকাল। তুষার বেরিয়ে যেতেই সায়ন বুঝতে পারলো, এটাই সুযোগ। সে আজ ইচ্ছে করেই অফিসে যায়নি। তুষার চোখের আড়াল হতেই সে আবার একই কৌশলে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে অধরার ঘরে ঢুকে তার হাত ধরে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে এলো। এই প্রথম সায়ন অধরার মুখের দিকে ভালোভাবে তাকানোর সুযোগ পেল। দেখলো, তার ফর্সা গালে স্পষ্ট পাঁচটা আঙুলের ছাপ। দৃশ্যটা দেখে সায়নের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
– “তোমার গালে এই দাগ কিসের?” তার কণ্ঠস্বর রাগে-দুঃখে কেঁপে গেল।
অধরা কোনো উত্তর দিতে পারলো না। শুধু ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। তারপর হঠাৎ করেই সে শক্ত করে সায়নকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। জীবনে এই প্রথম অধরা তাকে এতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে। আগে কখনো এমনটা হয়নি। সায়নের চওড়া বুকে মুখ গুঁজে সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে লাগলো,
– “বিশ্বাস করো সায়ন, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু সেদিন আমি নিরুপায় ছিলাম। তোমাকে ছাড়তে আমি বাধ্য হয়েছিলাম।”
সায়ন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, কী এমন হয়েছিল সেদিন, যার জন্য অধরা তাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল?
সায়ন খুব যত্ন করে তার দুই হাতের মুঠোয় অধরার মুখটা তুলে নিলো। তার আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে অধরার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া উষ্ণ অশ্রু মুছে দিয়ে নরম স্বরে বলল,
– “এবার শান্ত হও। আমাকে বলো, ঠিক কী হয়েছিল?”
অধরা ফোঁপাতে ফোঁপাতে অতীতের গভীরে ডুব দিল। তার কণ্ঠস্বর ছিল ভাঙা, অতীতের যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত।
– “মনে আছে তোমার, সাড়ে তিন বছর আগের সেই বিকেলটার কথা? আমরা পার্কে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, আর হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। আমরা দু’জন দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম পার্কের কোণের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে। সেদিন কত কথা হয়েছিল আমাদের মধ্যে…”
অধরা’র কথায় সায়নও যেন মুহূর্তেই সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে ফিরে গেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল চায়ের কাপ হাতে বসা অধরার হাসিমুখ। সে অধরার অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ভালোবাসা গভীর হলে তবেই বুঝি এভাবে কারো চোখের গভীরে তাকানো যায়। সায়ন আলতো করে বলল,
– “হ্যাঁ, সব মনে আছে আমার।”
– “ঠিক সেই সময়। দোকানের বাইরে একটা সাদা গাড়ি দাঁড়ানো ছিল। আর সেই গাড়িতেই বসে ছিল তুষার। সেদিনই সে প্রথম আমাকে দেখে। আর ঠিক তার পরদিনই সে আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। আমি স্পষ্ট ‘না’ করে দিয়েছিলাম, তোমাকেও বলেছিলাম।”
– “হ্যাঁ, বলেছিলে।”
– “কিন্তু ঠিক সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আমার বাবাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা ফোন করতে করতে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলাম। মধ্যরাতে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনের ওপাশের কণ্ঠটা ছিল বরফের মতো শীতল। সে জানায়, আমি যদি তুষারকে বিয়ে করতে রাজি না হই, তাহলে তারা আমার বাবাকে মে*রে ফেলবে। তখনই আমি প্রথম বুঝতে পারি, লোকটা কতটা ভয়ঙ্কর। আমি বাধ্য হয়েছিলাম… বাবাকে বাঁচাতে বিয়েতে রাজি হয়েছিলাম।”
সায়নের বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠলো।
– “এত বড় একটা ঘটনা তুমি আমাকে একবারও বলোনি কেন, অধরা?”
– “কীভাবে বলতাম?”
অধরার কণ্ঠস্বরে ছিল তীব্র অসহায়ত্ব। সে আবার বলল
– “বিয়ের পর সে আমার বাবা-মা দুজনকেই একরকম বন্দী করে ফেলে। গত দুই বছর ধরে আমি তাদের সামনাসামনি দেখিনি। শুধু মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা বলতে দেয়, তাও তার কড়া নজরদারিতে।”
সায়ন হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– “কিন্তু সে তো তোমাকে বিয়ে করেছে। তাহলে তোমার বাবা-মাকে আটকে রাখার কারণ কী?”
– “কারণ একটাই, সায়ন। আমি তার সব পাপ কাজের সাক্ষী। সাফল্যের চূড়ায় ওঠার জন্য সে কত মানুষকে যে পথে বসিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। শুধু তাই নয়, সে নিজের হাতে অনেকগুলো খু*নও করেছে। এই সবকিছুর একমাত্র সাক্ষী আমি। আমি যাতে কোনোদিন মুখ না খুলি, সেজন্যই সে আমার বাবা-মাকে তার হাতের মুঠোয় রেখেছে। কিন্তু কথায় আছে না, পাপ বাপকেও ছাড়ে না? হঠাৎ করে ব্যবসায় তার বিশাল লোকসান হতে শুরু করে। সে হন্যে হয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে থাকে, কিন্তু কিছুই পায় না। দিন দিন সে দেউলিয়া হতে থাকে, কিন্তু তার দেনা আর শোধ হয় না। এখন তার কাছে খালি হাত-পা আর সামান্য কিছু টাকা ছাড়া কিছুই নেই। আর এই শহরে তুমি যে খুনগুলোর কথা শুনছো, সব… সব তুষার নিজের হাতে করেছে। জানি না, আজ আবার সে কোথায় গেছে, কার সর্বনা*শ করতে।”
এই ভয়ঙ্কর সত্যগুলো শুনে সায়নের মাথাটা ঘুরে উঠলো। সে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়লো। অধরা তার পাশে বসে বলতে লাগলো,
– “তুষার জানে, আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। সে জানে, আমরা একে অপরকে কতটা ভালোবাসতাম। তোমাকে মানসিক কষ্ট দেওয়ার জন্যই সে প্রতি রাতে জোর করে… সে আমাকে বাধ্য করে অমন বিকৃত শব্দ করতে, যাতে তুমি শুনতে পাও। বিশ্বাস করো সায়ন, বিয়ের পর একটা দিনের জন্যও আমি ভালো নেই। আমার বাবা-মাকে সে কোথায় আটকে রেখেছে, তা-ও আমি জানি না। প্লিজ সায়ন, তুমি ওদের বাঁচাও!”
সায়ন অধরার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
– “চিন্তা করো না। আমি ওদের খুঁজে বের করবই। আর তোমাকে এই নরপশুর হাত থেকে আমি বাঁচাবো। কিন্তু… তুমি আর আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”
অধরা আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু সায়নকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। সেই আলিঙ্গনের মধ্যে ছিল হারানো বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আকুতি আর একরাশ নির্ভরতা। তার নীরবতাই বলে দিচ্ছিল, “না, আর কখনো না।”
কিন্তু আদৌ কি তারা এক হতে পারবে? নাকি দুইজনের মধ্যে কেউ একজন হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য?
চলবে……!
