#শ্বশুড়বাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৯]
~আফিয়া আফরিন
রান্নাঘরের দরজায় এসে থামল মেহুল। আধো আলোয় চারপাশটা শান্ত আর নিরব, শুধু ঘড়ির টিকটিক আর ফ্রিজের আওয়াজ। মেহুল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
— “কি খাবেন?”
ইরশান আশেপাশে তাকাল,
— “হালকা কিছু।”
— “যেমন?”
— “অমলেট।” একটু থেমে আবার যোগ করল, “আচ্ছা তুমি যাও, আমি করে নিচ্ছি।”
মেহুল ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল,
— “আপনিই যখন করবেন তো আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন কেন?”
— “ইয়ে মানে…” ইরশান মাথা চুলকালো, চোখ নামিয়ে বলল, “মানে তোমাদের রান্নাঘরে কী কোথায় থাকে, তা তো খুঁজে পাব না।”
মেহুলের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি,
— “অসাধারণ!”
ও রান্নাঘরে ঢুকে গেল। ফ্রিজ খুলে ডিম বের করল। তারপর বলল,
— “আপনি আমার পাশে দাঁড়াবেন না, একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ান। কাজের সময় পাশে কেউ থাকলে আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়।”
ইরশান হেসে বলল,
— “চুলার আগুনের চেয়েও?”
মেহুল তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল,
— “চুপ। নয়তো ডিমের সাথেই আপনাকেই ভেজে দেব।”
ইরশান মুখ বন্ধ করল, কিন্তু হাসিটা চেপে রাখতে পারল না। কেন যেন এই মাঝরাতে মেহুলকে জ্বালাতে বেশ লাগছে। এমন একটা জীবনই তো দরকার ছিল… যে জীবনের সকালটা শুরু হবে মেহুলের মুখভরা রাগ দিয়ে, আর শেষ হবে একফোঁটা হাসিতে। যেখানে রোজ কোনো না কোনো কারণে মেহুল গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে, আর ইরশান ওর চারপাশে ঘুরে বেড়াবে। সামান্য হাসি, ছোটো কথা, কিংবা ওর পছন্দের কোন জিনিস দিয়ে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করবে। মেহুল মুখ ফিরিয়ে বলবে, “আপনি একটু সিরিয়াস হতে পারেন না?”
ইরশান দাঁত কেলিয়ে হাসবে, “সিরিয়াস হয়ে কি কখনো ভালোবাসা যায়?”
রাতের বেলা মেহুল যখন ঘুমিয়ে পড়ে, ইরশান তখন চুপিচুপি ওর মুখের উপরের চুলগুলো সরিয়ে বলবে, “এই জীবনটাই চেয়েছিলাম… যে জীবনে রাগ থাকবে, মান থাকবে, কিন্তু শেষমেশ তুমিও থাকবে; শুধু তুমি।”
মেহুলের রিনরিনে চুড়ির আওয়াজে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো ইরশান। তার চোখ মেহুলের হাতের নড়াচড়ায় আটকে আছে। মেহুল ভুরু কুঁচকে তাকাল,
— “তাকিয়ে আছেন কেন?”
— “দেখছি। চুড়ি পড়া হাতে তুমি ডিম ভাঙছো খুব সুন্দর করে।”
— “ডিম ভাঙারও আবার স্টাইল আছে?”
— “তোমার আছে।”
ও মুখ ফিরিয়ে নিল,
— “এখান থেকে সরুন, তেল ছিটবে। গিয়ে একটা প্লেট আনুন।”
ইরশান তাড়াহুড়ো করে প্লেট নিতে গিয়ে সেটা হাত থেকে ফসকে গেল। ঠাস! প্লেট ভেঙে মেঝেতে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। মেহুল হতভম্ব,
— “অসাধারণ!”
— “তুমি আমার কনসেনট্রেশন ব্রেক করছ বারবার।”
— “ওহ! মানে এখন দোষও আমার?”
— “না, দোষ ঠিক তোমার না… তোমার উপস্থিতির।”
মেহুল চোখ গোল করে তাকাল,
— “আমি কি ভূত নাকি?”
— “ভূত না।” ইরশান হাসল, “ভূত হলে তো পালাতে পারতাম। এখন তো তারও সুযোগ নেই।”
— “ধ্যাত্তেরি! আপনার খাবার রেডি করে দিয়েছি। আপনি প্লিজ ঘরে নিয়ে খান। আমি এই দিকটা পরিষ্কার করি। সাবধানে যান, পায়ে কাঁচ ঢুকলে সমস্যা।”
— “আমি সাহায্য করছি, ওয়েট…” বলে ইরশানও নিচু হলো। একটা একটা কাঁচের টুকরো তুলে রাখছিল। আচমকা মেহুল খানিকটা এগিয়ে গেলেই ইরশানের মাথার সাথে নিজের মাথা জোরেশোরে একটা ধাক্কা খায়।
— “ইশশশ, আপনাকে কে বলেছে সবকিছুর মাঝে আসতে? দিলেন তো মাথাটা ফাটিয়ে?”
ইরশান উঠে দাঁড়িয়ে চিন্তিত গলায় বলল,
— “মাথা ফেটে গেল নাকি?”
— “ফাটলে বোধহয় খুব খুশি হতেন? দেখি আরেকটা, নাহয় আমার মাথায় শিং গজাবে।”
— “তুমি কি গরু-ছাগল নাকি? আশ্চর্য!”
মেহুল নিজেই এগিয়ে এসে ইচ্ছেকৃত মাথায় আরেকটা বাড়ি খেল। রান্নাঘরের নরম আলো পড়ছে মেহুলের মুখে, ঘামে ভেজা কপালে একগোছা চুল এসে পড়েছে। বেখেয়ালে দু’জন খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। মাঝের ফাঁকা জায়গাটা এতটাই কমে গেল যে, শ্বাস নিলেই মেহুল শ্বাস-প্রশ্বাসের স্পর্শ পেল। কেমন অচেনা স্নায়বিক টান, একধরনের কাঁপুনি নেমে এলো শরীর জুড়ে। ইরশান এতটাই নিঃশব্দে আছে যে তার উপস্থিতি নিম্নপানে চেয়ে থাকা মেহুল টের পেল না; যতক্ষণ না সে ফিসফিস করে বলল,
— “এত কাছে আসা কি ঠিক হচ্ছে, মেহুল?”
মেহুল চমকে তাকাল। ইরশানের মুখ একেবারে ওর সামনেই, এতটাই কাছে যে তাদের মধ্যে কেবল নিঃশ্বাসের উষ্ণতা। চোখে চোখ পড়তেই মেহুলের বুক ধক করে উঠল।,
— “এইভাবে অজান্তেই কেউ যদি খুব কাছে আসে তবে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা কি অস্বাভাবিক? আরেকটু দূরত্ব রাখা উচিত ছিল মনে হয়।”
মেহুল হতভম্ব হয়ে বলল,
— “আপনি কি বলছেন এসব?”
— “সত্যিই বলছি।” ইরশান মাথা ঝাঁকাল, “তুমিই বলেছ, আমাদের এই বিয়েটা এগ্রিমেন্ট। তাই না? কিন্তু তোমার এই চুলের ঘ্রাণ, এত কাছে এসে দাঁড়ানো, রাতের নীরবতা; সবমিলিয়ে মনে হচ্ছে এই চুক্তিটা খুব টলমল হয়ে যাচ্ছে আমার জন্য।” তার গলার স্বরটা নিচু, একরকম গভীর, ভিতরে কিছু সত্যি কথা লুকিয়ে আছে।
মেহুল একপা পেছোতে গিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
— “আপনি এখান থেকে চলে যান, প্লিজ।”
ইরশান থামল, কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
তারপর ধীরে বলল,
— “ঠিক আছে, যাচ্ছি। তবে সাবধান… এই দূরত্বটাকে কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দিয়ে কষ্ট বাড়িয়ে দিও না।”
এইটুকু বলে সে হাঁটতে শুরু করল। দরজার কাছে পৌঁছে একবার ফিরে তাকাল।
.
মতিউর রহমান চা খাচ্ছিলেন। এই সময়েই সাজ্জাদুল আলম এসে হাজির হলেন। মুখে গাম্ভীর্য,
— “আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। সময় আছে?” সাজ্জাদুল আলম সামনের চেয়ারে বসলেন।
— “বলো।”
— “ব্যাপারটা একটু জরুরি। আজই আমরা ফিরতে চাইছি। আর মেহুলকেও সাথে করে নিয়ে যাব ভাবছি।”
আচমকা চায়ের কাপটা থেমে গেল মতিউর রহমানের হাতে। কিছুটা অবাক হলেন, কিন্তু ভদ্রতা বজায় রেখে বললেন,
— “মেহুল যাবে? কিসের ভিত্তিতে?”
— “ভিত্তি খুবই সহজ।” সাজ্জাদ শান্ত স্বরে বললেন, “সে এখন আমাদের বৌমা।”
মতিউর রহমান হেসে উঠলেন। একধরনের কটাক্ষভরা হাসি,
— “বৌমা? আমি তো জানি, এই বিয়েটা আমি মানিনি। মেয়েকে তোমাদের বাড়িতে পাঠানোর প্রশ্নই আসে না।”
— “আপনি না মানলে কি বাস্তবতা পাল্টে যায়? বিয়ে হয়েছে, কাজেই সম্পর্কটাও হয়েছে। এখন আপনি যদি রাগ করেন, সেটা আলাদা ব্যাপার। সম্পর্কটাকে এমন ঝুলিয়ে রাখা ঠিক না।”
— “সম্পর্ক? সম্পর্ক হয় কীসের ভিত্তিতে? ওদের এটা কোনো বিয়ে হলো? যা করেছে ভেবেচিন্তে করেছে? দু’জন যা করেছে, সেটা ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছু নয়। তুমি কিছু দেখো নাই, আমিও দেখি নাই। চুপচাপ ডিভোর্স হয়ে যাবে, সমস্যা হবে না।”
ডিভোর্সের কথা শুনে সাজ্জাদুল আলম ক্ষোভ মিশানো কণ্ঠে উঠে দাঁড়ালেন,
— “আপনার এত অহংকার কীসের?” তিনি চাপা গলায় বললেন, “এমন সিদ্ধান্ত আপনি একা কীভাবে নিতে পারেন? ওরা দু’জন বিয়ে করেছে হয়তো তাড়াহুড়োয়। সেটা আপনার কাছে হয়তো অপ্রচেষ্টা; কিন্তু আমার কাছে এটা কোন ছেলেখেলা নয়। আপনি সারাজীবন নিজেরটাকে গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। অন্যের মতামতের কোন দাম আপনার কাছে কখনোই ছিল না। আজও যে থাকবে সেই আশা আমি করিনা। কিছু কিছু সময় মানুষের ভালোলাগাটা, তাদের চাওয়া-পাওয়াও গুরুত্ব দিতে হয়। আমি শেফালীর সম্পর্ক নষ্ট হতে দেইনি, শেফালীর জন্য আপনার তথাকথিত সম্মান নষ্ট হয়েছে; তার শোধ আপনি আমার ছেলের উপর নিবেন? আমি বেঁচে থাকতে এটা কখনোই মেনে নেব না।”
সাজ্জাদুল আলমের গলা বজ্রপাতের মতো চমকাচ্ছিল। উনার চেঁচামেচিতে বাড়ির সবাই এসে থম মেরে দাঁড়িয়েছে। মেহুলও দৌঁড়ে এসে দরজার চৌকাঠে দাঁড়াল। চোখে বিস্ময়… মেয়ের দিকে তাকিয়েই মতিউর রহমান কড়া গলায় বললেন,
— “তুই কি এদের সাথে চলে যেতে চাচ্ছিস, মেহুল? যদি যাস তবে জেনে রাখ, এই বাড়ির দরজা তোর জন্য সারাজীবনের তড়ে বন্ধ থাকবে। আর আমি জানব মেহুল নামে আমার কোন মেয়ে কোনদিন ছিলই না।”
মেহুল চোখ তুলে তাকাল। কথাটা সরাসরি ওর হৃদয় ভেদ করে ঢুকে গেল। কিছু বলতে পারছে না, ঠোঁট কাঁপছে, চোখে পানি টলমল করছে। বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিচ্ছে। কি হচ্ছে এসব? বাবা কি কোনোদিন বুঝবে না? সাজ্জাদুল আলম এগিয়ে এসে বললেন,
— “হোক বন্ধ। এমন বাড়িতে থেকে কি করবে, যেখানে নিজের সম্মান, নিজের ইচ্ছার কোনো দামই নেই? মেহুল মা, তুমি আমাদের সাথেই যাবে। ওটাই তোমার নিজের জায়গা।”
সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমিনা আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন। মেহুল দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল; চোখে দ্বিধা, বুকের ভেতর দোলাচল। একমুহূর্তে জীবনটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে; একপাশে শিকড়, আরেকপাশে মুক্তি।
ভেঙে পড়লে চলবে না, নিজেকে শক্ত করতে হবে।
শেফালী আন্টি, বড় আপা আর ইরশানকে ও কথা দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতিগুলোই সাহসের জায়গা। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে, তবু নিজেকে শক্ত করে রাখল। ইরশান যদি নিজের জায়গায় অটল থাকতে পারে, তবে ও কেন পারবে না? মেহুল দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “ইরশান যা বলবে তাই হবে। ওকে যেহেতু বিয়ে করেছি, ও-ই আমার স্বামী। ওর সিদ্ধান্তের বাইরে আমি যেতে পারব না।” বাবা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, মেহুল থামিয়ে দিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আর একটা কথা বলব বাবা, তুমি কীভাবে আমাকে বললে যে আমার জন্য এই বাড়ির দরজা সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দেবে? এটা আমার দাদার বাড়ি। দাদু তোমার চেয়েও বেশি অধিকার আমায় দিয়ে রেখেছে।”
মতিউর রহমান সত্যি হতবাক! যেই মেয়েকে তিনি ছোটোবেলা থেকে এত আদরে বড় করেছে সেই মেয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে বাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে? তিনি ওখান থেকে চলে গেলেন। পেছনে ফেলে গেলেন কয়েক জোড়া হতভম্ব দৃষ্টি। মেহুল নিজের কান্না আটকাতে পারল না। ও এসব কিছু চায় নাই। অথচ যা চায় নাই, তাই হতে হলো? কেনো? কেনো বারবার ওর সাথেই এমন হয়? ওর ভাগ্যটা এত খারাপ কেনো?
বাড়িতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা ইরশান শুনেছে। মেহুলের সাথে আর দেখা হয় নাই। ও ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। ডাকাডাকি করলেও শুনছে না। ইরশান মনে মনে বলল, “নাহ… এই শ্বশুরকে তো পথে আনা যাচ্ছে না। আল্লাহই জানে, শ্বশুর না অসুর! সাহস কত্ত বড়, আমার বউকে কাঁদায়?” সে ফোন করল মিতুলকে। সেও খুব শীঘ্রই দেশে আসবে। খুব শীঘ্রই মানে, এই সপ্তাহের মধ্যেই। আচ্ছা আচ্ছা… তাহলে তো হয়েই গেল। এইদিক সমাধান করার পর মেহুলকে দেখতে হবে। সেখানে আবার কী ঝামেলা পোহাতে হয়, কে জানে? অথচ ইরশানকে দ্রুত ফিরতেও হবে। এত তাড়াতাড়ি ফেরার কথা ছিল না। কিন্তু জরুরী প্রয়োজন। এখানে বাবা-মাকে বহুকষ্টে মানুষ রাজি করেছে, কিছুদিনের জন্য; অন্তত সবকিছু ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত নিজের পেশাদার পরিচয়টা গোপন রাখতে। অনেক তর্কের পর অবশেষে তারা সম্মতি দিয়েছে। এখনই অসুর মশাই অর্থাৎ তার শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই সব জেনে ফেললে গোলমাল পাকবে। তিনি মানুষটা এমনিতে ভালোই। তবে তার প্রতি সকলেরই মনের ভেতরে একটা চাপা ক্ষোভ রয়ে গেছে। কারণ একটাই দোষ, সে নিজের ভাবনাকেই শেষ কথা ভাবে। জীবনে কারও উপর কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়াটা বড্ড বাজে। শ্বশুরমশাইয়ের নিজের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা অনেক বড়, কিন্তু তারমানে এই নয় যে অন্যদেরটা অমূল্য।
.
আজ ইরশান বেশ তৎপর। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘোষণা দিয়েছে, মাছ ধরবে! আশেপাশের কয়েকটা ছেলেপেলেকে জোগাড় করেছে, কেউ জাল নিয়ে এসেছে, কেউ বালতি। নিজে পরেছে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর প্যান্ট কিন্তু প্যান্টে ঠিক সুবিধা হচ্ছে না। তাই হা-পিত্যেশ করে উঠোনে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
— “আব্বাজান! ওহে আব্বাজান!”
অনেকক্ষণ চেঁচামেচির পর মতিউর রহমান বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বিরক্ত স্বরে বললেন,
— “এইভাবে ষাঁড়ের মতো চেঁচামেচি আমি বাড়িতে সহ্য করব না।”
ইরশান নির্বিকার গলায় বলল,
— “একটা লুঙ্গি দেন।”
— “লুঙ্গি? কী দরকার?”
— “মাছ ধরতে যাব। আপনি তো মাছ কিনে খাওয়াচ্ছেন না, তাই ভাবলাম নিজের ব্যবস্থাটা নিজেই করে নিই। তাড়াতাড়ি দিন, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে মশাই।”
মতিউর রহমান হতভম্ব। এই ছেলেটা একেবারে পাগল করে ছাড়বে। তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
— “পারব না।”
ইরশান হাল ছাড়ল না। চোখ বড় বড় করে বলল,
— “কেন পারবেন না? একটা লুঙ্গি চেয়েছি মাত্র। আপনার জমিজমা, ধনসম্পদ বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিছুই তো চাইনি।”
তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,
— “লুঙ্গি আমি দিব না।”
ইরশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— “এমন ভাব করছেন যেন আমি আপনার আন্ডারওয়্যার চেয়ে বসেছি! অসহ্য মশাই আপনি।”
ইরশান কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা ছাদে উঠে গেল। দড়িতে শুকোতে থাকা একটা লুঙ্গি তুলে নিল, কোমরে পেঁচিয়ে নিচে নামল, তারপর শ্বশুরের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে ওদের সাথে বেরিয়ে গেল মাছ ধরতে।
মতিউর রহমান উপর থেকে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, শুধু তাকিয়েই রইলেন। এইবার সত্যি সত্যি তার মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। খুব শীঘ্রই বোধহয় পাগলা গারদে একটা সিট বুকিং দিতে হবে। এই ছেলে আর দুটোদিন বাড়িতে থাকলে তিনি সত্যি সত্যি বাড়ি ছাড়া হবেন…
.
.
.
চলবে…..
#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-১০]
~আফিয়া আফরিন
সকাল সকাল মেহুল আর ইরশানকে পাওয়া গেল না। ওরা বাড়িতেই নেই। কোথায় গেছে কেউ জানে না। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তুতুল জানাল, “ওরা চলে গিয়েছে। আলাদা থাকবে বলে এই বাড়ি ছেড়ে গেছে।”
মতিউর রহমান মোটেও অবাক হলেন না। বোধহয় আন্দাজ করেছিলেন কিংবা বিগত কিছুদিনের ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। তিনি সাজ্জাদুল আলমের দিকে চোখ বোলালেন। বিষাক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
— “তোমার ছেলে কি চায়? কি করলে আমার মেয়েকে ছাড়বে? টাকা-পয়সা? ধনসম্পদ? এই বাড়ি?”
সাজ্জাুল আলম দৃঢ়ভাবে বললেন,
— “ইরশান আমার ছেলে। এসব পুঁটি মাছে ওর মন ভরবে না।”
মতিউর রহমানের চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল,
— “মানে? কী চাও তোমরা?”
সাজ্জাদ নিঃশ্বাস টেনে উত্তর দিলেন। কণ্ঠে অনভিপ্রেত ইঙ্গিত,
— “রাঘব বোয়াল।”
— “মানে?” মতিউর রহমানের প্রশ্নে উত্তেজনা বেড়ে গেল।
— “সময়মত বুঝে নেবেন।” সাজ্জাদ ঢেউ খেলানো গলায় বলল। তার কথায় রহস্য, পরিকল্পনার আভাস স্পষ্ট। বুঝতে অসুবিধা হলো না। মতিউর রহমান আগেই বুঝেছিলেন, এরা কোনো সাদা-কালো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে। বাবার অসুস্থতার খবর তো সাজানো গল্প মাত্র। ভালোভাবে আশেপাশে তাকালেই চোখে পড়ছে একটাই সন্দেহ, সম্পত্তি। এই বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাবতীয় জমিজমা যা আছে তা এখনও বাবা-মায়ের আওতায়। তাদের হাত করে সব কিছু কেড়ে নেওয়া সহজ কথা নয়, কিন্তু যদি একমাত্র মেয়ে এবং তার জামাই একযোগে চলে আসে; তাহলে কি বাঁধা থাকে?
নাহ, এত বেখেয়াল হলে হবে না। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে আগেই, শক্ত করে ধরে রাখতে হবে। বাপ-ছেলেকে কিছুতেই উদ্দেশ্যে সাধন করতে দেওয়া চলবে না।
.
ইরশান আর মেহুল উঠেছে শহর থেকে একটু দূরে শান্ত গলির ভেতরে একতলা ছোট্ট হোটেল কাম বাড়িতে। বাইরের দিকে সাইনবোর্ডে লেখা “নীড় রেসিডেন্সি”, তবে নামের বিপরীতে এর ভেতরটা একেবারে ঘরোয়া। কাঠের দরজা, মাটি রঙের টালি, জানালার পাশে গাছের টব আর নীল পর্দা; সবকিছুতেই স্নিগ্ধতার পরশ। এ জায়গাটা আসলে হোটেল হিসেবেই ভাড়া দেওয়া হয়, কিন্তু রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিজেদের দায়িত্বে। প্রথমে মেহুল রাজিই হচ্ছিল না; বাড়ি ছেড়ে হোটেলে থাকবে? কিন্তু এখানে এসে সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়াতেই মেহুল বদলে গেল। রান্নাঘরের ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের রোদে চা খাওয়া, পর্দার আড়াল থেকে ইরশানের অগোছালো হাসি দেখা… সব স্বপ্ন, স্বপ্ন। মনে হচ্ছে এইটুকুই ওর জগৎ। দুপুরে একচুলায় ভাত বসিয়েছে, পাশে ডাল ফুটছে, ইরশান এসে এসে তদারকি করছে, অযথা বকবকও করছে; বকবকের বিষয়বস্তু শ্রদ্ধেয় শ্বশুরমশাই।
মেহুল বারবার এই ছোট্ট বাড়িটা ঘুরেফিরে দেখছে, এমন সাধারণ সাজই ওকে ভীষণ তৃপ্ত করে তুলেছে। কতদিন ধরে এমন একটা ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল; যেখানে কেউ তাকে জোরে বকবে না, কেউ বন্ধ দরজার আড়ালে চোখ রাঙাবে না। শুধু দু’জন মানুষ, কিছু গল্প, কিছু হাসি আর কিছু নীরবতা থাকবে…
দুপুরের পরের নিস্তব্ধতা। জানালার পর্দা হেলে হেলে আসা রোদে ঘরের ভেতরটা অলস আলোয় ভরে আছে। দূর থেকে পাখির কলকাকলির আওয়াজ ভেসে আসছে। মেহুল কাপড় গুছাচ্ছিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— “আমরা এখানে কয়দিন থাকব?”
ইরশান কী একটা কাজে ব্যস্ত। একবার কাগজপত্র এলোমেলো করছে আরেকবার গোছাচ্ছে। কাজ থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— “ভালো লাগছে না?”
— “না না, ভালো লাগছে। বরং অনেক ভালো লাগছে। তবে বাড়িতে চিন্তা করবে তো… একটু জানিয়ে রাখলে ভালো হতো না?”
ইরশান এবার মুখ তুলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি টেনে বলল,
— “আমাকে কি বোকা পেয়েছ মেহুল আফরোজ? জানিয়ে রেখেই এসেছি। তুতুলকে বলেছি।”
— “ওহ, আচ্ছা…”
এরপর আর কিছু বলার মত খুঁজে পেল না। স্বভাবতই ও কম কথা বলে। কথা কম বলার কারণেই মেহুলের খুব বেশি বন্ধু-বান্ধব জোটে নাই। সবাই ওকে ভদ্র, শান্ত আর একটু দূরের মানুষ মনে করে। স্কুল-কলেজে যখন সবাই হাসিখুশি আড্ডায় ব্যস্ত থাকত, ও তখন বই হাতে এককোণে বসে থাকত। প্রেমও হয়নি কোনোদিন। ভালোলাগা কী, ভালোবাসা কাকে বলে; এসব শুধু গল্পে, সিনেমায়ই দেখেছে। বাস্তবে দেখার সৌভাগ্য এখনও হয়নি। ওর ভাবনার ভেতরেই ইরশান নরম কণ্ঠে বলল,
— “মন খারাপ?”
মেহুল চমকে তাকাল। তাড়াতাড়ি বলল,
— “না না, এমনি।”
ইরশান হাতে থাকা কাজগুলো সরিয়ে এগিয়ে এলো। স্নিগ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
— “কোনোদিন কাউকে ভালোবেসেছিলে?”
মেহুল থমকে গেল। চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “না তো।”
ইরশান নিঃশব্দে হেসে উঠল,
— “আমি বেসেছিলাম। ভালোবাসার রং কেমন জানো?”
— “জানি না।”
— “ভালোবাসার রং কোনো চোখে ধরা যায় না। কখনো সেটা সকালবেলার আলোয় মিশে যায়, কখনো রাতের নিঃশব্দ নিঃশ্বাসে।
আর কখনো… এমন কারো চোখে পড়ে, যে মানুষটা বলে— ‘না না, এমনি।’ আর তখন পৃথিবীটা হঠাৎ একটু বেশি সুন্দর হয়ে যায়।”
মেহুল চোখ নামিয়ে নিল নিচের দিকে, অকারণে। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এলেও, সেটা বেশিক্ষণ টিকল না। নিচু স্বরে বলল,
— “সবসময় এত সিনেমার ডায়লগ না দিলেও চলে। শাকিব খানের ভক্ত নাকি?”
ইরশান একেবারে হাসিমুখে চোখ মেলে তাকাল। ঠোঁটের কোণে কেমন ছলভরাসা হাসি রেখে বলল,
— “না না, আমি শাকিব খানের ভক্ত নই। আমার গল্পে আমি নিজেই নায়ক।”
মেহুল হাসল। নড়েচড়ে বসল। বেশ সিরিয়াস হয়ে বলল,
— “আপনার সম্পর্কে কিছুই জানলাম না। কী করছেন আপনি?”
ইরশান ভুরু কুঁচকে উত্তর দিল,
— “এইতো বসে আছি।”
— “আরে তা বলি নাই। মানে, আপনার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। পড়াশোনা তো শেষ করেছেন। চাকরি-বাকরি করছেন না? আবার কবে ফিরে যাবেন?”
— “ফিরে যেতে হবে খুব শীঘ্রই। সবকিছু ঠিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। আর চাকরি-বাকরি? আমি এখন এখানে ‘পার্ট‑টাইম জামাই’। বুঝলে? পুরোপুরি জামাই না, কিন্তু কাজের দায়িত্ব‑নামা নিয়ে আছি। ওহ হ্যাঁ, আমার কপালে তো আবার ফুল-টাইম জামাই হওয়ার ভাগ্য নেই। পার্ট-টাইমের পর তো জামাই থেকে সেই পুরোনো ফর্মে ফেরত যেতে হবে।”
মেহুল একদম হতভম্ব হয়ে চোখ বড় করল,
— “এগুলো কি যুক্তি দিলেন?”
ইরশান হেসে কাঁধ তুলল,
— “যুক্তি? না না, যুক্তি বলতে এখানে কিছু নেই। শুধু মজা করলাম। তোমার মত সবসময় যদি মুডি হয়ে থাকি তো অল্প বয়সেই বুড়িয়ে যাব। আচ্ছা, সবসময় রেগে থাকো কেনো? কথা বলতে ভালো লাগে না? অবশ্য তোমাকে রেগে থাকলেই বোধহয় দেখতে সুন্দর লাগে। আজ অব্দি তো তোমার হাসিই দেখলাম না।”
মেহুল মুখ ফিরিয়ে বলল,
— “সবসময় মজা করতে ভালো লাগে না।”
— “হাসি জরুরি। যাইহোক একটা কথা বলি, আমাদের এগ্রিমেন্ট শেষ হওয়ার আগে একবার তোমার হাসি মুখটার দেখা দিও তো।”
এটুকু বলেই ইরশান উঠল। বোধহয়, বাহিরে যাবে। মেহুল একটু অস্থিরভাবে বসে রইল। মনে মনে ভাবল, ইরশান এতবার এগ্রিমেন্টের কথা কেন বলছে? ও নিজেও তো জানে, এটা মেহুলের সিদ্ধান্ত। চাপে পড়ে করা বিয়ে, শুধুমাত্র দুই পরিবারকে শান্ত করার জন্য; ইরশানও ভুক্তভোগী। তাই বলে কি বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে? এত তাড়া কেন? ওই দেশে গার্লফ্রেন্ড কি কেঁদে মরছে? ওর চোখদুটো মৃদু ঝাপসা হয়ে এলো।
আচ্ছা এগ্রিমেন্টে কি লেখা ছিল? সকলের সামনে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকবে। বন্ধ দরজার পেছনে নিজেদের আলাদা সম্পর্ক। পরিবারের চাপ বা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ সম্পর্ককে ব্যবহৃত করা হবে। দুপক্ষই চাইলে চুক্তি শেষ হলে স্বাভাবিকভাবে সম্পর্কের পরিসর পরিবর্তন হবে। এগ্রিমেন্টের কাগজে কোথাও লেখা নেই; ভালোবাসা যাবে না, মায়া করা যাবে না। মেহুলের মনে প্রশ্ন জাগল, “তাহলে কি আমি চুক্তির বাইরে চলে যাচ্ছি? আমার মনে থাকা সব অনুভূতি, যেগুলো সঠিক কারো জন্য তুলে রেখেছিলাম সেগুলো এখন ইরশানের দিকে ধাবিত হচ্ছে? সব নিয়ম, শর্ত আর সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে আমি কি তাকে ভালোবেসে ফেলতে চাইছি?”
.
তুতুল শাওনকে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল; কিছুটা অবাকে, কিছুটা রেগেমেগে। ভেবেছিল, ইরশান ভাইয়া চলে গেছে তাই তার বন্ধুও নিশ্চয় চলে গেছে। কিন্তু না, আছেই। সকালে তো ছিল না। এখন আবার কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে? রেগেমেগে মাকে জিজ্ঞেস করল,
— “মা, ওই সাবান এখনও কি করে এখানে?”
— “সাবান কে?” আমিনা অবাক।
— “সাবান মানে ওই ইরশান ভাইয়ার বন্ধু।”
— “ওহ শাওন? ও তো আমাদের অতিথি, কোথায় যাবে? আমার এদিকে অনেক কাজ তুই বরং একটু চা-নাস্তা দিয়ে আয়। তোর বাপের কর্মকান্ডে আমি ভালো করে অতিথি আপ্যায়ন করতে পারছি না।”
— “আমি পারব না।” তুতুল মুখ কালো করে বলল।
— “কেন পারবি না? যা।”
তুতুলকে চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে বের হলো। মনে হলো, এই চায়ের মধ্যে কিছু একটা মিশিয়ে শাওনকে দিতে পারলে কেমন হবে? কিন্তু কী মেশাবে? থুথু! না না, বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। ওহ হ্যাঁ, লবণ মিশিয়ে দেওয়া যায়। তুতুল আবার রান্নাঘরে ছুটল। কেউ নেই, মা বোধহয় অন্যদিকে গিয়েছেন। দৃষ্টি ঘুরিয়ে চায়ের কাপে একমুঠো লবণ ছিটিয়ে দিল। তারপর বাঁকা হাসি হেসে বেরিয়ে এলো। তবে শাওনের সামনে এসে বাঁকা হাসিটা মিষ্টি হাসিতে পরিবর্তিত হলো। চায়ের কাপ শাওনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “আপনার চা, মা পাঠিয়েছে।”
শাওন চোখ বড় করে অবাক হয়ে তাকাল,
— “চা? তুমি নিজে এনে দিলে?”
তুতুল একটু লাজুক হেসে বলল,
— “হুম, আমি আনলাম। কিন্তু একটু… বিশেষ।”
বিশেষ বলতেই শাওন বুঝেছে, নিশ্চিত কোনো গড়বড় আছে। এখানে আসার পর অজানা কারণেই তুতুল শাওনকে দেখতে পারে না। শাওন কিছুতেই কোনো ভুল করেনি, সে এমনটাই মনে করে। তবে ওই যে, প্রথমদিন বাবার সম্পর্কে কী যেন বলেছিল ওইটাই হয়ত কারণ। শাওন চায়ে চুমক দিল। মনে হচ্ছে, আটলান্টিক মহাসাগরের লবনাক্ত পানি খাচ্ছে। তবে কিচ্ছু বলল না। চুপচাপ খেয়ে নিল। তুতুল অবাক। চোখ মেলে চেয়ে বলল,
— “আপনি খেয়ে নিলেন? পুরোটা?”
শাওন হেসে উত্তর দিল,
— “হুম, মজা তো। কিন্তু কেনো তুমি খাবে নাকি? কাপের তলায় এখনও একটু চা পড়ে আছে, টেস্ট করতে পারো।”
তুতুল নাক চটকিয়ে মুখ কালো করে বলল,
— “ছিঃ! আপনার এঁটো জিনিস কেন খাব?”
শাওন বিনয়ে মাথা নাড়ল,
— “তাও ঠিক। চা ভালো ছিল, ধন্যবাদ।”
মুখ কালো করে তুতুল ট্রে হাতে নিয়ে রান্নাঘর দিকে চলে এলো। ওর চোখেমুখে একধরনের গোঁড়ামি আর কৌতূহলের মিশ্রিত ভাব। মনে মনে ভাবছিল, “আমি তো স্পষ্টভাবে লবণ মিশিয়েছিলাম অথচ শাওন খেতে খেতে কিছু বলল না। তবে কি ভুল করে চিনি মিশিয়েছিলাম?” ও অজান্তেই কাপের তলানিতে থাকা চা’টুকু চুমুক দেওয়ার মুহূর্তে ওয়াক থু করে ফেলে দিল, ছিঃ এত্ত বাজে খেতে! চা তো ঠিকই লবণযুক্ত। কিন্তু শাওন কীভাবে খেয়েছে, কীভাবে স্বাভাবিক থেকেছে, তা তুতুলকে রহস্যময় চক্রের মধ্যে বেঁধে ফেলল। মনটা বলল, “এই ব্যাটা সত্যিই অদ্ভুত! লবণ খেয়ে কী করে কেউ এত শান্ত থাকতে পারে?” তবে এই মানুষটার ধৈর্য আর মনোভাব সত্যিই অন্যরকম।
তুতুলের ভীষণ খারাপ লাগছে। ও এমনটা না করলেও তো পারতো। কি দরকার ছিল এমন পাগলামি করার? ইশশশ, ছেলেটা যদি এখন অসুস্থ হয়ে যায়? ওর মা-বাবা কি বলবে? বেড়াতে এসে এক পাগল মেয়ের পাল্লায় পড়ে অসুখ বাঁধিয়ে বসলো! নাহ নাহ, একদম ঠিক হলো না। শাওনের চিন্তায় সেই রাতে তুতুল দুচোখের পাতা এক করতে পারল না।
সকালবেলা উঠেই শাওনকে খুঁজতে বের হলো। ক্ষমা চাইতেই হবে। দোষ যখন করেছে তখন ক্ষমা চাইতে অন্যায় কোথায়? উঠোনে শাওনকে পেল। পেছন থেকে ডাক দিল,
— “শুনুন…”
শাওন ঘুরে তাকাল। তুতুলের দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল,
— “তুমি? ওমা, আজকে কি স্পেশাল চা আনেননি?”
তুতুল কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল,
— “সরি।”
— “সরি কেন?” শাওনের কণ্ঠে বিস্ময়।
— “গতকালের জন্য। আমি খুব বাজে চা খাইয়েছিলাম আপনাকে। সত্যি বলতে, আমি চা বানাতে পারি না। আসলে কোনকিছুই করতে পারি না। করতে পারলে শুধু খালি মুখে সরি বলতে আসতাম না। মাফ করে দিন, ঠিক আছে?”
— “মাফ করে দিলে কি পাব?”
তুতুল কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তিত গলায় বলল,
— “মানে? কি পেতে চাচ্ছেন?”
শাওন হেসে বলল,
— “আমাকে আরেকবার আটলান্টিক মহাসাগরে নিয়ে যেতে হবে মানে, ওই লবণাক্ত চা আবার খাওয়াতে হবে।”
তুতুল হো হো করে হেসে উঠল। শাওনও হাসির ছন্দে তাল মিলাল। তাদের হেসে খুনসুটি দূর থেকে মতিউর রহমানের নজরে পড়ল। তিনি চোরাচোখে দেখলেন। এক মেয়ে তো গোল্লায় গেছে, আরেকটাও কি যাওয়ার পথে? কি হচ্ছে এসব তার বাড়িতে? এই অনাচার আর সহ্য করা যাচ্ছে না। তিনি কপালে ভাঁজ ফেললেন এবং তুতুলকে ডাক দিলেন। তুতুল বাবার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। হাসাহাসি মাঝপথে থেমে গেল। বাধ্য হয়ে বাবার সাথে ঘরে ফিরে গেল।
ইরশান বেশ সপ্রতিভ, নিজের মাথা-ঝোঁক এবং বুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে জানে। এমন বুদ্ধি-দক্ষতার কারণেই হয়ত, হোটেলে এক রুমের কামড়ায় থাকা সত্ত্বেও ইরশান দু’টো রুমের কামড়া নিয়েছে। যত যাইহোক, তারা বিবাহিত; এক ঘরে থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে ইরশান মেহুলের কথা ভেবেছে। ওর যাতে মেহুলের কোনও সমস্যা না হয়, তা নিয়ে চিন্তা করেছে।
বিষয়টা মেহুলের ভীষণ ভালো লাগল। সেই ভালোলাগা থেকেই রাতে দারুন ঘুম হয়েছে। সকালে উঠে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে উঠে চা বানাল। অন্যরুমে ইরশান এখনও ঘুমে… এককাপ চা নিয়ে মেহুল এলো তার ঘুম ভাঙাতে। দরজাটা অল্প ফাঁক করা। মেহুল নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকল। সকালের রোদ পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকছে। ও টেবিলে কাপটা রাখল। ইরশান তখনও গভীর ঘুমে। চুলগুলো এলোমেলো, এক হাত মাথার নিচে, আরেকটা বুকের ওপর রাখা। মেহুল বিছানার পাশে এগিয়ে গেল। নিচু হয়ে বলল,
— “মি. পার্টটাইম জামাই… সকাল হয়ে গেছে। সূর্য উঠেছে, এখনও কি ঘুমাচ্ছেন?”
কোনো সাড়া নেই। মেহুল এবার এক হাতে হালকা করে কাঁধে ঝাঁকি দিল,
— “চা ঠান্ডা হয়ে যাবে কিন্তু…”
ইরশানকে ডাকতে ডাকতে মেহুলের প্রথমবারের মতো মনে হলো, এই মানুষটাকে দূরে রাখা সহজ নয়।
মেহুলকে এত কাছে, সকালের আলোয় পাশে বসে থাকতে দেখে ইরশান হঠাৎ চমকে উঠে বসল। চোখ কচলিয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল ওর দিকে; যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, এটা সত্যি কিনা! শ্বশুরকন্যা এক কাপ চা নিয়ে এসেছে, হেসে ডাকছে; কতবার এমন স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্ন কি এইবার সত্যি হতে যাচ্ছে?
ওর আরো দুদিন এখানে থেকে গেল। যদিও এখনই যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না কিন্তু মিতুল আজকে রওনা দিয়েছে। তাই না চাইলেও ফিরতে হবে। যাওয়ার আগ দিয়ে ইরশান হঠাৎ কী মনে করে মেহুলকে জিজ্ঞেস করল,
— “এগ্রিমেন্টের মেয়াদ শেষ হলেও তুমি কি এখনো আমার সাথে থাকবে?”
মেহুল অবাক হলো। ওকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। এইমুহূর্তে কি উত্তর দিবে বুঝতে পারছিল না। ইরশান বিষয়টা আরও সহজ করার জন্য বলল,
— “উত্তরের সুবিধার্থে চারটে অপশন দিচ্ছি… চিন্তা করো না।
১. হ্যাঁ
২. হুম
৩. হুঁ
৪. জি।
আরাম করে বসো। বসে তারপর বলো…”
.
.
.
চলবে…..
