#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৭]
~আফিয়া আফরিন
বাড়ির পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক। এরকম একটা ধাক্কা মতিউর রহমান সামলে উঠতে পারছেন না। ফ্যানের নিচে বসেও তিনি অনবরত ঘামছেন। বারবার পানি পিপাসা পাচ্ছে। মেয়েকে কিচ্ছু বলতে পারলেন না। চেয়ারম্যানকে দেওয়া কথা, নিজের মান-সম্মান; সবকিছু বাদ দিয়েও তার জীবনের চরম অপছন্দের মানুষের ছেলেকে বিয়ে! এই বিয়ে তিনি কিছুতেই মানবেন না। অসম্ভব!
সাজ্জাদুল আলম চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া। তিনি মতিউর রহমানের মতো বজ্রাহত নন, কিন্তু মনের ভেতর ঝড় বইছে।
এটা কি করল ইরশান? কেনো করল? ছেলেটা একমুহূর্তের উত্তেজনায় সবকিছু ওলটপালট করে দিলো? তিনি ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলেন! ছেলে স্থিরচিত্ত মানুষ হবে, পরিণতির আগে ভাববে, সিদ্ধান্তের আগে মাপবে। সেই ছেলে আজ বাবার এমন বিশ্বাসটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিল?
ঘটনার মূলহোতা যে দুজন তারাই এখন এখানে উপস্থিত নেই। মেহুল সেই যে ঘরে গিয়ে দরজায় খিল দিয়েছে, খোলার নামগন্ধ নেই। ইরশানকেও আশেপাশে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বিয়ের এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন খন্দকার আলফাজ উদ্দিন আর সালেহা বেগম। তারা তৎক্ষণাৎ দুরাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিয়েছেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যদি ছেলে আর মেয়ে জামাইয়ের সংঘাত মেটে।
এমনই থমথমে পরিস্থিতিতে ঘড়ির কাঁটা আর গুটিকতক মানুষের নিঃশ্বাসের আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। একদিকে মতিউর রহমান, অন্যদিকে সাজ্জাদুল আলম। দু’জনের চোখে জ্বলছে ক্রোধের আগুন, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভাঙা সম্পর্কের দগদগে ঘা। মতিউর রহমান হঠাৎ সিংহের মত গর্জন করে উঠলেন,
— “বেঁচে থাকতে এই বিয়ে আমি মেনে নিব না!”
এমন বজ্রকণ্ঠে চমকে উঠল সবাই। শারমীন মুখ খুলল,
— “ভাইজান আপনি একটু শান্ত হোন…” কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সাজ্জাদুল আলম চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। উনার মতোই তেজদীপ্ত কণ্ঠে বললেন,
— “আমি কি মেনে নিচ্ছি নাকি? একটাই ছেলে আমার। যাকে-তাকে বিয়ে করে নিয়ে আসবে, আর আমি চোখ বুজে মেনে নেব? কখনো না।”
মতিউর রহমান চোখ বড় করে তাকালেন,
— “সাজ্জাদ! মুখ সামলে কথা বলো। যাকে-তাকে মানে কি? আমার মেয়ে কি ফেলনা? তোমার ছেলে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করেছে, বুঝলে? প্রতারণা করেছে।”
সাজ্জাদ হেসে উঠল। সেই হাসিতে রাগের সঙ্গে তাচ্ছিল্য মিশে আছে,
— “আচ্ছা? আপনার মেয়ে কি বাচ্চা নাকি? বিয়ে কি একপাক্ষিক সম্ভব? দুজন না চাইলে হয়?”
ঘরের ভেতর টানটান উত্তেজনা। সবাই উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দু’জন মুখোমুখি যুদ্ধজাহাজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার নোঙর কেউই ফেলতে রাজি নয়। মতিউর রহমান এক পা এগিয়ে এলেন,
— “তোমরা সব কয়টা একরকম! বিশ্বাসঘাতকতা তোমাদের রক্তে মিশে আছে। এইজন্যই তো… এইজন্য এত বছর বাদে তোমাদের আগমন ঘটেছে, না! আমার ঘরের দোরগোড়া তোমাদের জন্য যেমন অশুভ তেমনি তোমরাও আমার জন্য দুর্ভাগ্যের। ছেলেটাকে মানুষ করতে পারো নাই, উচ্ছন্নে গেছে। বেশি আদর করতে গিয়ে মাথায় তুলেছো, এরই তো ফল!”
— “আমার ছেলে উচ্ছন্নে গেছে আর আপনার মেয়ে কি? ও তো এসেছে রানি ভিক্টোরিয়া সেজে। যদি জোর করে আমার ছেলে ওকে বিয়ে করত, তবে এইরকম সাজপোশাক থাকতো? দেখুন গিয়ে আপনার মেয়ে আমার ছেলেকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছে। সব দোষ আমার ছেলের ঘাড়ে দিয়ে কোনোভাবেই নিজের মেয়ের সাইড নিবেন না।”
মতিউর রহমান চোখ গোল করে তাকালেন,
— “কি বললে? তোমার সাহস দেখে আমি রীতিমতো অবাক। আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে তুমি আমাকে এসব কথা শোনাচ্ছো? কী শুরু করেছ কী?”
— “শুরু আমি করি নাই, আপনি করেছেন।”
— “আমি?”
— “হ্যাঁ আপনি!”
— “তুমি এখনো আগের মতোই একগুঁয়ে, সাজ্জাদ।”
— “আর আপনি এখনো আগের মতোই বদমেজাজি, নিজের দোষটা কখনোই স্বীকার করেন না।”
রাগে দু’জনের মুখ লাল হয়ে গেছে, চোয়াল শক্ত। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি না। সেসময় আচমকা দরজার দিক থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো,
— “চুপ! সবাই একদম চুপ।”
সকলে একসাথে ঘুরে তাকাল। দেখল, দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে মেহুল আর ইরশান। ওরা একসাথে এগিয়ে এলো। উপস্থিত সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে ইরশান বলল,
— “আপনারা তো প্রাইমারির বাচ্চাদের মত ঝগড়া শুরু করে দিয়েছেন। বিয়েটা করলাম আমরা, আমাদের সমস্যা নেই। আপনাদের সমস্যা? কেনো? কীসের?”
মেহুল এগিয়ে এলো। কাঁধ সোজা করে বলল,
— “কেউ আমাকে জোর করে, বিয়ে করে নাই। বিয়েটা আমি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছেয় করেছি।”
মতিউর রহমান আহত ভঙ্গিতে তাকালেন। আর অন্তত বিশ্বাস ছিল, মেহুল পক্ষে কথা বলবে। এখন নিজের মেয়ে এরকম বিপক্ষে চলে গেল? ইরশান মৃদু স্বরে বলল,
— “আমিও তাই। যা করেছি নিজেদের সম্মতিতেই করেছি।”
সাজ্জাদুল আলম বললেন,
— “বাহ! বিয়ে হতে না হতেই বউয়ের কথায় তাল মেলানো শুরু করেছিস?”
ইরশান চুপ করে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— “আব্বু দেখো, তোমরা নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করো না। আমার খারাপ লাগছে যে আমি বিয়ে করেছি অথচ জানাইনি। সেটা আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এখন যদি তোমরা নিজেদের মধ্যে এরকম ঝামেলা করো, তাহলে কেমন লাগবে বলো তো? তোমরা এমন মুখ কালো করে থাকলে আমাদের খারাপ লাগবে।”
আলোচনা অনেকদূর গড়িয়ে গিয়েছিল। সবাই ইরশান আর মেহুলের কাছ থেকে মূল কাহিনী শোনার জন্য উদগ্রীব। ওরা হঠাৎ বিয়ে করল নাকি আগে থেকে কোন সম্পর্ক ছিল? সম্পর্ক থাকলে তা কীভাবে? কথার মাঝে মতিউর রহমান ফের হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
— “আমি এই বিয়ে কোনোভাবেই মানি না। মেহুল আমার মেয়ে, আর আমার মেয়ের বিয়ে আমি ঠিক করব। যেখানে বিয়ে ঠিক করেছি, সেই সোহানের সাথেই বিয়ে হবে। এটাই শেষ কথা।”
ঘরের মধ্যে সবাই স্থির, কেউ জায়গা থেকে নড়ছে না। এই সময় হঠাৎ সব কণ্ঠকে ছাপিয়ে আরেকটি গলা গর্জে উঠল, খন্দকার আলফাজ উদ্দিন। তিনি কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরে বললেন,
— “মতিউর… তুই এখনও বুঝলি না, বিয়ে জোর করে হয় না। মেয়েটা বড় হয়েছে, ওরও নিজের মত আছে। নিজের পছন্দে জীবন গড়তে চাইছে, এতে দোষ কোথায়? আমি এই সংসারের বয়োজ্যেষ্ঠ। আমার জীবনে অনেক ভুল দেখেছি, অনেক ভাঙন দেখেছি। কিন্তু এবার আর দেখতে চাইনা। এই বিয়ে যদি কেউ না মেনে নেয়, তবুও আমি একাই দোয়া দেব। তুই তোর মেয়েকে ভালোবাসিস, এটা আমি জানি। তবে শুধু নিজের মত করলে ভাবলে চলবে না। ওর ভালোলাগা, ইচ্ছাকেও বুঝতে হবে।”
তিনি থামলেন। একনাগারে কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে গেছেন। নিঃশ্বাস নিলেন ধীরে, “মনে আছে? যখন শেফালীর বিয়ে ঠিক করেছিলাম, তখনও ভেবেছিলাম, আমার সিদ্ধান্তই সঠিক। তারপর তো সবকিছু তছনছ হয়ে গিয়েছিল… তা বুঝতে অনেক বছর লেগেছে। জীবন কারো ইচ্ছায় চলে না, জীবন নিজের ছন্দে বয়ে যায়। একটা সম্পর্ক তৈরি হয় মনের টানে, শরীরের জোরে নয়। তাই ওদের দুজনের ভালো-মন্দে তোমরা কোন কথা বলবে না। বাবা-মা হিসেবে পাশে থেকে সাহস যোগানোর চেষ্টা করো।”
উনার এই কথার পর কারোরই আর কিছু বলার থাকল না। একেকজন মুখে কুলুপ আঁটল। মেহুল সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও তো বিয়েটা করতেই চায় নাই। তারপরেও কীভাবে যেন হয়ে গেল…
কিছুক্ষণ আগে,
ইরশান মেহুলকে নিয়ে সরাসরি একটা ক্যাফেতে এসেছিল। এখানে ভিডিওকলে কথা হয়েছিল মিতুলের সাথে। বুদ্ধিটা ওর। ওর ভাষ্যমতে, বিয়ে হয়তো সবকিছুর সমাধান নয়, কিন্তু কখনও কখনও সেটাই একমাত্র সেতুবন্ধন। ইরশান আর মেহুল; ওদের এক হওয়া মানে শুধুমাত্র দুই পরিবারের মুখোমুখি হওয়া নয় বরং দুটি হৃদয়ের মিলনের ভেতর দিয়ে দুই পরিবারের পুনর্মিলন। সবশেষে মিতুল বলেছিল,
— “দেখ মেহুল, বিয়ে তো তোকে আজ নাহয় কাল করতে হবে। তবে এটাকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নে। আমি তোর বড় বোন, কখনো খারাপ চাইব বল? আমি তোকে বোঝালাম, বোঝানোর চেষ্টা করলাম। বাকিটা সম্পূর্ণ তোর ইচ্ছে। ইরশান অনেক বছর ধরে জার্মানি আছে, আমিও আছি। ওকে আগাগোড়া ভালোভাবে চিনি আমি। তোর জন্য পারফেক্ট, বুঝলি? শুধু পারফেক্ট বলেই বলছি না, তোদের দুজনের খুব প্রয়োজন এখন। এই দুই বাড়ির দেয়াল ভাঙার জন্য একজন মেহুল, একজন ইরশানের আবশ্যকতা বলেও বোঝাতে পারব না।”
মেহুল আছড়ে পড়ল চেয়ারটায়। চোখে উদ্বেগ আর মন ভেঙে যাওয়ার নিঃশব্দ ধ্বনি। ঠিক তখনই হাজির হলো একজন শান্ত, মমতাময়ী নারী; যার চোখে রয়েছে গভীর করুণা, আর মায়ার ছাপ। ইনি শেফালী ফুপু।
মেহুল অবাক! এতো বছর এই মানুষটিকে পরিবারের কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে? কেন? বাবার এত আত্ম অহংকার? এভাবে পরিবারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন? উনার সাথে মেহুলের কথা হলো। উনি বললেন,
— “বিয়ের ব্যাপারটায় তোমার মন রাজি নয়, তাইনা?”
মেহুল নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমি কাউকে ভালোবাসি না, কিন্তু জোর করে বিয়ে করতেও চাই না। এভাবে তো জীবন শুরু করা যায় না।”
শেফালী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
— “তোমার আব্বা একসময় আমাকে জোর করে একটা সম্পর্কে ঠেলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি তখন না বলেছিলাম। বলেছিলাম, ভালোবাসা বা সম্মান ছাড়া বিয়ে মানে শিকল পরা জীবন। তাদের কথার অবাধ্য হয়েছিলাম বলেই তো পরিবার থেকে দূরে। শুধু আমি একা না; শারমীন আপা, দুলাভাই, ইরশান সবাই।”
— “আপনি কীভাবে ওদের বিরুদ্ধে গেলেন?”
শেফালী মৃদু হেসে বললেন,
— “নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকা অনেক সাহসের কাজ। এবার তোমার হাতে সুযোগ আছে, অভিমান ভাঙার। তুমি যদি সম্মতি দাও তবে সব ঠিক হবে।”
মেহুল দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল,
— “সম্মতি মানে… ইরশানকে বিয়ে করা?”
— “হ্যাঁ।” শেফালী মাথা নাড়লেন, “তোমার চাওয়াটা যদি ঠিক থাকে আর ওর মনের দিকও যদি পরিষ্কার হয়।”
মেহুল অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— “ঠিক আছে, আমি রাজি।”
তবে ও ইরশানকে শর্ত দিল… বিয়েটা যেহেতু দুই পরিবারের জন্য তাই এটাকে তারা এগ্রিমেন্ট হিসেবেই ধরবে। যতদিন না পর্যন্ত দুই পরিবারের পুরোনো ঝামেলা মিটে যায়, ততদিন স্বামী–স্ত্রী হিসেবে থাকবে শুধু লোক দেখানোর জন্য। বাইরে সবাই যা খুশি ভাবুক, ওরা পরোয়া করবে না। কিন্তু বন্ধ দরজার ভেতর দু’জন দুই পৃথিবীর মানুষ। ইরশান তার মতো থাকবে, মেহুল ওর মতো। যেদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, সেদিন এই সম্পর্কেরও ডিশমিশ। কোনো ঝামেলা, কোনো দাবি, কোনো বন্ধন থাকবে না।
ইরশান এই শর্তে চুপচাপ রাজি হলো এবং তারপরেই সামান্য আয়োজনে বিয়েটা সম্পন্ন হয়। শেফালী এমুখো হয়নি, বিয়ে পড়ানো শেষে ফিরে গেছে।
.
ঘরে আলোটা ম্লান। মেহুল নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছিল। ওর চোখের জল এখনও শুকোয়নি। বিয়ের কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। “বিয়ে”… শব্দটা এত ভারী কেনো? এটা কি সত্যিই দু’জন মানুষের মিলন? কেউ বলেছিল, “বিয়ে মানে সারা জীবনের বন্ধন।” কিন্তু বন্ধন যদি ভালোবাসা ছাড়া বাঁধা হয়, তবে সেটা কি শৃঙ্খল নয়?
গতকাল অপরিচিত মানুষের একটা চিঠি এসেছিল। উত্তর দেওয়া হয় নাই। মন ভাল করার জন্য লিখতে বসল।
শ্বশুরবাড়ির প্রথম সকাল। শ্বাশুড়ি অনেকক্ষণ যাবত খেতে ডাকছেন। কেন যেন বিয়েটা তিনি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বামীর ভয়ে তটস্থ। জামাইকে হেলাও করতে পারছেন না।
ইরশান বেশ জামাই জামাই একটা ভাব নিয়ে ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়াল। মা-বাবা এখানেই উপস্থিত। একমাত্র আদরের ছেলেকে দেখেও কিছু বলল না উল্টো চোখমুখ শক্ত করে বসে রইল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিচ্ছু বলবেন না ছেলেকে। এতগুলো বছর বিদেশ থেকে পড়াশোনা করে এসে গতকাল যা অধঃপতনের কান্ড ঘটালো! তারপর আবার বড় মুখ করে কথা বলছে। নাহ, এ আর সহ্য করা যাচ্ছে না। সহ্য না করেই বা কি করবেন? একমাত্র ছেলে বলে কথা! তাতে অবশ্য ইরশানের কিছুই হলো না। সে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। চোখে গেল টেবিলে সাজানো এক সারি মিষ্টি পদের বাহারে…
কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই, সুজির হালুয়া, গাজরের হালুয়া, পায়েস, নারকেলের নাড়ু, কুলফি, বাদাম-কিশমিশে ভরা সেমাই, আরও কী কী যেন দেখা যাচ্ছে। সবই মিষ্টি, এত মিষ্টান্ন দেখে সকাল সকাল মাথা যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে একমাত্র শ্বশুরমশাইকে ডেকে উঠল,
— “আব্বা! একবার এখানে আসেন তো। এসব কি? আমাকে প্রথমদিনেই শুধু মিষ্টি খাইয়ে ডায়াবেটিস ধরানোর প্ল্যান করেছেন নাকি?”
মতিউর রহমান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। চোখ বড় বড় করে সদ্য পদপ্রার্থী জামাইয়ের দিকে তাকালেন। জামাই তো না, যেন আগুনের গোলা। ইরশান ফের বলল,
— “আব্বা, এসব তো বেবি ফুড। আমি কেন খাব? আমি তো বাচ্চা না। এগুলো রাখেন, যখন আপনার মেয়ের আর আমার বেবি হবে তখন খাওয়াবেন। আমার এখন আসল খাওয়া চাই; কাচ্চি বিরিয়ানি, রোস্ট, পোলাও কাবাবের মতো জামাই-যোগ্য কিছু দিন।”
মতিউর রহমান মুহূর্তেই লাল হয়ে গেলেন,
— “এটা কি বাপের হোটেল মনে করেছ যে সকালে কাচ্চি, রোস্ট, কাবাব খেতে হবে? শোনো মশাই, বিয়ে করে আমার ঘরে উঠেছ মানেই এই না যে রাজবাড়িতে এসে পড়েছো। সকালে যে মিষ্টি খাওয়াচ্ছি, এই ঢের। বিয়েই তো মানলাম না। এই আপ্যায়ন তো অতিথি হিসেবে।”
ইরশান আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু শারমীন কনুই দিয়ে ঠেলে দিলেন,
— “চুপ কর!”
আপাতত সময়ের জন্য ইরশান চুপ করে গেল। শ্বশুরমশাই খুব কিপ্টেমি শুরু করছে। নাহ, একটা শিক্ষা দিতে হবে তাকে। আলাভোলা জামাই সেজে থাকা যাবে না। চাটগাঁইয়া সে; হাত ভাঙবে তবুও মন ভাঙবে না, ঠেস দিবে মাগার প্রীতি হারাবে না।
সেদিন সকালে আরেকজন এসে উপস্থিত হলো। তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হলো তুতুলের। উঠোনে এমন অচেনা একটা ছেলেকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তুতুল এগিয়ে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
— “আপনি কে? এই বাড়ির কাউকে চেনেন?”
ছেলেটা বিনয়ীভাবে উত্তর দিল,
— “আজ্ঞে, আমি শাওন। ইরশান ভাইয়ের বন্ধু।”
তুতুল চোখ কুঁচকে বলল,
— “ভাই আবার বন্ধু? মাথার স্কুল ঢিলা নাকি?”
শাওন শান্ত স্বরে বলল,
— “জি না। আপনি কাইন্ডলি ভাইকে একটু ডেকে দিবেন?”
— “কিভাবে বুঝবো আপনি ভাইয়ার পরিচিত?” ওর কণ্ঠে সন্দেহ।
— “আপনি প্লিজ তাকে একটু ডাকুন।”
ছেলেটাকে দেখে কোনোভাবেই ডাকাত টাইপ মনে হলো না। তাই তুতুল ওকে ভেতরে নিয়ে এলো। এসে পড়ল মতিউর রহমানের সামনে। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন,
— “এই ছেলেটা আবার কে?”
তুতুল মিনমিন করে বলল,
— “বাবা, এটা ইরশান ভাইয়ের বন্ধু।”
— “বন্ধু? আমার বাড়িটাকে কি বন্ধুশালা মনে করেছে নাকি? আজকে এ, কালকে সে; যা মন চায় তাই করবে? এক বাঁদর দিয়ে হচ্ছিল না, আরেক বাঁদর এসে জুটেছে।”
তুতুল চুপ করে গেল। ইশশশ, নতুন একজন মানুষের সামনে বাবা কীসব বলছে? তিনি গজগজ করতে করতে ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, “চিড়িয়াখানা বানিয়ে ফেলবে আমার বাড়িটাকে। আসুক, চৌদ্দগুষ্টি নিয়ে আসুক। সাপ-বেজি, কেঁচো-কাঁকরি, গরু, ছাগল, মোষ, হাতি…”
উনি চলে যাওয়ার পর শাওন বলল,
— “উনার কি মানসিক সমস্যা আছে নাকি? মানুষের চৌদ্দগুষ্টি কেন পশু-প্রাণী হতে যাবে?”
তুতুল তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ধমক দিল। তারপর চুপচাপ পেছন পেছন ভেতরে আসতে বলল।
.
.
.
চলবে…..
#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৮]
~আফিয়া আফরিন
জনে জনে খবর দে,
জামাই এসেছে, জামাই এসেছে!
এইমুহূর্তে, দ্বিগুণ উল্লাসে,
মেহুল আমার বউ রে।
শশুরবাড়িতে উঠেছে তোলপাড়
জামাই এসেছে ধুমধাড়াক্কা আড়ম্বর!
শ্বশুর হাসে, শাশুড়ি খুশি,
শালীরা লাজে মুখ ঢাকে খুশখুশি!
সবাই বলে, এ একখান জামাই মাইরি
আমি বলি, শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি!
ইরশান এইবার আঁটঘাট বেঁধেই নামল। শ্বশুরমশাই স্পষ্ট ভাষায়
দিয়েছিলেন, “আমার সামনে কেউ এই ছেলেকে জামাই বলবে না। আমি ওকে জামাই বলে মেনে নিব না, দরকার হলে মেয়েকে ত্যাজ্য করব। যে মেয়ে নিজের বাবার সম্মানের কথা চিন্তা করে না, ওইরকম মেয়ে থাকার চেয়ে না থাকা ঢের ভালো।”
মেহুল এসব জানে না। শুনলে নিশ্চয়ই কষ্ট পেত। ইরশান চায় না তার জন্য, তার ছেলেমানুষি কর্মকান্ডের ফল মেহুল ভোগ করুক। তাই সকালের আলো ফোটার আগেই নেমে পড়ল প্ল্যান মাথায়। বাজারের পাশের ব্যান্ড পার্টিকে ধরে বলল,
— “ভাই, এমন বাজাবেন যেন পুরো কুমিল্লার সবাই জানে যায় যে আজ থেকে আমি খন্দকার বাড়ির অফিসিয়ালি জামাই।”
দু’ঘণ্টার মধ্যে পুরো গ্রাম কেঁপে উঠল ঢাক-ঢোলের তালে। বাদ্য বাজছে, বাচ্চারা দৌড়ে আসছে। ইরশানের সাথে শাওন আছে, শাওনের একটা চমকপ্রদ পরিচয় আছে যা আপাতত শ্বশুরবাড়ির কেউ জানে না। এই বাদ্য-বাজকদের সাথে ওরা দুজন মতিউর রহমানের দোকান পর্যন্ত এলো। আশেপাশের বাড়িঘর থেকে মহিলারাও উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। এমন পাগলামী তারা এই এলাকায় আগে কখনো দেখে নাই যে।
এই হুল্লোড় বাজারের রাস্তা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়লে তখন মতিউর রহমান তার আড়তের দিকে চললেন। পথে লোকজনের মুখে ঘটনা শুনলেন। তারা বিষণ্ণ কণ্ঠে বলছে,
— “ভাই, মেয়ে বিয়ে দিলেন? আমাদের একটুও জানালেন না, কী কষ্টের ব্যাপার। যাইহোক, মেয়ে সুখী হোক। জামাই যে ইরশান বাবাজি হবে, তা ধারণাও করতে পারি নাই। খুব ভালো ছেলে, খুউউব।”
কথাগুলো বিষগুঁড়ো হয়ে তার কানে লাগল। দ্রুত পা চালালেন। দোকানের সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হট্টগোল বেশ তীব্র। অনেক লোক জমেছিল, তারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে চপল চোখে সব দেখছে। মতিউর রহমানের চোখ বড় হয়ে গেল; ভেতরে ঢুকেই চমকে উঠলেন। তারই নিজের কাতারে, নিজের আসনে, যে জায়গায় তিনি দিনযাপন করেন, সেখানে আরামে পায়ের ওপরে পা তুলে বসে আছে ইরশান।
তার গায়ে ওটা কি? পত্রিকা কেটে শার্ট বানিয়েছে নাকি? শার্টের হাতা আবার কনুই পর্যন্ত গুটানো। তিনি বুঝলেন না, এই আজব জিনিসটা এত আঁটসাঁটভাবে গায়ে পড়ে আছে কীভাবে? জিন্সের প্যান্টও হাঁটুর কাছে ছেঁড়া। নাকি ওই অংশটুকু দর্জি সেলাই শেষ করতে ভুলে গেছে? গলায় একটা কালো চেইন ঝুলছে। চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে কফির মগ, চেহারায় স্বচ্ছতা, অদৃষ্ট হাসি; চারপাশ জুড়ে মানুষ, বাদ্য-বাজনা আর পাশে ওই বাঁদর বন্ধুটা… বেশ ভাবে আছে বোঝা যাচ্ছে।
তিনি মনে মনে বললেন,
— “এই ছেলে আমার রক্তচাপ বাড়িয়েই মারবে একদিন।” তিনি রাগটাকে বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারলেন না। এখানে তার যথেষ্ট সম্মান রয়েছে। এই ছেলে সেই সম্মান নিয়ে লুডু খেলছে। সাধের দোকানটাকে নাচের মঞ্চ বানাচ্ছে। সকলের উদ্দেশ্যে ধমক দিয়ে বললেন,
— “কি হচ্ছে এখানে? আমার দোকানটা কী সার্কাসের আড্ডাখানা নাকি? কি কৌতুক শুরু করেছ? এসব করার হলে অন্যকোথাও যাও, আমার এখানে এসেছ কেন? এটা একটা দোকান। এখানে লোক আসে কাজ করতে, হিসাব কষতে। তোমরা ঢাক-ঢোল বাজাচ্ছো? ছেলেখেলা হচ্ছে? এইরকম আচরণ… মন্টু, এই মন্টু, কোথায় গেলি?”
মন্টু নামের ছেলেটা দৌড়ে এলো। ও দোকানের সহকারী। ইরশানকে বলেছিল, এসব না করতে। কিন্তু সে মেহুল আপার জামাই, বেশি কিছু তো বলাও যায় না। ইরশান একটুও বিচলিত হলো না। সানগ্লাসটা নামিয়ে চারপাশে যেসব গাদা গাদা মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল, তাদের উদ্দেশ্যে দু’হাত উঁচু করে বলল,
— “মামা, চাচা, কাকা, খালুরা, আপনারা এখন আসেন। আমার শ্বশুরমশাই এসে গেছেন, এখন থেকে দোকানের কার্যক্রম পুরোদমে চালু হবে। আপনারা প্লিজ চিন্তা কইরেন না, পরে আবার আপনাদের সবার সাথে হই-হুল্লোড় করব।”
কেউ কেউ চুপচাপ মাথা নেড়ে চলে গেল, কেউ কৌতূহলে দাঁড়িয়ে রইল এরপরের কাহিনী দেখার জন্য। দোকানের ছেলেটা সামনে এসে সবার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল,
— “আচ্ছা ভাই, এখন সবাই একটু সরেন। একটু জায়গা খালি করেন।”
খানিকপর দোকান প্রায় ফাঁকা। বাতাসে শুকনো ধুলোর গন্ধ আর মতিউর রহমানের ভারী নিঃশ্বাস। ইরশান চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল, দু’হাত দিয়ে জায়গাটা ঝেড়েঝুড়ে দিয়ে সেই পুরনো উচ্ছল ভঙ্গিতেই বলল,
— “আব্বাজান! সিট ডাউন, প্লিজ। এতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলে প্রেসার বাড়বে। আপনি বসেন, আমি দোকানটা একটু গুছিয়ে দিই।”
ইরশানের মুখের চওড়া হাসিটা এমন যে, এতক্ষণ এখানে যা হচ্ছিল তাতে তার কোনো হাত নেই। মতিউর রহমান ক্যাটক্যাটে গলায় বললেন,
— “তোমাকে এসব করতে হবে না। কি শুরু করেছ তুমি? দিনকে দিন আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি।”
ইরশান চট করে কাঁধ উঁচিয়ে উত্তর দিল,
— “প্রমোশন করছিলাম। আপনার তো ভালোই হল, বিনা পয়সায় প্রমোশন পেলেন। মানুষজন এখন আপনার দোকান থেকে দোকানের খুঁটি পর্যন্ত চিনে গেছে। দেখুন, জামাই হিসেবে আমারও তো কিছু কর্তব্য আছে, না?”
মতিউর রহমান ভ্রু কুঁচকালেন,
— “মশকরা করো?”
ইরশান বিক্ষোভ নিয়ে বলল,
— “মশকরা করলাম? ছিঃ ছিঃ ওসব আপনার সঙ্গে করব কেন, আব্বাজান? এসব ছোটোখাটো পুঁটি মাছের মত বিষয় তো আপনার মেয়ের জন্য তুলে রেখেছি।”
মতিউর হতাশায় সেঁধে গেলেন। তিনি হঠাৎ করেই টেবিলের ওপর রাখা হিসাবের খাতাটা ধরে নিচে ফেলে দিলেন। খাতাটা বিচ্ছিরি শব্দ করে মাটিতে আছাড় খেল। তার কণ্ঠ এখনও কড়া,
— “আব্বাজান? আব্বাজান কাকে বলছ? খবরদার, আমার সঙ্গে কৌতুক করবে না। তোমাকে তো মেনেই নিলাম না এরমধ্যে মাথায় চড়ে নাচানাচি শুরু করে দিয়েছ একদম!”
ইরশান সরল মুখে তাকিয়ে বলল,
— “আব্বাজান, আপনি হয়তো এখনো নিজেকে ঠিক মতো দেখেননি। আপনার মাথার উপর আমি কোথায়? আমি যদি সত্যি মাথায় চড়ে নাচানাচি করি, তবে আপনি তো ঘাড় ভেঙে পড়বেন।”
তিনি তীব্র চাহনি নিক্ষেপ করলেন। ডাইনোসরের মতো; চোখ থেকে আগুন বেরোচ্ছে। কিন্তু ইরশান নির্লিপ্ত, মৃদু হাসি মুখে ধরে রাখল; ভঙ্গি বদলাল না। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে, শাওনকেকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল।
ইরশানের কীর্তিকলাপ কারোরই অজানা রইল না। সাজ্জাদুল আলম খুব হম্বিতম্বি করলেন কিছুক্ষণ। ছেলে উচ্ছন্নে চলে গেছে। কোথায় বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসে এখানে চাকরি করবে, নয়তো দুদিন থেকে ফিরে চলে যাবে; তা না করে ছেলে বিয়ে করে নিল! আচ্ছা ঠিক আছে, বিয়ে করেছে ভালো করেছে। কিন্তু এখন কি করছে? শ্বশুরের পেছনে কাঠি দিচ্ছে কেনো? ইরশান বাড়ি ফিরলে ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিবেন বলে ঠিক করলেন। খুব দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে… ছেলের বউ নিয়েই ফিরবেন।
ওদিকে ইরশানের কর্মকান্ডে সালেহা বেগম হেসে গড়াগড়ি! তুতুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “দেখলি আমার নাতিকে? তোর নাক-উঁচু বাপের নাক বোঁচা করে ছাড়বে এইবার।”
তুতুলও হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। ভাইয়া যদি ওকে সাথে করে নিয়ে যেতে তবে আরো বেশি মজা হতো। তা নয়, উল্টো ওই ছেলেটাকে নিয়ে গেল। হুহ, দেখতেই মন চায় না। বাবাকে মানসিক রোগী বলেছে কিনা!
.
আজ মেহুল আবার একটি চিরকুট পেল, অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মোটেও আশা করেনি আর কোনো উত্তর আসবে। দু’দিন ধরে কোনো চিঠি নেই, কোনো খবর নেই। ভেবেছিল, চিঠি আদান-প্রদানের গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ। আজ বিকেলের হাওয়ায় জানালার পাশে বসে থাকা অবস্থায় লাল ফুল গাছের নিচে সাদা কাগজটা দেখতে পায়। দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এসেছে। খাম খুলতেই সেই পরিচিত হাতের লেখা। একটু আঁকাবাঁকা, কিন্তু ভীষণ আন্তরিক।
চিঠিতে লেখা—
“আমার জীবনে একটা খুব সুন্দর ঘটনা ঘটেছে। সুন্দর ঘটনা বলছি, কারণ সেটা হচ্ছে বিয়ে। জানেন কেন সুন্দর? শুনুন… আমি একটি মেয়েকে ভালোবেসেছি তিন বছর, চার মাস, ছয় দিন, সতেরো মিনিট, বারো সেকেন্ড আর তিন ন্যানোসেকেন্ড ধরে। এখনও ভালোবাসি। সময়টা লিখলাম, কারণ ঠিক ওই মুহূর্তের পরেই আমার ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছে। দুঃখের বিষয়, সে আমাকে ভালোবাসে না। আচ্ছা, একটা উপকার করবেন? বলুন তো, একপাক্ষিক ভালোবাসা কি কখনও টিকে থাকে? শুধু আমি আর আমার মন জানে, কত বড় একটা ঝুঁকি নিয়েছি। জানি না, কতটা সফল হব। তবে চেষ্টা করব।
সফল হলে প্রথম আপনাকেই জানাব, কেমন?
পুনশ্চ: হয়তো খেয়াল করেছেন, আজ আপনাকে আপনি বলেছি। আসলে, বিয়ে হয়েছে তো… বউয়ের প্রতি এখন খুবই লয়াল হয়ে গেছি।
ইতি
অচেনা কেউ!”
চিঠিটা শেষ পর্যন্ত পড়ে মেহুলের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। তার মানে, চিঠিদাতা একজন পুরুষ। আর যেভাবে লিখেছে “একটা মেয়েকে তিন বছর চার মাস ছয় দিন…” তাতে মেহুলের মনে অজান্তেই প্রশংসার সুর জাগল।
কী সুন্দর! কেউ এতদিন ধরে কাউকে ভালোবাসে, এমন ধৈর্য! এমন নিষ্ঠা! ভালোবাসা মানে যদি সত্যিই অপেক্ষা হয়, তবে এই মানুষটা নিশ্চয়ই ভালোবাসাকে খুব গভীরভাবে বোঝে। ওর চোখের কোণে ম্লান ছায়া পড়ল। নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ভেতর থেকে। ও নিজে কাউকে ভালোবাসতে পারেনি… আর কেউ ওকেও তেমনভাবে ভালোবাসেনি!
তারপর একমুহূর্তেই মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। প্রেম হলো না, ভালোবাসা হলো না; সরাসরি বিয়ে হলো। নিজেকে এত সামলে রাখার পরেও শেষমেষ কিনা কপালে জুটেছে একটা উজবুক! যে সারাক্ষণ বাবার পিছে ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই তাকে কুপোকাত করতে চায়। আজকের ঘটনা শুনে মেহুলের মেজাজ গরম হয়ে গেছে। শত্রুতার অবসান ঘটাতে গিয়ে ওর জীবনে একটা শত্রু বেড়ে গেছে। মেহুল ছাদের দিকে পা বাড়াল। ওপর থেকে ভেসে আসছে গিটারের সুর আর ইরশানের গলার নরম ঝংকার। গান গাইছে… এই ছেলে কি সবসময় শুধু গানই গায়? আর কোন কাজ নাই? আচ্ছা কি করে সে? একেবারেই বেকার? ভালো করে এখনও কিছুই জানা হলো না।
তার কণ্ঠটা এমন যা শুনলে মন থেমে যায়। মেহুল দরজার আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে শুনছিল কিছুক্ষণ, তারপর পায়ের আওয়াজ তুলে এগিয়ে এলো সামনে। ইরশান থেমে গেল। তার চোখে চাওয়া। মেহুল জিজ্ঞেস করল,
— “কি হলো? থামলেন কেন?”
ইরশান একটু চুপ থেকে বলল,
— “তুমি এলে বলেই থেমে গেলাম। কিছু বলবে?”
— “বলার জন্যই এসেছি।”
— “আচ্ছা, বলো।”
মেহুল ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— “আগে গানটা শেষ করুন। আপনাকে এসেছি ধমক দিতে, তাই ধমক খাওয়ার আগে মনটা ফুরফুরে করে নিন।”
ইরশান মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— “সে আমি করেই নিচ্ছি। তবে একটা ব্যাপার জানো? আমার গান শোনার পর তুমি আর ধমক দিতে পারবে কিনা, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ হচ্ছে।”
মেহুল তীব্র চোখে তাকাল। বাহ! এক্কেবারে বাপের ফটোকপি; সেই চাহনি, সেই চোখের আগুন! কিন্তু এই আগুনের নিচে লুকিয়ে আছে কৌতূহল।
ইরশান গিটারের তারে হাত রাখল। হাওয়ায় ভেসে এল গিটারের নতুন সুর। মেহুল নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পাশে। ইরশান গান শুরু করল,
“Oh, I cannot explain, every time, it’s the same.
Oh, I feel that it’s real, take my heart. I’ve been lonely too long, oh, I can’t be so strong.
Take the chance for romance, take my heart
I need you so… There’s no time I’ll ever go. Cheri, cheri lady… Goin’ through a motion. Love is where you find it, Listen to your heart…”
সুরটা থেমে গেলে, চারদিকের নিস্তব্ধতা আরও গভীর হলো। মেহুল তাকিয়ে রইল ইরশানের দিকে। কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলার কাছে শব্দগুলো গিয়ে থেমে গেল। ইরশান হেসে বলল,
— “ধমক দিতে এসেছিলে তো? এখন দাও, আমি প্রস্তুত।”
মেহুল মুখ ফিরিয়ে নিল,
— “আপনি… আপনি এসব গান গেয়ে কী প্রমাণ করতে চান?”
— “কিছু না।”
— “একেবারে কিছুই না?” মেহুলের প্রশ্ন।
— “অনেককিছু।”
— “বলুন, কী কী?”
— “শুধু এটা বলতে চাই, সবসময় এত রেগে থাকো কেন? হাসলে কিন্তু তোমাকে ভীষণ মিষ্টি দেখায়। ওমন মিষ্টি একটা মুখ বাপের মেজাজ ধরে রাখতে চায় কেন?”
কথাটা শুনে মেহুলের বুকের ভেতর হঠাৎ কিছু একটা নড়ে উঠল। এইভাবে কেউ কখনও বলেছিল? একমুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই ছেলেটার মধ্যে অজানা কিছু আছে। চোখের গভীরে কিছু একটা আছে, যা মেহুল বুঝতে পারছে না কিংবা সে হয়তো বুঝতে দিতে চায় না। ও মুখের ভঙ্গিটা তীক্ষ্ণ রেখেই বলল,
— “এইসব সংলাপ দিয়ে মুগ্ধ করার চেষ্টা করবেন না, মিস্টার ইরশান।”
— “আচ্ছা।”
মেহুল দ্রুত সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। পেছনে রয়ে গেল ইরশানের কণ্ঠস্বর,
— “একদিন কিন্তু এই ছাদই সাক্ষী থাকবে, যখন তুমি নিজেই বলবে; থামলেন কেনো, গানটা শেষ করুন… আমার জন্য…”
মেহুল কথাটা শুনল না। থাক, সব ওকে শুনতে হবে কেনো? সব ওর জানতে হবে কেন? সব যদি ইরশান জানিয়ে দেয় তবে সেই ভালোবাসা মেহুল কি করে উপলব্ধি করতে পারবে? ওকে নিজ থেকে বুঝতে হবে নয়তো ইরশানের গত তিন বছরের সাধনা বৃথা যাবে!
আমিনা তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে পা রাখতেই মনে হলো, ইরশান কি খেতে পছন্দ করে, সেটা তো জানা নেই। “ইশশশ” নিজের সঙ্গে বলল, “ছেলেটা দুপুরেও কিছু খায় নাই। কী রাঁধব ওর জন্য?”
শারমীন কাছেই ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— “আপা ইরশানের কি পছন্দ?”
— “ঠিক নাই, যখন যা ইচ্ছে হয় তাই খায়।”
— “তাহলে এখন কি রাঁধবো?” আমিনাকে বিভ্রান্ত দেখায়।
— “যা মন চায় তাই। বিদেশ ভুঁইয়ে এতদিন যেসব খাবার খেয়েছে, তা এখানে কোথায় পাবেন?”
আমিনা খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,
— “তাহলে গরুর মাংসটা বরং ঝালঝাল করে ভুনা করে ফেলি। আপনি কি এখনও রেগে আছেন আপা? দেখেন আমরা মানি বা না মানি, ওরা বিয়ে তো করছে তাইনা? আল্লাহর পবিত্র কালাম সাক্ষী আছে। আমাদেরও জামাই। জামাইকে তো অবহেলা করা যায় না। আপনার ভাইয়ের স্বভাব তো জানেনই, কয়েকদিন এমন করবেই। দেখবেন, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের মধ্যে যে সমস্যাগুলো আছে, ওদের হাত ধরে সেটাও মিটে যাবে।”
শারমীন কিছুটা চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
— “হুমমম…”
.
তুতুলকে স্যার পড়াতে এসেছেন। ও বসার ঘরেই পড়তে বসে, স্যার নিয়ে ভেতরের ঘরে যাওয়ার অনুমতি নেই। সাধারণত সালেহা বেগম উপস্থিত থাকেন, কিন্তু আজ শরীরটা কিঞ্চিত খারাপ লাগায় আসতে পারেননি। তাই মেহুলকে আগে থেকে বলে গেছে, সামনেই বসে থাকতে। অচেনা ছেলেমানুষের ওপর কোনো ভরসা নেই তার। আজকাল স্যারেরা পড়ানোর সময় ফুঁসুরফাঁসুর করে, ছুঁকছুঁক করে, প্রেমের প্রস্তাব দেয়; সে তা খুব ভালোভাবে জানে। মেহুল ওই ঘরে যেতেই শাওনকে দেখে বলল,
— “ভাই, তোমার কি এখন কোনো কাজ আছে? যদি না থাকে, একঘন্টা এখানে একটু সময় দাও প্লিজ। তুতুলকে পড়াতে আসবে।”
শাওন সম্মত হলো। পড়ানোর সময় তুতুল পড়া বাদ দিয়ে শাওনের দিকে তাকিয়ে গজগজ করছিল। শাওন নিজের মতো বসেছিল; একধাপ পিছিয়ে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছিল। স্যার চলে যাওয়ার পর তুতুল শাওনের দিকে এগিয়ে এল। কোমর বেঁধে পেশাদার ঝগড়াটে কাকিমাদের ভঙ্গিতে বলল,
— “কি সমস্যা আপনার? আমাকে পাহারা দিচ্ছেন কেন?”
শাওন কিচ্ছু বলল না, শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তুতুল ফের দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “আপনার স্বভাব আমার পছন্দ হচ্ছে না। কি চান বলুন তো? লাইন মারার ধান্দা? আমি এসব খুব ভালো করে বুঝি। আমার সঙ্গে এসব করার চেষ্টাও করবেন না। পাত্তা দিবে না, একদম।”
শাওন এইবার উঠে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে, হেসে বলল,
— “তোমার নামটা খুব সুন্দর, তুতুল। একদম তুলতুলে টাইপ লাগে। বাট তুমি মানুষটা… একদম আনবিলিইভেবল!”
সে চলে গেল। তুমুল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। ছেলেটার সাহস কত বড়! ও বইখাতা ওইভাবেই ফেলে রেখে দৌঁড়াল।
ইরশানের জন্য এত আয়োজন করা হলেও সে কিচ্ছু মুখে নিল না। উল্টো জানাল, কিছুই খাবে না। সবাই অনেক বলল কিন্তু ইরশান শুনল না। রাতের বেলা সকলে যখন ঘুমিয়েছে তখন হঠাৎ খিদে পেল। রাত অনেক গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ, মাঝেমাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। বাড়ির বাতাসে ঘুম ঘুম নিস্তব্ধতা। এরমধ্যেই আচমকা দরজায় ঠাস ঠাস শব্দে মেহুল চমকে উঠল। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে দরজার দিকে গেল। দরজা খুলে দেখল, ইরশান দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে ঘুমের ভাব, মুখেও অনুতপ্তের ছায়া। ভুরু কুঁচকে মেহুল বলল,
— “কি চাই?”
ইরশান কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল,
— “খিদে পেয়েছে।”
— “তো আমি কি করব? তখন তো সবাই খেতে বলেছিল, ভাব দেখালেন। এখন কেন?”
— “তুমি আসলেই তোমার বাপের ফটোকপি। তোমাকে অন্তত ভালো ভেবেছিলাম।”
এই বলে ঘুরে দাঁড়াতেই মেহুলের বুকের ভেতর কেমন খালি খালি লাগল। রাতের এমন নীরবতায় কেউ নেই, আর তার খিদে পেয়েছে। সে কাউকে না ডেকে, ওকেই ডাকতে এসেছে। এরমধ্যে যে কতটা নির্ভরতা, কতটা অজানা টান আছে; তা মেহুল নিজে বোঝার চেষ্টা করল। তার অধিকার আছে বলেই তো মেহুলের শরণাপন্ন হয়েছে। পেছন থেকে ডাকল,
— “দাঁড়ান…”
ইরশান ঘুরে তাকিয়ে চোখে চিরচেনা দুষ্টুমি নিয়ে বলল,
— “কি হয়েছে, শ্বশুরকন্যা?”
মেহুল নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
— “আসুন দেখি, আপনার জন্য এখন কি ব্যবস্থা করতে পারি। এই রাতেরবেলা কী যে মুসিবতে ফেললেন।”
এলোমেলো চুলগুলো হাতখোপা বাঁধতে বাঁধতে ও রান্নাঘরের দিকে এগোল। তাল মিলিয়ে ইরশানও পিছু নিল।
.
.
.
চলবে…..
