Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়িশ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি পর্ব-৫+৬

শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি পর্ব-৫+৬

#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৫]
~আফিয়া আফরিন

চিঠিদাতা অপরিচিত! তবুও তাকে দারুন লাগল। যে এত সুন্দর করে মন বুঝতে পারে, তাকে খারাপ লাগার মত দুঃসাহস নেই। তবে জানে না, কে এই চিঠিদাতা? খানিক চেনা নাকি সম্পূর্ণ অচেনা? ভালো নাকি মন্দ? নারী নাকি পুরুষ। যাইহোক না কেন মেহুল উত্তর দিল, সেই একই জায়গায় নিজের লেখা চিরকুটটা রেখে দিয়ে এলো। যে আপাদমস্তক মন বুঝতে পারে না বলা সত্ত্বেও, তার জন্যও খুব ছোট্ট প্রকাশ রাখা উচিত।
মেহুল সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল। দক্ষিণের বারান্দার দিকে চোখ পড়তেই ইরশান দৃশ্যমান হলো। শরীরচর্চায় ব্যস্ত সে। সূর্যের মৃদু আলো শরীরের রেখায় পড়ছে। মেহুল নিজে অবচেতনভাবে ভেতরে বলল,
“ভাগ্যিস কাল ছিল… ওহো, তাকে তো সরি বলা হয়নি। চিনি খালা যেসব কথা বলছিল তা সত্যি লজ্জাজনক।”

মেহুল এগিয়ে গেল। বারান্দায় গ্রিলে পাখির চাহনি, বাতাসের দোল,
আর ইরশানের নিঃশব্দ মনোযোগ আকর্ষণের জন্য খুকখক করে কাশলো। ইরশান ঘুরে তাকাল। চোখে মৃদু কৌতূহল, মুখে অর্ধহাসি।
— “ওহ, আপনি… আচ্ছা, আপনি বলতে কেমন যেন লাগছে? তুমি বলব?”

মেহুল মাথা নিচু করে বলল,
— “আপনি শুনতে আমারও অস্বস্তি হচ্ছে। তুমিই বলুন। এছাড়া আমি তো বয়সে ছোটো।”
— “আচ্ছা।”
— “আপনাকে সরি বলতে এলাম।”

ইরশান খানিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “সরি? কেন?”
— “গতকালের জন্য। ধন্যবাদ তো দিয়েই দিয়েছিলাম। সরি তো পাওনা ছিলেন।”

সে মনে মনে হাসল।
— “আচ্ছা। ঋণী থাকতে পছন্দ করো না বুঝি?”
— “বিষয়টা ঠিক তা নয়।”

ইরশান ধীরে গ্রিলের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। তারমুখে বিনয়ী গম্ভীরতা।
— “আমার জানামতে, মেয়েরা সহজে সরি বলে না।”

মেহুল হেসে ফেলল। হাসির শব্দে দুটো নাম না জানা পাখি গাছের ডাল থেকে উড়ে এসে গ্রিলে বসল। ওর হাসিটা খুব সুন্দর,
— “সেটা তো ক্ষেত্রবিশেষে।”
— “ওকে।”
মেহুল বলার মত আর কিছু খুঁজে পেল না। অনেককিছুই জিজ্ঞেস করা যায়। কিন্তু ইচ্ছে করছে না। আবার হুট করে সামনে থেকে সরে পড়াও কেমন অভদ্রতামি! এইরকম একটা দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থা থেকে ইরশান নিজেই ওকে উদ্ধার করল। বলল,
— “ওই দেখো, তোমার বাবা। কোথায় যাচ্ছেন এই সকালে?”
— “বোধহয় দোকানে।”

ইরশান হঠাৎই উপর থেকে চেঁচিয়ে বলল,
— “মামা!”
নিচে দাঁড়ানো মতিউর রহমান মাথা তুলে তাকালেন। ইরশান তখন দু’হাত উঁচু করে ইশারায় দু’মিনিট দাঁড়াতে বলল। মামা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন।
ইরশান ঘরে ঢুকে গেল। একটু পর দরজা খুলে বেরোল একেবারে পাল্টে যাওয়া রূপে; কালো ট্রাউজার, সাদা টি-শার্ট, চুলগুলোও পানি দিয়ে ব্যাকব্রাশ করে নিয়েছে। দু’মিনিটের কথা বলে ঠিক দশ মিনিট পর নামল।
এই ছেলে আবার সেজেগুজে এসেছে কেন? দেখানোর জন্য? হোয়াই?
— “ফুলবাবু সেজে বের হয়েছে!” মতিউর রহমান বিড়বিড় করলেন।

ইরশান শুনেও নির্বিকার মুখে বলল,
— “কোথায় যাচ্ছেন? আমিও আপনার সাথে যাব।”

ইরশান গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
— “আপনি এখন আগুনে ঝাঁপ দিতে গেলেও আমি সেখানেই যাব।”

মামা হাঁ করে তাকালেন। তারপর গজরাতে গজরাতে হাঁটা শুরু করলেন। ইরশান পিছু চলতে চলতে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
— “আমার সাথে আপনাকে একদম মানাচ্ছে না মামা। এরকম লুঙ্গি-ফতুয়া পরে বেরিয়েছেন কেন?”

মতিউর রহমান থমকে দাঁড়ালেন। চোখ রাঙালেন,
— “তোমাকে কি তোমার মা-বাবা ভদ্রতা শেখায় নাই? অভদ্রের মতো ব্যবহার করছ কেন?”

ইরশান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
— “আর আপনাকে কি আপনার মা-বাবা নতুন কাপড় কিনে দেয় না?
কুঁচকানো ফতুয়া পড়ে আছেন কেন?”
বেয়াদব, চরম বেয়াদব… পথিমধ্যে তিনি আর কোনো কথা বলবেন না ভেবে সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের সময়টাই ভালো ছিল। আজকালকার ছেলেপেলেরা দিনকে দিন বেয়ারা হয়ে যাচ্ছে। বড়দের জন্য সামান্য সম্মানটুকু এদের হৃদয়ে অবশিষ্ট নেই।
মতিউর রহমান আর ইরশান ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছাল। আজকেও সালিশ বসেছে। সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে এরা হুলস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে বসে। গাঁয়ের মুরুব্বিরা গামছা কাঁধে পিড়িতে বসে আছেন, কারো মুখে পান, কারো হাতে কাঠের লাঠি। ইরশান ঢুকেই গম্ভীর মুখে চারপাশটা দেখে নিল। তারপর হঠাৎ বলল,
— “মামা, এটা কি দেশের মন্ত্রিসভা নাকি?”

একজন বৃদ্ধ বললেন,
— “বাপু, তুমি কেডা?”
— “কাকা আমি একজন নগন্য মানুষ। বুদ্ধিমানদের সান্নিধ্যে থাকতে ভালোবাসি। তাই তো আপনাদের সালিশে হাজির হয়েছি।”
মামা কটমট করে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। একটু পরেই নিজের জায়গায় বসতে গেলেন। ইরশানও ভদ্রভাবে পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
আরেকজন মুরুব্বি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “তুমি কি মতিউর সাহেবের আত্মীয়?”

ইরশান বলল,
— “জি কাকা, আমি উনার ভাগ্নে। তাও একমাত্র…”

মতিউর রহমান শক্ত মুখে নিজের কথা শুরু করলেন। বিষয়টা হচ্ছে, রমিজ মিয়ার গাভী নাকি ফরিদ উদ্দিনের ক্ষেতের ধান খেয়ে ফেলেছে।
এ নিয়ে তর্ক তুঙ্গে। একজন বলছে গাভী তার, আরেকজন বলছে ক্ষেত তার, কেউ কাউকে ছাড় দেবে না। ইরশান চুপচাপ একপাশে বসেছিল। মামার কথা শুনছিল। মাঝখানে বলছিল,
— “মামা আমি কি কিছু বলতে পারি?”

তিনি চোখ রাঙাচ্ছিলেন,
— “তুমি চুপ থাকো, এগুলা তোমার বোঝার বিষয় না।” বিষয়টা যেহেতু ইরশানের নাগালের না তাই সে কিছুক্ষণ চুপ করেই থাকল। তবে এখন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। আরেকটুখন অপেক্ষা করলে তো এরা মারামারি শুরু করে দিবে। কেউ পরিস্থিতি সামলাতে পারছিল না। হঠাৎই ইরশান উঠে দাঁড়াল। নরম গলায় বলল,
— “আমি একটা কথা বলতে পারি চাচারা?”

সবাই তাকাল। ছেলেটাকে দেখে কোনভাবেই গ্রামের মনে হয় না। উল্টো অভিজাত পূর্ণ মনে হচ্ছে। এই ছেলে আবার কি বলবে? ইরশান অবশ্য কারো মতামতের অপেক্ষা করল না। বলল,
— “গাভী যদি ক্ষেতের ধান খেয়ে থাকে তবে শাস্তি গাভীরই হওয়া উচিত, কিন্তু গাভী কি নিজের বিচার বুঝে? আপনারাই বলেন।”

গ্রামের মানুষ একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কিছু বলল না। ইরশান ফের বলল,
— “যদি ক্ষেত নষ্ট হয় কিংবা ধান, সেই ধান তো আবার গজাবে। এই সামান্য বিষয় নিয়ে যদি আপনারা এভাবে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করেন, তবে কি হলো? পরবর্তীতে গাভী বা ধান কি আপনাদের ঝামেলা মিটাতে পারবে? তাই আমি বলি, আপনাদের মধ্যে যার গাভী তিনি গাভীটা বিক্রি করে দেন আর আরেকজন জমির ধান বিক্রি করে দেন। টাকাটা দুইজন মিলে ভাগ করে বাচ্চাদের জন্য একটা ছোট স্কুল বানান।”

সবাই স্তব্ধ। এমন প্রস্তাব কেউ ভাবেইনি। ধান বিক্রি করবে? গাভী বিক্রি করবে? এর আগে তো সবসময় যার ধান খেয়েছে গাভীটা তাকে দিয়ে দেওয়া হত আর নাহয় সমপরিমাণ অর্থ দিত; এই ছেলে কি বলছে?
রমিজ মিয়া বলল,
— “স্কুল?”
— “হ্যাঁ, যাতে পরের প্রজন্মে আপনাদের মত বোকা বোকা বিষয়গুলো নিয়ে কেউ সালিশে না বসে। একটা শিক্ষিত সমাজ খুব দরকার।”

একমুহূর্তে সালিশের পরিবেশ বদলে গেল। বায়োজৈষ্ঠ্যেরা ইরশানের সাথে একমত। মতিউর রহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। এত বছর তিনি সালিশে আছেন, কোনোদিন এই সোজা বিষয়টা মাথায় আসে নাই। মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, ভাগ্নে তার বোন জামাইয়ের মতোই সাধারণ অথচ তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী। অবশেষে ইরশানের মতামতই মেনে নেওয়া হলো। আর গ্রামের নতুন স্কুলের জন্য শুধু তারা নয়, গ্রামের সকলে টাকা দিবে।
গ্রামের মানুষ মামার কাছে ভাগ্নের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মতিউর রহমান কিছুই বলছেন না। উল্টো বিরক্ত হচ্ছেন। সুসম্পর্ক থাকলে হয়ত খুশি হতেন। আইয়ুব আলী আর করিম চৌধুরীও বিড়ি জ্বালাতে জ্বালাতে ইরশানকে নিয়ে কিছু কথা বললেন। তিনি সেখানেও নির্বিকার রইলেন। মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, শারমীন এত বছর পর কেন এলো? কাকতালীয় নাকি কোনো কারণ আছে? থাকলে কি সেই কারণ?
.
সাজ্জাদুল আলম ও শারমীন বসে ছিলেন বসার ঘরে। চায়ের কাপ হাতে দুজনেই নীরব। হঠাৎ সাজ্জাদুল আলম বললেন,
— “আমরা যাচ্ছি কবে? তোমার আব্বা-আম্মার সাথে দেখা তো হলোই। যেখানে নিজের সম্মান নেই, সেখানে থেকে আর কাজ নেই।”
— “হুম।”

সাজ্জাদুল আলম নিজের ক্ষুব্ধতা ধরে রাখতে পারলেন না,
— “তোমার একমাত্র ভাইজান, একবারও কথা বলেছেন আমাদের সাথে? অন্তত ভদ্রতার খাতিরে বলা উচিত ছিল না? মুখ ফিরিয়ে রেখেছে এমনভাবে, যেন আমাদের চেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী আর দুটো নেই এই দুনিয়াতে।”

শারমীন চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
— “আহ, চুপ করো না। আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলছি। আজ কি আমাদের যেতে দেবে? তুমি ভাইজানের কথা এত ভাবছো কেন? বাড়ি কি তার? আমার মা-বাবা এখনও বেঁচে আছেন।”
— “তার কথাতেই সব চলে। যাইহোক, তার সম্পর্কে কিছু বলার ইচ্ছে নেই। তুমি আসতে চেয়েছ, নিয়ে এসেছি। ফেরার সময় তাল বাহানা করো না। ইরশানকে জানিয়ে দাও। আমরা আগামীকাল ফিরছি।”

শারমীন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরে তাকাল। দেখতে পেল, ইরশান আর তুতুল কোথাও যাচ্ছে। ওদের মধ্যে এখন বেশ ভাব হয়েছে। ইরশান এখন পর্যন্ত গ্রামের যা চিনেছে, যা দেখেছে সব তুতুলের সাথেই।
অন্যদিকে মেহুল একটু মুডি। মুখে বিশেষ কথা নেই। ইরশান আসার সময় ওকেও বের হওয়ার প্রস্তাব দিল, মেহুল মাথাব্যথার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেল। তবে ইরশানের কেন যেন মনে হলো, মনের গভীর থেকে মেহুল তাদের সাথে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বাঁধা দিচ্ছে।
ওরা দুজন গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটছিল। সকালের সালিশীর পর ইরশানকে সবাই চিনে গেছে। যারা চেনে নাই অন্তত নায় শুনেছে। আবার বয়োজ্যেষ্ঠরা একটু রসিয়ে চেহারার বর্ণনা দিয়েছে। যেমন, একদম রাজপুত্তুর। যেমন রূপ তেমন গুণ। হাসলে মনে হয়, মুক্তো ঝড়ে। তাই পথিমধ্যে যেই তুতুলের সাথে ইরশানকে দেখল সেই বলল,
— “কিরে! এটা কি আমাদের নতুন অতিথি?”

তুতুল থেমে থেমে শুধু তাদের প্রশ্নের জবাবই দেয় না, ইরশানের সাথে পরিচয়ও করিয়ে দেয়। একপর্যায়ে তুমুল, পথের ধারে দাঁড়িয়ে, উঁচু কণ্ঠে বলল,
— “ভাইয়া! আপনি তো সেলিব্রিটি বনে গেলেন। অটোগ্রাফ দিবেন না?”

পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইরশান নরম গলায় বলল,
— “অটোগ্রাফ? সাধারণ মানুষ আবার অটোগ্রাফ দেবে কি?”
— “দেখেন, সবাই আপনাকে রাজপুত্র বলছে। সাধারণ হলেন কোথায়?”
— “আগে রাজপুত্রের জন্য রাজকুমারীর ব্যবস্থা করো, তারপর দিচ্ছি।” সামনের গাছের গুঁড়িতে লাত্থি মেরে বলল ইরশান। রাজপুত্র আর রাজকুমারীর কথা শুনতেই তুতুলের মনে হঠাৎ মেহুলের চেহারাটা ভেসে উঠল। কোনোভাবে যদি ওদের মধ্যে একটা সেতু গড়ে ওঠে? যদিও দুজন দুপ্রান্তের। তবে একই ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়ায় মিল হতে দোষ কোথায়? আপার কত শখ ছিল, পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চেপে ওর জন্য কেউ আসবে… ইরশান ভাইয়া ওইভাবে না এলেও অপ্রত্যাশিতভাবেই এসেছে তো!
মেহুল আর ইরশানের মধ্যে সেদিন আরও দুবার চিঠি আদান-প্রদান হলো। বিশেষ কোনো কথাবার্তা না, এমনিতেই দুজন অচেনা মানুষের মধ্যে যেরকম কথা হয়। মেহুল অবশ্য তার পরিচয় জানতে চেয়েছিল। সে জানিয়েছে, হুট করে একদিন সামনে এসে উপস্থিত হবে। তবে হিন্টস দিয়েছে, মেহুল তাকে খুব সামান্যই চেনে তবে সে মেহুলকে পুরোপুরি চেনে। মেহুল শুধু ভাবছে, কে হতে পারে এই মানুষটা? তাকে নিয়ে কৌতুহল বাড়ছে বৈকি কমছে না।

বাড়ি ফেরার পর তুতুল মায়ের কাছে খুব করে বকা খেল অসময়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে টইটই করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। ও একেবারেই পাত্তা দিল না। দাঁত কেলিয়ে হেসে চলে গেল দাদির ঘরে। এখানে জমজমাট গল্প চলছে। আপা, দাদা, দাদি ফুপু, ফুপা, সবাই চারপাশে; হাসি-ঠাট্টায় একেকজনের চেহারা ঝলমল করছে। তুতুল সবার মাঝখানে ঢুকে বসে পড়ল। বড়দের কথার ফাঁকে ফাঁকে মেহুলকে বলল, আজ ও আর ইরশান ভাইয়া কোথায় কোথায় গিয়েছে। কী কী করেছে। মেহুল ততটা আকর্ষন বোধ করল না শুধুমাত্র ছোটোবোন আগ্রহ নিয়ে শোনাতে চেয়েছে বলেই শুনছে।

সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। চারপাশে পাখির ডাকে শান্ত গোধূলি ঘনিয়ে উঠছে। মেহুল ট্রেতে চা-নাস্তা সাজিয়ে বাবার সামনে রাখল। মতিউর রহমান কাপটা হাতে নিয়ে কথার বদলে শুধু মাথা নেড়ে “হুঁ” বললেন। মেহুল পাশে বসে খানিক কথাবার্তা বলল; আবহাওয়া, পাড়ার খবর, অতিথিদের কথা। কিন্তু তিনি প্রত্যুত্তর করলেন না। বেশ চুপচাপ। তিনি যে সত্যি শান্ত নাকি মনে মনে কোনো পরিকল্পনা আঁটছেন তা বোঝা যাচ্ছে না।
চুপচাপ সরে এসে মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনটা ভার হয়ে আছে, কিছু একটা ঠিক নেই কিন্তু কোথায় কী ঠিক নেই বোঝাও যাচ্ছে না। ছাদে উঠতে গিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতেই উপর থেকে গিটারের নরম টুংটাং আওয়াজ কানে এল। অচেনা সুর, মৃদু কাঁপা তারের শব্দ, সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় কেমন অন্যরকমভাবে মিশে যাচ্ছে। “ইরশান…” নামটা নিজের মনে ফিসফিস করে বলল। যাওয়া কি ঠিক হবে? ঘরের ভেতরেও তো বসে থাকা যাচ্ছে না। ঘরের আবহাওয়া ভারী। মা-বাবা মুখ কালো করে আছে। অতিথিদের দেখলেই কেমন ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে তাদের। মেহুলেরই লজ্জা লাগে…

ছাদে পা রাখতেই মৃদু বাতাসে ওড়না উড়ল। আকাশে তখন নরম গোধূলি, সূর্য ডোবার রেশ রয়ে গেছে। রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে আছে ইরশান, এক হাতে গিটার, চুলে বাতাসের ছোঁয়া; এলোমেলোভাবে কপালে গড়াগড়ি খাচ্ছে। গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে গাইছে,
— “Romeo, take me somewhere we can be alone,
I’ll be waiting, all that’s left to do is run…”

তার গলার স্বরটা নরম, গভীর, হৃদয়ের কোথাও একটা গিয়ে আঘাত করে। মেহুল থমকে দাঁড়াল। সামনে এই ছেলেটা; শান্ত, অচেনা, তবুও কেমন এলোমেলো লাগে।

— “It’s a love story, baby, just say yes…”
এই লাইনটা কনে আসতেই মেহুলের বুকটা কেমন কেঁপে উঠল। এত হৃদয়স্পর্শী! এতটা! ইরশান গান শেষে গিটার নামিয়ে নিল। মাথা ঘুরিয়ে মৃদু হাসল,
— “তুমি?”

মেহুলও হাসল,
— “অনেকক্ষণ এসেছি। আপনার গান শুনলাম। এমনভাবে, এমন সময়ে আর এমন সুন্দর করে গাইলেন, প্রশংসা করার মত ভাষা নেই। মন খারাপ করার মতো সুন্দর।”

ইরশান অবাক হলো। ভ্রু তুলে বলল,
— “মন খারাপের মতো? এটা এখন প্রশংসা, না অপমান?”
— “অবশ্যই প্রশংসা।”

ইরশানের চোখে কৌতূহল,
— “মন খারাপ কি সুন্দর হয় মিস মেহুল আফরোজ?”

মেহুল দূরে তাকাল, সূর্যটা তখন লালচে কমলায় মিশে যাচ্ছে। ধীরে বলল,
— “হ্যাঁ, ভীষণ সুন্দর হয়। শুধু উপলব্ধি করতে জানতে হয়। যখন কারও অভিমান, ভালোবাসা, আর না-বলা কথাগুলো একসাথে বুকের ভেতর জমে যায়, সেই অনুভূতির নামই তো মন খারাপ। যে মন জানে হারানো কেমন লাগে, সে-ই বুঝতে পারে সুন্দরটা কেমন গভীর।”

ইরশান তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। ওর দৃষ্টিটা মেহুলের মুখে থেমে রইল; চুপচাপ, কিন্তু মনোযোগী। মেয়েটার চিন্তা-ভাবনা অন্তর্ভেদী।
— “তাহলে মন খারাপও একটা শিল্প। এখন থেকে বরং মন খারাপ করেই থাকব। যদি কেউ তোমার মত বোঝার চেষ্টা করে।” মেহুল হো হো করে হেসে উঠল। এককোণে অবহেলে পড়ে থাকা গিটারের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আপনার গিটার টা আমায় একটু দিবেন? গান গাইতাম।”
— “শোনার অনুমতি আছে? থাকলে দিব।”
— “তবে শুনুন…”

গিটারটা হাতে নিয়েও মেহুলের গান গাওয়া হলো না। আমিনা ওকে নিচ থেকে ডাকছেন। ও তড়িঘড়ি করে গিটার রেখে দৌড়াল। ইরশান ওর গমন পথের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। এই বাড়ির মানুষগুলোর সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি… পরিকল্পনা কি তবে আগামীকাল বাস্তবায়ন করা যায়?
.
.
.
চলবে…..

#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৬]
~আফিয়া আফরিন

মতিউর রহমানের মুখে আজ হাসি ধরছেই না। যেন দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরে প্রাপ্ত আনন্দে মন ভরে গেছে। তার অনেক বড় কারণও আছে… আজ নিজে চেয়ারম্যান সাহেব তার ছেলের জন্য মেহুলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।
মতিউর রহমান কিছুক্ষণ অবাক হয়েছিলেন। এমন না যে এখনই মেয়েকে বিয়ে দিতে হবে তবে পাত্র দেখা হচ্ছিল কিছুদিন ধরেই। ভালো কোনো প্রস্তাব এলে ভেবে দেখা হতো। কিন্তু চেয়ারম্যানের প্রস্তাবটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত, লোভনীয়। তিনি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন। আনন্দে গদগদ হয়ে বললেন,
— “আমার মেয়ে যদি আপনার ঘরে যায়, সেটা তো আমাদের পরম সৌভাগ্য। তবে… দেখাশোনার ব্যাপারটা?”

চেয়ারম্যান হেসে উত্তর দিলেন,
— “মেহুল মা’কে আমরা ছোটবেলা থেকে দেখছি। এমন মেয়ে আলাদা করে দেখার কী আছে বলুন তো? বরং আপনারা বলুন, আমাদের সোহানকে নিয়ে কোনো পছন্দ-অপছন্দ আছে কি?”

মতিউর রহমান একটু লজ্জায় হাসলেন,
— “ছিঃ ছিঃ, কী যে বলেন! সোহান বাবাজিও তো আমাদের চোখের সামনে বড় হয়েছে। এমন ভদ্র, মার্জিত, শিক্ষিত ছেলে; এর বেশি কিছু চাইবার থাকে নাকি?”
— “তাহলে বিয়ের দিন-তারিখটা ঠিক করে ফেলি?”
— “হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই!”

চূড়ান্ত কথাবার্তা শেষে মতিউর রহমান মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ঘরে ঢুকেই খুশির সংবাদটা প্রথমে জানালেন মা-বাবাকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারা মোটেও খুশি হলেন না। মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে সালেহা বেগম বললেন,
— “মেয়েকে যদি ভাসিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে থাকে, তাহলে ওখানেই বিয়ে দিয়ে দে।”

মতিউর রহমান একটু অবাক হলেও কিছু মনে করলেন না। জানতেন, বয়োজ্যেষ্ঠরা সবসময় সবকিছু সহজে মেনে নিতে পারেন না। তার মন বলছে সোহানের মতো একটি শিক্ষিত, শহুরে ছেলের সঙ্গে বিয়ে হলে মেয়ের জীবনটাই বদলে যাবে। গ্রাম থেকে শহরে যাবে, নতুন পরিবেশ পাবে, ভালো ভবিষ্যৎ, নিশ্চিন্ত জীবন… একজন বাবা হিসেবে তিনি কি আর মেয়ের খারাপ চান? বড় মেয়ে মিতুলকেও তো নিজেই যোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
আশাবাদী মুখে তিনি খবরটা জানালেন আমিনাকে। যতটা আনন্দের আশা করেছিলেন, তারচেয়েও বেশি আনন্দিত হলো আমিনা। আর ওইদিকে মেহুল, ও বজ্রাহত। এক্ষুনি লাগাম টেনে ধরতে হবে। সোহানের মত এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করা মানে নিজের জীবন শেষ করে ফেলা। মেহুল ক্ষোভ নিয়ে বলল,
— “আমি মরে যাব তবুও ওই ছেলেকে বিয়ে করব না।”

মতিউর রহমান হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বুঝলেন না, মেয়ে এতটা রাগ করছে কেন? তিনি তো শুধু মেয়ের ভালোর জন্য একটা স্থায়ী, সম্মানজনক পরিবার চান।
শুধু মেহুল জানে, যার সঙ্গে বিয়ের কথা হচ্ছে সে সোহান আসলে এক নাম্বার লম্পট। বাইরে থেকে পরিপাটি, ভদ্র, শহুরে ছেলে কিন্তু ভেতরে? ভার্সিটির গেটে গিয়ে মেয়েদের ইভটিজিং করাই তার নিত্যদিনের কাজ! একবার তো মেহুলের বান্ধবীর ওড়না টেনেছিল। তারপর কীসব অশালীন কথাবার্তা বলে… ছিঃ। চেয়ারম্যানের ছেলে বলে প্রতিবার ছাড় পেয়ে যায়। কার সাধ্য আছে, ওদের বিরুদ্ধে কথা বলে নিজের মানসম্মান নষ্ট করার?

মেহুল কিছুতেই বাবাকে বোঝাতে পারল না। যত কথা বলছে, বাবা ততই গোঁ ধরছেন নিজের সিদ্ধান্তে। হতাশ হয়ে ও দাদির ঘরে ঢুকল। অনুরোধের সুরে বলল,
— “দাদি, তুমি একটু বাবাকে বোঝাও না। আমাকে যদি সৈকতকে বিয়ে করতে বলো, তাও রাজি আছি। আমি পড়াশোনা ছেড়ে নাহয় সংসার করলাম। কিন্তু সোহানকে পারব না দাদি, একদম না।”

দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখে অসহায়তা,
— “তোর বাবা আমাদের কথা কখনো শুনেছে? উল্টো বলবে, ‘আমার মেয়ের ভালো-মন্দ বুঝি আমি বুঝিনা?’ তোর বাবার এমন কথার উপর আমাদের আর কি বলার থাকতে পারে, বলত?”
ওই সময় পাশেই বসেছিল ইরশান। আজ ওদের ফিরে যাওয়ার দিন, তাই নানুর পাশে এসে বসেছিল। ঘটনাটা ইতিমধ্যে তুতুলের মুখে শুনেছে, আর শুনেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে এখন মেহুলের মুখ দেখে গম্ভীর সুরে বলল,
— “বাবা-মায়ের কথা শুনতে হয়, মেহুল।”

মেহুল ক্ষিপ্ত হয়ে তাকাল। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে,
— “আপনি চুপ করেন। বেশি বোঝেন, তাই না? এদিকে আমার জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেটা কিছু না? এই বিয়ে হলে আমি বিষ খেয়ে মরে যাব!”

ইরশান হেসে উঠল। ওর কথার ভেতরের যন্ত্রণাটা বুঝেও না বোঝার ভান করছে।
— “খুব ফিল্মি ডায়লগ দিচ্ছো তুমি। আজকালকার মেয়েরা ফিল্ম দেখে দেখে পুরো নাটক শিখে গেছে। বিটিভিতে চান্স নিয়ে দেখতে পারো।”
এমন সেনসিটিভ মুহূর্তে ইরশানের বিরক্তিকর কথায় রাগ লাগল। ক্রন্দনরত চোখ মুছে ও উঠে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কাউকে দরকার নেই ওর, যেখানে ইচ্ছে হয় চলে যাবে। দরকার হয়, ভেসে যাবে।
.
দুপুরের রোদের আলো বসার ঘরে নরম ছায়া ফেলছে। সাজ্জাদুল আলম পত্রিকায় চোখ রেখেছিলেন, এমন সময় পায়ের শব্দে চোখ তুলতেই মতিউর রহমানকে দেখলেন। তিনি সামনে এসে বসলেন। অনেক বছর পর এমন মুখোমুখি। দু’জনেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। কপালে ভাঁজ পড়ল। হয়ত মনে মনে ভাবছেন, “এই সাক্ষাৎ কি দরকার ছিল?”

মতিউর খানিক জোরে ডাক দিলেন কাউকে,
— “বসার ঘরে দু’কাপ চা দিয়ে যাও।” তারপর সাজ্জাদুল আলমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কি খবরাখবর? শুনলাম, আজ নাকি চলে যাওয়া হচ্ছে?”

সাজ্জাদুল আলম ধীর ভঙ্গিতে পত্রিকা ভাঁজ করলেন। একসময় তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় ছিল। আজ সেখানে সম্বোধন ছাড়াই প্রশ্ন বিনিময়? বাহ! ক্ষীণ হাসিতে বললেন,
— “হুঁ, কাজকর্ম আছে।”
— “মেহুলের বিয়ে ঠিক করে এলাম। খুব তাড়াতাড়ি। বিয়ে পর্যন্ত থাকলেই হতো।”

এইবার সাজ্জাদুল আলম ভুরু কুঁচকে তাকালেন,
— “শুনেছি। এটাও শুনেছি, মেহুল রাজি নয়।”

মতিউর রহমানের মুখের ভঙ্গি শক্ত হলো,
— “তাতে কি আসে যায়? মেয়ের জন্য আমি খারাপ চাইব?”
— “চাইতেও পারেন। অনেক বছর আগে তো শেফালীর জন্য খারাপটাই চেয়েছিলেন।”

মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। মতিউর রহমানের মুখে কঠোর রেখা পড়ল। বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,
— “খারাপ? সাব্বিরের সাথে শেফালীর বিয়ে হলে আজ ও কোথায় যেত তা জানো? সাব্বিরের অবস্থান দেখেছ, সাজ্জাদ?”
— “দেখেছি। আর এটাও দেখেছি, শেফালী ওইরকম জীবন চায়নি। আপনার মেয়েও চায় না। ভালো হয়…”

মতিউর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন,
— “ভেবেছিলাম, তোমাদের মেহুলের বিয়ে পর্যন্ত থাকতে বলব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, চলে যাওয়াই শ্রেয়। বহু বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর চাই না আমি।”
এটুকু বলেই তিনি উঠে গেলেন। সাজ্জাদুল আলম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নাহ, এই লোক ঠিক হওয়ার মত নয়‌।
শেফালী ছিল মতিউর রহমান আর শারমীনের ছোট বোন; নিজের নয় পালক। খন্দকার আলফাজ উদ্দিন একদিন ফেরীঘাট থেকে এই মেয়েটাকে পেয়েছিলেন। নৌকাডুবিতে ওর মা-বাবা মারা গেছে, তখন শেফালীর বয়স দশ-এগারো ছিল। ওকে নিয়ে এসে নিজের মেয়ের মতোই মানুষ করেছিলেন। তারপর শারমীনের বিয়ে হলো। সাজ্জাদুল আলমের সাথে শ্বশুরবাড়ি আসা-যাওয়া করত তার কিছু বন্ধু। তাদের মধ্যে একদিন এক বন্ধুর প্রেমে মজলো শেফালী… তার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল ইরশানের ডাকাডাকিতে। ছেলে এসে জানিয়েছে, কোনোভাবেই সে দুপুরের টিকেট ম্যানেজ করতে পারে নাই। কোনো সিট ফাঁকা নেই। বহুকষ্টে সন্ধ্যার টিকেট পাওয়া গেছে। সাজ্জাদুল আলম একটু বিরক্তবোধ করলেন। সন্ধ্যায় রওনা হলে তারা কখন গিয়ে বাড়ি পৌঁছাবেন? কত্ত রাত হয়ে যাবে! ওই সময়টা খুব রিস্কি। ইরশান মনে মনে স্বাগতিক্ত করল, “এত চিন্তা করে লাভ নেই। আজ বাড়ি যেতে পারো কিনা সেটা নিয়েই তো সন্দেহ।”

আজ চলে যাওয়া উপলক্ষ্যেই হয়ত আমিনা আর শারমীনের মধ্যেও টুকটাক কথাবার্তা হলো। আমিনার দিক থেকে তো কোনো সমস্যা ছিল না, কিন্তু স্বামীর কড়া নির্দেশ। একসময় দারুন সম্পর্ক বজায় ছিল। ইরশান হওয়ার পুরো সময়টা এই বাড়িতেই কেটেছে শারমীনের। ইরশান জন্মানোর দুমাস আগে মিতুল হলো। দুটো বাচ্চাকে নিয়ে তাদের পুরো বাড়ি আনন্দে ভরপুর ছিল। শেফালী, শারমীন, আমিনা; ভিন্ন চরিত্রের, ভিন্ন বয়সের, ভিন্ন প্রকৃতির, ভিন্ন সম্পর্কের তিনটি মানুষ হয়েও বাহ্যিক ভিন্নতা কাটিয়ে আত্মিক বন্ধনে বাঁধা পড়েছিল।
.
ইরশান’রা ফিরে যাওয়ার আর মাত্র চার ঘণ্টা বাকি। ঘড়ির কাঁটা একটু দ্রুত চলছে। দুপুরের আলো নিস্তেজ হয়ে এসেছে, বারান্দা জুড়ে রোদ আর বাতাসের টানাটানি। সেই সময়েই ইরশান মেহুলের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। আলতো করে দরজায় কড়া নাড়ল। ভেতরে প্রথমে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। একবার, দু’বার, তিনবার… অবশেষে ওপাশ থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজা খুলতেই মেহুলের মুখটা ভেসে উঠল। ওর চোখদুটো লালচে, মুখ ফুলে গেছে, গাল বেয়ে নেমে আসা শুকনো অশ্রুর দাগ মুছে যায়নি। ইরশান একমুহূর্ত চুপ করে রইল। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মেহুল বলল,
— “জি? কিছু বলার ছিল?”
— “তুমি কি সোহানকে বিয়ে করতে চাও?”
— “অবশ্যই না।” মেহুলের গলায় কাঁপুনি।

ইরশান তাকাল সোজা ওর চোখের দিকে,
— “তোমার নিজের পছন্দ আছে?”

মেহুল চুপ রইল। ঠোঁট নড়ল ধীরে,
— “না। কিন্তু…”

ইরশান গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
— “তাহলে চলো, মেহুল।”

মেহুল ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
— “কোথায় যাব?”
— “কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে।”

— “মানে? হেঁয়ালি করছেন কেনো? স্পষ্ট করে বলুন।” মেহুলের কণ্ঠে কৌতূহল।

ইরশান এইবার এক পা এগিয়ে এলো। তার গলায় কোমল তীব্রতা,
— “যেখানে অন্যেরা তোমার ভাগ্য লিখে দিতে চায়, সেখানে নিজে গিয়ে নিজের গল্পটা লিখে ফেলাই সবচেয়ে ভালো উত্তর। আজ যদি একটু সাহস দেখাও, তাহলে সবকিছু বদলে যাবে। চলো।”
মেহুল ইরশানের কথার আগামাথা কিছুই বুঝল না। তবে যা বুঝল তা হচ্ছে, সে নিশ্চয়ই বিয়ে ভাঙ্গার জন্য কিছু করছে। এই কারণেই যেতে বলছে। সেদিন চিনি খালার আনা প্রস্তাবেও প্রতিবাদ করেছিল। সে কোনো করছে এসব? তার স্বার্থ কি? মেহুল তো তার দীর্ঘদিনের পরিচিতও না। সম্পর্ক আছে ঠিক কিন্তু তাতেও ধূলোর আস্তরণ পড়ে গেছে। এই সম্পর্কে তো টান থাকার কথা নয়। মেহুল কারণটা জিজ্ঞেস করতে চাইল তবে তার আগেই বাতাসে জানালার পর্দা উড়ে এসে মুখ ছুঁয়ে গেল। সময় নিজেই ওকে তাগাদা দিয়ে গেল, “যাও…”
মেহুলের চোখে দ্বিধা, ভয়, বিস্ময়, আর অজানা বিশ্বাসের মিশেল। ইরশানের চোখে তীক্ষ্ণ দৃঢ়তা। দেখে মনে হয়, সিদ্ধান্ত সে আগেই নিয়ে রেখেছে। আর একটিও কথা না বলে সে এগিয়ে এলো এবং মুহূর্তের মধ্যে মেহুলের হাত টেনে ধরল। মেহুল এতটাই হকচকিয়ে গেল যে প্রতিবাদ করতেও ভুলে গেল। দু’জনের মাঝে শুধু তাদের দ্রুত নিঃশ্বাস আর দূরে পাখির ডাকে দুপুরের নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল।
বাড়িটা তখন ঘুমন্ত। দুপুরের রোদ ফিকে হয়ে এসে বারান্দার গ্রিল ছুঁয়ে শুয়ে আছে। ভেতরে সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষে ভাতঘুমে মগ্ন। শুধুমাত্র করিডোরে শোনা যাচ্ছে মৃদু পদধ্বনি, একজোড়া তাড়াহুড়ো পা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
ইরশান কোনোদিকে তাকাল না, কিছু বললও না। মেহুলকে সঙ্গে নিয়েই সোজা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। মেহুল অবাক, আতঙ্কিত। ওর মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে, “না, সোহানকে আমি বিয়ে করব না… কিছুতেই না।”

ওরা যে এইরকম হন্তদন্ত হয়ে কোথাও ছুটে গেল তা শুধুমাত্র বারান্দা থেকে তুতুল দেখল। ছুটে যেতে যেতে দু’জন হাওয়া। বিস্ময়ে ভরা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
— “এইমাত্র কি দেখলাম আমি? আপা… আর ইরশান ভাইয়া! ওরা দু’জন… একসাথে, এমন করে… গেল কোথায়?”

বিকাল নেমে এসেছে। যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে ইরশানের খোঁজ শুরু হলো। ফোনও বন্ধ। সাজ্জাদুল আলম আশেপাশে খুঁজে বেড়ালেন, উঠোন থেকে বাজার; কোথাও নেই। শারমীন চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন,
— “চলে আসবে, রাগারাগী করো না। আমরা বরং কিছুক্ষণ পর প্রস্তুত হয়ে থাকি। ইরশান তো নিজেই টিকিট এনেছে। জানে আমরা আজ যাচ্ছি। তবে আর কোথায় যাবে বলো?”
রাগারাগী করো না, কথাটা বললেও রাগ তো আর চুপচাপ বসে থাকল না। মতিউর রহমান ঘন ভ্রু কুঁচকিয়ে লোকদের মারফত খবর পাঠালেন, সদরের আশেপাশে যদি তাকে দেখতে পাওয়া যায় তাহলে যেন বাড়ি আসতে বলে। দু’দিন আগে গ্রামে এসেই তো পুরো গ্রাম আর মানুষগুলোকে একসাথে মাথায় তুলেছে। কার সাথে কোথায় উল্লাস করছে, কে জানে?
ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে গেছে পাঁচটা।মতিউর রহমান বললেন,
— “সাতটায় ট্রেন না? দেরি আছে। এত হইচই করলে হবে? ধৈর্য্য ধরো, চলেই আসবে।”
কথাটা যে তিনি সাজ্জাদুল আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তা উপস্থিত সকলেই বুঝে গেল। এদিকে তুতুল জানে, ইরশান ভাইয়া কোথায়। এখনও আপার খোঁজ পড়ে নাই। সবাই জানে, ওর মন খারাপ। নিশ্চয়ই ঘরে গিয়ে বসে আছে। তুতুল কিছুটা আতঙ্কিত, শঙ্কিত! ওদের দু’জনের হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাওয়াটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

সাড়ে ছয়টা পার হলেও ইরশান এলো না। এখন আর কোনোভাবেই তারা রওনা হতে পারবেন না। স্টেশন কমপক্ষে এক ঘণ্টা দূরে, সেখানে পৌঁছাতে পারলেও ট্রেন ধরা সম্ভব নয়।
রাগের বদলে এখন বাসার সবাই চিন্তায় মগ্ন। ইরশান কোনো বিপদে পড়েনি তো? এমন দায়িত্বশীল ছেলেটা কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ করে কোথায় যাবে?
মতিউর রহমান এইবার নিজেই খুঁজতে বের হলেন। তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে আশেপাশে দৃষ্টি মেললেন। ভাগ্নেকে এই কয়েকদিনে যথেষ্ট সতর্ক, সিনসিয়ার মনে হয়েছে… যদিও তার সাথে কথাবার্তা বলেছেন উদ্ভট ভঙ্গিতে, কাজকর্মও করেছে উল্টাপাল্টা; তাও মানুষকে তো চেনা যায়, তাইনা?

সাড়ে সাতটার পরে ইরশান আর মেহুল বাড়ি ফিরে এলো। পুরো বাড়ি তখন নিস্তব্ধ। চিন্তায় আজ উঠোনের আলোটাও জ্বালানো হয়নি। মতিউর রহমান একটু আগেই ফিরে এসেছেন, কোনো খোঁজ পাননি।
ওদের আসার খবর এখনও কেউ জানে না। উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল দু’জন। হঠাৎ উপর থেকে তুতুল দেখল ওদের। অবাক তো হলোই সাথে আনন্দে তিড়িং বিড়িং করে উঠল। উল্লাসের বাঁধ ভেঙে চেঁচিয়ে উঠল,
— “বাবা! বাবা! মা! কে কোথায় আছো? দেখে যাও, কারা এসেছে আমাদের বাড়িতে, আল্লাহ আমি তো বিশ্বাস করতে পারছিনা।”

ওর চিৎকারে তৎক্ষণাৎ সবাই বারান্দায় এসে ভিড়ল। উত্তেজনা আর বিস্ময়ে একেকজন অস্থির। মতিউর রহমান উপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে মেয়েকে দেখলেন; লাল শাড়ি, সাধারণের চেয়ে বেশি সাজগোজ, বিয়ের কনের মত সেজেছে কেন মেহুল? পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওটা কে? চশমা না থাকায় চোখেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন না। শুধু লম্বা, অবয়ব মত দেখতে পাচ্ছেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “মেহুল? তুই এমন সাজে? এইভাবে কার সাথে দাঁড়িয়েছিস? তোর পাশে কে ওটা?”

ইরশান ধীরে উপরের দিকে তাকাল। মুখে চওড়া হাসি রেখে বেশ ভদ্র কণ্ঠে বলল,
— “মামাজান ওরফে আব্বাজান, আমি আপনার মেজ মেয়ের একমাত্র বর। চিনতে পেরেছেন? ইর-শান তৈ-মুর, ফাদার-ইন-ল’স সন-ইন-ল’।”

মুহূর্তেই বারান্দার সমস্ত চোখ ইরশানের দিকে ঝুঁকে গেল। মতিউর রহমান বজ্রাহত, স্তব্ধ।
.
.
.
চলবে…..

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ