Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়িশ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি পর্ব-৩+৪

শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়ি পর্ব-৩+৪

#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৩]
~আফিয়া আফরিন

সকালের রোদটা পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকেছে। ডাইনিং টেবিলের উপর গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। শারমিন চশমা পরে মনোযোগ দিয়ে দৈনিক সংবাদ পড়ছিলেন। হঠাৎ পাশে রাখা টেলিফোনটা ঝনঝনিয়ে উঠল। তিনি পত্রিকা ভাঁজ করে ফোন তুললেন,
— “হ্যালো?”

ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ, প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে, তাড়াহুড়োয় বলল,
— “ম্যাডাম, আপনি কি খন্দকার আলফাজ উদ্দিনের মেয়ে? আপনার আব্বা… উনি খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলেছেন, এখনই দেখা না পেলে… উনি শুধু একটাই কথা বলছেন, ‘আমার মেয়েকে শেষবারের জন্য একবার দেখতে চাই, একবার।’ আপনি যদি পারেন, দয়া করে এখনই চলে আসবেন। তিনি বাঁচা-মরার মাঝখানে আছেন।”

শারমিনের শরীরটা হঠাৎ জমে গেল। হাতে ধরা ফোনটা ভারী হয়ে উঠল। এটার জন্য তিনি মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারলেন না। ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। ওপাশ থেকে ফোন কেটে গেল, ট্রিং… ট্রিং… শব্দটা থেমে গেল। তারপর হঠাৎ বুক ভেঙে বেরিয়ে এলো হাহাকারভরা কান্না। প্রথমে নিম্নস্বরে, তারপর ধীরে ধীরে অস্ফুট চিৎকারের মতো; বহু বছরের জমে থাকা শ্বাস, অভিমান, অপরাধবোধ, সব একসাথে ফেটে পড়ল।
কান্নার শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে দাবার ঘুঁটি সরানোর আওয়াজ থেমে গেল। ইরশান আর সাজ্জাদুল আলম তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলো।
— “কি হয়েছে?” সাজ্জাদুল আলম অবাক।

শারমিন চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙা গলায় বললেন,
— “ফোন এসেছিল… আব্বা… উনি খুব অসুস্থ…” কথাগুলো বলার সাথে সাথেই গলা আটকে গেল তার। তিনি আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শেষমেষ যা বললেন তার সারমর্ম বুঝতে কারোর অসুবিধে হলো না। সাজ্জাদুল আলম ধীরে বললেন,
— “কিন্তু আমি চাই না, তুমি ওই বাড়িতে ফিরে যাও।”

শারমীন চোখ মুছে, শক্ত হলেন। স্বামী আর ভাইয়ের মনোমালিন্যে অনেকগুলো বছর নষ্ট করেছেন। তিনি বেশ রূঢ় গলায় বললেন,
— “তোমরা থাকো। আমি একাই যাব। তোমাদের ঝামেলা এইবার বাদ দাও। আমার আব্বা অসুস্থ, মৃত্যুর মুখে… কত বছর তাকে দেখি না, জানো? হিসেব আছে? আমি আর তোমাদের মাঝখানে নেই। তোমরা থাকো তোমাদের মতো, আমি যাচ্ছি আমার আব্বাকে দেখতে।”
— “তুমি এখনই যাবে?”

শারমিন মাথা না তুলেই বললেন,
— “হ্যাঁ, এখনই।”
— “এই অবস্থায় একা যাওয়া ঠিক হবে না। ওরা যে তোমার সাথে কেমন আচরণ করবে, তা তো জানি না। এত বছর পরে তুমি হঠাৎ সেখানে গেলে…”

শারমিন এবার মুখ তুললেন। চোখ দুটো লাল,
— “ভয় আমার অনেক আগেই ফুরিয়েছে। এখন শুধু একটাই ইচ্ছে, শেষবারের মতো আমার আব্বাকে দেখা।”

সাজ্জাদুল আলম একটু চুপ করে থেকে বললেন,
— “সেই অতীত নিয়ে তুমি যতটুকু কষ্ট পেয়েছো, আমিও কম পাইনি, শারমীন। কিন্তু এখন সেখানে ফিরে যাওয়া মানে পুরোনো ক্ষত আবার খোঁচানো।”

— “তুমি না গেলেও আমি যাবই। অভিমান আমারও আছে, কিন্তু রক্তের ডাকের উত্তর না দিয়ে কীভাবে থাকি বলো?”
ইরশান পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। এই অপূর্ণ সম্পর্কের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি সম্পর্কে সে মোটামুটি জানে। জানাল, মায়ের সাথে নিজেও যাবে। ইরশানের যাওয়ার কথা শুনে মা-বাবা দ্বিধা নিয়ে একে অপরের দিকে তাকালেন। শারমিন থমকে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
— “তুই যাস না বাবা, এই অভিশপ্ত সম্পর্কের ছায়া আমি তোর ওপর ফেলতে চাই না।”

ইরশান এগিয়ে এসে বলল,
— “না মা, তুমি একা যাবে না। আমিও যাব সাথে বাবাও। আমাকে কেন নানাবাড়ির আদর থেকে বঞ্ছিত করে রেখেছ? দোষ তোমরা করেছ, আমি কেন ভুগছি? আমাকে যেতেই হবে। তোমরা নিজেদের ঝামেলা মিটিয়ে নাও নাহয় বহন করো, আমায় কিছু যায় আসে না।” ছেলের কথা শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ইচ্ছেয় ইরশানকে ওখানে নিয়ে যেতে মন সায় দিচ্ছে না। অনেক বছর আগে একটা ঘটনার সূত্রপাত ধরে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সবকিছুর শুরু হয়েছিল নিজের ভাইয়ের দিক থেকে। একটা ঘৃণ্য ভুল যার পরিণতিতে একমাত্র বনাইয়ের দিকে রাগে দা ছুঁড়ে মেরেছিল। তখন বাবাও কোনো প্রতিবাদ করেন নাই। তারপর থেকে সবকিছুই থেমে যায়। শারমীন বুঝেছিলেন, সম্পর্ক মানে শুধু রক্তের বন্ধন নয়; কখনও কখনও তা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই দিনটার পর থেকে তিনি পেছন ফিরে তাকাননি। পিতৃগৃহ, ভাই, আত্মীয়স্বজন, সব ছেড়ে গেছেন। তবুও আজ, এই বয়সে এসে যখন ফোনে শোনেন, “আপনার বাবা মৃত্যুশয্যায়।” তখন আর সেই অভিমান থাকে না। রক্তের টান এমনভাবে ডাকছে, যার প্রতিধ্বনি এড়িয়ে চলা অসম্ভব।
.
খন্দকার বাড়ির একমাত্র ছেলে হিসেবে এবং নামী বংশের গৌরব মতিউর রহমানের কাঁধেই গাঁথা। তাকে দেখলে কেউ সহজে বুঝতে পারবে না এই নিস্তব্ধ, অগোছালো গ্রামের প্রাচীন বাড়ির ভেতরে এমন এক মানুষ বাস করে; যার নাম শুনলে আশপাশের কয়েক গ্রাম থমকে যায় শ্রদ্ধায়। সুশিক্ষিত, মিতভাষী, পরিমিত জীবনযাপনে অভ্যস্ত মতিউর রহমান বংশের ঐতিহ্য আর নিজের মেধা, দুই-ই একসঙ্গে বয়ে বেড়ান।
বহু বছর ধরে স্থানীয়দের চোখে তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ, নিরহঙ্কার অথচ দৃঢ়চেতা মানুষ। গ্রামের জমি-জমার কাজ, আব্বার পুরোনো ব্যবসা আর এলাকার সামাজিক দায়িত্ব, সবমিলিয়ে দিন কাটে ব্যস্ততায়। লোকমুখে শোনা যায়, তিনি বাবার মতোই দৃঢ় কিন্তু মায়ের মতো কোমল। আর সবচেয়ে বড় কথা, খন্দকার নামের মান রাখতে
তিনি কখনো অন্যায়ের পাশে দাঁড়াননি।
আজ জমিজমা সংক্রান্ত একটা সালিশী বৈঠকে উপস্থিত হতে হবে তাকে। তাই দুপুর নাগাদ খাওয়া-দাওয়া করেই বেরিয়ে গেলেন। বৈঠকের আলোচ্য বিষয় অতি তুচ্ছ, দুই পরিবারের জমি সীমানা নিয়ে ঝামেলা। তিনি এমনভাবে দু’পক্ষকে বোঝালেন যে উভয়েই মাথা নিচু করে রাজি হয়ে গেল। বেশ হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে ঘটনার পরিসমাপ্তি টানলেন,
— “আরে মিয়া, জমি যায় আসে কিন্তু ইজ্জত গেলে ফেরে না। এখন যা করার, মিলেমিশে করেন।”
বৈঠক শেষে করিম চৌধুরী আর আইয়ুব আলীর সাথে বসলেন। দু’জনেই তার নিকট আত্মীয়, শালা আর সম্বন্ধী।

মেহুল এখন এমন এক বয়সে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে চারপাশের মানুষের একটাই কথা, “এখনো বিয়ে হচ্ছে না?”
আত্মীয়রা বলে, চিনি খালা প্রায়ই মা’কে টিপ্পনী ছুঁড়ে দেয়। আগে বিয়ের প্রস্তাব আসতো মাসে মাসে, তারপর সপ্তাহে, এখন প্রতিদিন। কেউ বলে, ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করে। কেউ বলে, বিদেশে আছে। কেউ আবার “পরিবারটা ভালো” বলে জোর দিয়ে যায়। মেহুলের কোনকিছুতেই শান্তি নেই। যেখানে যায়, যাই করে, এই “বিয়ে” শব্দটা চারপাশে মেঘের মতো ভাসে।
ওর চোখে বিয়ে মানে কেবল আচার বা সম্পর্ক নয়, সেটা গভীর দায়িত্ব যেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের পরিচয়ও টিকিয়ে রাখতে হবে। নিজের মনে বলে, “এমন কেন হয়? মেয়ে মানেই কি বিয়ের তাগিদে বাঁচতে হবে?” ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে সালেহা বেগমের কণ্ঠ ভেসে আসে,
— “মনি, চিনি যে ছেলের কথা বলল কাল তার পরিবার আসতে পারে। তুই ঘরেই থাকিস।”

মেহুল চুপ করে বসে থাকে। বাবা এলে উঠে যায়। তিনি এইসময় চা খান। মেহুল গিয়ে চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে। মেহুলের সাথে ওর বাবার সম্পর্ক মোটামুটি ধাঁচের। অবশ্য সবার সাথেই তাই। নিজের দাম্ভিকতা কিংবা গাম্ভীর্যের একটা দেওয়াল তিনি পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও তুলে রেখেছেন।
বড় মেয়ে মিতুল, সংসারিণী এখন। কথাবার্তা টুকটাক হয়। এখন তো উন্নত যুগ, কথা বলার নানান উপায় রয়েছে। মেজ মেয়ে মেহুল, ওর কাজ হচ্ছে বাবাকে চা বানিয়ে খাওয়ানো। সেই চা খাওয়ানোর সময়টুকুতেই টুকটাক যা কথাবার্তা হয়। আর তুতুল, ওর ব্যপার অন্যরকম। প্রচন্ড জেদী, যা বলবে তাই। মাগরীবের নামাজের পর উঠোনে একপাশে বসে আছেন মতিউর রহমান। চা হাতে তার পাশে এসে বসল মেহুল।
— “বাবা…” মৃদু গলায় ডাকল।
— “কি মা, মুখখানা এমন গম্ভীর কেন?”

মেহুল চোখ নামিয়ে বলল,
— “চিনি খালা আবার নাকি কোন ছেলের কথা বলছেন?”
— “তোর মা বলল। ছেলেটা নাকি ব্যাংকে চাকরি করে। ভালোই তো!”

মেহুল একটু চুপ করে থেকে বলল,
— “বিয়ে নিয়ে এখন ভাবতে ভালো লাগে না, বাবা। আমার আরও অনেক কাজ আছে।”

মতিউর নরম গলায় বললেন,
— “কাজ থাকবেই। কিন্তু সংসারও জীবনের অংশ। আমি তোকে জোর করব না, ওরা আসুক। এলেই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না।”
কিন্তু মেহুলের তো বারবার মানুষের সামনে সঙ সেজে বসে থাকতে ভালো লাগে না। ও কিছুটা অপ্রসন্ন হয়ে উঠে গেল।

ইরশান’দের আজ আর রওনা দেওয়া হলো না। ধর্মঘটের কারণে সবকিছু বন্ধ। শারমীন কেঁদেই যাচ্ছেন, কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না তাকে। কে হঠাৎ ফোন দিল? এমন ভয়াবহ দুঃসংবাদ দিতে হলো তাকে? এটুকু সময়ের মধ্যে যদি ভালোমন্দ কিছু ঘটে যায়? নাহ,‌ শারমীন আর কিছু ভাবতে পারলেন না। দমবন্ধ হয়ে আসছে তার। সকাল সকাল তিনি কি আর একমুহূর্তও অপেক্ষা করেন? ইরশান মাত্র ঘুমিয়েছিল, তাড়াহুড়ো করে ছেলেকে ডেকে তুললেন। দেশে আসার পর থেকে তার ঘুমের সমস্যা হচ্ছে। কিছুতেই ওখানকার সাথে শিডিউল মেলাতে পারছে না। এইমাত্র চোখটা লেগে গেল ওমনি মায়ের হাঁকডাকে ধরফড়িয়ে উঠে বসল। তারপর আর কোনোদিকে তাকাল না, সোজা ট্রেনে চেপে রওনা হলো কুমিল্লার উদ্দেশ্য। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এগারোটা বাজল। অনেক… অনেকগুলো দিন পর এই শহরে পা রাখা। শারমীন বোধহয় স্মৃতি থেকে কুমিল্লা নামটাই বাদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভব হলো না। হৃদয়ের অনিবার্য আহ্বান ঠিকই ডেকে এনেছে। ট্রেন থেকে নামার পর বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন। ছেলেবেলা অনুভব করার চেষ্টা করলেন। ওদিকে বাপ-ছেলেতে এসব পাত্তাই দিচ্ছে না। প্লাটফর্মে চা দেখলেই তাদের লোভী জিহ্বা লকলক করে উঠছে।
ইরশান ইচ্ছাকৃত দেরি করছিল। বেশ সময় নিয়ে চা খেল। দেরি করায় বিশেষ উদ্দেশ্যে নেই, তাও… শারমীন চরম বিরক্ত। একদিকে নিজের বাবার অসুস্থতা অন্যদিকে নিজের ছেলের ফাজলামি! অসহ্য হয়ে বললেন,
— “ইরশান, আমাদের যেতে আরও অনেকটা সময় লাগবে তো। বারোটা বাজতে মাত্র দশ মিনিট। এখন চল।”

ইরশান চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
— “তোমার বাপের বাড়ি গেলে আমাদের খেতে দেয় না দেয়, কে জানে? পেটের মধ্যে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। আমি আর আব্বু খেয়ে নিই। এখানে কোথাও একটা লোকাল হোটেল আছে, এরপর সেখানে যাব ভাবছি। দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিব। ওয়েট…”
— “আমার বাপের বাড়ি তোদের খেতে দিবে না? এমন কথা তুই বলতে পারলি আমার ছেলে হয়ে?”

ইরশান কাঁধ ঝাঁকাল,
— “সত্যি কথাই তো বলেছি। চিন্তায় আছি, বাড়িতে ঢুকতে দেয় কিনা। তাও ধরো, আমাদের উপর কৃপা করে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিল। কিন্তু খাওয়া-দাওয়ার একটা বিষয় আছে তো? আমি ক্ষিধে সহ্য করতে পারি না। পরে দেখা হলো, তোমার ভাইয়ের উপর চড়াও হলাম।”
— “আমার সাথে ফাজলামি করছিস?”
— “উঁহু। তোমার স্বামীকে নিয়ে যাও। তার শ্বশুরবাড়ি, খাতির-যত্ন করতে পারে। কিন্তু আমার কি? আমি পরে আসছি।”

সাজ্জাদুল আলম এতক্ষণ হাসলেও এখন খানিকটা অবাক হয়ে বললেন,
— “মানে? তুমি কোথায় থাকবে?”
— “আব্বু, দুনিয়াটা বেশ বড়। থাকার জায়গার অভাব আছে নাকি? তোমরা বেরিয়ে পড়ো। বারোটা পার হয়ে গেছে। পৌছাতে পৌঁছাতে তো অনেকটা দেরি হবে। একটু তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করো। নাহয় বেলা পেরিয়ে গেলে ওরা তোমাদের খেতে দিবে না।”

শারমীন রেগেমেগে বললেন,
— “আশ্চর্য, এরকম খাওয়া নিয়ে পড়েছিস কেনো? আমরা ওখানে খেতে যাচ্ছি? আমি আব্বাকে দেখব, কিছুক্ষণ থাকব; তারপর ফিরে আসব।”
— “ফিরেই আসতে হবে। তোমার যে মার্কামারা ভাই, দিবে থাকতে?”

মা-ছেলের তর্কাতর্কি অলিম্পিকের দৌড়ের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে সাজ্জাদুল আলম দু’জনকে থামালেন। স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিলেন শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে। ইরশানকে সাবধানে চলে আসতে বললেন। মা-বাবাকে বিদায় দেওয়ার পর সে আরও এককাপ চা খেল। এখানে কারো সাথেই ইরশানের পরিচয় নেই। থাকবেই বা কি করে? থেকে যাওয়ার কারণ হচ্ছে, এই এলাকাটা ঘুরে দেখা এবং এখানকার মানুষজন তার মামার সম্পর্কে কি বলে, তা জানা। অনেকদূর এগিয়ে এসেছে এখন বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে… একটা পা ভুল ফেললেই হিতে বিপরীত হতে পারে।
.
তুতুল অনেকভাবে চেষ্টা করছে, আপার মন ভালো করতে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। রেডিওতে পছন্দের রবীন্দ্রসঙ্গীতও ওর মন ভালো করতে পারছে না আজ। একটু আগে চিনি খালা এসে জানাল, সন্ধ্যার পর ছেলেপক্ষ আসবে। মনখারাপ করে দুপুরের খাবারটাও খেল না। উঠোনে এসে বসে রইল। ঠিক সেসময় দেখতে পেল দু’জন মানুষ এইদিকেই এগিয়ে আসছেন। মেহুল তাদের চেনে না। সেই তথাকথিত পাত্রপক্ষের কেউ না তো? উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল,
— “আপনারা? আমাদের বাড়িতে এসেছেন?”

শারমীন যেহেতু মেহুলকে কখনো দেখেননি কাজেই চিনতে পারলেন না। বললেন,
— “এটা তোমাদের বাড়ি হলে আমি তোমাদের বাড়িতেই এসেছি। আচ্ছা, তুমি? তোমার বাবার নাম কি?”
— “মতিউর রহমান।”

শারমীনের বুকের ভেতরটা আচমকা হুহু করে উঠল। এই মিষ্টি মেয়েটা তাই ভাইঝি? তিনি মেহুলকে টেনে গালে একটা চুমু খেয়ে সোজা ভেতরে পা বাড়ালেন। মেহুল অবাক! গালে হাত দিয়ে হা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইনি কি কোনোভাবে পাত্রের মা? পাত্রী পছন্দ হয়ে গেল বলে এইভাবে চুমু খেয়ে গেলেন? আজব! এটা কোন ধরনের অভদ্রতামি? উনার একা পাত্রী পছন্দ হলেই হবে? পাত্রীরও তো পাত্রকে পছন্দ হতে হবে নাকি?
মেহুল যেই মুহুর্তে গালে হাত দিয়ে তব্দা খেয়ে এসব ভাবছে সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে তুতুল হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলো। বলল,
— “আপা আপা, আমাদের ফুপু এসেছে। এসো তাড়াতাড়ি।”

মেহুল আরেক দফা অবাক! ফুপু মানে? ও দৌড়ে ভেতরে এলো। একটু আগে দেখা মহিলাটিকে দাদি জড়িয়ে কাঁদছে। তারমানে, এটাই ফুপু? মেহুল মাকে দেখল এককোণে মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে থাকতে। বাবা বাসায় নেই। থাকলে কি প্রতিক্রিয়া দেখাতো কে জানে? যাইহোক, এইমুহূর্তে দাদা-দাদি তাদের একমাত্র মেয়েকে পেয়ে কিছুতেই কান্না সংবরণ করতে পারছেন না। আরেকপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকটি নিশ্চয়ই ফুপা। মেহুল আর তুতুল এগিয়ে এসে সালাম দিল। তিনি অপ্রস্তুতবোধ করে সালামের উত্তর দিলেন।
আরেকটা আশ্চর্যের বিষয় হলো শারমীন এখানে এসে দেখলেন, তার বাবা দিব্যি সুস্থ-স্বাভাবিক। ফোনে তো শুনেছিল একেবারেই অন্য খবর! সেই দুশ্চিন্তাতেই তো তারা সব কাজ ফেলে ছুটে এসেছে। শারমীনকে বিভ্রান্ত দেখায়। সাজ্জাদুল আলম অবশেষে জিজ্ঞেস করলেন,
— “বাবা তো বেশ ভালোই আছেন… তাহলে ফোনে যে কথাগুলো বলা হলো, সেগুলো?”

ঘটনা খুলে বললেন তিনি। বাড়ির অন্যরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তাদের কেউই কিছু জানে না। তারা বলল,
— “আমরা তো কিছুই শুনিনি। কে ফোন করেছিল, তাও জানি না!”

তাহলে কাহিনীটা কী? কে ফোন করেছিল? কেনই বা এমন খবর ছড়ানো হলো? আপাতত ওই বিষয়টা এড়িয়ে গেলেন সকলে। আলফাজ উদ্দিন এসব শুনলেনই না। তার মেয়ে ফিরে এসেছে, এটাই বড় কথা।
ফুপু এসে এককোণে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুল আর তুতুলকে আবারও আদর করে দিলেন। ওরা কিছু বলতে পারল না, শুধু চোখদুটো ঝাপসা হয়ে গেল। দাদা উচ্ছ্বাসে বললেন,
— “কত বছর পর আমার ঘরটা আবার ভরে উঠল! ইরশান আসে নাই? কোথায় আমার নানাভাই, কোথায়?”

শারমীন হেসে উত্তর দিলে,
— “আছে, আব্বা। আসছে খানিকক্ষণ পর।”

সবাই কথা বলছে, হাসছে, স্মৃতি ফিরছে। কিন্তু এতকিছুর মাঝেও আমিনা চুপচাপ। শারমীন কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরল। আমিনা না চাইতেও হাসলেন। আলফাজ উদ্দিন মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে ঘরে চলে গেলেন।
তুতুল ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
— “এই আপা, ইরশান কে রে?”

মেহুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
— “আমি কি জানি? চিনি না তো।”

তুতুল মুচকি হেসে বলল,
— “মজা লাগছে তাই না? আমি তো ভাবছিলাম, ফুপুকে আর কোনোদিন দেখতেই পাব না।”
— “সত্যিই… চল, ছাদে যাই।”

ছাদে ওঠার আগে মেহুলের মনে পড়ল, আজ পাত্রপক্ষ আসবে। চিন্তা করতেই মনটা ভার হয়ে গেল। ওর অভ্যাস, মনখারাপ হলে লেখে। কখনো নিজের উদ্দেশ্য কখনো অন্যের… সবটাই হাবিজাবি।
ছাদের বাতাসে সন্ধ্যার গন্ধ। মেহুল কাগজ-কলম নিয়ে বসল। নিচের ঘরে হাসির শব্দ, আর উপরে ছাদের কোণে নিঃশব্দ এক মেয়ে,
নিজেকে কাগজে ছাপিয়ে দিচ্ছে… তারপর লেখা শেষে চুপচাপ চিরকুটটা ভাঁজ করে সেটাকে প্লেনের মতো বানিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই মৃদু হাওয়া বইল। সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল, “যদি কেউ পায়…”

তারপর চিরকুটটা উড়িয়ে দিল। সেটা বাতাসে ভেসে উড়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও। উড়তে উড়তে ছাদ পেরিয়ে নিচের রাস্তার দিকে নেমে এলো। সেই পথ দিয়ে ফিরছিল ইরশান।
হাওয়ায় ভেসে আসা কাগজের প্লেনটা তার পায়ের কাছে এসে ঠেকল।
সে থমকে দাঁড়াল। কৌতুহলবশত সেটা তুলে নিল। সাদা কাগজের ভাঁজ খুলতেই ভেতরে অচেনা হাতের লেখা। ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে দু’হাতে কাগজটা মেলে ধরল এবং পড়তে শুরু করল,
“আজ কিছুই ভালো লাগছে না। রাগ নেই, দুঃখও না… তবু কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঠিক নেই অথচ কী সেটা নিজেও জানি না। আমি জানি না এই লেখাটা কাকে লিখছি। হয়তো কাউকেই না… হয়তো শুধু নিজের ভেতরের ভারটা একটু হালকা করতে লিখছি। এটা কোথায় যাবে, কে পড়বে তাও জানি না। শুধু জানি, এই চিরকুটটা লিখে ছুঁড়ে দেব বাতাসে।
শুনুন, অপরিচিত মানুষ; মনটা ভীষণ বিষণ্ন, বুঝলেন? নিজস্ব কেউ থাকলে ভালো লাগত। আমি প্রতিটা মুহূর্তে কারো জন্য অপেক্ষা করি…
কেউ একদিন ঠিক আসবে। এমন বিশ্বাসেই মনটা সাজিয়ে রাখি, ঠিক গানের মতো সুর তুলে,
‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে…’

আচ্ছা শুনছেন? আপনি যদি কোনোদিন এই চিঠিটা পান, তাহলে উত্তর দেবেন। ঠিক আছে?

ইতি
মেহুল।
(পুনশ্চ: সত্যি যদি উত্তর দেন, তাহলে খন্দকার বাড়ির উঠোনে যে লাল ফুলগাছটা আছে, সেই গাছটার নিচে রেখে যাবেন উত্তরটা।”
.
.
.
চলবে…..

#শ্বশুরবাড়ি_মধুর_হাঁড়ি🧡 [পর্ব-০৪]
~আফিয়া আফরিন

মেহুল নিচে নামতেই মায়ের সামনে পড়ল। তিনি ব্যস্ত ভঙ্গিতে দৌড়াদৌড়ি করছেন। মেয়েকে দেখেই রেগেমেগে ধমক দিলেন,
— “এই মেয়ে, তোকে আমি কখন থেকে খুঁজতেছি জানিস? ঘরে মেহমান আসছে, কাজে হুঁশ পাচ্ছি না তারমধ্যে তুই কোথায় হারিয়েছিস?”

মেহুল চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, চুলের গোছা এখনো বাতাসে উড়ছে, মুখে সেই অবহেলিত গাম্ভীর্য। আমিনা ফের রেগে গেলেন,
— “একটু বাদেই পাত্রপক্ষের লোক আসবে, আর তুই ছাদে ঘুরে চুল উড়িয়ে বেড়াচ্ছিস? এখন এই সময়টা ঘুরাঘুরি করার? ঘরে গিয়ে দেখ তোর কাপড়চোপড় ঠিকঠাক করে এসেছি। তোর চিনি খালার লোকজন আসবে এখন। তোর বাবাও আসছে। জানিনা কী হবে? এরমধ্যে আবার নতুন এক অশান্তি। আর তুই, তুই যেন আগুনে ঘি ঢালিস না মা।”
একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলেন আমিনা। চোখেমুখে সামান্য ক্লান্তি, চিন্তার রেখা স্পষ্ট। মেহুল কিছু বলল না, কিন্তু ওর মুখের কোণে নীরব তাচ্ছিল্য খেলা করল। ও বুঝে ফেলেছে, “নতুন অশান্তি” বলতে মা যে নামটা না বলেই এড়িয়ে গেল তা আর কেউ নয়; ফুপু আর ফুপা। মেহুলের বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে
ওর কানে ফের মায়ের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভেসে এলো,
— “হায় আল্লাহ, এই সময়টায় ওরা আসতেছে। এমনিতেই এইদিকের অবস্থা সুবিধাজনক নয়, আবার একটা ঝড় উঠবে মনে হয়। আমি যে কোনদিক সামাল দিব, বুঝতেই পারতেছি না।”
মেহুল থেমে গেল সিঁড়ির ধাপে। মা দৃষ্টিগোচর হয়ে গেলে ও কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। চারদিকের নিস্তব্ধতায় আরও বিরক্ত হচ্ছিল।
মায়ের বকাঝকা, পাত্রপক্ষ, ফুপু–ফুপা; সবমিলিয়ে মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগোল সে। “একটু হাওয়া খাই।” নিজেকেই বলল।

দরজার নব ঘুরিয়ে বাইরে বেরোতেই ফাঁক দিয়ে একটা মুখটা ভেসে উঠল, অপরিচিত। মেহুল যেই মুহূর্তে দরজা খুলছে উনিও কলিংবেলে হাত রেখেছে ওমনি দরজা খুলে গেল। দুটো ঘটনার সংঘর্ষে দুজনেই থমকে গেল।
মেহুলের ভুরু কুঁচকে গেল। চোখের পলক থেমে গেল খানিকক্ষণের জন্য। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুণ। মেহুল তার চেহারায় একটা শান্তির ভাব দেখতে পেল যেন পৃথিবীর সমস্ত ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে এসে প্রশান্তির উপকূলে দাঁড়িয়েছে সে। মুখে না আছে বাড়তি হাসি, না আছে কোনো সংকোচ। শুধু চোখে অনির্বচনীয় স্থিরতা। বোধহয় অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু খুঁজছে; খুঁজতে খুঁজতে হয়ত আলো নামা বিকেলের কোমল রঙে এসে ঠেকেছে। কাঁধে গিটার। এমনভাবে তা আঁকড়ে রেখেছে মনে হয়, জীবনের প্রতিটি পথ সে এই গিটারের তার ছুঁয়ে মেপেছে। চুলগুলো সামান্য লম্বা, কপালে পড়ে আছে কয়েকটা এলোমেলো গোছা; হয়ত অনিয়মের মধ্যেও সে নিজের ছন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে।
তার উপস্থিতি ছিল একেবারে শান্ত নদীর মতো; নিঃশব্দ, কিন্তু গভীর।
যে নদী বহু দূরের মরুভূমি ছুঁয়ে এসেছে, তপ্ত বালির পথ পেরিয়ে এখন হঠাৎ একটা নীল জলপ্রপাতের নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে; একেবারে নিরব, অথচ তৃপ্ত।
মেহুল তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। এই মুখটার ভেতর ঠিক কী আছে তা বোঝা গেল না, কিন্তু তার শান্ত দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মানুষকে থমকে যেতে বাধ্য করে। ছেলেটার চোখের কোণেও বিস্ময়। মেহুল আরেকবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ওকে দেখে নিল। পরিপাটি পোশাক, শান্ত চেহারা, নম্র ভঙ্গি… এইসময় বাড়িতে শুধুমাত্র অতিথি বলতে পাত্রপক্ষরই আসার কথা তাই মেহুল ধরে নিল এই ছেলেটাই পাত্র। ও খুব অনুনয়ের সাথে বলে উঠল,
— “আপনি চিনি খালার ঠিক করা সেই পাত্র তাই না? দেখুন, প্লিজ, একটু বোঝার চেষ্টা করুন… আমি এইমুহূর্তে বিয়ে করতে চাই না। কিন্তু আমার বাড়ির লোকজন কিছুতেই সেটা মানছে না। দুদিন পরপর সম্বন্ধ নিয়ে বসে যাচ্ছে। আপনি তো দেখতে শুনতে ভালোই, মানে… মাশাল্লাহ! আপনার জন্য আরও ভালো, আরও সুন্দর মেয়ে নিশ্চয়ই আছে এই দুনিয়ায়। তাই আমার অনুরোধ আপনি নিজ দায়িত্বে আমাকেই রিজেক্ট করে দিন, আমি কিচ্ছু মনে করব না।”

মেহুল কথাগুলো একটানা বলে থামলো। উত্তরের অপেক্ষায় পাত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। এইদিকে ইরশান, কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে চাপা হাসি। কি বলছে এই মেয়ে? কোন পাগলের পাল্লায় পড়ল সে? কিন্তু মোটেও অস্বস্তিবোধ হচ্ছিল না। উল্টো মনে হচ্ছে, এইমুহূর্তে যদি গিটারটা হাতে তুলে নিতে পারত তবে এই মেয়েটার চিন্তিত চাহনির সুরেই গিটার বাজাতে শুরু করত। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে অবশেষে নরম গলায় বলল,
— “উম্ম… আমাকে দেখতে কি পাত্রের মত মনে হয়?”

মেহুলের চোখে-মুখে বিভ্রান্তি। অস্পষ্ট স্বরে বলল,
— “আপনি পাত্র নন?”

ছেলেটা শান্তভাবে উত্তর দিল,
— “আমি কি বলেছি, আমি পাত্র?”

— “ও আচ্ছা… সরি…” মিনমিন স্বরে বলল মেহুল, গলার স্বর কেমন যেন ভেঙে যাচ্ছিল। একটু থেমে আবার বলল, “তাহলে কার কাছে এসেছেন? আপনার পরিচয়টা জানতে পারি?”

ইরশান ঠিক তখনই মুখ খুলতে যাবে, এরমধ্যেই কয়েক হাত দূর থেকে ভেসে এলো চেনা চিৎকার,
— “এই এখানে কি করিস তুই!” চিনি খালা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন, মুখে ঘাম, গলায় তাড়াহুড়োর ছাপ। “তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন নিয়ে এসেছি। একজন তোর খালা-শাশুড়ি, আরেকজন তোর শাশুড়ি! আর তুই এখানে দাঁড়িয়ে অপরিচিত ছেলের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিস?”

মেহুল বিরক্তিতে তাকিয়ে রইল চিনি খালার দিকে। ওর মনে হলো, পৃথিবীর সব অক্ষর একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে, শাশুড়ি? খালা-শাশুড়ি? এখনই? চিনি খালার পেছনে দুজন ভদ্রমহিলা। পড়নে সুতি শাড়ি, মাথায় ঘোমটা, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ওদের এমন বাঁকা দৃষ্টি দেখে মেহুলের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ওর কপালে কি এমন দাজ্জাল শাশুড়ি জুটবে?
চিনি খালা আবারও গর্জে উঠলেন,
“চল ভেতরে চল! এই ছোকরাটা কে? এখানে কি করছে? আমাদের এলাকায় তো আগে কখনো দেখি নাই।”

ইরশানের কপাল কুঁচকে গেল। মেহুল বলল,
— “আমি চিনি না।”

সবাই একসাথে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ইরশান বলল,
— “কিন্তু আমি চিনি। আপনি হচ্ছেন মেহুল… মেহুল আফরোজ। এম আই রাইট?”
মেহুল হতবাক, চিনি খালাও অবাক, আর সেই দুই “শাশুড়ি” একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ইরশান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,
— “আর আপনি নিশ্চয়ই চিনি খালা? কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, আপনার নাম চিনি কে রেখেছিল?”

চিনি খালা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। ইরশান কথা চালিয়ে গেল,
— “আপনাকে দেখতে মিষ্টি কুমড়ার মতো, কিন্তু কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে নামটা হওয়া উচিত ছিল লাল মরিচ খালা।”

মেহুল না চাইতেই হেসে ফেলল। পরক্ষণেই চিনি খালার গম্ভীর মুখ দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল। উনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, এখনই কেউ দেশলাই ধরালে ফুঁস করে আগুন ধরে যাবে। চোখ কটমট করে বললেন,
— “এই ছোকরা! তোমার সাহস তো দেখি পাহাড় চূড়া ছুঁইছে। আমার নাম নিয়ে মজা করছ? জানো আমি কে? এই এলাকার সবাই আমাকে সম্মান করে। কেউ নামের দিকে তাকায় না, কাজের দিকে তাকায়!”

ইরশান মৃদু হেসে গিটারটা কাঁধ থেকে নামাল। উফফফ, গরম। লাল মরিচ খালার কথার তেজে সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। তিনি আরও গর্জে উঠলেন,
— “তুমি কে? এই বাড়িতে কিভাবে ঢুকলে? কে ঢুকতে দিল?”

মেহুল তড়িঘড়ি করে বলল,
— “খালা, খালা, প্লিজ! উনি বোধহয় বাবার কাছে কোনো কাজে এসেছিলেন। আপনি মাথা ঠান্ডা করুন।”

চিনি খালা সন্দেহভরা চোখে তাকালেন ইরশানের দিকে,
— “কাজ? তোমার কি কোনো লাইসেন্স আছে? আজকাল ছোকরারা কাজের নাম করে কত্ত কাণ্ড করে বেড়ায়।”

তর্ক-বিতর্কে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। ঝামেলার মূল হোতা ইরশান শান্ত মুখে সব দেখছিল। এখন কিছু বলা উচিত ভেবে এগিয়ে এলো। সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
— “শুনুন… মিস, ওর মিসেস চিনি খালা। আমি ইরশান তৈমুর, ফ্রম চট্টগ্রাম। আপনি এখানে একটা কাজে এসেছেন, সেটা বুঝতে পেরেছি। তবে কথাটা স্পষ্ট করে বলি, যে কাজে আপনি এসেছেন সেটা হবে না। কারণ, পাত্রী বিয়েতে রাজি নয়। নাও, ইউ ক্যান গো।”

চিনি খালার মুখের ভাব বদলে গেল। আর মেহুল? ও বিশ্বাসই করতে পারছে না। যাকে ও কিছুক্ষণ আগেও পাত্র ভেবে ভুল করেছিল, সে ওর ফুফাতো ভাই? কিন্তু কেন এরকম অনুচ্চারিত প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওর পক্ষে দাঁড়াল?
চিনি খালা এই ছোকরার সাহস দেখে হতভম্বের শেষ সীমানায় পৌঁছালেন। তাকে কেউ এভাবে কথার ধাক্কা দিচ্ছে, এ ঘটনা চৌদ্দগ্রামে নতুন! মেহুলও চুপ। উনি শেষবারের মত গর্জে উঠলেন,
— “তুই চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সব বুঝে ফেলেছি আমি। এই ছোকরার সাথেই নিশ্চয়ই তোর পিরিতের সম্পর্ক? তাই এমন বড় বড় কথা? দেখব, এই ছেলেই তোকে বিয়ে করবে কিনা। জীবনটা যখন ছিঁড়েছুঁড়ে পালিয়ে যাবে, তখন কিন্তু এই চিনির কাছেই ফিরতে হবে।
যাহ, যাহ। চলেন ভাবি, এইখানে আপনার ভালো ছেলের সম্বন্ধ করে লাভ নাই। দুনিয়াতে মেয়ের অভাব আছে নাকি?”

দুই পাশে দাঁড়ানো “শাশুড়ি মহোদয়ারা” হতভম্ব। শেষ কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে তিনি হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেলেন। মেহুল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, ইরশান দাঁড়িয়েই আছে। দৃষ্টিতে মায়ামিশ্রিত কৌতূহল, ছোট্ট বাচ্চাদের মত। মেহুল মৃদু হেসে বলল,
— “ধন্যবাদ। ভেতরে আসুন।”

ইরশান কিছু না বলে গিটারটা কাঁধে তুলে অন্দরে প্রবেশ করল। কতগুলো বছর পর আবার নানাবাড়ি পা রাখল। এই বাড়ির কিছু বিশেষ পরিবর্তন হয় নাই। হলেও ইরশানের বোঝার কথা নয়। এই বাড়ি ছাড়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র সাড়ে ছয়।
ইরশানকে দেখে সবাই খুশী। নানা-নানু হাসছে, কাঁদছে। মৃদু চাপা কান্নার সাথে মিলছে হাসির ঝিলিক। সেও লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। ওদের আবেশমিশ্রিত স্নেহের থেকে ছাড়া পেল অনেকক্ষণ পর। তারপর দেখা হলো তুতুলের সাথে। তুতুল হেসে বলল,
— “ভাইয়া, আপনি আমাকে চেনেন? আমি কে বলেন তো?”

ইরশান মুচকি হেসে বলল,
— “তুমি হচ্ছো এই বাড়ির ছোট্ট রাজকন্যা, তুতুল আমরিন।”

তুতুল অবাক,
— “আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?”
— “রাজকন্যার নাম জানতে আলাদা করে জানার প্রয়োজন হয় না, চোখে তাকালেই বোঝা যায়।”
আরেব্বাস, এই ভাইয়াটা তো একেবারে জোস! এটুকু সময়ের মধ্যেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল দুজনের।

এদিকে ঘরের ভেতরে আমিনা গভীর চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছেন। শারমীনের ফিরে আসা, এখন ইরশানের উপস্থিতি, মনের ভেতর অজস্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তারমধ্যে পাত্রপক্ষের কোনো খবর নাই। তিনি টেলিফোন তুলে চিনি খালার সাথে যোগাযোগ করলেন। ওপাশ থেকে সে যা-তা শুনিয়ে দিল। আমিনা চুপচাপ শুনলেন। স্বামী আসার অপেক্ষায় রইলেন। এইসব নাটকীয়তা অনেক আগে থেকেই দেখছেন। ওই ছেলে তো পুরোদমে বাপের মতোই। মানুষের বিয়ে ভাঙ্গা বোধহয় এদের বংশগত কাজ!

মতিউর রহমান বাড়ি ফিরলেন আরও অনেকক্ষণ পর। আগত অতিথিদের দেখে কিছুই বললেন না, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। এতটাই নির্বিকার রইলেন যে তাকে দেখেও বোঝার উপায় রইল না, তিনি ভাবছেন। ডেকে পাঠালেন ইরশানকে। ইরশান সামনে এসে কিছু না বলে সোজা মুখোমুখি বসে পড়ল। তিনি ভুরু তুলে তাকালেন। বেয়াদবিটা হজম হলো হলো না বোধহয়। জিজ্ঞেস করলেন,
— “তুমি ইরশান?”

ইরশান মুখে কিছু বলল না, ভদ্রভাবে মাথা নাড়ল। তিনি ফের বললেন,
— “আমার বাড়িতে এসে তুমি প্রথম বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কাজটাই করলে?”

ইরশান হাসি টেনে বলল,
— “ভাঙিনি মামা। শুধু বাঁচাতে চেয়েছি দুইজন মানুষকে, যারা নিজেরা বোঝে না তারা কিসে জড়িয়ে যাচ্ছে।”

মতিউর রহমান কপালে ভাঁজ ফেললেন,
— “তুমি খুব বড় বুঝনেওয়ালা বনে গেছ নাকি?”
— “না। শুধু দূরদেশে থাকাকালীন এবং পরিবার থেকে কিছু শিখেছি। জোর করে গাঁটছড়া বেঁধে দিলে সম্পর্ক থাকে না বরং বিশ্বাসটাই ভেঙে যায়। আর আপনার অনুমতি নিয়ে বলি, যে বিয়েটা আমি ভেঙেছি বললেন, ওটা তো এখনো গড়েই ওঠেনি। তবে ভাঙ্গার প্রসঙ্গ কেন আসছে বলেন তো? ভাঙ্গতে হলে, এতো চুপচাপ না; ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে ভাঙতাম।”

মতিউর রহমান শক্ত কণ্ঠে বললেন,
— “খুব কথা বলতে জানো।”
— “জি। তবে বুঝে কথা বলি, মামা। আজাইরা কথা বলার স্বভাব আমার ধাতে নেই।”
তিনি আর কিছু না বলেই উঠে গেলেন। ইরশান নিজের মনে মনে বলল,
“বাহ্ মামা, প্রথম দেখাতেই এমন চোখ রাঙানি। ভাবছিলাম, চা খাওয়াবেন উল্টো ঝাড়িই খাওয়ালেন। তবে ঠিকই আছে… আপনার ভাগ্নেও কম যায় না। কাল থেকে শুরু হচ্ছে, বিগত কয়েকদিনের বিশেষ ধারাবাহিক নাটক ‘মামা ভাগ্নে যেখানে আপদ-বিপদ সেখানে’। মিস মেহুল আফরোজ তুমিও এই নাটকের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছো। সো, বি রেডি।”
.
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই শুধু ইরশান বসে আছে জানালার ধারে, হাতে একটা কাগজ। মেহুলের লেখা চিঠির উত্তর না দিলে অনেককিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, অর্ধেক বাজানো সুরের মতো। সে পাল্টা উত্তর লিখে জায়গা মতো রেখে এলো কাগজটা।

পরদিন সকাল। মেহুলের কৌতূহল হচ্ছিল। মনে হলো, যদি সত্যিই কেউ কিছু লিখে রেখে যায়? ও নিঃশব্দে নিচে নেমে এল, দু’চোখে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে চারপাশে তাকাল। ঠিক গাছটার নিচে চোখ পড়তেই দেখল, একটা সাদা কাগজ। কম্পিত হস্তে ওড়নায় কাগজটা লুকিয়ে ঘরে ফিরে এলো। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসল। ভাঁজ খুলল। খুব পরিপাটি লেখা। পাতার কোণে মৃদু ভাঁজ, কালি ছড়ানো। যেন তাড়াহুড়োয় লেখা হয়নি, অনেক ভেবে লেখা হয়েছে।

“মেহুল,
তোমার নামটা লিখতে গিয়েও কিছুক্ষণ থেমে গিয়েছিলাম। কী বলে সম্বোধন করব বুঝতে পারছি না। অচেনা কাউকে ‘তুমি’ বলা ঠিক কিনা, তা এখনো ভাবছি। তবে অচেনা মানেই যে দূরের নয়, সেটা তোমার কারণেই বুঝছি। মানুষকে কখনও চোখে নয়, তার ভেতরের নীরবতায় চিনতে হয়। তোমার নীরবতায় আমি গর্জে ওঠা প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছি। এজন্য তোমার প্রতি একরকম শ্রদ্ধা জন্মেছে। আমি জানিনা কখনো তোমার দেখা পাবো কিনা! কিন্তু এই সন্ধ্যেটা আমার মনে থেকে যাবে; যেমন শীতের শেষ বিকেলের রোদ মনে থাকে,
একটু উষ্ণ, একটু মলিন, তবুও একদম সত্যি।

ইতি,
অচেনা মানুষ।
পুনশ্চ: তোমার মনটা কি ঠিক হয়েছে? যদি জানাতে ইচ্ছে হয়, তবে পুনরায় আরেকটা চিঠি ওখানে রেখে দিও।”
.
.
.
চলবে…..

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ