#পরী
পর্ব:০১
লেখিকা:-লিলি
রান্নাঘর থেকে মা বললেন, ২ টা ডিম কিনে আনতো,ভাজি করবো। সারহান বিরক্ত হয়ে জবাব দিলো,ঘরে রুই মাছ রান্না হইছে।চিংড়ি রান্না হইছে।এতো কিছুর পরেও আবার ডিমভাজি খেতে চায় কে?
সারহানের ছোট বোন বিভা খানিকটা চেঁচিয়েই বললো, তোমার বউয়েরই খাইতে মন চায় ভাই। আমাদের কারো এতো আবদার করার সাহস নেই।চান্দের দেশের থেকে আসছে সে।তাই,মাছ খায়না।
মা চোখ রাঙালেন বিভাকে।বললেন,আহ: নতুন বউ শুনবে তো।আস্তে কথা বলতে পারিস না!
মীরা সম্ভবত বিভার কথা শুনে পেয়েছে। মাথায় ঘোমটা টেনে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে সে।মাথা নিচু করে বলে,”মা… আপনার ছেলেকে বাইরে যেতে মানা করুন।আমি ঝোল দিয়ে খেয়ে নিবো। আর কিছু লাগবে না।”
মা কিছু বলার আগেই সারহান বললো,সমস্যা নেই আমি নিয়ে আসছি।তবে মাছ খাওয়ার অভ্যাস করবে।
সারহান খুব দ্রুত কথাগুলো বলে গটগট করে হেঁটে চলে গেলো।
বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পরছে।সারহানের বিয়ে হয়েছে ছয়দিন।এই ছয়দিনে তার খুব অদ্ভুত ১ টা রোগ হয়েছে।খালি সারাক্ষন মীরাকে দেখতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু,মীরা সামনে আসলেই চোখের দিকে তাকাতে পারে না।লজ্জা করে।কি অদ্ভুত কথা… নিজের বউকে দেখে বুঝি কারো লজ্জা পায়?মীরা এ নিয়ে তার সাথে ঠাট্টাও করেছে।২দিন আগে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা সারহান লজ্জাবতীর পুরুষ বাচক শব্দটা কি জানো?
সারহানের এমন লজ্জা লাগলো!
কত মেয়ে বন্ধু ছিলো কলেজ লাইফে, ভার্সিটি লাইফে।কই তখন তো এমন হয়নি….
.
মীরার আর সারহানের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ।সারহানের তেমন কোনো মনের মানুষ ছিলো না।তবে কিশোর বয়সে সে ১টা পাহাড়ি মেয়েকে ভালোবেসেছিলো।তখন তার বাবার পোস্টিং ছিল চট্টগ্রামে।মেয়েটা সারহানের স্কুলেই পড়তো।কি ঘন আর লম্বা চুল মেয়েটার মাথায়!সারহান তাই নাম দিয়েছিলো, মেঘবতী।মেঘবতীও হয়তো তাকে ভালোবাসতো। কিন্তু,সেই ভালোবাসা স্থায়ী হয়নি।কারন,মেয়েটা বৌদ্ধ ছিল।বাবা প্রচন্ড রাগ করেছিলেন সারহানের উপর।হয়তো,মেঘবতীর পরিবারেও একই হাল হয়েছিলো! সে যাই হোক,কিশোর হৃদয় ভেঙে যাওয়ার পর সারহান ভেবেছিলো, জীবনে আর কাউকে বোধহয় ভালোবাসতে পারবে না।পরবর্তীতে অনেক প্রপোজাল পেয়েও কোনোটাই আর গ্রহন করেনি সে।
শেষে বাবা মীরার সাথে বিয়ে ঠিক করলো।সে একপ্রকার বিনাবাক্যেই মেনে নিয়েছিলো। মীরার ছবি দেখতে দেওয়া হলো যখন, না চাইতেও তার অবচেতন মন আশা করেছিলো,মেয়েটা মেঘবতীর মতোই দেখতে হবে।কিন্তু, না।ছবিতে সে দেখলো মীরার মাথায় নুডুলসের মতো কোঁকড়ানো চুল, যা তার ঘাড় অবধি নেমে এসেছে।চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলো। ভেবেছিল, কোনোদিন কি এই মেয়ের জন্য কোনো কিছু অনুভব করতে পারবে?যেমনটা মেঘবতীর জন্য করতো….
কিন্তু, বিয়ের পরপরই ১টা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো।মীরা আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই কাঁদছিলো বিয়ের পর বিদায়ের মুহুর্তে অর্থাৎ, শ্বশুর বাড়ি আসার সময়।তখন,মীরার কান্না দেখে সারহানের এমন মায়া লাগলো!মনে হলো,তার খুব কাছের একজন মানুষ কাঁদছে। খুব মন চাইলো,হাতটা ধরে বলতে,আর কেঁদো না প্লীজ।
মাত্র ৩বার কবুল বললেই সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা মানুষ বুঝি এতো আপন হয়ে যায়?মীরাও তাকে বাসর রাতে একই কথা বলেছিলো,আপনাকে আজকেই প্রথম দেখলাম অথচ মনে হচ্ছে কত দিনের চেনা।
সারহানের মনে হয়েছিলো,,
এই ভালোবাসা অবশ্যই স্রষ্টা প্রদত্ত….
.
বিভা বললো,দেখলা মা তোমার ছেলের কান্ড?এখন যদি আমি কিছু আনতে বলতাম তাহলে সিংহের মতো গর্জন করে উঠতো।কিন্তু, বউয়ের সামনে বিলাইয়ের মতো মেও মেও করছিলো।২ দিন হয়নাই বিয়ে হইছে এখনই বউ এত আপন হয়ে গেলো….
মা বললেন,আহঃ বিভা তুই কি চাস সারহান নতুন বউয়ের সাথে ঝগড়া করুক?
-তুমি চুপ থাকো মা।রাগে আমার গা জ্বলে যায়। আমার বান্ধবী নয়না কি কম সুন্দর ছিল?তার সাথে তোমরা ভাইয়ার বিয়ে দিলে না।এখন তো ঘরে আনছো বিশ্বসুন্দরী হুহ। নুডুলসের মতো চুল। দেখলেই আমার বমি বমি আসে।
মা বললেন,নয়নাকে তো আমারও ভালোই লাগতো। কিন্তু, তোর বাবাই তো মীরাকে পছন্দ করলো…..
.
সারহান বাসায় ফিরেছে ডিমের সাথে ৬ ডজন কাঁচের চুড়ি নিয়ে।
রুমে এসে সে দেখলো মীরা ১ টা কাগজ হাতে নিয়ে পড়ছে।সারহানকে দেখে সে কাগজ টা লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করলো শাড়ির আঁচলে আড়ালে।সারহান জিজ্ঞেস করলো,কি ওটা?
মীরা বললো, বাবার ওষুধের প্রেসক্রিপশন।
সারহান সত্য-মিথ্যা যাচাই করলো না। মীরার দিকে চুড়ির প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলো।
মীরা জানতে চাইলো ,কি এর মধ্যে?
-খুলে দেখো কি…
জবাব শুনে মীরা খুললো।তবে,কাঁচের চুড়ি দেখে তার চেহারার তেমন কোনো পরিবর্তন হলোনা।
সারহান ফেসবুকে অনেক পোস্ট দেখেছে এমন যে মেয়েদের কাঁচের চুড়ির থেকে প্রিয় আর কিছু নেই।সে ভেবেছিল মীরা প্রচন্ড খুশি হবে।কোন শালারা যে এসব ভুলভাল কথা লেখে ফেসবুকে!
মীরা সারহানকে হতাশ হতে দেখে কিঞ্চিৎ হেসে বললো, কাঁচের চুড়ি দিয়ে কি আর ডাক্তার পটানো যায় বলো মিস্টার লজ্জাবতী।অবশ্য আমি যদি নাইন-টেনে পড়ুয়া কোনো মেঘবতী হতাম তাহলে খুশিতে লাফ-ঝাঁপ দেয়া শুরু করতাম এতোক্ষণে।
সারহানের কান লাল হয়ে গেলো লজ্জায়।মীরা এসব জানলো কি করে? পরক্ষনেই সে বুঝতে পারলো আসলে, মীরা যেটা পড়ছিল সেটা কোনো প্রেসক্রিপশন নয়, তার লেখা পুরানো চিঠি।সম্ভবত মেঘবতীর কাছেই লিখেছে সে।সব তো ফেলেই দিয়েছিল।প্যাঁচ লাগানোর জন্য এটা আবার কোন ফাঁকে রয়ে গেছে….
সারহান ব্যস্ত হয়ে বললো, তুমি খারাপ কিছু ভেবো না। আমি তখন ছোট ছিলাম।হাবা ছিলাম।
মীরা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বললো,থাক কিছু বলতে হবে না। বুঝেছি…..
সারহান বললো,আরে ঐ মেয়ের চেহারাও আমি ভুলে গেছি।সত্যি।আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।
মীরা হেসে ফেললো।বললো,দাও চুড়ি পরিয়ে দাও।
সারহান মীরার ২ হাত ভর্তি করে চুড়ি পরিয়ে দিলো।
এরপর আবার নীরবতা।কি বলবে কেউই যেন খুঁজে পাচ্ছে না।
সারহান নীরবতা ভাঙার জন্য বললো, তুমি মাছ খাওনা কেন?
-মাছের গন্ধই সহ্য হয়না আমার।
আবার,২জন চুপচাপ।
এমন সময় মা খেতে ডাকলেন।
সারহান বললো,মীরা তুমি এখন থেকে একটু মাকে রান্না-বান্নায় হেল্প করো কেমন।কিছু মনে করলে?
– ছিঃ সারহান। তুমি যে কি বলো।আমি কাল থেকেই কিচেনে যাবো।আর, তুমি এভাবে সবসময় আমাকে একটু সব মনে করিয়ে দিবে, বুঝিয়ে দিবে।প্রথম বার সংসার করছি তো… নিয়ম-কানুন বুঝতে শিখিনি।
মীরা হাসতে লাগলো।হাসলে মীরাকে ভারী সুন্দর দেখায়।
খাবার টেবিলে বসে সারহানের মীরার জন্য খারাপ লাগতে লাগলো। বেচারি শুধু ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খাচ্ছে।আর, তার পাতে রুই মাছ,চিংড়ি মাছ।
সে বললো,মীরা তুমি একটু চিংড়ি মাছ নাও।চিংড়ি তো আর সত্যিকারের মাছ না।
বিভা খানিক বিরক্তি নিয়েই বললো,আহ: ভাইয়া খেতে না চায় না খাক। তুমি এতো জোর করছো কেন?
সারহান চুপ হয়ে যায়।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর সারহানের বাবা বললেন,মা মীরা। আমার প্রেশার টা একটু মেপে দিয়ো তো।
মীরা ঘাঁড় নেড়ে সম্মতি জানালো।
বাবা হেসে বললেন, আমার যে কি খুশি লাগছে!ঘরের মধ্যে ডাক্তার থাকবে।যখন-তখন জ্বালাবো।কোনো ভিজিট লাগবে না।হা…হা…কত চেষ্টা করেছি এই গাঁধা গুলোকে ডাক্তারি পড়ানোর।একটাও চান্স পেলোনা।
মীরাও এবার হেসে ফেললো শ্বশুরের কথা শুনে।
বিভা সেসময় ঘরে ঢুকে বললো,এতো জোরে হাসছো কেন ভাবী? নিচতলার আন্টি বসার ঘরে। নতুন বউ দেখতে এসেছেন। এভাবে বেশরমের মতো হাসলে উনি কি ভাববে?
বলেই বিভা চলে গেলো।
মীরার খুব লজ্জা লাগলো,সে মাথা নুইয়ে ফেললো।বাবা বললেন,ওর কথায় কিছু মনে করোনা মা।ও একটু এমনই।
মীরা বললো,কি বলছেন আপনি?ওর কথায় আমি কি ভাববো?ও আমার ছোট বোনের মতো।
.
সারহানদের নিচতলার প্রতিবেশী মহিলা এসেছেন মীরাকে দেখতে।সাথে আরোও ২ জন মহিলা।
তারা উভয়ই মীরার চুলের দিকে তাকিয়ে আছে।১জন বললো, তুমি স্ট্রেইট করিয়ে ফেলো না কেন মা?
মীরার খুব মন খারাপ হলো।সে বললো,কেনো আন্টি? আমার চুল কি খারাপ?
বিভা উত্তর দিলো,না ভাবী তোমার চুল অনেক সুন্দর।কাকেরা দেখলে পছন্দ করে বাসা বানাবে।
বিভার কথা শুনে সবাই হাহা করে হেসে উঠলো।
উনারা ইনডিরেক্টলি বিভিন্ন কথায় বুঝিয়ে গেলেন নতুন বউ তাদের ভাল্লাগেনি।
শুতে এসে সারহান মীরাকে বললো, তুমি কি মন খারাপ করেছো?
মীরা বললো,নাহ। খুব খুশি হইছি।এতো খুশি হইছি যে উনাদের ধন্যবাদ দিতে মন চাইছে।
সারহান কি বলবে ভেবে পেলো না।
খানিকক্ষণ পর মীরা-ই বললো,কি ব্যাপার আমার মন খারাপ। তুমি মন ভালো করার চেষ্টা করছো না কেনো?
সারহান বললো,কি করতে হবে বলো।
মীরা বললো,চলো ছাদে যাই।চাঁদ দেখবো,পূর্ণিমা আজ।
-এতো রাতে?
-এতো রাত কই দেখলে? মাত্র ১১ টা বাজে ।চলো তো।
সারহান মীরার কথা মেনে নিলো।বসার ঘরে এখনো মা আর বিভা সিরিয়াল দেখছে।এটাই সমস্যা। ওদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কি বলবে…কেমন যেন লজ্জা লাগছে তার।
কিন্তু, মীরা আগে আগে চলে গেলো।বললো,মা আমরা একটু ছাদে যাই।বলেই আর থামলো না। বেরিয়ে গেলো।
মা ধরলেন সারহানকে।”এতো রাতে কি দরকার ছাদে যাওয়ার।জ্বীন, ভূত কত কি আছে।”
সারহান মাথা নিচু করে হাসার ভঙ্গী করলো।এরপর দরজা দিয়ে বের হয়ে এলো।শুনতে পেলো বিভার গলা।
বিভা বলতে লাগলো,দেখছো মা কেমন নির্লজ্জ মেয়ে?ছিঃ।
সারহান সেসব কানে না তুলে ছাদে এসে মীরার পাশে বসলো।মীরা সারহানের দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে।
সারহান বললো,চাঁদ দেখতে না এলে?এখন আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন?
মীরা চোখ না সরিয়েই উত্তর দিলো, চাঁদ আর তোমার মধ্যে তুমিই বেশি সুন্দর।
সারহান হেসে ফেললো।
মীরা বললো,একটা গান গাওতো।
সারহান ঘাড় নাড়ালো। বললো,জীবনেও না। স্কুলে একবার গান গেয়েছিলাম।স্যার বলেছিল তোর গানের থেকে কাকের কা..কা…অনেক সুন্দর।
কিন্তু,মীরা নাছোড়বান্দা।অবশেষে,সারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,আমি শুধু ১ টাই গান পারি।গান কখনো শুনিনা তো….
-আচ্ছা ঐটাই গাও….
-“লুঙ্গি ডান্স…. লুঙ্গি ডান্স….লুঙ্গি ডান্স…”
– কি শুধু এক কথাই বার বার বলছো?
-শুধু এইটুকুই মনে আছে। আর মনে নেই।
-না মনে থাকলে বানিয়ে গাও। বিয়ে করেছে অথচ বউকে শোনানোর জন্য একটা গান শিখেনি।আমি তোমার জন্য বিয়ের আগে কত কিছু শিখেছি জানো?রান্না,গান,নাচ কতকি। আবার মুখে হলুদ মেখে মেখে সুন্দর হয়েছি।চুপ কেন? বানিয়ে গাইতে বললাম না?
সারহান ঢোক গিলে বানিয়ে গাইতে শুরু করলো,লুঙ্গি ডান্স.. লুঙ্গি ডান্স….শার্ট ডান্স….শাড়ি ডান্স….প্যান্ট ডান্স….
মীরা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগলো।
সারহান বললো,হাসবে না তো।এতো হাসির কি আছে? তুমিই তো বানাতে বললে।তুমি নিজে একটা গাও দেখি কেমন পারো…
মীরা সাথে সাথেই গান ধরলো,
“তুমি আমার এমনই একজন…
যারে এক জনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন!!”
কি সুন্দর গায় মেয়েটা….সারহান শক্ত করে মীরার হাত ধরে।তার মনে হতে থাকে,জীবনটা আসলে মন্দ নয়……
চলবে।
.
