#পরী
পর্ব: ০৪ (শেষ পর্ব)
ঘরে এসে সারহান দেখে মীরা ফোন হাতে নিয়ে গুনগুন করে গান গাইছে।
সারহান বলে, মীরা আমাদের মধ্যে যা হইছে আমি তার জন্য স্যরি।
-স্যরি বললেই সব সমাধান হয়ে যায় না সারহান। এরপরেও আবার তুমি সেইম কাজই করবে।
-ওয়েল। তুমি বলো তাহলে আমি এখন কি করবো? আমার কি শাস্তি হওয়া উচিৎ?
-আচ্ছা বাদ দাও।এসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না।
.
এরপর থেকে মীরা কেমন যেনো বদলে গেছে।বিভা অনেক কথা বললেও আর প্রতিবাদ করে না।কারো সাথেই তেমন কথা বলে না।তাকে অপমান করলেও সে মুখ খোলেনা।সারহানের সাথেও আগের মতো বন্ধুসুলভ আচরণ করে না। খুনসুটি করে না।সারহান খালি জিজ্ঞেস করে, মীরা তোমার কি হয়েছে?
মীরা হাসে।বলে, কিছুই হয়নি তো।
-তুমি আর আগের মতো নেই।আগে রাগ দেখালেও রাগের মধ্যে ভালোবাসা থাকতো।আর, এখন হেসে কথা বলো। তবুও মনে হয় সবটাই ভান করছো। কেন এমন করছো?সব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা হয়।তাই,বলে কেউ এমন করে না।
মীরা বলে,কাছের মানুষ খারাপ ব্যবহার করলে ভুলতে সময় লাগে।কষ্ট হয়।আমি চাইলেও তোমার সাথে আগের মতো সহজ হতে পারি না। তুমি ভালোবাসার কথা বললেও মিথ্যা মনে হয়।
….
কয়েকদিন পর বিভা তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যায়।কারণ,বিভার স্বামী বিদেশ থেকে এসেছে।
মীরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কথায় কথায় বিভার খোঁচা শুনতে শুনতে সে পাগলপ্রায়।
বিভা চলে যাওয়ার পর থেকেই মা খালি বলছে,আহারে! আমার মেয়েটা কিভাবে যে আছে।ওর শ্বাশুড়িটা যা শয়তান…..
বিভা প্রায় দুইমাস পর এ বাড়িতে পুনরায় আসে।এসেই বাড়ি মাথায় তুলে ফেলে।
তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন এর কি ভয়ংকর রূপ তার বর্ণনা করা শুরু করে দেয়। তার শ্বাশুড়ি সাক্ষাৎ ডাইনী, তার স্বামীর বড় বোন তো আরো বড় ডাইনী….
রাতে মীরাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ভাবীর মতো তো আর সবার ভাগ্য না।কি কাকের ঠ্যাং,বকের ঠ্যাং রেঁধে বইসা থাকে।অথচ, আমার ভাই সেটাই অমৃত মনে করে খায়।মা-ও কিছু কয়না। আমার শ্বাশুড়ি হলে এমন বউ কে ২ দিনও রাখতো না।
মীরার একবার বলতে মন চাইলো,আমি তো তবুও তোমার মা-বাবা কে রান্না করে খাওয়াই। তাদের সাথে থাকি। তুমি তো স্বামী আসলেই শুধু শ্বশুরবাড়ি যাও।সারা বছর তো শ্বাশুড়ি কে একটা ফোনও করোনা। তোমাকে যখন তোমার শ্বাশুড়ি রেখেছে তাহলে আমাকেও নিশ্চয়ই রাখতো।
কিন্তু, মীরা কিছুই বললো না। কারণ, এতো দিনে মীরা বুঝে গেছে সংসার করতে হলে চুপ করে থাকতে হয়!
এইভাবে আরো দুই মাস কাটার পর একটা সুখবর পেলো বাড়ির মানুষেরা।
বিভা সন্তানসম্ভবা।মা-বাবা আর সারহানের খুশির অন্ত নেই।খবর শুনে,বিভার শ্বাশুড়ি এলো এ বাড়িতে। মীরা দেখলো রোগা টিঙটিঙে একটা মহিলা। ঠিকঠাক মতো হাঁটতেও পারে না।অথচ, মীরা মনে করেছিলো ঝাড়ুর উপর বসে কোনো ডাইনীই আসবে হয়তো,যা বর্ণনা সে শুনেছে বিভার মুখে!
মীরা তাকে জিজ্ঞেস করলো, বাড়িতে আপনাকে কে রান্না করে খাওয়ায়?
উনি বলে, আমিই রান্ধি।মাইয়াগো তো বিয়া হইয়া গেছে।তারা মাঝে মাঝে আসে।আর,বিভা তো আমাদের বাড়িত থাকতে পারে না কারেন্ট নাই দেইখা।
মীরা বললো, আপনি এ বাড়িতেই থেকে যান বিভা যত দিন থাকে।একা বয়স্ক মানুষ এতো কষ্ট করেন…আহা!ভদ্র মহিলা অবশ্য ২ দিন থেকেই চলে যান। ছেলের শ্বশুরবাড়িতে তিনি থাকতে চান না।পরে ছেলের বউয়ের খোঁটা শুনতে হয় যদি…
মীরা বিভাকে বললো,বিভা বেবি হওয়ার পর থেকে তুমি ও বাড়িতেই গিয়ে থাকবে।আর,এখনো কিছু দিন থেকে আসো।
বিভা মুখ বাঁকিয়ে বলে,এক ডাইনীর জন্য আরেক ডাইনীর টান থাকবে এইটাই তো স্বাভাবিক….ঐ বুড়ির মুখ আমি বাবু পেটে নিয়ে দেখবো আর আমার বাবুর চেহারাও কালি মার্কা হবে আমি তা চাইনা।
মীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিভার দিকে।
.
রাতে মীরা রুমে এসে দেখে সারহান মশারি টাঙিয়ে রেখেছে।
মীরা বলে,বাহ… এতো ভালো হলে কবে তুমি?
সারহান হাসে।
বিছানায় শুয়ে সারহান বললো, মীরা আমার খুব মন চায় একটা ছোট বাচ্চাকে আদর করি,চুমু খাই,কোলে নিয়ে ঘুরি।
-ভালো তো। বিভার বাবু হলে তোমার ইচ্ছা পূরণ হবে।
তখন ইচ্ছা মতো কোলে নিয়ে বসে থেকো।
-তা তো নিবোই। কিন্তু, ইশ যদি এমন একটা বাচ্চা পেতাম যে আমাকে বাবা ডাকতো।
মীরা সারহানের দিকে ফিরে।ডিম লাইটের আলোয় সারহানের মুখটা দেখা যাচ্ছে।কেমন দুঃখী ভাব চেহারায়।
মীরা জোরে জোরে হাসতে থাকে।সারহানের বুকে একটা আলতো কিল দিয়ে বলে, তুমি তো নিজেই বাচ্চা এখনো। তোমার আবার, বাচ্চার বাবা হওয়ার শখ কেনো?বাবা হওয়া অনেক কঠিন বুঝেছো মি. ঝগড়াবতী?এনিওয়ে, তোমার নাম লজ্জাবতী বদলে এটা রাখা হয়েছে।কেমন এটা?
– আমি বাচ্চা কোন দিক দিয়ে বলোতো….
-বাচ্চা না হলে কি আর অন্যের কথায় নিজের বউয়ের সাথে ঝগড়া করো…..
-উফ মীরা বাদ দাও না। তোমার পায়ে ধরি….
– আচ্ছা বাদ দিলাম।
-হুম এখন আমাকে একটা কিউট দেখে বাচ্চা এনে দাও।যেটা সারাক্ষন বাবা…বাবা…করে ডেকে আমার মাথা নষ্ট করে দিবে।
– চুপ থাকো।আমি মনে হয় বাচ্চার ফ্যাক্টরি নিয়ে বসে আছি যত্তোসব।ঘুমাও…এতো তাড়াতাড়ি না।
সারহান রাগী রাগী মুখ করে পাশ ফিরে শোয়।
-এইই সারহান তুমি কি রাগ?
মীরা সারহানের উপর হাত রাখে।বলে, আমার অনেক টুইন বাচ্চার শখ।
-কিহ? টুইন?
-হুম। তোমার ভাল্লাগে না?আমি তো নামাজে রোজ দোয়া করি যাতে আমাদের টুইন বেবি হয়।
-না আমার যমজ টমজ ভাল্লাগে না একটুও। একসাথে দুইটা পালবো কেমনে?আল্লাহ রে…
মীরা এবার উঠে বসে।সারহানকে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুষি দিতে থাকে।
-কি বললি তুই? তোর টুইন ভাল্লাগে না ?
-আরে মারছো কেন? নিজের মতামতও কি প্রকাশ করা যাবে না নাকি?
-না যাবে না।ম্যারিড পুরুষদের আবার কিসের নিজের মতামত?বউ যেটা বলবে সেটাই বলতে হবে, রাইট….
সারহান আর মীরা দুজনেই জোরে জোরে হাসতে থাকে। একপর্যায়ে মীরা দেখে সারহানের চোখে পানি।
-এই তুমি কি রাগ করছো?ব্যথা পাইছো?আমি তো ফান করছিলাম।স্যরি।
সারহান বলে, মীরা কতদিন পর তুমি আবার আমার সাথে মন খুলে কথা বলছো। আমার যে কি শান্তি লাগছে।আমি আগের মীরাকে অনেক মিস করতাম!
মীরা বলে,হইছে…হইছে।আর, ঢং করতে হবে না। আরেক দিন আমার সাথে ঝগড়া করে দেখো কি করি তোমার আমি….
সারহান বলে, আচ্ছা আমাদের টুইন বাচ্চা হলে কি নাম রাখা যায় বলোতো।
মীরা এবার খুব এক্সাইটেড হয়ে যায়। সে বিভার বাচ্চার জন্য একটা নাম ভেবেছিল। কিন্তু,বিভা বলেছে আমার বাচ্চার নাম তুমি রাখবা কেন?আমি আর আমার স্বামী কি মরছি?
-আসো কয়েকটা সুন্দর নাম বের করি।
সারহান বললো,আসো।মেয়ে হলে সারাহ…. আমার নামের সাথে মিল রেখে…নাম শুনেই বুঝা যাবে আমার বাচ্চা।
মীরা পরক্ষনেই বললো,সরো তোমার নামের সাথে মিলিয়ে রাখবো না।আমি ৯ মাস কষ্ট করবো।আর,নাম হবে উনার সাথে মিলিয়ে।শখ কত!
-তাহলে কি?
সারহান মুখ অন্ধকার করে ফেললো।
মীরা লাইট জ্বেলে দেয়।বলে, টেবিল থেকে খাতা আনো সারহান। এখন সুন্দর সুন্দর নামগুলো লিখতে হবে।
.
সকালে কিচেনে আসার পর মা জিজ্ঞেস করলো, মীরা তোমাদের কি আবার ঝগড়া হইছে?
-কই না তো মা। কেন?
-মাঝ রাতে একবার পানি নিতে ডাইনিং এ এসে দেখি তোমাদের ঘরে আলো জ্বলছে।
মীরা মাথা নিচু করে ফেলে।”আসলে মা…”
-কি?
-আমরা নাম ঠিক করছিলাম তো তাই।
-কার নাম?বিভার বাচ্চার নাকি?
-না…মানে আমাদের…
মীরা মাথা নিচু করে লাজুকভাবে হাসে।
মা চিৎকার করে ওঠে,কি বললে? আলহামদুলিল্লাহ।কবে জানলে?আমাকে শোনানোর প্রয়োজন মনে করলে না?
-না মানে এখনো তো হয়নি।পরে যখন হবে আরকি, তখন এর জন্য ঠিক করছিলাম নাম।
মায়ের মুখটা চুপসানো বেলুনের মতো হয়ে গেলো মুহুর্তেই।
বললো,তাহলে নাতি -নাতনির নামও ঠিক করতে যত্তোসব।
-না মানে মা আসলে…
-এভাবেই রাত জেগে নাম ঠিক করতে থাকো।তাহলে,নামই হবে, সেই নাম রাখার জন্য বাচ্চা আর হবে না।
মীরা হাসে। পাশাপাশি কিচেনে পরিচারিকা যিনি ছিলেন তিনিও অট্টহাসিতে ফেটে পরেন।
বিভা হাজির হয় সেখানে।
-কি হইছে মা?এতো হাসছো কেন?এতো হাসাহাসির কি আছে? তোমাদের হাসির শব্দে ঘরের মধ্যে একটু শোয়াও যাচ্ছে না।
মা বললেন, তোর ভাবীর কথা শুনে হাসি।সে এখনই তার না হওয়া বাচ্চার নামও ঠিক করে ফেলছে।
বিভার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো।”কত ঢং যে আরো দেখা লাগবে দুনিয়ায় থাকলে”…
মা বললেন,যা বিভা তুই শুয়ে থাক। অসুস্থ শরীর নিয়ে এতো ঘুরা ঘুরি করিস না।
মীরা বললো,বিভার কিন্তু হাঁটাহাঁটি করাই দরকার মা।এই সময় টুকটাক কাজ না করে খালি শুয়ে থাকা একদমই উচিৎ না।
বিভা গজগজ দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেলো।”ওরে আমার জ্ঞানী নুডুলস, উনার থেকে আমার জ্ঞান শিখতে হবে।”
মীরা মনে মনে বললো, তুই নুডুলস।শা/লি ফাজিল।
সারহান ফিরার সময় বিভার জন্য অনেক খাবার-দাবার আনলো।
প্রতিদিনই এখন সে এমন করে।
দেখতে দেখতে ৩ মাস হয়ে যায়।বিভার শ্বাশুড়ি এরমধ্যে, ২ বার এসেছেন গ্রাম থেকে অনেক জিনিস পত্র নিয়ে।বেশ কয়েকবার বিভাকে বাড়িতে যেতেও বলেছে। কিন্তু,সে যায়নি। মীরা লক্ষ্য করেছে বিভার ইদানীং মন খারাপ থাকে সারাক্ষণ।মনে হয় তার স্বামীর সাথে তার ঝগড়া-বিবাদ হয়। ফলস্বরূপ তার সমস্ত রাগই মীরার উপর ঝাড়ে সে। মীরা তেমন প্রতিউত্তর করে না।যেহেতু,বিভা প্রেগন্যান্ট তাই।
….
সারহান অফিসে কাজ করছে। হঠাৎ, তার এক বন্ধু, কলিগ হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলে,সারহান তুই এখনো বসে আছিস ইয়া আল্লাহ….
সারহান অবাক হয়ে বললো,কেনো কি হইছে?
-আরে অফিসে তো প্রধানমন্ত্রী এসেছে।জানিস না?
-কিহ?কি সব বলছিস?
-সত্যি। বিশ্বাস না হয় দেখবি চল।
সারহান দ্রুত পায়ে তার বন্ধুর পিছু পিছু যায়। গিয়ে দেখে মীরা এসেছে।
সারহান রাগী চোখে তাকায়।বন্ধুটি হেসে বলে,আই মিন তোর ঘরের প্রধানমন্ত্রী।
মীরাও হাসলো।
সারহান মীরাকে বললো, তুমি হঠাৎ কি মনে করে?
-এমনি তোমার অফিস দেখতে এলাম।কয়টা মেয়ে বান্ধবী আছে অফিসে তোমার দেখে যাই।
সারহান আস্তে করে মীরার মাথায় একটা থাপ্পর দেয়।
হেসে বলে,পাজি মেয়ে।
মীরা বললো, আমাকে শপিং করাতে নিয়ে যাবে আজকে?
-যা আপনার আদেশ মহারানী তাই হবে। কিন্তু সকালে বললে বেশি ভালো হতো। এখন কতো কাজ।
মীরা বললো,আমি কিছু জানি না। তুমি এখনি নাও।
শপিং মলে এসে মীরা একটা সুন্দর ডিজাইনার কেটলী ,চায়ের কাপের সেট এসব গৃহস্থালি জিনিস পত্র কিনতে লাগলো।সারহান বললো,এসব হাবিজাবি কিনছো কেন?শাড়ি-টারি কিনো….
মীরা অন্য একটা দোকানে গিয়ে দুই জোড়া ছোট্ট সাইজের জুতা কিনলো।
সারহান বললো, এগুলো কার জন্য কিনছো?
মীরা সারহানের কথা পাত্তা না দিয়েই আরেকটা শপে গেলো।আবারো,২ টা ছোট সাইজের ড্রেস কিনলো। ছোট সাইজের শীতের টুপি কিনলো। সোয়েটার কিনলো।
সারহান বললো,এইসব কেন কিনছো?
-কারণ,তখন শীতকাল থাকবে।
-কখন?আর, এগুলো কি বিভার বাচ্চার জন্য কিনছো?
– না গো। তোমার বোনের স্বামী আছে,ভাই আছে।তারা থাকতে আমি কিনে দিবো কিসের জন্য?
-তাহলে এগুলো কার? তোমার ভাবীর কি আবার বেবি হবে?
মীরা কিছু ক্ষন রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে থাকে।
বলে, আমার এক পরিচিত দম্পতির বাচ্চা হবে।টুইন বেবি। ওদের জন্য কিনেছি।
-ওহ।কারা ?
মীরার রাগের মাত্রা আরেকটু বাড়লো।
-তুই যেই লেভেলের গাধা,তোর পক্ষে ওদের চিনা সম্ভব না।
-নাম তো বলতে পারো না কি?চিনতেও তো পারি।নাম কি উনাদের?
-সারহান আর মীরা।
মীরাকে চমকে দিয়ে সারহান একটা চিৎকার দিয়ে ওঠে। মীরা ভয়ে বুকে থুতু দেয়। আশেপাশের মানুষ সারহানের দিকে তাকিয়ে আছে।
মীরা বলে,কি হইছে? গলায় কি বোম ঢুকছে?
-আমি এতো খুশি এর আগে কোনদিন হইনি। আচ্ছা, টুইন হবে তুমি কিভাবে জানলা?
-আমি কাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম টুইন বাচ্চা।আর,আজকে হাসপাতালে টেস্ট করালাম,দেখি পজিটিভ। আশা করি, টুইনই হবে।
সারহান একদম বাচ্চাদের মতো হাসছে।
মীরা বললো,এখন থেকে এতো হাবার মতো হাসলে হবে না অনেক দায়িত্ব বুঝেছো?
..
দেখতে দেখতে বেশ কয়মাস হয়ে যায়।মা বলেন, মীরা এখন তুমি কিছু দিন ছুটি নিয়ে তোমার মায়ের কাছ থেকে ঘুরে আসো।
মীরা বললো,জ্বি মা যাবো।সারহান কয়েক দিন পর ছুটি নিচ্ছে তখন যাবো।
বিভা বলে উঠলো, কেন ভাবী?সবকথায় ভাইকে টানো কেন? তুমি বাচ্চার মা হবা আর এই সময় তো মেয়েরা বাপের বাড়ি ই থাকে।এইটাই তো নিয়ম।
-না বোন আমি এই নিয়ম মানি না। তোমার ভাই আমার সাথে থাকবে,আমি প্রতিনিয়ত কত কষ্ট করি সেইটা অনুভব করবে,আমাকে হেল্প করবে আমি এটাই চাই।এতো ফ্রি ফ্রি বাবা হয়ে যাওয়া ঠিক না।
-তোমার তো ভাবী সবেতেই ঢং।
মা বললেন,আহ থাম তো তোরা। মীরা তোমার মাকেই বলো বেড়িয়ে যেতে।
মীরা হেসে বললো, আচ্ছা মা।
দেখতে দেখতে আরোও দিন কাটতে লাগলো।
বিভার মীরার প্রতি অনেক রাগ। তার ধারণা, মীরা ইচ্ছা করে এখন বাচ্চা নিচ্ছে। তার সাথে হিংসা করে। যেহেতু, বাড়ির সবাই তাকে বেশি প্রায়োরিটি দিচ্ছিলো।সেটা মীরার সহ্য হয়নি।
.
একদিন মীরা ঘুম থেকে উঠে দেখে ঘরের মধ্যে চেঁচামেচি হচ্ছে।দ্রুত বসার ঘরে যায় সে।দেখে বাবা বিভাকে বকছেন।
ওখানে থেকে ঘটনা যা বুঝতে পারে তা হলো,বিভার শ্বাশুড়ি অনেক দিন ধরে অসুস্থ।আর,বিভা একবারও দেখতে যায়নি।এটা নিয়েই তার স্বামীর সাথে এতো দিন ঝগড়া চলছিল।আর, এখন বিভার স্বামী বিভার বাবার কাছে বিচার দিয়েছে।
বাবা বললেন, আমার লজ্জা লাগছে যে তুই এতো খারাপ।২ দিন ওখানে গিয়ে থাকলে তো তুই মরে যেতি না। তোর স্বামীর বড় বোনেরা ছিল।ওরা তোকে রাঁধতে দিতোও না।আর, তোর ভাবী যদি ঘর-বাহির দুইটাই সামলাতে পারে তুই কেন দুইটা দিন ওখানে গিয়ে থাকতে পারলি না?
বাবা নিজের ঘরে চলে গেলেন কথাগুলো বলে।
বিভা চোখের পানি মুছে ব্যাগ গুছানো শুরু করলো।
মীরা বললো, এখন আর যাওয়ার দরকার নেই।ডেইট যেহেতু ঘনিয়ে আসছে।
-তুমি চুপ থাকো।সব ব্যাপারে নাক না গলালে তোমার কি শান্তি লাগে না? কেন এসেছো এঘরে?মজা দেখতে?
-দেখো বিভা।আমি তোমার বড় বোনের মতো।আমি তোমার ভালো চাই। আমাদের বাসা থেকেই তো আমার হাসপাতাল টা কত দূরে।আর, তোমার শ্বশুরবাড়ি তো একটু গ্রামের দিকে। ওখান থেকে হাসপাতাল আরো দূরে। তোমার তো ডেইট চলেই এসেছে।
-আমার ডেইটের এখনো অনেক দিন বাকি ভাবী। তুমি আর এখন আমার সামনে ভালো সেজো না। তুমি যে কত ভালো তা আমার জানা আছে।
বিভাকে নিতে তার এক চাচাতো দেবর এলো।বিভা তার সাথে চলে গেলো। কয়েকদিন থেকেই চলে আসবে।
মীরা নিজেও অসুস্থ। ইদানিং অনেক কষ্ট হয় মীরার।সত্যি সত্যিই মীরার পেটে জমজ বাচ্চা। এখন,তো হাঁটাহাঁটি করতেও অনেক বেগ পেতে হয় তার।
এরমধ্যে, সেদিন সকাল থেকেই অনেক বৃষ্টি।মীরা বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছিলো। বৃষ্টির ছাঁট আর ঠান্ডা বাতাসের জন্যই হয়তো মীরার বিকালের দিকে জ্বর এলো।সে সারহানকে ফোন করলো।কারণ,তার শ্বাশুড়িও বিভার শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছেন বিভা যাওয়ার পরদিনই।তার মেয়ে একা থাকবে তা তিনি চাননা।
সারহান এসে মীরাকে বকাবকি করলো। কেন সে একটু সাবধানে থাকে না!
রাতের দিকে প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। মীরা আর সারহান তাড়াতাড়িই শুয়ে পরলো সেরাতে। হঠাৎ, মাঝরাতে টেলিফোন এলো মায়ের থেকে।
মা বললেন,বিভার অবস্থা খুব খারাপ। এতো ঝড়বৃষ্টির মধ্যে হাসপাতালেও নেয়া যাচ্ছে না।
সবটা শুনে মীরা বললো,মা আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।আমি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কল করছি এখুনি।
এরপর, মীরা হাসপাতালে ফোন করলো।
সারহানকে বললো, এবার চলো আমরা হাসপাতালে যাই।
সারহান বললো,এতো ঝড়ের মধ্যে তোমার যাওয়ার দরকার নেই এই শরীর নিয়ে।আমি যাই। তুমি থাকো।
-ননসেন্স। তুমি কি ডাক্তার?
-হাসপাতালে কি আর ডাক্তার নেই?
-আপন মানুষ দেখলে যে কত সাহস বাড়ে,শান্তি লাগে তুমি বুঝো না?
মীরা সারহানের সাথে হাসপাতালে গেলো।
বিভার বাচ্চার পজিশন উল্টা হয়ে আছে।
বিভার অবস্থাও খুব খারাপ।মীরাকে দেখে বিভা বললো,ভাবী,আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি।আমাকে মাফ করে দিও।
মীরার চোখে পানি চলে এলো।
সে সারারাত বিভার সাথে অপারেশন থিয়েটারে ছিলো এই শরীর নিয়েই।বিভা মীরার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল খুব ভরসার সাথে।
অবশেষে অনেক কষ্টের পর ভোরে বিভার একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়। বিভা ততক্ষণে প্রায় অচেতন।
মীরা বাচ্চাটাকে কোলে নিলো।বললো,শুদ্ধ হৃদয়ের মানুষ হও মা।
সকালে মীরার শরীরও অনেক অসুস্থ হয়ে যায়।
মীরা নেতিয়ে পরে একদম।
সেবার,মীরা অনেক দিন অসুস্থ ছিলো,বিভা হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আসার পরেও।
.
বিভা মীরার কাছে অনেক বার ক্ষমা চেয়েছে।আর,সে সারাক্ষনই বলে,ভাবী তুমি আমার মেয়ের নাম রাখো।
মীরা অবাক হয়ে বিভাকে দেখে।কত বদলে গেছে সেরাতের পর থেকে। এখন কত সুন্দর করে কথা বলে।
মীরা বিভার মেয়ের নাম রেখেছে, শুদ্ধতা।
এই নামেই বিভা তাকে ডাকে।
.
দেখতে দেখতে সময় গড়ায়।মীরাও দুটি ফুটফুটে শিশুর জন্ম দেয়।সবাই এসে বাচ্চাদের দেখে,কোলে নেয়।
নানা-নানি,দাদা-দাদির ভীড়ে সারহান বাচ্চাদের ধারে কাছেও আসতে পারে না।
অবশেষে,সবাই রুম থেকে গেলে সারহান বাচ্চাদের পাশে বসে। তার চোখে পানি এসে পরেছে। ছোট বাচ্চা তার অনেক ভালো লাগে। কিন্তু, আজকের ভালো লাগাটা একদম অন্যরকম।
-পুরোই আমার মতো দেখতে তাই না মীরা?
-না তো। আমার মতো।
সারহান আস্তে আস্তে একজন একজন করে কোলে নেয়।
বলে,”বলো বাবা। বাবা বলো সোনামণি।”
মীরা হেসে ফেলে।
-জন্মেছে একদিনও হয়নি এখনও সারহান।
-আমার যে কি খুশি লাগছে মীরা!
-তাহলে একটু আদর করে দাও।
সারহান বাচ্চাদের কপালে পর্যায়ক্রমে চুমু খায়।
মীরা নিজের কপালে হাত রাখলো,হায়রে….আমি বলছি কার কথা আর সে বুঝলো কি…
সারহান এবার মীরার কপালেও চুমু খায়।
…
৪ বছর পরের কথা।
বিভার মেয়ে ও মীরার ছেলে-মেয়ে ধীরে ধীরে অনেক খানিই বড় হয়েছে।বিভা এখন শ্বশুর বাড়িতেই থাকে।
মীরার সাথে এখন আর আগের মতো ঝগড়া করে না। যথেষ্ট বুঝদার হয়েছে সে।
সেদিন বিভা তার স্বামী আর কন্যাকে নিয়ে এবাড়িতে এসেছে বেড়াতে। মীরা আর তার শ্বাশুড়ি অনেক রান্না-বান্না করেছিলো ওদের জন্য।
একপর্যায়ে,খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে মীরা আর বিভা রুমে বসে গল্প করছিলো। বাচ্চারা সবাই বাইরে অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলছে।এমন সময় বিভার মেয়ে শুদ্ধতা কাঁদতে কাঁদতে রুমে আসে।বিভা আর মীরা ২ জনই জিজ্ঞেস করতে থাকে কি হইছে মা?কাঁদছো কেন?
শুদ্ধতা বিভাকে জড়িয়ে ধরে বলে,মা.. আমার চুল কার্লি দেখে ঐ বাসার বাচ্চাগুলো বলেছে আমার চুল গুলো নাকি নুডুলসের মতো।এর জন্য নাকি আমাকে ডাইনীর মতো লাগে।
বিভা শুদ্ধতার কপালে চুমু দিয়ে বলে,ওরা পঁচা তাই এসব বলেছে। আমার মা টা তো একদমই পরীর মতো দেখতে।
-যারা এসব বলে তারা খুব খারাপ তাই না মা?আমাকে তো আল্লাহ পছন্দ করেই এমন চুল দিয়েছে।ওরা বোঝে না।
বিভা মাথা নিচু করে বলে,হ্যাঁ বোঝেনা।ওরা খারাপ।
এরপর,আড়চোখে মীরার দিকে তাকায়।
মীরা হাসে।বলে, শুদ্ধতা মামণি এদিকে আসো।
শুদ্ধতা মীরার কাছে এসে মীরাকে জড়িয়ে ধরে।
মীরা মজা করে বলে, তোমাকে নুডুলস বলে বেশি বিরক্ত করলে তুমিও ওদের বলবা স্টিক নুডুলস…..
শুদ্ধতা হা…হা করে হেসে দেয়।
সেই নিষ্পাপ হাসিতে যোগ দেয় মীরা আর বিভাও।
____________________সমাপ্ত______________________
লেখিকা: লিল
