#লিটল_গার্ল
#পর্ব_৭
#আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
গাড়ি এসে ধীরে ধীরে থামে বাড়ির সামনে। বাইরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেছে, বাড়ির আলো নিভু নিভু করছে। দরজার পাশে ঝুলে থাকা বাতিটা কেবল টিমটিম করে জ্বলছে।
আদ্র কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। গাড়ির ভেতর উষ্ণতা, কিন্তু মনে টানাপোড়েন চলছে। ওয়ারিন ঘুমিয়ে আছে, চুলগুলো এখনো কপালে ছায়া ফেলছে। আদ্রর বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে সামলায়। ভেতরের দ্বিধা, ডাকবে, নাকি না। একটু সময় তাকিয়ে থাকে। তারপর নিঃশব্দে বলে ওঠে, “ওয়ারিন…”
কোনো সাড়া নেই। ওয়ারিনের মাথাটা সামান্য কাঁপে, তারপর আবার স্থির। আদ্র গাড়ির দরজা ধীরে খুলে বাইরে নামে। ওয়ারিনের দরজার পাশে এসে থামে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে। রাতের আলোয় ওর মুখটা আরও ফর্সা, আরও নরম লাগছে। আদ্র আলতো করে ঝুঁকে পড়ে। হাতদু’টো সাবধানে ওয়ারিনের কাঁধের নিচে আর হাঁটুর পাশে রাখে। তারপর আলতো করে তুলে নেয় কোলে। ওয়ারিনের মাথা এসে ঠেকে আদ্রর বুকের কাছে। মৃদু গরম নিঃশ্বাস লাগছে গলায়।
সিঁড়ি বেয়ে উঠে রুমের দরজায় পৌঁছে আদ্র। দরজাটা ধীরে ঠেলে খোলে, আলো জ্বালায় না। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে আসছে। আদ্র খুব সাবধানে ওয়ারিনকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। একপাশে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। চুলগুলো হাত বাড়িয়ে আলতো করে সরিয়ে দেয়। আঙুল ছুঁয়ে যায় গালের পাশে। ওয়ারিনকে সে কখনও সেই চোখে দেখেনি। যে চোখে ভালো লাগার ছায়া থাকে। দেখা তো ওদের প্রায়ই হতো, কথাও, কখনও-সখনও। তবু মন তার অচঞ্চলই থেকেছে, কোনো অনুভূতির ঢেউ ছুঁয়ে যায়নি তাকে। আদ্র সবসময়ই এইসব আবেগঘন বিষয় থেকে দূরে থেকেছে। কিন্তু মন যে এখন অন্য কথা বলছে। যে মন এতদিন নিঃস্পৃহ ছিল, সে আজ অকারণেই আলোড়িত।
“আশ্চর্য!! তুই কেন এভাবে আমার শান্তিটা কেড়ে নিচ্ছিস?”
আদ্র ধীরে ধীরে ওয়ারিনের কাছে ঝুঁকে আসে। নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ওয়ারিনের গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে ওয়ারিনের কানের লতিতে ছোট্ট চুমু খায়। কিন্তু ঠিক পরের মুহূর্তেই, আদ্র দ্রুত সরে বসে, নাকে হাত দেয়।
“বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে করিনি। ভয় পেয়ে গেছিলাম।”
ওয়ারিন উঠে বসে। ঘুমের মাঝে হটাৎ স্পর্শে ভয় পেয়েছে। ধাক্কা দেওয়ার ফলে আদ্র ব্যথা পাবে ভাবেনি।ওয়ারিনের চোখে তখন অপরাধবোধের ছায়া।
“আপনার নাকে… লেগেছে?”
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের পর হঠাৎ আদ্র এগিয়ে আসে। কোনো কিছু না ভেবেই, ওয়ারিনকে নিজের দিকে টেনে নেয়। ওয়ারিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে আদ্রর বুকের মধ্যে পায়। দু’হাত দিয়ে আদ্র শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওকে। ওয়ারিনের নিশ্বাস আটকে আসে।আদ্রর বুকে ঠেকে আছে। ওয়ারিন অবাক হয়ে স্থির হয়ে যায়। হটাৎ কী হলো? যে এত সংযত। সে এভাবে ওকে জড়িয়ে ধরছে!! মুহূর্তটা যে অবিশ্বাস্য। ওয়ারিন হাত তুলেও নামিয়ে নেয়। তার শরীর জমে যায়, মনে হয় এই মুহূর্তে কিছু না ভেঙে যাক। এই আলতো উষ্ণতা, আর স্বীকারোক্তি। চোখের কোণায় অজান্তেই জমে ওঠে জল। ওয়ারিন জানে না, কেন কান্না আসছে। ভয় থেকে, না কি দীর্ঘদিনের চাপা ভালোবাসার স্পর্শে। আদ্রর বুকের কাছে ভিজে উঠতে থাকে। আদ্র টের পায়, ধীরে আলগা করে ধরে। দৃষ্টি ওয়ারিনের মুখের দিকে যায়। চোখের কোণে চকচকে জল।আদ্র হতবাক হয়ে যায়,
“কান্না করছিস কেন? আমি কী কিছু বলেছি?”
ওয়ারিন চোখ মুছে মাথা নাড়ায়। চোখ নামিয়ে নেয়, ঠোঁট কাঁপে সামান্য। আদ্র ওয়ারিনকে ধীরে ধীরে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিঃশ্বাস কেঁপে উঠছে সামান্য। আদ্র ভর ছেড়ে দেয়। গলায় মুখ গুজে। ভেতরের সব আকুলতা সেখানেই গলে যেতে থাকে। এক হাত বাড়িয়ে পাশে থাকা টেবিলের সুইচে আলতো চাপ দেয়।পর মুহূর্তেই ঘরটা নিভে যায় অন্ধকারে। চাঁদের আলোই শুধু থাকে, আর সেই আলোয় বিছানার কিনারে পড়ে ছায়া-আলোয় মিশে যায় দু’টো ছায়া।
———-
সকালের মিষ্টি আলো ঘরে ঢুকছে। বাতাসে উষ্ণতা আর প্রশান্তি। চোখ খুলেই ওয়ারিন বুঝতে পারে। সে কারও বাহুতে বাঁধা। এক মুহূর্তের জন্য অবাক হয়, তারপর হালকা হাসি ছড়িয়ে যায় ঠোঁটে। আদ্র ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। আদ্রর বুকের ওঠানামা অনুভব করছে। এমন শান্ত আদ্রকে সে খুব কমই দেখেছে। ওয়ারিন আস্তে করে নড়তে চায়, কিন্তু আদ্রর বাহু আরও শক্ত হয়ে আসে, অবচেতনে ওকে নিজের আরও কাছে টেনে নেয়। ওয়ারিন মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। আদ্রর মুখ একদম কাছে। চোখ বন্ধ, শান্ত ঘুমে ডুবে আছে। চুলের একগুচ্ছ কপালে পড়েছে, ওয়ারিন সেই চুল সরিয়ে দিতে। কিন্তু মাঝপথে থেমে যায়। ভয় পায়,যদি আদ্র জেগে ওঠে। তবু পরক্ষণেই সাহস পেয়ে যায়। খুব আস্তে করে আদ্রর কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দেয়। সেই স্পর্শে আদ্রর ঠোঁটের কোণ হালকা নড়ে ওঠে, যেনো স্বপ্নে কিছু দেখছে। ওয়ারিনের মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তটা বাস্তব না,একটা মিষ্টি স্বপ্ন। ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যায়। নরম কণ্ঠে বলে,
“এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না আপনি পাশে আছেন। যেন স্বপ্ন দেখছি।”
এখন ঘরটা পুরোপুরি আলোয় ভরে গেছে। জানালার পর্দা হালকা দুলছে, সকালের হাওয়া বইছে ভেতরে। ওয়ারিন ধীরে ধীরে আদ্রর হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে যায়, কিন্তু আদ্রর বাহু এতটাই শক্তভাবে ঘিরে আছে যে নড়াচড়া করাই মুশকিল। আদ্রর হাত তার কোমর জড়িয়ে রাখে আগের মতোই। ধীরে ধীরে আঙুলগুলো খুলে নেয় নিজের কোমর থেকে।
একটু মুক্তি মিলতেই হালকা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসে। বিছানার পাশে বসে একবার তাকায়। মৃদু হাসে ওয়ারিন। তারপর আস্তে উঠে পড়ে বিছানা থেকে। চুলগুলো পেছনে টেনে গুঁজে নেয় কানের পাশে। রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে যায়। ওয়ারিন তখন কিচেনে ব্যস্ত। চুলায় প্যান বসানো, টোস্ট গরম হচ্ছে, পাশে ডিম ভাজা শেষ হয়েছে। ঠোঁটে এক টুকরো তৃপ্তির হাসি খেলে যায়।
তখন বাইরের দিক থেকে গাড়ির শব্দ আসে। ওয়ারিনের হাত থেমে যায়। ও তাড়াতাড়ি জানালার দিকে এগিয়ে যায়। কিচেনের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দেয়। কালো গাড়ি থেকে নামছেন মালিনী বেগম। গায়ে হালকা রঙের শাড়ি। ওয়ারিনের মুহূর্তে মনে পড়ে, সে এখন কী পরেছে! আদ্রর কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার। এক মুহূর্তে গাল গরম হয়ে ওঠে লজ্জায়।
“ইশ! এই অবস্থায় যদি দেখেন…”
হাতের তোয়ালে ফেলে দেয়, চুলের গিট খুলে তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ির দিকে দৌড় দেয়।
রুমের ঢুকে তাড়াতাড়ি কাবাড থেকে শাড়ি বের করে। চুল গুছিয়ে নেয় তাড়াহুড়ো করে।
ওয়ারিন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। নিচে নামতেই চোখে পড়ে। সবে সোফায় বসেছেন মালিনী বেগম। ওয়ারিন কে দেখে হাসলেন। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
“খেয়েছিস?”
ওয়ারিন মাথা নাড়ল, “নাহ, এখন খাব।”
“আদ্র অফিসে চলে গেছে?”
ওয়ারিন একটু থেমে নিচু গলায় উত্তর দিল,
“না, যায়নি এখনও। রুমে আছে।”
মালিনী বেগমের মুখে হালকা বিস্ময়ের রেখা ফুটল। উঠে দাঁড়ান। ওয়ারিন বলল,
“চা করে দিবো?”
মালিনী বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“না রে, আমি খেয়ে এসেছি। তোরা খেয়ে নে, আর কত বেলা করবি। আমি একটু ঘরে যাই।”
মালিনী বেগম সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যান। ওয়ারিন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তাঁর পেছন দিকে, যতক্ষণ না তিনি করিডরের মোড়ে অদৃশ্য হয়ে যান।
সন্ধ্যার আলো ঢুকে পড়ছে। জানালার পর্দা অল্প নড়ছে বাতাসে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভিডিও চলছে। আদ্রর চোখ স্থির স্ক্রিনের দিকে। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি।
“ও নাকি ওয়ারিনকে ভালোবাসে! ব্লাডিফুল।”
ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আয়াশ, দুজন মেয়েকে নিয়ে হোটেলের লবিতে ঢুকছে। পরের আয়াশ হাসছে, মেয়েদের গলায় হাত রেখেছে। মেয়েরা হাসছে জোরে জোরে, আর আয়াশের চোখে সেই দাম্ভিক চাহনি। যেটা আদ্রর কাছে বরাবরই বিরক্তিকর ছিল। আফনান পাশে বসে, একহাতে কফির কাপ, অন্য হাতে ল্যাপটপের মাউস। চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে।
“ওইদিন যখন আয়াশ আমার কাছে আসলো, তখন অবাক হয়েছিলাম। ভাবছিলাম, কী দরকার ওর আমার কাছে আসার?ওই শালা কে পাত্তা দেয় নাই। দুই নম্বর একটা।”
আদ্র চেয়ারে হেলান দিল। চোখ বন্ধ করে বলল,
“এই ভিডিওটা আমার ফোনে পাঠা,ওর বাবাকে দেখাবো আমি।”
আফনান একটু থমকালো। “তুই নিশ্চিত?”
“একদম।”
চলবে…..
