Friday, June 5, 2026







অপূর্ব সমাপ্তি পর্ব-৮+৯

#অপূর্ব_সমাপ্তি
পর্ব -৮

তার বন্ধুটির নাম তানজিম। তানজিম ভাই আমাদের বাংলোর ভেতরে নিয়ে গেলেন। বাংলো দেখাশুনা করে একটি লোক, নাম জহিরুল। বয়স ত্রিশের মতো হবে। কালো কুচকুচে শরীর, চাপা ভাঙা। দেখলেই ভয় ভয় লাগে। তবে গলার স্বর সুন্দর। কথা বলে শুদ্ধ ভাষায়। জহিরুল জানালো ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তাই সব অন্ধকার। আমরা ভেতরে গিয়ে বসলে মোমবাতি জ্বালিয়ে আনলো।

কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে তানজিম ভাই বিদায় নিলেন। আমরা শোবার ঘরে ঢুকলাম।আমারা যে ঘরে থাকব সেটা অনেক বড়। উত্তর দিকে ঘরের সাথে লাগোয়া ছোট ঝুল বারান্দা আছে।

সন্ধ্যারাতে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর। সে বলল, “ঘুমিয়ে যাবে?”

“হ্যাঁ।”

“আমিও। মনে হচ্ছে শরীরের সবগুলো অস্থি কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে।”

“তুমি তো সারা রাস্তা ঘুমিয়েছ।”

“জার্নির ঘুম আর আরামের ঘুম এক হলো? তুমি কাপড় বদলে শুয়ে পড়ো, আমি আসছি।”

সে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর পর কেন যেন মনে হলো ঘরটা আরও বড় হয়ে গেছে। বেশ শীত লাগছে। ঘরে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। মোমের অল্প আলোর তিরতির কাঁপনে ঘরে আলোছায়ার খেলা চলছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা কোনো কোলাহলের শব্দ পরিবেশটা ভারী আর রহস্যময় করে তুলেছে৷

ভয় ভয় অনুভূতিটা পাত্তা না দিয়ে আমি জামা পাল্টে নিলাম। বাম হাতের নখের দিকে নজর পড়ল। এটা সত্যি কাটা দরকার। একটু সুন্দর হয়ে না থাকলে ভালোবাসার মানুষটিও অপছন্দ করতে শুরু করবে এটা সত্যি কথা। কিন্তু এই আঁধারে কিছুই খুঁজে পেলাম না।

আমি ফ্রেশ হয়ে কোনোরকম চুলটা বেঁধে নিয়ে বসে রইলাম, কিন্তু তার কোনো খবর নেই। মনে হলো বহুক্ষণ পর সে এলো। ততক্ষণে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি প্রায়। শুধু দেখলাম সে পাশে এসে শুয়ে পড়ল।

মাঝরাতে ঘুম ভাঙলো একটানা ঘ্যার ঘ্যার ধরনের শব্দে। শব্দটা কাছেই কোথাও থেকে আসছে। পুরো জায়গাটা শব্দহীন, ঝিঁঝির ডাক নেই, রাতের যে নিজস্ব শব্দ থাকে তাও নেই, শুধু ওই একটা শব্দই থেকে থেকে কানে আসছে! প্রতিবার বুক কেঁপে উঠছে আমার। ঠান্ডা আবহাওয়াতেও ঘেমে গেছি। ঘরে একটা মোমবাতির মৃদু আলো। মনে হলো ওটা আরও অন্ধকার বাড়িয়ে দিয়েছে!

আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে আমি তার দিকে তাকালাম। সে কি শুনতে পাচ্ছে না কিছু? এবং সেই সময় আবিষ্কার করলাম শব্দটি আমার বরমশাই এর নাক ডাকার শব্দ। সে নাক ডাকে? এত ভয়ানকভাবে! ইয়া আল্লাহ!

আমি যেমন অবাক হলাম, তেমন স্বস্তিও পেলাম। আচমকা আমার প্রচন্ড হাসি পেলো। হেসেও ফেললাম খিলখিল করে। বড় ঘরে হাসির শব্দ প্রতিফলিত হতে লাগলো। এদিকে সে শব্দ শুনে হকচকিয়ে উঠে বসল। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম।

চোখ হালকা খুলে দেখলাম সে অস্থির হয়ে এদিক হয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। কিছুক্ষণ বসে থেকে কিছু দেখতে না পেয়ে সে আমার গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমায়।

আমি লজ্জায় সিটিয়ে গেলাম। এদিকে সে আরও শক্ত করে চেপে ধরছে যেন! হঠাৎ আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “মাঝরাতে পেত্নী সেজে ভয় দেখানোর মানে কী?”

আমি তখনো মটকা মেরে পড়ে আছি। লজ্জায় কথা বন্ধ। সে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা মোমবাতিটা নিভিয়ে দিয়ে এসে বলল, “অন্ধকারই ভালো!”

.
সকলে ঘুম ভাঙলে ঘরবাড়ি ঘুরে দেখতে বের হলাম। সে তখনো ঘুমিয়ে আছে। বাড়িটা রাতের বেলা রহস্যময় লাগলেও দিনে বেশ সুন্দর৷ দোতলায় তিনটা শোবার ঘর, নিচে ডাইনিং, ড্রইং আর একটা ঘর আছে তালা দেয়া। নিচতলায় বাড়িতে প্রবেশপথের সামনের টানা বারান্দাটুকুর মেঝে ডিজাইন করা। একপাশে একটা সাদা রঙ করা ছোট্ট গোল টেবিল, দুটো চেয়ার।

বাড়ি থেকে গেট পর্যন্ত পাথরের নুড়ি বিছানো রাস্তা। দু’পাশে বাহারি ফুলের বাগান।

পেছনের দিকে একটা পরিত্যক্ত পুকুর আছে। জঙ্গলাবৃত হয়ে আছে। তাছাড়া বাকি সবকিছু পরিপাটি। জহিরুল দেখলাম বাগানের গাছগুলোর আগাছা ছেটে দিচ্ছে আর গুনগুন করে আঞ্চলিক ভাষার গান গাইছে। সুন্দর গানের গলা তার। শুনতে ভালো লাগলো। আমি পেছন থেকে যাওয়ায় প্রথমটায় দেখতে পায়নি সে। দেখামাত্র গান থামিয়ে দিল। বললাম, “সুন্দর গাইছিলেন তো। থামলেন কেন?”

জহিরুল লজ্জা পেয়ে হাসলো। তবে গাইলো না আর। বললাম, “সময় পেলে আমাকে গান শোনাবেন।”

জহিরুল খুশি হয়ে বলল, “আচ্ছা ভাবী।”

.
সে ঘুম থেকে উঠে খেয়ে বেরিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে বলল পরে বলবে। একা একা থাকতে হবে শুনে সে অভয় দিয়ে বলল, “জহিরুল লোকটা ভালো, চিন্তা নেই। আমার জরুরি কাজ আছে। তোমার সমস্যা হলে ফোন করো।”

সে চলে যাওয়ার পর মনে পড়ল ফোন করব কেমন করে? কাল বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সেই যে মোবাইল বন্ধ কারেছি আর চালু করা হয়নি। কিন্তু মোবাইল চালু করলে মা বাবা ফোন করবে। আচ্ছা তারা কি এখন আমাকে খুঁজছে। নাকি বুঝতে পরেছে আমি ওর সাথে আছি? পালিয়ে আসার উত্তেজনায় বাবা মায়ের মনের অবস্থা কী হবে সেকথা ভাবিনি তেমনভাবে। এখন ভয়ে গলা শুকিয়ে আসতে চাইলো।

মোবাইল অন করলাম। ওকে আগে ফোন করে জিজ্ঞেস করতে হবে কী করব। কিন্তু মোবাইল অন করার সাথে সাথে মায়ের নাম্বার থেকে ফোন এলো। ভয়ে আমার গা কাঁপতে শুরু করল। চুরি করে ধরা পড়লে এমন লাগে! ফোনটা ধরতে না চাইলেও ধরে ফেললাম। যেন সময়টা মনে হলো মায়ের সাথে এই মুহূর্তে কথা না বললে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব।

মা ব্যকুল গলায় বললেন, “ঠিক আছিস তুই?”

“হ্যাঁ মা। তোমরা ভালো আছ?”

“আছি। কী করছিস?”

“মা, তুমি কি জানো আমি কোথায় আছি?”

“না। শুধু তোর বাবা বলল তুই জামাই বাবার সাথে আছিস।”

“বাবা জানলো কী করে?”

“জানি না!”

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। সে অবশ্য বলেছিল তারা নাকি আমাকে খুঁজবে না। হয়তো সে বাবাকে বলেছিলো। আসলে জিজ্ঞেস করতে হবে। মায়ের সাথে কথা শেষে তাকে ফোন করলাম। সে ধরলো না।

.
ফিরতে ফিরতে তার দুপুর হলো। আমায় দেখে হেসে বলল, “আছ কেমন?”

আমি হাসলাম। তার জ্বলজ্বলে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে বললাম, “ভালো আছি। তোমার সাথে থাকলে আমি ভালোই থাকব।”

সে ভুরু নাচিয়ে বলল, “সিরিয়াসলি? এত বিশ্বাস করো কেন?”

“এসব বাদ দাও। আগে খাবে চলো।”

আমি প্রথম তার জন্য রান্না করেছি। তার পছন্দের আইটেম কোনগুলো তাও জানা নেই। নিজের আন্দাজে যা ভালো মনে হয়েছে করেছি৷ সে খাবার মুখে না দিয়েই বলল, “মজা হয়েছে। ভালো রান্না পারো।”

“না খেয়েই আন্দাজে প্রশংসা আমি নেই না।”

সে কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, “নিও না!”

খেয়ে আর ভালো খারাপ কিছু বলল না। আজব লোক!

সারাদিন কোথায় ছিল জানতে চাইলে খুলে বলল সব৷ তানজিম ভাই তার বন্ধুর পাশাপাশি বিজনেস পার্টনার। সিলেটে তাদের বিরাট ফ্যাশন হাউজ আছে। সে টাকা ইনভেস্ট করলেও স্বশরীরে এখানে ছিল না। তানজিম ভাই একাই দেখাশোনা করতো। এখন সে নিজেও কাজ করবে। সে টাকা দিয়ে আর তানজিম ভাই শ্রম দিয়ে ব্যবসাটা শুরু করেছে। এখন ব্যবসার অবস্থা ভালো চলছে। তানজিম ভাই কাজের মানুষ। শ্রম দিয়ে অল্প সময়ে ফ্যাশন হাউজটাকে ছোট থেকে এতবড় করেছে।

প্রশ্ন করলাম, “তানজিম ভাইয়েরটা বুঝলাম, কিন্তু তুমি তোমার বাবার ব্যবসা রেখে এটা শুরু করতে গিয়েছিলে কেন?”

“মূলত আমি তানজিমকে সাহায্য করছিলাম। বেচারা চাকরি পাচ্ছিলো না। আমি আইডিয়া দিয়েছিলাম ব্যবসা করতে। তবে তার মূলধন ছিল না। আমি দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে এমনিতে টাকা নেবে না বলে পার্টনার হিসেবে দিতে হয়েছে।”

“কিন্তু ঢাকা রেখে এখানে কেন?”

“যেহেতু ও কাজটা করছে, ওর বাড়ি, চেনাজানা সবই এদিকে, তাই এখানটাই পারফেক্ট জায়গা ছিল। ঢাকায় হলেও আমি সময় দিতে পারতাম না। আর ওরও অসুবিধা হয়ে যেতো।”

“আর এখন যে তার সাথে কাজ করতে এসেছ হুট করে, এটা সে মেনে নেবে?”

সে হেসে বলল, “কেন মানবে না? তাছাড়া আগেই বলে রেখেছিলাম আসতে পারি।”

“তার মানে তুমি সব আগে থেকে ঠিক করে এসেছিলে?”

“নাহ। তবে ভেবেছিলাম এমন কিছু হতে পারে। তাই ব্যাকআপ প্ল্যান ছিলো এটা।”

“আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। কী হবে বলোতো?”

“চিন্তা করো না, মন দিয়ে সংসার করো। মনে করো এটাই তোমার শ্বশুরবাড়ি। তেমন করে থাকো।”

আমার মন বলছে এসব ঠিক হচ্ছে না। এদিকে আমরা আমাদের মতো সব গুছিয়ে নিচ্ছি, ওদিকে না জানি কী হচ্ছে! শ্বাশুড়ি মা নিশ্চয়ই ভাববেন আমি তাকে তার ছেলের থেকে আলাদা করে দিয়েছি! জীবনে কেনোদিন মেনে তো নেবেনই না,উল্টে অভিশাপ দেবেন! অভিশাপের সংসার কি সুখী হবে?

(চলবে)

সুমাইয়া আমান নিতু

#অপূর্ব_সমাপ্তি
পর্ব- ৯

দুই মাস হয়ে গেল আমরা এসেছি৷ একেবারে যেন তুলোর মতো উড়ে উড়ে সময়গুলো চলে গেলো! আমার কাছে এই নতুন অচেনা জায়গায় নিজের মতো করে সংসার করার অনুভূতিটা প্রতি মুহূর্তে আনন্দ দেয়। একটা মেয়ের এমন স্বপ্নই তো থাকে! এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে কল্পনার মতো চমৎকার একটা মানুষের সাথে জীবন কাটানোর। না আছে কোনো লোকের কথা, না আছে সমাজের ভয়, আত্মীয়স্বজনের ভিড়ভাট্টা…কিচ্ছু না।

সে সকালে উঠে খেয়ে অফিসে চলে যায়, ফেরে সন্ধ্যায়। আমার দিন কাটে ঘরের কাজ করে, রান্না করে, বই পড়ে আর টিভি দেখে। মায়ের সাথে, আপার সাথে, ঝিনুর সাথে ফোনে কথা হয়। কখনো বা বিকেলে সে আগে আগে ফিরে আমাকে নিয়ে সে হাঁটতে বের হয়। চা বাগান দেখাতে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর চা খেতে খেতে সারাদিনের গল্প বলে, ক্লান্ত থাকলে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যায়। আমি অপলক তার অপূর্ব মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকি অনেক…অনেকক্ষণ…এইতো..আর কী চাই জীবনে?

তার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলেও সে জবাব দেয় না। এড়িয়ে যায় সযত্নে। আমিও তাই আগ্রহ দেখাই না। তারটা সে বুঝুক। আরেকটা আশ্চর্যের বিষয় হলো সে আমাকে পড়াশুনার কথা বলে না। এ পর্যন্ত একটিবারও বলেনি। আমি অবশ্য বেঁচে গেছি পড়া থেকে মুক্তি পেয়ে৷ তবে অবাকও হয়েছি।

এদিকটায় প্রায়ই ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। কাছেপিঠে বাড়িঘর না থাকায় রাতের বেলা পুরো বাড়ি গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায়। এক রাতে এই আঁধারের মাঝে সে আমাকে ছাদে নিয়ে গেল। আকাশে পূর্ণচন্দ্র উঠেছে। চারপাশ ভিজে যাচ্ছে রূপালী আলোয়। দূরের নদীর পানি চিকচিক করছে। আর খোলা জায়গায় ঝাঁকড়া গাছের বিশালাকার ছায়া ভুতুড়ে এক আবহ সৃষ্টি করেছে। তবে সে হাত ধরে থাকায় ভয় হচ্ছে না একটুও।

সে আমাকে ছাদের কোণায় নিয়ে গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মতো প্রশান্তিগুলো হৃদয় ভেদ করে গেল, অনুভব করলাম তার শরীরের উষ্ণতা। অনেক সময় পার হলো। সে হঠাৎ বলল, “মনে করো আমি অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেলাম, কাজকর্ম করতে পারি না, ঠিকভাবে চলাফেরাও করতে পারি না। তোমার ওপর ভরসা করে চলতে হয়। তখন তুমি আমাকে এখনকার মতো করে ভালোবাসবে?”

আমি হেসে ফেলে বললাম, “সময় বলে দেবে। তাছাড়া উল্টোটাও তো হবে। তখন?”

“উমম…সেটাও নাহয় সময় বলে দেবে। আচ্ছা, তুমি আমাকে কখনো ভুল বুঝবে না তো?”

“তোমায় কেন ভুল বুঝব?”

“বলো না তুমি! যদি পরিস্থিতি তেমন হয়, ভুল বুঝবে না তো?”

“নাহ।”

“কক্ষনো না?”

“কক্ষনো না!”

“তোমার শ্বশুরবাড়ির সবার সাথে দেখা করতে, তাদের সাথে থাকতে ইচ্ছে করে?”

আমি চুপ করে রইলাম। সত্যি বলতে ইচ্ছে করে না। শ্বাশুড়ি মায়ের কথাগুলো কানে বাজে। “তুমি কারো সাথে মানিয়ে নিতে পারবে না!”

আমার নিরবতার সে কী মানে বের করল জানি না। সেও চুপ হয়ে গেল। আকাশ থেকে হঠাৎ তারা খসে পড়লো। সে আরেকটু শক্ত করে আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, “তারা খসার সময় কিছু চাইলে নাকি পূরণ হয়?”

“কার কাছে চাইবে?”

“জানি না।”

“আল্লাহর কাছে চাও, তিনি যেন আমাদের জীবনে এমন ধ্বস না আনেন।”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “চাইলাম!”

.
পরদিন সকালে আমাদের জাফলং যাওয়ার কথা। খুব ভোরে উঠে দেখি সে পাশে নেই। পুরো বাড়ির কোথাও নেই। ফোনটা ফেলে গেছে। এত সকালে অফিসে যাওয়ার কথা না। অনেকটা সময় হয়ে গেল, তবুও সে এলো না। অফিসে ফোন করে দেখি সেখানেও নেই।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল, তার কোনো খবর নেই। এর মাঝে হুট করে আবির্ভাব হলেন তারানা জামান, আমার একমাত্র শ্বাশুড়ি।

আমি আমার ঘরে বসছিলাম। নিচে কথার শব্দ শুনে ভাবলাম সে এসেছে৷ ছুটে নিচে নেমে দেখি শ্বাশুড়ি মা। হঠাৎ অজানা ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো। আমি মাথায় কাপড় দিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালাম। উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “কেমন আছ মা?”

আমি থতমত ভাব কাটিয়ে বললাম, “আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনার শরীর কেমন?”

“এইতো আছি।” তারপর মা খালাদের মতো করে বললেন, “এতদিন হয়ে গেল, তুমি একটা ফোনও করলা না আমাকে, শরীরটা খারাপ খবরও নিলে না।”

আমি সত্যি লজ্জা পেলাম। খবর নেয়া উচিত ছিল। তার মধ্যে আবার এই অসুস্থ অবস্থায় তার ছেলেকে নিয়ে এখানে চলে আসাটাও আটকানো দরকার ছিল। শুনেছি সে নাকি ছেলের হাত ছাড়া খেতোই না! সব মিলিয়ে আমার ভারি অনুশোচনা হতে লাগলো। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

উনি বললেন, “কেমন চলছে তোমার সংসার?”

“ভালো।”

“ঝগড়া টগড়া হয় নাকি?”

“না।”

“তবে তো ভালোই। সিলেট মিশন সফল হলো। ও তোমার সাথে মানিয়ে নিতে পেরেছে।”

সিলেট মিশন মাথায় ঢুকলো না। এদিকে জহিরুল এসে বলল, “ম্যাডাম আপনার ঘরের সব ঠিকঠাক করে দিছি।”

“কোন ঘর?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

জহিরুল বলল, “ম্যাডামের ঘর।”

সেই নিচতলার তালা মারা ঘরটা! মায়ের সাথে সে ঘরে ঢুকলাম। ঢুকেই বিষ্ময়ে হা হয়ে রয়ে গেলাম। ঘরটা অন্যসব ঘরের চেয়ে আলাদা। প্রচুর আসবাপত্র। সবচেয়ে বড় কথা, ঘরের দেয়ালে বড় একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি টানানো। ছবিটা ওর সাথে ওর বাবা, মা, ভাই, বোন। কক্সবাজার সমূদ্র সৈকতে তোলা ছবি। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।

আমাকে অবাক হতে দেখে মা বললেন, “এটা দু’বছর আগের তোলা। আমার ইচ্ছে ছিল বড় করে বাঁধিয়ে রাখবো ছবিটা। কিন্তু তোমার শ্বশুর আবার নামাজ পড়ে তো, তাই ওবাড়ির কোনো দেয়ালে ছবি টানাতে দেয় না। এখানে থাকা হয় না তেমন, তাই এখানে টানিয়ে রেখেছি।”

তার মানে কী? এই বাড়িটা ওদের? তবে যে বলেছিলো তানজিম ভাইয়ের?

মা সাথে ব্যাগ আনেননি। আলমারির চাবি দেখলাম তার কাছেই। পার্স থেকে চাবি বের করে আলমারি খুললেন। প্রচুর শাড়ি, কসমেটিকসে ভরা আলমারি। উনি বললেন, “আমার যেসব জিনিস না হলেই চলে না, সেসব এখানে সবসময় থাকে। যখন তখন চলে আসি তো, এ বাড়িটাতে শান্তি লাগে আমার। এই ঘরটাতেও। কেউ ঢুকে যাতে নোংরা না করতে পারে, তাই অন্য সময় তালা দেয়া থাকে। জহিরুল অবশ্য মাঝে মাঝে ঢুকে পরিষ্কার করে।”

আমার মাথা দপদপ করতে শুরু করলো। একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই ঘরে কী আছে। ও বলেছিল এখানে নাকি তানজিম ভাইয়ের জিনিসপত্র আছে। তাই তালা দেয়া। ও আমাকে এসব মিথ্যে কথা কেন বলল? এবাড়িটা তাদের সেটা বললে কি আমি থাকতাম না?

মা ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে এসেছেন। শাড়ি পাল্টে একটা সুতির শাড়ি পরেছেন। এই বয়সেও উনার ফিগার সুন্দর। বয়স কম লাগে, যদিও বড় অসুখ থেকে উঠেছেন বলে চেহারায় একটা অসুখের ছাপ পড়ে গেছে। উনি বললেন, “এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন, বসো।”

আমি চাবি দেয়া পুতুলের মতো খাটে গিয়ে বসলাম৷ উনি বললেন, “আমার ছেলেটা ছোটবেলা থেকে আমার ন্যাওটা। আমার পরামর্শ ছাড়া কিচ্ছু করতে পারে না। আমি তাকে যখন বললাম ডিভোর্স দিতে তোমাকে, তখন সে রাজি হলো না। উল্টে আমাকেই বলল কোনো উপায় বের করতে। সে তোমার সাথে থাকতে চায়। তাই আমি বললাম কিছুদিন দূরে গিয়ে থাকতে। যাতে তোমাদের মধ্যে বোঝাপড়া হতে পারে। যদি তোমরা মানিয়ে নিতে পারো, তো ভালো। নয়তো ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক। অবশ্য ছেলে বলল, তুমি নাকি খুব লক্ষী। মানিয়ে গেছ তার সাথে।”

ও আচ্ছা এই ছিল সিলেট মিশন! বাহ! আমি কিছুতেই বুঝলাম না এত নাটকের কী প্রয়োজন ছিল? সব বলে দিলে কি আমি আসতাম না?

মা বলে চলেছেন, “ছেলে ছাড়া আমি কি আর থাকতে পারি? তাই চলে এলাম৷ কয়েকটা দিন এখানে থেকে তারপর তোমাদের নিয়ে একসাথে ফিরব ঢাকায়।”

এসময় বাইরে তার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সে সোজা এঘরে এসে ঢুকলো। মা’কে দেখে প্রায় ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। অনেকটা সময় চলল তাদের মা ছেলের মিলন দৃশ্য। সে মায়ের পায়ের কাছে বসে বলল, “আমাকে ক্ষমা করে দিও মা।”

মা তার কপালে চুমু খেয়ে বললেন, “তুই যা করেছিস, ঠিক করেছিস।”

“আচ্ছা, তুমি কী করে এলে? আমি সেই ভোরবেলা থেকে এয়ারপোর্টে গিয়ে বসে আছি। ফোনটা ভুলে নিয়ে যাইনি। তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে পাগলপ্রায় অবস্থা হয়েছিল।”

“প্লেনে আসতে ইচ্ছে করেনি। গাড়িতেই চলে এলাম। আর তোর মোবাইলে আমি টেক্সট করেছিলাম। দেখিসনি?”

“নাহ।”

“সমস্যা নাই। মায়ের জন্য একটু কষ্ট করেছ, এখন যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।”

সে ঘরের বাইরে নিয়ে এসে আমাকে বলল, “তুমি আজকে ইলিশ মাছ আর খাসির মাংস রান্না করবে। মায়ের পছন্দ এগুলো। আর হ্যাঁ, সাথে টমেটো ছাড়া সালাদ। একেবারে কুচি কুচি করে। ঠিক আছে?”

তারপর জহিরুলকে কিছু জিনিস আনতে বলে আবার মায়ের ঘরে ঢুকে গেল। আমি তখনো সেখানেই স্থির হয়ে আছি। সে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলল, “দাঁড়িয়ে থেকো না, হারি আপ! মা জার্নি করে এসেছেন।”

আমি তবুও দাঁড়িয়ে। সব হজম করতে পারছি না। জহিরুলের ডাকে সম্বিত ফিরল। “ভাবী, রান্না বসাইবেন না?”

আমার জীবনটার মতোই রৌদ্রজ্জ্বল দিনটা হঠাৎ আঁধার হয়ে এলো। মেঘ ডাকতে শুরু করলো ক্ষণে ক্ষণে আর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো।

(চলবে)

সুমাইয়া আমান নিতু

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ