Friday, June 5, 2026







ধূসর শ্রাবণ পর্ব-০৬+০৭

#ধূসর শ্রাবণ
#লেখিকা:#তানজিল_মীম💚
#পর্ব-০৬+০৭

সময়টা অস্থায়ী! তাই তো এই অস্থায়ী সময়টার সাথে চলতে গিয়ে প্রায় থ মত খেতে হয় আমাদের। ব্যস্ত এই সময়ের ব্যস্ত এই শহরে মানুষের আনাগোনাও প্রখর। আর এই ব্যস্ত মানুষদের ভিড়েই ঢাকা এয়ারপোর্টের অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র বর্ষার পরিবার। সাধারণত শুভ্র বর্ষাকে বিদায় দেওয়ার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে ওনারা। শুভ্রের মা আর বর্ষার মা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে খুব। ছেলেমেয়ে দুটোকে বিদায় দিতেই এসেছে ওনারা এখানে। শুভ্রকে অনেক কিছু বুঝিয়ে বলছে শুভ্রের বাবা। বিয়ের পর থেকেই দেখছে ছেলেটা খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। এমনিতেও শুভ্র একটু গম্ভীর টাইপের। কিন্তু বিয়ের পর যেন এর গভীরতা আরো বেশি হয়ে গেছে যার জন্য একটু টেনশনও হচ্ছে শুভ্রের বাবার।’

অতঃপর সবাইকে বিদায় জানিয়ে পাশাপাশি হেঁটে ফ্লাইটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো শুভ্র আর বর্ষা। পিছন ফিরে আরেকবার তাকালো বর্ষা আপনজনদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে অনেকদূরে। যদিও সে জানে না সামনের দিনগুলো আসলে কেমন কাটবে তাঁর। তপ্ত নিশ্বাস ফেলে চোখে পানি মুছে এগিয়ে যেতে লাগলো সে শুভ্রের পিছু পিছু। বাকি সবাইও প্রায় নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে রইলো শুভ্র বর্ষার যাওয়ার পানে।’

_

প্লেনের মাঝ বরাবর সারিতে উইন্ডো সিটে বসে আছে বর্ষা। নার্ভাস লাগছে খুব, লাইফে ফাস্ট টাইম ফ্লাইটে উঠেছে সে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য। বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পেটার মতো কম্পিত শব্দ হচ্ছে খুব। এতটাই অস্থিরতা ফিল হচ্ছে তাঁর যে শরীর সমেত কাঁপছে। কাঁপা কাঁপির ঠ্যালায় দু’বোতল পানি শেষ করে ফেলেছে কয়েক মুহূর্তে। তিন বারের বার পানি আনার জন্য কাউকে ডাকার জন্য পরিকল্পনা করতেই তাঁর পাশে বসে থাকা শুভ্র বিরক্ত নিয়ে তাকালো বর্ষার দিকে। তারপর বললো,

‘ হচ্ছেটা কি? তুমি কি সোজা হয়ে বসতে পারো না আর এতবার পানি খাওয়ার কি আছে?’

শুভ্রের কথা শুনে কেঁপে উঠলো বর্ষা। তক্ষৎনাত কাঁপা কাঁপা গলায় বললো সে,

‘ বিশ্বাস করুন আমার না ভীষণ ভয় করছে,শরীর কাঁপছে গলা শুকিয়ে আসছে।’

‘ এতো ভয় পাওয়ার কি আছে?’

‘ প্লিজ আমার উপর বিরক্ত হবেন না। আসলে প্রথমবার ফ্লাইটে করে কোথাও যাচ্ছি তো। কোনো ব্যপার না আমি আর পানি খাবো না।’

এতটুকু বলে হাত থেকে পানির বোতল সরিয়ে ফেলতে নিলো বর্ষা। কিন্তু আশেপাশে কোথায় রাখবে সেটাই বুঝতে পারছে না। বর্ষার কাজে আরো বিরক্ত শুভ্র। গম্ভীর কণ্ঠ নিয়ে বললো,

‘ আমার কাছে দেও?’

সাথে সাথে বর্ষাও দু’সেকেন্ড দেরি না করে হাতের বোতলটা এগিয়ে দিলো শুভ্রের কাছে। তারপর শুকনো হেঁসে জানালার বাহিরে তাকালো সে। এদিকে শুভ্র একজন লেডি এয়ারহোর্স্টকে ঢেকে আরেক বোতল পানি আনিয়ে রাখলো বর্ষার আড়ালে। এরই মধ্যে মাইকে এনাউন্সমেন্ট করা হলো আর দশ মিনিটের মধ্যেই তাদের ফ্লাইট লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবে। যাত্রীরা যেন তাদের সিটবেল্ট খুব যত্ন সহকারে চটজলদি লাগিয়ে ফেলে। মাইকের এনাউন্সমেন্ট শুনে শুভ্রসহ ফ্লাইটের সবাই তাদের সিট বেল্ট লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বর্ষাও হাতে নিলো সিটবেল্ট কিন্তু নার্ভাসের কারনে হাত কাঁপছে তার যার দরুন ঠিকভাবে লাগাতে পারছে না সে। বর্ষার কান্ড খেয়াল করলো শুভ্র অতপর দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বর্ষার কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে সিটব্লেট লাগাতে লাগাতে বললো,

‘ এত নার্ভাস হওয়ার কি আছে, ভুলে কেন যাচ্ছো তুমি একা নও আমিও তো আছি তোমার সঙ্গে।’

যদিও কথাটা শুভ্র কিছুটা বিরক্তির ভাব নিয়েই বললো তারপরও শুভ্রের কথা শুনে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল বর্ষার ভিতর দিয়ে। যার কারনে আনমনেই মুখে হাসি ফুটলো তাঁর। কিন্ত সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকলো না বর্ষার ঠোঁটে । হঠাৎই পুরো প্লেন জুড়ে কম্পিত এক ধাক্কা খেতেই চমকে উঠলো সে। সঙ্গে সঙ্গে ঘাবড়ে গিয়ে শুভ্রের হাত ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো তক্ষৎনাত। চোখ বন্ধ করে নিলো নিমিষেই। চোখ, মুখ, ঠোঁট অনবরত কাঁপছে তাঁর। শুভ্র বেশ অবাক হয়েই তাকিয়ে রইলো বর্ষার মুখের দিকে। সে বুঝে না এতটা ভয় পাওয়ার কি আছে?’

এরই মধ্যে প্লেন চলতে শুরু করলো ধীর গতিতে। শুরুতে আস্তে আস্তে চললেও ধীরে ধীরে এর প্রবনতা হলো গভীর। সামনে যত এগোচ্ছে বর্ষার হৃৎপিণ্ড যেন ততই তড়িৎ গতিতে বাড়তে লাগলো। হাত কাঁপছে, শরীর কাঁপছে, বুকের ভিতর দক দক করছে সব মিলিয়ে বিশ্রী এক অবস্থা।’

শুভ্র তখনও শুধু তাকিয়ে আছে বর্ষার এমন ভয়ার্ত মুখের দিকে। না চাইতেও ভিতর থেকে কেমন যেন হাসি পাচ্ছে তাঁর যদিও কারো ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে হাসাহাসি করতে নেই কিন্তু তারপরও হাসি পাচ্ছে শুভ্রের। নিজের হাসিটাকে দমিয়ে রেখে কোনোমতে স্থির বা সোজা হয়ে রইলো সে। এরই মধ্যে ধীরে ধীরে আকাশ পথে পাড়ি জমাতে লাগলো তাদের প্লেন। বর্ষা তাঁর নখ দিয়ে খামচে এতটাই শক্ত করে ধরে আছে শুভ্রের হাত যে এখন শুভ্র ব্যাথা অনুভব করছে একটু। তবে ঠোঁট চেপে পুরোপুরি ব্যাথাটাকে হজম করে নিলো সে।’

কিছুক্ষন পর,

প্লেন জমিন ছেড়ে আকাশ পথে ভাসছিল তখন। ধীরে ধীরে বর্ষার মন,মস্তিষ্ক সবকিছুই শান্ত হতে লাগছিল ধীরে গতিতে। বর্ষা আস্তে আস্তে তাঁর চোখ খুলতে লাগলো। চোখ এতটাই শক্ত করে চেপে রেখেছিল যে শুধুতে ঝাপসা ঝাপসা লাগছিল সবকিছু্। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে তাকালো সে শুভ্রের দিকে। শুভ্র তখন স্থির দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল বর্ষার পানে। শুভ্রকে নিজের দিকে এক এংগেলে তাকিয়ে থাকতে দেখে চটজলদি নিজের হাত সরিয়ে অস্পষ্টনীয়ভাবে নিজের হাসিটাকে ঠোঁটে রেখে বললো,

‘ সরি।’

সাথে সাথে দৃষ্টি সরালো শুভ্র বর্ষার উপর থেকে। নিজের ডান হাতটাকে শক্ত করে চেপে ধরলো তক্ষৎনাত ব্যাথায় হাল্কা জ্বলছে জায়গাটা। হয়তো বর্ষার নখের আঁচড়ে ছিলে গেছে একটু। কাংখিত বিরক্ত নিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে নিয়েও আবার কিছু বললো না সে। শুভ্রের কাজে ভীত হয়ে বসে রইলো বর্ষা। এদিকে শুভ্র ভাবছে,

‘ এই মেয়ের সাথে সারাজীবন সংসার করবে কি করে? আঘাতে আঘাতে মনে হয় ক্ষত বিক্ষত করবে তাঁকে।’

চোখে মুখে স্পষ্ট রাগের ছাপ শুভ্রের। এই কয়েকদিন নিজেকে সামলে নিতে পারলেও এখন যেন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে বর্ষা। যখন তখন রাগের বসে যা খুশি তাই করে ফেলতে পারে শুভ্র। চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে লাগলো শুভ্র। হয়তো রাগ কমানোর প্রচেষ্টা!’

এদিকে শুভ্রের কান্ডে খুব বলতে ইচ্ছে করছিল বর্ষার ‘এত রাগ করেন কেন আমি তো একটু ভয়ে পেয়েছিলাম শুধু? আপনি না খুবই ভয়ানক’

কিন্তু কথাটা আর বলা হয়ে উঠলো না শুভ্রকে। বর্ষার ভিতরের ঠোঁট পর্যন্তই আঁটকে রইলো সেই কাঙ্ক্ষিত বাক্যগুলো অস্পষ্টনীয় শব্দগুলো।’

হঠাৎই চোখ গেল বর্ষার শুভ্রের হাতের দিকে সাথে সাথে কেঁপে উঠল সে। তাঁর নখের আঁচড়ে পুরো লালচে হয়ে গেছে জায়গাটা। তাই হয়তো ব্যাথায় আর রাগে চোখ বন্ধ করে রেখেছে শুভ্র। বর্ষার ইচ্ছে করছে হাতটা ধরে মলম লাগিয়ে দিতে কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছে না মটেও, যদি রেগে যায় শুভ্র নামক এই ভয়ানক ব্যক্তিটি।’

তাই মনের এর কাঙ্ক্ষিত বাসনা নিয়েই চুপচাপ বসে রইলো বর্ষা নিজের সিট জুড়ে।’

____

রাত নয়টা কি দশটা। রাস্তার পাশ জুড়ে থাকা আলোকিত ল্যামপোস্টের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে হিয়া। কিছুটা বিরক্ত লাগছে তাঁর, নিজের প্রান প্রিয় ডাইরিটা কি করে যে শিফাদের বাড়িতে রেখে আসলো এটাই যেন বুঝলো না সে। তাই তো সেটা আনতেই এই রাতের বেলা বাড়ি থেকে বের হতে হয়েছিল তাঁকে। যদিও আরো কয়েক ঘন্টা আগে বেরিয়ে ছিল এখন বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যেই হাঁটছে। আশেপাশে মানুষের আনাগোনা খুব কম। যার দরুন হাল্কা ভয় ভয়ও করছে তাঁর। তাদের এলাকায় একটা কুকুর আছে, যেটা প্রায় এই টাইম করে ঘেউ ঘেউ করে যার কারনে আরো বেশি ভয় হচ্ছে হিয়ার। ছোট বেলা থেকেই কুকুরকে ভীষণ ভয় পায় সে। সেই ছোট বেলায় কবে টিউশন পড়তে গিয়ে দৌড়ানি খেয়েছিল কুকুরের সেই ভয় এখনো আছে তাঁর। হিয়া যত পারে তাদের এলাকার সেই কুকুরটাকে এড়িয়ে চলে। আজও মনে মনে চাইছে কুকুরটার সাথে যেন দেখা না হয়। মনে মনে আল্লাহর নাম নিয়ে ভীত শরীর নিয়ে আস্তে আস্তে এগোচ্ছিল সে। এমন সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটা রিকশা এসে থামলো তার সামনে। হুট করে এমনটা হওয়াতে পুরোই কেঁপে উঠল হিয়া সামনেই রিকশাওয়ালাকে দেখে নিজেকে সামলে নিয়ে পাশ কেটে চলে যেত নিলো সে। হিয়াকে যেতে দেখে বলে উঠল রিকশাওয়ালা,

‘ কোথায় যাবেন আফা? আমি আমনেরে পৌঁছাই দেই?’

রিকশাওয়ালার কথা শুনে ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো হিয়া। পিছন ঘুরে মুচকি হেঁসে বললো সে,

‘ তাঁর আর দরকার পড়বে না চাচা আমি প্রায় এসে গেছি।’

বলেই যেতে নিলো হিয়া। হিয়াকে যেতে দেখে বলে উঠল রিকশাওয়ালা,

‘ আপনে নাকি কুকুরে ভয় পান তাই স্যার কইলো আফনার বাড়ির গেটের লগ দি নামাই দিতে।’

রিকশাওয়ালার কথা শুনে চোখ বড় বড় হয়ে যায় হিয়ার। আশ্চর্য সে যে কুকুরে ভয় পায় এ কথাটা রিকশাওয়ালা কি করে জানলো আর স্যারটাই বা কে?’ হিয়া অবাক হয়ে বললো,

‘ কোন স্যার?’

‘ নাম কইতে মানা করছে।’

এবার বিরক্ত লাগলো হিয়ার। আশ্চর্য নাম বলে নি কেন কোনোভাবে নির্মল নয় তো কিন্তু এই মুহূর্তে নির্মলের তো চেম্বারে থাকার কথা তাহলে। হিয়ার ভাবনার মাঝেই আবারো বলে উঠল রিকশাওয়ালা,

‘ কি হলো আহেন আফা একলা একলা গেলে ভয় পাইতে পারেন।’

হিয়া বিরক্ত হলো খুব। বিরক্ত নিয়েই বললো সে,

‘ কে বলেছে আমি কুকুরে ভয় পাই, আমি কিছুতেই ভয় পাই না বুঝেছেন।’

‘ কিন্তু আফা?’

‘ কোনো কিন্তু নয় আপনি জান আপনার কাজে।’

বলেই হন হন করে এগিয়ে যেতে লাগলো হিয়া। আশ্চর্য কুকুরে ভয় পায় দেখে কি এখন রিকশাওয়ালাও তাঁকে নিয়ে মজা নিবে নাকি। আর কে না কে তাঁর কথা শুনে হুট করে রিকশায় চড়ে বসবে তারপর হেতে বিপরীত কিছু হয়ে গেলে তখন?’

নানা কিছু ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চললো হিয়া সামনে। হঠাৎই একটা মোড় আসায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো হিয়া কারন সে যেটার ভয় পাচ্ছিল সেটাই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আজকে আর ভাগ্য তাঁর সহায় হলো না। তাঁর থেকে কয়েককদম দূরেই একটা অটোরিকশার কাছ দিয়ে বসে আছে কুকুরটা। হিয়া ভয়ে ভয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেত লাগলো তাঁর পাশ দিয়ে। বুক কাঁপছে তাঁর এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে রিকশাওয়ালার কথাটা তাঁর শোনা উচিত ছিল। এই জন্যই বলে ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’

হিয়া আস্তে আস্তে চুপচাপ কুকুরটার পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো কয়েককদম এগোতেই হঠাৎই কুকুরটা ঘেউঘেউ করে উঠলো দু’বার সাথে সাথে হিয়া ঘাবড়ে গিয়ে ‘ ও মা বাঁচাও’

বলতে বলতে দিল দৌড়। কতদূর যেতেই আচমকাই কেউ একজন হিয়ার হাত ধরে দিলো টান সাথে মুখ চেপে ধরলো তক্ষৎনাত। হিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো সামনের মানুষটার দিকে। সাথে সাথে কাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটা বলে উঠল তাঁকে,

‘ তোমরা মেয়েরা এত বেশি বুঝো কেন বলো তো? রিকশা পাঠিয়েছি আরাম করে চলে আসবে তা না। বেশি বুঝে নিজেও বিপদে পড়বে আর অন্য মানুষকেও বিপদে ফেলবে।’

#চলবে…..

#ধূসর_শ্রাবণ💚
#লেখিকা:#তানজিল_মীম💚
#পর্ব-০৭
________________
ভয়ে জড়সড় হয়ে তাকিয়ে আছে হিয়া সামনের ছেলেটির মুখের দিকে সে ভাবে নি এই মুহূর্তে তাঁর সামনে নির্মল দাঁড়িয়ে থাকবে। হিয়া অস্পষ্টনীয় ভাবে তার মুখ ধারা উচ্চারন করলো ‘উম উম’। হিয়ার কথা শুনে ওর মুখের আরো একবার তাকিয়ে বেশ ভাবনাহীন ভাবেই বললো নির্মল,

‘ কি বললে তুমি?’

উওরে আবারো উম উম উচ্চারন করলো হিয়া যার অর্থ আমার মুখের ওপর থেকে আপনার হাত সরান। হিয়ার এবারের প্রতিধ্বনি শুনে নির্মল বুঝতে পেরে চটজলদি নিজের হাতটা সরিয়ে বললো,

‘ হুম এখন বলো?’

সঙ্গে সঙ্গে তেলেবেগুনে এক হয়ে রাগী কন্ঠ নিয়ে জোরে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো হিয়া,

‘ আপনি কি পাগল এইভাবে কেউ কারো মুখ চেপে ধরে থাকে নাকি আর একটু হলেই তো জানটা বেরিয়ে যাচ্ছিল।’

হিয়ার কথা শুনে নির্মল কিছুটা হতাশ হয়ে বললো,

‘ খুব বেশি কষ্ট পেয়েছো?’

‘ 😒😒😒

‘ ওভাবে তাকাবে না?’

‘ আপনি মানুষটা তো ভাড়ি অদ্ভুত আর এতরাতে এখানে কি করছেন?’

‘ কি করছি মানি তোমার জন্যই তো আসা লাগলো যাইহোক রিকশায় ওঠো নি কেন? সেই তো কুকুরের ভয়ে দৌড়ানি দেওয়া লাগলো।’

‘ দেখুন বেশি বাজে বকবেন না আমি একদমই ভয় পাই নি।’

‘ হা তা তো তোমার চোখ দেখেই বুঝতে পারছি। তোমরা মেয়েরা না কেমন যেন একটা জিনিসে ভয় পাও সেটা সহজে শিকার করতে চাও না।’

‘ আপনার কথা বলা শেষ হলে বলুন আমি বাড়ি যাবো।’

‘ হুম জানি তো, দাঁড়িয়ে আছো কেন যাও?’

বলেই হিয়ার সামনে থেকে সরে আসলো নির্মল। নির্মলকে সরতে দেখে হিয়া মিটমিট চোখে আশেপাশে তাকালো কুকুরটা আগের ন্যায় সে যে রাস্তা দিয়ে যাবে সেখানেই বসে আছে। যেটা দেখে হিয়া শুকনো ঢোক গিললো। হিয়ার কান্ডে হাসলো নির্মল তারপর গম্ভীর কণ্ঠ নিয়েই বললো সে,

‘ কি হলো এখনো দাঁড়িয়ে আছো কেন যাও বাড়ি?’

নির্মলের কথা শুনে হাল্কা কেঁপে উঠল হিয়া তক্ষৎনাত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো সে,

‘ এমন করছেন কেন?’

‘ আমি কি করছি যা করার সব তো তুমি করেছো।’

‘ আমি কি করেছি?’

হিয়ার এবারের কথা শুনে বেশ সিরিয়াসভাবেই হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো নির্মল,

‘ তুমিই তো করেছো সবকিছু আমার হৃদয়টাকে ক্ষনে ক্ষনে আঘাত করছো কারনে অকারণেই বার বার।’

নির্মলের কথা নির্বিকার ভঙ্গিতে নির্মলের দিকে তাকালো হিয়া। হিয়াকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে আবারো বললো নির্মল,

‘ আমায় কি একবার ভালোবাসা যায় না প্রিয়দর্শিনী?’ আমি কি সত্যি খুব খারাপ?’

নির্মলের এবারের কথা শুনে বেশ অবাক হয়েই তাকালো হিয়া নির্মলের মুখের দিকে। দু’জনের চোখাচোখি হলো খুব, দুজনেই তাকিয়ে দু’জনের পানে। নির্মলের চোখ তো অনেক কিছু বলছে কিন্তু সেই চোখের ভাষা কি হিয়া বুঝতে পারছে হয়তো পারছে হয়তো না। রাতের আকাশের তাঁরারা ঝলমল করছে আজ, অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গাছেরাও নড়ছে ভীষণ। গা ছমছম করা হিম শীতল কি ঠান্ডা বাতাস।’

____

কাঁধে কারো মাথার ভাড় অনুভব হতেই ঘুম ভেঙে যায় শুভ্রের। এখনো আকাশের বুকে মেঘেদের মাঝে ভাসছে তাঁরা। শুভ্র আনমনেই তাকালো পাশ ফিরে, বর্ষার ঘুমন্ত মুখটা সবার আগে চোখে পড়লো তাঁর। ফর্সা মুখ, হাল্কা মেকাপ,মুখে মায়া মায়া একটা ভাব, বর্ষার চোখের পাপড়িগুলো বেশ বড় সাথে ঘন। যে জিনিসটা আজ প্রথম খেয়াল করলো শুভ্র। বর্ষার ফেসে একটা বাচ্চা বাচ্চা ভাব আছে যার দরুন তাঁকে বেশ ইনোসেন্ট ইনোসেন্ট লাগে। আনমনেই হাসলো শুভ্র। হঠাৎই নিজের ডান হাতের দিকে চোখ গেল শুভ্রের কেউ একজন তাঁর হাতে বেন্ডেজ করে দিয়েছে। শুভ্র বুঝতে পেরেছে তাঁর ঘুমের সুযোগ নিয়ে এই মেয়েটা অত্যাধিক হারের সাহসীকতা দেখিয়েছে। না চাইতেও আবারো হাসলো শুভ্র। আনমনেই ভাবলো,

‘ মেয়েটা ওতোটাও খারাপ না।’

তপ্ত নিশ্বাস ফেললো শুভ্র। তাকালো সে তাদের পাশে থাকা জানালার দিকে। বাংলাদেশের রাত কাটিয়ে এসেছে অনেক দূরে। যদিও সামনের জায়গাগুলো শুভ্রের জন্য নতুন কিছু নয় কিন্তু বর্ষার জন্য একদমই নতুন পরিবেশ, নতুন মানব নতুন হাওয়া, নতুন সব মুখ। শুভ্র বর্ষার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ তুমি কি পারবে আমার সাথে মানিয়ে নিতে অপ্রিয় ঘুমকুমারি?’

প্রতি উওরে হাল্কা নড়ে চড়ে উঠলো বর্ষা তবে কিছু বললো না শুভ্রের হাত জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে পড়লো আবার। শুভ্রও প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষণেই বর্ষাকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে সামলে নিলো নিজেকে।”

লন্ডনের এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য গাড়ি করে পাড়ি জমাচ্ছে শুভ্র আর বর্ষা। সামনে ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে আর পিছন সিটে পাশাপাশি বসে শুভ্র বর্ষা। বর্ষার দৃষ্টি বাহিরে, সুন্দর মিশ্রন মোলায়েম রাস্তা। লন্ডনর এই রাস্তা আর লন্ডনের প্রকৃতি দেখতেই যেন ব্যস্ত বর্ষা। সারি সারি রঙিন গাছপালা, ধবধবে সাদা রঙের মানুষ সাথে রঙবেরঙের যানবাহন।

‘ অতঃপর বলতে না বলতেই কয়েক ঘন্টার মাঝে চলে গেল তাঁরা তাদের নিজেদের গন্তব্যের কাছে।’

এক বিশাল আলিসান বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র আর বর্ষা। ডুপ্লেট ছাঁদওয়ালা বিশাল এক বাড়ি রঙটা সাদা, যার চারদিকটা রঙিন থাইগ্রাস সমৃদ্ধ, বাড়িটার ডানদিকেই রয়েছে এক বিশাল সুইমিংপুল। বাড়িটা বিশাল মাঠের মাঝ বরাবর তৈরি যার চারদিকেই রয়েছে সবুজ ঘাসের মাঝে অল্প স্বল্প গাছপালা। বর্ষা পুরো জায়গাটায় চোখ বুলালো একবার বেশ লেগেছে তাঁর বাড়িটার। শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে নিজেদের ব্যাগপত্রগুলো বের করে বর্ষাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘ চলো।’

উওরে বর্ষাও মাথা নাড়িয়ে চললো শুভ্রের পিছু পিছু।’

বিকেল ৫ঃ০০টা….

চুপচাপ বসে আছে বর্ষা ভালো লাগছে না কিছু একদম চুপচাপ আর নিরিবিলি সবটা। সকাল থেকেই সবকিছুই নিরিবিলি আর নিস্তব্ধ। শুভ্রও বাড়িতে নেই এখন এমন সময় বর্ষার ফোনটা বেজে উঠল উপরে মায়ের নাম্বার দেখে মুহূর্তেই চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো তাঁর। তক্ষৎনাত খুশি মনে বললো,

‘ হ্যালো মা কেমন আছো?’

মেয়ের কন্ঠ শুনে অপরপাশে বর্ষার মা খুশি মনে বললো,

‘ হুম ভালো তুই মা?’

এরপর দুজনের মধ্যে হলো কিছুক্ষন কথোপকথন!’

______

আকাশটা হাল্কা হাল্কা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আছে। হয়তো বৃষ্টি হবে হয়তো না। বাতাসের প্রলাপে টেবিল জুড়ে থাকা সমস্ত খাতাপত্রগুলো উড়ছে বারংবার। জানালা জুড়ে থাকা সাদা পর্দাগুলোও উড়ে চলছে খুব। বেলকনিতে থাকা ছোট ছোট গাছের পাতারাও মৃদু বাতাসে উড়ছে ভীষণ। এসবের ভিড়েই বিছানায় উল্টো হয়ে শুয়ে আছে হিয়া। পায়ে থাকা পায়েলটাও শব্দ করছে কিছুক্ষন পর পর। সাদা রঙের ডাইরিটা মুখোমুখি চোখ রেখে কিছু একটা ভাবছে হিয়া। কিন্তু যতবারই কিছু না কিছু ভাবতে যাচ্ছে তখনই নির্মলের বলা কাল রাতের কথাটা কানে বাজছে হিয়ার। আনমনেই ভাবলো সে,

‘ আচ্ছা সত্যি কি নির্মলকে ভালোবাসা যায় না? মানুষটা তো এমনিতে খারাপ নয়। একটু মারপিট করে ঠিকই কিন্তু মনটা তো ভীষণ ভালো।’

চোখ বন্ধ করে ফেললো হিয়া। হুট করে নির্মল নামের মানুষটা মাথায় কেন চেপে বসলো এটাই সে বুঝলো না!’

#চলবে…

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ