Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রজাপতির রংপ্রজাপতির রং পর্ব-১৮+১৯

প্রজাপতির রং পর্ব-১৮+১৯

#প্রজাপতির_রং🦋
#Part_18
#Writer_NOVA

—- হ্যালো লিসেনার।গুড আফটারনোন।আপনারা টিউন করে আছেন ঢাকা এফএম 90.04 ।আপনাদের শো “লাভ কমপ্লেন” নিয়ে লাভ কুইন নোভানাজ আছি আপনাদের সাথে। ফিরলাম বিজ্ঞাপন বিরতির পরপরি।ভালোবাসা নিয়ে আপনাদের কি কি অভিযোগ আছে তা আমাকে জলদী জলদী করে টেক্সট বা কমেন্ট করে জানিয়ে দিন।আমি সেই অভিযোগ গুলোর সলিউশন দেওয়ার চেষ্টা করবো।তাহলে দেরী কিসের? ভালোবাসার বিরুদ্ধে কিংবা আপনার gf বা bf এর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো করে ফেলুন চটজলদি। কথা না বলে আমি এখন কতগুলো টেক্সট পরবো।রাজশাহী থেকে সুবর্ণা আছে আমাদের সাথে। সে বলেছে আপু,একজনকে আমি অনেক ভালোবাসি কিন্তু সে আমাকে বুঝতে চায় না।ওহ সো স্যাড সূবর্ণা।তুমি নিজেকে আরেকটু ফোকাস করো তার দিকে।তাকে বোঝাও যে তুমি তাকে ভালোবাসো।তাহলে হয়তো সে তোমায় বুঝতেও পারে।তার আগে খোঁজ নিয়ে দেখো সে অন্য কাউকে ভালোবাসে কিনা।ছেলেরা কিন্তু কাউকে সত্যিকারে ভালোবাসলে অন্য কোন মেয়ের দিকে নজর দেয় না।আই হোপ তুমি তার বিষয়ে খোঁজ নিবো।গাজীপুর থেকে চঞ্চল আছে।সে বলছে একজনকে অনেক ভালোবাসতাম আপু।কিন্তু সে আমার ভালোবাসাকে পাগলামি ভেবে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আর ভালোবাসার প্রতি কোন ইন্টারেস্ট নেই। চঞ্চল ভাইয়া আপনাকে বলতে চাই একটা কথা। যা আমার তা কিন্তু আমারই।যা আমার নয় তা কখনো আমার ছিলো না আর কখনো হবেই না।আপনার ভালোবাসার মানুষটাও হয়তো আপনার নয়।তাই সে আপনার হয়নি।আর কে টেক্সট করছে আমাকে।আর কে আছে? পেয়েছি, ধানমন্ডি থেকে সজল আছে আমাদের সাথে। আপু তাকে অনেক ভালোবাসতাম।নিজের সবটুকু দিয়ে। কিন্তু সে আমাকে ঠকিয়েছে।আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে টাকাওয়ালা ছেলেকে বিয়ে করে বিদেশে স্যাটেল হয়েছে। এখন ভালোবাসাটা সিগারেটের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছি।ভাইয়া কি বলবো খুঁজতেছি।অতিরিক্ত সবকিছুই অসহ্যকর।অতিরিক্ত কিছুই ভালো না।তেমনি ভালোবাসাটা অতিরিক্ত পেয়ে গেলে আমরা অবহেলা করি।যে আপনার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে অন্যকে বিয়ে করে সুখে আছে তাকে ভেবে নিকোটিনের ধূয়া টেনে নিজের ক্ষতি কেন করবেন ভাইয়া? দিস ইজ নট ফেয়ার।এটা কিন্তু ঠিক নয়।

গলা শুকিয়ে আসছে। বোতল খুলে গলা ভিজিয়ে নিলাম।বাপরে, এই রেডিও স্টেশনে বকবক করতে করতে আমার জীবন শেষ। সারাদিন অফিস করে কার ভালো লাগে আবার এত বকবক করতে।কিচ্ছু করার নেই স্বামী বিদেশ🤷‍♀️।ওফস সরি,আমার স্বামী বিদেশ নয়।আজ তাজ অফিসে আসেনি।ফ্যাক্টেরীতে প্রোডাক্ট দেখতে গেছে। তার জন্য শান্তিতে একটু কাজ করতে পেরেছি। কিন্তু ওকে ভীষণ মিস করেছি।শত হোক আমার জামাই বলে কথা।বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বকবক শুরু করলাম।

—- ভালোবাসা চার অক্ষরের একটা অপূর্ব শব্দ। যার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজার মান-অভিমান, ভালো লাগা,খারাপ লাগা, ভালোবাসার মানুষকে ঘিরে অন্যরকম অনুভূতি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম অনুভূতির মধ্যে সর্বপ্রথমে এটা আছে।আমি তো আগেই বলেছি ভালোবাসা হলো প্রজাপতির মতো।হালকা করে ধরলে উড়ে যাবে,শক্ত করে ধরলে মরে যাবে আর যত্ন করলে কাছে রবে।আর এই ভালোবাসা নামক প্রজাপতির রং গুলো হলো,, রাগ, মান-অভিমান, রেসপেক্ট, বিশ্বাস,জেলাসি ফিল করা,কেয়ার,সবকিছুতে অধিকার দেখানো ইত্যাদি ।প্রজাপতি যেমন তার রং ছাড়া অসম্পূর্ণ। তেমনি ভালোবাসা নামক বস্তুটাও এসব ছাড়া অসম্পূর্ণ। সবাই কিন্তু একভাবে ভালোবাসতে পারে না।একেকজন ভালোবাসাটা একেকভাবে প্রকাশ করে।কারো ভালোবাসা প্রকাশটা কেয়ারিং -এর মধ্যে। কারো বা শাসনের মধ্যে, কারো রাগের মধ্যে। এক্ষেত্রে আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে ঠিক কিভাবে ভালোবাসে।মেক্সিমাম মানুষ বুঝতে কিংবা ধরতে পারে না তার পার্টনার তাকে কোন এঙ্গেলে ভালোবাসে।যার কারণে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।সম্পর্কে ফাটল ধরে নষ্ট হয়ে যায়।সত্যি ভালোবাসার মানুষগুলো কখন তার ভালোবাসার অসম্মান করে না।হাজার চেষ্টা করবে আপনাকে তার করে রাখতে।তবে জানেন তো পৃথিবীতে একটা অদ্ভুত নিয়মে চলে।সেই নিয়মটা হলো,

” আমি যারে চাই, সে আমাকে চায় না।
যে আমাকে চায় তারে আমি চাই না। ”

এটা ১০০% সত্যি। আপনি যাকে ভালোবাসেন মন-প্রাণ দিয়ে।বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।আর যে আপনাকে ভালোবাসে তাকে আপনি ভালোবাসেন না।কিন্তু কি করার মনটা তো অন্য কাউকে দিয়ে বসে আছেন।চাইলেও ফেরাতে পারেন না।অনেক কথা হয়েছে। এখন কতগুলো কমেন্ট পরবো।আজকে এত কম টেক্সট ও কমেন্ট কেন আসছে।কেন কেন কেন আসছে হুম? আপনারা কি সবাই ঘুমিয়ে পরছেন? যদি ঘুমিয়ে পরেন তাহলে উঠুন জলদী করে আপনাদের অভিযোগ গুলো টেক্সট, কমেন্টও করে আমাকে জানিয়ে দিন।”পথহারা মুসাফির” নামক এক আইডি থেকে কমেন্ট করেছে।আপু, আজকাল ভালোবাসা হয় রূপ দেখে। কেউ গুণ দেখে করে না।কালো রংয়ের মানুষদের ভালোবাসতে মানা।গায়ের রং দিয়ে এখন ভালোবাসা বিবেচনা হয়।কালো রঙের বলে কেউ পছন্দ করে না।ফর্সা গায়ের রংটাই আজকাল সব।নব্বই দশকের সত্যিকারের ভালোবাসাটা এখন নেই আপু।

আপনি ছেলে না মেয়ে আই ডোন্ট নো। আপনার প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি একটা একটা করে দিচ্ছি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর —ভালোবাসা কখনো রূপ দেখে হয় না।ভালোবাসতে কখনো কারণ লাগে না।কোন রূপ লাগে না। কারণে-অকারণেই ভালোবাসা যায়।যেই ভালোবাসা রুপ দেখে হয় সেটা কখনো সত্যিকারের ভালোবাসা হতেই পারে না। সেটা যাস্ট রূপে মুগ্ধ হওয়া কিংবা মিথ্যে ভালোবাসা।যে আপনাকে সত্যি ভালোবাসবে তার কাছে আপনার চেহারার গঠন,গায়ের রং নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। সে পুরোটা দিয়ে শুধু আপনাকে চাইবে।তবে আমরা বেশিরভাগ সময় মরিচীকার পেছনে ছুটি।সত্যি ভালোবাসা চিনতেই পারি না।দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথায় আকৃষ্ট হয়।কিন্তু সত্যি ভালোবাসার মানুষটার তেতো কথা হজম করতে পারি না।বুঝতে পারি না সে আমার ভালোর জন্য আমাকে শাসন করছে, তেতো কথা বলছে,উচিত কথাগুলো, পথগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।

আরেকটা প্রশ্নের উত্তর —কে বলেছে আপনাকে ভালোবাসা গুণ দিয়ে হয় না? এটা আপনার ভুল ধারণা। যে আপনাকে মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসবে সে আপনাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে।আপনার গুণগুলোও সে হাজার দোষের ভিড়ে খুঁজে নিবে।ফর্সা গায়ের রং মোটেও সব নয়।যদি ফর্সা রংয়ে সব হতো তাহলে মানুষ রূপ ধুয়ে ধুয়ে পানি খেতো।পৃথিবীতে এত মেধা, গুণের কোন উৎসই থাকতো না। হ্যাঁ, এখন নব্বই দশকের প্রেম নেই।আমিও স্বীকার করি নেই। কেন নেই জানেন?কারণ এখন যুগ পাল্টিয়েছে।তার সাথে সাথে ভালোবাসার ধরণ, প্রকাশের ধরণও পাল্টে গেছে। ভালোবাসা নামক বস্তুটা যদি না থাকতো তাহলে কখনও আমরা টিকে থাকতে পারতাম না।যে আপনাকে ভালোবাসবে সে এমনি ভালোবাসবে।আপনার রূপে মুগ্ধ হয়ে নয়।বরং আপনার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েও হতে পারে।

সবশেষে আমি সবাইকে একটা কথা বলতে চাই। কেউ সবদিক থেকে ১০০% পারফেক্ট নয়।প্রত্যেকের মাঝে কিছু না কিছু খুঁত অবশ্যই আছে।তাই নিজেকে কখনো তুচ্ছ মনে করবেন না।আল্লাহর সৃষ্টি সবকিছু সুন্দর। গায়ের রংটা একটু চাপা হয়েছে তো কি হয়েছে? তাই বলে কি আমরা মানুষ নই।আপনার গায়ের রং কালো বলে আপনি মন খারাপ করবেন, বিষন্ন মনে থাকবেন।এটা কিন্তু ঠিক নয়। এতে তো আপনি আল্লাহর সৃষ্টিকে তুচ্ছ করছেন।তার সৃষ্টি কি কখনো খারাপ হতে পারে বলুন? উনি কত সুন্দর করে আমাদেরকে সৃষ্টি করেছে।আপনি যেরকম আছেন আল্লাহ আপনাকে যেরকম বানিয়েছেন তার জন্য বলুন আলহামদুলিল্লাহ। নিজেকে কখনো ছোট করে দেখবেন না।নিজেকে ছোট করা মানে আল্লাহর সৃষ্টিকে ছোট করে দেখা। আমিও কিন্তু সুন্দরী নই।আমার গায়ের রং শ্যামলা।তার জন্য আমি শুকরিয়া আদায় করি আলহামদুলিল্লাহ। আমাকে এভাবে ভালো দেখাবে বলেই আল্লাহ এভাবে সৃষ্টি করছে।আমার এক ফুফাতো ভাইয়া আমাকে সবসময় বলতো, “নোভা, কখনও নিজেকে ছোট করে দেখবে না।তুমি এভাবেই পার্ফেক্ট বলে আল্লাহ তোমাকে এভাবে সৃষ্টি করেছে। তুমি নিজেকে কালো মনে করে শুধু শুধু নিজেকে অপমান করছো আর আল্লাহর সৃষ্টিতে অসন্তুষ্ট হচ্ছো।তুমি যেরকম আছো তার জন্য আলহামদুলিল্লাহ বলো।কতটা নিখুঁতভাবে সে তোমাকে সৃষ্টি করছে। আর তুমি নিজেকে কালো বলে দাবী করছো।তুমি কাজটা ভুল করছো” আমিও ভেবে দেখলাম সত্যিই তো।ভাইয়া যা বলছে তা পুরোটাই সত্যি।

একবার ভেবে দেখুন তো, আপনাকে চাইলে আল্লাহ একটা হাত না দিতে পারতো,একটা পা না দিতে পারতো।কিন্তু তা সে করেনি।সে আপনাকে পুরো সুস্থ, স্বাভাবিক করে তৈরি করেছে। গায়ের রংটা নাহয় একটু চাপা তাতে কি হয়েছে? আপনি কি ফেলে দেওয়া বস্তু হয়ে গেছেন।বরং কালো রঙের বলে আপনাকে যে কিরকম মায়াবী লাগে তা কি আপনি জানেন? ফর্সা ত্বকের মানুষের থেকে শ্যাম বর্ণের মানুষের মুখে একটু বেশি মায়া দিয়ে ঘেরা থাকে।আপনার বিশ্বাস না হলে আপনি একজন শ্যাম বর্ণের মানুষের দিকে পাঁচ মিনিট মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে থেকেন।দেখবেন অন্য রকম একটা সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন।তাই আমি বলবো নিজেকে তুচ্ছ করে দেখা বন্ধ করুন।আপনার গায়ের রংটা আপনার মেটার নয়।এট তো আপনি বানাননি।তাহলে কেন আপনি নিজেকে খারাপ ভাববেন?পৃথিবীর সব সৃষ্টিই সুন্দর। কারণ সবকিছুই মহান আল্লাহ তায়ালা নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী সৃষ্টি করেছে। গায়ের রং-এর দিকে না তাকিয়ে নিজের মনের দিকে নজর দিন।মনের দিক থেকে যে সুন্দর তাকেই সবাই ভালোবাসে।রূপ তো কিছু দিন কিন্তু ভালোবাসা চিরদিন।

দেস রাইট।আপনারা শুনছেন ঢাকা এফএম 90.04। চলছে লাভ কমপ্লেন।এবং চলবে বিকেল ৬ টা পর্যন্ত।প্রতিদিন ৪টা থেকে ৬টা অব্দি আমি আর জে নোভানাজ থাকি আপনাদের সাথে। আপনাদের শো লাভ কমপ্লেন নিয়ে। এখন সময় ৫ টা বেজে ৪৭ মিনিট।আর ১৩ মিনিট আছি আপনাদের সাথে। এখন ছোট একটা বিজ্ঞাপন বিরতি নিবো।ফিরছি বিজ্ঞাপনের পরপরি।কোথাও যাবেন না।আমার সাথেই থাকুন, ঢাকা এফএমের সাথে থাকুন।আপনাদের ভালোবাসা নিয়ে অভিযোগগুলো মনের মধ্যে জমিয়ে না রেখে টাইপ করে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন।আমি তার সলিউশন দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। ফিরছি বিজ্ঞাপন বিরতির পর।কোথাও হারিয়ে যেয়েন না কিন্তু আবার।

🦋🦋🦋

পরেরদিন…………..

দুপুরের প্রখর রোদে সবকিছু কিরকম ঝিমিয়ে গেছে। ক্যান্টিনে এসেছি দুপুরের খাবারের জন্য। মাথার ওপর চারটা ফ্যান ঘুরছে তারপরেও অসহ্যকর গুমোট একটা গরম অনুভূত হচ্ছে। ক্যান্টিনের জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার সবটা দেখা যায়। রাস্তায় দুটো কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । সম্ভবত রিকাশার জন্য অপেক্ষা করছে।তারা একে অপরের সাথে হেসেখেলে কথা বলছে আবার কিছু সময় পরপর মেয়েটা ছেলেটাকে ইচ্ছে মতো পিঠে কিল,ঘুষি দিচ্ছে। ছেলেটা সুযোগ বুঝে মেয়েটার চুল টেনে দিচ্ছে। এদের দেখে তায়াং ভাইয়ার কথা মনে পরে গেলো।আমি আর তায়াং ভাইয়ার বন্ডিংটাও এমন ছিলো।এদের দেখে আমার একটা ঘটনার কথা মনে পরে গেল।একবার তায়াং ভাইয়ার হাতে যেই ধাওয়া খেয়েছিলাম।ভাইয়া আমাকে খুব ধমকি-ধামকি দিয়ে মানা করেছিলো কলেজে যেনো কোন ছেলের সাথে কথা না বলি।কিন্তু আমি একবার একটা ছেলেকে পটাতে গিয়েছিলাম।তখুনি ভাইয়ার যেই ধাওয়া খাইছিলাম তারপর কানে ধরছিলাম যে কোন ছেলের আশেপাশে থাকবো না।

ফ্লাশব্যাক……. ❣️

সবার ক্রাশবয়ের আলভীর সাথে কথা বলছিলাম।আসলে কথা নয় পটানোর চেষ্টা করছিলাম।একে নাকি কেউ পটাতে পারে না।তাই বান্ধবীদের সাথে বাজি ধরে আমি আসছি পটাইতে।হঠাৎ দেখি রোডের দিক থেকে তায়াং ভাইয়া ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে আমার দিকেই আসছে।

আমিঃ এই রে তায়াং ভাইয়া এদিকে আসছে কেন?ঐ মোটা স্টাম্প দিয়ে কি এখন দু-চার ঘা আমার পিঠে মারবে নাকি।এই পাঠারে নিয়া আর পারি না।সবসময় আমার কাজে বা হাত ঢুকাইতে বিনা দাওয়াতে চলে আসে।(মনে মনে)

আমি মনে মনে কথা আওড়াতে আওড়াতে তায়াং ভাইয়া সামনে চলে এলো।

তায়াংঃ কি রে তুই এখানে কি করছিস?(রেগে)

আমি ভাইয়াকে হেচকা টান দিয়ে অন্য দিকে নিয়ে গেলাম।ভয়ে হাত-পা কাঁপা-কাঁপি করছে।তাও যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললাম।

আমিঃ আসলে ভাইয়া আমি ঐ ছেলেটাকে পটাচ্ছিলাম।হয়েছে কি…..

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তায়াং ভাইয়া হুংকার মেরে বললো।

তায়াংঃ তোকে না বলছি ছেলেদের থেকে দূরে থাকতে।আর তুই নিজেই চলে এসেছিস ছেলে পটাতে।তোকে তো আজকে এই স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে সোজা করে ফেলবো।

আমিঃ ভাগ নোভা ভাগ।জানে বেঁচে থাকলে পরেও ঐ ক্রাশবয়কে পটাতে পারবি। আগে নিজের জীবন বাঁচা।

অবস্থা বেগতিক দেখে বেশ জোরে কথাগুলো বলে উল্টো দিকে দৌড় মারলাম।আমার পেছন পেছন তায়াং ভাইয়াও স্টাম্প হাতে দৌড়াচ্ছে। একবার পেছনে তাকিয়ে দৌড়ের স্প্রিড বারিয়ে দিলাম।দুপুর বেলা হওয়ায় রাস্তায় বেশি মানুষ নেই। তারপরও দু-একজন যারা আছে তারা আমাদের দিকে অবাক চোখ তাকিয়ে আছে। আমি সেদিকে তোয়াক্কা না করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে জুতা জোড়া হাতে নিয়ে নিলাম।তারপর আবার ছুট।পেছন থেকে তায়াং ভাইয়া চেচিয়ে আমাকে থামতে বলছে।আমি কি পাগল নাকি যে থামবো।থামলেই তো ঐ মোটা স্টাম্প আমার ওপর ভাঙবে।

ফ্লাশব্যাক এন্ড………❣️

পুরোনো কথা মনে করে নিজের মনেই হেসে উঠলাম।ততক্ষণে ছেলে-মেয়ে দুটো চলে গেছে। একটা বার্গার অর্ডার করেছি সেই কখন, এখনো আসার নাম নেই। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে হিমিকে কল করলাম।

হিমিঃ হ্যাঁ বল।

আমিঃ নাভান কই?

হিমিঃ একটু খাওয়াতে বসছিলাম।কিন্তু এক লোকমাও মুখে তুললো না।

আমিঃ ও ইদানীং খাবার নিয়ে অনেক জ্বালায়।দেখিস কিছু করে খাওয়াতে পারিস কিনা।এরিন আসেনি?

হিমিঃ না ও এখনো আসেনি।নে তোর ছেলে তোর সাথে কথা বলবে।

আমিঃ দে ওর কাছে।

নাভানঃ হ্যালো আম্মু।কই তুমি? আসো। আমার জন্য বাজার থেকে চিপস,চকলেট আনো।

আমিঃ তোমার জন্য মোটা লাঠি আনবো।তুমি বেড বয় হয়ে গেছো।খাবার নিয়ে দুষ্টামী করো।

নাভানঃ না মারে না।আমি গুড বয়।

আমিঃ গুড বয় হলে চুপচাপ খাবার খেয়ে নেও।নয়তো চিপস, চকলেট কিছুই আনবো না।

নাভানঃ আচ্ছা আমি খাবো।কিন্তু তোমার হাতে।

আমিঃ এখন খালামণি খাইয়ে দিক।তার হাতে খেয়ে নেও মানিক।তুমি আমার গুড বয়।আম্মুর কথা তো শুনে নাভান তাই না?

নাভানঃ হুম।আম্মু,আমাল বাবা কো?বাবাকে নিয়ে আইসো।আমি আব্বুর সাথে খেলবো।

বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।ইদানীং নাভান একটু বেশিই বাবার কথা জিজ্ঞেস করে। আমি চিন্তা করছি একদিন ওকে অফিসে নিয়ে আসবো।তাজকে দেখে যদি ঠান্ডা হয়।শত হোক ওর বাবাই তো।

আমিঃ তুমি দুষ্টুমী করো না আব্বু।আমি আসার সময় চিপস,চকলেট নিয়ে আসবো।

নাভানঃ বাবাকে নিয়ে আইসো।

আমিঃ তোমার খালামণিকে মোবাইল দেও।

হিমিঃ হ্যাঁ বল।

আমিঃ ওকে একটু দেখে রাখিস।আবার বাপের কথা মনে পরছে।সারাদিন গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে।

হিমিঃ আচ্ছা।

আমিঃ রাখছি তাহলে।

কল কেটে বিষন্ন মনে বাইরে তাকিয়ে রইলাম।তাজের কাছে এত সহজে আমি ধরা দিবো না।প্রত্যেকটা দিনের হিসাব নিবো আমি।কেন বেচে থাকতেও আমাকে সাদা কাপড় পরে থাকতে হয়? ছেলে,বউয়ের কোন খোঁজ নেয়নি।এমনি এমনি ছেড়ে দিবো নাকি আমি।অনেক হিসাব বাকি আছে। কেন সবকিছু এলোমেলো করে দিলো আমার।সে যখন বদলেই গেছে তাহলে আবার কেন আমার সামনে এলো।আমার স্বামীকে মৃত ভেবে আমি না হয় ছেলেটাকে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতাম।তার ওপর প্রচন্ড অভিমান ও ক্ষোভ জন্মেছে আমার।খুব সহজে এগুলো ভাংবে না।আজ অফিসে কতগুলো গেস্ট এসেছে।আমি তাদের দেখিনি।একজন কলিগের থেকে শুনছি। তাদের নিয়ে ব্যস্ত তাজ সাহেব।আমি এখন তার থেকে নিজেকে দূরেই রাখি।সে যখন পেরেছে আড়াই বছর আমার থেকে নিজেকে দূরে রাখতে আমি কেন পারবো না।

আদরঃ একা একা বসে আছেন যে ম্যাম?

আমার মুখোমুখি চেয়ার টান দিয়ে বসতে বসতে কথাটা বললো আদর।আমি মুখে কিঞ্চিত হাসির রেখা ফুটিয়ে বললাম।

আমিঃ সেই কখন একটা বার্গার অর্ডার দিয়েছি।এখনো আসার নাম নেই।

আদরঃ ওহ আচ্ছা।

আমিঃ কিছু বলবেন??

আদরঃ নাহ কিছু না।আপনি একা একা বসে আছেন তাই আরকি।

আমিঃ কোম্পানি দিতে এসেছেন?

আদরঃ তোওবা তোওবা। কি বলেন ম্যাম? আমি আপনাকে ছোট বোনের নজরে দেখি।

আমিঃ তাহলেই ভালো।

হঠাৎ আদরের হাতে থাকা মোবাইলে ভাইব্রেশন বেজে উঠলো।আদর আমার দিকে তাকিয়ে মুখটা চওড়া করে উঠে যেতে যেতে বললো।

আদরঃ আচ্ছা ম্যাম থাকুন।আমি আসছি।

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই আদর কল রিসিভ করে কথা বলতে বলতে চলে গেল। ওয়েটার এসে বার্গার দিয়ে গেলো।আমি সেটা কোনরকম খেয়ে, বিল পে করে অফিসের দিকে চলতে লাগলাম।

নিজের কেবিনের দিকে যাচ্ছিলাম।তখুনি এক জোড়া হাত এসে হেচকা টানে আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেল।আমি চিৎকার করতে নিলেই একটা বলিষ্ঠ হাত এসে পেছন থেকে আমার মুখ চেপে ধরলো।

#চলবে

#প্রজাপতির_রং🦋
#Part_19
#Writer_NOVA

রক্তচোখে তাজ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই চোখের দিকে আমার তাকানোর সাহস নেই। আমাকে এখন বোধহয় খুনই করে ফেলবে।আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। তাজ খুব শব্দ করে দরজাটা লাগিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালো।

তাজঃ রোশান দেওয়ানের সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক? ওর সাথে এতো ঢলাঢলি কিসের?

তাজের এসব উল্টো পাল্টা কথা শুনে মাথায় চিনচিন করে রাগ উঠে গেলো।সবাই পেয়েছেটা কি?কোন ছেলের সাথে আমাকে দেখেলেই আজেবাজে মন্তব্য করছে।আমি কি এতটাই মূল্যহীন নাকি।মনের মধ্যে একটা ত্যাড়ামী ভাব চলে এলো।আমাকে এভাবে প্রশ্ন না করে অন্যভাবেও তো বলতে পারতো।আমি এখন কিছু বলবো না।

তাজঃ উত্তর দিচ্ছো না কেন? রোশান দেওয়ান কে হয় তোমার? ওর সাথে এক রুমে কি করছিলে? চুপ করে থাকবে না নোভা? আমার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।

তার রাগ দেখে আমারো রাগ উঠলো।এত বছর খবর ছিলো না এখন এসে নজরদারি করা হচ্ছে। আমার খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।তা এই ভালোবাসাগুলো আগে কোথায় ছিলো? আড়াই বছর আমি ঠিক কতটা কষ্ট করেছি তাতো শুধুমাত্র আমিই জানি।তখন আমার তার ভালোবাসার হাতের প্রয়োজন ছিল কিন্তু তখন তো আমি কাউকে পাইনি।আর এখন আড়াই বছর পর এসে আমার ওপর অধিকার দেখাচ্ছে। কিছু বলবো না আমি।দুই হাত মুঠ করে রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছি।রাগের সময় আমার আবার কোন হুশ থাকে না। কাকে কি বলি, কি করি তার কোন কিছুই আমি জানি না।

তাজঃ কথার উত্তর দেও নোভা? চুপ করে থেকে আমাকে রাগিয়ো না।তাহলে কিন্তু এর ফল ভালো হবে না। এন্সার মি।

তাজ টেবিলের ওপর থেকে ফুলদানিটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারতেই সেটা শব্দ করে ভেঙে এদিক সেদিক ছড়িয়ে পরলো।আমি কিছুটা চমকে উঠলেও চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।এনাজ অল্প কিছুতে রেগে যাওয়ার মতো ছেলে নয়।এখন যেহেতু রেগে আছে তার মানে আমার খবর আছে। অন্য সময় হলে আমি ভয় পেতাম।কিন্তু এখন যেহেতু আমার নিজেরই রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে তাই ভয় পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।আমি আবার ছোটবেলা থেকে বিশ্ব ত্যারা।

তাজঃ তুমি চুপ করে এখনো কোন সাহসে আছো? আমার কথার উত্তর না দেওয়ার সাহস কোথা থেকে উদয় হলো তোমার? ও কি তোমার প্রেমিক?

আমিঃ রোশান দেওয়ান আমার যা খুশি তা হোক তাতে আপনার কি? কে হোন আপনি আমার?কোথা থেকে আপনি উদয় হয়েছেন? আমি তো আপনাকে চিনি না।আমার ওপর এত অধিকার খাটানোর সাহস আপনার কোথা থেকে আসে?

রাগে আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে। তাজ তড়িৎ গতিতে আমার বাহু ধরে হেচকা টানে নিজের দিকে ঘুরিয়ে থুঁতনি ধরে আমার মুখ উঠালে।

তাজঃ কি বললে তুমি?

আমিঃ কেন আপনি শুনতে পাননি? ছাড়ুন আমায়।আমাকে স্পর্শ করার কোন অধিকার আপনার নেই। ডোন্ট টার্চ মি।

তাজঃ এতকিছুর পরেও কি তোমাকে আমার খোলসা করে বলতে হবে আমি তোমার স্বামী এনাজ।আমি তোমার এনাজ।

আমি এক ঝাটকায় তার হাত ছাড়িয়ে হাত তালি দিতে দিতে বললাম।

আমিঃ ওয়াও, ওয়াও মিস্টার তাজরান তাজওয়ার। এখন নিজের মুখেই কথা পাল্টে ফেললেন।আপনি কিন্তু প্রথমদিন আমায় বলেছিলেন আপনি তাজ, এনাজ নয়।আপনি সত্যি আমার এনাজ নন।আমার এনাজ কখনও এমন করতে পারতো না। আমার এনাজ সেদিনই মারা গেছে। এখন যে আমার সামনে দাড়িয়ে আছে সে হলো এই কোম্পানির ওনার তাজরান তাজওয়ার। যাকে আমি চিনি না। আমার এনাজ কখনো আমাকে ছেড়ে আড়াই বছর নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারতো না। আমাকে একা ফেলে চলে যেতো না।অন্য ছেলের সাথে দেখলে এরকম ব্যবহার করতো না। সো, ডোন্ট ক্রশ ইউর লিমিট।

তাজঃ আমিই তোমার এনাজ।(অসহায় মুখে)

আমিঃ আমি বিশ্বাস করি না।আমার এনাজ মারা গেছে। আপনি শুধু আমার অফিসের বস।

তাজঃ তুমি তো প্রথমদিনই আমাকে চিনে গিয়েছিলে।তারপরেও কেন এখন অস্বীকার করছো?

আমিঃ আমি তো ভেবেছিলাম চেহারা পাল্টে গেছে তো কি হয়েছে মানুষটাতো পাল্টায়নি।কিন্তু আমার ধারণা ভুল।এর মধ্যেও সে আমার খোজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি।আমি কোথায় আছি,কি করছি, কি খাচ্ছি তার খবর নেওয়ার গুরুত্ব সেই মানুষটার নেই। আমিই বেহায়ার মতো তার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি।

তাজ অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর চোখ দুটো ছলছল করছে।আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।এর দিকে তাকালে এখন ইমোশনাল হয়ে যাবো।শত হোক আমার স্বামীতো।এত সহজে আমার অভিমানের পাহাড় ভাঙ্গবে না।আমি ছোট বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে তো কম কষ্ট করিনি।সমাজের বিভিন্ন মানুষের কথায় মনটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যেতো।তাও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সব মুখ বুজে সহ্য করে নিতাম।সপ্তাহ খানিক আগেও তো নিজের চরিত্র সম্পর্কে বাজে কথা শুনতে হয়েছে। সে থাকলে কি কেউ এসব বলার সাহস পেতো।সমাজে সিঙ্গেল মাদারদের যে কতকিছু সহ্য করে বেঁচে থাকতে হয় তা সে বুঝবে কি করে? যখন বৈধ ছেলেটাকে জারয সন্তান বলে তখন একটা অসহায় মায়ের বুকটা যে কি করে ফাটে তা সে বুঝবে কি করে? দিনরাত এক করে কোলে,পিঠে করে বাচ্চাটাকে বড় করেছি।সে থাকলে তো আমার জীবনটা সুন্দর হতো।কিন্তু তখন সে লাপাত্তা ছিলো।তার জন্য নিজেকে সাদা রঙে রাঙিয়ে নিয়েছি।তার স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছি।তার সন্তান মানুষ করছি।আর সে এখন এসেছে দরদ দেখাতে।লাগবে না আমার কাউকে।

তাজঃ তুমি আমাকে এসব বলতে পারলে?

আমিঃ হ্যাঁ পারলাম।আরো কোন কথা আছে? যদি থাকে জলদী বলে ফেলুন।আমি আর আপনার কোম্পানিতে চাকরীটা করছি না।আপনার মুখটা আমি দেখতে চাই না।মুখও পাল্টে গেছে, মানুষটাও পাল্টে গেছে। আমি সত্যিই একটা বোকা।নয়তো এমন একটা মানুষের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করতাম না।

ভেতর থেকে কান্না দলা পাকিয়ে গলার কাছে এসে আটকে গেছে। তাজের চোখ দিয়ে পানি পরছে। আমি নিজের চোখ দুটো নামিয়ে নিলাম।তাজ আমাকে ছেড়ে দূরে সরে গেলো।আমি জানি তাজ কাঁদছে। আমার কথায় সে অনেক হার্ট হয়েছে।কিন্তু এই কথাগুলো বলার প্রয়োজন ছিলো।আমি ধীর পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলাম।তাজ অন্য দিকে ঘুরে তাকিয়ে রইলো।এখানেও সে ইগো দেখালো।একবার আমাকে জড়িয়ে ধরে যদি বলতো আমাকে সবকিছুর জন্য মাফ করে দেও।তাহলে কি আমি করতাম না।সে কি জানে না তার সাথে আমি রাগ করে থাকতে পারি না।সে তো জানে আমি অনেক অভিমানী মেয়ে। আড়াই বছর ধরে তার প্রতি জমে থাকা অভিমান কি এত সহজে গলে যাবে? কিন্তু সে সব ভুলে আমাকে কাছে টেনে নিলে কি আমি ফিরিয়ে দিতাম? সে তো আমার বাচ্চার বাবা।নাভানের জন্য হলেও তো তাকে আমার প্রয়োজন। সেটাও সে বুঝলো না।বরং আমাকে দূরে সরিয়ে দিলো।আমি আসবো না তো তার কাছে।থাকুক সে এভাবেই। লাগবে না আমার তাকে। এই চাকরীটাও আমি করবো না।

🦋🦋🦋

নিজের ডেস্কের সামনে এসে চুপ করে চেয়ারে বসে পরলাম।মাথাটা ঘুরছে।সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।আমি দুই হাতে মাথায় চেপে কিছু সময় আগের কথা মনে করতে লাগলাম।যার কারণে এতকিছু ঘটলো।

ফ্লাশব্যাক………..

নিজের কেবিনের দিকে যাচ্ছিলাম।তখুনি এক জোড়া হাত এসে হেচকা টানে আমাকে একটা রুমে নিয়ে গেল।আমি চিৎকার করতে নিলেই একটা বলিষ্ঠ হাত এসে আমার মুখ চেপে ধরলো।আমি সামনের ব্যাক্তিটার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চমকে উঠলাম।ততক্ষণে সে আমার মুখ ছেড়ে দিয়েছে।

আমিঃ রোশান আপনি????

রোশানঃ হ্যাঁ আমি।

আমিঃ আপনি এখানে কি করছেন?

রোশানঃ আমারো সেম প্রশ্ন। তুমি এখানে কি করছো?

আমিঃ আমি এই অফিসে নতুন জয়েন করেছি দুই দিন আগে।

রোশানঃ ওহ আচ্ছা। আমি আজ এই অফিসে একটু কাজে এসেছিলাম।মুরাদ সাহেব আমার খুবই ক্লোজ। শুনলাম তার বড় ছেলে শেয়ার ব্যবসা শুরু করবে।যার জন্য আমাকে তার ছেলের সাথে একটু কথা বলতে বলেছিলো।আমার ছোট চাচ্চু আবার শেয়ার বিজনেস আছে অনেক।ছোট চাচ্চুর সাথে এসেছি।

আমিঃ আপনারাই তাহলে গেস্ট হিসেবে এসেছেন।আমি ভাবলাম কে না কে? কিন্তু আমাকে এভাবে এখানে আনার মানে কি?

রোশানঃ হুট করে তোমাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।তোমার সাথে কিভাবে কথা বলবো তার উপায় খুঁজছিলাম।তোমাকে ডাকলে তো কথা বলতে না।তাই এভাবে নিয়ে এলাম।

আমিঃ আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।কেউ এভাবে কাউকে হেচকা টান দেয়।

রোশানঃ সরি পাখি।অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দেও।

রোশান কান ধরে ইনোসেন্ট ফেস করে আমাকে কথাগুলো বললো।ওর বলার ভঙ্গি দেখে আমি ফিক করে হেসে উঠলাম।ছেলেটা পুরো পৃথিবীর কাছে এক আর আমার কাছে আরেক। একে দেখলে আমার রাগ উঠলেও মাঝে মাঝে এর কান্ড দেখে ভীষণ ভালো লাগে। দুজন রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। একসাথেই হাঁটছিলাম আর টুকটাক কথা বলছিলাম।আসলে রোশানই কথার ঝুলি খুলেছে। আমি মাথা নেড়ে শুধু হু হা করছি।হঠাৎ পা বাঁকিয়ে জুতা উল্টে পরতে নিলেই রোশান আমার বাহু ধরে ফেললো।

রোশানঃ ঠিক আছো তুমি? কোথাও লাগেনি তো?

আমিঃ আমি ঠিক আছি।

রোশান আমাকে সোজা করে দাঁড়া করাতেই আমার চোর গেলো সামনের দিকে। তাজ তীক্ষ্ম চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম তাজের চোখটা রোশানের হাতের দিকে।কারণ রোশান তখনও আমায় ধরে ছিলো।রাগে গটগট করে তাজ ওর কেবিনে চলে গেল।ঘন্টাখানিক পর রোশান চলে যেতেই আদর এলো।আমি তখন নিজের ডেস্কে কাজ করছিলাম।

আদরঃ স্যার আপনাকে ডেকেছে ম্যাম।

আমিঃ আসছি।

আমি আগে থেকেই জানতাম আমাকে তলব করা হবে। তার জন্য মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে নিয়েছি।কিন্তু তারপরেও ভয় করছিলো।কিন্তু তার ঐসব উদ্ভট কথা শুনে আমারও রাগ উঠেছিলো।কেবিনে ঢোকার পর কি হয়েছে তাতো বললামই।

ফ্লাশব্যাক এন্ড……………

পরের সময়গুলো একদম অসহ্য গিয়েছে। কোন মতে কাজগুলো সেরে বাসার দিকে রওনা দিলাম।আজ শো করার মতো কোন মন-মানসিকতা নেই। বাসার দরজায় এসে কোলিং বেল বাজাতেই হিমি এসে দরজা খুলে দিলো।ওর সাথে সাথে নাভানও এসেছে।

হিমিঃ এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলি যে? আজ শো করবি না?

আমিঃ না।

হিমিঃ তোর কি শরীর খারাপ? তোকে এরকম কেন দেখাচ্ছে? মুখ, চোখ শুকনো,চোখ লাল হয়ে আছে।

আমিঃ কিছু হয়নি।

ওদের পাশ কাটিয়ে রুমে ঢুকে গেলাম।হিমি আমার পিছু না এলেও নাভান আমার পিছু ঠিকই এলো।কারণ অন্য দিন বাসায় এলে ওকে কোলে তুলে নেই।

নাভানঃ আম্মু, বাবা কই?

তড়িৎ গতিতে ওর সামনে এগিয়ে গিয়েই গালের মধ্যে কষিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিলাম।নবাবজাদার আবার বাবার কথা মনে পরে গেছে। নাভান কিছু সময় ঠোঁট উল্টে জোরে কান্না করে উঠলো।

আমিঃ বাবার জন্য আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে? সারাদিন খেটে মরি আমি আর তোমার দরদ হয় বাবার জন্য? আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেছে বাবার গুণগান গাওয়া।কই তোর বাবা তো একবারও তোর খবর নিলো না।একটি বার আমায় প্রশ্নও করলো না তুই কেমন আছিস? সে তো তোর কথা মনে করে না।তাহলে তুই কেন সারাদিন বাবার গান গাস?

নাভান গালে হাত দিয়ে কান্না করেই যাচ্ছে। তা দেখে কেন জানি আরো রাগ উঠে গেল।নাভানের কান্না আর আমার চিৎকার চেঁচামেচি শুনে হিমি ছুটে এলো।আমাকে একদফা বকে নাভানকে নিয়ে অন্য রুমে চলে গেল।আমি খাটে ধপ করে বসেই মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পরলাম।আমার জীবনটা তো এমন না হলেও পারতো?

#চলবে

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ