#স্বপ্নপূরণ (অন্তিম পর্ব)
নীলিমার সেই বজ্রনির্ঘোষ উত্তরের পর পাড়ার লোকেদের মুখ দেখানোর আর জায়গা ছিল না। সুবলরা সেই যে মুখ চুন করে বিদায় নিল, তারপর আর কয়েক মাস ওদের চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দেখা যায়নি। কিন্তু নীলিমার জীবন এখন আর শুধু সেই পুরনো টিনের চালের বাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। তার পোস্টিং হয়েছে মহকুমা শাসকের দপ্তরে। ডব্লিউবিসিএস অফিসার হিসেবে তার ব্যস্ততা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু নীলিমা বদলায়নি।
এখনও সে ভোরবেলা উঠে আগে সরোজিনী দেবীর জন্য চা বানায়। শাশুড়ি মা এখন আর গজগজ করেন না, বরং পাড়ায় কেউ নীলিমার নামে কিছু বললে বাঘিনীর মতো রুখে দাঁড়ান। তিনি এখন বুক ফুলিয়ে বলেন, “আমার বৌমা সাক্ষাৎ লক্ষ্মী গো! ও তো শুধু আমার অনির বউ নয়, ও আমার ঘরের শক্তি।”
নীলিমা প্রথম মাসেই তার বেতনের টাকা দিয়ে অনিমেষের দোকানটা বদলে দিল। স্টেশনের ধারের সেই মলের সঙ্গে পাল্লা দিতে এখন অনিমেষের দোকানের নাম হয়েছে ‘নীলিমা ভ্যারাইটিস ‘।অনিমেষ এখন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে দোকানে বসে, তার চোখেমুখে এখন আর সেই অভাবের কালিমা নেই, বরং এক উজ্জ্বল আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে।
একদিন নীলিমা আর অনিমেষ বিকেলবেলা তাদের নতুন তৈরি বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিল। সামনে রাস্তা দিয়ে সাইকেল নিয়ে ঘরে ফিরছে গ্রামের মানুষ। সূর্যটা দিঘির পাড়ে তালগাছের আড়ালে টুপ করে ডুব দিচ্ছে।
অনিমেষ হঠাৎ বলল, “জানো নীলিমা, মাঝে মাঝে আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না যে আমরা সেই দিনগুলো পেরিয়ে এসেছি। সুবলরা যখন বলত তুমি আমায় ছেড়ে যাবে, তখন আমার বুকটা কেঁপে উঠত। আমি ভাবতাম, আমার তো কিছুই নেই, কীসের জোরে তোমাকে ধরে রাখব?”
নীলিমা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে অনিমেষের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার আঙুলের সেই ফাটলগুলো এখন আর নেই, কিন্তু হাতের উষ্ণতাটা একই আছে। নীলিমা হাসল। “আপনি আমায় সেই জিনিসটা দিয়েছিলেন, যেটা কোনো টাকা দিয়ে কেনা যায় না— বিশ্বাস। আপনি আমাকে ডানা দিয়েছিলেন উড়তে। আমি যখন আকাশে উড়েছি, তখন শুধু আপনার ভরসাটুকুই ছিল আমার অক্সিজেন। মানুষ কি অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে?”
অনিমেষ একটু চুপ করে থেকে বলল, “কিন্তু লোকে বলে পড়াশোনা শিখলে মানুষ বড় বেশি হিসেবি হয়ে যায়। তুমি তো হিসেব করলে অনেক আগেই আমায় ছেড়ে আরও ভালো কাউকে খুঁজে নিতে পারতে।”
নীলিমা জানলার বাইরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “শিক্ষা মানুষকে হিসেবি করে ঠিকই, কিন্তু অকৃতজ্ঞ করে না। যারা ছেড়ে যায়, তারা পড়াশোনার দোষে যায় না, তাদের স্বভাবের দোষে যায়। আমি তো সেই তেরো বছরের কিশোরী নীলিমাকেই মনের ভেতর পুষে রেখেছি, যে অভাবের জন্য বই কিনতে না পেরে কাঁদত আর আপনি তাকে ভরসা দিয়েছিলেন। সেই নীলিমা কোনোদিন এই অনিমেষকে ছেড়ে যেতে পারে না।”
গল্পের পূর্ণতা এল আরও এক বছর পর। নীলিমার কোল আলো করে এল এক ছোট্ট দেবদূত। পাড়ায় সেদিন যেন হোলি লেগে গেল। সরোজিনী দেবী নাতির মুখ দেখে কেঁদে ফেললেন। যে নীলিমাকে একসময় ‘বন্ধ্যা’ অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, আজ তার সন্তানের অন্নপ্রাশনে গোটা গ্রাম নিমন্ত্রিত।
অনিমেষের বন্ধু সুবলও সেদিন এসেছিল। অপরাধবোধে সে মাথা তুলতে পারছিল না। অনিমেষ নিজেই এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল। সুবল ধরা গলায় বলল, “আমায় ক্ষমা করিস অনি। আমি ভেবেছিলাম সব বৌরাই বুঝি এক। আমি ভুল ছিলাম। তোর বিশ্বাসই তোকে জিতিয়ে দিল।”
অনিমেষ মুচকি হেসে বলল, “বিশ্বাস আমি করিনি সুবল, বিশ্বাসটা ও অর্জন করেছিল। ও শুধু আমার বউ নয়, ও এই সংসারের স্তম্ভ।”
আর নীলিমা তার সন্তানের কপালে একটা চুমু খেয়ে ডায়েরিতে লিখল— “সংসারের খুঁটিনাটি টানাপোড়েন থাকবেই, অভাব আসবে, সমাজ কথা শোনাবে। কিন্তু যদি পাশে একজোড়া বিশ্বস্ত হাত থাকে, তবে যে কোনো পাহাড় ডিঙানো সম্ভব।”
আকাশে তখন শুকতারা উঠেছে। অনিমেষ আর নীলিমা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। তাদের এই বাঁধন শুধু সিঁদুরের নয়, এই বাঁধন হলো ত্যাগের, সম্মানের আর অক্ষয় ভালোবাসার।
সমাপ্ত
কলমে -#SupriyaGhosh
