#নতুন_শাড়ি
#পর্ব_১
#ইলোরা_ফারদিন
“আমার ঈদের পোশাক কোথায়?”
আব্বা তখন সোফায় বসে আমাদের সবার জন্য আনা ঈদের পোশাক দিচ্ছিলেন, কিন্তু আচমকা আম্মার করা প্রশ্নে থমকে গেলেন আব্বা। কারণ আমার হুশ হওয়ার পর থেকে কোনোদিন দেখি নি আম্মাকে ঈদের দিন নতুন শাড়ি পরতে। অবশ্য ঈদের দিন কি, আম্মাকে আমি কোনোদিনও নতুন শাড়ি পরতে দেখি নি। সব সময় ওই পুরাতন প্রিন্টের শাড়িই পরে থাকে। ছিড়ে গেলে সেলাই করে পরে। আর নাহয় ফুপিদের পুরানা শাড়ি আম্মাকে গোছায় দেয়।
আব্বা কিছু বলবে তার আগেই দাদি বলল,” তোমার আবার কিসের নতুন কাপড় লাগবে বউ। দুইদিন আগেই তো তোমারে শাড়ি দিলাম একটা। ওটাই পইরো ঈদে।”
আম্মা এবার তাচ্ছিল্য হেসে বললো, ” আপনার মেয়ের পরা পুরানা শাড়ি ওটা আম্মা। ওটা পরে আমি কেনো ঈদ করব? বাড়ির বউ হিসেবে আমারও তো ঈদে নতুন কাপড়ের অধিকার আছে।”
আব্বা এবার হাস্কি স্বরে বললেন,” হাতে এবার আর টাকা নেই জবা, কোরবানিতে কিনে দিব।”
“আমার জন্য আমার হাতে কোনোদিনও টাকা থাকে না। বিয়ের পর প্রথম ঈদে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু আপনার বোনের পছন্দ হওয়ায় আমার অনুমতি না নিয়েই সেটা আপনার বোনকে দিয়ে দিলেন। এরপর আর কোনো ঈদেই আমার কপালে শাড়ি জুটে নি। বিয়ের তেরো বছর পার হলো, শাড়ি তো দূরের কথা কোনোদিন বলতে পারবেন একটা কানের দুল বা এক পাতা টিপ কিনে আমার হাতে দিয়েছেন?” ক্ষোভ নিয়ে বললো আম্মা।
দাদি এবার হায় হায় করে উঠলো,” ছি ছি বউমা, তোমার ননদ নাহয় তোমার একটা শাড়ি নিয়েছিল, সেটার খোটা দিবা? ও তোমারে নিজের বোনের মতো ভাবে, আর তুমি কি না!”
“ভুল বললেল আম্মা,আপনার মেয়ে আমাকে তার ব্যাবহার করা পুরানা শাড়ি দিত, যেগুলো সাধারণ মানুষ ফকিরকে দেয়। আর আপনার মেয়ের জামাই যেমন প্রতি ঈদে আপনার মেয়ের জন্য দোকানের সবচেয়ে দামি শাড়িটা কিনে আনে, আমারও তো অধিকার আছে যে আমার স্বামীও আমাকে দোকানের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা কিনে আনে পরাবে।”
আব্বা এবার একটু রাগী কন্ঠে বলল,” কি বাচ্চা মানুষের মতো শুরু করছো, বললাম তো হাতে টাকা আসলে কিনে দিব”
আম্মা এবার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আব্বার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে টেবিলে রাখা দাদি ফুপিদের জন্য আনা ঈদের কাপড় নিয়ে বারান্দা দিয়ে পাশের ডোবায় ফেলে দিলেন। কি থেকে কি হয়ে গেল আমরা কিছুই বুঝলাম না।
রাগের মাথায় আব্বা আম্মার গালে থা*প্পড় বসিয়ে দিলেন। আম্মা তখনো নির্বিকার।
এর আগে কোনোদিন আম্মার গায়ে আব্বা হাত তুলে নি। এবারই প্রথম। অবশ্য এতোদিন আম্মা নিজের প্রতি হওয়া সব অন্যায় চুপচাপ মেনে নিত, কিন্তু আজ যখন প্রতিবাদ করেছে সেটারি শাস্তি পেল মনে হয়।
আম্মা কিছু না বলেই নিজের ঘরে চলে গেল।
সন্ধ্যার এই কাহিনির পর আব্বা বাহিরে চলে যায়। হয়তোবা দাদি ফুপিদের জন্য আবার নতুন কাপড় কিনতে।
।।।।।।।।।।
রাত ১০ টা বেজে গেছে, খিদেয় পেটটা চোচো করছে। এদিকে দাদিও বসার ঘরে বসে গজ গজ করছে সেই তখন থেকে। ছোট ফুপিও যেয়ে বেশ কয়বার যেয়ে আম্মার ঘরের দরজা ধাক্কিয়েছে, কিন্তু আম্মা সারা দেয় নি। এরই মধ্যে আব্বা আবার নতুন কাপড় নিয়ে আসলে, দাদি আম্মার নামে অভিযোগের ঝুড়ি নিয়ে বসলেন। আম্মা রান্না করে নি, দাদি অসুস্থ মানুষটা না খেয়ে আছে আরো কত কি।
এদিকে আব্বার রাগটা আবারও বেড়ে গেল। আব্বা যেয়ে দরজা ধাক্কাতেই আম্মা এবার দরজা খুলে দিল, তারপর আবার ঘরে ঢুকে পরল। ভেতরে তাদের কি কথা বলো আমরা জানি না। কিন্তু আব্বা আবারও বাহিরে চলে গেলেন, হয়তোবা হোটেল থেকে খাবার আনতে।
।।।।।।।।।
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে জবা। মাত্র আঠারো বছর বয়সে এ সংসারে এসেছিল সে। তারপর থেকে স্বামী ননদ শ্বাশুড়ি সবার দায়িত্ব নিজ কাধে নিয়ে নিয়েছিল। মাথা নিচু করে সারাদিন কাজ করতো, কোনোদিন টু শব্দটাও করে নি। স্বামী যা বলতো তা মাথা পেতে মেনে নিত। এমনকি সে যখন অন্তস্বত্তা ছিল তখনও এবাড়িতেই পরে ছিল, নাহলে তার অসুস্থ শ্বাশুড়িকে দেখাশুন করবে কে! এরপর যখন বাচ্চা কাচ্চা হল, একা হাতেই সব সামলিয়েছে। বিনিময়ে সে কি পেয়েছে? কিছুই না।
বিয়ের তেরো বছর হয়ে গেলেও তার স্বামী কোনো দিনও তার বাবা মাকে একটা সুতাও দেয় নি। বাধ্য হয়ে জবা নিজেই জসিমকে বলেছিল তার মা বাবাকে ঈদে কিছু দিতে। কিন্তু জসিম মুখের উপর না করে দেয়। বলে এবার হাতে টাকা নেই। কিন্তু আজ ঠিকি নিজের মা বোনদের জন্য দামি পোশাক এনেছে, তার দুলাভাইয়ের জন্য ছয় হাজার টাকার পাঞ্জাবি এনেছে। তখনি জবা উপলব্ধি করেছে এ বাসায় সে পরে আছে শুধুমাত্র একটা দাস হিসেবে, যার দায়িত্ব শুধু দাসিগিড়ি করা। এ বাসায় জবার ইচ্ছের কোনো মূল্য নেই। তাই তো আজ সে সব নিয়ম ভেঙে প্রতিবাদ করেছে।
কিছুক্ষণ আগে জসিম যখন ঘরে ঢুকেছিল তার ছিল একটি শপিং ব্যাগ৷ সেটা থেকে একটি ব্লকের শাড়ি বের করে জবাকে দিতেই জবা তা ছুড়ে ফেলে দেয়, তারপর হাসতে হাসতে বলে,” নিজের বোনের জন্য এনেছেন পাচ হাজার টাকার জামদানী, আর বউয়ের জন্য আটশো টাকার ব্লকের শাড়ি। দরকার নেই এই শাড়ির…!”
জসিম জবার আচরণে আবারও অবাক হয়, যেই মেয়ে বিয়ের পর থেকে তার সামনে মাথা নত করে থাকে, সেই মেয়ে আজ তার সাথে ঝগড়া করছে! জসিম আর কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার আগে বলে যায় যদি জবার আচরণ এমনি থাকে তবে জবাকে নিয়ে সে সংসার করবে না।
জবা তখনকার কথা ভেবে নিজেই নিজকে কথা দেয় আর মাথা নত করে থাকবে না সে। এবার থেকে সে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করবে। এজন্য যদি সংসারটা না টিকে, তবু সে থামবে না।
চলবে…..
