#মরিচীকা
#পর্ব ০২
#মাকামে_মারিয়া
জ্বর মানুষের শরীর পুড়ায়৷ আর নাজেরার জ্বর হলে শরীর হৃদয় দুটোই পুড়ায়। টানা দুইদিন বিছানা থেকে নড়তে পারেনি মেয়েটা। ডাক্তার এসেছিলো, জ্বর মেপে ঔষধ দিয়ে গিয়েছে। মালেকা খালা মেয়েটার বেশ যত্ন নিচ্ছে। জামিনার থেকেও মালেকা একটু বেশিই আদর করেন।
ঘোর সন্ধ্যা, ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা। ডাক্তার দানিশ এসেছেন নাজেরাকে আরও একবার দেখবে বলে। নাজেরা বিছানায় শুয়ে আছে। গায়ে কাঁথা মুড়ানো। দানিশ রুমে প্রবেশ করেই বললো, মা মনি! শরীরটা ঠিক লাগছে তো?
নাজেরা ফ্যাকাশে চেহারা নিয়েই স্নিগ্ধ হাসলো। ঠোঁট মুখ শুকিয়ে আছে বিধায় হাসলে মুখের ভাজ স্পষ্ট হয়। হেসেই বললো, জ্বি আঙ্কেল আলহামদুলিল্লাহ! আগের চেয়েও ঠিক লাগছে।
দানিশ ডাক্তার চাপাঁ কুঞ্জের বাঁধানো ডাক্তার। কারো কিছু হলেই উনাকে সাথে সাথে পাওয়া যায়। নাজেরাকে মেয়ের মতো আদর স্নেহ করেন। মেয়েটার পাশে এসে বসলেন। কপালে হাত রেখে জ্বর দেখে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, এই তো জ্বর একদমই না-ই হয়ে গিয়েছে। দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে।
নাজেরা শান্ত কন্ঠে বললো, বিছানায় আর শুয়ে থাকতে হবে না তো আঙ্কেল?
দানিশ ঔষধ পত্র দেখতে দেখতে বললো, কেনো মনি? শুয়ে থাকতে বুঝি ভালো লাগে না?
নাজেরা চুপ করে রইলো। জ্বর নিয়ে শুয়ে থাকতে কারোই হয়তো ভালো লাগে না। কিন্তু নাজেরার ভালো না লাগার আরও কিছু কারণ তো রয়েছে। তার শুয়ে থাকা কারো পছন্দ হয়না।
কি হলো? হাঁটতে যাবে ছাঁদে? একটু বাহিরের হাওয়া গায়ে লাগলে ভালো লাগবে।
দানিশের করা প্রস্তাবে নাজেরা মনের সমস্ত বিষাদ কেটে গেলো। কত খেয়াল রাখে মানুষটা৷ ঠিক তার বাবার মতো। বাবা থাকলেও ঠিক এমন ভাবেই নাজেরার খেয়াল রাখতো। বাবা কবে যে ফিরবে।
নাজেরার চুপ থাকাকে সম্মতি বুঝে নিয়ে ডাক্তার দানিশ বললো, আমি বাসায় জানিয়ে দিচ্ছি। তুমি আস্তেধীরে উঠো। তাযিনকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমাকে একটু সময় দিবে। তোমার শরীর আর মন দুটোই হালকা লাগবে। প্রকৃতি আর মানুষের সঙ্গ পেলেই সব রোগবালাই পালায়। এ তো মনের রোগ রে মা।
দানিশ চলে গেলো। নাজেরা উপলব্ধি করলো সত্যিই তো শরীরটা অনেক হালকা লাগছে।দানিশ তাদের প্রতিবেশীই। দেখা যাবে একটু পরেই তাযিন এসে হাজির হয়ে গিয়েছে।
চোখে মুখে পানির ছিটাঁ দিতেই শরীরটা হালকা লাগছে। আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো মেয়েটা। কতটা স্নিগ্ধ লাগছে। হুট করেই মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। জ্বর হয়ে বিছানায় পড়ে আছে দুইদিন হলো অথচ একবারের জন্যও কেউ তাকে দেখতে আসেনি। নুরজাহান, ভাই, মা কেউ আসেনি। নাজেরা জ্বরে কাতরাচ্ছিলো, মনে মনে তাদেরকে পাশে চাচ্ছিলো। কিন্তু কেউ আসেনি। মালেকাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, খালা কেউ আসছিলো আমাকে দেখতে?
মালেকা বিরক্তির স্বরে বললো, কার থাইকা কি আশা করেন নাজেড়া আম্মা! উনারা আইবো আপনারে দেখতো! মাথা খারাপ।
আমার কথা একবারও জিজ্ঞেস করেনি?
হু! করছিলো। আপনে সুস্থ হইছেন কিনা! সুস্থ হওন তো তাগো জন্যে জরুরি! সুস্থ হইলেই না তাগো দাসী হইয়া কাজ কাম করতে পারবেন।
নাজেরা আয়নায় একধ্যানে তাকিয়ে থাকে। মালেকা খালাকে হাজার বার জিজ্ঞেস করা হয়েছে, খালা আমাকে তারা ভালোবাসে না কেন??
মালেকা কোনো দিন উত্তর দেয়নি। নাজেরা এ জন্য আর জিজ্ঞেস করে না।প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না যেনেও আর কতবার প্রশ্ন করা যায়?
জারুলতা! কি এতো দেখছিস হুম?
হঠাৎ তাযিনের কন্ঠের স্বর শুনেই নাজেরার ধ্যান ভাঙলো। আয়না থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে বললো, তুই চলে এসেছিস তাজু!
হুম এসেছি! বাবা বললো তোকে নিয়ে নাকি হাঁটতে হবে। কোলে নিয়ে হাঁটবো নাকি বল তো?
বাজে কথা বলিস না তাজু! আম্মু শুনলে বকা দিবে।
আমি তোর আম্মুকে ভয় পাই নাকি রে?
হয়েছে চল। তুই তো দুনিয়ার কাউকেই ভয় পাস না।
নাজেরা তাযিনকে সাথে নিয়ে রুম থেকে বের হতেই নুরজাহানের সামনে পড়লো।।নুরজাহান দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, কি ব্যাপার নাজেরা? শরীর ঠিক হয়ে গিয়েছে? তোমাকে ছাড়া সমস্ত বাড়িটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছিলো।
নাজেরা স্মিত হেঁসে বললো, জ্বি ভাবি আগের চেয়ে সুস্থ লাগছে।
এখন যাচ্ছো কোথায়? একটু রুমে এসো তো কাজ আছে।
তাযিন বাঁধা দিয়ে বললো, নাহ!জারু ছাঁদে যাবে এখন। আপনার কাজ করতে পারবে না।
নুরজাহান ব্রু কুঁচকে তাযিনের দিকে একবার নাজেরার দিকে একবার তাকালো। নাজেরা ভয়ে চুপসে আসলো। তাযিনের হাতের মুঠোতে নিজের হাতটা রেখে বললো, চুপ কর না! তর্ক করিস না।
তাযিন নাজেরার হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরে হাঁটতে শুরু করলো ছাঁদের উদ্দেশ্যে, বিরবির করে বললো, আমাকে থামিয়ে লাভ নেই জারুলতা। আমি তোর ডাইনি ভাবিকে ভয় পাই নাকি!
নাজেরা ভয়ে তটস্থ হয়ে ফিসফিস করে বললো, ইয়া মাবুদ! তুই কেন ভয় পাবি। ভয় তো আমার। রুমে ফিরলে আমাকে কথা শুনাবে। তোকে তো আর হাতের কাছে পাবেনা।
তোকে কথা শুনাবে মানে! তুই শুনবিই বা কেনো? জবাব দিয়ে দিতে পারিস না?
নাজেরা চুপ করে রইলো। তাযিন জানে এই মেয়ে বোকা প্রজাতির, সে কাউকে উঁচু গলায় কিছুই বলতে পারে না। ছোট বেলা থেকেই লেদা বাচ্চা সে। তাযিন প্রায় ছোট বেলার সেই বোকামি গুলো মনে করিয়ে দিয়ে নাজেরাকে হাসায়।
আকাশে চাঁদ নেই। খুব বেশি অন্ধকারও না। তবে কুয়াশা ঘিরে ফেলছে ধীরে ধীরে। ছাঁদের একপাশে এসে পাশাপাশি দাঁড়ালো নাজেরা আর তাযিন। ঠান্ডা আবহাওয়া খুব ভালো লাগছে নাজেরার। শরীর মৃদু কাঁপছে, মাঝে মাঝে ঠোঁটও কাঁপছে। গায়ে পাতলা শাল জড়ানো। তাযিন একদৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো। নাজেরাকে কাঁপতে দেখে বললো, এমন একটা পাতলা শালে শীত কমে নাকি? তুই কি সারাজীবন বোকাই রয়ে যাবি জারু?
নাজেরা স্মিত হেঁসে মাথা দোলায়, বুঝায় সে সারাজীবন বোকাই থাকবে। বোকা থাকার একটা মজা আছে সেটা হলো কাউকে ঠকানো হয় না। নিজে সব সময় ঠকে যায়।
তাযিন বলে, তোর কি সব সময় ঠকতে ভালো লাগে?
ঠকতে কার ভালো লাগে বল শুনি? তবে আমার অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এখন জিতে গেলেই বরং অস্বস্তি লাগে। আব্বু বলতো ঠকানোর চেয়ে ঠকে যাওয়াই ভালো মা।
তাযিন আর কিছু বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশে খুব খোঁজ একটা তারা পেলো। সে-ই তারার দিকে তাকিয়ে আনমনে বললো, একদিন ভীষন বাজে ভাবে ঠকে যাবি জারু। সেদিন উপলব্ধি করবি সব ঠকে যাওয়াতে স্বস্তি নেই।
নাজেরার হৃদয় কেঁপে উঠল। অভিমানী স্বরে বললো, তুই বুঝি আমায় অভিশাপ দিলি?
তাযিন তাচ্ছিল্য হেঁসে বললো, ধূর কি যে বলিস না! আমার লেংটা কালের আলাভোলা বন্ধুটাকে কি আমি অভিশাপ দিতে পারি?
নাজেরা খিলখিলিয়ে হাসলো তাযিনের কথায়। তাযিন নাজেরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিষাদের স্বরে বললো, এই মেয়ে তোর জীবন তো এমনি অভিশপ্ত! আমি আর কি বা অভিশাপ দিবো বল তো?
নাজেরার খিলখিলে হাসি বন্ধ হয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে একটু হাসি রেখে বলে, ধূর! আমার আব্বুর মতো রাজ পিতা আর তোর মতো বন্ধু থাকতে আমার জীবন অভিশপ্ত হতে যাবে কেনো? তোর মতো বন্ধু আছে, আমার একজন বাবা আছে, একটা ডাক্তার আঙ্কেল আছে,মালেকা খালা আর একটা মানিক চাচা আছে। একটা জ্যামিন আছে কতগুলো বই আর হাজার রকমের ফুলেরা আছে। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী।
তোর সুখ দেখে তো হিংসা হচ্ছে।
নাজেরা আবার হাসলো। ঠিক এই কারনে তাযিনের সঙ্গ মেয়েটার ভালো লাগে। অদ্ভুত কারনে তাযিন মুখ ফুটে যা-ই বলে তাতেই নাজেরার হাসি পায়, খুব হাসে সে।
তাযিন বললো, থাকবি আরেকটু?
নাজেরা গায়ের শালটা টেনে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে বললো, মন্দ লাগছে না। থাকি আরেকটু?
তাযিন মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলো। নাজেরা একটু থেমে বললো, তোর কি মন্দ লাগছে?
তাযিন একপলক নাজেরার চোখের দিকে তাকালো। খুব বেশিক্ষণ মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। তাযিনের চোখ অনেক কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস পায় না। তাযিন মুখে কিছু বললো না। নিজের গায়ের মোটা জ্যাকেট খুলে নাজেরার দিকে এগিয়ে আসলো। নিজের জ্যাকেট টা নাজেরাকে পড়িয়ে দিয়ে তার শালটা নিজের গায়ে মেলে দিলো।
নাজেরা এতে অবাক হয় না তাযিন আগে থেকেই তার এতোটা খেয়াল রাখে। তবে মুখে বলে, তোর ঠান্ডা লাগবে না?
তাযিন বিজ্ঞদের মতো বলে, আমি সুস্থ আছি। তোর শরীর অসুস্থ ভুলে যাচ্ছিস।
নাজেরা হেঁসে বলে, মনে রাখার জন্য তো তুই আছিস।
তাযিনও হাসে, হেঁসে ফিসফিস করে বলে, আমি তো কেবল ক্ষনিকের মায়া জারুলতা।
চলবে………
