Saturday, June 6, 2026







বসন্তের ঝরা ফুল পর্ব-১+২

#সূচনা_পর্ব
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

“তুই এত সুন্দরী একটা মেয়ে হয়ে গ্রামের সবচেয়ে বোকা ছেলেকে ভালোবাসিস এটা শুনতে কিন্তু খুবই খারাপ লাগে।”

​কলেজে যাওয়ার পথে, বৃষ্টি তার বান্ধবী শিউলির উদ্দেশে কথাটা বলল। কিন্তু শিউলি তার কথায় কোনো সায় দিল না, সে চুপ রইল।
​বৃষ্টি আবারও বলল, “তোর পেছনে কত ছেলেরা ঘুরে! তুই চাইলেই তাদের সাথে প্রেম করতে পারিস।”

​কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিউলি কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে এক রাশ সারল্য নিয়ে বলল,
​“আমি তো শুধু প্রেম করতে চাই না। আমি ভালোবাসতে চাই। আর সে ভালোবাসা সারাজীবনের জন্য পেতে চাই।”

​বৃষ্টি শিউলিকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কাকে ভালোবাসে? সেই প্রশ্নের উত্তরে শিউলি জানিয়েছিল, সে তাদের বাড়ির পাশের শিমুল নামের ছেলেটাকে ভালোবাসে। যে ছেলেটা কিনা গ্রামের চোখে সবচেয়ে বোকা। গ্রামের সবাই ছেলেটাকে বোকাসূলভ স্বভাবের জন্য ‘বলদ শিমুল’ বলে ডাকে।
​প্রিয় বান্ধবীর এমন অদ্ভুত কথায় আর ভালো না লাগায়, বৃষ্টি সামান্য ক্ষুণ্ণ হয়ে শিউলির পাশ থেকে আগে আগে হেঁটে চলে গেল

শিউলি কলেজের মূলপথ রেখে বাম দিকের সরু পথ ধরল।এখন বসন্ত কাল চলছে।হালকা রোদ আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, আর বাতাসে সেই নরম উষ্ণতা। গাছের শুকনো ডালে নতুন কচি পাতা ফুটছে, ঝুলছে সবুজ ঝুলন্ত কুঁড়ি। শিমুল পলাশের লাল কমলা ফুল চারপাশে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়েছে। পাখির ডাক, মৌমাছির গুঞ্জন, প্রজাপতির নরম ডানা সব মিলিয়ে বসন্তের নতুন প্রাণ বয়ে নিয়ে এসেছে। ছোট ছোট নদী খালও স্বচ্ছ জল দিয়ে হাসছে।

​শিউলি কিছুদূর এগোতেই দেখল, শিমুল ভাই পালংশাকের ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করছে। শিউলি তা দেখে ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকালো। ‘এটা তো শিমুলদের ক্ষেত নয়! তাহলে কেন সে নিজেদের ক্ষেত রেখে অন্যের ক্ষেতে কাজ করছে?’
​শিউলি এগিয়ে গিয়ে ডাকল,
​“শিমুল ভাই! ও শিমুল ভাই। ওই ক্ষেতে কী করো?”

​কারো ডাক শুনে নিচু হয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে থাকা, সাদা গেঞ্জি পরা আর মাথায় গামছা পেঁচানো ছেলেটা শিউলির দিকে তাকালো। শিউলিকে দেখতে পেয়ে সে দ্রুত এগিয়ে এলো। দাঁত বের করে প্রাণখোলা হাসি হাসতে হাসতে শিউলির কাছে দাঁড়িয়ে বলল,
​“কী রে শিউলি। ডাকিস ক্যান?”

​শিউলি রোদে পোড়া শিমুলের দিকে তাকাল। বলল,
​“শিমুল ভাই, তুমি নিজেদের ক্ষেত রেখে জামিল চাচার ক্ষেতে কী করছো?”

​ছেলেটা শিউলির কথায় আবারও হাসল, বলল,
​“জামিল চাচা কইল তার ক্ষেতে নাকি খুব আগাছা হইছে, তাই কইল সাফ করে দিতে।”

​শিউলি এবার সবটা বুঝতে পারল। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই ছেলেটাকে বোকা পেয়ে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই সব কাজ করিয়ে নেয়। শিউলি রাগী সুরে বলল,
​“তুমি কেন তাদের কাজ করে দিবা? কয়েকদিন আগেই তো তোমায় শুধু শুধু মারলো জামিল চাচা, মনে নেই?”

​শিমুল নিজের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“হ, মনে আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, ওইদিন আমি লাউ চুরি করি নাই, তবুও আমারে মারছে।” অসহায়ভাবে কথাটা বলল শিমুল।

​শিউলি কোমল কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি তুমি কিছু করো নাই। আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তোমার জন্য আমি পাটিসাপটা পিঠা এনেছি।”

​পিঠার কথা শুনতেই শিমুলের মুখে মুগ্ধতার হাসি ফুটে উঠল।
​“হাছা? দে, খাই!” আগ্রহ নিয়ে হাত পেতে বলল সে।

শিউলি এবার একটু শাসনের সুরে বলল,
​“এই! হাতে ময়লা নিয়ে খাবে? যাও আগে হাত ধুয়ে শিমুল গাছের তলায় আসো।”
শিউলি বিশাল বড় শিমুল ফুলের গাছটার দিকে ইশারা করে বলল।

​শিমুল ‘আইচ্ছা’ বলেই দৌড়ে ক্ষেতের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট খালের কাছে চলে গেল।
​শিউলি ততক্ষণে সেই বড় শিমুল গাছটার নিচে গিয়ে বসে পড়ল। গাছটা বিশাল, তাতে লাল ফুল ফুটে আছে। বসন্তের নতুন পাতাও গজাচ্ছে ডালে ডালে। শিউলি ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটা বের করে শিমুলের হাতে দিল। শিমুল বক্সটা নিয়েই তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করল।
​শিউলি এক ধ্যানে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

​“আমাকে একটু দিবে না? তুমি কি একাই খাবে?” শিউলি মুচকি হেসে বলল।

​শিমুল খেতে খেতেই বলল, “তুই খাস নাই? খাইবি?”

​“আমার ভাগের পিঠাটাই তো নিজে না খেয়ে তোমার জন্য নিয়ে আসছি। তোমার পছন্দ, তাই।”

​শিমুল তখন একটা পিঠা শিউলির দিকে এগিয়ে ধরে বলল, “নে, খা।”

​“তুমি খাইয়ে দাও শিমুল ভাই।” শিউলি আদুরে আবদার করল।

​শিমুল সরল হাসি হেসে বলল,
​“আমি ক্যান খাইয়ে দিমু? তোর জামাই তোরে খাইয়ে দিবে।” ​বলেই শিমুল মুচকি হাসল।

​আর কিছু না বলে শিমুল আবারও খাওয়ায় মন দিল।
​“জানো শিমুল ভাই, তুমি এই শিমুল ফুলের মতোই সুন্দর।” শিউলি নরম সুরে বলল।

​শিউলির কথায় ছেলেটা খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, “হাছা?”

​“হ, হাছা। শিমুল ভাই, আমি কি দেখতে সুন্দর না?”

​“হ, তুইও ম্যালা সুন্দরী আছস, ম্যালা।” শিমুল খেতে খেতে কথাটা বলল।

​“কই, কখনও তো বলো না আমি সুন্দর,” একটু থামে শিউলি। তারপর সরাসরি প্রশ্ন করে, “আমি কি তোমার বউ হওয়ার মতো সুন্দরী?”

​শিউলির এমন কথায় শিমুল হকচকিয়ে তাকালো। তার মুখে হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল। এরপর হাতে থাকা টিফিন বক্সটা শিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে সে বলল,
​“ধর, আমি তোর পিঠা খাব না। তুই লজ্জা লজ্জা কথা বলিস।”

​শিউলি হেসে বলল,
“লজ্জার কথা কই বললাম! পিঠাগুলো খেয়ে নাও। আর না খেতে পারলে চাচির জন্য নিয়ে যেও।”

​বলেই শিউলি উঠে দাঁড়ালো। দুই কদম সামনে এগিয়ে আবারও পেছনে ফিরে তাকালো। কিছুটা শাসনের ভঙ্গিতে বলল,
​“তুমি আর জামিল চাচার ক্ষেতে কাজ করবে না। তোমার নিজের ক্ষেত আছে তো! সেখানেই কাজ করো।”

রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে শিউলি। আজও তার কলেজে পৌঁছাতে দেরি হবে, তবে তাতে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে ধীর স্থিরভাবেই হেঁটে চলেছে।

​রাস্তার পাশে টংয়ের দোকানে সামনে বাইকে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে তামিম ইকবাল। প্রতিদিনই তাকে এখানে দেখা যায়। সাথে আরও কয়েকটি ভণ্ড ছেলেপুলে। গ্রামের প্রায় সব মেয়েদেরকেই বিরক্ত করা এদের প্রধান কাজ। এই ছাড়া এদের আর কোনো কাজ নেই। বাপ চেয়ারম্যান বলে কেউ এদের কিছু বলতেই পারে না।

​শিউলি যতটা সম্ভব দ্রুত এই জায়গাটা পার হতে চাইছে। সে মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল। পেছন থেকে ছেলেগুলো শিস বাজাচ্ছে।
​তখনই তামিম জোরে বলল,
​“আরে তোরা থাম! তোদের ভাবি হয়। একটু সম্মান দে।”
​সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল সবগুলো ছেলে একসুরে ডাকছে, “ভাবি!”

​তামিম এসে শিউলির রাস্তা আটকিয়ে দাঁড়ালো। শিউলি পাশ দিয়ে যেতে চাইলে সে আবারও সামনে এসে দাঁড়াল। তামিম সিগারেট টান দিয়ে শিউলির মুখের সামনে ধোঁয়া উড়ালো। শিউলি নাক মুখ কুঁচকে চেপে ধরল। স্পষ্ট রাগে সে বলে উঠল,
​“সমস্যা কী আপনার? পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কেন?”

​“আর এক কথা কত বলবো সুইটহার্ট? কতবার করে বললাম ভালোবাসি তোমাকে, কিন্তু না! তুমি তো আমার কথা শোনো না।”

​“আমিও আপনাকে বলেছি, আমি আপনাকে ভালোবাসি না! তবুও কেন এত ঝামেলা করছেন? আপনার জন্য গ্রামে আমাকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়!” শিউলি তার কণ্ঠে তীব্র রাগ নিয়ে বলল।

​তামিম সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে বেশ উদ্ধতভাবে বলল,
​“আমি যা বললাম সেটা চিন্তা করো। তা না হলে এর থেকে বড় ধরনের বদনাম হবে। পরে কিন্তু গ্রামে মুখও দেখাতে পারবে না, সুইটহার্ট।”

​শিউলি রাগী গলায় আবারও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
​“আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন, আমার সমস্যা নেই। এবার পথ ছাড়ুন।”
বলেই সে অন্য পাশ দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল।
​তামিম গিয়ে আবারও সেই একই জায়গায় বসল। তার সাথের একটা ছেলে বলল,
​“শিউলির বাপ তো এই গ্রামের মেম্বার। যদি কোনো সমস্যা হয়?”

​ছেলেটার কথায় তামিম তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
​“তুই বোধহয় ভুলে যাচ্ছিস, আমি চেয়ারম্যানের ছেলে। ওর বাপের কাছে বিচার দিয়েও কিছু করতে পারবে না। কারণ ওর বাপ ইদ্রিস খুব ভালো করেই জানে, আমার বাবা চাইলেই ওকে মেম্বারের পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারবে।”

​সবগুলো ছেলে একসাথে অট্টহাসি হেসে উঠল। তামিম আরেকটি সিগারেট ধরাল। খুব আয়েশ করে টান দিল সেই সিগারেটে।

#চলবে…?

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
শিমুলদের ঘরটি চারদিকে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা এবং মেঝেটি ইটের তৈরি। এই বাড়িতে শিমুল আর তার মা ছাড়া কেউ থাকে না। শিমুলের বাবা মারা গেছেন অনেক বছর আগেই।
​তাদের কিছুটা জমিজমা থাকায় তেমন কষ্ট করতে হয়নি। শিমুল বাড়িতে ঢুকেই জোরে হাঁক দিয়ে ডাকতে লাগল,
“আম্মা! ও আম্মা! কই তুমি?”

​শিমুলের মা আছিয়া খাতুন তখন গরুকে ঘাস দিচ্ছিলেন। ছেলের ডাক শুনে তিনি ছেলের দিকে আসলেন। শিমুল হাতে থাকা বাক্সটি মায়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখো আম্মা, তোমার লাইগা পিঠা আনছি।”
​আছিয়া খাতুন পিঠার বাক্সটি হাতে নিয়ে বললেন, “কোত্থেকে আনলি? কে দিল?”

​শিমুল হাতের গামছাটা বারান্দায় বাঁধা দড়িতে রাখতে রাখতে সংক্ষেপে উত্তর দিল,
“শিউলি দিছে।”

​আছিয়া খাতুন দেখলেন শিউলি বাড়ির ভেতরেই ঢুকছে। শিউলিকে দেখেই আছিয়ার খাতুনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। শিউলি শিমুলকে দেখে বলল,
“শুনবা চাচি, তোমার ছেলের কীর্তি শুনবা?”
​আছিয়া বেগম ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কেন, আবার কী করল?”

​“তোমার বোকা ছেলে নিজের জমি ফেলে রেখে অন্য মানুষের কাজ করে দিচ্ছিল।”

​আছিয়া বেগম হতাশার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“কী আর কই বল! গ্রামের মানুষ গুলো আমার পোলাটারে সরল-সোজা পাইয়া কেবল খাটিয়ে মারতে চায়। পোলাটারে কত করে বোঝাই, কিন্তু বোঝে না।”
​আছিয়া খাতুন এবার শিমুলের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বললেন,
“দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা গিয়ে গোসল করে আয়। ভাত দিচ্ছি।”

​শিমুল ‘আচ্ছা’ বলে পুকুরে গোসল করতে চলে গেল।
​আছিয়া শিউলিকে জিজ্ঞেস করলেন,
“আজ কি কলেজে যাসনি?”

​“হ, চাচি, গেছিলাম তো। টিফিনের সময় ছুটি নিয়ে চলে এসেছি। ভালো লাগছিল না তাই।”

​“তাহলে তো মনে হয় এখনো কিছু খাসনি? তুইও শিমুলের সাথেই ভাত খেয়ে নে। শুঁটকি রান্না করছি, তোর প্রিয় তো!”

​শিউলি হেসে বলল, “আচ্ছা চাচি। তুমি ভাত বাড়ো, শিমুল ভাই এলে তখন খাবো।”

এই বলে শিউলি বাড়ির পাশের পুকুরে গেল, যেখানে শিমুল গোসল করতে নেমেছে।
​শিউলি পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখল, শিমুল ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে পানিতে ফুটবল ছুঁড়াছুঁড়ি খেলছে। শিউলি গিয়ে ঘাটে বসল এবং এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শিমুল ভাইয়ের ভেজা চুলগুলো কপালে মিশে আছে। মনে হয় অনেকদিন ধরে চুলগুলো কাটা হয়নি, তাই বেশ লম্বা লাগছে।
​শিমুল সারাক্ষণ হাসে। হয়তো এই কারণেই তাকে একটু বোকা বোকা লাগে। তবে যখন মুখটা বন্ধ করে রাখে, তখন তাকে কোনো সিনেমার নায়কের চেয়েও কম লাগে না।
​হঠাৎ করেই শিউলি সাত বছর আগের এক ঘটনার কথা ভাবল।

​সেদিন ছিল মেঘলা দিন। বাচ্চাদের সাথে খেলা করতে করতে শিউলি পুকুরঘাটে এসেছিল নিজের পা ধুতে। কিন্তু পিছলে খেয়ে সে সোজা পানিতে পড়ে যায়। বর্ষার কারণে পুকুর পানিতে কানায় কানায় ভরা ছিল। শিউলি একবার পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, তো পরক্ষণেই ভেসে উঠছে। এই বুঝি তার প্রাণ যায় অবস্থা! ঠিক সেই সময় শিমুল যমদূতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে শিউলিকে তুলে এনেছিল।
​কিন্তু এই মহৎ কাজের জন্য শিমুল ভাইয়ের কপালে পুরস্কার জোটেনি, জুটেছিল লাঠির আঘাত।
​শিউলির বাবা ইদ্রিস খন্দকার ভুল বুঝেছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন শিমুলই হয়তো শিউলিকে পানিতে ধাক্কা দিয়েছে। সেই ভুল ধারণায় সেদিন এই পুকুরঘাটেই মাটিতে ফেলে শিমুলকে মেরেছিলেন তিনি। শিউলি সেদিন শুধু বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। সে তখন কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিল না। আজও তার কানে বাজে সেদিনের সেই চিৎকার,তার শিমুল ভাইয়ের চিৎকার।
​শিমুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকেই শিউলি সেই পুরনো ঘটনা ভাবতে থাকে।​যখন থেকে শিউলি বুঝতে শিখেছে ভালোবাসা কী, সেই দিন থেকেই শিমুল তার ভালোবাসার মানুষে পরিণত হয়েছে।

পানির ছিটায় শিউলির ধ্যান ভাঙল। শিমুল তখনো ছোটদের সাথে খেলা করে যাচ্ছে। শিউলি এবার ডাকল,
“শিমুল ভাই, এবার উঠে আসো। চাচি তোমাকে ডাকছেন।”

​শিমুল এবার পানিতে ডুব দিয়ে উঠে এলো। শিউলিকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শিমুল কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেল। সে গামছা শরীরের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছস কেন, আমার শরম লাগে।”

​শিউলি মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে নিল।

​বাড়িতে গিয়ে শিউলি আর শিমুলকে একসাথে খেতে দিলেন আছিয়া বেগম। শিউলি ভাত মুখে নিয়েই বলল,
“উফফ, চাচি! তোমার হাতের রান্না এত মজা! বিশেষ করে এই শুঁটকি মাছ।”

​আছিয়া বেগম হেসে বললেন, “হইছে এবার খা। এত প্রশংসা করতে হইব না।”
​আরেকটা লোকমা মুখে দিতে দিতে শিউলি প্রশ্ন করল, “আচ্ছা চাচি, শিমুল ভাইকে বিয়ে করাবে না?”

​আছিয়া বেগমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। হতাশার শ্বাস নিয়ে বললেন,
“ইচ্ছে তো হয় ছেলেটাকে বিয়ে করাতে, কিন্তু গ্রামের কেউ তো বিয়ে দিতেই চায় না। সবাই শুধু কয় ছেলেটা বোকা। যদি একটা মেয়ে পেতাম, তাহলে বিয়েটা করিয়ে ফেলতাম।”

​শিউলি মুচকি হেসে বলল,
“আশেপাশে কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে। তাদের সাথে শিমুল ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেই তো পারো।”

​শিউলির কথার আসল অর্থ হয়তো বুঝতে পারলেন না আছিয়া খাতুন। তিনি বললেন,
“কার কথা কইতাছোস? পাশের বাড়ির কুলসুমের কথা কইতাছোস? ওই মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়া দিয়া আমি কালসাপ ঘরে আনতে পারতাম না। যেভাবে ঝগড়া করে ওই মেয়ে! আর চরিত্রও তো ভালা না।”

​শিউলির খাওয়া এতক্ষণে শেষ। থালায় পানি ঢালতে ঢালতে সে বলল,
“আমি কুলসুমের কথা বলিনি। ভালো করে আশপাশে নজর দাও, অনেক ভালো মেয়ে পেয়ে যাবে।”

বলেই শিউলি উঠে দাঁড়াল। নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। শিমুলদের বাড়ি থেকেই শিউলিদের বাড়ি দেখা যায়। সামান্য রাস্তাটা পার হলেই তাদের বাড়ি। শিউলিদের বাড়িটি ভীষণ বড় করে এবং খুব সুন্দর নকশা করে তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি বিশাল ইটের তৈরি ঘর।
​শিউলিদের দুই বোন। শিউলি সবার বড় ছোট বোনটির বয়স আট। শিউলির মা হলেন জাবেদা এবং বাবা হলেন ইদ্রিস খন্দকার।
​শিউলিদের পরিবারটি খুবই সুখী এবং সচ্ছল। ছোটবেলা থেকে এই পর্যন্ত তাদের জীবনে কোনো কিছুর অভাব হয়নি, কখনো কোনো কষ্ট করতে হয়নি। তারা গ্রামের সবচেয়ে সচ্ছল পরিবার। বাবা মেম্বার হওয়ায় টাকার অভাব নেই। তবে অভাব শুধু বাবার সততার।
​শিউলি বুঝতে পারে, দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারিভাবে যত সহযোগিতা আসে, তার বেশিরভাগ অর্থই তার বাবার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। কিন্তু হাজার হলেও তো তিনি পিতা। তাই সব কিছু দেখে শুনেও চোখ বন্ধ করে থাকা ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকে না।

তখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণ পরই রান্না শুরু হবে। শিউলির অবশ্য কোনো কাজই করতে হয় না। বাড়িতে দুজন গৃহকর্মী লোক আছে, আর তার মা তারা মিলেই সব সামলে নেন।
​শিউলি তার ছোট বোন ফুলঝুরিকে পড়াচ্ছে। বাচ্চা মেয়েটা এবার নার্সারিতে উঠেছে। ছোট মানুষ, সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায়। সেই কারণেই শিউলি বিকেলে জোর করে তাকে পড়তে বসায়। তার সাথে শিউলি নিজেও একটু-আধটু পড়ে নেয়।
​শিউলি পড়াশোনায় ভীষণ ভালো, ক্লাসের টপার। শিউলির ছোট ভাই একটা বড় মাদ্রাসায় থেকে হাফেজি পড়ছে, সে সপ্তাহে একদিন বাড়িতে আসে।

​ঠিক তখন সেখানে শিউলির মা জাবেদা বেগম এলেন। তিনি এসে বললেন,
“শিউলি, তোর আব্বা কইছিল শাপলার লতি দিয়া চিংড়ি খাইবো। কাজের ছেলেটাও বাজারে গেছে। তুই গিয়া নিয়া আয়।”

​শিউলি বলল, “আমি একা যাব?”

​“আমি যাব আপা,” ফুলঝুরি উত্তেজিত গলায় বলে উঠল।

​শিউলি তার বোনের মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“তোকে নিয়ে গিয়ে আমার লাভ কী? তোকে নিলে উল্টে আমার চিন্তা বাড়বে।”

বোনের কথায় ছোট মেয়েটি মুখ ফুলিয়ে অভিমান করল।
​এবার জাবেদা বেগম বললেন,
“তাহলে তুই শিমুলকে বলবি এনে দিতে।”

​শিউলি তার মায়ের কথায় খুশি হয়ে হাসল। এই সুযোগে শিমুল ভাইয়ের সাথে আলাদা সময় কাটাতে পারবে ভেবেই তার ভালো লাগল। শিউলি দ্রুত বেরিয়ে গেল। ফুলঝুরিও তার সাথে যাওয়ার জন্য কাঁদতে শুরু করল, কিন্তু জাবেদা বেগম তাকে ধরে রাখলেন।

​শিউলি বিলের পাশের মাঠের কাছে গেল। কারণ সে জানত, শিমুলকে এই বিকেলে সেখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে।
​মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। আর শিমুল একপাশে বসে বসে তাদের খেলা দেখছে আর বারবার হাততালি দিচ্ছে। ছেলেটা ফুটবল খেলতে ভয় পায়। একবার খেলতে গিয়ে পায়ে ভীষণ ব্যথা পেয়েছিল, সেই থেকে আর ফুটবল খেলে না।
​শিউলি শিমুলকে ডেকে এনে বলল যে তাকে নিয়ে বিলে যেতে হবে শাপলা তোলার জন্য। শিমুল এক কথায় রাজি হয়ে গেল।
​শিমুল তার নিজের ছোট ডিঙিতে বসল, শিউলিও বসল তার সাথে। এই নৌকাটি মূলত গরুর জন্য ঘাস কাটার কাজে ব্যবহার করা হয়।
​শিমুল নৌকার সামনের দিকে বসে নৌকা চালাচ্ছে, আর শিউলি নৌকার মাঝে বসে এক দৃষ্টিতে শিমুলের দিকে তাকিয়ে আছে।
​শিউলি বলল,
“শিমুল ভাই, তোমার সাথে এভাবে সারাজীবন নৌকায় ঘুরতে চাই।”

​শিউলির কথায় শিমুল শুধু হাসল, আর কোনো কথা বলল না। শিউলি আবারও আবদার করল,
“বলো না, এভাবে নৌকায় ঘুরাবে তো?”

​“তোর বিয়া হইয়া গেলে তো জামাই বাড়ি চইলা যাইবি, তখন কেমনে ঘুরাব? তোর জামাই তোরে ঘুরতে নিয়া যাইবে,” শিমুল সরল-সহজ গলায় বলল।

​শিউলি আবারও হাসল, তবে এই হাসিতে ছিল চাপা গভীরতা। সে বলল,
“আমার জীবনে স্বামী হিসেবে শুধু তোমার নামই লেখা হোক। অন্য কারো হওয়ার আগে আমার মৃত্যু কবুল হোক।”
​শিউলির কথাটা আবেগপূর্ণ সহজ সরল ভাষায় হলেও, শিমুলের পক্ষে তার অর্থ বোঝা কঠিন। শিমুল শিউলির কথা বুঝল কিনা, তা বোঝা গেল না। ছেলেটা শুধু তার চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী হেসে দিল।

শিউলির মাঝে মাঝে ভীষণ মন খারাপ হয়। কেন তার প্রিয় শিমুল ভাই অন্য সব প্রেমিকদের মতো তার মনের কথা বুঝতে পারে না? কেন সে অন্য সব প্রেমিকের মতো প্রেমিকার মন জয় করতে চায় না?
​শিউলি নিজেও জানে, তার মনের আশা এত সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তার মনের মানুষটি যে অন্য সবার মতো নয়। সে তো অনেকবারই স্পষ্ট ভাবেই ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে, কিন্তু শিমুল বরাবরই তা বুঝতে অক্ষম।

#চলবে

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ