#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২৬ (সমাপ্ত)
★★★
সময় বহমান। প্রকৃতি কারো জন্যই তার গতি থামিয়ে রাখে না। মানুষ বলে, ‘আজ মরলে কাল দুইদিন’ কথাটা নিষ্ঠুর হলেও ধ্রুব সত্য। শিউলি মারা গেছে আজ পনেরো দিন হতে চলল। এই কয়েকটা দিনেই গ্রামের আকাশ-বাতাস থেকে শিউলির কান্নার রেশটুকু ফিকে হয়ে এসেছে। মানুষগুলোও বড় অদ্ভুত! যারা সেদিন শিউলির জানাজায় হাহাকার করেছিল, তারা আজ নিজেদের নিত্যদিনের কাজ আর হাসাহাসিতে ব্যস্ত। পৃথিবীটা চলে ঠিক পৃথিবীর নিয়মেই, কেবল কিছু ব্যক্তিগত জগত এক লহমায় ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে থাকে।
শিউলি হারিয়ে গেছে মাটির গহীনে, কিন্তু প্রিয় মানুষকে হারানোর সেই ক্ষত কি এত সহজে মুছে যায়? শিমুল সেই পনেরো দিন আগে যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, আর ঘরে ফেরেনি। নিজের ঘর, বিছানা সবকিছুই এখন তার কাছে অর্থহীন। দিন নেই, রাত নেই ছেলেটা পড়ে থাকে শিউলির ওই নিস্তব্ধ কবরের ওপর। ধুলোমাখা জীর্ণ শরীর, এলোমেলো চুল আর শূন্য দৃষ্টি। প্রেম মানুষকে কতটা নিঃস্ব করতে পারে, শিমুলকে না দেখলে তা বোঝা দায়। সে যেন এক জ্যান্ত লাশ, যার প্রাণপাখিটা পনেরো দিন আগেই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে সমাধিস্ত হয়েছে। মানুষ বিস্ময়ে ভাবে কী আছে এই প্রেমে? যে প্রেমে মানুষ নিজেকে তিল তিল করে শেষ করে দিতেও দ্বিধা করে না!
ইদ্রিস খন্দকারের দম্ভ আজ ধুলোয় মিশে গেছে। যে ক্ষমতা আর পদের লোভে তিনি নিজের সন্তানের চোখের জল দেখতে পাননি, যে দম্ভে তিনি শিউলির জীবনটাকে নরক বানিয়েছিলেন আজ সেই দম্ভেরই করুণ পরাজয় ঘটেছে। শিউলির মৃত্যুর দিন তিনি যে চেয়ারটাতে পাথরের মতো বসেছিলেন, আজও সেখানেই বসে আছেন। সেই চেয়ারে বসেই যেন তার বিচার শুরু হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা জানিয়ে দিয়েছেন, তীব্র স্ট্রোকের আঘাতে তার শরীরের বাম দিকটা চিরতরে অবশ হয়ে গেছে। এখন তিনি বেঁচে আছেন ঠিকই, কিন্তু সেই বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক। কথা বলার শক্তি নেই, নড়ার ক্ষমতা নেই কেবল চোখের কোণে জল আর হৃদয়ে এক পাহাড় সমান অপরাধবোধ নিয়ে তিনি তাকিয়ে থাকেন শূন্যতার দিকে।
হায়রে মানুষ! কিসের এত দম্ভ? কিসের এত অহংকার? আজ ইদ্রিস খন্দকার লক্ষ টাকা খরচ করেও নিজের শরীরের একটা আঙুল নাড়াতে পারছেন না। অথচ এই দম্ভের জন্যই তিনি একটি পবিত্র আত্মাকে আত্মহননের পথে ঠেলে দিয়েছিলেন।
তামিমকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল, আজ পনেরোটা দিন পেরিয়ে গেলেও সে অন্ধকার চার দেয়ালের মাঝেই বন্দি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার বাবা সিদ্দিক ইকবাল যিনি এলাকার প্রভাবশালী চেয়ারম্যান চাইলেই প্রভাব খাটিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। আজ পদমর্যাদা বা আভিজাত্যের চেয়ে একজন বাবার বিবেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি চান তার বিপথগামী ছেলে নিজের কৃতকর্মের সর্বোচ্চ শাস্তি পাক।
তামিম এখন জেলখানার ওই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কুঠুরিতে পড়ে থাকে। বাইরের আলো-ঝলমলে পৃথিবীটা এখন তার নাগালের বাইরে। জেলখানার নোংরা মেঝেতে হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে স্থবির হয়ে বসে থাকে। চারপাশে দাগি আর নিকৃষ্ট সব অপরাধীদের ভিড়, কিন্তু তামিমের মনে তাদের নিয়ে কোনো ভয় বা আক্ষেপ নেই। তার সমস্ত অনুশোচনা আজ এক মৃত মেয়েকে ঘিরে। তার কেবলই মনে হয় যদি শিউলি আজ বেঁচে থাকত, যদি সে আগেভাগে শিমুল আর শিউলির ওই পবিত্র ভালোবাসার গভীরতা বুঝত, তবে সে নিজ হাতে শিউলিকে শিমুলের হাতে তুলে দিত। কিন্তু হায়! হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজিলে আর মেলে না। সময় একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা কেবল এক বুক হাহাকারই উপহার দেয়।
অন্যদিকে, নয় বছরের ছোট্ট মেয়ে ফুলঝুরি। সমাজ হয়তো শিউলিকে ভুলে গেছে, কিন্তু এই ছোট্ট প্রাণটা কীভাবে ভুলবে তার কলিজার টুকরো বোনকে? কীভাবে ভুলবে শিউলির সেই আঁচলের গন্ধ, সেই স্নেহভরা স্পর্শ? মেয়েটা আগের মতো আর খেলাধুলা করে না, তার দুরন্তপনা আজ বিষাদে ঢাকা পড়েছে। জাবেদা বেগমও যেন তিল তিল করে শুকিয়ে যাচ্ছেন। তার ফ্যাকাশে মুখ আর কোটরাগত চোখ দুটোই বলে দেয়, তার ভেতরটা কতটা তছনছ হয়ে গেছে। যে সংসারে একসময় শিউলির হাসিতে রোদ খেলা করত, সেখানে এখন কেবল এক নিঝুম শোকের ছায়া।
কী অদ্ভুত, তাই না? একটা মেয়ের মৃত্যু, একটা ভুল জেদ আর একটা সাজানো অপবাদ কতগুলো মানুষের জীবনকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিল! কেউ জীবন্ত লাশ হয়ে কবরের পাশে পড়ে রইল, কেউ পঙ্গু হয়ে চেয়ারে বন্দি হলো, আর কেউ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিজের বিবেকের দংশনে দগ্ধ হতে লাগল। শিউলি তো চলে গেছে, কিন্তু সে যাওয়ার সময় এই মানুষগুলোর চেনা পৃথিবীটাকেও নিজের সাথে নিয়ে গেছে।
★★★
শিমুল শুয়ে আছে শিউলির কবরের ঠিক পাশে। যে মানুষটাকে সারাজীবন আগলে রাখার কথা ছিল, আজ তার কবরের ওপর গজিয়ে ওঠা ঘাসগুলোকেই সে পরম মমতায় ছুঁয়ে দেয়। সেই কচি ঘাসগুলোর দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে যেন এই সবুজ ঘাসগুলোর নিচেই শিউলি শুয়ে তার কথা শুনছে। শিমুলের চেহারার দিকে তাকালে আজ চেনা যায় না চোখের নিচে জমাটবদ্ধ কালির গাঢ় প্রলেপ, উষ্কখুষ্ক লম্বা দাড়ি আর ঘাড় অবধি ঝুলে থাকা অবিন্যস্ত চুল। ছেলেটার চোখের জল অনেক আগেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, এখন শুধু সেখানে এক অদ্ভুত শূন্যতা বিরাজ করে।
আছিয়া বেগম প্রথম প্রথম বুক ফাটা আর্তনাদ করে ছেলেকে ঘরে ফেরানোর চেষ্টা করতেন, কিন্তু এখন আর সেই সাহস পান না। শিমুলকে কবরস্থান থেকে জোর করে সরাতে গেলেই সে বন্য পশুর মতো চিৎকার করে ওঠে, যেন তাকে তার অস্তিত্ব থেকে আলাদা করা হচ্ছে। লোকে বলাবলি করে ছেলেটা বুঝি পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু শিমুল তো পাগল হয়নি, সে তো কেবল তার ঘর খুঁজে পেয়েছে। লোকে যাকে মৃত্যুপুরী বলে ভয় পায়, শিমুলের কাছে আজ সেটাই তার ভালোবাসার ঘর। কে বলেছে শিউলি আর শিমুলের সংসার হয়নি? রোজ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই সাড়ে তিন হাত মাটির ওপরই তো তাদের সংসার চলে। শিমুল এখন আর কাঁদে না, বরং শিউলির সাথে এক মনে গভীর গল্প করে সময় কাটায় যেন শিউলি পাশেই বসে তার কথা শুনছে।
শিমুল ধীরে ধীরে কবরের মাটির ওপর মাথা নুইয়ে দিল, যেন শিউলির বুকের ওপর মাথা রাখছে। তারপর খুব মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“জানস শিউলি? আমার না এই জায়গাটাত বইসা থাকতে বিরাট ভালা লাগে । তোরে ছাইড়া অন্য কেথাও গেলে আমার দম বন্ধ হইয়া আসে। তুই জানস? তুই যখন জিন্দা ছিলি, তখন আমি প্রতিটা নিশ্বাসে শুধু তোরে চাইতাম। আর এখন? এখন আমি প্রতিটা নিশ্বাসে নিজের মরণ খুঁজি। কিন্তু আজব কথা কী জানস, এই আজরাইলও আমার লগে বড় ছলনা শুরু করছে। মরণটা আমার কাছে আয় না রে শিউলি, মরণটা আমারে দেখা দেয় না।”
শিমুলের এই কথাগুলো যেন কবরের মাটির গভীরে হারিয়ে গেল। সে সেখানেই পড়ে রইল এক জ্যান্ত মানুষ, যার আত্মাটা অনেক আগেই ওই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে ঘর বেঁধেছে। গ্রামের মানুষ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে, যে প্রেম মানুষকে এভাবে জ্যান্ত লাশ বানিয়ে দেয়, সেই প্রেমের বিচার বুঝি এই দুনিয়ায় নাই।
শিমুল শিউলির কবরের নরম মাটির ওপর অনেকক্ষণ নির্জীবের মতো শুয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে হলো, শিউলি সেই পরিচিত হাসি মাখা মুখটা নিয়ে ঠিক তার শিয়রে এসে বসেছে। শিমুলের ফ্যাকাসে মুখে মুহূর্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে কচি বাচ্চার মতো দাঁত খিলখিল করে হেসে বলে উঠল,
“তুই আইছোস শিউলি? এত দেরি কইরা ক্যান আইলি? তোর শিমুল ভাই যে তোর লাইগ্যা হা পিত্যেশ কইরা বইসা থাকে, তুই কি এক্টুও বুঝস না?”
শিউলি তার চিরচেনা অভিমানি সুরে মুখ ভার করে বলল, “একী দশা করছো শিমুল ভাই তোমার? আমার শিমুল ভাইরে তো আমি এমন জংলি বেশে দেখতে চাই না। চুলগুলা এত বড় হইলো ক্যান? দাড়ি কাটো না ক্যান? আমি কিন্তু তোমার ওপর বিরাট চইটা আছি, কয়া দিলাম!”
শিউলি আজ একদম শিমুল ভাইয়ের ভাষায় কথা বলল।শিমুল হোহো করে হেসে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই শিউলির অবয়বটা বাতাসের সাথে মিশে উধাও হয়ে গেল। শিমুল ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বসল। আসলে কবরে মাথা রেখেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শিউলির বলা কথাগুলো তার কানে তখনো বাজছে। শিউলির আবদার যে তাকে রাখতেই হবে!
শিমুল পরম আদুরে ভঙ্গিতে কবরের মাটির ওপর হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তুই এইখানেই থাক শিউলি, এক পা-ও নড়বি না। আমি এই দেখ, এখনই সাফ-সুতরা হইয়া ফিরতাছি।”
বলেই ছেলেটা তীরের বেগে বাড়ির দিকে দৌড় দিল। আছিয়া বেগম উঠানে কাজ করছিলেন, ছেলেকে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি ভীষণ অবাক আর খুশি হলেন। যে ছেলেকে হাজার হাতে ধরেও বাড়িতে আনা যায় না, সে আজ নিজ থেকেই ফিরে এসেছে! শিমুল কারো সাথে কোনো কথা না বলে গামছাটা কাঁধে নিয়ে পুকুরঘাটে চলে গেল। কতদিন শরীরের ওপর পানি পড়েনি, কত ময়লা জমেছে চামড়ায়।
পুকুরের শীতল পানিতে ডুব দিয়ে শরীর জুড়াল সে। তারপর ঘরে ফিরে মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে সোজাসুজি বাজারে চলে গেল। সেলুনে গিয়ে মাথার জঙ্গল হয়ে থাকা চুল আর অবিন্যস্ত দাড়িগুলো একদম পরিষ্কার করে ফেলল। আয়নায় নিজেকে দেখে সে মনে মনে হাসল এখন নিশ্চয়ই শিউলি আর অভিমান করে থাকবে না।
শিমুল আবারও পাগলের মতো দৌড়ে সেই গোরস্থানে ফিরে গেল। শিউলির কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে সে বলল, “শিউলি, ও শিউলি! দ্যাখ, এবার আমারে ভালা লাগতাছে না? তুই রাগ করছোস দেইখা মাথার চুল কাটছি, দাড়ি কামাইছি। অহন তো আর তোর শিমুল ভাইরে জংলি লাগতাছে না, তাই না রে?”
কিন্তু শিউলির কোনো সাড়াশব্দ এল না। সেই নিস্তব্ধ কবর থেকে কোনো উত্তর ফিরল না। শিমুল অস্থির হয়ে আবারও চিৎকার করল, “কথা কস না ক্যান? তুই কি এখনো গোসা কইরা আছোস? আচ্ছা দাঁড়া, আমি বুঝছি তোর কী লাগব। তুই তো শিউলি ফুল খুব ভালোবাসতি, দাঁড়া আমি এখনই আইতাছি।”
বলেই শিমুল এক ছুটে শিউলিদের বাড়ির পেছনের সেই শিউলি গাছটার নিচে গিয়ে থামল। প্রতিবার এই সময় গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে থাকে, ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করে। কিন্তু আজ একি দৃশ্য! গাছটাতে একটা ফুল তো দূরের কথা, একটা সবুজ পাতাও অবশিষ্ট নেই। জ্যান্ত শিউলি গাছটা কেমন জানি শুকনো কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো, শিউলিহীন এই পৃথিবীতে শিউলি গাছটাও প্রাণ হারিয়েছে,সেও অভিমানে মরে কাঠ হয়ে গেছে।
এক মুঠো ফুল না পেয়ে শিমুলের দুচোখে রাজ্যের হতাশা নেমে এল। সে মাথা নিচু করে ধীর পায়ে আবারও কবরের কাছে ফিরে আসল। সে নিস্তব্ধ হয়ে কবরের পাশে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারই মাঝে শিমুল দেখল, ছোট ফুলঝুরি ধীরপায়ে কবরের দিকেই এগিয়ে আসছে। মেয়েটাকে দেখে শিমুলের শুকনো মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। ইদানীং এই অবুঝ মেয়েটাই শিমুলের দিনরাত্রির সঙ্গী, কবরের পাশে বসে দুইজন মিলে কত কথা বলে, কত খেলা খেলে।
ফুলঝুরি এসে আস্থার সাথে শিমুলের কোলে বসল। শিমুল এক ধ্যানে ফুলঝুরির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা দেখতে অবিকল শিউলির মতো। সেই একই রকম দুধ-আলতা গায়ের রঙ, সরু ঠোঁট আর কাজল কালো গভীর দুটো চোখ। শিউলি নেই, কিন্তু তার প্রতিচ্ছবি যেন এই ছোট বোনটার মাঝে বেঁচে আছে।
হঠাৎ ফুলঝুরি তার জামার ভাঁজ থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করে শিমুলের দিকে বাড়িয়ে দিল। শিমুল অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কিসের কাগজ এইটা ফুলঝুরি?”
ফুলঝুরি আধো আধো স্বরে বলল,
“আম্মা আইজ আপার পড়ার টেবিলের নিচ থাইক্যা এইডা পাইছে। আম্মা কইলো এই কাগজের ওপর তোমার নাম লিখা আছে, তাই তোমারে দিয়া আসতে পাঠাইলো।”
কথাটা বলেই ফুলঝুরি কোল থেকে নেমে আবার বাড়ির দিকে দৌড় দিল। শিমুল পাথরের মতো জমে গিয়ে হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল। পনেরোটা দিন ধরে যে মানুষটার একটা ডাক শোনার জন্য সে চাতকের মতো বসে ছিল, আজ সেই মানুষটারই ফেলে যাওয়া কোনো এক শব্দগুচ্ছ তার হাতের মুঠোয়।
শিমুলের বুকটা ধক করে উঠল। সে কাঁপাকাঁপা হাতে ভাঁজ করা কাগজটা খুলল। দীর্ঘদিনের জমে থাকা কান্নাগুলো যেন আবার বাঁধ ভাঙার উপক্রম হলো। চোখ ঝাপসা হয়ে এলেও সে অতি কষ্টে কাগজের অক্ষরগুলোর ওপর দৃষ্টি স্থির করল।
“প্রিয় শিমুল ভাই,
কেমন আছো তুমি? তুমি যখন এই চিঠিটা পড়ছো, তখন আমি পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ করে চলে গেছি এই মাটির বুক চিরে। এইমাত্র বিষের শিশিটা এক ঢোকে শেষ করে খাতা-কলম নিয়ে বসলাম। জানো শিমুল ভাই, বিষটা খাওয়ার পর মুখটা কেমন তিতকুটে তেঁতো হয়ে এসেছে। বিষের স্বাদ বড়ই ভয়ংকর শিমুল ভাই। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। কিন্তু বিষের যন্ত্রণার চেয়ে তোমারে হারানোর যন্ত্রণাটা বেশি হওয়ায় তেমন একটা কষ্ট বুঝতে পারছি না।
বিষ পান করার কয়েক সেকেন্ড আগে আমার হাত দুটো দুইবার কেঁপে উঠেছে। মুখের সামনে শিশিটা ধরেও গিলতে পারিনি। তোমার মুখটা যে বড় বেশি মনে পড়ছিল! ভীষণ করে মনে পড়ছিল তোমার সেই হাসিটা। কিন্তু যখনই মনে পড়লো এই বিষ যদি আজ না খাই, তবে অন্য পুরুষের নামে ‘কবুল’ পড়তে হবে,অমনি দুম করে গিলে ফেললাম নীল রঙা বিষ খানা।
আমার হাত এখন থরথর করে কাঁপছে, বারবার চোখে ঝাপসা দেখছি। তোমার সাথে ছোট্ট একটা সংসার করার বড় স্বপ্ন ছিল আমার। শখ ছিল তোমার সাথে দুষ্টু-মিষ্টি ঝগড়া করার, লাল বেনারসি পইরা তোমার ঘরে বউ হয়ে যাওয়ার। গতকাল রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম আমাদের ঘর আলো করে চারটা ফুটফুটে সন্তান এসেছে। স্বপ্নটা কী যে সুন্দর ছিল শিমুল ভাই! কিন্তু জাগার পর দেখলাম চারপাশটা কী ভীষণ অন্ধকার।
জানো শিমুল ভাই, আজ যে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছি, তাতে আমার কোনো দুঃখ নাই। আমার জন্মদাতা বাপের ওপর সামন্যতম অভিমান নাই, তামিমের প্রতিও কোনো ক্ষোভ নাই। আমার সবটুকু অভিমান শুধু নিজের ওপর। আমি জানতাম শিমুল ভাই, তোমারে পাওয়া আমার ভাগ্যে নাই। আমার মন-আত্মা সব জানতো যে আমি শিমুল ভাইয়ের হওয়ার নই। কিন্তু এই বেশরম হৃদয়টা কোনোদিন তা মানতে চায় নাই।
সবাই বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে খুব করে কিছু চাইলে তিনি নাকি ফিরিয়ে দেন না। আমিও তো বিশ্বাস করেছিলাম। যতবার আল্লাহরে ডাকছি, ততবার শুধু তোমারে চাইছি। তবুও কেন আমার কপালটা পুড়লো? কেন তোমার হইলাম না? যে জিনিস ভাগ্যে থাকে না, সে কেন হৃদয়ে পাথর হয়ে বসে থাকে বলতে পারো?
আমি চলে যাওয়ার পর তুমি একটা বিয়ে করে নিও। চাচি তো সারাজীবন থাকবে না। তোমারে সামলানোর জন্য একজন জীবনসঙ্গী বড় প্রয়োজন। কিন্তু শিমুল ভাই, নতুন বউরে পাইয়া আমারে এক্কেবারে ভুইলা যেও না। মাঝে মাঝে আমার এই ‘জাহান্নামি’ কবরের কাছে গিয়া একটু দোয়া করো, যাতে আল্লাহ আমার কবরের আগুনটা এক্টু কমিয়ে দেয়। আমি জানি আত্মহত্যা মহাপাপ। এক জীবনের জ্বালা থেকে বাঁচতে গিয়ে আমি কিয়ামত পর্যন্ত দুঃখ কিনে নিলাম। আমি বড় বোকা, তাই না শিমুল ভাই?
এই পর্যায়ে এসে ভীষণ মাথা ঘুরছে। চোখ দুটো জ্বালা করছে, হাত কাঁপছে। গলায় কী যেন দড়ির মতো পেঁচিয়ে ধরছে। কলম ঘুরাতে পারছি না। অনেক কিছু লেখার বাকি ছিল, কিন্তু শরীর আর কুল দিচ্ছে না।
তোমারে প্যাইয়া গেলে হয়তো ইতিহাস হইয়্যা যাইত,তাই তো তোমারে পাওন হইলো না।বিদায় শিমুল ভাই।
ইতি
তোমার শিউলি ফুল।”
চিঠিটা পড়া শেষ হতেই শিমুলের চারপাশটা যেন দুলে উঠল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে সে শুনতে পেল শিউলির সেই কান্নাভেজা কণ্ঠ। কাগজের ভাঁজে লেগে থাকা বিষাদ আর ভালোবাসার এই দলিলটা বুকের সাথে চেপে ধরে শিমুল আকাশের দিকে তাকিয়ে এক অমানুষিক চিৎকার দিল। যে কান্না সে পনেরো দিন ধরে জমিয়ে রেখেছিল, আজ তা রক্ত হয়ে যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইল।
★★★
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। শ্রাবণের সেই ধারা যেন আজ আর থামতে চাইছে না। চারপাশটা নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে গেছে। আছিয়া বেগমের মনটা কু গাইছে,ছেলেটা আজ পনেরোটা দিন ওই শ্মশানপুরীতে পড়ে আছে। এই ঝড়-বৃষ্টির রাতেও সে কি ফিরবে না? মা জননীর মন মানল না, একটা পুরনো ছাতা নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। ঝোড়ো বাতাসের ঝাপটায় ছাতা দিয়ে আর কতটুকু শরীর ঢাকা যায়? মাথার কিছু অংশ বাদে তার পুরো শরীরটাই ভিজে একাকার।
শিউলির কবরের ঠিক ওপরে একটা হলুদ বৈদ্যুতিক বাতি লাগানো হয়েছিল, বৃষ্টির ঝাপটায় তার ম্লান আলোতে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আছিয়া বেগম কবরের কাছে গিয়ে দেখলেন, শিমুল ঠিক আগের মতোই শিউলির কবরটা দুই হাত দিয়ে জাপ্টে ধরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। শিমুলের ভেজা শরীরে সেই হলদেটে আলো পড়ে এক অদ্ভুত বিষাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আছিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের শিয়রে বসলেন। পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে ডাকলেন,
“শিমুল… বাপ আমার, ওঠ।”
শিমুল কোনো উত্তর দিল না। আছিয়া বেগম ভাবলেন ছেলেটা হয়তো ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনি আবার ডাকলেন, “চল বাপজান, অহন বাড়ি চল। কাইল সকালে বৃষ্টি কমলে আবার আইস। এমনে ভিজলে তো শরীর থাকবো না রে বাজান।”
কিন্তু একি! ছেলেটা যে একটু নড়ছেও না। আছিয়া বেগমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। তিনি অস্থির হয়ে শিমুলের শরীরে একটা ধাক্কা দিলেন। ধাক্কা দিতেই শিমুলের নিথর শরীরটা কবরের একপাশে হেলে পড়ল। আছিয়া বেগম চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন,
“শিমুল! বাপজান আমার! কথা কস না ক্যান? ওরে কেউ আয়রে, আমার বাপ কথা কয় না ক্যান?”
শিমুল আর কথা বলবে না। সে চিরতরের জন্য মৌনতা বেছে নিয়েছে। তার প্রাণভোমরা অনেক আগেই লোকচক্ষুর আড়ালে উড়াল দিয়েছে দূর নীলিমায়। শিউলির কবরের ওপরেই শিমুল তার জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করল। আজ আর শিউলির আক্ষেপ রইল না যে শিমুল ভাই তাকে ছাড়া বাঁচতে শিখল না। শিমুলও প্রমাণ করে দিয়ে গেল বিচ্ছেদ কেবল শরীরের হয়, আত্মার নয়।
পরদিন আবারও পুরো গ্রামবাসী স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সবার মনে আজ একই প্রশ্ন প্রেমে এমন কী আছে যা মানুষকে মৃত্যুর ওপারেও টেনে নিয়ে যায়? শিমুলকে দাফন করা হলো ঠিক শিউলির পাশের কবরে।
আজ শিমুল আর শিউলির প্রেম সার্থক হলো। আজ তাদের মিলন হলো সেই ঘরে, যেখানে কোনো কোনো কলঙ্ক নেই, কোনো সমাজ নেই।
দুনিয়ার নিয়মের চেয়ে তাদের সংসারটা একটু ভিন্ন হলো বটে, কিন্তু কবরের এই অন্ধকার ঘরই হলো তাদের চিরনিদ্রার বাসর। এমন অক্ষয় সংসার কয়জনে পায়? তপ্ত রোদে পোড়া এই পৃথিবীতে কজন এমন শীতল ছায়া পায়? বসন্তের দুটো ফুল আজ একসাথেই ঝরে গিয়ে মাটির কোলে আশ্রয় নিল।
প্রকৃতি যেন সাক্ষী হয়ে রইল আজ দুইটি #বসন্তের_ঝরা_ফুল মাটির সাথে মিশে এক হয়ে গেছে। এভাবেই ইতি ঘটল শিমুল আর শিউলির সেই অবিনশ্বর ভালোবাসার।
[ “সমাপ্ত”]
