#পার্থক্যটা_দৃষ্টিভঙ্গিতেই
#আফরোজা_আশা
পর্ব-১.
একদা গ্রামের এক বড় ভাইয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। হেতু স্বরূপ বলেছিলাম; আনস্মার্ট ছেলে, তার সাথে আমাকে মানাবে না। কালের পরিক্রমায় একদিন সেই আনস্মার্ট ছেলের নামে কবুল পড়তে হয়েছে। পারিবারিকভাবে বিয়েটা হয়েছিল বিধায় আমার শত বারণ কেউ কানে তুলেননি। অবশ্য বিয়ের পর মানুষটাকে কেবল এক ঝলক দেখেছিলাম। তারপর সেই যে মানুষটা শহরে গেল চাকরির জন্য, আর এলো না। কেউ না বুঝলেও আমি ঠিক বুঝেছি, পুরুষটা আমায় বিয়ে করেছে পূর্ব প্রত্যাখ্যানের শোধ তুলবার উদ্দেশ্যে। কথাখানা ভাবলেই কেন যেন পাঁজোড় ভাঙ্গা কান্না আসে। অথচ নিষ্ঠুর আমার চোখজোড়া বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু আজ অবধি গড়েনি। কি অদ্ভুত কষ্ট! নিজের প্রতি নিজের বড্ড হাসি পায়!
সময়টা শীতের কোনো এক সকালের। গ্রামের বড় মাঠটার সামনে মাটির চুলো দেওয়া ছোট্ট পিঠার দোকানে তখন বেশ লোকজনের ভিড়। দালান ঘরের জানালা মাড়িয়ে সেই দোকানপানে দৃষ্টি ফেলে সেতু। মন তার আকুলিবিকুলি করছে, ওই গরম গরম ধোঁয়া ওঠা পিঠার জন্য। বাড়ির বউ বলে বাইরে গিয়ে খেতে পারছে না সংকোচে। কেবল তার চঞ্চল পদযুগল ঘুরছে দালান ঘরের চতুরপাশে। কিয়ৎকাল হাঁটাহাঁটির পর পুনরায় নজর ফেলে দোকানের দিকে; ব্যস অক্ষিপট তার বৃহদাকার ধারণ করে। ধপ করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যায় মেয়েটা। পিঠার দোকানের সোজা বরাবর পাকা রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়িটা দেখে বুক ধুকপুক করে উঠে। কি সর্বনাশ! মানুষটা চলে এলো? কিন্তু সে তো মোটেও তৈরি নয় তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য। আনমনেই অস্ফুট স্বরে এক আর্তনাদ বেরিয়ে যায় সেতুর মুখ থেকে। তক্ষুণি কর্ণগোচড় হয় উঠোনের তুমুল হৈ চৈ। রমণী একরাশ ভয়-ডর নিয়ে দুরুদুরু বুকে আসে দরজার সামনে। ওই তো মানুষটার পেছন অংশ দেখা যাচ্ছে। কি মোটা-সোটা বড় দেহের মানব! অথচ এককালে হাড্ডিসাড় ছিল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা লাগাত। তা দেখেই তো সদ্য ডগমগে বেড়ে উঠা রমণী সেতুর নিকট ছেলেটাকে আনস্মার্ট লেগেছিল। অদৃষ্টের খেল, আজ যদি সেতু ওই পুরুষটার পাশে দাঁড়ায়, তবে যে লোকে তাকেই আনস্মার্ট বলবে।
দরজার কপাটের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে উঠোনের গুটি কতক মানুষের কার্য-কলাপ দেখছে সেতু। কি আনন্দ! কি ফুর্তি তাদের! বাড়ির ছেলে ফিরেছে বলে হাসি যেন উপচে পড়ছে একেকজনের ঠোঁট-মুখ বেয়ে। কিছুটা সময় পর সেতুর ডাক পড়ে। তার শ্বশুরমশাই আওয়াজ দিচ্ছে তাকে।
“বউমার গোছ-গোছা হলো না এখনো? এদিকে এসো শিগগিরই। মিরাজ এসেছে।”
সে ডাক শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে সেতুর বক্ষস্থল। হাতের মাঝে থাকা কাপড়টাকে প্যাঁচাতে শুরু করে রমণী। এসেছিল ওই শুকনো কাপড়ের টুকরো দিয়ে, এখানকার বেতের চেয়ারগুলো মোছার জন্য। তার আর হয়েছে মোছা! শ্বশুরের হাঁক ডাকে বাধ্য হয়ে পা বাড়াতে হলো সেদিকে। শাড়ির আঁচলটা টেনে মাথা ছাপিয়ে নেয় ঠিকঠাক। নস্ত মস্তকে এসে দাঁড়ায় শ্বশুরের পাশে। দৃষ্টি তার জমিনের দিকে। লজ্জা পাচ্ছে, নাকি ভয়, নাকি জড়তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সামনা-সামনি থাকলেও পুরুষটার সঙ্গে কোনোরূপ বাক্য বিনিময় হলো না সেতুর। তার উচ্ছ্বাসিত শ্বশুরমশাই একাধারে কথা বলে গেলেন।
নাস্তার টেবিলে বসে বাঁধলো বিপত্তি। সেই ভোর-সকালে উঠে মাংস দিয়ে ভুনা খিচুড়ি রেঁধেছে সেতু। তার শ্বশুর আর ননদ উভয়ের পছন্দের খাবার। কিন্তু শহুরে ফেরত স্বামী নাকি সেসব হ্যাভি খাবার খাবেন না। তাকে সিদ্ধ ডিম, দুধ আর স্যালাড দিতে হবে। উপায়ন্তরহীন সেতুকে আবার রান্নাঘরে যেতে হলো। ডিম সিদ্ধ হতে আর দুধে জাল উঠাতে শ্বশুর, ননদের খাওয়া হয়ে গেল। ওদিকে নিজের ফরমায়েশ রেখে নবাবপুত্র তার ঘরে চলে গেছে। ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে সেতু। সংসারে বেশি মানুষ নেই। বিয়ের পর থেকে তাকে একা হাতে সামলাতে হয় সব। শ্বাশুরি মারা গেছে বেশ কয়েক বছর আগে, তখন সেতু স্কুল পড়ুয়া মেয়ে ছিল বোধহয়।
এক ট্রেতে ডিম সিদ্ধ আর দুধ নিয়ে ঘরের দিকে আসে সেতু। স্যালাড বানানোর মতো সবজি নেই বাড়িতে, তাই যা পেয়েছে তাই এনেছে। অভ্যাস মতো ঘরের দরজা পেরিয়ে কয়েক কদম চলে এসেছে সে, তাতক্ষণাৎ এক গম্ভীর গলা শোনা গেল।
”আমি থাকা অবস্থায় ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নিবে।”
কথাটা ভালো ঠেকল না সেতুর নিকট। তবুও মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। তারপর আবার এক কদম বাড়াতেই তার ওপর রীতিমতো ধমকে উঠল মিরাজ।
“গেট আউট। বললাম না পারমিশন নিয়ে ঘরে আসবে।”
হতচকিত পুরুষটার মুখপানে তাকায় সেতু। বড় আশ্চর্য হয়! এ কেমন কর্কশ রূপ? ছেলেবেলা থেকে মানুষটাকে দেখেছে সে। একই এলাকায় বাড়ি তাদের। অমন চড়া গলার আওয়াজ আগে কখনো শুনেনি। এতো বদল? কিছু বছরের মাঝে এতোটা বদলে গেছে সে? ঝাপসা হতে চায় সেতুর আঁখিপল্লব। খুব ইতস্ততা নিয়ে পা ঘুরিয়ে দরজার বাইরে যায়। মানুষটার ওই কর্কশ বাণী কোথায় যেন বিঁধেছে তার বুঝতে পারছে না। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আ..আসব?”
মিরাজের পূর্ণ দৃষ্টি সেতুর দিকে। বেতের চেয়ারটায় আয়েশ করে বসে আওড়ায়, “কাম।”
সে আনস্মার্ট বলেছিল বলে কি ইংরেজি বুলি আওড়ে নিজের স্মার্টনেসের প্রমাণ দিচ্ছে লোকটা? এ দফার ভেতরে ভেতরে বেশ হাসি পায় সেতুর। নিছকই বোকা লোক! হয়তো জানেই না মানুষের ব্যবহারে স্মার্টনেস নিহিত থাকে। তার ভাবনার মাঝে পুনরায় মিরাজের ভারিক্কি আওয়াজ আসে।
“স্যালাড কোথায়?”
“সালাদ বানানোর মতো সবজি নেই বাড়িতে।”
“সো হোয়াট? বাজার থেকে বিলুপ্তি ঘটেনি নিশ্চয়ই?”
“এখন এগুলো খেয়ে নিন। আমি আব্বাকে বলছি সবজি এনে দিতে।”
“তুমি থাকতে আব্বা কেনো যাবে?”
সহসা অবাক দৃষ্টে মিরাজের দিকে তাকায় সেতু, “আমি?”
মিরাজ ভাবলেশহীম গলায় বলে,“ইয়েস।”
“আমি কিভাবে? বাজার সবসময় আব্বা করেন।”
“নো মোর সাউন্ড’স। এক ঘণ্টার মধ্যে স্যালাড নিয়ে হাজির হবে। আমার ডায়েট চার্টের টাইম আপ হলে ইউ হ্যাভ টু পে।”
মিরাজের একরোখা কথার পরিপ্রেক্ষিতে সেতু কেবল বোকা চোখে চেয়ে রইল। মানুষটা কি ভাবছে; অমন আচরণ দেখিয়ে তার স্মার্টনেস জাহির করছে? কিন্তু সে যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এক মেরুদণ্ডহীন পুরুষকে। সাক্ষাৎ এক আনস্মার্ট পুরুষের প্রতিচ্ছবি ভাসছে পুরুষটার বসার ভঙ্গিমায়। ওই যে, সেতু তার সামনে দাঁড়িয়ে, অথচ সে কেমন পায়ের ওপর পা তুলে জুতোর তলা তার পানে বাড়িয়ে রেখেছে। কোনো স্মার্ট পুরুষের কাজ এতো নীচু মানের হবে না নিশ্চয়ই? তবে সেদিনকার প্রত্যাখ্যানটা জায়েজ ছিল বৈকি!
বয়স দোষে তখন সেতুর চোখে রঙিন চমশা লেগেছিল, তাই কঙ্কালসার হাবাগোবা ছেলেটার প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। আবার অপমান করেনি, গালি-গালাজও করেনি। শুধু ফিরিয়ে দিয়েছিল দুটো কথা বলে। কিন্তু মানুষটা কি করছে? বিয়ের পর এসে স্বামীরূপে সে এমন স্মার্ট সাজার প্রতিযোগীতায় নেমেছে যে, পূর্বের থেকে বহুগুণে আনস্মার্ট মিরাজের দর্শন পাচ্ছে রমণী। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবনা জগৎ থেকে বের হয় সেতু। তার অবস্থান এখন মাছের বাজারে। ইশ! কি আঁসটে গন্ধ! পেট গুলিয়ে আসতে চাইছে। মাছের বাজার পেরিয়ে তবে সবজির বাজারের নাগাল পাবে। ছোট থেকে দেখেছে বাড়ির হর্তা-কর্তারা বাজার-সদাই করে আর গিন্নিরা রাঁধে-বাড়ে। তার ভাগ্য এমন কর্তা জুটালো যে..! থাক ওসব ভেবে আর কাজ নেই।
সকাল হয়তো আটটার ঘরে। এরমাঝেই সব তাজা, টাটকা সবজিগুলো মানুষজন তুলে নিয়ে গেছে। কয়েকটা দোকান ঘুরে সালাদ উপযোগী সবজি কিনে সেতু। হাঁটার তালে আবার শাড়িও ঠিক রাখছে হচ্ছে তাকে। রাস্তার অবস্থা যা তা! বাজার থেকে বেরিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় চলল তার অলস পদযুগল। এক ঘণ্টা সময় দিয়েছে না? সে ঠিক দেড় ঘণ্টায় হাজির হবে। তারপর দেখতে চায় তার মেরুদণ্ডহীন, আনস্মার্ট স্বামীর প্রতিক্রিয়া।
পিঠার দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পিঠাওয়ালি চাচিটা তাকে ডাকল।
“ও বউ! তোমাদের বাড়ির পিঠাগুলা নিয়ে যাও।”
সেতু ভাবল ছেলে এসেছে বলে তার স্বশুরমশাই পিঠা দিতে বলেছে। তার একহাতে বাজারের ব্যাগ। অপরহাতে পিঠার বড় থলিটা নিতে নিতে শুধায়, “আব্বা টাকা দিয়েছে,নাকি পরে দিতে চেয়েছে?”
“তোমার শ্বশুর কেন দিবে? বাড়ি ঢুকার আগে মিরাজ গরম গরম পিঠা পাঠাইতে কইলো আর ওর ডেরাইভারটা কিছুক্ষণ আগে টাকা দিয়ে গেছে।”
অবাক হলো সেতু। হ্যাভি খাবার খাবে না বলে কত কাজ করালো তাকে দিয়ে। সেগুলো না করিয়ে তখনি বলতে পারত আমি পিঠাপুলি খাবো! একরাশ বিতৃষ্ণা সমেত বাড়ি ফিরে মেয়েটা। খিদের চোটে পেট তার মরি মরি করছে। খায়নি যে সকাল থেকে কিছুই। তন্মধ্যে পিঠের মনকাড়া গন্ধে, খিদের রাজ্য যেন তার ক্ষুদ্র পেটে যুদ্ধ শুরু করেছে।
ঠিক দেড় ঘণ্টা পর সালাদের বাটি হাতে ঘরে আসে সেতু। ওহ হ্যাঁ! এবার অবশ্যই অনুমতি নিয়েই ঢুকেছে। কি পরাধীন জীবন! এই জন্যই নারীদের সাবলম্বী হতে হয়, নয়তো এই যে তার স্বামীর মতো সমাজের কিছু মেরুদণ্ডহীন নিজেদের স্মার্ট বানাতে গিয়ে আনস্মার্ট এর সীমা ভেঙ্গে ফেলে।
মিরাজ খাচ্ছে। সেতু দাঁড়িয়ে আছে কোনো এক তাণ্ডবের জন্য। কিন্তু সে কি! মানুষটা নির্বিকারে, চামচে তুলে বেশ তৃপ্তি নিয়ে সালাদ খাচ্ছে। তার ভাব এমন যে এখানে সে ব্যতিত দ্বিতীয় কেউ নেই। অথচ স্ব-শরীরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। যারপরাইন অবাক সেতু, নিশ্চুপে প্রস্থান করে।
কদিন পর,
গ্রামের অলি-গলি ছেড়ে সেতুর স্বামীর মতোই, তার মেরুদণ্ডহীন বড়লোক গাড়িটা তখন শহরের পথ ধরেছে। সামনে ড্রাইভার, পেছনে তারা দুজন। কদিন ছুটি কাটিয়ে, আজ মানুষটা তাকেও সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে শহরে। দূরে থেকে তো ফরমায়েশ খাটাতে পারবে না, তাই এবার কাছে রেখে ইচ্ছেমতো স্মার্টনেস দেখাবে। বিরাট বড় কোম্পানিতে অফিসার পদে চাকরি করে নাকি সে। যখন বিয়ে হয়েছিল তখন শুনেছিল ব্যবসা করে। হায় পুরুষ! কত রূপ! কত পরিবর্তন!
এই মুহূর্তে পুরুষটা আরেকটা স্মার্টের কাজ করতে গিয়ে আনস্মার্ট বনে গেছে। তার দিকের কাঁচ-জানালা খুলে প্রমাণ করতে চাইছে; মেরুদণ্ড সমেত সুঠাম এক পুরুষ সে, র’ক্ত গরম। যার এই তীব্র শীতের মাঝে, জানালা বেয়ে হনহনিয়ে আসা বাতাসটা গায়ে লাগছে না। অথচ পাশে যে শাড়ি পরিহিত একজন, শীতল বাতাসের প্রকোপে সিটিয়ে আছে, তা যেন চোখেই পড়ছে না।
কি এক অবস্থ! সেতু ক্ষণে ক্ষণে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। হাসবে নাইবা কেনো? মানুষটা প্রতি পদে পদে তাকে বোঝাতে চাইছে, সে যে কারণে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার থেকেও বেশি স্মার্ট পুরুষ হয়েছে সে। কিন্তু হায়! সেতু যে শারীরিক, মানসিক, আচরণিক সবদিক থেকেই তার উল্টোটা দেখছে। রাতের আঁধারে পুরুষটা যখন নিমগ্ন ছিল স্বীয় পৌরুষত্বের আড়ালে চূড়ান্ত স্মার্টনেসের প্রমাণ দিতে, তখন সে খুব করে উপলব্ধি করেছে, সেদিনকার তার প্রত্যাখ্যানের বুলিগুলো বড্ড উচিত ছিল।
ওই যে সে বলেছিল, মানুষটাকে তার সাথে মানাবে না। সে কথার রেশ ধরে পুরুষটা তার প্রতিটা স্পর্শে দেখাতে চেয়েছে; দেখো মেয়ে আমাকে নয়, বরং তোমাকেই আমার সাথে মানাচ্ছে না। সেতু দেখে তো! স্ব-চক্ষে দেখে, স্পষ্ট দেখে নারীকে অবজ্ঞা, অবমাননা করা মেরুদণ্ডহীন আনস্মার্ট এক পুরুষকে।
চলবে..
