#পার্থক্যটা_দৃষ্টিভঙ্গিতেই
২.
মিরাজ আর সেতুর শহরের আসার পরদিনের ঘটনা।
দিনের শুরুতেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারিধার। ফজরের নামাজ শেষে হাঁড়-কাঁপা শীতে রান্নাবান্না করছে সেতু। যত ঠাণ্ডাই হোক, জগৎ-সংসারের নিয়মে কি আর বেড়ি বাঁধা যায়! স্বামী নামক পুরুষটা উঠে খেয়েদেয়ে অফিস যাবে। সে রান্না না করলে খাবে কি? গরম গরম খানা-পিনা, আর নিজের দেখভালের জন্যই না পুরুষটা তাকে শহরে নিয়ে এসেছে।
মিরাজ উঠল কিছুটা বেলা করে। বলা বাহুল্য তাদের মাঝে কথাবার্তা খুব একটা হয় না। ওই অতি-প্রয়োজনীয় টুকটাক। স্যুটব্যুট পড়ে বাবু সাহেব এলেন খাবার টেবিলে। মুখের সামনে পেলন দুধ,ডিম আর সালাদ। টেবিলে আবার দুপুরের জন্য টিফিন ক্যারিয়ার সাজানো। সব গুছিয়ে রেখেছে সেতু।
মিরাজ সময় নেই অজুহাত দিয়ে দু-একবার খেয়ে অফিস চলে যায়। ওদিকে সেতু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখে টেবিলের ওপর রাখা খাবারগুলো। চোখ-মুখ তার ভীষণ ফ্যাকাসে। গুলগুলিয়ে কাঁপছে হাত-পা। সাত-সকালে উঠে সব করল সে। খাবেই না যখন আগে বলত, তাহলে এই ঠাণ্ডায় এতো অহেতুক আয়োজন করত না। কি বিদঘুটে শীত পড়েছে! ভেতরের কল-কবজা তার হীম হয়েছে বুঝি। পুরুষটা কোনো কিছুর মূল্যই দিল না। একটা ডিম আধখাওয়া, দুধের গ্লাস অর্ধেক, কাঁচা সবজি-টবজি গেলে সেগুলোও অর্ধেক। অচিরেই সেতুর পেটের খিদে মরে গেল। আর বিন্দুমাত্র রুচি হলো না খাওয়ার। বরফের ন্যায় শক্ত শরীরটা টেনে গিয়ে মরার মতো বিছানায় পরে থাকল। কষ্টে জর্জরিত তার বক্ষতালু। গলা ফাটিয়ে কাঁদতে পারলে হয়তো আরাম পেত খানিকটা। কিন্তু চোখে কি যেন লেগেছে তার? পানি পড়ছেই না। রমণীর মাথায় এক কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল, ‘বাঘে পেলে, প্রত্যাখ্যানের শোধ কি বাজেভাবে তুলতে জানে পুরুষজাত!’
_________
মিরাজের অফিসে।
ব্রেক আওয়ার চলছিল তখন। কয়েকজন কলিগ মিলে একসাথে লাঞ্চে বসেছে মিরাজ। খাওয়ার ফাঁকে তাদের মাঝে জমজমাট গল্প চলছে। মিরাজের এক কলিগ তাকে বলল, ‘এতোদিন বাইরের খাবার খেতেন মিয়া। বউ এসে সুবিধা হয়েছে দেখছি। বাড়ির স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন এখন থেকে।’
সে কথার প্রেক্ষিতে চাওড়া হাসল মিরাজ। খেতে খেতে বলল, ‘তা তো হয়েছেই। বউ আমার বড্ড ভালো। বলার আগেই সব গুছিয়ে রাখে।’
আরেকজন বলল, ‘ঘুষ হিসেবেও নিশ্চিয়ই পকেট মেরে দেয়। আমারজন পারলে অনলাইনের সব এনে বাড়িতে তুলে।’
অতঃপর এক কথা দু কথায় তাদের মধ্যে নিজেদের স্ত্রী নিয়ে বেশ আলাপ-আলোচনা চলে। মিরাজ কেবল হাসে। তার মনে পরে পুরনো দিনগুলো। সেতুদের বাড়ির পাশে বড় ফাঁকা মাঠ ছিল। ছুটির দিনগুলোতে সেখানে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা হতো ওর। হুট করে একদিন রমণীকে দেখে সে মুগ্ধ হয়। তারপর আরো কয়েকদিন নজরে নজরে রাখে। এরপর একদিন নিজের মনের কথা বলে ফেলে তার নিকট। পায় তার প্রত্যাখ্যান। রমণীর মুখে শুনে সে আনস্মার্ট। তার সাথে মানাবে না তাকে। কষ্ট পায় ছেলেটা। খুব কষ্ট পায়। আরো কয়েকবার চেষ্টা করে মেয়েটার সাথে কথা বলার, পারে না।
পরে নিজেকেই শোধরায় সে। দৈনিক রুটিনে বিশদ পরিবর্তন টানে। খাওয়া-দাওয়ায় চলে কড়া নিয়ম। পড়াশোনায় যেটুকু খামতি তা আস্তেধীরে পূরণ করে। সাথে পাল্টায় তার আচার-ব্যবহার। বয়সের সাথে শীর্ণ দেহে পুরুষালি ছাপ ফেলে। লম্বা-চাওয়া সুঠামদেহী হয়। পড়াশোনার সাথে একটা ছোট ব্যবসা চালায়। তাতে বেশ লাভবান হয়। অতঃপর তার বাবার কানে তুলে সে তার এলাকার এক মেয়েকে পছন্দ করে। তাকেই বিয়ে করতে চায়। সেতুর কথা শুনে মিরাজের বাবা কদিন বাদে সেতুর বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে যায়। জানা-শোনা মধ্যে ভালো ছেলে পেয়ে সেতুর বাবা দ্বিমত করেননি। কিছুটা আয়োজন করেই মেয়েকে তুলে দিয়েছেন মিরাজের হাতে।
ওদিকে বিয়ের দিন সকালেই মিরাজের ইমেইল আসে, চাকরি কনফার্ম হয়েছে। সেদিনই তাকে শহরে যেতে হতো। কিন্তু চাকরি ছাড়লেও, বিয়ে ছাড়বে না সে। অতঃপর বিয়ের পরদিন শহরে আসতে হয়েছিল ছেলেটাকে। ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে, এখানকার সবকিছু সাজিয়ে তারপর গ্রামে ফিরেছিল।
কোম্পানি থেকে গাড়ি পেয়েছে মিরাজ। তাতে করেই চলা ফেরা তার। সেদিন যখন বাড়ির রাস্তায় তার গাড়ি থামল, তখন দেখল এক চঞ্চলে হরিণী দালান ঘর থেকে বারবার উঁকিঝুঁকি মারছে পিঠার দোকানের দিকে। সে বুঝল মেয়েটার পিঠা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাড়িতে ঢোকার আগে পিঠাওয়ালিকে কিছু পিঠা পাঠাতে বলল। খুচরো না থাকায় বাড়িতে এসে ড্রাইভারের হাতে টাকা পাঠালো। মেয়েটা আবার সে পিঠা একা খায়নি, তার জন্যও পাঠিয়েছিল।
তারপর মিরাজ একটু ফায়দা নিয়েছে। ওই যে তাকে কতদিন ঘুরিয়েছিল, তাই একটু বাজিয়েছে সেতুকে। আব্বা বাজার করলেও, সে মেয়েটাকে বাজারে পাঠিয়েছে। অবশ্য এতে ক্ষতির কিছু নেই। সে চায় মেয়েটা বাইরের জগৎ চিনুক। শহরে এনেছেও এ কারণে। কিন্তু বছরের শেষ সময় বলে অফিসের পাহাড় সমান কাজের কারণে এখনো তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতে পারেনি। মিরাজের ইচ্ছে আছে এই পুরো শহরটা ঘুরে ঘুরে রমণীকে দেখাবে, চেনাবে। দিনশেষে সত্য এই, মেয়েটার প্রত্যাখ্যানের কারণে সে এই অবস্থানে এসেছে। কৃতজ্ঞ সে তার কাছে। এখন শুধু সময় করে স্বীকার করা বাকি!
মিরাজ আজো নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগে। সেতুর বলা ওই কথা স্পষ্ট মনে আছে তার। মেয়েটা খুব ঘৃণা নিয়ে বলেছিল, সে আনস্মার্ট। এই শব্দটার জন্য আজো সেতুর সাথে সহজ হতে পারছে না। ওর সাথে বেশি কথা বলতে চাইলে, সময় কাটাতে চাইলে মেয়েটার উদাসীন ভাব দেখে বুঝতে পারছে, তার নজরে আজো সে আনস্মার্ট। কিছুটা ভাবের সহিত চলেও দেখেছে, সে স্মার্টনেসও সেতুর মন মতো স্মার্ট হতে পারেনি বোধহয়।
মিরাজ খুঁজে পাচ্ছে না নিজেকে আর কিভাবে বদলালে সেতুর নিকট সে স্মার্ট হতে পারবে। একজন পুরুষের কি করণীয়? সব ঘেঁটে টেটে সে নিজেকে প্রস্তুত করেছিল। স্বীমার অধিকার নিয়ে যখন প্রথমবার গিয়েছিল মেয়েটার কাছে, বিপরীতে সে একদম চুপ ছিল। মিরাজ ভেবেছে নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। তারপরও বেশ ভয়ে ছিল। পরদিন গ্রাম ছেড়ে শহরের আসার জন্য সেতুকে দেখল সাজগোজ করতে। তা দেখে ওর ভীতি কাটল। আবার গাড়িতে যখন পাশাপাশি বসেছিল, তখন খেয়াল করেছে সেতুর নাকের পাশে, কপালের দিকে চিকচিক করছে। দূর থেকে মিরাজের চোখে তা ঘামের মতো ধরা পরে। বদ্ধ পরিবেশে সেতুর খারাপ লাগছে ভেবে কাঁচ-জানালা নামিয়ে দেয়। আবার ভোরে রমণী নামাজ পড়ার পর যখন নিজ থেকে কাজ করছিল, তখন ঘরের হিটার অন করে দেয়, যাতে শীত কম লাগে তার। খাবার টেবিলে যখন বসল, দেখল মেয়েটা সব খাবার-দাবার ওর পাতে দিয়ে দিয়েছে। তাই অর্ধেকটা খেয়ে বাকিগুলো ওর জন্য রেখে, দেরীর বাহানা দিয়ে চলে আসে। মেয়েটা হয়তো খেয়েদেয়ে এখন আরাম করছে। ওহ! মিরাজ আবার এক কাজ করেছে। পাশের প্লটের ভাবিটা বেশ মিশুকে।সময় কাটানোর জন্য তাকে বলেছে অবসর সময়ে গিয়ে সেতুর সাথে গল্প-গুজব করতে। সেতুকে চেনে ও, মেয়েটা মুখ ফুটে কিছু বলে না। মিরাজের এই কদিন অফিসেই ব্যস্ততা যাচ্ছে। ফিরেও দেরী করে। এই সপ্তাহটাই তার চাপ বেশি তারপর বেশ ফাঁকা থাকবে। তখন ভাবনা মতো সেতুকে নিয়ে ঘুরবে। দুজনের মাঝে যে জড়তা আছে তা কাটাবে ধীরেসুস্থে।
______
কলিংবেল বাজছে।
সেতু তখনো নির্বিকারে শুয়ে ছিল। কলিংবেল একাধারে বাজছে দেখে উঠে নিজেকে ঠিকঠাক করে দোর খুলে। পাশের ফ্ল্যাটের ভাবিকে দেখে সৌজন্য আলাপ করে। ঘরে আসতে বলে তাকে। মহিলা আসে, সেতুর সাথে কথাবার্তা বলে। কথার ফাঁকে এও বলে মিরাজ তাকে বলেছে, যেন এসে এসে দেখে যায় সে কি করছে। কিছুক্ষণ থেকে সে চলে যায়।
ওদিকে দরজা চাপিয়ে এসে ভেঙ্গে পরে সেতু। তার ধৈর্য্য সীমায় আর কূলোচ্ছে না। মেরুদণ্ডহীন পুরুষটা সবভাবে প্রতিশোধ তুলছে। আনস্মার্ট বলেছিল বলে, স্মার্ট সেজে বিয়ে করল। তারপর তাকে ফেলে রেখে শহরে চলে গেল। যেদিন গ্রামে ফিরল, তাকে দিয়ে বাজার করালো। পিঠা আনালো নিজের জন্য, সেগুলো সেতু প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে গেল, একবারো সাধল না খাওয়ার জন্য। রাতের বেলা তাকে কতগুলো টাকা দিল। মোহরানা শোধ করে বোঝালো, সে তার হোক আদায় করতে এসেছে। তৈরি ছিল না সে কিন্তু কোন যুক্তিতে বাঁধা দিতো? নিশ্চুপ থেকে সব সইতে হয়েছে। পুরুষটাকে মন থেকে মেনে নেওয়ার আগেই মন থেকে বেরিয়ে গেছিল।
এখানে এসে সাত-সকালে উঠে কাজ করে, ঠাণ্ডা পানি নাড়ে। একবারো মানুষটা বলে না এতো সকালে উঠতে হবে না, একটু দেরী করে উঠো। বরং ভোরের দিকে নিজের শীত বাড়ে বিধায় হিটার অন করে। ওদিকে সে নারী, তাকে বরফ ঠাণ্ডা পানি নেড়ে সব কাজ করতেই হবে। সেতু সবজি বেশি খেতে পারে না। ডিম খায় কম আর দুধ তো চিরশত্রু। পুরুষটার এঁটো প্লেটের খাবারগুলো ডাস্টবিনে দিতে হয়। লাঞ্চের জন্য খায় একপালা সবজি। ফলস্বরূপ রমণীর দিনটায় যায় পেটের খিদেয়। বেঁচে থাকার জন্য জোরপূর্বক দু লোকমা গিলে পানি খায় শুধু।
পুরুষটা এতো বেশি স্মার্ট সেজেছে যে, তার সাথে দু’দণ্ড কথা বলে না। সে সাজলে-গুজলে ঠিকভাবে দেখে না। ওই তো সেদিন, শহরে আসার সময়, নিজের বিষাদ ছাপিয়ে রেখে সেজেছিল। গালে-মুখে হাইলাইটার দিয়েছিল যেন সুন্দর লাগে দেখতে। আয়নায় দেখেছিল নিজেকে সে, মুক্ত দানার ন্যায় চিকচিক করছিল তার চোখমুখ। অথচ আনস্মার্ট পুরুষটা প্রত্যাখ্যানের শোধ তুলতে, রাস্তায় ঠাণ্ডা বাতাস খাইয়ে এনেছে। আবার পাশের বাড়ির ভাবিকে বলেছে, নজরদারিতে রাখতে।
বিছানার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে এবার হু হু করে কাঁদল সেতু। এক সময় পর বিছানায় পরে গেল তার দূর্বল দেহখানা।
_______
মিরাজ যখন বাড়ি ফিরল তখন অনেক রাত। সারাদিনের কাজে শরীর তার ক্লান্ত। বেল দিতে গিয়েও দিল না। সেতু হয়তো এতোক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে। এক্সট্রা চাবি দিয়ে ভেতরে আসে।
ঘরে এসে দেখল মেয়েটা এই ভারি শীতেও সোয়েটার পড়েনি, ঘুমিয়েছে তাও গায়ে লেপ-কম্বল কিছু নেয়নি। অফিস ব্যাগটা রেখে সেতুর নাম ধরে কয়েকবার আওয়াজ দিল মিরাজ। কিন্তু মেয়েটার কোনো সাড়া পেল না। শরীর,হাত-পা তার বেশ অপরিষ্কার। এভাবে মেয়েটার কাছে গেলে যদি আরো আনস্মার্ট মনে করে। তাই তাড়াহুড়ো করে আগে ফ্রেশ হয়ে নিল। অতঃপর সেতুর পাশে এসে ওর গায়ে ভারি কাপড় টেনে দিল। কতক্ষণ থেকে এভাবে আছে কে জানে। মনে হয় হাত-পা ঠাণ্ডায় জমে গেছে মেয়েটার। গরম করার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াতেই চমকাল মিরাজ। শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। সে জ্বর ছাড়াতে পারল শেষ রাতে গিয়ে। চার ঘণ্টা পর পর সেতুকে কিছু খাইয়ে ওষুধ দিতে হলো তাকে। দুবার রমণীর কাঁপুনি উঠল, তখন নিজের সাথে প্যাঁচিয়ে ধরে উষ্ণতা দিল। অনেক সেবা-যত্নের পর মেয়েটা সুস্থ হলো দিন দুই পর।
কথায় আছে না, অসুস্থতা আল্লাহর নিয়ামত সরূপ। মাত্রাতিরিক্ত জাজমেন্টাল সেতু উপলব্ধি করল পুরুষটা খুব গুছিয়ে যত্ন নিতে জানে। সুস্থ হওয়ার পর তাকে নিয়ে শহরের আনাচে-কানাচে ঘুরতে জানে। শহর চেনাতে জানে। একা চলা শেখাতে জানে। তার মন ভালো করার মতো কাজও করতে জানে। তার সাথে ম্যাচিং কাপড় পরে বোঝাতে জানে, দেখো আমাদের একসাথে খুব সুন্দর মানাচ্ছে। স্মার্ট পুরুষের ন্যায় স্ত্রীর হাত ধরে রাস্তা পার করতে জানে। ফুটপাতের ওই লোভনীয় ফুচকা তার ভারী পছন্দের তাও জানে।
সেদিন বের হওয়ার সময় বলল, ‘সেজো না। তুমি ন্যাচরালিই ভীষণ সুন্দর।’
ওই কথাটাতে কি কিছু ছিল? ছিল তো, মেরুদণ্ডসমেত পুরুষের বলা একটা মধুর বাণী ছিল। সেতুর নিকট যে তাই মনে হয়েছে। বড় আশ্চর্য হয়েছিল সেদিম মেয়েটা। তারপর যখন রিকশায় বসল পাশাপাশি, তখন পুরুষটা শুধাল, ‘তুমি ঘেমে যাচ্ছো। গরম লাগছে তোমার?’
সেতু বলল, ‘ঠাণ্ডা প্রকৃতিতে ঘামবো কেনো?’
বিপরীতে সে বলল, ‘তোমার গালে-কপালে ঘামের মতো দেখতে পাচ্ছি। খারাপ লাগছে কি?’
তা শুনে ভেতরে ভেতরে খুব চমকাল সেতু। সাজতে মানা করেছে তাও সে একটু পাউডার দিয়েছিল। শত হোক বাইরর বের হচ্ছে স্বামীর সাথে। হালকা ছোট ছোট দানার চিকমিক ছিল পাউডাটায়। ওগুলো আবার মানুষটার চোখে পড়েছে! কত সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করেছে সে? তবে কি সেদিন ওগুলোকে ঘাম ভেবে, গাড়ির জানালা নামিয়েছিল? ঘটনা বুঝতে পেরে হাসি-কান্নার মিশ্র অনুভূতিতে মূর্ছা গেল সেতু। সে সাথে আত্নগ্লানিতেও ভুগল, তার ভুল ধারণার জন্য।
বেশ সময় কাটাল দুই মানব-মানবী। জানল একে অপরকে। আরো জানল তারা দুজনেই এ কদিন বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছিল একে অপরকে। যে যাই করেছে, তার উল্টোটা বুঝেছে। সেতু জানল পূর্বের রেশ ধরে পুরুষটা তাকে অবজ্ঞা করছে না, বরং একটু একটু করে ভালোবাসার চাঁদরে মোড়াতে চাইছে। আর মিরাজ জানল, মেয়েটা খুব চাপা স্বভাবের, জাজমেন্টাল কিন্তু একটু ভালোবাসা-যত্ন পেলে তার সব দিয়ে অপরজনকে খুশি রাখার চেষ্টা করে।
মিরাজ মুখে বলতে পারে না, চুপেচাপে যত্ন নিতে জানে। উদাহরণ সরূপ, সেদিন ফ্রিজ ভর্তি আমিষ এনে রেখেছে। আগেও রেখেছিল তবে তখন সেতু বুঝেছে ওগুলো অতিথি অপ্যায়নের জন্য।
আবার সেতু, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে পাহাড়সম ভাবনায় থাকে। মিরাজ সবজি ছাড়া, আমিষ বেশি খেতে পারে না। সেও চেষ্টা করে সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ার। উদাহরণ সরূপ, একদিন মানুষটার রেখে যাওয়া আধখাওয়া খাবারগুলো খেয়েছে সে। ভাগাভাগি করে খেলে নাকি স্বামী-স্ত্রীর মহব্বত বাড়ে? তা ভেবে বড্ড তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছে। বাড়ুক না তাদের ভালোবাসাও।
পার্থক্যটা তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেই ছিল..!
পূর্বের দৃষ্টিভঙ্গি দিনকে দিন ভুল প্রমাণিত করে, সেতু চোখ মেলে দেখতে পাচ্ছে তার মনের মতো এক স্মার্ট পুরুষকে। আর মিরাজ দেখতে পাচ্ছে, সেতুর স্বচ্ছ ভালোবাসাময় দৃষ্টি। যাতে সেদিনের মতো আর ঘৃণা নেই। প্রত্যাখ্যানের ভয় নেই।
সে কি তবে পারল, তার পছন্দের রমণীর স্মার্ট পুরুষ হতে?
____________________সমাপ্ত_____________________
