#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব-৩
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
ঋতুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর হলো বসন্তকাল। কিন্তু মানুষ শীতকালকে কেন পছন্দের ঋতু বলে, কে জানে! বসন্তকালে হালকা ঠান্ডা ভাব থাকে, আবার হালকা গরমও লাগে সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ তৈরি হয়। চারদিক ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করে। তবুও মানুষ বলবে তাদের শীতকাল পছন্দ, অথচ শীতকালে তারাই থরথর করে কাঁপে আর বলে, শীত কবে যাবে।
শিউলি সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ হাতে নিয়ে বাড়ির পেছনে এসে সুপারি গাছে বাঁধা দড়ির দোলনায় বসে এইসব ভাবছিল।
তার থেকে একটু দূরেই একটি শিউলি গাছ। সেই ফুলের তীব্র গন্ধ তার নাকে এসে পৌঁছাচ্ছে। শিউলি যেদিন জন্মেছিল, সেদিন নাকি গাছটিতে প্রথম ফুল ফুটেছিল। সেই দেখে তার মা মেয়ের নাম রেখেছিলেন শিউলি।
দোলনায় বসা অবস্থায় শিউলি শিমুলদের বাড়ির দিকে নজর দিল। এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরেই শিমুলদের ঘর। মাঝখানে অনেকগুলো গাছ রয়েছে,বিভিন্ন রকম ফলের গাছ এবং মেহগনি গাছ বেশি। এরপরই একটা হাঁটাচলার রাস্তা, আর রাস্তার ওপারেই শিমুলদের ঘর। বসা জায়গা থেকেই শিমুলদের ঘরের জানালা দেখা যায়, তবে ভেতরের কিছু দেখা যায় না।
শিউলির মা জাবেদা বেগমের ডাকে শিউলি বাড়ির ভেতর ঢুকল। উঠোনের একদিকে বড় করে টিনের তৈরি রান্নাঘর, আর তার থেকে খানিকটা দূরেই গোয়াল ঘর।
জাবেদা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে রাগী কণ্ঠে বললেন,
“কয়টা বাজে দেখেছিস? কোচিং-এ যেতে হবে না!”
মায়ের কথায় শিউলির মনে পড়ল যে তার কোচিং আছে। ঘরে দৌড়ে গিয়ে দেখল সাতটা ত্রিশ বেজে গেছে। কোচিং শুরু হবে ঠিক আটটার সময়। বাড়ি থেকে কোচিং পর্যন্ত যেতে প্রায় বিশ-পঁচিশ মিনিট লেগে যায়।
শিউলি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। ভাত খেতে তার মন চাইছিল না, কিন্তু জাবেদা বেগম জোর করে কয়েক লোকমা মুখে দিয়ে তাকে খাইয়ে দিলেন।
★★★
বৃষ্টি কলেজের ক্লাসরুমে ঢুকেই দেখল পুরো ঘরটা খালি। শুধু মাত্র পেছনের একটা টেবিলের উপর মাথা রেখে বসে আছে শিউলি। কলেজে এখনো কোনো ছাত্র-ছাত্রী আসেনি। ক্লাস শুরু হয় সকাল সাড়ে দশটার দিকে, আর এখন বাজে মাত্র সাড়ে আটটা।
বৃষ্টি কৌতূহলবশত শিউলির কাছে গেল। শিউলিকে ডাকল, কিন্তু সে মাথা তুলল না। শুধু অস্পষ্টভাবে বলল, “হুঁ, বল।”
বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল,
“আজ কোচিং-এ আসিসনি কেন? আজ স্যার পরীক্ষার জন্য সাজেশন দিয়ে দিয়েছিলেন।”
তবুও শিউলি মাথা তুলল না। বৃষ্টি এবার বলল,
“কী হয়েছেটা কী তোর? মাথা তোল!”
শিউলি এবার মাথা তুলল। বৃষ্টি শিউলির মুখের দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল। সে জিজ্ঞেস করল,
“এসব কী, শিউলি? তুই কাঁদছিস?”
শিউলি নিজের মুখ দুই হাতের তালু দিয়ে মুছে নিল। “কই, না তো।”
বৃষ্টি এবার জোর দিয়ে বলল,
“কী হয়েছে শিউলি? তুই তো কোচিং বন্ধ দেওয়ার মেয়ে নোস। আর আজ এত তাড়াতাড়ি চলে এলি কলেজে?”
শিউলি প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও, বৃষ্টি তাকে জোর করতে লাগল।
‘শিউলি রাস্তা দিয়ে আসছিল। সকালের সময় হওয়ায় রাস্তায় তেমন মানুষের আনাগোনা নেই। হঠাৎ শিউলি পেছনে কারো পদশব্দ শুনতে পেল। শিউলি পেছনে ফিরল। দেখল তার ঠিক পেছনে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হেঁটে আসছে তামিম ইকবাল।
শিউলি কিছুটা ঘাবড়ে গেল। তামিমের ঠোঁটে একটি সিগারেট, আর মুখে বিশ্রী হাসি। শিউলি দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। এবার তামিম একদম শিউলির পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
এতটুকু পর্যন্ত শিউলি সহ্য করেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই তামিম নিজের সীমা পেরিয়ে শিউলির হাত চেপে ধরল।
শিউলি এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সজোরে তামিমের গালে চড় মেরে বসল। শিউলির রাগে শরীর কাঁপছিল।
“প্রতিদিন বিরক্ত করিস, সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু শরীরে স্পর্শ করলে ছেড়ে দেব না!”
তামিমের চোখ দুটো থেকে যেন আগুন বের হচ্ছিল। তামিম মুখ দিয়ে বিশ্রী গালি দিয়ে একটি ছোট চাকু বের করে শিউলির গলায় ধরল। শিউলি ভয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
তামিম দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই আমার গালে হাত দিয়েছিস! আমার গালে? তুই তামিম ইকবালের গালে হাত দিয়ে খুব বড় ভুল করেছিস, খুব বড়!”
ছেলেটা এই বলে আবারও ছুরি নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। শিউলি হাফ ছেড়ে বাঁচল। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল।
তামিম শিউলির একদম কাছে এসে দাঁড়াল। শিউলি ভয়ে দু’কদম পিছিয়ে গেল। হঠাৎ তামিম অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তারপর নিজের হাসি থামিয়ে আবারও চোখ-মুখ রাগে লাল করে বলল,
“কী ভেবেছো, সুইটহার্ট? তোমাকে মেরে দেব? না, না! তোমাকে এভাবে মারলে তো হবে না। তোমাকে তিলে তিলে মারব। হাজার হোক, ভালোবাসি তো নাকি!”
কথাটা বলেই সে আবারও অট্টহাসিতে মেতে উঠল। শিউলির কাছে মনে হলো, এই লোকটা হয়তো একটা মানসিক রোগী। শিউলি একপ্রকার দৌড়েই সেখান থেকে চলে এলো। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
ঘটনাটা বলেই শিউলি কেঁদে উঠল। বৃষ্টি বেশ অবাক হলো, কারণ জীবনে যত ঝড়ই আসুক না কেন, শিউলি এভাবে ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। প্রাইমারি স্কুল থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করছে বিধায় শিউলির ব্যাপারে সব জানে বৃষ্টি। বৃষ্টি কৌতূহল চেপে না রেখে বলল,
“তুই এই সামান্য ঘটনার জন্য ভয়ে কাঁদছিস?”
“না…”
বৃষ্টি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “তাহলে কেন?”
“সেই দৃশ্যটা আরেকজন মানুষ দেখছিল। সে হলো শিমুল ভাই। কিন্তু শিমুল ভাই আমাকে এই অবস্থায় দেখেও চলে গেল, কিছুই বলল না। লোকটা হাসতে হাসতে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলল ‘শিউলি, তুইও প্রেম করিস!’-”
এই কথা বলেই শিউলি আবারও কেঁদে উঠল।
বৃষ্টি এবার রাগী কণ্ঠে বলল,
“চলে যাবে না তো কী করবে তোর শিমুল ভাই? তুই কি শিমুলকে সিনেমার হিরো মনে করিস? যে তোকে ভিলেনের থেকে বাঁচাবে? তোকে আগেই বলেছিলাম, এমন একটা ছেলের প্রতি নিজের আবেগ দিস না যে ছেলেটা একটা বোকার হদ্দ। যে ছেলে ভালো-মন্দ কিছু বোঝে না।”
শিউলিও তো জানে যে তার শিমুল ভাই এসব কিছু বোঝে না। তবুও মেয়েটা চরম অভিমান করেছে। শিউলি বলল,
“তখন শিমুল ভাইকে দেখে আমি ভেবেছিলাম হয়তো সে এসে তামিমের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করবে, কিন্তু…”
পরের কথাগুলো কান্নার জন্য আর বোঝা গেল না। বৃষ্টি এবার রেগে টেবিল থেকে উঠে গেল। সে বলল,
“তুই থাক তোর শিমুল ভাইকে নিয়ে। শিমুলের জন্য কেঁদে নিজেকে উজাড় করে দে। আমি যাই, আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করি। আর হ্যাঁ, আমার বয়ফ্রেন্ড তোর শিমুল ভাইয়ের মতো হাঁদারাম না। সে ভালোবাসা বোঝে।”
শেষের কথাগুলো বৃষ্টি ইচ্ছে করেই শিউলিকে খোঁচা দেওয়ার জন্য বলল।
শিউলি নিজের চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
বাইরে বের হতেই দেখল, বারান্দার এক কোণায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি আর তার বয়ফ্রেন্ড শফিক কথা বলছে।
শফিককে কোনো কালেই পছন্দ নয় শিউলির। শফিকের চেহারা সুন্দর, কিন্তু তার চরিত্র যে এতটা ভালো নয়, তা শিউলি জানে। বৃষ্টির সাথে সম্পর্কে জড়ানোর আগেও সে শিউলিকে প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু শিউলি তা গ্রহণ করেনি। এমনকি বৃষ্টির সাথে প্রেম চলাকালীনও সে আবারও শিউলিকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু শিউলি সেই কথা বৃষ্টিকে বলেনি, বললে হয়তো বৃষ্টি তাকে ভুল ভাববে।
এইসব মনে মনে ভাবতে ভাবতে শিউলি পথ চলতে শুরু করল।
“রূপ-গুণ দেখেই কি শুধু ভালোবাসা হয়?” নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল শিউলি। “তাহলে আমি কেন শিমুল ভাইকে ভালোবাসলাম? কোনো গুণ তো শিমুল ভাইয়ের মাঝে নেই।”
এরপর নিজেই তার উত্তর দিল,
“না, ভালোবাসা কখনো রূপ দেখে হয় না। ভালোবাসা হয় অন্তর দিয়ে। এটাই শিমুলের জন্য কাজ করে।”
শিমুল একটা আম গাছের তলায় বসে আছে। এখানে বাঁশের তৈরি একটা বসার জায়গা রয়েছে, সেখানেই সে বসে ছিল। তখন তার নজর গেল শিউলির দিকে। শিউলি তাকে অতিক্রম করে সোজা চলে গেল।
শিমুল ঠোঁট উল্টিয়ে তাকিয়ে রইল। তার অবুঝ হৃদয়ে প্রশ্ন উঁকি দিল শিউলি চলে গেল কেন? শিউলি তাকে দেখে তো কথা না বলে যেত না, তাহলে আজ কী হলো?
শিমুল উঠে দাঁড়াল। লুঙ্গির নিচের অংশটা এক হাতে ধরে দৌড়ে গেল। কিন্তু তবুও শিউলি দাঁড়াল না। শিমুল প্রশ্ন করল,
“শিউলি, আমারে তুই দেখছ নাই?”
শিউলি কথা বলল না। শিমুল আবারও প্রশ্ন করল,
“তুই আমার লগে কথা বলবি না? রাগ করছোস?”
শিউলি অবাক হয়ে আড়চোখে তাকাল শিমুলের দিকে। ছেলেটার মধ্যে এই প্রথম হালকা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল। শিউলি রাগী কণ্ঠে বলল,
“তুমি আমার সাথে আর কখনো কথা বলবে না। আমিও তোমার সাথে আর কথা বলব না।”
শিমুল কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কেন? আমি কী করছি? আমি ভুল করছি কোনো? তোর লগে কথা না বললে যে আমার দুক্ক লাগে।”
এবার শিমুলের মধ্যে সর্বোচ্চ অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেল। শিউলির মনে আশার আলো জাগল তার মানে কি শিমুল ভাইও তাকে নিয়ে ভাবে? তার উপস্থিতি কামনা করে?
এই ভেবেই শিউলির মনে হাসি ফুটল। জীবনে অনেক কিছু আছে, যেগুলো আমরা মনে মনে কল্পনা করেই সুখী থাকি। শিউলির ক্ষেত্রেও তাই হলো।
শিউলি এবার অভিমানের সুরে বলল,
“সকালে তুমি দেখলে তামিম নামের ছেলেটা আমার রাস্তা আটকে আমাকে বিরক্ত করছে, তুমি তবুও কিছু কেন বললে না শিমুল ভাই?”
শিমুল নিজের মাথায় চুলকিয়ে কিছু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“কই! আমি তো বুঝি নাই তোরে ওই ছেলে বিরক্ত করতাছে?”
এতটুকু সময়ে যতটুকু আশা জেগেছিল শিউলির মনে তা ততক্ষণাত নিবে গেল।কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল তার প্রিয় শিমুল ভাইয়ের দিকে।শিউলি এবার কাঁপা কন্ঠে বলল,
“হ্যা তোমাকে বুঝতে হবে না।আর আমিই বা কি করে আশা করি তুমি বুঝবে!?যে লোকটা সাতটা বছরে কিছু বুঝতে পারলো না,সে আজ সব বুঝে যাবে সেটা আশা করাও বোকামো।”
শিউলি দ্রুত হাঁটা শুরু করল।শিমুল একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।শুধু তাকিয়ে রইল শিউলির যাওয়ার দিকে।এবারও হয়তো কিছু বোঝতে পারল না।
#চলবে…
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৪
লেখনীতে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি থরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। স্বপ্ন দেখেই তার ঘুম ভেঙে গেছে। সে বিছানায় বসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। রুমের সব আলো বন্ধ।
হাত দিয়ে খুঁজে সে বাটন মোবাইলটি বের করল। মোবাইলটি তার মায়ের, মাঝে মাঝে রাতে কাছে নিয়ে ঘুমায়।শিউলি স্বপ্ন দেখেছে সে শিমুল ভাইয়ের বউ হয়ে তাদের ঘরে ঢুকছে। স্বপ্নটা মনে পড়তেই শিউলির মুখে হাসি ফুটে উঠল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত তিনটা বেজে চল্লিশ মিনিট। ফজরের আজান দিতে আরও অনেকক্ষণ বাকি।
তার ভীষণ মন চাইছে শিমুল ভাইকে এক নজর দেখে আসতে। আবার মনে মনে ভাবছে, এখন যাওয়া ঠিক হবে কি না। তবে সে তার মনের কথাকেই প্রশ্রয় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওড়নাটা মাথায় সুন্দর করে জড়িয়ে নিল। তারপর টেবিলের ওপর থেকে হারিকেনে আগুন ধরাল। এই হারিকেনটি অনেক পুরোনো যুগের, জং ধরা। মাঝে মাঝে এটি ব্যবহার করা হয়।
শিউলি খুবই শান্ত পায়ে ঘর থেকে বের হতে লাগল। পাশের রুমেই তার আব্বা-আম্মা থাকেন। ফুলঝুরি মাঝে মাঝে তার আব্বা-আম্মার সাথে, আবার মাঝে মাঝে শিউলির সাথে ঘুমায়। কিন্তু আজ সে তার আব্বা-আম্মার সাথেই ঘুমিয়েছে।
শিউলি বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে তখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। অন্য সময় হলে শিউলি হয়তো ভয় পেত, তবে এখন তার মনে কোনো ভয় কাজ করছে না। শিমুল ভাইকে এক ঝলক দেখার ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছে মেয়েটার। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা কোনো ভয়কে কাবু করতে পারবে না।
সাবধানতার সাথে শিউলি পৌঁছে গেল শিমুলদের বাড়িতে। এখান থেকে শিমুলদের বাড়ি যেতে তার মাত্র দুই মিনিট সময় লাগে।
টিনের তৈরি ঘরটায় কাঠের তৈরি জানালা। শিউলি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। টুক টুক করে শব্দ করল সেখানে। কিন্তু শিমুল ভাইয়ের কোনো সাড়া শব্দ নেই। শিউলি এবার মৃদু স্বরে ডাকল,
“শিমুল ভাই, ও শিমুল ভাই!”
সাথে সাথেই জানালা খোলার আওয়াজ হলো। জানালা দিয়ে শিমুল ভাই উঁকি দিলেন। শিউলির হাতে ধরা হারিকেনের আলোয় শিমুল ভাইয়ের হালকা কুচকুচে দাঁড়িওয়ালা মুখটি দেখা গেল। একবার ডাকতেই শিমুল ভাই জানালা খুললেন, তার মানে হয়তো শিমুল জাগ্রতই ছিলেন।
শিমুল অবাক কণ্ঠে বলল,
“শিউলি! তুই এইহানে কী করস?”
“তুমি আগে বাইরে আসো, তারপর বলছি।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিমুল বাইরে বেরিয়ে এলো। শিমুল এসেই জিজ্ঞেস করল,
“এত রাতে কী করস এইহানে? আমারে ডাকস ক্যান?”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের হাত ধরে কিছুটা দূরে পুকুরের সামনে রাখা একটা বড় গাছের গুঁড়ির ওপরে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ এভাবেই বসে রইল। ঠাণ্ডা হাওয়া এসে তাদের শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে।পাশে রাখা হারিকেন।
শিমুল শিউলির দিকে তাকাল। ওড়নার আড়াল থেকে তার চুলগুলো বাতাসে এসে কপালে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ শিমুল শিউলির দিকে তাকিয়ে থেকেই বোকার মতো হেসে দিল। শিমুলের হাসি টের পেয়ে শিউলিও শিমুলের দিকে তাকাল। লোকটাকে হাসতে দেখে ভীষণ সুন্দর লাগে। শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“শিমুল ভাই, হাসছো কেন?”
শিমুল বলল,
“তোরে ভীষণ সুন্দর লাগতাছে। ওই যে দেখ, আকাশের চাঁদটার চাইতেও তোরে সুন্দর দেহা যায়।”
শিউলি শিমুলের আঙুল অনুসরণ করে চাঁদের দিকে তাকাল। এই প্রথম শিমুল ভাই নিজ থেকে তার প্রশংসা করলেন। শিউলির হাসি-খুশি মনটা আরও আনন্দপূর্ণ হয়ে উঠল। এর চাইতে সুখ যে আর কিছু নেই।
শিউলি এবার আবদার করে বসল,
“শিমুল ভাই, একটা গান শোনাবে?”
“এই রাইতে! না না, আরেকদিন,” শিমুল না করে দিল।
শিউলি বলল, “আচ্ছা, তাহলে আমি শোনাই। শুনবা?”
শিমুল বলল,
“হ, ক্যান শুনতাম না?”
শিউলি নিজের গলা খাঁকারি দিয়ে গান ধরল শিমুলের দিকে তাকিয়ে,
“ইসস,খোঁপা কইরা চুল,কানে পইরা ফুল
সাজবো আমি বউ গো,সাজবো আমি বউ
গোমটা দিয়া লাল শাড়িতে
এক বিছানায় এক বাড়িতে
থাকবো হইয়া বউ গো থাকবো হইয়া বউ..
শিউলির কথা শুনে শিমুল হু হু করে হেসে উঠল। শিউলি মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কী হলো? এভাবে হাসছো কেন? আমার গানটা কি ভালো লাগেনি?”
শিমুল হাসতে হাসতে বলল,
“তোর গানের গলা ভালা, কিন্তু তুই তো দেহি বিয়ার লাইগা পাগল হইয়া গেছস!”
শিউলি শিমুলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
‘হ্যাঁ, আমি তো পাগলই তোমাকে বিয়ে করার জন্য। তোমার বউ হওয়ার জন্য।’
শিমুল আবারও বলল,
“কাকু রে কমু তোরে বিয়া দিয়া দিতে। তোর কপালে সুন্দর একটা জামাই জুটব।”
“তোমার মতো স্বামী চাই, শিমুল ভাই। কোথায় পাব তোমার মতো একজন পুরুষকে?”
শিউলি গভীর দৃষ্টিতে শিমুলের দিকে তাকিয়ে বলল।
শিমুল বলল,
“আমার মতো পোলা ক্যান চাস? আমি তো সবার চোখেই বোকা।”
শিউলি পুকুরের শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে নিজের মনের কথা প্রকাশ করল,
“ভালোবাসা কি ওসব দেখে হয়, শিমুল ভাই? ভালোবাসি যে তোমাকে। তোমাকে যে আমার জীবন সঙ্গী হিসেবে পেতে চাই, তুমি বোঝো না?”
শিমুলের কোনো উত্তর বা সাড়াশব্দ না পেয়ে শিউলি তার পাশে তাকাল। দেখল, সেখানে শিমুল ভাই নেই। সে একটু দূরে নজর দিতে দেখল শিমুল ভাই কিছু ঝিঁ ঝিঁ পোকা ধরাতে ব্যস্ত। শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে এতক্ষণ একা একা নিজের মনের কথা বলছিল, কিন্তু শিমুল সেটা না শুনে পোকা ধরাতেই ব্যস্ত!
শিউলির মনে আবারও অভিমান জমল। ছলছল নয়নে তাকিয়ে রইল সেই প্রাপ্তবয়স্ক বাইশ বছর বয়সী পুরুষটার দিকে। শারীরিক গঠন দেখে কি কেউ বলবে ছেলেটা বোকা?
পরক্ষণেই মনে হলো, তার অভিমান ভাঙানোর জন্য শিমুল ভাই আসবে না। হয়তো লোকটা বুঝবেই না যে সামনে থাকা মেয়েটা অভিমান করেছে। শিউলি নিজের চোখে হাত রেখে জল মুছে চোখ পরিষ্কার করে নিল। মৃদু হাসল। তারপর উঠে দাঁড়াল।
শিমুল ভাইয়ের ঠিক পেছনেই সে গিয়ে দাঁড়াল। শিমুল ভাই এক মুঠো হলুদ আলো জ্বলতে থাকা ঝিঁ ঝিঁ পোকা শিউলির সামনে ধরলেন। শিউলির সামনে ধরতেই ঝিঁ ঝিঁ পোকাগুলো উড়ে চলে গেল।
শিউলির মুখে আবারও হাসি ফুটল।সে নিজের মনকে বোঝাল,
’যতকিছুই হয়ে যাক না কেন, শিমুল ভাই আমার কথা বুঝুক আর নাই বুঝুক তবুও এরকম সময় সবসময় চাই আমি। যতদিন এই দেহে প্রাণ আছে, ততদিন।’
শিউলি এবার আবারও বলল,
“আচ্ছা শিমুল ভাই আমারে কি তোমার পছন্দ না?যদি বলি আমি তোমাকে বিয়া করতে চাই তাহলে কি আমারে বিয়া করবা?”
শিমুল শিউলির দিকে তাকাল, এবার তার হাসিটা একটু বেশি বোকাটে ঠেকল। সে সরলভাবে বলল,
“তুই কী কস রে শিউলি? তুই তো ভালা মাইয়া। আর আমি তো হইলাম বোকাসোকা একটা পোলা। আমার লগে বিয়া অইলে তোর জীবনডা তো নষ্ট হইয়া যাইব। তুই এমন কথা কস ক্যান?”
শিউলি ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল।
শিমুল এবার সরে দাঁড়াল, পুকুরের ঠাণ্ডা পানির দিকে ইশারা কইরা কইল,
“শোন, আমারে খালি ভালা বন্ধু হিসাবে দেখ। ওই যে দেখ, শাপলা ফুলগুলা খালি রাইত হইলেই ফোটে, দিনের বেলা চুপ কইরা থাহে। তোর প্রেমটাও ওরকম ক্ষণিকের না হোক। তোর লাইগা ভালো কিছু হইব, দেইখা নিস।”
তারপর শিমুল শিউলির দিকে ফিরল। তার চোখে কোনো চালাকি নাই, খালি সরলতা। সে বলল,
“আর এই রাইতে তোর আমার লগে থাকা ঠিক না। সবাই জানলে অনেক খারাপ কথা কইব। তুই যা, ঘুমাইতে যা। আমারে আর ডাকিস না।”
শিউলি নিজের চোখের জল লুকার ব্যার্থ চেষ্টা করল না। কাঁপা কন্ঠে বলল,
“বাহ্ রে শিমুল ভাই!সবই তো বুঝো,মানুষ খারাপ কথা কইব এটা বুঝো।কিন্তু বুঝো না শুধু আমারে।ক্যান বুঝো না আমারে?আমি কি তোমার যোগ্য না?তোমারে ভালোবাসা বুঝতে হইবো না,আমি তোমারে ভালোবেসে যাব।তুমি শুধু সারাজীবন আমার সাথে থাকবা তাইলেই হইবো।”
শিমুল আবারও একই সুরে বলল,
“চইলা যা শিউলি।তোর লগে আমারে দেখলে তোর বাপে আমারে মারব।”
শিউলির বুক ফেটে কান্না আসতে চাইল কিন্তু কাঁদল না।দৌড়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিল।
ঘরে ঢুকতেই চাইলেই দেখল সামনে তার আব্বা দাঁড়াইয়া আছে।পরনে লুঙ্গি আর হাফহাতা গেঞ্জি পরনে।হয়তো নামাজ পড়তেই উঠেছে।
সামনে তার আব্বারে দেখে মেয়েটার বুক কেঁপে উঠল।উনি কি দেখে নিয়েছে শিমুল ভাইয়ের সাথে? প্রশ্নটা মনে উঁকি দিতেই শিউলির ভয় হতে শুরু করল।এসব জানলে তার উপর তো তান্ডব যাবেই সেই দিকে শিমুলেরও রক্ষে থাকবে না।
ইদ্রিস খন্দকার মেয়েকে ভালো করে পরখ করে বলল,
“কই গেছিলি?”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“আসলে আব্বা টয়লেটে গেছিলাম।”
তাদের টয়লেট ঘরের বাহিরে উঠানের এক পাশে।
“প্রত্যেকদিন তোর মা’রে নিয়া যাস আ্যইজ একলা ক্যান গেলি?”
“আম্মা ঘুমাইতাছিল তাই।আর এখন তো সকাল হয়ে যাইতাছে।”
ইদ্রিস খন্দকার মেয়ের কথা বিস্বাসযোগ্য মনে হলো।তাই আর কোনো প্রশ্ন করেনি।শিউলি নিজের রুমে ঢুকে গেল।
এখন আর ঘুম হবে না।সূর্য উঠার সূচনা মেয়েটার কান্না দিয়েই হবে।
#চলবে…
