#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৫
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
সকাল গড়িয়ে বিকেল হলো, কিন্তু শিমুল ভাইয়ের কোনো দেখা মিলল না। শিউলি না হয় অভিমান করেছে, তাই বলে কি শিমুলের কোনো হদিসই থাকবে না? শিউলি অনেকক্ষণ ধরে বাড়ির পেছনের দোলনায় বসে বসে শিমুলদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু শিমুলকে একবারও বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গেল না।
শিউলির ভেতরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন কোনো দিন যায়নি, যেদিন শিমুলের সাথে কথা না বলে রয়েছে। এই কারণেই শিউলি কোথাও বেড়াতে গেলেও দিনে যায়, আবার দিনেই ফিরে আসে। কারণ, একদিনও সেই শিমুল ভাইয়ের মায়ায় ভরা চেহারা না দেখলে শিউলির ভেতরে কষ্ট শুরু হয়। কিন্তু আজ লোকটা কোথায়?
’না, আমাকে আর অভিমান করে থাকলে চলবে না। আমি নিজেই গিয়ে দেখা করব,’মনে মনে বলেই শিউলি শিমুলদের বাড়ির দিকে গেল। উঠানে গিয়ে ডাকল,
“শিমুল ভাই? কই তুমি?”
আছিয়া খাতুন শিউলির ডাক শুনে বেরিয়ে এলেন। আছিয়া খাতুনকে দেখে শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“চাচি, শিমুল ভাই কই?”
আছিয়া বেগম বললেন,
“সকালবেলা বের হইছে, এখনো ফেরে নাই। বল তো, ছেলেটা কই গেল! আমাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারছে পোলাডা।”
শিউলির মনে অদ্ভুত ভয় কাজ করল। ‘কোথায় গেল লোকটা! কোনো বিপদ হয়নি তো!’ শিউলি বলল,
“আচ্ছা চাচি, চিন্তা করো না। হয়তো বাচ্চাদের সাথে খেলছে, আমি খুঁজে আনছি।” শিউলি নিজের মনের ভয় প্রকাশ করল না।
শিউলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল, কিন্তু কোথাও পেল না। শিউলি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। শিমুল ভাই তো কখনো দূরে কোথাও যায় না। আর শিমুল ভাই এতটা বোকাও না যে সে হারিয়ে যাবে। তাহলে গেল কোথায়?
ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ছোট বল্টু নামের বাচ্চাটা দৌড়ে এসে বলল,
“শিউলি আপা, শিমুল ওই রাস্তার ধারে পইড়া আছে।”
শিউলি ভয়ে আরও কাবু হলো, “পইড়া আছে মানে? কী হইছে?”
“শরীরে অনেক রক্ত। চলো, তোমারে নিয়া যাই।”
শিউলি দৌড়ে গেল সেই নির্জন রাস্তার দিকে। সেই দিক দিয়ে মানুষের আনাগোনা কম। শুধুমাত্র এই চারপাশের কয়েকজন মানুষ ছাড়া কেউ যায় না। শিউলির কাছে মনে হচ্ছে রাস্তাটা যেন ফুরাচ্ছে না। শিউলি গিয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়াল। চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল। হঠাৎ চোখ গেল রাস্তার একদম পাশে, যেখানে শিমুল ভাই মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেন।
শিউলি দৌড়ে গিয়ে শিমুলকে ধরল। মেয়েটা কেঁদে ফেলল তার শিমুল ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে।
শরীরে মারের দাগ স্পষ্ট। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। বাচ্চাটা যেভাবে বলেছিল, ঠিক ততটাও রক্ত বেরোচ্ছে না, তবে শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন হয়ে আছে। শিউলি ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
“কী হয়েছে তোমার? কে মারছে তোমারে এমন কইরা?”
শিমুল শিউলির ক্রন্দনরত মুখটার দিকে তাকাল। মেয়েটার নাকের ডগা লাল হয়ে আছে।কান্নার কারণেই চোখগুলো লাল হয়েছে। শুধু নাক-চোখ নয়, ফর্সা চামড়ার কারণে তার পুরো মুখটাই লাল দেখাচ্ছে। শিমুল হাসার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু অয় নাই। তুই কান্দস ক্যান? কাঁদিস না। দেখ, আমার কিছুই অয় নাই।”
শিউলি শিমুল ভাইকে ধরে দাঁড় করাল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু শিমুল যেতে চাইল না। ছেলেটা ডাক্তারকেও ভয় পায়। এই বাইশ বছরের সুপুরুষটি সবকিছুতেই ভয় পায়, এমনকি কিছু মানুষকে দেখেও ভয় পায়। তার কারণ হয়তো মানুষের অমানুষিক ব্যবহারের ফল।
শিমুল শিউলির কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পায়েও হয়তো ভীষণ আঘাত করেছে কেউ। যারা শিমুলের এই অবস্থা করেছে, তাদের ছাড়বে না শিউলি মনে মনে সে শপথ করল।
হঠাৎ সামনে শিউলির বাবা ইদ্রিস খন্দকারের দেখা। তিনি হয়তো বাজারে যাচ্ছিলেন। শিউলির সাথে শিমুলকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। আগুন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন সেই দিকে।
শিউলি নিজের বাবাকে দেখে দৃষ্টি নত করল। ওনার চাহনি দেখেই মনে হচ্ছে, এখনি বুঝি শিউলির গায়ে হাত তুলবেন। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে এলাকার মেম্বার হয়ে মেয়ের গায়ে হাত তোলা লজ্জার বিষয়।
তিনি কয়েকজন লোককে ডেকে শিমুলকে বাড়ি পর্যন্ত দিয়ে আসতে বললেন। তিনি শিউলিকে বললেন,
“সোজা বাড়ি যাও।”
কিন্তু শিউলি ওনার কথা মানল না। সে তার শিমুল ভাইদের সঙ্গেই তাদের বাড়ি গেল। এতে যেন ইদ্রিস খন্দকার আরও ক্রুদ্ধ হলেন।
শিমুল ভাইকে বিছানায় শোয়ানো হলো। ছেলেটার মুখ ফুলে গেছে। হয়তো কেউ নিজের সর্বশক্তি ব্যবহার করে তার গালে পরপর থাপ্পড় দিয়েছে। বার বার শিউলির কান্না আসছে।
আছিয়া বেগম গরম পানি করার জন্য রান্নাঘরে গেলেন। এখন রুমে উপস্থিত শুধু শিউলি এবং শিমুল ভাই।
শিমুল ভাই চোখ বন্ধ করে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। শিউলি জিজ্ঞেস করল কাঁপা কণ্ঠে,
“শিমুল ভাই, কে মেরেছে তোমারে? জামিল চাচা আজ আবার মেরেছে তোমারে?” শিউলির কণ্ঠে রাগ স্পষ্ট ছিল।
শিমুল ধীরে ধীরে চোখ খুলল। শুধু মাথা নাড়াল, মানে ‘না’।
“তাহলে কে মেরেছে তোমারে?”
শিউলি যখন এই প্রশ্ন করল, তখন শিমুলের মনে কিছুক্ষণ আগের ঘটনাগুলো ভেসে উঠল,
তখন শিমুল নিজেদের ক্ষেত থেকে ফিরছিল। তখনই হঠাৎ দেখল, রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে তামিম ইকবাল তার বন্ধুদের সাথে সিগারেট খাচ্ছে। তখন তার মনে পড়ল শিউলির সেই দিনের কথা, যেদিন শিউলি বলেছিল তামিম নামের ছেলেটা তাকে বিরক্ত করেছে।
শিমুল এগিয়ে গেল সেই হাফ প্যান্ট, টিশার্ট পরা ছেলেটার দিকে। তামিম গাড়ি থেকে উঠল না। বলল,
“কী রে চান্দু, এভাবে কী দেখিস? সিগারেট খাবি?”
শিমুল সোজাভাবে বলল,
“তুমি সেদিন শিউলিকে রাস্তায় বিরক্ত করছো ক্যান?”
তামিম নিজের সিগারেটটা মাটিতে পিষে দিল। সে বলল,
“তাতে তোর কী? প্রয়োজনে বাড়ি গিয়ে বিরক্ত করব।”
শিমুল রাগী কণ্ঠে আঙুল উঁচু করে বলল,
“তুমি একদম শিউলিকে বিরক্ত করবা না। তাহলে…”
“হুঁ, তাহলে… তাহলে কী করবি বল!” বলতে বলতে তামিম শিমুলের বুকে ধাক্কা দিল।
শিমুল বলল, “তাইলে তোমারে খুন কইরা দিমু। যদি শিউলি কষ্ট পায়।”
শিমুলের কথা শুনে তামিম সহ তার সাথে থাকা সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
“এই, তোরা শুনছিস? এই বলদের বাচ্চা কী বলে? ও নাকি খুন করে ফেলবে! শালা। এই শালারে ধর সবাই!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সবকটা ছেলে শিমুলকে ধরে মাটিতে ফেলে মারতে শুরু করল।
শিউলির ভীষণ রাগ হলো ওই তামিমের ওপর। এতদিন তাকে বিরক্ত করে গেছে, কিন্তু আজ তার প্রিয় মানুষটাকে এভাবে মেরেছে!
শিমুল বলল, “শিউলি, বাড়িত চইলা যা। দেখ, সন্ধ্যে হইয়া গেছে।”
শিউলি বাইরে তাকিয়ে দেখল সত্যিই সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শিউলি শিমুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল। এতক্ষণ মাথায় ছিল না তার আব্বার কথা। কিন্তু এখন বাড়িতে গেলে কী হবে, কে জানে। তবে এই সময় তার বাবা বাড়িতে থাকেন না। তাই ভয়টা কিছুটা কম লাগল। ‘আব্বা বাড়িতে আসার আগেই ঘুমিয়ে যাব, তাহলে আর কিছু বলতে পারবে না’ এই ভেবে শিউলি কিছুটা নিশ্চিন্ত হলো।
বাড়িতে পা দিল। দেখল, উঠোনে কেউ নেই।
শিউলি ছোট সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠল। হঠাৎ এক শক্ত হাতের থাপ্পড় এসে পড়ল তার গালে। এমন আকস্মিক আক্রমণে শিউলি তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
শিউলি নিজের গালে হাত রেখে জন্মদাতা পিতার দিকে তাকাল। এই লোকটা এমনই কিছু এদিক থেকে সেদিক হলেই শিউলির গায়ে হাত তুলবে। এমনকি, শিউলির মাকেও ছাড় দেন না।
আজ শিউলির ভীষণ রাগ হলো তার বাবার আচরণে। এমন কিছু তো সে করেনি যে তার গালে হাত তুলতে হবে। শিউলিও উঠে দাঁড়াল। সে বলল,
“আব্বা, এভাবে চড় মারার কী হলো? আমি তো শুধু শিমুল ভাইকে ধরে বাড়িতেই নিয়ে যাচ্ছিলাম।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই ইদ্রিস খন্দকারের চোখে-মুখে রাগ উপচে পড়ল। পাশেই একটা চিকন বাঁশের কঞ্চি ছিল। সেটা হাতে তুলেই শিউলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পশুর মতো মারতে লাগলেন।
শিউলি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এই বেতের আঘাত যে ভীষণ শক্ত। যেখানে বাড়ি পড়ছে, সেখানের মাংসই লাল বর্ণ ধারণ করছে। আর ইদ্রিস খন্দকার মারছেন আর রাগে চিৎকার করে বলছেন, “এত বড় সাহস! আমার সাথে তর্ক করিস? আমার থেকে জবান চালাস?”
ছোট্ট দেহের মেয়েটা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।শিউলির মা জাবেদা বেগম রুমে ছিলেন। তিনি দৌড়ে আসলেন। এসেই স্বামীর এরকম ভয়ানক রূপ দেখে তিনি থমকে গেলেন। তিনি মেয়েকে আগলে ধরলেন। যার প্রভাবে তার গায়েও বেশ কয়েকটি কঞ্চির আঘাত পড়ল।
ছোট্ট ফুলঝুরি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। বাবার সামনে আসার সাহস ছোট্ট মেয়েটার নেই।
শিউলির শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। শরীরে সব জায়গায় মারের আঘাত। ইদ্রিস খন্দকার কঞ্চি দিয়ে মারা তখনই থামালেন, যখন সেটা ভেঙে গেল। তিনি রাগে চিৎকার করে বললেন,
“ওই শিমুলের লগে তোরে যদি আবারও দেহি, তাইলে ওইদিনই হইব তোর শেষ দিন।”
আজ জাবেদা বেগম প্রতিবাদ করলেন,
“একটা সামান্য ব্যাপারে মাইয়াডারে এভাবে মারবেন আপনি? আপনার শরীরে কি দয়া-মায়া কিছু নাই?”
ইদ্রিস খন্দকার একটা নোংরা গালি দিয়ে বললেন,
“তোর মতো তোর মাইয়্যাডারে বানাইছোস? তোর মাইয়্যা গতকাল রাইতের বেলায় ওই শিমুলের লগে পুষ্টিনাস্টি করতে গেছিল, বুঝলি! তোর মাইয়্যারে সাবধান কইরা দে। মানুষে বদনাম করার আগে তোর মাইয়্যারে আমি জবাই কইরা গাঙ্গে ভাসাই দিমু।”
শিউলি কান্নাভেজা চোখে তার বাবা নামক পশুটার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজের মেয়ের সম্পর্কে এমন খারাপ কথা পিতা হয়ে কীভাবে বলতে পারে? এরকম পিতাও কি পৃথিবীতে আছে? নেই বোধহয়।
শিউলির শরীর দুর্বলতায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল মেয়েটা।
#চলবে…
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৬
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
মধ্যরাতে ঘুম ভাঙল শিউলির। চোখ খুলে দেখল রুমে মিটমিট করে আলো জ্বলছে। চোখের পাতা দুটো জ্বালা করছিল ভীষণভাবে, তবুও সে কষ্ট করে চোখ কুঁচকে তাকাল। চারপাশের সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা মনে হচ্ছিল। সে নিজের হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ ঘষল। অনুভব করল, কপালে ভিজে থাকা এক টুকরো কাপড়ের স্নিগ্ধ স্পর্শ। তখনই তার মনে পড়ল, বাবার প্রহারে জ্ঞান হারানোর পর কখন যেন তার জ্ঞান ফিরেছিল, আর সেই মুহূর্ত থেকেই শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসতে শুরু করেছিল।
সে তার বাঁ দিকে তাকাল। সেখানে তার ছোট বোন ফুলঝুরি বাঁকা হয়ে শুয়ে আছে। ছোট্ট মেয়েটার সাথে শিউলির গলায় গলায় ভাব থাকলেও, তারা সারাক্ষণ ঝগড়া করে। ঘরের দুই বোনের সম্পর্ক যেমন হয় এই ঝগড়া, এই ভালোবাসা। ফুলঝুরি হয়তো অনেক কেঁদেছে। তার চোখের পাশে কান্নার ফলে শুকনো দাগ এখনো লেগে আছে।
ঠিক পাশেই, একটি চেয়ারে বসে আছেন জাবেদা বেগম। শিউলির কপালে জলপট্টি দিতে দিতে কখন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন, তা খেয়াল নেই। মায়ের ক্লান্ত মুখটা দেখে শিউলির বুকটা ব্যথায় ভরে উঠল। এত কষ্ট সত্ত্বেও মা তাকে আগলে রেখেছেন।
শিউলি বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। শরীরে ভীষণ ব্যথা অনুভব হচ্ছে। সন্ধ্যার সময়ের ভয়াবহ মারধরের কথা মনে পড়তেই তার শরীর কেঁপে উঠল।
তখনই একটি প্রশ্ন তার মনের মাঝে উঁকি দিল “কিন্তু আব্বা জানল কেমনে যে আমি শিমুল ভাইয়ের সাথে রাতে দেখা করেছিলাম?”
কিন্তু এর সঠিক ব্যাখ্যা শিউলি পেল না। তার আফসোস হচ্ছে তখন যদি আব্বার সাথে তর্ক না করত, তাহলে হয়তো এভাবে মার খেতে হতো না।
শিউলি খুব কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। নিজের শরীরে ওড়না নেই। আলনা থেকে একটা ওড়না নিল। তারপর টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি পান করল। জ্বর নেই, তবে সবকিছু বিস্বাদ মনে হচ্ছে। নিজের মায়ের দিকে তাকাল। ‘আমার জন্য আম্মাও মার খেল!’ ভীষণ অনুশোচনা হলো তার।
সে গ্রিল দেওয়া জানালাটা খুলল। বাইরে তখন গভীর অন্ধকার। শিমুলদের বাড়ি দেখা যাচ্ছে না, শুধু উঠোনে পঁচিশ পাওয়ারের একটা হলুদ বাতি জ্বলতে দেখা যাচ্ছে।
“শিমুল ভাইয়ের কী অবস্থা এখন? শরীরের ব্যথা কমেছে তো! নাকি লোকটা এখনো ব্যথায় কাতরাচ্ছে।”
শিমুল ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই শিউলি নিজের শরীরের আঘাতের কথা ভুলে গেল।
ইচ্ছে হচ্ছে একটাবার শিমুল ভাইকে দেখে আসতে।কিন্তু তার শরীরে হেঁটে যাবার শক্তি নেই।
শিউলি মনে মনে দোয়া করছে যেন এই রাতের মাঝেই সুস্থ হয়ে যায়।আর তামিমের সাথে মুখামুখি কথা বলতে পারে।তামিম ছেলেটা বখাটে তবে এতটা খারাপ তা জানা ছিল না।
শিউলি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা।জালানার গ্রিল ধরে মাথা ঠেকালে।
“তুমি কবে বুঝবে শিমুল ভাই?কবে তুমি আমাকে ভালোবাসবে?নাকি তোমার ভালোবাসা বিহীনই আমাকে থাকতে হবে?”
★★★
দুই দিন কেটে গেল। শিউলির জ্বর এখনো পুরোপুরি ভালো হয়নি। তবে শরীরের আঘাতগুলো অনেকটাই সেরে উঠেছে। এই দুই দিনে সে অনেক চেষ্টা করেছে কলেজে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পারেনি। এতটা অসুস্থ শিউলি মনে হয় এই প্রথম হয়েছিল, তাও কিনা নিজের পিতার জন্য।
তবে নিজের আঘাতগুলো যেমন মিলিয়ে যাচ্ছিল, তেমনি তার বাবার ওপর থেকে রাগও উঠে যাচ্ছিল। কারণ, কোন বাবা এটা মেনে নিবে যে মেয়ে রাতের বেলা একটা ছেলের সাথে দেখা করবে! হয়তো অন্য বাবারা মেয়েদের বুঝিয়ে বলেন, কিন্তু ইদ্রিস খন্দকার তো তেমন নন। তিনি গ্রামের মেম্বার, গ্রামে তাঁর একটা সম্মান আছে। তাই হয়তো নিজের রাগ সামলিয়ে উঠতে পারেননি। শিউলি নিজেকে নিজেই এই বলে বোঝ দিল।
এর মাঝে ফুলঝুরিকে দিয়ে খবর এনেছে শিমুল এখন অনেকটাই ভালো আছে।
শিউলি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তার আব্বা উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েকে কলেজে যেতে দেখে তিনি বললেন,
“সাবধানে যাস। আর নে, ট্যাকাটা প্রয়োজন লাগবার পারে।”
তিনি পঞ্চাশ টাকা শিউলির দিকে এগিয়ে দিলেন। শিউলি টাকাটা নিয়ে চলে গেল। বাবারা মেয়েদের নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসেন, কিন্তু কখনো তারা তাদের মেয়ে কোনটাতে ভালো থাকবে, সেটা বুঝতে অক্ষম, অথবা বুঝেও না বোঝার মতো থাকেন।
শিউলি আজ আগেই বের হলো। আজ সোমবার, তাই কোচিং বন্ধ এই দিন স্যার নিজের ইউনিভার্সিটিতে যান। শিউলি হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল শিমুলদের ক্ষেতের পাশে। তার মনে হলো, পাশের শিমুল ফুল গাছটার নিচে হয়তো শিমুল বসে আছে।
শিউলি তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তাই শিমুল সেখানে বসা। লুঙ্গি পরা আর সাথে টি-শার্ট, ছাইরঙা। লোকটা ধুবরা ঘাস ছিঁড়ছে একটা একটা করে। ওপরের শিমুল ফুল গাছটায় লাল টকটকে ফুলগুলো ফুটে আছে।
শিউলির মনে মনে ভাবল, লোকটার নামের সাথে নিজের চেহারার ভীষণ মিল একদম শিমুল ফুলের মতো। গাছটার নিচে অনেকগুলো বসন্তের ঝরা ফুল পড়ে আছে। কী সুন্দর সেই দৃশ্য! শিউলি ধীরে হেঁটে গেল।
শিউলিকে দেখেই শিমুল অমায়িক হাসল। এই হাসিই যে সে অষ্টাদশী মেয়েটার ভেতরে ‘আগডুম বাগডুম’ খেলা করে, সেটা কি লোকটা জানে?
শিউলি শিমুল ভাইয়ের পাশে বসে পড়ল। শিমুলের ঠোঁটের পাশে কালচে দাগ রয়েছে এখনো।
শিউলি বলল,
“শিমুল ভাই, তোমার ব্যথা সেরেছে এখন?”
“হ, এহন ভালা,” বলেই শিউলির দিকে তাকাল শিমুল। শিউলির কনুইয়ের নিচে বেতের দাগ কিছুটা দেখা যাচ্ছে। আর ফুলঝুরিও বলেছিল যে তার বাবা শিউলিকে মেরেছেন।
শিমুল বলল,
“তোরে কাকু মারছে রে শিউলি?”
শিউলি কিছু বলল না, চোখ নামিয়ে নিল।
হঠাৎ শিমুল শিউলির আঘাতের জায়গাটাতে আঙুল বুলিয়ে বলল,
“খুব ব্যথা লাগছে, তাই না?”
শিউলি শিমুলের দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে বলল,
“না, শিমুল ভাই, মনের ব্যথার থাইকা বেশি না। ওই যে তুমি মাত্র ছুঁয়ে দিলে, আমার ব্যথা ভালো হইয়া গেছে। যেইদিন তুমি আমার মন ছুঁইতে পারবা, সেই দিন মনের অসুখও ভালো হইয়া যাইব।”
‘আচ্ছা, শিমুল ভাই কি এতটাই বোকা যে একটা মেয়ের ভালোবাসা বোঝে না?’ শিউলি মনে মনে ভাবল। কিন্তু শিউলির বিশ্বাস, তার শিমুল ভাই তারই হবে। সেটা হোক বেঁচে থাকতে বা মৃত্যুর পর।
★★★
শিউলি তার ইচ্ছে মতো তামিমকে দেখতে পেল। ছেলেটা আজও একই ভাবে টংয়ের দোকানের সামনে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিনের মতো আজও তার সঙ্গপাঙ্গরা রয়েছে।
শিউলির রাগ থরথরিয়ে বেড়ে গেল। শিউলি লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। শিউলিকে দেখে তামিম বাইক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। হাসি মুখে বলল,
“বাহ্! আজ ফুল যে ইচ্ছে করেই আমার নিকটে।”
শিউলি রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। সে বলল,
“আপনি শিমুল ভাইকে এভাবে মারলেন কেন?”
তামিম ভাবার মতো ভান করে বলল,
“শিমুল ভাই! মানে, ওই বলদ ছেলেটা?”
“একদম বলদ বলবেন না।”
তামিম সামনে এগিয়ে এল। সে বলল,
“বাহ্ বাহ্! এত জেদ দেখাচ্ছো কেন?”
“আজেবাজে কথা বন্ধ করুন! আর বলুন, শিমুল ভাইকে মারলেন কেন? সহজ-সরল পেয়ে ছেলেটাকে এভাবে মারবেন!”
তামিম ঔদ্ধত্যের সাথে বলল,
“না মেরে কী করব, সুইটহার্ট? ওই বলদ আমার কাছে এসে হিরো সাজতে চাইছিল। বলে কী তোমাকে বিরক্ত করলেই নাকি খুন করে ফেলবে! তুমিই বলো, মারব না তো কী করব? চুমু দেব?”
সাথে থাকা ছেলেগুলো হেসে উঠল। মনে হয় এই ছেলেগুলোর কাজই শুধু একটা এই তামিমের কথায় তাল মিলিয়ে হাসা। শিউলির ইচ্ছে হচ্ছিল এখনি একটা ঠাস করে বসিয়ে দিতে।
“আপনি আর কখনো শিমুল ভাইকে টুকা দেওয়ারও চেষ্টা করবেন না।”
শিউলির কথা শেষ করতে দিল না। তামিম তার আগেই দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“যতদিন তুমি শিমুলের সাথে রাতে দেখা করবে, ততদিন মারব। এবার বলো, শিমুলের সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক যে রাতের বেলা দেখা করতে হবে?”
শিউলি চমকে তাকাল। ‘এরা কী করে জানে! আর তার বাবাও জেনেছে কি এদের থেকেই?’ শিউলি জানে, যদি এরা জানতে পারে যে সে শিমুল ভাইকে ভালোবাসে, তাহলে এরা শিমুল ভাইকে আস্ত রাখবে না। শিউলি কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“শিমুল ভাইয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনিই কি আমার আব্বাকে এই দেখা করার বিষয়ে বলছেন?”
“আরে না, আমি কেন বলব! যে দেখেছিল, সেই বলেছে।”
শিউলি জিজ্ঞেস করল, “কে?”
“ওই যে তোমাদের পাশের বাড়ির গাঞ্জাখুর স্বপন আছে না, ওই বেটাই দেখেছিল। ওই বলল। আচ্ছা যাই হোক, আমিও বিশ্বাস করি, ওই বলদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। যাও যাও, কলেজে যাও।”
শিউলি আর কথা বাড়াল না। সে জানে, এদের সাথে কথা বললে আরও বিপদ বাড়বে।
★★★
শিউলি কলেজে পৌঁছে গেল। গিয়ে দেখল, বৃষ্টি এখনো আসেনি। অন্যদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, বৃষ্টি নাকি দুই দিন ধরেই আসছে না।
শিউলি অবাক হলো। এই মেয়ে তো কলেজ ফাঁকি দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু কী হয়েছে যে কলেজে আসে না! আজও না এলে তিন দিন হবে।
শিউলির বৃষ্টিকে ছাড়া ক্লাস করতে ইচ্ছে হলো না। এই বৃষ্টি মেয়েটাই তার একমাত্র বেস্টফ্রেন্ড। শিউলি নিজেকে জোর করে ধরে টিফিন পর্যন্ত ক্লাস করল। টিফিনে প্রিন্সিপালের কাছে ছুটির আবেদন করতে গেলে তিনি তা নাকচ করে দিলেন। বললেন, “দুই দিন পর কলেজে এসেছো, এখন আবার ছুটির জন্য এসেছো!”
শিউলি ছুটি না পেয়ে বেরিয়ে এলো। বেরোতেই দেখল শফিক, মানে বৃষ্টির বয়ফ্রেন্ড, দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি ডাকল, ছেলেটা এগিয়ে এলো। শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“বৃষ্টি আসে না কেন? আপনাকে কিছু বলেছে?”
ছেলেটার চাহনি ঠিক নেই। এসব ছেলের সাথে কথা বলা একদম পছন্দ না, তবে কী আর করা বৃষ্টির খাতিরে বলতেই হচ্ছে। ছেলেটা ভীষণ তিক্ততার সাথে বলল,
“আমি জানি না। এইসব মেয়েদের খবর।”
বলেই হনহন করে চলে গেল শফিক।
শিউলি বুঝতে পারল, কিছু তো একটা গন্ডগোল হয়েছে। বৃষ্টি মেয়েটা একদম সহজ-সরল, অন্যদের মনের কূটনৈতিক বুদ্ধি বুঝতে পারে না। যদি বুঝতেই পারত, তাহলে এই শফিক নামের ছেলেটার সাথে প্রেম করত না।
#চলবে…
