#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৭
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি কলেজ ছুটির পরই বৃষ্টিদের বাড়ির রাস্তা ধরল। শিউলিদের বাড়ি থেকে বৃষ্টিদের বাড়ি তেমন দূরে নয়। বৃষ্টিদের ঘরটা হাফ বিল্ডিং। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো বৃষ্টির মায়ের সাথে। শিউলি সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আন্টি, বৃষ্টি কোথায়? কয়েক দিন ধরে কলেজ যাচ্ছে না।”
তিনি বললেন, “বৃষ্টি বলল, তার কলেজে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না, আর শরীরটাও নাকি ভালো না।”
শিউলি বৃষ্টির মায়ের সাথে কথা বলে বৃষ্টিদের ঘরে ঢুকল। গিয়ে দেখল বৃষ্টির রুমের দরজা বন্ধ। শিউলি দরজায় টুকটুক করে আওয়াজ করল। ভেতর থেকে বৃষ্টি বলে উঠল,
“আম্মা, তুমি এখন যাও। আর বারবার এভাবে ডাকছো কেন?”
“আমি শিউলি। দরজা খোল,” শিউলি শান্ত কণ্ঠে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। ভেতরে ঢুকে শিউলি অবাক হয়ে সব কিছু দেখতে লাগল। কী জীর্ণশীর্ণ অবস্থা বৃষ্টির! মাথার চুল বোধহয় দুই দিন ধরে আঁচড়ানো হয়নি। চোখের নিচে কালি পড়েছে। অযত্নের কারণে মুখে ব্রন দেখা দিয়েছে।
শিউলি অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“এ কী অবস্থা তোর? কী হয়েছে?”
বৃষ্টি মাথা নাড়ল, মানে ‘কিছু না’।
শিউলি এগিয়ে গিয়ে বৃষ্টির হাত ধরল। নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,
“আমার সাথে বলবি না? শফিকের সাথে ঝামেলা?”
এবার বৃষ্টির বাঁধ ভাঙল। মেয়েটা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। শিউলি তাকে কিছুক্ষণ সময় দিল নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য।
কান্না থামলে শিউলি বলল, “এবার বল দেখি, কী হয়েছে?”
বৃষ্টি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, “শিউলি, আমি ঠকে গেছি। খুব খারাপ ভাবে ঠকেছি।”
বলেই সে আবারও কেঁদে উঠল।
“বল, কী হয়েছে!” শিউলি জোর দিল।
বৃষ্টি বলতে শুরু করল: “ওই দিন যখন কলেজে গেলাম… গিয়ে দেখি তুই আসিসনি। ওই দিন গিয়ে দেখলাম শফিক আমাদের জুনিয়র একটা মেয়ের সাথে বসে গল্প করছে। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, এটা কে? তখন শফিক কিছু বলল না। কিন্তু মেয়েটা বলল শফিকের সাথে সে রিলেশনে আছে। শফিক আমাকে ঠকিয়েছে।”
বৃষ্টি আবারও কেঁদে উঠল।
তবে শিউলির মুখটা শক্ত হয়ে উঠল। এতক্ষণ বৃষ্টির কান্নার জন্য তার কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এখন নিজেরই রাগ হচ্ছে বৃষ্টির জন্য। শফিক ছেলেটা যে ভালো না, সেটা আগেও সে বলেছিল, কিন্তু বৃষ্টি মানেনি। যাকে বলে, একদম জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিল। চোখে কালো কাপড় বেঁধেছিল, এখন কী হলো!
শিউলি বিরক্তি নিয়ে বলল,
“মনটা চাচ্ছে তোকে ঠাস করে একটা বসিয়ে দিই! এই খারাপ একটা ছেলের জন্য তোর এই অবস্থা?” শিউলি নিজের গলা নরম করে আবারও বলল, “শোন বৃষ্টি, ভালো যদি বাসতেই হয়, তাহলে এমন কাউকে বাসিস যে তোকে কখনো ঠকাবে না।”
বৃষ্টি এবার চোখ মুছল। “সত্যিই তো! আমি এই শফিকের জন্য কেন কান্না করব?”
বৃষ্টির চোখ গেল শিউলির শরীরের দিকে। সে অবাক কণ্ঠে বলল, “শিউলি, তোর শরীরে এসব কিসের দাগ? তোকে কে মারল এভাবে?”
শিউলি হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ভালোবাসার শাস্তির দাগ। আব্বা শাস্তিস্বরূপ দিয়েছে।”
বৃষ্টি শুধু অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, “শিউলি, তুই আমাকে বললি, বোঝালি, আমি বুঝলাম। কিন্তু আমি আগের মতোই তোকে বলছি, শিমুলের সাথে তোর কখনো ভবিষ্যতে হতে পারে না। ছেলেটা তোর ভালোবাসা বুঝবে না।”
“না, শিমুল ভাই অবশ্যই আমার ভালোবাসা বুঝবে। পৃথিবীর সব জিনিসের মাঝেও ভালোবাসা বিদ্যমান থাকে। পশুপাখিরাও তো ভালোবাসা বোঝে। পাগলরাও ভালোবাসা বোঝে। তাহলে আমার শিমুল ভাই কেন বুঝবে না?” শিউলির কণ্ঠে ছিল দৃঢ় বিশ্বাস।
বৃষ্টি প্রশ্ন করল,
“যদি না বোঝে, আর যদি বুঝেও তোর বাপ জীবনেও মেনে না নেয়, তখন কী করবি?”
শিউলি হাসি মুখে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“পালিয়ে যাব। অনেক দূরে পালিয়ে যাব। যেখানে গেলে সমাজের বেড়া থাকবে না, লোকলজ্জার ভয় থাকবে না।”
★★★
শিমুল পুকুর ঘাটে বসে আছে। পানিতে বাচ্চারা সাঁতার কাটছে। তবে আজ শিমুল নামল না পানিতে। সে ডুবে আছে অন্য কোথাও।
‘শিউলি সবসময় এসব ক্যান কয়? শিউলি আমারে ভালা পায়? কিন্তু ক্যান ভালা পায়?’ নিজের মনে প্রশ্নগুলো বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে।
হঠাৎ পেছনে কারো হাতের স্পর্শ নিজের কাঁধে পেল। শিমুল থমকে পেছনে ফিরল। ছেলেটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দেখল পাশের বাড়ির এনামুল, শিমুলের ছোটবেলার বন্ধু। শিমুল দাঁত বের করে হাসল। এনামুল শিমুলের পাশে বসল।
এনামুলই ছিল শিমুলের একমাত্র ছোটবেলার বন্ধু। বোকা-সোকা হওয়ার জন্য শিমুলের সাথে বেশি কেউ মিশত না। তবে এনামুল শিমুলকে সবসময় আশ্রয় দিত।
শিমুল হাই স্কুলের পড়া শেষ করেনি। সব পোলাপান তাকে নিয়ে মজা করত, তাই শিমুল নিজেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। তবে শিমুল পড়াশোনায় খারাপ ছিল না।
শিমুল জিজ্ঞেস করল,
“কোন দিন আইলি ঢাকা থাইকা?”
“এই তো গতকালই আসলাম। ঢাকায় একটা চাকরিও পাইছি।”
“বাহ্, ভালাই হইছে।”
এভাবেই তাদের অনেকক্ষণ কথা হলো। শিমুল এক পর্যায়ে বলল,
“আইচ্ছা এনামুল, ভালোবাসা, প্রেম কারে কয়?”
বন্ধুর মুখে এমন কথা শুনে এনামুল অবাক হলো। সে বলল,
“বাহ্ রে! শিমুল সাহেব প্রেমে পড়ল কার?”
শিমুল তাকে উপেক্ষা করে জানতে চাইল,
“বল না, ভালোবাসা কীভাবে হয়? কারো কথা বারবার মনে পড়লে কি তারে ভালোবাসা কয়? কাউরে প্রতিদিন না দেখলে যে বুকে ব্যথা হয়, তারে ভালোবাসা কয়? বল না, ভালোবাসা কারে কয়?”
এনামুল অবাক হয়ে তাকিয়েই রইল শুধু। ছেলেটার আগের থেকে এখনকার কথাবার্তার অনেক তফাত রয়েছে।
“আমি কী আর বলব! তুই নিজেই তো সব বলে দিয়েছিস। তুই যা বলেছিস, সেটাকেই ভালোবাসা বলে।”
শিমুল চোখ বন্ধ করে অনুভব করল। তার চোখের সামনে সবসময় শিউলির মুখটাই ভাসে। একদিন মেয়েটাকে না দেখলে বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব হয়। কিন্তু সেটা কীভাবে ভালোবাসা হতে পারে? শিমুল মুচকি হাসল। পরপরই আবারও হাসিটা মিলিয়ে গেল। ওই দিন ফুলঝুরি বলেছিল, তার সাথে দেখা করার জন্যই শিউলি অনেক মার খেয়েছে। শিমুল নিজে নিজেকে আবার বলল,
‘না, না! শিউলিকে আমার পাওয়া হবে না। এটা অসম্ভব একটা বিষয়। কাকু তাইলে মাইরা ফেলব আমারারে।’
এনামুল জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে শিমুল? এভাবে বিড়বিড় করছিস কেন?”
“না, কিছু না। এমনেই।” বলেই শিমুল উঠে গেল।
★★★
গোধূলির আকাশ তখন শেষ লগ্নে। অস্তগামী সূর্যের নরম আলোয় গ্রামের সৌন্দর্য যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
শিমুল বসে আছে নিজের ডিঙিটার (ছোট নৌকা) মাঝে। বিলটা বিশাল বড়, থৈ-থৈ করা জল। হাঁসগুলো পানিতে খেলা করছে। জলের সঙ্গে মিশে আসছে কমলি পাতার ঘ্রাণ সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। শিমুল চুপচাপ পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ ডিঙিটা নড়েচড়ে উঠল পেছনে কেউ ওঠার কারণে।
শিমুল পেছনে ফিরে দেখল শিউলি। তাকে দেখামাত্র শিমুলের মুখে তৎক্ষণাৎ হাসি ফুটে উঠল। শিমুল বলল,
“আইয়া পড়ছস কলেজ থাইকা?”
“হ, শিমুল ভাই, ডিঙি বাই দাও।”
“কই যাইবি?” শিমুল সরলভাবে প্রশ্ন করল।
শিমুলের বোকা কথায় শিউলি হাসল। এই বিল ছাড়া আর কোথায় যাওয়া সম্ভব! শিউলি মজার ছলে বলল,
“রঙিন এক দুনিয়ায় যাব। যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব।”
“এসব কী কস?” শিমুল বিভ্রান্ত হয়ে বলল।
“তোমাকে বুঝতে হবে না। তুমি ডিঙি চালাও।”
শিমুল আর কিছু না বলে ডিঙি বাইতে শুরু করল। তারা এখন বিলের একদম মাঝখানে এসে পৌঁছেছে। চারপাশে অসংখ্য পদ্মফুল ফুটে আছে। বিকেলের দিকে ফুলগুলো আধো-ফোটা অবস্থায়।
শিউলি শিমুলকে এখানে নৌকা থামাতে বলল। ডিঙি স্থির হলে, শিউলি তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল।
“আচ্ছা শিমুল ভাই, আমি যদি কখনো হারিয়ে যাই, তাহলে কি আমার জন্য তুমি কাঁদবে?”
শিউলির কণ্ঠে কোনো চপলতা ছিল না, ছিল এক গভীর জিজ্ঞাসা। শিমুল বৈঠা থামিয়ে স্থির হয়ে গেল। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। শিমুল সামান্য অস্থির হয়ে বলল,
“আরে না, কাঁদব ক্যান? আর তুই হারাইবি কই? এই ছোট্ট গ্রাম থাইকা তুই হারাইয়া কোথায় যাইবি?” শিমুল সহজভাবে উত্তর দিল।
শিউলি এবার বলল,
“যদি মইরা যাই তখন?”
শিমুলের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। শিমুল ঠোঁট ফুলালো বাচ্চাদের মতো। ছেলেটার মাঝে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। শিমুল বলল,
“তোর কিছু হইলে আমার বুকডা যে ফাইট্যা যাইব রে শিউলি। আমি কাঁন্দনের কী বুঝুম, তয় বুক ফাটলে তো বাঁচন যায় না।”
শিউলি মূলত শিমুল ভাইয়ের মধ্যে এরকম পরিবর্তনই লক্ষ্য করতে চেয়েছিল, এবং সে সফলও হলো। শিউলি বলল,
“আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তুমি ওই দিন কইছিলা একটা গান শোনাইবা। এখন শুনাও।”
শিমুল মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলল,
“না না, আমার শরম করে।”
শিউলি বায়না করল,
“না করলে হবে না। তোমাকে বলতেই হবে। না বললে কিন্তু আমি তোমার সাথে আর কথা বলব না।”
শিউলি মুখ ফুলিয়ে অন্য দিকে ফিরল।
শিমুল কিছুক্ষণ শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার কোমর পর্যন্ত চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে। ‘মেয়েটা এত রূপবতী কেন?’ নিজেকে প্রশ্ন করল শিমুল।
শিমুল শেষমেশ হাসিমুখে সম্মতি জানাল। তারপর দ্বিধা ছেড়ে তার অপরূপ কণ্ঠে গান গাইতে শুরু করল। তার কণ্ঠস্বরে কোনো জড়তা ছিল না, ছিল এক স্নিগ্ধ, গ্রাম্য সুর,
“কন্যার চিরল বিরল চুল,তাহার কেশে জবা ফুল…
কন্যার চিরল বিরল চুল,তাহার কেশে জবা ফুল।
সেই ফুল পানিতে ফেইলা কন্যা করল ভুল।
কন্যা ভুল করিস না, ও কন্যা ভুল করিস না।
আমি ভুল করা কন্যার লগে কথা বলবো না।”
শিমুলের কণ্ঠস্বর পেয়ে শিউলি সেই দিকে তাকাল। দু’জন দু’জনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল নীরবে। শিমুল আবারও নিজের সুরেলা কণ্ঠে সুর ধরল,
“এক যে ছিল সোনার কন্যা, মেঘবরন কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ।
দুই চোখে তার আহারে কী মায়া…
নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া
আমি তাহার কথা বলি, তাহার কথা বলতে বলতে
নাও দৌড়াইয়া চলি।”
#চলবে
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৮
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
বাড়িতে আজ ছোটখাটো আয়োজন চলছে বলা চলে। রান্নাঘরে সকাল থেকে চলছে রান্নাবান্না। রান্নার সুস্বাদু গন্ধে পুরো বাড়ি মৌ মৌ করছে। শিউলির আবার রান্নার ঘ্রাণ পেলেই খিদে পেয়ে যায়। সে বারবার রান্নাঘরে যাচ্ছে আর এটা-সেটা খেয়ে আসছে।এটা খুবই বদ অভ্যাস।
জাবেদা খাতুন কিছুক্ষণ বকা দিয়েও বললেন,
“এভাবে ছুঁচোর মতো খাচ্ছিস কেন? প্লেট নিয়ে বসে খা।”
শিউলির এক উত্তর
“এভাবে খাওয়ার মজাই আলাদা।”
জাবেদা বেগম বললেন,
“আমি না হয় এসব মেনে নিব। শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এসব করলে মানুষ ভালো বলবে না।”
শিউলির বলতে ইচ্ছে হলো, ‘বাড়ির পাশেই তো বিয়ে করব! সেখানে থেকেই রান্নার ঘ্রাণ পেয়ে দৌড়ে এসে এভাবেই খেয়ে যাব।’ কিন্তু মনের কথা মনেই রয়ে গেল।
জাবেদা বেগম এসব বিষয় নিয়ে কখনোই খারাপ কথা বলেন না।কারণ মেয়েদের শখ শুধু এই বাপের বাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকে,অন্যের বাড়ির মানুষের মন জয় করতে করতে নিজের সকল শখ বিসর্জন দিতে হয়।
জাবেদা বেগম আবারও বললেন,
“দুপুর তো হয়ে এলো। বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখ তো,তোর খালা আসছে কি না।”
আজ জাবেদা বেগমের বোন, মানে শিউলির খালা, শহর থেকে আসবেন। ওনারা সপরিবারে আসবেন এবং অনেকদিন থেকে যাবেন। তাদের ইচ্ছে অনেক দিন ধরে পুরো গ্রাম ঘুরে দেখবেন। সেই কারণেই বাড়িতে এত আয়োজন।
ইদ্রিস খন্দকার দরজার সামনে বানানো ইটের তৈরি বসার জায়গাটায় বসে হাতের নখ খুঁটছিলেন। হঠাৎ তিনি শিউলিকে ডাকলেন।
শিউলি বাবার দিকে তাকিয়ে সামান্য ভয় পেল। যদি কিছু জিজ্ঞেস করে শিমুল ভাইয়ের সম্পর্কে, তাহলে কী হবে! সেই ভেবেই ভীত হলো। সে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“জ্বি আব্বা।”
তিনি নখ খুঁটতে খুঁটতেই বললেন, “বোস।”
শিউলির ভয় আরও বাড়ল। সে বুঝল, তার বাবা কিছু জিজ্ঞেস করবেনই। শিউলি বসে গেল। সে মনে মনে কয়েকবার দোয়া-দুরুদ পড়ে নিল। ‘আল্লাহ, এইবার বাঁচিয়ে দিও।’
ইদ্রিস খন্দকার মেয়ের দিকে তাকিয়েই বললেন,
“ওইদিন রাইতে কেন গেছিলি শিমুলের লগে দেখা করবার?”
শিউলি মনে মনে এটাই ভাবছিল। কথায় আছে না, যেখানে ভাগের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়। শিউলির সাথে এটাই হলো। শিউলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তোতলিয়ে বলল,
“আ… আসলে আব্বা, আমি ওইদিন টয়লেটে যেতে নিচ্ছিলাম, কিন্তু বাইরে তাকিয়ে দেখি শিমুল ভাই বসা। আমি ভাবলাম লোকটা এভাবে বসে আছে কেন? তুমি তো জানোই, লোকটা বোকা তাই জিজ্ঞেস করতে গেছিলাম।”
কথাটা বলেই শিউলি চোখ বন্ধ করে দম নিল। মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস যে নেই!
ইদ্রিস খন্দকার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
“আমিও বিশ্বাস করি, আমার মেয়ের ওরকম একটা বোকা বলদের সাথে কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। ওই গাঞ্জাখুর স্বপন যেমনে এসে বলল, তাতে আমার মাথাটা গরম হয়ে গেছিল। তাই ওই দিন এভাবে…”
শিউলি তার বাবাকে থামিয়ে দিল। বলল,
“আব্বা, থাক। আপনি আপনার পিতার দায়িত্ব পালন করেছেন। এটা দোষের না। আমি কিছুই মনে করিনি আব্বা।” শিউলি মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলল।
এরপর তার বাবার সাথে আরও অনেক কথা হলো পড়াশোনার বিষয়ে। এই পর্যায়ে এসে বাবার কাছ থেকে এত সুন্দর সুন্দর কথা শুনে তার ইচ্ছে হচ্ছিল, আব্বাকে জড়িয়ে ধরে বলুক ‘ভালোবাসি আব্বা, তোমাকে ভালোবাসি।’
কিন্তু শিউলির দ্বারা এটা সম্ভব হলো না। প্রিয় মানুষগুলোর ক্ষেত্রে আমরা বোবা হয়ে যাই। ভালোবাসার কথাগুলো ঠিক করে বলতে পারি না।
★★★
দুপুরের তখন আযান দিচ্ছে। বাড়ির বাইরে থেকে কিছু মানুষের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। শিউলি বুঝল, হয়তো তার খালারা এসে গেছেন।
শিউলি বাড়ি থেকে বের হতেই টপস পরা একটি মেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। শিউলিও মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিল। মেয়েটা মিলি, শিউলির খালাতো বোন।ছোট বেলা থেকে বেশ ভালো সম্পর্ক।এর মাঝে অনেকবার এই বাড়িতে এসেছে।
মিলি শিউলির মুখে হাত বুলিয়ে বলল,
“আপু, তুমি আরে দিনকে দিন সুন্দর হয়ে যাচ্ছো! এত সুন্দর কীভাবে হচ্ছো? কী প্রোডাক্টস ইউজ করো?”
মিলির কথা শুনে শিউলি ফিক করে হেঁসে দিল।প্রত্যেকবার মেয়েটা এসেই এই একই কথা বলবে।অথচ মিলিও কম সুন্দর না।
পেছন থেকে মিলির মা জুলেখা বেগম এসে মিলির কান মলে দিয়ে বললেন,
“আসতে না আসতেই কী প্রোডাক্টস ইউজ করে, তা নিয়ে পড়ে আছিস? আপুকে জিজ্ঞেস করেছিস, আপু কেমন আছে?”
মিলি লাজুক লাজুক হেসে বলল,
“সরি আম্মু।”
শিউলি বলল, “থাক খালা, সমস্যা নাই। তুমি ভালো আছো?”
জুলেখা বেগম শিউলির গালে হাত ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,
“হুম, ভালো আছি। মাসাআল্লাহ! তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস।”
শিউলি হেসে বলল,
“খালু আসে নাই?”
“না, অফিস নিয়ে ব্যস্ত, তাই আসতে পারেনি। সোহাগকে নিয়ে আসছি।”
শিউলি পেছনে তাকাল। দেখল শার্ট-প্যান্ট পরা একটি ছেলে হেঁটে আসছে, চোখে সানগ্লাস।সোহাগকে অনেক বছর আগে দেখেছিল।তখন হয়তো শিউলি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
জুলেখা বেগম আর জাবেদা বেগম অনেক দিন পর বোনের দেখা পেয়ে নিজেদের কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
সোহাগের পাশে শিমুল ভাইও আছেন। শিমুল ভাইয়ের হাতেও একটা ব্যাগ। হয়তো এতগুলো ব্যাগ সোহাগ একা নিয়ে আসতে পারছিল না বলেই শিমুল সাহায্য করছেন।
মিলি এসে শিউলির পাশে দাঁড়াল। আঙুলে ইশারা করে ফিসফিস করে বলল,
“আপু, ওই ছেলেটা কে? অনেক সুন্দর, তাই না?”
মিলির কথা শুনে শিউলি মিলির দিকে তাকাল। মিলির চোখ শিমুল ভাইয়ের ওপরে, মেয়েটার মুখে অমায়িক হাসি লাগানো। শিউলির ঠিক ভালো লাগল না। তার সামনে অন্য একটা মেয়ে তার শিমুল ভাইয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকবে, এটা তার সহ্য হওয়ার মতো নয়। পরক্ষণেই মনে পড়ল, মিলি মেয়েটার বয়স মাত্র পনেরো হবে হয়তো।এতটুক বয়সে কিই বা বুঝবে!
শিউলি এবার হেসে বলল,
“উনি শিমুল ভাই। ওই যে বাড়িটা দেখছিস, ওইটাই শিমুল ভাইদের ঘর।”
শিউলি আঙুল দিয়ে ইশারা করে শিমুলদের বাড়ি দেখাল।
সোহাগ শিউলিদের কাছে এসেই বলল,
“তুমি শিউলি,রাইট?
শিউলি সোহাগের কথায় উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে মিলি বলে উঠল,
“ইয়েস ভাইয়া ইউ আর রাইট।”
মিলি মেয়েটা ভীষণ চঞ্চল। শহুরে হওয়ার করনেই হয়তো।তবে ভীষণ মিষ্টি মেয়ে।দেখতেও সুন্দরী।
সোহাগ শিউলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো শিউলি?”
“হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?” শিউলি হেসে উত্তর দিল।
এভাবেই হাতে গোনা কয়েকটি কথা হলো সোহাগ আর শিউলির মাঝে।
মিলি এগিয়ে গেল শিমুলের কাছে।বলল,
“আপনার নাম কি?”
শিউলি ব্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।মাত্রই নামটা শুনেছে তারপরও আবারও জিজ্ঞেস করছে।
শিমুল ধীর কন্ঠে বলল, “আমি শিমুল।”
মিলি মিষ্টি হেঁসে বলল,
“আপনার কন্ঠ ভীষণ সুন্দর…
আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই শিউলি থামিয়ে দিল।
শিউলি সোহাগ আর মিলিকে বলল,
“তোমরা বাড়ির ভেতর যাও। আমি শিমুল ভাইয়ের থেকে ব্যাগ নিয়ে আসছি।”
শিউলির কথা অনুযায়ী তারা বাড়ির ভেতর চলে গেল।এবার সেখানে শুধু শিমুল আর শিউলি। শিমুল জিজ্ঞেস করল,
“ওরা কী অয় তোদের?”
“ওনারা আমার খালা আর দুজন খালার ছেলে-মেয়ে।”
“ও,” শিমুল ধীর গলায় বলল। শিউলির কাছে শিমুল ভাইয়ের কণ্ঠটা অন্য রকম শোনাল।
শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“শিমুল ভাই, তোমার কি শরীর ভালো নাই? অসুস্থ তুমি?” শিউলির কণ্ঠে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
শিমুল মাথা নেড়ে বলল,
“আরে না না, তেমন কিছু না।”
“তাহলে?” শিউলি আবারও জিজ্ঞেস করল।
শিমুল পায়ের বুড়ো আঙুল বালুতে ঘষতে ঘষতে বলল,
“ওই পোলাডা তোর দিকে খুব সুন্দর কইরা তাকাইয়া কথা কইছিল। তুইও তো খুব সুন্দর কইরা হাইসা হাইসা কথা কস।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের কথায় বাক্যহীন তাকিয়ে রইল। লোকটা কি ঈর্ষা (Jealous) করছে? শিউলি হেসে বলল,
“তুমি কি জেলাসি করছো?”
শিমুল হয়তো শিউলির কথাটা বুঝতে পারল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।
শিমুল শিউলির হাতে ব্যাগটা দিয়ে বলল,
“আইচ্ছা যাই এহন আমি।”
বলেই সে পিছু ফিরল। শিউলি তখনও একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। শিমুল কয়েক কদম সামনে এগিয়ে আবারও পেছনে ফিরল। শিউলির পরনে সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ। ওড়নাটা মাথায় সুন্দর করে দেওয়া। গোসল করে হয়তো ভেজা থাকার কারণে চুল বাঁধেনি। অনেকগুলো চুল সামনে এসে পড়েছে, চোখের ওপর।
শিমুল ভাই হেসে বলল,
“শিউলি… তোরে সাদা পোশাকে বেশ মানায়। একদম পরীগোর মতোন লাগে।”
শিউলির মুখে চটজলদি হাসি ফুটে উঠল। শিমুল পেছন ফিরে চলে গেল। শিউলির খুশির যেন অন্ত নেই। শিমুল ভাইয়ের সামান্য একটা কথার কারণে যদি এতটা খুশি হতে পারে, তাহলে যদি কখনো শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শোনে, তাহলে কী হবে!শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে খুশিতে আকাশে উড়তে।
সত্যিই তাই যারা কিছু চেয়েও না পায়, তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে।কিন্তু তাদের কপালে সেই অল্পও জুটে না।
#চলবে
