#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_৯
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে শিউলি নিজের রুমে আসলো। সারাটা দিন ভীষণ ভালো কেটেছে। তবে কিছুটা অস্বস্তির মাঝে ছিল সোহাগকে নিয়ে।
সোহাগ ছেলেটা বারবার অন্য ভাবে তাকিয়ে ছিল শিউলির দিকে। মেয়েদের আলাদা একটা ক্ষমতা রয়েছে তারা ছেলেদের নজর ধরতে পারে। কোন ছেলেটা কীভাবে তাকাচ্ছে, সেটা মেয়েরা বুঝতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে সোহাগ অনেক ভালো ছেলে, এটা অস্বীকার করা যায় না।
পরমুহূর্তেই শিউলি নিজেকে বোঝ দিল হয়তো অনেক দিন পর দেখেছে, তাই হয়তো মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছিল।
তা না হলে তো ছোটবেলায় সোহাগের সাথে অনেক খেলা করেছে। শিউলির থেকে সোহাগ কয়েক বছরের বড়।
শিউলি নিজের টেবিলে বসেই এসব ভাবছিল। হঠাৎ মিলি দৌড়ে এসে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল। এমন ভাবে বসল, যেন বিছানাটাই ভেঙে দেবে। হঠাৎ এমন আকস্মিকতায় শিউলি মিলির দিকে তাকাল।
পরমুহূর্তেই মিলি এসে শিউলিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে আমি পুরো বাড়ি খুঁজে নিলাম, আর তুমি এখানে?”
“একটু পড়তে বসছিলাম তাই…”
“আমরা এসেছি, আর তুমি পড়ছো? এটা ঠিক না আপু। এখন শুধু তুমি আমার সাথে গল্প করবে। অন্য কিছুই না।”
বলেই মিলি শিউলির সামনে থেকে বই কেড়ে নিল।
শিউলি মিষ্টি হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, পড়ব না।”
মিলি আবারও বলল,
“আপু, এবার বলো না, তুমি মুখে কী প্রোডাক্টস ইউজ করো। প্লিজ বলো।”
তখনি দরজা থেকে সোহাগ বলে উঠল,
“শিউলি কী ইউজ করে আর না করে, এসব বাদ দে। গ্রামে অনেক গোবর পাওয়া যায়। তুই বললে সেসব গোবর এনে দিই, কী বলিস?”
এহেন কথায় শিউলি ও মিলি দুজনেই সেই দিকে তাকাল। শিউলি নিজের মুখ চেপে হাসছে। মিলি রাগে মুখ ফুলিয়ে সোহাগের দিকে বালিশ ছুঁড়ে মারল। সোহাগ বালিশটা ক্যাচ ধরে এসে বিছানায় বসল। মিলির ফোলা ফোলা গাল দুটো টেনে দিয়ে বলল,
“হয়েছে, আর রাগ করতে হবে না।”
মিলির মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে গেল। সে হঠাৎ বলে উঠল,
“ভাইয়া, তোমার মাথার ওপর তেলাপোকা!”
সাথে সাথেই সোহাগ জোরে ‘আহ…’ বলে চিৎকার করে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই বুঝতে পারল মাথায় কিছু নেই, মিলি তাকে ভয় দেখানোর জন্যই বলেছে। সোহাগ তেলাপোকা ভয় পায়, সেটারই সদ্ব্যবহার করল মিলি।
সোহাগ দম নিয়ে বলল,
“তুই আমার বোন নাকি শত্রু?”
সোহাগের কথার পরিপ্রেক্ষিতে মিলি মুখ ভেঙাল।শিউলি সেই হেসেই যাচ্ছে। শিউলির একবার হাসি শুরু হলে আর থামার নাম থাকে না।
এবার সোহাগের নজর গেল শিউলির দিকে। ছেলেটা এক নজরে তাকিয়ে রইল। কী সেই স্নিগ্ধ হাসি! সোহাগের মনে হলো, এই হাসির দিকে তাকিয়ে থেকে সারাজীবন অচিরেই কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। সোহাগ পলকহীন চেয়ে রইল।
শিউলি সোহাগকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজের হাসি থামিয়ে দিল। শিউলি অস্বস্তিতে পড়ল।
শিউলি এবার বলল,
“অনেকটা রাত হয়ে গেছে, এবার ঘুমানো উচিত।”
সোহাগ নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“মাত্র দশটা বাজে, এখনি ঘুম…?”
“হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। শহরে হয়তো এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না। তবে তাড়াতাড়ি ঘুমানো আর সকালে ঘুম থেকে ওঠা ভালো। গিয়ে দেখুন, এখন গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ ঘুমে আছে,” শিউলি হেসে বলল।
সোহাগ মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। কাল সকাল সকাল উঠে না হয় গ্রাম ঘুরতে বের হবো। গুড নাইট।”
শিউলি মাথা নেড়ে বলল, “শুভ রাত্রি।”
ঘরের মৃদু আলোয় শিউলি ও মিলি পাশাপাশি শুয়ে আছে। শিউলি সাধারণত পুরো ঘর অন্ধকার করেই ঘুমায়, কিন্তু মিলি অন্ধকারে ভয় পায় বলেই আলোটা আজ বন্ধ হয়নি।
মিলি পাশ ফিরে শিউলির দিকে তাকাল। কিছুটা কৌতূহলী কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল,
“আপু, তুমি কি কারো সাথে প্রেম করো?”
শিউলি উত্তরে ‘প্রেম…!’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মিলি আবার বলল, “হুম, কাউকে কি তোমার সত্যি খুব ভালো লাগে?”
শিউলি চোখ বুজল। সে ডুবে গেল তার শিমুল ভাইয়ের কল্পনায়। লোকটা কি তাকে ভালোবাসে? তার মতো কি শিমুল ভাইয়েরও হৃদয় পোড়ে? শিউলি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ফিসফিস করে বলল,
“প্রেম কিনা জানি না। তবে ভালোবাসি একজনকে। যে রয়েছে আমার কল্পনার ঘরে, যাকে আমি চাই আমার প্রত্যেকটা মুহূর্তে। সে যেন আমার নিঃশ্বাসেরও অংশ।”
মিলি মুগ্ধ হয়ে শুনল শিউলির কথা। তার চোখে রাজ্যের কৌতূহল। সে আরও ইচ্ছুক হয়ে বলল,
“সে কে আপু? সেও বোধহয় অনেক সুন্দর, অনেক হ্যান্ডসাম?”
শিউলি ধীর শব্দে হাসল। হাসিটা করুণ হলেও তাতে ছিল এক অনাবিল তৃপ্তি। ছাদের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“সে আমার চোখে রাজপুত্র। তাকে পেয়ে গেলে আমার দুনিয়ায় আর কিছু চাওয়ার থাকবে না।”
মিলি শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তার চোখে তখন স্বপ্নীল ঘোর। ধীরে ধীরে সে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল। শিউলির কথাগুলো যেন তার হৃদয়ে নতুন করে ঢেউ তুলল।
মিলি মনে মনে একান্তে বলল,
“আমিও প্রেমে পড়েছি আপু। ভীষণভাবে পড়েছি। এক দিনে একজনকে এত ভালো লাগা যায়!”
★★★
শিমুল খাটে শুয়ে একবার এদিক আরেকবার ওদিক করছে। আজ ছেলেটার ঘুম আসছে না। কিন্তু কেন ঘুম আসছে না? বারবার তৃষ্ণা পাচ্ছে। এর মাঝে পানিও খেয়েছে পিপাসা মেটানোর জন্য, কিন্তু মিটছেই না। তাহলে কিসের তৃষ্ণা পেল? গলার নাকি মনের?
এমনিতেই শিমুল সন্ধ্যা নয়টা নাগাদই ঘুমিয়ে পড়ে, অথচ এখন রাত এগারোটা পার হয়ে গেছে, তবুও ঘুম আসছে না। আজ কি ঘুমেরা অভিমান করল? শিমুল চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে চাইলে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা মেয়ের কাজল কালো চোখ দুটো। সেই সরু নাক, বাঁকা ভ্রু, গোলাপি ঠোঁট। এত কেন আজ মনে পড়ছে মেয়েটাকে? এর আগেও তো অনেকবার দেখেছে, তবে আজকের মতো মনে পড়ছে না।
শিমুল উঠে বসল। সে মনে মনে ভাবল,
‘আইচ্ছা, শিউলি কি ওই পোলাটার লগে এভাবেই হাইসা হাইসা কতা কইতাছে?’
এটা ভাবতেই তার মনের ভেতর উতালপাতাল ঝড় বইতে শুরু করল। এক তীব্র অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল।
শিমুল চৌকি থেকে নেমে মাটিতে পা রাখল। সে ধীর হাতে কাঠের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সে সোজা চলে গেল শিউলিদের বাড়ির পেছনে। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে শিউলির রুমের জানালার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। কিসের তাড়নায় এখানে আসা, শিমুলের জানা নেই। সে শুধু জানে এখানে না আসলে সে যেন দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে।
হঠাৎ জানালাটা খুলে গেল। জানালার ওপারে দেখা গেল লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে থাকা শিউলি বাইরে দৃষ্টি রাখল। হঠাৎ শিমুল ভাইকে দেখে শিউলির মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে গেল। ‘এই লোক এখন কী করে এখানে?’ প্রশ্নটা উঁকি দিল তার মনে।
শিমুল এক ধ্যানে তাকিয়েই রইল।
শিউলি জলদি নিজের মাথায় ওড়না টেনে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। শিউলির মনে তখন তার বাবার মারের জন্য কোনো ভয় কাজ করছে না এক অদৃশ্য শক্তি তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শিউলি দরজাটা ধীরে খুলে বেরিয়ে আসলো। পায়ে জুতো নেই। সে দৌড়ে গেল বাড়ির পেছনে।
সেখানে শিউলি ফুল গাছটার নিচে শিমুল ভাই দাঁড়িয়ে। লোকটার পরনে লুঙ্গি আর ছাইরঙা শার্ট। শিউলি একদম শিমুল ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শিউলির হৃৎস্পন্দন দ্রুতলয়ে উঠানামা করছে। কিন্তু তার চোখ সরাতে পারছে না শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকে।
শিমুলের এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে তার তৃষ্ণা মিটে গেছে। এতক্ষণ ধরে তার মানে শিউলিকে দেখারই তৃষ্ণা পেয়েছিল। শিমুল কোনো দিন এতক্ষণ একই ভাবে পলকহীন শিউলির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেনি, কিন্তু আজ ছেলেটা পলকহীন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের দু’জনেরই চোখ এক বিন্দুতে সীমাবদ্ধ।
অনেকক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর শিউলি ধীর কণ্ঠে বলল,
“শিমুল ভাই… এত রাতে এখানে কেন আসলে?”
শিমুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই বলল,
“জানি না, শুধু জানি ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল। তোকে দেখবার তৃষ্ণা।”
শিউলির মনে হচ্ছে সে যেন স্বপ্নে দেখছে। সে মনে মনে দোয়া করছে, ‘আল্লাহ, এটা স্বপ্নও যদি হয়, তাহলে এই জনমে যেন এই স্বপ্ন না ভাঙে।’ কিন্তু এটা সত্যিই বাস্তব। শিমুল ভাইয়ের মনও শিউলির ভালোবাসায় রঙিন হচ্ছে।
বসন্তকালে যেমন ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি, আজ এই মধ্যরাতে রঙিন হয়ে উঠল দুজন মানব-মানবীর মন। জোৎস্নার আলোকছটায় তাদের মুখে যেন এক মুগ্ধতা খেলা করছে।
শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে, এখন যদি একবার শিমুল ভাই ভালোবাসার কথা বলত!
শিমুল বসহজ সরল কন্ঠে বলল,
“শিউলি, আমার এহন রাইতে ঘুম আইয়ে না। খালি দেখবার মন চায় তোরে। আমার কোন অসুখ হইলো?”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের সাগরের মতো গভীর চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“একই রোগের রোগী তো আমি নিজেই শিমুল ভাই। কী করে তোমার প্রশ্নের জবাব দিই?”
তখনি হঠাৎ কিছু একটার শব্দ শুনে শিমুল ও শিউলি দুজনেই থমকে তাকাল। দেখল, একটি বিড়াল দ্রুত দৌড়ে চলে গেল। এই সামান্য শব্দেই তাদের স্বপ্নের ঘোর কাটল।
শিমুল এবার বলল,
“শিউলি, ঘরে যা। তোর আব্বা দেখে নিলে তোরে আবারও মারব।”
শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে না যাওয়ার জন্য, তবুও না গিয়ে উপায় নেই। এমন একটি দিনের অপেক্ষা শিউলি কত রাত করেছে! একবার যদি শিমুল ভাই নিজ থেকে আসত! একবার যদি শিমুল ভাইকে দেখত! সেই ইচ্ছে পূরণ হলো আজ। এর চেয়ে সুখের আর কী হতে পারে! এই হৃদয়ে এত সুখও কি সইবে?
তাদের মন ভরা এই ভালোবাসার পরশ কি সফল হবে? দুটি নিষ্পাপ ফুলের কি মিলন ঘটবে…?
#চলবে…
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১০
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
সকাল অনেকটা হয়েছে। বারান্দার গ্রিল গলে মিষ্টি রোদ উঁকি দিয়েছে ঘরের ভেতরে। নরম উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে বিছানার চাদরে।
ঠিক তখনই মিলির ডাকে শিউলি থরফরিয়ে উঠে বসল। হাতের তালু দিয়ে চোখ ঘষে মিলির দিকে তাকাল। মেয়েটি তখন হাসছে।মিলি বলল,
“কী আপু! তুমি রাতে আমাদের তাড়াতাড়ি শুয়ে তাড়াতাড়ি ওঠার জন্য বললে। আর তুমি এখন এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছো?”
শিউলি ঘোর কাটাতে পারছিল না। সে জিজ্ঞেস করল,
“কয়টা বাজে?”
“দশটা।”
শিউলি চোখ বড় বড় করে তাকাল। দশটা বেজে গেছে! অথচ রাতেই সোহাগ আর মিলিকে সে সকাল সকাল ওঠার কথা বলেছিল। আর নিজেই কিনা এতক্ষণ ঘুমাল! না ঘুমিয়েই বা কী করবে! এত রাতে ঘুমাতে গেছে, তার ওপর আজকের ঘুমটা হয়েছে অনেক ভালো গভীর ও তৃপ্তিদায়ক।
রাতের স্মৃতি মনে পড়তেই শিউলির মুখে এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। মধ্যরাতের সেই গোপন সাক্ষাৎ, শিমুল ভাইয়ের সহজ স্বীকারোক্তি, আর তার পলকহীন মুগ্ধ চাহনি সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।
শিউলির মুখে হাসি দেখে মিলি জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো আপু, হাসছো কেন? আর শোনো, ব্রেকফাস্ট আমরা সেই কখনোই করে নিয়েছি। তুমিও এবার উঠে খেয়ে নাও। তারপর আমরা গ্রাম ঘুরতে যাব।”
শিউলি বালিশের পাশ থেকে ওড়না জড়িয়ে উঠে দাঁড়াল।
রুম থেকেই সবার প্রথম মুখামুখি হলো সোহাগের। ছেলেটা টি-শার্ট পরে আছে। শিউলি পাশ কাটিয়ে চলে গেল কলের পাড়ে।
সোহাগ তাকিয়ে রইল শিউলির দিকে। মেয়েটার ভ্রুর পাশেই একটা ব্রণ হয়েছে। যার কারণে গতরাতের চেয়ে আরও বেশি সুন্দর লাগছিল। মেয়েটার মুখে আলাদা একটা মায়া আছে বলেই সোহাগের মনে হয়। মনে হয়, মেয়েটাকে সৃষ্টিকর্তা কোনো দিক থেকেই কমতি রাখেননি।
সোহাগ নিজের মাথায় আলতো করে একটা চড় দিয়ে মনে মনে বলল, ‘উফফ, এভাবে তাকিয়ে থাকিস না। নজর লেগে যাবে।’
হঠাৎ পেছন থেকে মিলি বলে উঠল,
“কী হয়েছে ভাইয়া? কুচ তো ডাল মে কালা হ্যায়।”
এরকম কথায় সোহাগ চমকে পেছন ফিরল। মিলি দাঁড়িয়ে হাসছে। মিলি’কে দেখে রেগে বলল,
“চুপ থাক তুই! বেশি বুঝিস।”
★★★
শিউলি, সোহাগ, আর মিলি তিনজন বাড়ি থেকে বের হলো। মিলি বায়না ধরল, সে প্রথম শিমুলদের বাড়ি যাবে। তাই সবার প্রথমে শিমুলদের বাড়িতেই ঢুকল তারা।
আছিয়া খাতুন তখন উঠোনে বসে নকশি কাঁথা সেলাই করছিলেন। তিন জনকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“শিউলি, তোর লগে ওরা কারা?”
“চাচি, ওরা আমার খালাতো ভাই আর খালাতো বোন। শহর থেকে এসেছে।”
মিলি গিয়ে শিমুলের মায়ের পা ছুঁয়ে অতি-নম্রভাবে সালাম করল। শিউলি, সোহাগ দুজনেই অবাক। সাথে আছিয়া বেগমও অবাক হয়ে পা পেছনে সরিয়ে নিলেন।
শিউলি মনে মনে ভাবছিল, ‘এসব কী! এই মেয়ে কি পাগল হলো! মিলি তো এমন মেয়ে নয়!’
আছিয়া বেগম বাঁধা দিয়ে বললেন,
“এসব করছোটা কী মা? আমাকে সালাম করছো কেন?”
মিলি মিষ্টি করে হেসে বলল,
“এমনি আন্টি।”
শিউলি মিলিকে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী সমস্যা তোর? এরকম এত ভালো সাজছিস কেন? আর তুই তো সালাম করার মতো মেয়ে না!”
মিলি হাসি দিয়ে বলল,
“আপু, পরে তোমাকে একসময় বলব।”
শিউলি হয়তো কিছুটা হলেও বুঝতে পারছিল মিলির আচরণে কী চলছে, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করল না।
আছিয়া খাতুন বললেন,
“তোমরা বোসো। কিছু না খেয়ে যাবে না।”
শিউলি মিষ্টি হেসে বাঁধা দিল, “না চাচি, এখন যাই। পরে একসময় আসব।”
বলেই তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।।তারা তিনজন হাঁটছে। আর মিলি বারবার জিজ্ঞেস করছে, ‘এটা কী?’, ‘ওটা কী?’ এর মাঝে একবার জিজ্ঞেস করে বসল,
“শিমুল ভাই কোথায় আপু?”
হঠাৎ শিউলি রেগে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকাল। শিউলির এমন চাহনি দেখে মিলি ঘাবড়ে গেল। সে এমন কী করল, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মিলি তোতলিয়ে বলল,
“ক… কী হয়েছে আপু?”
শিউলি একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের রাগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“শিমুল ভাই বলে ডাকবি না। ডাকলে শুধু ভাইয়া ডাকবি।”
শিউলির রাগের কারণ মিলি বুঝতে পারল না। এতক্ষণ হাসি-খুশি থাকা মেয়েটা চুপ করে গেল। সে যে শিউলির কথায় কষ্ট পেয়েছে, তা শিউলি ঠিক বুঝতে পারছিল। মিলি একদম নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।
শিউলি মনে মনে অনুতপ্ত হলো। এই পর্যন্ত এতটা কড়া ভাষায় সে কখনো মিলির সাথে কথা বলেনি। কিন্তু কী করবে! অন্য কেউ ‘শিমুল ভাই’ বলে ডাকলে তার হিংসা হয়। এতটাই হিংসা যে মনে চায় গলা চেপে ধরতে!
শিউলি মিলির দিকে তাকাল। শিউলি মিলির একদম কাছে ঘেঁষে জিজ্ঞেস করল,
“রাগ করেছিস?”
মিলি শুধু দুইদিকে মাথা নাড়াল। শিউলি আবারও বলল,
“বোকা! অভিমান করার কী আছে? শিমুল ভাই তো তোর থেকে অনেক অনেক বড়, তাই শুধু ভাইয়া বলে ডাকবি।”
সাথে সাথে মিলির মন ভালো হয়ে গেল। সে বলল,
“ও আচ্ছা, ঠিক আছে।”
সোহাগ নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাঁটছে। মিলি কিছুটা এগিয়ে এগিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটা ভীষণ খুশি। অবশ্য খুশি হওয়ারই কথা। এরকম সুন্দর প্রকৃতিতে কে খুশি না হয়েই বা পারে! আর যদি সেটা হয় বসন্তকাল, তাহলে তো কথাই নেই।
সোহাগ শিউলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“Your village is very very beautiful.”
শিউলি হেসে বলল, “হুম।”
সোহাগ আবারও শিউলির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“সাথে তুমিও অনেক সুন্দর। গ্রামের মেয়েরাও যে এতটা সুন্দর হতে পারে, তা তোমাকে না দেখলে বুঝতামই না।”
শিউলি এবারের কথায় হাসল না। সোহাগের থেকে এরকম প্রশংসা শুনলে যে কেউ খুশি হতো। শিউলিও হয়তো খুশি হতো, তবে সেটা একমাত্র শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকেই। শিউলি বলল,
“আপনি জানেন না বা দেখেননি, সেটা আপনার ব্যর্থতা। তবে আমার থেকেও অনেক সুন্দর সুন্দর মেয়ে পল্লীর আনাচে-কানাচে পড়ে থাকে। কিন্তু তাদের রূপের প্রশংসা করার মতো কেউ নেই।”
★★★
শিউলিরা গ্রাম হেঁটে চলছে, আর তার চোখ খুঁজে ফিরছে শিমুল ভাইকে। কিছুটা দূরে যেতেই দেখল লোকটা শিমুল ফুল গাছটার নিচে বসা।
শিমুল ভাইকে দেখেই মেয়েটার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
তাদেরকে দেখে শিমুল উঠে দাঁড়াল। সোহাগের সাথে গতকালই শিমুলের কথা হয়েছে।
সোহাগ শিমুলের হাতে হাত রেখে বলল,
“কী অবস্থা? কেমন আছেন?”
“হুম, ভালা। আপনে কেমন আছেন?” শিমুল তার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষ্যমতে বলল।
দুজন এক সাথে গল্প শুরু করল। সোহাগ ছেলেটা ভীষণ মিশুক, আর শিমুল ভাইও মিশুক অনেক। শিউলি তাকিয়ে রইল শিমুল ভাইয়ের মুখপানে। গতকাল রাতের স্মৃতি মনে পড়তেই তার মন চাচ্ছে যেন এখনি নেচে ওঠে।
বেশ কিছুক্ষণ শিমুল ফুল গাছের তলায় বসে রইল তারা।
মিলি আবার বলল,
“চলো, এবার যাই। দুপুর হয়ে আসছে তো!”
এবার তারা উঠে দাঁড়াল।
সোহাগ আর শিউলি এক সাথে কথা বলতে বলতে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তাদের থেকে কিছুটা পেছনেই শিমুল ও শিউলি হাঁটছে।আজ শিমুল ভাইয়ের মুখে হাসি দেখা যাচ্ছে, তবে সেটা আড়ালেই।
শিউলি বলল,
“শিমুল ভাই, এভাবে হাসছো কেন?”
শিমুল সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল,
“কই না তো! কই হাসছি?”
“আজও কি যাবে আমাদের বাড়ির পেছনে?”
শিমুল শিউলির দিকে তাকাল, আবারও মুখ ফিরিয়ে নিল। কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“আমি তোরে দেখবার লাইগা তোগোর বাড়ির পেছনে যাই নাই?”
“তাইলে কেন গেছিলা?”
“তোগোর বাড়ির পেছনে একটা চোর দেখছিলাম, তাই গেছিলাম।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের কথার পরিপ্রেক্ষিতে হেসে উঠল। শিমুল শিউলির হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। শিমুল ভাই অবাক নয়নে তাকিয়ে রইল। ‘কী অদ্ভুত! আমার মনে তো এরকম ঝড় কখনোই উঠত না। তাহলে এখন কেন এমন হইতেছে?’ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল।
হঠাৎ শিমুল ভাই বলে উঠল,
“জানিস, তোর হাসিটা ভয়ংকর সুন্দর। মনে হয়, তোর হাসির দিকে তাকাইয়া একটা জনম পার করা যাইব।”
কথাটা বলেই শিমুল থমকে গেল। ‘আমি ক্যান এমন কইলাম? কী কারণে কইলাম?’
শিউলির হাসি থেমে গেল। সে ততক্ষণাৎ শিমুলের দিকে তাকাল। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই কথাটা তার শিমুল ভাই বলছে তো! শিউলি বলল,
“তাহলে বিয়ে করে নাও। সবসময় আমার হাসি দেখতে পারবে।”
শিমুল যেতে যেতেই বলল,
“ক্যান তোরে আমি বিয়া করমু?”
শিউলির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার কণ্ঠ থেকে বিস্ময় ঝরে পড়ল,
“ক্যান করবা মানে? তুমি আমারে ভালোবাসো না?”
শিমুলের পা থেমে গেল। সে ঘুরে দাঁড়াল।
“তোরে কহন কইলাম তোরে ভালোবাসি আমি?”
শিউলি কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“ক্যান ভালোবাসো না আমারে? আমার মাঝে কী নাই? কোন দিক দিয়ে কমতি আছি আমি?”
শিমুলের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। শিউলির ভীষণ কান্না পেল। এই দুই দিন যতটা আনন্দ পেয়েছে, এখন ঠিক ততটাই কষ্ট পাচ্ছে।
“আসলে তোমরা পুরুষ মানুষ মেয়ে মানুষের মন নিয়া খেলতে খুব ভালো পারো। যদি ভালো না বাসো, তাহলে এত দরদ দেখাও ক্যান? গতকাল ক্যান এত মিষ্টি মিষ্টি কথা কইলা? তুমি ভালোবাসা বোঝো না এই কথাটা মানতে আমার ভীষণ কষ্ট হইতাছে।” বলেই শিউলি দৌড়ে চলে গেল।
শিমুল পেছন থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তার মাঝে ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। এতটাই যন্ত্রণা, মনে হচ্ছে মাথা ফেটে যাবে। তার মাথায় একটা প্রশ্নই ঘুরছে, ‘আমি ভালোবাসি শিউলিকে? গতকাল ক্যান শিউলিরে দেখবার লাইগা এত মন ছটফট করছিল?’ কিন্তু এখন আর ওইরকম অনুভব হচ্ছে না।
#চলবে…
