#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১১
লেখনীতে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি নিজের পড়ার টেবিলে বসে আছে, সামনে বই খোলা। পড়তে একদমই ইচ্ছে হচ্ছে না, তবে না পড়েও উপায় নেই। আগামীকাল কলেজে ক্লাস টেস্ট আছে, তাই পড়তেই হবে।
বারবার শিমুল ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। তখন ঠিকই রাগ করে চলে এসেছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তার রাগ করাটাই ভুল ছিল। কারণ, শিমুল ভাই তো এরকমই সরল।
‘আমাকে সবার প্রথম শিমুল ভাইকে ভালোবাসা কী তা বোঝাতে হবে। আমি জানি শিমুল ভাই আমাকে ভালোবাসে, কিন্তু সেটা শিমুল ভাই নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না।’ শিউলি মনে মনে ভাবল।
শিউলি আবার পড়ার মাঝে মনোযোগ দিল।
পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে শিউলি পেছন ফিরল। দেখল সোহাগ দাঁড়িয়ে। শিউলি সোহাগকে দেখে বলল,
“বসুন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
সোহাগ বিছানার একদিকে বসল। সে শিউলির বইয়ের দিকে নজর দিয়ে বলল,
“বাংলা সাহিত্য পড়ছো, ভালো।”
শিউলি ‘হুম’ বলল। সোহাগ হয়তো কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। শিউলি বুঝতে পেরে বলল,
“কিছু কি বলবেন?”
সোহাগ তোতলিয়ে বলল,
“ন…না, মানে আসলে…”
শিউলি ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে বলল,
“না মানে আসলে কী?”
সোহাগ তার পকেট থেকে একটি পারফিউম বের করে শিউলির দিকে এগিয়ে দিল।
শিউলি পারফিউমটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এটা কী?”
“পারফিউম।”
“সেটা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি পারফিউম। কিন্তু আমাকে কেন দিচ্ছেন?”
সোহাগ শিউলির কথায় ধীরে কণ্ঠে বলল,
“এই পারফিউমটা আমার ফেভারিট। এখানে আসার সময়ই কিনেছিলাম। এখনো ব্যবহার করিনি। তাই ভাবলাম তোমাকে গিফট করা যাক।”
শিউলি হেসে উঠে দাঁড়াল। সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“কেন, আমার শরীর থেকে কি দুর্গন্ধ আসে যে আমাকে পারফিউম গিফট করতে হবে?”
শিউলির কথায় সোহাগের মুখটা নিচু হয়ে এলো। হয়তো সে কিছুটা অপমান বোধ করল। সে বলল,
“না না, তেমন হবে কেন? আমরা তো কাজিন, তাই ভাবলাম…”
সোহাগের কথা শেষ করতে দিল না শিউলি। তার আগেই স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
“ক্ষমা করবেন। এত দামি পারফিউমের দরকার নেই আমার। এমনিতেও আমি পারফিউম ব্যবহার করি না। তাই আশা করছি বুঝতে পেরেছেন আমি কী বললাম।”
সোহাগ হালকা হাসার চেষ্টা করে পারফিউম হাতে নিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
শিউলি আবারও পড়ার টেবিলে বসে পড়ল।
★★★
শিমুল চৌকির উপরে বসে আছে। দুই হাঁটু ভাঁজ করে হাঁটুর মাঝে থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে। দৃষ্টি তার বাইরের দিকে নিবদ্ধ। ছোট জানালা দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের জোৎস্না ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে। ছোট জানালা দিয়ে চাঁদটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শিমুল চাঁদটার দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
বারবার শিউলির কথাগুলো কানে বাজছে ‘ক্যান ভালোবাসলা না আমারে শিমুল ভাই?’ এই কথাটা যেন বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে।
তখনি আছিয়া খাতুন ঘরে প্রবেশ করলেন। ছেলেকে এভাবে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে তিনি ছেলের পাশে বসে তার উসকো চুলগুলোতে আঙুল বুলিয়ে দিলেন। মমতাময়ী কণ্ঠে বললেন,
“কী হইছে বাপজান? মন ভালা না?”
শিমুল মায়ের দিকে মাথা তুলে তাকাল। শিমুল মাথা উপর-নিচ নাড়াল, যার মানে ‘হ্যাঁ’।
আছিয়া বেগম আবার জিজ্ঞেস করলেন,
“ক্যান মন ভালা না?”
শিমুল মায়ের উরুর ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। এখন শোয়া অবস্থায় চাঁদটা আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছে। শিমুল চাঁদটার দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,
“আম্মা, শিউলি আ্যইজ আমার উপর রাগ কইরা বাড়িত চইলা গেছে।”
আছিয়া খাতুন ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
“ক্যান রাগ করছে? তুই নিশ্চয়ই কিছু উল্টাপাল্টা কইছোস। শোন বাপজান, শিউলিরে এভাবে কষ্ট দিস না। মেয়েটা বিরাট ভালা। এরকম মাইয়া গ্রামে এক-দুইটা পাওন যাইতো না।”
শিমুল ভাই আছিয়া বেগমের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
“আইচ্ছা আম্মা, তুমি কারে ভালোবাসো?”
আছিয়া খাতুন হেসে বললেন,
“আমার এই জীবনে তুই ছাড়া কেডা আছে? তোরে ছাড়া যে দুনিয়াই অন্ধকার। তাই তোরে ছাড়া আর কারে ভালোবাসমু!”
শিমুল উঠে বসল। সে বলল,
“নিজের মানুষরেই কি শুধু ভালোবাসোন যায়? বাইরের মানুষরে কি ভালোবাসোন যায় না?”
“ক্যান যাইব না! তোর বাপ তো বাহিরের মানুষ আছিল, তাও তো তারে ভালোবাসছি।”
শিমুল আর কিছু বলল না। আছিয়া বেগম শিমুলের গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মায়ের বলা কথাগুলো শিমুলের সরল মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে লাগল। ‘তোর বাপ তো বাহিরের মানুষ আছিল, তাও তো তারে ভালোবাসছি।’ এই কথাটার অর্থ কী?
শিমুল এতদিন ভালোবাসা বলতে শুধু মা-বাবার, বা নিজের স্বজনদের সম্পর্ক বুঝত। কিন্তু শিউলির জন্য তার যে আকুলতা রাতে ঘুম না আসা, তাকে না দেখলে বুক ফেটে যাওয়ার ভয়, আর শিউলির চলে যাওয়ায় যে তীব্র কষ্ট এগুলো কোন সম্পর্কের বাঁধনে পড়ে?
হঠাৎ শিমুলের মনে হলো, শিউলি ঠিকই বলেছিল। সে হয়তো ভালোবাসা বোঝেই না, তাই এই অনুভূতিকে ‘অসুখ’ ভেবেছিল। কিন্তু তার মা যা বললেন, সেই তীব্র টান, সেই আকুতি সেটা তো সে শিউলির জন্যই অনুভব করছে!
‘আমি তাইলে শিউলিরে ভালা পাই!’ এই কথাটা শিমুলের মনে প্রথম বারের মতো পরিষ্কারভাবে এলো।
★★★
শিউলি ও মিলি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা শুয়েও পড়েছে। শিউলি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল এক ধ্যানে। ঘুম আসছে না। অনেকটা সময় পার হয়ে গেল এভাবেই। এতক্ষণে মিলিও ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশের রুম থেকে আওয়াজ আসছে হয়তো তার খালা, মা, বাবারা আলাপ করছেন। আজ আবার সোহাগের বাবাও এসেছেন। আগামীকালই তারা আবারও শহরে ফিরে যাবেন। এই কারণে আজ হয়তো এতক্ষণ পর্যন্ত আলাপ করছেন।
শিউলি বিছানা থেকে উঠে বসল। বাথরুমে যেতে হবে।
দরজা খুলতে যাবে, তার আগেই মনে হলো ভেতরে তাকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে হয়তো। শিউলি বিস্মিত হলো এখন এতটা রাত করে তাকে নিয়ে কী কথা হতে পারে! শিউলি দেওয়াল ঘেঁষে মাথা রাখল শোনার জন্য।
ভেতরে সোহাগের বাবা মাসুদ ইদ্রিস খন্দকারকে বললেন,
“ভাইজান, আমরা চাচ্ছিলাম আপনাদের সাথে আরেকটা নতুন করে আত্মীয়তা করতে।”
শিউলির মা জাবেদা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“মানে?”
জুলেখা বেগম হেসে বললেন,
“মানে বলতে চাচ্ছি, সোহাগের সাথে শিউলির বিয়ে দিয়ে আমরা বোন থেকে বেয়াইন হয়ে যাব।”
সাথে ইদ্রিস খন্দকার বললেন,
“বাহ্, এটা তো ভালো প্রস্তাব। এমনিতেও সোহাগও অনেক ভালো ছেলে।”
এসব শুনে শিউলি যেন থমকে গেল। হচ্ছেটা কী এসব! আমার বিয়ে নিয়ে আলাপ হচ্ছে! এখন আমি কী করব! আব্বাকেও তো বোঝাতে পারব না! শিউলি নিজের পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পাচ্ছে না। শিউলি দেওয়াল ঘেঁষে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। দু’হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখ ঢাকল।
তার কণ্ঠস্বররুদ্ধ ভাবনাগুলো এক নীরব চিৎকার হয়ে উঠল,
‘এখন কী হবে! শিমুল ভাই, তুমি কবে বুঝবে আমাকে? কবে নিজের মনের কথাকে প্রশ্রয় দিবে তুমি?’
★★★
শিউলি কলেজের পথ ধরল। তার মাথা থেকে এখনো রাতের কথাগুলো বের হয়নি। বিয়ের আলোচনা তাকে ভেতর থেকে অস্থির করে রেখেছে।
সকালে সোহাগের সাথে দেখা হলো, লোকটাকে ভীষণ খুশি খুশি মনে হচ্ছিল। হয়তো ওই লোকটাও জানে বিয়ের ব্যাপারে। খালা আর তার আম্মা ভীষণ মিষ্টি গলায় কথা বলছিলেন। কয়েকবার শিউলিকে তাদের সাথে বসতে বলেছিলেন। শিউলি জানে, তাদের সাথে বসলেই তারা বিয়ের কথাটাই বলবে, তাই আর শিউলি বসেনি। সে সোজা কলেজ যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেছে।
শিউলি কলেজের পথ ধরল। কলেজের রাস্তার পাশেই একটি বড় এক বিঘার মতো জমি রয়েছে।এই জমিটা ইদ্রিস খন্দকারের নিজের। সেটিতে ফসল চাষ করা হয়। হঠাৎ শিউলির চোখ গেল জমিতে হালচাষ দেওয়া শিমুল ভাইটির দিকে। ছেলেটা রোদের মাঝে হালচাষ করছে।
আজ সত্যি সত্যি শিউলির রাগ হলো। ‘মানুষ বোকা হয়, কিন্তু এরকম বোকা মানুষ জীবনে দেখিনি।’ শিউলি মনে মনে শিমুলের উপর ক্ষুব্ধ হলো।
সে জোরে চিৎকার করে ডাকল,
“শিমুল ভাই, এদিকে আয়ো!”
শিউলির ডাক শুনে শিমুল ভাই এগিয়ে আসলো। শিমুল ভাই এগিয়ে আসতেই শিউলি রাগী কণ্ঠে বলল,
“তোমার সমস্যাটা কী শুনি? তোমারে কত কইরা বললাম, মানুষের জমিনে কাজ করবা না, তবুও ক্যান কাজ করতাছ, হুঁহ? তুমি আসলেই একটা বলদ (নির্বোধ)। মানুষ শুধু শুধু কি তোমারে বলদ কইয়া ডাকে!”
শিউলির চোখ-মুখে ও কথাতে একদম স্পষ্ট রাগ। এতটা কড়া ভাষায় এই প্রথম হয়তো শিমুলের সাথে কথা বলছে সে।
শিমুল শিউলির মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা কষ্ট পেয়েছে শিউলির কথায়। শিমুল ভাইয়ের চোখে জল চিকচিক করছে।
শিমুল ভাইয়ের চোখ জল দেখে শিউলির মনে হলো, তার ভেতরটা মুচড়ে উঠেছে। শিমুল ভাইয়ের চোখে জল! এটা কি শিউলি সহ্য করতে পারে? শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে, নিজের গালে নিজেই কয়েকটা চড় লাগিয়ে দিতে।
শিউলি নিজের গলা তুলনামূলক থেকেও বেশি নরম করে বলল,
“শিমুল ভাই, তুমি ক্যান বোঝো না? সবাই তোমাকে কাজ করিয়ে নেয় বিনা পারিশ্রমিকে। তোমার কষ্ট হয় না বলো? অন্যের কাজ তুমি ক্যান করবা? অন্যরা কি তোমাকে দু’মুঠো ভাত দেয়? দেয় না তো, তবুও ক্যান করো?”
শিমুল মাথা তুলে বলল,
“এটা তো তোর বাপেরই জমি, তবু ক্যান এমুন করতাছোস?”
শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনোভাবেই লোকটাকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে না।
“সেটা আমার বাপের জমি হোক বা অন্য কারো, সেটা বিষয় না। পৃথিবীতে সব কাজেরই একটা পারিশ্রমিক থাকে। মানুষ কাজের বিনিময়ে টাকা দেয় অথবা অন্য কোনো বস্তু দেয়। কিন্তু তোমারে তো ওরা কিছুই দিব না, তবুও ক্যান কাজ করবা বলো।”
শিমুল ভাই হয়তো শিউলির কথার মানেটা কিছুটা হলেও বুঝল। শিউলি এবার করুণ কণ্ঠে বলল,
“শিমুল ভাই, এবার তুমি বুঝদার হও। তোমার যে সামনে খুব বড় দায়িত্ব নিতে হবে। যদি তুমি সে দায়িত্ব না নাও, আমি ধ্বংস হয়ে যাব। আমি শেষ হয়ে যাব।”
শিউলি কিসের ‘দায়িত্বের কথা’ বলল, তা শিমুলের সাধারণ মাথায় ঢুকল না।
শিউলি আবারও বলল,
“এখনি বাড়িত যাও। আর কোনো দিন অন্যের কাজ করবা না। যদি কাজ করতেই হয়, তাহলে তার পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করবা। বুঝছো?”
শিমুল মুচকি হেসে বলল,
“হ, বুঝছি। এহন থাইকা কারো কাজ করমু না। শুধু আমি আমার নিজেদের কাজ করমু।”
শিউলিও হাসল শিমুল ভাইয়ের মুখপানে চেয়ে। কী সুন্দর শিমুল ভাইয়ের স্নিগ্ধ হাসি!
#চলবে
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১২
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
আগের মতো আজও তামিম শিউলির পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। শিউলির ভীষণ রাগ হচ্ছে এমনিতেই আছে চিন্তায়, তার মাঝে এই তামিমের উগ্র ঝামেলা!
তামিম সিগারেটে টান দিয়ে বলল,
“কী শিউলি, কয়েকদিন ধরে কলেজে যাচ্ছো না যে?”
শিউলি রাগী কণ্ঠে বলল,
“সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে না।”
“আমার কাছে দিবে না মানে, সুইটহার্ট? তাহলে আর কার কাছে দিবে শুনি?”
“প্লিজ, আমার পথ ছাড়ুন। ভালো লাগছে না আপনার এসব ফালতু প্যাঁচাল।”
তামিম শিউলির চারপাশে ঘুরে বলল,
“ওকে, ফালতু প্যাঁচাল শুনতে হবে না। আমার সাথে প্রেম করো, একটু ভালোবাসো।”
শিউলি চক্ষু লাল করে তাকিয়ে বলল,
“আপনার মতো ছেলেকে দুনিয়ার কোনো মেয়েই ভালোবাসবে না। আপনার মতো খারাপ বখাটে ছেলে গ্রামে একটা আছে?!”
শিউলির এই অপমানজনক কথাও তামিমকে থামাতে পারল না।
“ওকে, সুইটহার্ট, আমাকে ভালোবাসতে হবে না। বিয়ে করে নাও আমাকে। বিশ্বাস করো, রানী করে রাখব তোমায়।”
শিউলি বরাবরের মতোই বিরক্ত হচ্ছে।
“প্লিজ রাস্তা ছাড়েন, আমি যাই।”
তামিম বলল,
“ওকে, ঠিক আছে যাও। তবে আর মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা সময় তোমার কাছে। তারপর তুমি সিদ্ধান্ত দিবে। যদি তারপরও আমার কথায় রাজি না হও, তাহলে পরেরটা আমি করব।” বলেই তামিম বাঁকা হাসল।
শিউলি তামিমের দিকে তাকাল। লোকটাকে এই পর্যন্ত ভালো করে দেখা হয়নি। লোকটার মুখে চাপ দাড়ি। গোঁফটা ঘন। শ্যামলা গায়ের রং। দেখতে তো মাসাআল্লাহ, তাহলে কাজকাম এরকম অস্তাগফিরুল্লাহ কেন! শিউলি মনে মনে ভাবল।
শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“কী করবেন যদি আমার সিদ্ধান্ত না পাল্টায়?”
“সবকিছু বলে দিলে তো শেষই। তাহলে সাসপেন্স থাকবে কী? বরং পরেই দেখে নিও আমি কী করতে পারি।”
শিউলি আর কথা বাড়াল না। চলে এল। শিউলি পিছনে ফিরল না, তবে বুঝতে পারল তামিম তাকিয়ে আছে তার দিকে।
★★★
সোহাগরা আজ বিকেলে শহরে ফিরে যাবে। সকলেই রেডি। উঠোনে দাঁড়িয়ে তারা সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।
জুলেখা বেগম শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ভালো থাকিস মা। আর ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করিস। ছোটবেলা থেকেই ঠিক করে খাস না। শরীরের দিকে দেখ তো, শরীরটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।”
শিউলির ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে আজ অথচ তার খালা তার পছন্দের একজন। ছোটবেলা থেকে কত আদর করেছেন। অথচ আজ এত অস্বস্তি লাগছে, তার কারণ হয়তো বিয়ের আলোচনাটাই।
এবার জুলেখা বেগম নিজের আঙুলের পরা ফুলের ডিজাইন করা আংটিটা শিউলির আঙুলে পরিয়ে দিতে চাইলেন। শিউলি সাথে সাথে বাঁধা দিল,
“কী করছো খালা! আংটি খুললে কেন?”
পাশ থেকে জাবেদা বেগমও বললেন,
“হ্যাঁ রে জুলেখা, এসবের কী প্রয়োজন? এসব দেওয়ার দরকার নেই।”
জুলেখা বেগম বললেন,
“আমার যা, সব তো শিউলিরই হবে। তাহলে আজকে দিলে কী সমস্যা?”
পাশ থেকে সোহাগ কখন থেকে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। সোহাগের বাবা আর ইদ্রিস খন্দকার তারা আগেই বেরিয়ে গেছেন বাড়ি থেকে, গাড়ি আটকাতে হবে তাই।
আজ মিলিকে ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। এমনিতে তো মেয়েটা একদম হাসি-খুশি থাকে।
জুলেখা বেগম শিউলির কথা না শুনে আংটিটা পরিয়েই দিলেন। আর বললেন,
“আংটি একদম খুলবি না। মনে কর, এটা তোর খালার দেওয়া শুধুমাত্র গিফট, আর কিছুই না।”
শিউলি আর কিছু বলল না। তারা সকলে বাড়ির বাইরে বের হয়ে গেল। শিউলিও বের হতে চাইলে পেছন থেকে সোহাগ ডাকল,
“শিউলি..!”
শিউলি পিছন ফিরে তাকাল। বলল,
“জ্বি, বলুন।” শিউলির চোখ মাটির দিকে নিবদ্ধ।
সোহাগ বলল,
“শহরে গিয়ে তোমার কথা খুব মনে পড়বে। মাঝে মাঝে কল দিব, কথা বলবে তো!”
শিউলি সোহাগের কথায় কোনো প্রত্যুত্তর করল না।
সোহাগ আবারও বলল,
“নিশ্চয় জানো, তোমার সাথে আমার বিয়ের কথা হয়েছে।”
শিউলি মাথা উপর-নিচ নাড়াল, যার মানে সে জানে। আজ কলেজ থেকে ফেরার পরই তার মা বিয়ের কথাটা সরাসরি বললেন।
সোহাগ শিউলিকে চুপ থাকতে দেখে বলল,
“তুমি কি আমার ওপর বিরক্ত?”
শিউলির ইচ্ছে হলো বলে দিতে ‘আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। আমি অন্য কাউকে আমার মন বিলিয়ে দিয়েছি।’ কিন্তু পারল না বলতে কথাটা।
সোহাগ বলল,
“আচ্ছা, এখন যাচ্ছি। কিছুদিন পর আবারও আসব। কারণ, তোমাকে এতদিন না দেখে থাকাটা আমার জন্য কেন, কোনো পুরুষই পারবে না।”
শিউলি বলল,
“খালা আপনাকে ডাকছেন, যান।” শিউলি কথাটা বলল সোহাগের থেকে বাঁচার জন্যই।
সোহাগ হেসে বলল,
“আল্লাহ হাফেজ।”
সকলেই রাস্তা ধরেছে।মিলি তাকিয়ে আছে শিমুলদের বাড়ির দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় শিউলি লক্ষ্য করল, মিলি কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে। শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে মিলি? কোনো অসুবিধা? সকাল থেকে দেখছি কেমন মনমরা হয়ে আছিস?”
মিলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর হঠাৎ তার মাকে বলে উঠল,
“আম্মু, আমি শহরে ফিরে যাব না।”
এরকম হঠাৎ কথাটা শুনে সকলেই মিলির দিকে বিস্ময়ে তাকাল। শিউলি বেশ খানিকটা অবাক হলো। জুলেখা বেগম বললেন,
“কেন, কী হয়েছে? যাবি না কেন?”
“আসলে আম্মু, আমি গ্রামে কয়েকদিন থাকতে চাই।”
সোহাগ বলল,
“থাকবি মানে? তোর স্কুল আছে না? তাহলে তুই থাকবি কী করে?” সোহাগ শাসনের স্বরে বলল।
মিলি বায়না করল, “প্লিজ ভাইয়া, থাকি না!”
জাবেদা বেগম বললেন,
“হ্যাঁ, থাকুক না কিছুদিন গ্রামে। তারপর না হয় সোহাগকে পাঠিয়ে দিস, এসে নিয়ে যাবে।”
শেষ পর্যন্ত মিলিকে রেখেই সকলে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। শিউলি শুধু তাকিয়েই রইল মিলির দিকে। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের মনের ভাব পড়া না গেলেও শিউলি বুঝতে পারল মিলির মনে শিমুল ভাইকে নিয়ে দুর্বলতা কাজ করছে।
★★★
পাশের বাড়ির শমসের চাচা শিমুলকে দেখেই ডাক দিল,
“শিমুল! অ্যাই শিমুল, এদিকে আয়।”
শিমুল তার ডাক শুনে কাছে গিয়ে বলল,
“কী হইছে চাচা? কও কী কইবা?”
তিনি বেশ আদেশের স্বরে হুকুম করলেন,
“নে তো, এই ব্যাগটা বাড়িত দিয়া আয়।”
হাতে থাকা বাজারের ব্যাগটা শিমুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন কথাটা।
শিমুল গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“পারুম না আমি। নিজের জিনিস নিজে লইয়া যাও।”
শিমুলের মুখ থেকে এমন কথা শুনে যেন শমসের মিয়া আকাশ থেকে পড়লেন। তার বিস্ময়ে মুখ হাঁ হয়ে উঠল!
“এডা কীরে! ভূতের মুখে রাম রাম! আজ কী হইলো তোর? মুখের ওপর না করোস?”
শিমুল এবার আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তো না করমু না তো কী করমু? অনেক কাটাইছো
আমারে। এহন থাইকা অন্য জনের কাম আর কইরা দিমু না আমি। নিজের কাম নিজে করো।”
শিমুলের মুখের উপর না করে দেওয়া শমসের মিয়া রেগে গেলেন। তিনি হাত উঁচু করলেন শিমুলের গালে চড় মারার উদ্দেশ্যে। শিমুল ভয়ে ঘাবড়ে গেল, চোখ বন্ধ করে নিল।কিন্তু পরক্ষণে যখন বুঝতে পারল চড় এসে গালে পড়ল না, তখন সে চোখ খুলে দেখল শমসের মিয়ার হাত রাগে ধরে রেখেছে শিউলি। শিউলির চোখে ক্রোধ স্পষ্ট।
শমসের মিয়া রেগে শিউলিকে বললেন,
“অ্যাই মাইয়া, অ্যাই! তুমি আমার হাত ক্যান ধরলা? এত বড় সাহস তোমার?”
“তার আগে আপনি বলেন, কোন সাহসে আপনি শিমুল ভাইয়ের দিকে হাত উঠান?”
শিউলি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে মারল। শিউলির এরকম কথায় শমসের মিয়া থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি বললেন,
“হাত তুলি আর যাই করি, তাতে তোমার কী মাইয়া?তুমি কডা শিমুলের হ্যা?মেম্বারের মাইয়া হইছো বইলা যা মন চায় তাই করবা?”
শিউলি আরও নিজের কণ্ঠে তেজ বজায় রেখে বলল,
“আমি যাই হই না কেন, সেটা কোনো বিষয় না। আপনি কোন অধিকারে হাত তুলবেন? আপনার কাজ করে দেয়নি বলে? যদি তাই হয়, তাহলে শিমুল ভাই একদম ঠিক কাজ করেছে। কেন সে আপনাদের কাজ করে দিবে? আর কোনো দিন শিমুল ভাইয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস দেখাবেন না, তাহলে এর পরিণতি ভয়ানক হবে, বলে দিলাম!”
শমসের মিয়া শিউলির সাথে কথা বলে না পেরে শেষমেশ বললেন,
“এত পড়াশোনা কইরা এসব শিখতাছো? বড়দেরকে সম্মান করতে পারো না! ছিহ্!”
বলেই শমসের মিয়া হনহন করে জায়গা ত্যাগ করলেন। শমসের মিয়ার কথায় শিউলির হাসিই পেল। এই লোকগুলো এরকমই যখন কথায় হারাতে পারবে না, তখন পড়াশোনার দোহাই দেবে।
শিমুল শিউলির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অবাক নয়নে। শিমুল বলল,
“ক্যান শুধু শুধু ঝামেলা করতে গেলি?”
“শুধু শুধু মানে? আর তুমি তো দেখছি এখনো বোকাই রয়ে গেলে! ওরা তোমার গায়ে হাত তোলার সাহস কী করে দেখায়? তুমি কিছু বলতে পারো না?”
শিমুল কণ্ঠস্বর স্থির করে বলল,
“কইলাম দেখেই তো মারবার আইলো।”
“এখন থেকে মারতে আসলে তুমি প্রতিবাদ করবে। ঠিক আমি যেভাবে প্রতিবাদ করলাম।”
শিমুল বলল,
“আইচ্ছা, তাই করুম।”
শিউলি হেসে বলল, “হুঁ, তবে তুমি যে কাম করবা না সেটা না করেছো, সেটা দেখে সত্যিই অনেক ভালো লাগছে।”
শিমুল শিউলির কথায় হাসল। শিউলি আবারও বলল,
“সবসময় এভাবেই প্রতিবাদ করবা। জানোই তো, বিড়াল নরম জায়গাতে কামড়ায় বেশি। শক্ত হতে শেখো।”
শিমুল আর শিউলি দু’জন এক সাথে রাস্তা ধরল। শিমুল সব বলতে বলতে যাচ্ছিল। আজ সকাল থেকে সে কী করেছে, সব কিছু শিউলির সাথে বলল শিমুল ভাই।
#চলবে…
