#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৩
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
বসন্ত বিকালের শেষ লগ্নে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছে শিউলি আর শিমুল। সূর্য পশ্চিমের ঘন গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে।
শিউলি আর শিমুল সেই মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পায়ে পায়ে তাদের নরম মাটির গুঁড়ো উড়ছে, সেই ধুলো বিকেল বেলার সোনালী আলোয় চিকচিক করছে। পথটি বাঁক খেয়ে দূরে একটি আম গাছের দিকে চলে গেছে। গাছটিতে তার ডালপালা জুড়ে নতুন পাতার সবুজ আভা এবং মকুল চোখে পড়ছে।
বাতাসে মেশানো আলাদা মিষ্টি গন্ধ। সেটা হয়তো ধানের গোলায় রাখা সদ্য কাটা খড়ের গন্ধ, নয়তো দূরে কোথাও ফোটা কোনো বুনো ফুলের।
ডান পাশে যতদূর চোখ যায়, সবুজ সরষের ক্ষেত। আর বাঁ পাশে একটি ছোট পুকুর, সেখানে জল স্থির। হাঁটতে হাঁটতে শিমুল একটা ছোট নুড়ি(পাথরখন্ড) তুলে সামনের দিকে ছুঁড়ে দেয়।
আজকের বিকেলটা শিউলির কাছে প্রতিদিনের থেকে বেশিই সুন্দর মনে হচ্ছিল। তার কারণ হয়তো শিমুল ভাই সাথে থাকার জন্যই। আজ শিউলির ভয় নেই তার বাবা গঞ্জে যাবেন, আসতে আসতে অনেকটাই রাত হবে। মিলিকে বলে-কয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে আগেই।
শিউলি শিমুল ভাইয়ের পানে চাইল। ছেলেটার উসকো চুলগুলো বাতাসে অভিরাম নড়ছে। পরনে নীল রঙা একটা সাধারণ শার্ট আর বরাবরের মতো লুঙ্গি, পায়ে কোনো জুতো নেই। শিউলির পরনে সালোয়ার কামিজ আর মাথায় ওড়না টানা।
শিউলি এতক্ষণে মুখ খুলল, বলল,
“শিমুল ভাই, প্রতিটা বিকেল তোমার সাথে এভাবে কাটানোর এক আকাশ সমান ইচ্ছে আমার। তুমি পারবে না আমার সেই ইচ্ছেটা পূরণ করতে?”
শিমুল শিউলির দিকে তাকিয়ে অমায়িক হাসল, বলল,
“হুম, পারুম।”
শিউলি শিমুলের থেকে ‘হ্যাঁ’ উত্তর আশা করেনি,সে ভেবেছিল হয়তো বরাবরের মতো আজও শিমুল ভাই ‘পারব না’ বলবে। শিউলির হাসিটা আরও প্রসারিত হলো।
শিমুল ভাই শিউলিকে অবাক করে দিয়ে বলল,
“আইচ্ছা শিউলি, আমি যদি বিয়া করি, তাইলে বউরে খাওয়াইমু কী?”
শিমুলের কথায় শিউলি তার দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি দিল। শিমুল ভাই পেছনে দুই হাত বেঁধে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিউলি বলল,
“কেন, ভাত খাওয়াবে।”
“ভাতই তো খাওয়ামু, সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু ভাত দিতে গেলেও তো ট্যাকা লাগব। ট্যাকা কই পামু?”
“ওহ, আচ্ছা এই কথা। তুমি চাইলে কাজ করতে পারো।”
শিমুল দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“তাইলে কালকের থাইকা পাশের বাড়ির রমজানের লগে টাউনে যামু কাজ করবার লাইগা। ওইখানে ইটের কলায় (brick kiln) কাজ করলে ভালা ট্যাকা পাওন যায়।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের পানের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। লোকটা এখন নিজের ভালো নিজেই বুঝতে শিখছে। তবে শিউলির মনে মনে ভাবছে, লোকটা কি তার ভালোবাসা বুঝতে পেরেছে, নাকি এমনিই শুধু বিয়ের কথা বলল? তবে শিউলি আজ তার মনকে প্রশ্রয় দিল না। তার শিমুল ভাই নিজের ভালো বুঝছে, সেটাই বড় কথা।
শিউলি হেসে বলল,
“আচ্ছা, তাহলে আগামীকাল সকাল থেকেই যেও।”
শিউলি জানে, ইট ভাঙার কাজ করা বিরাট কষ্টের। এমনি সময় হলে শিউলি কাজ করতে যেতে না করে দিত। কারণ, শিমুল ভাইয়ের কষ্ট হলে মেয়েটা কি নিজেকে স্থির রাখতে পারবে! কিন্তু এখন না করার উপায় নেই। বড়জোর এক-দেড় মাস বিয়ের ডেট পিছিয়ে রাখতে পারবে, তার বেশি দিন বিয়ের তারিখ পিছিয়ে রাখতে পারবে না শিউলি। সে না চাইলেও বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে। তাই এই ক’দিনে শিমুল ভাইকে বুঝদার বানাতে হবে।
শিউলি চেয়েও শিমুল ভাইকে বিয়ের কথা বলতে পারল না এই ভয়ে যে, যদি শিমুল ভাই বলে ‘বিয়ে করে নে’, তাহলে সেই কথা শিউলি সহ্য করতে পারবে না। সে চায়, শিমুল যেন ভালোবাসার সম্পূর্ণ অর্থ বুঝে তবেই তার হাত ধরে।
শিউলি এসব ভাবতে ভাবতেই যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল তার পাশে শিমুল ভাই নেই। এতটাই ভাবনার জগতে চলে গিয়েছিল যে, কখন শিমুল ভাই তার পাশ থেকে সরে গেল, টেরই পেল না।
শিউলি এদিক-সেদিক চোখ বুলিয়ে দেখল পুকুর ঘাটের ওই পার থেকে শিমুল ভাই আসছে হাতের মুঠোয় করে কিছু নিয়ে। শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
শিমুল দৌড়ে এসে শিউলির সামনে দাঁড়াল। ছেলেটা হাঁপাচ্ছে, দৌড়ে যাওয়া-আসার কারণেই হয়তো।
শিউলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শিমুল ভাই নিজের কণ্ঠ কোমল করে শিউলির দিকে মুঠো করা হাতটা খুলল। হাতের মুঠোয় দেখা গেল সাদা রঙের এক মুঠো শিউলি ফুল।
শিমুল ভাই গভীর আবেশে বলল,
“তোরে দেওনের মতোন আমার কাছে কিছু নাই রে শিউলি। এই এক মুঠো শিউলি ফুলগুলো আমার শিউলিরে দিতে চাই। নিবি তো?”
শিউলি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নিজের চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শিউলির গলা কাঁপছে, কিছু বলতে পারছে না। তার শিমুল ভাই তাকে ফুল দিচ্ছে এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে!
শিউলি দু’হাত বাড়িয়ে দিল। শিমুল ভাই শিউলির হাতে পরম নরম ভাবে ফুলগুলো দিয়ে দিল।
তারা হেঁটে যাচ্ছে, তবে শিউলির চোখ এক মুহূর্তের জন্য অন্য দিকে সরছে না। শিউলি হঠাৎ কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“মানুষ মায়ায় পড়ে চোখের, সৌন্দর্যের, ব্যক্তিত্বের… আর আমি মায়ায় পড়েছি শিমুল ভাইয়ের কণ্ঠের, সরলতার, বোকামির।”
★★★
শিউলি বাড়ির কাছে গিয়েই দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির পেছনে। হয়তো তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। শিউলি পেছনে তাকিয়ে দেখল, শিমুল ভাই এতক্ষণে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছেন। শিউলিকে দেখে মিলি এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আপু, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
“কেন, কী হয়েছে?”
“হয়নি কিছু। অনেকক্ষণ ধরে বাড়িতে বসে ছিলাম একা, ভালো লাগছিল না তাই।”
শিউলি হেসে বলল, “আচ্ছা, চল বাড়ির ভেতরে যাই।”
মিলির চোখ গেল শিউলির হাতের শিউলি ফুলের দিকে। মিলি জিজ্ঞেস করল,
“আপু, শিউলি ফুল কোথা থেকে আনলে? আর তোমাকে আজ বেশ খুশি মনে হচ্ছে!”
শিউলির হাসি আরও গভীর হলো। বলল,
“একজনে দিয়েছে।”
মিলি জিজ্ঞেস করল, “কে দিছে?”
ততক্ষণাৎ মিলির মনে পড়ল সে শিউলিকে শিমুলের সাথে আসতে দেখেছে। তার মানে কি শিমুল দিয়েছে? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মিলির মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। মিলি আরও ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কে দিছে আপু? শিমুল ভাই… না মানে ভাইয়া দিছে?”শিউলি মিলির প্রশ্নের উত্তর দিল না। শিউলি বলল,
“চল, বাড়ি চল। পরে একদিন বলব।”
মিলি আর কথা বাড়াল না। দুজনেই বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।বাড়ির ভেতর ঢুকেই দেখল ফুলঝুরি কান্না করছে। ফুলঝুরিকে কান্না করতে দেখে শিউলি এগিয়ে গিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“কী হয়েছে পটলকুমারীর?”
’পটলকুমারীর’ ডাক শুনলেই ফুলঝুরি আরও রেগে যায়। সে কান্নার গতি বাড়িয়ে দিল আরও।
শিউলি চাপা হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, তো বলো ফুলঝুরি, কী হয়েছে?”
“আম্মা মারছে!”
শিউলি জিজ্ঞেস করল, “কেন মারল?”
ফুলঝুরি কিছু বলার আগেই জাবেদা বেগম এগিয়ে এলেন। রাগী কণ্ঠে বললেন,
“কিছুক্ষণ আগে পড়াতে বসেছিলাম। কিন্তু ওনার এক কথাপড়বে না। এখন বল, এটারে মারব না তো কী করব?”
ফুলঝুরি কেঁদে বলল, “পড়তাম না আমি। আমি এই বাড়িত থাকুম না।”
ফুলঝুরির কথা শুনে মিলি আর শিউলি দুজনেই হেসে দিল। জাবেদা বেগম রাগী কণ্ঠে শুধালেন,
“পড়াশোনা করবি না তো কী করবি? বিয়ে বসবি নাকি?”
“হ, বিয়া বসমু।”
জাবেদা বেগম তেড়ে গেলেন ফুলঝুরির গায়ে হাত তোলার জন্য। ফুলঝুরি গিয়ে শিউলিকে জড়িয়ে ধরল। শিউলি জাবেদা বেগমকে আটকিয়ে বলল,
“থাক আম্মা, বাদ দাও। ছোট মানুষ।”
জাবেদা বেগম রাগে চলে গেলেন ঘরে। যেতে যেতে বললেন,
“বড়ডারে দেইখ্যা দেইখ্যা ছোটুডার এই হাল!”
মায়ের কথা শুনে শিউলি হেসে উঠল। বড় মেয়ে হলে এই এক জ্বালা ছোটগুলো কিছু করলেই দোষ এসে পড়বে বড়দের ঘাড়ে।
★★★
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘরে যেতে চাইলেই জাবেদা বেগমের ফোনে কল আসল। কলটা জাবেদা বেগমই তুললেন। তিনি কিছুক্ষণ হাসি মুখে কথা বললেন। তারপর তিনি মিলির কাছে দিয়ে বললেন সোহাগ কল দিছে, কথা বল।
মিলি হাসি মুখে তার ভাইয়ের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে গেল। একপর্যায়ে সোহাগ জিজ্ঞেস করল,
“শিউলি কোথায়?”
মিলি শিউলির দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে হেসে বলল, “এখানেই আছে। কথা বলবা?”
সোহাগ বলল, “হুঁ, দে।”
তার মাঝে শিউলি এসব লক্ষ্য করে হাত ইশারা করে না করতে লাগল তার কাছে দেওয়ার জন্য, কিন্তু মিলি শুনল না। মোবাইলটা দিয়েই চলে গেল।
শিউলি মোবাইলটা ধীর হাতে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসল, “হ্যালো।”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “জ্বি।”
“কেমন আছো?”
“জ্বি ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো তাদের মাঝে। সোহাগের কথার প্রত্যুত্তরে শিউলি শুধু ‘হুঁ’, ‘হ্যাঁ’ উত্তর দিয়েছে। সোহাগ এক পর্যায়ে বলল,
“শিউলি, আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার সাথে কথা বলতে ডিস্টার্ব ফিল করছো।”
শিউলি সোহাগের কথায় উত্তর দিল না। ওপাশ থেকে সোহাগ আবারও বলল,
“কিছুদিন পরই তো আমাদের বিয়ে, তাহলে এখন কথা বলতে সমস্যা কী?”
শিউলি চোখ বন্ধ করে নিল। এই বিয়ের কথা শুনলেই যে তার মাথা গরম হয়ে যায়, সেটা সে কী করে বোঝাবে!
শিউলি বলল,
“জ্বি, বিয়েটা হয়নি আগে হতে দিন নাকি! আর আমার আগামীকাল ক্লাস টেস্ট আছে। আশা করি, আমার কথা বুঝতে পারছেন আমাকে পড়তে হবে।” বলেই শিউলি কল কেটে দিল।
শিউলি দুই হাত মাথায় দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। সে বুঝতে পারছে, এই বিয়ে নিয়ে বিশাল বড় ঝামেলা হবে। এসব ঝামেলা হওয়ার আগেই শিমুল ভাইকে বুঝদার বানাতে হবে।
#চলবে…
#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৪
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
ফজরের আযান দিচ্ছে। শেষ আযানের সাথে সাথেই শিউলির ঘুম ভেঙে গেল। শিউলি নিজের চোখ হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঘষে চোখ মেলল। পাশেই মিলি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
শিউলি বিছানা থেকে নেমে বাইরে বের হতেই দেখল উঠানের সাইটের বৈদ্যুতিক বাতিটা অন করা। হেঁটে আসতে দেখা গেল ইদ্রিস খন্দকারকে। তিনি নামাজের অজু করেই আসছেন। শিউলিকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“এত তাড়াতাড়ি উঠলি?”
“নামাজ পড়তে উঠলাম আব্বা।”
মেয়ের কথা শুনে ইদ্রিস খন্দকার দারুণ হেসে বললেন,
“হুম, প্রতিদিন এভাবে নামাজ পড়বি।”
বলেই তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন।
এখন এতটা ঘন অন্ধকার নেই। অনেকটা আলোকিত হয়েছে। শিউলি অজু করে এসে নামাজ পড়ে নিল। আজ জাবেদা বেগম বাড়ি নেই। গতকাল সন্ধ্যার পরই খবর আসল জাবেদা বেগমের ভাই মানে শিউলির মামা অসুস্থ। তাই রাতেই ইদ্রিস খন্দকার জাবেদা বেগমকে পৌঁছে দিয়ে আসলেন। তিনি রাতে বাড়ি ফিরে আসেন, কারণ মেয়েরা বাড়িতে একা।শিউলি প্রতিদিন এত তাড়াতাড়ি উঠে না, বা উঠলেও নামাজ পড়েই আবার শুয়ে পড়ে। তবে আজ শিউলি শুয়ে পড়ল না।
আজ শিমুল ভাই প্রথম কাজে যাবে। তার উদ্দেশ্য শিমুল ভাইয়ের জন্য কিছু রান্না করবে আলাদাভাবে। আজ মা-ও বাড়িতে নেই, তাই কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ারও প্রয়োজন নেই যে কার জন্য রান্না করবে।
শিউলি রান্নাঘরে ঢুকল। কোথায় কী রাখা, তা তার জানা নেই। সবকিছু একে একে খুঁজে বের করল।
তারপর মাটির উনুনে আগুন ধরিয়ে রান্না বসাল। মৃদু আঁচে রান্না হচ্ছে, আর সেই ভোরের আলো-আঁধারিতে শিউলির মন ভরে আছে এক নীরব ভালোবাসায়। আজ শিমুল ভাইকে ভালোভাবে খেয়ে কাজে যেতে হবে এই ভাবনাতেই তার সব মনোযোগ।
★★★
শিমুল গোসল করে এসে মাথার চুল নিজের গামছা দিয়ে মুছে নিচ্ছে। এখন বাজে সকাল সাড়ে ছ’টা। আছিয়া বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। খুব তাড়াতাড়ি রান্না করছেন তিনি। তার ছেলে কাজে যাবে শুনে তিনি খুবই খুশি। এতদিনে ছেলেটার মাথায় একটু সুবুদ্ধি আসছে এটাই অনেক বড় কথা।
শিমুল হাঁক দিয়ে ডেকে বলল,
“আম্মা, রান্না হইছে?”
আছিয়া বেগম বললেন, “হ, শ্যাষ। আনতাছি।”
আছিয়া বেগম ভাত নিয়ে এলেন। বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে খাবার দিয়ে দিলেন। শিমুল বলল,
“তুমিও খাইয়া লও আম্মা।”
“তুই খা। আমার কাম আছে। আর কিছু লাগলে ডা দিস।”
বলেই তিনি আবারও রান্নাঘরে চলে গেলেন।
শিমুল মাথা নিচু করে খেতে আরম্ভ করল।
শিমুলের খাওয়া শেষ হলে হাত ধুয়ে উঠতে নিলেই দেখল শিউলিকে। শিমুল হেসে জিজ্ঞেস করল,
“কী রে শিউলি, এত সকাল সকাল আমাদের বাড়িত?”
শিউলি শিমুলের সামনে ফাঁকা মাদুরে বসে পড়ল। হাতের থাকা ওড়না দিয়ে ঢাকা প্লেটটা বের করে শিমুলের সামনে রেখে বলল,
“হুম, তোমার জন্য পায়েস রান্না করেছি।”
শিমুলের চোখে-মুখে বিস্ময়! শিউলির চোখে তখন গভীর মমতা। তার ভালোবাসার মানুষটি আজ কঠিন কাজে যাচ্ছে, তাই এই উপহার এই ভাবনাতেই শিমুলের হৃদয় ভরে উঠল এক অদ্ভুত আবেশে। এই পায়েস শুধু খাবার নয়, এই হলো শিউলির ভালোবাসার প্রথম নৈবেদ্য।
শিমুল পায়েসের বাটির দিকে তাকিয়ে খুশিতে হাসল। শিমুলের পায়েস ভীষণ প্রিয়। শিউলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাচি রান্না করছে?”
শিউলি ডানে বামে মাথা নাড়াল, যার অর্থ ‘না’।
শিমুল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কেডা?”
শিউলি নিজের মুখে একটু মিথ্যা রাগী অভিমান ফুটিয়ে বলল, “ক্যান, আমি কি রান্না করতে পারিনা? আমি সব পারি বুঝলে!”
শিমুল হাসি মুখে এক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
“উফফ! কী বানাইছিস রে শিউলি! এত মজা পায়েস খাইতাছি নাকি অমৃত!”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের থেকে প্রশংসা শুনে ভীষণ খুশি হলো। শিমুল ভাই খেতে খেতে বলল,
“তোর স্বামী বড় ভাগ্যবান হইব।”
শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“কীভাবে?”
“তোর হাতের এত মজার রান্না খাইতে পারব। আর তোর মতো ফুলরে পাইব।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সহসা বলে উঠল,
“তোমারে পাইলেও যে এই আমিও ভাগ্যবতী হবো।”
শিমুল শিউলির কথাটা ঠিক করে শুনতে পারল না। বলল, “কী কইলি?”
শিউলি হেসে দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, “কিছু না।”
শিউলি ততক্ষণ সেখানেই বসে রইল যতক্ষণ পর্যন্ত শিমুল ভাইয়ের খাওয়া শেষ না হয়। খাওয়া শেষ হলে শিউলি প্লেট নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলে উঠল,
“শিমুল ভাই, সাবধানে কাজ কইরো। শিমুল ফুলে আঘাত লাগলে, বুঝে নিও কোনো এক স্থানে শিউলি ফুলটাও ব্যথায় কুঁকড়াচ্ছে।”
বলেই শিউলি দ্রুত চলে গেল। শিমুল ভাই তাকিয়ে রইল শিউলির যাওয়ার পানে। আর বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“এত্ত ভালোবাসার দাম কি তোরে দিতে পারুম আমি?”
★★★
মিলি দাঁড়িয়ে আছে শিউলি আর শিমুলদের রাস্তাটার ধারে। গতকাল শিউলি বলেছিল, আজ থেকে শিমুল কাজে যাবে। মিলি দাঁড়িয়ে রইল এক ধ্যানে তাকিয়ে শিমুলদের বাড়ির দিকে। লোকটা একবার বের হলে, একটা বার দেখার উদ্দেশ্য।
এই ছোট্ট পঞ্চদশী (পনেরো বছর বয়সী) মেয়েটা যে সেই শিমুল নামক পুরুষটাকে ভালোবেসে ফেলেছে। তখনি দেখা গেল শিমুলকে আসতে। মিলি এগিয়ে গিয়েই শিমুলের পথ আটকে দাঁড়াল। মিলিকে দেখে প্রথমে অবাক হলেও ততক্ষণাৎ শিমুল বলল,
“তুমি এইখানে কী করো?”
“কিছু না। আপনাকে দেখতে আসছিলাম।”
শিমুল একটু ঘাবড়ে গেল। বলল,
“আমারে…! ক্যান?”
মিলি কালক্ষেপণ করল না। সোজা ভাবেই বলে বসল,
“আমার আপনাকে ভীষণ ভালো লাগে। আই রিয়েলি লাভ ইউ।”
এতটুকু ইংরেজি বোঝার ক্ষমতা শিমুলের আছে। শিমুল ভাই মিলির কথা শুনে চোখ পাকিয়ে তাকাল। কণ্ঠে রাগ মিশ্রিত গলায় বলল,
“কী কইতাছো তুমি? ভাইবা কইতাছো তো!”
মিলি ধীর কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, আমি ভেবেই বলছি।”
“তোমার বয়স কত মাইয়া? মাত্র চোদ্দ-পনেরো বছরের মাইয়া হইয়া এসব কইতাছো?”
শিমুল ভাইয়ের কথা শুনে মিলির হাসিটা গায়েব হয়ে গেল। মেয়েটা বলল,
“আপনি আমারে ভালোবাসেন না?”
শিমুল বলল,
“না…”
মিলির বুক ফেটে কান্না আসতে চাইল। শহরে কত কত ছেলে তার জন্য পাগল, আর গ্রামের একটা ছেলে তাকে রিফিউজ করল সেটা ভেবেই তার কষ্ট হচ্ছে। মিলি বলল,
“তাইলে আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন?”
শিমুল কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার চোখে ভেসে উঠল শিউলির সরল হাসিমাখা মুখটা। শিমুল বলল,
“হ, বাসি।”
মিলিও থমকে দাঁড়াল। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “কাকে? সে কেমন? আমার থেকেও সুন্দর?”
“সে এমন একজন যার গুণ বর্ণনা করা যাইব না। তার রূপ কোনো ফুলের লগে তুলনা করলেও কম হইয়া যাইব। কারণ সে নিজেই একটা ফুল, যে ফুল অমূল্যবান ।”
বলেই শিমুল দ্রুত জায়গা ত্যাগ করল। একটি বিধ্বস্ত চোখ তাকিয়ে রইল তার দিকে অসহায়ের মতো। মিলি কাঁপা পায়ে বাড়িতে ঢুকে গেল।
★★★
দুইতলা বিশাল বড় বাড়িটার সামনে দুটো চেয়ারে বসে আছেন সিদ্দিক ইকবাল, যিনি এলাকার চেয়ারম্যান। আর তার সামনে আরেকটা চেয়ারে বসা ইদ্রিস খন্দকার। সামনে থাকা চায়ের কাপটা থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে।
সিদ্দিক ইকবাল হাসি মুখে বললেন,
“ইদ্রিস সাহেব, গ্রামের জন্য কয়টা ঘর আসছে?”
ইদ্রিস খন্দকার মনে করে বললেন,
“এই তো, একান্নটা।
“বিশটা ঘর আমাদের দলের লোকদের দিয়ে দিবেন। আর বাকিগুলো গ্রামের লোকদের দিয়ে দিবেন।”
ইদ্রিস খন্দকার নীরবে মাথা নেড়ে ‘আচ্ছা’ বললেন।
হঠাৎ দেখা গেল তামিম হেঁটে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। সে সরাসরি প্রশ্ন করল,
“কেন, বিশটা নিজ দলের লোকদের দিবেন? আমার জানামতে, আমাদের দলের লোকদের ঘর এর আগেও দেওয়া হয়েছে। এখন আবার কেন?”
সিদ্দিক ইকবাল ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু ধমকের স্বরে বললেন,
“তোমাকে এসব বিষয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।”
তামিম বাবার ধমকের তোয়াক্কা না করেই বলল,
“কেন দরকার নেই? আমিও এই গ্রামেরই একজন বাসিন্দা। তাহলে অবশ্যই এই বিষয়ে প্রশ্ন করার দরকার আছে। আপনারা সরকার থেকে যেসব অনুমোদিত জিনিস আছে, তার বেশিরভাগ ভাগাভাগি করে দেন আপনাদের চামচাদের। আর তারা তা দরিদ্র মানুষের কাছে অর্ধেক মূল্যে বিক্রি করে! অথচ সেই দরিদ্র মানুষগুলো বুঝতেও পারে না তাদের জিনিসই তাদের কাছে বিক্রি করছে। আসলে আপনারা দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তাদেরই জিনিস ভোগ করেন!”
ছেলের এহেন কথায় সিদ্দিক ইকবাল হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, বললেন,
“তুমি কী বোঝো এসব বিষয়ে? সারাদিন তো বেকার ঘুরো!”
ইদ্রিস খন্দকারের মনে হলো, এই সময় এইখানে থাকা ঠিক না। তিনি বললেন,
“চেয়ারম্যান সাহেব, তাহলে আমি এখন যাই।”
ইদ্রিস খন্দকার অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন।
সিদ্দিক ইকবাল ছেলের দিকে তেড়ে গিয়ে বললেন, “বাইরের মানুষের সামনে আমাকে এভাবে বেইজ্জতি করার মানেটা কী?”
তামিম হেসে বলে উঠল,
“তোমার ইজ্জত থাকলে তো বেইজ্জতি করব! গিয়ে দেখো, যারা তোমাদের সামনে সামনে সালাম দেয়, তারাই তোমাদের পেছনে বাঁশ ঢুকায়।”
বলেই তামিম সামনে থাকা নিজের বাইকে চড়ে বসল। সিদ্দিক ইকবাল রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি রাগে পেছন থেকে অনেক কথাই শোনালেন, কিন্তু তামিম তা শোনার প্রয়োজন মনে করেনি। বাইকে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিল। তার উদ্দেশ্য কলেজের বাইরে গিয়ে শিউলিকে প্রতিদিনের মতো বিরক্ত করা।
তামিম কলেজের সেই টংয়ের দোকানের সামনে গিয়েই দাঁড়াল। তবে আজ আসতে দেরি হয়ে গেছে। এতক্ষণে কলেজের সকল স্টুডেন্ট কলেজের ভেতর ঢুকে গেছে। শিউলিকে দেখার জন্য এসেও দেখা না হওয়ায় তামিমের ভীষণ রাগ হচ্ছে। এরই মাঝে তার সকল বন্ধুরাও এসে গেছে।
তামিমের চোখ-মুখের ভাব দেখে এরশাদ নামক ছেলেটা বলল,
“কী ভাই তামিম? চোখ-মুখের এই অবস্থা কেন?”
তামিম বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে সিগারেট ধরিয়ে বলল,
“দূর! আজ শিউলির সাথে দেখা হলো না।”
“হয়তো আজ আসে নাই কলেজ।” এরশাদ বলল।
তামিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আসেনি বলছিস?”
এরশাদ বলল, “হতেও পারে। চল, এখানে দাঁড়িয়ে এখন লাভ নেই।”
তামিম বাঁধা দিয়ে বলল,
“না রে তোরা যা। আমি এখানেই দাঁড়াই, হয়তো শিউলি আসছে। ওরে না দেখলে ভালো লাগব না।”
এরশাদ এবং সাথের সকলেই এক জোট হয়ে হেসে উঠল। এরশাদ তামিমের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বাহ্ বাহ্! একদম প্রেমিক পুরুষ হয়ে গেলি দেখছি!”
তামিম হেসে বলল,
“কী আর করব বল! প্রেম যে খুব জ্বালাতন করে। ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় না, খেতে দেয় না।”
এরশাদ সহ বাকিরা চলে গেল। তামিম একই ভাবে গিয়ে কাঠের টেবিলে বসল। দোকানদারকে বলল, এক কাপ চা দিতে।
#চলবে…
