#বটবিবাহ (সমাপ্তি পর্ব)
#মৃধা_মৌনি
মীরু বসে রয়েছে বটগাছের গুড়ির উপর। গুটিশুটি দিয়ে, মাথার উপর ওড়না ঘোমটার মতো করে ঢাকা দেওয়া। শুধু তার মুখ বের হয়ে আছে। তাকে জ্বরে আচ্ছন্ন কোনো রোগীর মতো দেখাচ্ছে। শীতের কাপড় নেই। খালি পা। চোখজোড়া ঈষৎ লাল। তাকে দেখতে বড্ড ভয়ংকর লাগছে।
সে বিড়বিড় করে কথা বলছে।
নিজের সঙ্গে নয়, গাছের সঙ্গে।
‘কেমন আছ তুমি?’
বটগাছটি জবাব দিলো, ‘আমি ভালো আছি ছোট্ট মেয়ে। তুমি কি ভালো আছ?’
‘ভালো নেই। আমার শীত করছে।’
‘আমার ভেতর ঢুকে বসো ছোট্ট মেয়ে। তাহলেই আর শীত তোমায় কাবু করতে পারবে না।’
মীরু জুবুথুবু হয়ে আরও গুটিয়ে বসল। যেন সত্যি সত্যিই সে ঢুকে পড়তে চাইছে বটগাছটির ভেতরে।
‘তুমি আমাকে ছোট্ট মেয়ে বলছ কেন? আমি তো ছোট নই।’
‘আমার তুলনায় তুমি অনেক ছোট। ছোট না?’
‘হুঁ।’
‘যদি ছোট্ট মেয়ে সম্বোধনে তোমার আপত্তি থেকে থাকে, তবে আমি নাম ধরে ডাকতে পারি। তোমার নাম কি?’
মীরু অবাক হয়ে বলল, ‘যাকে বিয়ে করলে তার নাম জানো না?’
‘না জানি না। আমায় তো কেউ বলেনি। কেউ মতামত ও নেয়নি, এই বিয়ের ব্যাপারে। তোমার নিশ্চয়ই নিয়েছে।’
ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলল মীরু, ‘না, আমার মতামত নেয়নি। তবে বলেছে যে বিয়েটা হবে। এবং আমাকে রাজী হতে হয়েছে।’
‘তাহলে তো তোমার অবস্থান আমার অবস্থান খুব কাছাকাছিই বলতে পারো! আমি তো গাছ, আমার মতামত কেউ নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তুমি মানুষ হয়েও তোমার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব নেই। এটা অদ্ভুত।’
মীরু হাটুতে মুখ গুঁজে বলল, ‘অদ্ভুতের কিছু নেই। মাঝে মাঝে মানুষ গাছের চেয়েও বেশি অসহায়।’
‘সেটা কীভাবে?’
‘তোমার তো মুখ নেই। তুমি নাহয় কথা বলতে পারো না। কেউ তোমার পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গেলেও তুমি কিছুই বলতে পারবে না। গায়ে কোপ দিয়ে তোমায় ব্যথা দিলেও তুমি চিৎকার করতে পারবে না। বরং এক সমুদ্র ব্যথা নিয়ে তোমাকে স্থির হয়েই অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে মৃ ত্যু র। আমরাও মাঝে মাঝে এমনই অসহায় হয়ে পড়ি। আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কেউ কে ড়ে নিয়ে গেলেও তাকে কিছুই বলতে পারি না। সবচেয়ে দামী হৃদয়টাকে কেউ ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দিলেও আমরা চুপ থাকি। ভাঙা মনটাকে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি, একদিন নিশ্চয়ই সব ঠিক হয়ে যাবে এই আশায়।’
বটগাছটি বিমুগ্ধ গলায় বলল, ‘তুমি তো দারুণ বললে মীরু! কত গভীর কথাগুলি! বাহ..আমি তোমার প্রতি চমৎকৃত এবং মায়া অনুভব করছি।’
মীরু হাসল সামান্য, ‘ধন্যবাদ।’
‘ভয় করছে মীরু?’
‘প্রথমে করছিল, এখন করছে না।’
‘ভয় নেই, আমি আছি, আমি তোমাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছি। কোনো ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। ঘুমাও মীরু, তোমার চোখ বুঁজে আসছে।’
সত্যি মীরুর চোখ বুঁজে আসছে ঘুমে।
মনে হচ্ছে খুব সুখকর নিদ্রা হবে তার।
গায়ের উপর দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। শরীর বরফের মতোন ঠান্ডা। একটু একটু কাঁপছেও। মীরু গুড়ির উপরই গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়ল। আঁচলটা টেনে দিলো পুরো শরীরে। চোখ বন্ধ করল। গাছ গান ধরেছে। সুরেলা কণ্ঠস্বর,
ঘুম পাড়ানি মাসি-পিসি, মোদের বাড়ি এসো।
মীরুর মনে হলো, গানটি বটগাছ নয় বরং তার মা গাইছে। যেভাবে বেঁচে থাকা অবস্থায় প্রতি রাতে তাকে গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো মা, সেভাবেই।
একসময় মীরু গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
***
মনোয়ার সাহেব বিছানায় শুয়ে আছেন। তার গায়ের উপর মোটা কম্বল টেনে দেওয়া। ঘরের ভেতর হিটার চলছে। বিজবিজ জাতীয় আওয়াজ বের হচ্ছে তা দেখে। ঘড়ির টকটক শব্দ ও কানের ভেতর ঢুকে ব্রেইনে চুটকি মা র ছে। বড় অস্থির লাগছে তার। মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়বে যেন। মীরুর দুশ্চিন্তায় তিনি মুহূর্তের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
শিখাও চিন্তিত। এর ভেতরও ছোটাছুটি বন্ধ নেই তার। মনোয়ার সাহেবের দিকে খেয়াল রাখছেন। আবার মীরুর খবর নিয়ে এলো কিনা কেউ, সেটাও দেখছেন। মালী দু’জন দারোয়ানের সঙ্গে মিলে বেরিয়েছে এলাকাটা খুঁজে দেখতে। মীরুর বড় মামা গিয়েছেন থানায় সাধারণ ডায়েরি করে আসার জন্য। এছাড়াও গ্রামের একটা ছোট দল ইতিমধ্যেই খুঁজতে বেরিয়ে গেছে আশেপাশের গ্রাম গুলিতেও। কোথাও একটুখানি বাদ রাখা চলবে না।
শিখা নিঃশব্দ পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকলেন। মনোয়ার সাহেব ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘ঘড়ির পেনসিল ব্যাটারি গুলো খুলে দাও। কানে লাগছে।’
‘তোমার মাথা ধরেছে। তাই জন্য শব্দ কানে লাগছে। এত দুশ্চিন্তা করো না। কোথায়ই বা যাবে মীরু! নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে।’
শিখা ঘড়ি নামিয়ে ব্যাটারি গুলো খুলে নিতেই মাথার ভেতরের শব্দ কমে গেল। মনোয়ার সাহেব চোখ খুলে অসহায় ভঙ্গিতে তাকালেন।
‘ও আমার উপর অভিমান করেই চলে গেছে। আমি বলেছিলাম তোমাকে, ও আমাদের বিষয়টা পছন্দ করছে না। ও চায় না আমি তোমাকে… তুমি কেন সহজ জিনিসটাকে জটিল করতে চাইছ শিখা?’
শিখার চোখে পানি চলে এলো, ‘আমি জটিল করছি? আমি?’
‘তা নয়তো কি? মীরু কখনোই তার মায়ের জায়গায় কাউকে চায় না। আমি ওর মনের কথা বুঝতে পারি। কিন্তু তুমি কিছুতেই সেটা বুঝতে চেষ্টা করো না।’
‘তুমিও তো আমাকে বুঝতে চেষ্টা করছ না মনোয়ার। আপা মা রা যাওয়ার সময় আমার হাত ধরে বলে গেল..’
‘মীরুকে দেখে রাখতে। আমার পাশে দাঁড়াতে। তাই তো? তার মানে কি এই মীরুর আরেক মা হবে তুমি? আমার দ্বিতীয় স্ত্রী হবে? রিনা কি এসব বলে গিয়েছিল?’
শিখা কোনো কথা বলতে পারলেন না।
মনোয়ার শোয়া থেকে এবার উঠে বসলেন। বললেন, ‘মা হারিয়ে আমার মেয়েটা পাগল প্রায়। এর ভেতর ওর উপর কীসের কোন আছড় পড়ে একদম শেষ হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছ, কত ভাবে কত চেষ্টা করেও ওকে আমি পরিপূর্ণ সুস্থ করে তুলতে পারছি না। দু’দিন ভালো থাকে তো দু’দিন খারাপ। এর ভেতর তোমার এসব.. ভোর বেলায় তুমি আমায় হাগ করেছিলে, ও দেখেছে।’
শিখা চোখ মুছে ঘুরে দাঁড়ালেন, ‘ঠিক আছে। সব যেহেতু আমার উপরেই আসছে তখন আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, তোমাদের ভেতর আমি আর আসব না। আই প্রমিস। মীরুকে পাওয়া গেলে তোমরা ঢাকা চলে যাবে। আমি এখানেই থাকবো এবং বড় ভাইয়ের পছন্দের পাত্রকে হ্যাঁ ও বলে দিবো। অবশ্যই তোমরা আমার বিয়েতে আসবে এবং আমি হাসিমুখে মীরুর সঙ্গে আমার বিয়ের মুহূর্তটা এনজয় করব। মার্ক মাই ওয়ার্ড।’
শিখা বেরিয়ে গেলেন। মনোয়ার সাহেব স্থির দৃষ্টিতে তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঘড়ির কাঁটা স্থির হয়ে আছে দুটোর ঘরে। অর্থাৎ রাত গভীর। ভোরের দিকে এগিয়ে চলছে সময়। মীরুর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না পাক্কা চার ঘন্টা হতে চলল। কোথায় গেল মীরু! মনোয়ার সাহেবের হৃদয়টা পুনরায় মুচড়ে উঠল।
***
মীরুর ঘুম ভেঙেছে। ঘন্টা তিনেক ঘুমিয়েছে মাত্র, তাতেই মনে হচ্ছে কয়েক যুগ ধরে ঘুমিয়ে ছিল সে। আলস্য ভর করে আছে শরীরে। পিটপিট করে চোখের পাতা খুলতেই এক ঝাঁক আলো তার নিউরন কোষে গিয়ে আঘাত হানলো। মীরু ঝটপট চোখ বন্ধ করে নিলো। ব্যাপারটা কি হলো? সে চোখ বন্ধ রেখেই বোঝার চেষ্টা করল। মনে করতে লাগল, ঘুমাবার আগে কি কি হয়েছিল। এক গ্লাস দুধ খেয়ে নিজের ঘরে এসেছিল মীরু। তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে কুয়াশাছন্ন চারদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই তার মনটা বিষন্নতায় ভরে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ তাকে ডাকছে। খুব করুণ সুরে ডাকছে। সেই ডাক এড়িয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। মীরু যন্ত্রের মতো নিচে নেমে এসেছিল। এরপর আর কিছু মনে নেই। মীরু চোখ খুলল এবং প্রায় সাথে সাথেই কুৎসিত দেখতে একটা লোক ওর উপর থেকে মাথা সরিয়ে নিলো।
‘মাইয়ার জ্ঞান ফিরছে, জ্ঞান ফিরছে। আমার টোটকায় কামে দিছে। দেখছেননি, কেমনে ভূতে ধরা মাইয়ার জ্ঞান ফিরায়ে আনলাম।’
মীরু ভয়ে ভয়ে উঠে বসল। জড়সড় হলো। চারপাশে মাথা ঘুরিয়ে প্রায় বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেল। এটা সে কোথায়! আশেপাশে এত মানুষ কেন? ভোরের আলো কি ফুটে গেছে? আকাশ পরিষ্কার! তাকে একটা পাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। সামনে আগুনের কুন্ডুলি। ধোঁয়া এসে নাকে লাগছে। একটা কটু গন্ধ ছড়াচ্ছে। মীরু ভ্রু কুঁচকে ফেলল। সেই সঙ্গে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। কুৎসিত দেখতে লোকটার ভোটকা সাইজের মোচ, তাতে তা দিতে দিতে বলছে, ‘দেখছুন ভাইসব, দেখছুন আমার খমতা? সবাই তো ডরাইছিলা। আরে এইসব আমার বা হাতের কেলমা! এডিরে আমি পকেটে ভইরা রাখি। এই বেদ্দপ পিশাচ, সুরসুর কইরা এবার নিজের নাম ক। কোথ থেইকা আসছস আর কবে থেইকা এই মাইয়ার ভিত্রে ঢুকছস।’
মীরু বিস্মিত গলায় বলল, ‘আপনি কে? এসব কি বলছেন? আমাকে এভাবে এখানে…’
মীরু ঝটপট উঠে দাঁড়াল, ‘দেখুন, আমাকে বাড়ি দিয়ে আসেন প্লিজ। পাপা কোথায়। আমি বাড়ি যাবো।’
‘ন্যাকা কান্দা আমার সামনে দেহাবি না। তুই যে এই মাইয়ার ভিত্রে থাহা পিচাশ, এইটা আমি বুঝছি। আমার সামনে এইসব চলব না। চালু নিজের পরিচয় দে।’
‘আমার নাম মীরু। আমি ঢাকা থেকে পাপার সাথে দাদা বাড়ি আসছি। আমার দাদার বাড়ি আলেয়া কান্দায়। আপনি প্লিজ আমাকে সেখানে নিয়ে চলুন।’
‘চোপ… একদম চোপ! মিথ্যুক! আমার লগে বিটলামি? অভিনয়? অভিনয় তোর *** দিয়া…’
আগুনের ভেতর কিছু একটা গুড়ো ফেলতেই তার উত্তাপ বাড়লো। মীরুর দিকে ধেয়ে আসলো। মীরুর মনে হলো, শরীরটা বোধহয় জ্বলেই যাবে। সে ভয়ে কেঁদে ফেলল। হাত দুটো জোর করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানালো। কেউ শুনল না। বরং সবাই যেন তামাশা দেখছে, এমন ভঙ্গিতেই ভীড় আরও বাড়তে থাকল। সুন্দর শহুরে মেয়ে, বুকে কাপড় নেই, ভয়ে থরথর করে কাঁপছে- আহা এরচেয়ে উপভোগ্য জিনিস আর কি হয়? মীরুর মাথাটা ঘুরছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি সে পড়ে যাবে জ্ঞান হারিয়ে। তবু ভালো। এই কঠিন দুঃসময়ের হাত থেকে বাঁচা যাবে। মা বলত, বিপদের সময় মাথা আউলাতে নেই। শান্ত থাকতে হয়। কিন্তু মীরু শান্ত থাকতে পারছে না। তার সবটা আউলে যাচ্ছে। তার বড্ড ভয় করছে। বুক ভেঙে কান্না আসছে। মীরু অস্ফুটস্বরে শুধালো, পাপা…
***
মনোয়ার সাহেব মীরুর খবর পেলেন ঠিক বারো ঘন্টা পর, সকাল দশটা বাজে। গ্রামের একদল তরুণ, যাদের মীরুর বড় মামা খোঁজাখুঁজি তে লাগিয়ে দিয়েছিল, তারাই খবর এনে দিলো। মনোয়ার সাহেব তৎক্ষনাৎ গাড়ি নিয়ে ছুটলেন। মীরুর তখন ধরে প্রাণ আসে যায় দশা। কুৎসিত দেখতে লোকটি ভূত তাড়ানোর নামে তাকে আধমরা করে ফেলেছে। মনোয়ার সাহেব যখন পৌঁছুলেন, মীরু এক নজর তার মুখটি দেখেছে, তারপর পরই জ্ঞান হারিয়ে অচেতন হয়ে গেছে।
‘আপনার মাথা ঠিক আছে তো চাচা?’ অবিশ্বাস্য কণ্ঠ যুবকের, ঝাঁকড়া চুল কপালের উপর এসে পড়েছে, দেখলে মনে হবে সে কখনো চুল আঁচড়ায় না। ভাসা ভাসা চোখ দুটিতে বিস্ময় খেলা করছে। সে পুনরায় শংকিত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আপনার মতো মানুষ এসবে জড়ালেন কীভাবে..’
মনোয়ার সাহেব বড় ক্লান্ত বোধ করছেন। জবাব দিতেও ইচ্ছে করছে না। তিনি বসে রয়েছেন মীরুর মাথার কাছে, শিয়রে, মেয়েটা দু’চোখ বন্ধ করে রেখেছে। গায়ে তীব্র জ্বর, পুরো শরীর কেমন লালচে হয়ে উঠেছে। একটু সাড়লেই তিনি মেয়েকে নিয়ে শহরে চলে যাবেন। এই গ্রামে আর একদণ্ড নয়।
গ্রামের ওই তরুণদের মুখে শুনেছেন তিনি, সকাল বেলায় অজু করে মসজিদ যাবার সময় একদল মুরুব্বিদের চোখে পড়ে সর্বপ্রথম। বটগাছের নিচে মীরু ঘুমিয়ে ছিল। অস্বাভাবিক রকম কাঁপছিল তার পুরো শরীর। সেই সঙ্গে বিড়বিড় করে বলছিল কিছু। এমন দৃশ্য এ অঞ্চলে বিরল। সবাই ভয় পেয়ে যায়। সূর্য উঠার আগেই খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। উৎসুক মুখে এগিয়ে আসে সকলে। আসে ওই কুৎসিত মতো দেখতে লোকটিও, যিনি একজন তন্ত্রমন্ত্র বিদ্যায় পারদর্শী সাধক। সেই বলে, এই মেয়ে সাধারণ মেয়ে নয়, একে খুব খারাপ পিচাশ নিজের নিয়ন্ত্রণে করে রেখেছে।
মীরুর দু’হাত ভরে লালচে দাগ। কিছু দিয়ে আঘাত করেছে। হয়তো বেত বা লাঠি। মনোয়ার সাহেবের বুকের ভেতরটা পুনরায় মুচড়ে ওঠে। দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। আকস্মিক মনে হয়, রিনা তাকে কঠিন দৃষ্টিতে দেখছে এবং তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছে। মেয়ের এই পরিস্থিতির জন্য সেও তো দায়ী। রিনা চলে যাওয়ার সময় কথা দিয়েছিল মনোয়ার তাকে, মীরুকে যত্নে রাখবে। কই? তিনি তো কথা রাখতে পারছেন না। মীরুর আজ জীবন-মরণ দশা।
যুবকটি এসে মনোয়ার সাহেবের সামনে বসে। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে, ‘তুমি আমার দিকে তাকাও চাচা। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’
মনোয়ার সাহেব বিরক্ত মুখে তাকালেন, ‘আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না জুবায়ের। তুমি হয়তো বুঝতে পারছ।’
‘বুঝতে পারছি। কিন্তু না বললেও শুনতে হবে চাচা। মীরুর সমস্যার কথা মা আমাকে চাচী মা রা যাওয়ার কয়েকদিন পরেই প্রথম বলেছিল। তখন অবশ্য আমিও বুঝিনি ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে। আমি যদি বাইরে না থাকতাম, তবে হয়তো মীরুকে হেল্প করতে পারতাম।’
মনোয়ার সাহেব স্থির দৃষ্টিতে জুবায়েরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলেটি তার বড় ভাইয়ের বড় ছেলে। ভীষণ ট্যালেন্টেড। গত পরশুই বাহির থেকে এসেছে ভার্সিটি ছুটি বলে। দু মাস পর আবার যাবে। গত রাতে শিখা প্রায় সবাইকেই টেলিফোনে জানিয়েছে, মীরুকে পাওয়া যাচ্ছে না এ ব্যাপারে। সকাল হতেই জুবায়ের তার মা কে নিয়ে চলে এসেছে।
জুবায়ের দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইল। মুখের ভেতর জমে থাকা কথা যেন একটানে বলতে পারছে না। অবশেষে ধীরে, শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘চাচা, মীরু সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে।’
মনোয়ার সাহেব চমকে উঠলেন। মুখে কোনো কথা এলো না তার। শুধু চেয়ে রইলেন জুবায়েরের দিকে।
‘তুমি হয়তো ভাবছ, আমি অতি শিক্ষিতের মতো কথা বলছি। কিন্তু না চাচা, আমি নিশ্চিত। আমি ওর মতো অসংখ্য রোগীর সঙ্গে কাজ করেছি, বাইরে থাকাকালীন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা করেছি। মীরুর উপসর্গগুলো একেবারে textbook case। এটা এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তব আর কল্পনার পার্থক্য হারিয়ে ফেলে। যাকে আমরা Perception Disorder বলি। অর্থাৎ মস্তিষ্কের তথ্য গ্রহণ ও বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গোলযোগ হয়। তখন মানুষ যা দেখে, শোনে বা অনুভব করে- তা তার কাছে একেবারে সত্যি মনে হয়, যদিও সেটা বাস্তব নয়।’
‘কী বলছ তুমি?’ মনোয়ার সাহেবের গলা কাঁপছে।
‘আমি বলছি, ওর মস্তিষ্কে এক ধরণের বিভ্রম তৈরি হয়েছে। তুমি ওকে দেখেছ কখনও নিজের সঙ্গে কথা বলে, কখনও ভাবে কেউ ডাকছে তাকে, আবার কখনও বলে তার মা আসে রাতে দেখা করতে। এই সবকিছুই সিজোফ্রেনিয়ার অংশ। এটা এমন এক রোগ, যেখানে বাস্তব আর অবাস্তবের সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়। মানুষটা আর বুঝতে পারে না কোনটা সত্যি, কোনটা কল্পনা।’
মনোয়ার সাহেব গলার স্বর নিচু করে বললেন, ‘তুমি বলতে চাও, ওর মা’র কথা শোনা, সবটাই কল্পনা?’
জুবায়ের মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ, তবে সেই কল্পনা তার কাছে বাস্তবের চেয়েও সত্যি। ওর মস্তিষ্ক এক ধরণের Auditory Hallucination তৈরি করে। মানে, সে আসলে শোনে না, কিন্তু মনে হয় কেউ তাকে ডাকছে, কথা বলছে, গান গাইছে। এমনকি মায়ের গন্ধও পায়, যেটা Olfactory Hallucination। এইসব মস্তিষ্কের কেমিক্যাল ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফল। বিশেষ করে Dopamine ও Serotonin নামের নিউরোট্রান্সমিটারের অস্বাভাবিকতা থেকে।’
জুবায়ের একটু থামল, তারপর গলা নিচু করে যোগ করল, ‘সিজোফ্রেনিয়া সাধারণত তিনটা বড় কারণে হয়।
প্রথমত Trauma বা মানসিক আঘাত,
দ্বিতীয়ত বংশগত প্রবণতা,
তৃতীয়ত একাকীত্ব বা অবদমিত শোক।
তুমি জানো, মায়ের মৃত্যুটা ওর ছোটবেলার সবচেয়ে বড় ট্রমা ছিল। ও মায়ের সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে ছিল। ওর জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে মা-ই ছিল কেন্দ্রবিন্দু। মা হঠাৎ চলে যাওয়ার পর ওর অবচেতনে একটা ফাঁক তৈরি হয়, একেবারে গভীর শূন্যতা। ওর মন সেই জায়গাটা ভরাট করতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যতা থেকে জন্ম নিয়েছে ভয়, একাকীত্ব আর বিভ্রম।’
মনোয়ার সাহেবের চোখ ভিজে ওঠে। তিনি মেয়ের কপালে হাত রাখলেন। যেন শরীর নয়, মনের জ্বরের উত্তাপ কতখানি, তা বুঝতে চেষ্টা করলেন।
জুবায়ের বলল, ‘শরীরটাকে যত গুরুত্ব সহকারে দেখি, ততটা যদি মনকেও দেখতাম, তবে আমাদের ভালো থাকাটা বেড়ে যেতো, বিষন্নতা কমতো, অকালে মৃ ত্যুর হার শূন্যে গিয়ে ঠেকতো একসময়। ওর চিকিৎসা প্রয়োজন চাচা। সেই সঙ্গে প্রয়োজন যত্ন এবং ভালোবাসার। এবার শহরে নিয়ে গিয়ে ওকে বড় একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাও চাচা। আমার বিশ্বাস, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’
জুবায়ের চাচার হাতের উপর হাত রাখল।
মনোয়ার সাহেব লোক লজ্জা ভুলে তার সামনেই নীরবে চোখের জল ফেললেন।
এমন সময়ে শিখা বললেন, ‘তাহলে ওকে বটগাছের কাছে পাওয়া গেছে। এটা কী করে সম্ভব? ও কীভাবে এতোটা পথ গেল আর কেন গেল?’
জুবায়ের শিখার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চাচী, ওর ওই বটগাছের প্রতি টানটা আসলে হঠাৎ নয়। এটা ওর অবচেতনের গভীর প্রতিক্রিয়া। শুনে অবাক হবেন, কিন্তু সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মস্তিষ্ক এমনই। বাস্তবের সঙ্গে অবাস্তবকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে।
ওর মস্তিষ্কে “Symbolic Substitution” নামের একটা প্রক্রিয়া কাজ করছে। মানে, যাকে হারিয়েছে, যার প্রতি টান সবচেয়ে বেশি ছিল- ও তার বিকল্প হিসেবে কোনো এক বস্তু বা রূপকে আঁকড়ে ধরে। মীরুর ক্ষেত্রে সেটা বটগাছ। কারণ বটগাছ মানে ওর কাছে ছায়া, আশ্রয়, স্থায়িত্ব, আর ‘মা’- যাকে ও হারিয়েছে।’
শিখা বিস্মিত চোখে তাকালেন, ‘মানে ও গাছটাকে নিজের মা ভেবে নিয়েছিল?’
‘পুরোপুরি মা নয়, কিন্তু অবচেতনে মা’র প্রতিরূপ। তুমি খেয়াল করেছ, ও যখন গাছটার সঙ্গে কথা বলছে, তখন গাছের কণ্ঠস্বরটা তার মা’র মতো- কোমল, সান্ত্বনাদায়ক, মমতাময়। এই ঘটনাকে আমরা বলি auditory hallucination with emotional association। অর্থাৎ মস্তিষ্ক এমন এক মায়া তৈরি করে, যেখানে কল্পনার কণ্ঠস্বর বাস্তবের মতো শোনা যায়, আর সেটার সঙ্গে জুড়ে যায় এক পরিচিত অনুভূতি- যেমন মা’র ভালোবাসা।’
জুবায়ের এবার একটু থামল, মীরুর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে কথা গুছিয়ে নিতে লাগল।
‘ওর ভেতরে transference ও কাজ করছে চাচী। মা’র ভালোবাসা ও সান্ত্বনার আকাঙ্ক্ষা এখন স্থানান্তরিত হয়েছে গাছটার ওপর। মা যেভাবে ওকে জড়িয়ে রাখত, গাছটাও যেন ওকে চারদিক থেকে জড়িয়ে রাখছে। ঠিক সেই অনুভূতি।’
জুবায়ের একটু থেমে আবারও বলে চলল, ‘আর বটগাছের সঙ্গে বিয়ে নামক যে রীতিটা তোমরা পালন করেছো, সেটাও ওর মেন্টাল হেলথে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিয়ে তার সঙ্গেই হয়, যে তোমাকে ভালোবাসে কিংবা ভালোবাসবে এবং আগলে রাখবে। মীরুর কাছেও এইটিই হয়েছে। বটগাছের প্রতি ওর তীব্র এক টান, মায়া, মমত্ববোধ তৈরি হয়েছে।’
‘কিন্তু ও কেন গেল সেখানে? এত রাত করে?’
‘কারণ সেই ডাকটা যেটা আসলে মস্তিষ্কেরই তৈরি করা hallucinated voice, ওর কাছে বাস্তব মনে হয়েছিল। মনে রেখো, রাতে মস্তিষ্কের sensory isolation বেশি হয়, মানে চারদিক শান্ত থাকে, বাইরের শব্দ কম থাকে। তখন ভেতরের hallucination আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ওর মনে হয়েছিল কেউ তাকে ডাকছে- মায়ের সুরে, মায়ের গলায়। তাই ও বাধ্য হয়ে গেছে যেন অবচেতনের টানে হাঁটছে। আমরা একে বলি compelled behavior under delusional influence।’
শিখা চোখ মুছে বললেন, ‘তাহলে এই বিয়ের পর থেকে ওর মানসিক অবস্থা কি আরও খারাপ হয়ে গেল?’
‘অবশ্যই।’ জুবায়ের বলল শান্ত গলায়, ‘কারণ বিভ্রম যদি reinforcement পায় অর্থাৎ যদি কোনোভাবে সেটার সত্যতা মস্তিষ্ক পায়, তাহলে রোগটা আরও গভীর হয়। যখন ও বুঝল, ওর বিয়ে হয়েছে বটগাছের সঙ্গে, তখন মীরুর বিভ্রমটা validate হয়ে গেল। ওর মস্তিষ্কে chemical imbalance আরও বেড়ে গেল। dopamine surge হল, যা delusion-কে স্থায়ী করে। এখন ওর চিকিৎসা দরকার। medication এর মাধ্যমে chemical balance ঠিক করতে হবে, আর সাইকো থেরাপি দিয়ে বিভ্রম ভাঙতে হবে।’
হঠাৎ করেই জুবায়ের গলা নিচু করল, ‘চাচা, এই মেয়েটা আসলে ভালোবাসার অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওর মস্তিষ্কের যত না ক্ষতি, ওর মন ততটাই একলা হয়ে পড়েছে। ওকে কল্পনার বটগাছ নয়- এবার সত্যি একটা ছায়া দরকার, যেটা বাস্তব। তোমার অনুমতি থাকলে আমি সেই ছায়াটা হতে চাই। ওর বটগাছ হতে চাই। বাস্তবের আগলে নেওয়া বটগাছ!’
মনোয়ার সাহেব কিছুই বলতে পারলেন না। কেবল ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে জুবায়েরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। জুবায়েরের এলোমেলো চুল গুলো কপাল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চিরুনী না করলেও দেখতে ভালো লাগছে।
___________
পরিশিষ্টঃ
দশ বছর পর মীরু এসেছে সেই বটগাছটির সামনে, যার সঙ্গে ছোট্ট বেলায় তার বিয়ে হয়েছিল। মিথ্যে বিয়ে। আজ মীরুর সত্যিকারের বিয়ে হয়েছে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে জুবায়ের। পরনে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি। বিয়ের আসর থেকে দু’জনেই সরাসরি এখানে এসেছে। বলা বাহুল্য মীরুর আবদারেই আসা। লাল বেনারসিতে মিরুকে চমৎকার লাগছে।
মীরু চোখ বন্ধ করল। মনে মনে বলল, ‘প্রিয় বটগাছ, আমাকে কি তোমার মনে আছে? আমি তোমার কাছে এক রাত আশ্রয় নিয়েছিলাম নিজের অবচেতন মনে, কিন্তু পরবর্তীতে আমার স্মৃতিতে সেই রাতের ঘটনাটি বেশ স্পষ্ট করেই ধরা দিয়েছিল। সেই স্মৃতিতে তোমার সঙ্গে চমৎকার কথোপকথনের একটি অংশ আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। তুমি বলেছিলে, আমার কোনো ভয় নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি আমায় আগলে রাখবে। তুমি কথা রেখেছ। আজ সব ঠিক হয়ে গেছে। তোমার প্রতিরূপ হিসেবে আমায় আগলে রাখার একটি মানুষ ও প্রকৃতি আমায় দিয়েছে। আজ আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। এই সর্বশ্রেষ্ঠ দিনে আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম। তুমি ভালো থেকো প্রিয় বটগাছ। আমার স্মৃতিতে তুমি বেঁচে থাকবে চিরজীবন।’
জুবায়ের গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, ভ্রু-কুটি করে বলল, ‘কী গো, এত কী দোয়া দরুদ পড়ছ মনে মনে? নাকি প্রথম স্বামীর থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছো হু?’
মীরু চোখ খুলল। সে হাসছে। জুবায়েরের চোখেমুখে বিরক্তি, তবু তাকে দেখতে চমৎকার লাগছে। মীরু পার্স ব্যাগ খুলে একটা চিরুনী বের করে আনলো।
‘সবসময় তোমার চুল এলোমেলো থাকে। এসো, আজ আঁচড়ে দেই। আজ একটা শুভ দিনে তোমায় আমি গুছিয়ে নেই।’
(সমাপ্ত)
