#প্রেমাতাল
#পর্ব-৯
#Fatema_Aktar_mim
রুদ্র থেমে গেল। কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা ভারী হয়ে এসেছে। শুভ আর রিফাত নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এতটা গভীর ভালোবাসা, এতটা না বলা কষ্ট—ওরা কেউই আন্দাজ করতে পারেনি।
রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বলতে শুরু করল—
★★
তানহা চলে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মাথার ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে এসেছিল। মনে হচ্ছিল চারপাশের সব শব্দ নিঃশব্দ হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা এমনভাবে ব্যথা করছিল, যেন কেউ ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে যাচ্ছে।
মাথার উপর বড়ো একটা মেয়ে থাকতে কোনো বাপ কি তার ছোট ছেলেকে বিয়ে দেয়?তারপর ছেলের বয়স হয়নি।এই বয়সে বিয়ে করলে নাকি ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে।এখন আবেগে বিয়ে করবো, দুইদিন পর তানহাকে ভালো নাও লাগতে পারে।এই নিয়ে দুজনেরই দাম্পত্য জীবনে কলহ-দ্বন্দ্ব লেগেই থাকবে।
কিন্তু এসব কোনো কথা আমি কানে নিচ্ছি না।একটা জেদ ধরেই বসে আছি,তানহার অন্য কথাও বিয়ে হলে আমি সুসাইড করবো।শেষ পর্যন্ত আব্বাজান উপায় না পেয়ে রাজি হয়েছিলো। তবে একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছে,”__তানহা যদি নিজ মুখে বলে তোকে ভালোবাসে,তবেই আমি তোদের বিয়ে দেবো।না হলে তানহাকে ভুলে যা তুই।
কেন জানি না, সেদিন আব্বাজান মুখ খুব কালো করে বাসায় ফিরে ছিলো। এবং আমায় প্রচন্ড শাসন করলো,ঘর বন্দী করে রাখলো দুইদিন।মা,বোন সবাই মিলে আমায় দিন-রাত ধরে বুঝিয়েছে,_যাতে আমি তানহার বিয়েতে কোনো গন্ডগল না করি।তানহা বিয়েতে রাজি,আমায় বিয়ে করবে না সে।এই দুইদিন আমি দানা পানি কিছুই মুখে দিলাম না।
~লাই টিং, ফুল দিয়ে পুরো পাড়া সাজানো হয়েছে।খান বাড়ির একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা।কোনো কিছুর কমতি রাখেনি।চারপাশের এত আলো,মাইকের শব্দে আমার অস্বস্তি লাগছিল।এক কথায় গাঁ পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে আমার।বেলকনিতে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো সিগারেট খেয়ে যাচ্ছি আমি।না খাওয়া শরীর তার উপর সিগারেটের ধোয়ায় যেন গলা চিরে যাচ্ছিলো। হঠাৎ বাইরে থেকে মার্জিয়ার কণ্ঠ—
–“এই রুদ্র, বের হ! বর আসছে!
–“তাতে আমার কি?আমায় ডাকিস কেন?
–“আব্বু-আম্মু তোকে সাথে নিয়ে বিয়েতে যেতে বলছে।চল আমার সাথে।
–“এ যা তো বাল,ঘ্যানঘ্যান করিস না।
–“রুদ্র তুই কিন্তু বারাবাড়ি করছিস?ফাঁকা বাড়ি পেয়ে নিশ্চয়ই উল্টাপাল্টা কাজ করবি।শেষে আম্মু আমায় গলা দড়ি দিয়ে ঘুরাবে।
–“তোর সমস্যা কি বাল।আমায় কি দেবদাস-এর মতো বিয়েতে গিয়ে ঘুরতে বলছিস?আমায় কি তোর পাগল মনে হয়।
আমি কথাগুলো বলে একটা ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে বাইরে বের হলাম।তারপর মার্জিয়াকে পাত্তা না দিয়েই গটগট পায়ে বাইরে চলে গেলাম।আপু শুধু হা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।
~সন্ধ্যার একটু পর,যখন সবাই বড় আসায় অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত।ঠিক তখন আমি ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি।ঠোঁটে আমার অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের হাসি।হঠাৎ ছাদের দরজা কেউ খট করে বন্ধ করে দিলো।
খট করে দরজাটা বন্ধ হতেই আমি ফিরে তাকালাম।
মুহূর্তের জন্য আমার চোখ দুটো থমকে গেল।
পুরো ছাদ যেন তানহার লাল বেনারসির আভায় রঙিন হয়ে উঠল। কপালে টিপ,গায়ে ভারি গহনা জরানো।
লাল বেনারসির আঁচলটা বাতাসে উড়ছে।ঘোমটা সামান্য সরে গিয়েছে,মাথার টিকলি টাও ঠিক যায়গা নাই।তার এই এলোমেলো সাজ শাক্ষি দিচ্ছে সে দৌড়ে ছাদে চলে এসেছে। চোখ দুটো লাল, কিন্তু মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
মুহুর্তেই আমার বুঁকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো, “এই বেনারসি, গহনা,সাজ সবকিছু অন্য মানুষের জন্য।তারচেয়ে বড়ো কথা,আমার প্রিয় মানুষটাই একটু পর অন্য কারো হয়ে যাবে।
আমার হাতে থাকা সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিলাম।তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠলাম,
–” তুই এখানে কেন এসেছিস?
তানহা কিছু বলল না।তার চোখ মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট।শুধু ক্ষিপ্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।যেন চোখ দিয়েই গিলে খাবে সে।
ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এলো।একদম সামনে এসে দাঁড়ালো।আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো।এতটা কাছে সে,তবুও যেন মনে হচ্ছিলো কতটা দুরত্ব আমাদের মাঝে।
আমি কিছু বলতেই যাব ঠিক তখনই তার হাতের শক্ত থাপ্পড় এসে পড়লো আমার গালে।
একটুও অবাক হলাম না,শুধু গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।কারণ আমি জানি থাপ্পড়টা কেন মারছে,থাপ্পড় মারার মতোই কাজ করে আসছি আমি।তবুও দমে যাওয়ার পাত্র না আমি।মেজাজ হারিয়ে বলে উঠলাম,
–“সমস্যা কি তোর?গায়ে হাত দিচ্ছিস কেন?
তানহা আরও ক্ষেপে গেল।আমার শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরলো। রাগে চোয়াল শক্ত করে বলে উঠল,
–“সুসাইড করতে চাস তুই?সুসাইড নোট লিখে সিনেমার হিরো দের মতো মরতে চাস?কি ভাবছিস তুই,এসব করে আমায় পেয়ে যাবি?ব্লাকমেল করে আমায় পেতে চাস তুই?এসব ফালতু জিনিসে আমি গলে যাব?মনডা চাইতেছে চটিয়ে গাল লাল করে দেয়,এসব পাগলামি বের করে দেয় তোর।
–আমি যা খুশি করবো,তাতে তোর কি?তুই কেন এখানে আসছিস, আমায় বিরক্ত করতে?যা ভাগ..নিচে গিয়ে বিয়ে কর তোর সুগার ডেডিকে।
–“তবে রে….?
বলেই তানহা তেরে আসে আমার দিকে।আমিও থাপ্পড় খাওয়ার ভয়ে মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়।ঠিক তখনই তানহা আমায় অবাক করে দিয়ে থাপ্পড়ের পরিবর্তে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
একদম শক্ত করে।
যেন ছেড়ে দিলে আমি মিলিয়ে যাবো।
আমি স্তব্ধ পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছি। হাত দুটো ঝুলে আছে দু’পাশে। বুকের ভেতর এতদিন জমে থাকা কষ্টটা হু হু করে উঠে এলো।
তানহার কপাল আমার বুকে ঠেকানো।আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে ধরে আছে।তার গলা কাঁপছে। নিঃশ্বাসগুলো আটকে আসছে,
–“রুদ্র…?
আমি কোনো কথা বললাম না।চোখ বন্ধ করে ফেললাম। যদি চোখ খুললেই তানহা কথাও হারিয়ে যায়?আমার হাত কাঁপছে।খুব ইচ্ছে করছে তানহাকে বুকের সাথে আরও মিশিয়ে নিতে।নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে মুখ গুজ দিলাম তার চুলের ভাজে।
কিছুক্ষণ আমাদের মধ্যে নিরবতা চলল।ছাদে শুধু বাতাসের শব্দ, আর নিচ থেকে ভেসে আসা মানুষের কলহলে আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
তানহা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমার শার্ট ভিজে যাচ্ছে। বুঝলাম, কাঁদছে সে।আমি হালকা করে তার মাথায় হাত রাখলাম।
ভাঙা গলায় বলল—
–“রুদ্র…?
–“হুম?”
–“চলে যাও… প্লিজ, চলে যাও এখান থেকে।
মুহুর্তেই আমার সব অনুভূতিতে পানি ঢেলে দিলো।আমি শুধু হাসলাম। তাচ্ছিল্যের সেই হাসি আর ধরে রাখতে পারলাম না। গলা ভারী হয়ে এলো।
–“তাহলে এতক্ষণ ধরে এসব নাটক করলি তুই?
হঠাৎ তানহা আমাকে ছেড়ে দিল। দুই কদম পিছিয়ে দাঁড়াল। চোখে পানি, কিন্তু ঠোঁটে জোর করে হাসি ধরে রেখেছে।ভাঙবে তবু মচকাবে না মেয়েটা।
–“আজ আমার বিয়ে রুদ্র।আপাতত আমি নতুন করে কোনো অশান্তি চাইছি না।আব্বু খুব অসুস্থ, বিয়েতে যদি তোমার কারণে কোনো ঝামেলা হয়,তাহলে উনি সহ্য করতে পারবে না।হয়তো স্টক করেই মারা যাবে।
প্লিজ তুমি ছাদ থেকে নিচে যাও।পাগলামো করো না।
আমার পরিস্থিতি বুঝার চেস্টা করো।
আমি তাকিয়ে রইলাম। বিশ্বাসই করতে পারছি না, এই কথাটা তার মুখ থেকে বেরোল।
–“তাহলে এতক্ষণ কেন নাটক করলি?
তানহা চোখ নামিয়ে ফেলল।ঠোঁট কামড়ে বলল,
–“দয়া করে থামো রুদ্র।আমায় দুর্বল করো না।আমিও রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। কোনো রোবট না।আমি যে প্যারায় আছি,তুমি তা কখনো বুঝবে না।নিজেকে সামলাতে না পারলে শেষ হয়ে যাবো আমি।তোমার কারণে আমার আব্বুর কিছু হলে আমি মরেই যাব….
–তানহা…
আমি চিৎকার করে বললাম,
–“চুপ করেন প্লিজ।এসব কি হ্যাঁ!মরার কথা মুখেও আনবেন না।
তানহার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি নিয়ে অন্য পাশে ফিরে তাকালো।যেন কান্না থামানোর চেস্টা করছে।
–“আমায় বিয়ে করলে কি এমন ক্ষতি হতো আপনার? কেন ভালোবাসলেন না আমায়?একটু ভালো বাসলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত।
তানহা মুখে স্মিথ হাসি নিয়ে বলল,
— শোনো ছেলে,ভালোবাসার কথা যারতার কাছে প্রকাশ করতে নেই।মানুষ নাটক মনে করে মজা নেয়।তুমি অনেক ছোট, তাই এই আবেগ গুলো ধরে রাখতে পারছো না।এই বয়স আমরাও পারি দিয়ে এসেছি।তাই আমরাও বুঝি তোমার ঠিক কতটা কষ্ট হচ্ছে।নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো ছেলে।যখন বড়ো হবে,তখন এই তানহাও ভ্রমের মতো হারিয়ে যাবে।তখন দেইখো এই পাগলামি গুলো মনে করে আফসোস করবে তুমি,যে তানহা আপুকে কতো জালিয়েছি।
আমি হেসে উঠলাম। সেই হাসিতে কোনো সুখ নেই, শুধু পাগলামি।
–“তাহলে আমি বড়ো হওয়ার পরে বিয়ে করতেন।আর তিন চার বছর কি অপেক্ষা করা যেত না।এত তারাতাড়ি কেন বিয়ে করছেন?আমার জন্য একটু অপেক্ষা করেই তো দেখেন,এই রুদ্র শতবছর পরে-ও বলবে, “সে আপনাকে আজও ভালোবাসে।কেন আমার অনুভূতিকে আবেগ বলে কষ্ট দিচ্ছেন।
–” ধুর বোকা ছেলে..তোমার পথ আর আমার পথ সম্পুর্ন আলাদা।পরিস্থিতিকে মেনে নিতে শেখো।
এত কষ্ট পেলে তাই চলে?।নিজেকে আরও স্ট্রং বানাতে হবে।এই পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে হবে।আমি তো শুধুমাত্র ভ্রম,যা আগামী বছর আসতে আসতে মিলিয়ে যাব।কিন্তু পিছনে তোমার পুরো ভবিষ্যৎ পরে আছে।আপাতত এখন সেগুলোতে ফোকাস করো।
–“আমার ভবিষ্যৎ তো আপনি তানহা।
তানহা ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি আনলো।কিন্তু চোখ তার অস্থিরতার পরিচয় দিচ্ছে।আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
–“তুমি বড্ড ছোট রুদ্র।শুধু হাত পায়ে লম্বা হইছো।তোমার তো এখনো দাড়িই গজায়নি।
বলেই তানহা ফিক করে হেসে উঠলো।আমার খুব রাগ হলো। গাল ফুলিয়ে বললাম।
–“আমি মোটেও ছোট না।আপনি জানেন, আমার সব বান্ধবীদের ক্লাস নাইনে থাকতে বিয়ে হয়ে গেছে। এবং তারা ১/২ সন্তানের মাও হয়ে গেছে। তাহলে আপনার আমায় কোন দিক দিয়ে ছোট মনে হয়?লম্বায়ও আপনার থেকে উঁচু আমি।আর আপনি তো খাটো।এখনো আমার কাধে পরেন,যখন আরও বড়ো হবো,তখন তো আমার পাশে আপনাকে খুজেও পাওয়া যাবে না।তাই বাচ্চা বাচ্চা বলে অপমান করা বন্ধ করেন।অসহ্য লাগে,বিশ্রী শব্দ।
তানহা তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো তাকে খাটো বলায় রাগ করেছে।কিন্তু প্রকাশ করলো না।মুখ ছোট করে বলল,
–“মেয়ে আর ছেলের মধ্যে পার্থক্য আছে রুদ্র।মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়,আর বাচ্চার মাও হয়,তাদের সে ক্ষমতা আছে।আর ছেলেদের প্রাপ্তবয়স্ক হতে অনেক সময় লাগে।তোমার তো মাত্র সতেরো চলে।এতকিছু বুঝবে না।ধীরে ধীরে সব জেনে যাবে।
–“হয় আমি শিশু,একদম নাদান বাচ্চা।ফিডার খায় আমি।
“একবার বিয়ে তো করে দেখেন আমায়,আপনাকেও বাচ্চার মা বানানোর ক্ষমতা আমার আছে।
–“চুপ বেয়াদব। এসব কথা কই থেকে শিখছো?দিন দিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছো।
–” হয় আমি তো বেয়াদব। নিচে আপনার সুগার ডেডি অপেক্ষা করছে। যান গিয়ে তাকে বিয়ে করেন।
মুহুর্তেই তানহার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।মুখটা ছোট হয়ে গেলো।চোখ দুটো ছলছল করছে।মাথা নিচু করে বলল,
–“আমার যেতে হবে রুদ্র।তুমি নিজের খেয়াল রেখো।আমার কসম লাগে তুমি নিজের কোনো ক্ষতি করবে না।জীবনে চলার পথে অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়।সবাইকে তো আর মনে রাখা সম্ভব না।আমাকেও একজন পথের পথিক ভেবে ভুলে যেও।
নিজের পড়াশোনা নিয়ে মনোযোগী হয়ে ওঠো।নামাজ আদায় করো,নিয়মিত কলেজে যাবে,বন্ধুদের সাথে সময় কাটাবা।এক কথায়, সব সময় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবা।ইনশাআল্লাহ একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি হেসে উঠলাম।তিক্ত হাসি,
–“আপনি আমার চলার পথের পথিক না ম্যাম।আপনি আমার চলার জন্য আস্তো একটা পথ।
তানহা আর কিছু বলল না।মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে ছাদ থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়।মাঝপথে গিয়ে থেমে যায়।পুনরায় পিছনে ঘুরে তাকায়।তারপর আমার কাছে এগিয়ে আসে।
কখনো আমার গালে হাত দেয়,তো কখনো আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।আমি শুধু স্তব্ধ পাথরের মতো দাড়িয়ে আছি।হঠাৎ সে আমার বুকে হাত রেখে বলে উঠে,
–“তোমার বউ খুব সুন্দরী হবে।এই বুকে মাথা রেখে সে ঘুমাবে।তোমার সাথে সুখ দুঃখের গল্প করবে।তোমায় এত এত ভালো বাসবে।তখন দেইখো,”আমার কথা মনে করে শুধু হাসি আসবে,__যে তানহা আপুর সাথে কতো ফ্লার্ট করেছি।অবশ্য আমারও তখন এসব মনে পড়লে হাসি আসবে।কি একটা অবস্থা আল্লাহ, “সিনিয়র আপুর জন্য পাগলামি করছে রুদ্র।হাহা,হাস্যকর বিষয়।
আমি শুধু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি।ইচ্ছে তো করছে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিতে তার।বেয়াদব মেয়ে,নিজে অন্যজনকে বিয়ে করছে,তার সাথে আমাকেও অন্য কাউকে বিয়ে করার জন্য বদ দোয়া দিয়ে দিচ্ছে।
তানহার হাসির সাথে জল গড়িয়ে পরলো।সে হাতের উল্টো পিঠে জল টুকু মুছে।কিন্তু কাজ হচ্ছে না,চোখও যেন আজ তার সাথে বেইমানি করছে।সে কোনো মতে নিজেকে সামলে।
আবারও আমার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নেয়।তারপর আমার কপালের সাথে নিজের কপাল ছুয়ে বলে উঠলো।
–“একটা অনুরোধ রাখবে?
আমার গলা শুকিয়ে এসেছে চাপা কষ্টে।আওয়াজ বের হচ্ছে না।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম।
–” কিহ?
তানহা আমার কপালে মাথা ছুয়ে শ্বাস নিয়ে বলল,
–“তুমি বিয়েতে থেকো না প্লিজ।আমার খুব অস্বস্তি লাগছে।নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে।তুমি থাকলে আমি আরও ভেঙে পরবো।আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।কেন জানি না, খুব খারাপ লাগছে।তুমি ছাদ থেকে নেমে সোজা বাসায় গিয়ে ঘুমাও।নাহলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেও।দেখবে ভালো লাগবে।শুধু এখান থেকে চলে যাও।
এই কথাটুকু বলেই তানহা দ্রুত নিজেকে সরিয়ে নিল। যেন আর এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলে ভেঙে পড়বে। টিস্যু দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
আমি তখনো নড়িনি। বুকের ভেতরটা কেপে উঠছে। গলার কাছে দলা পাকানো কষ্টটা চিৎকার করে বের হতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। শুধু তাকিয়ে দেখলাম—তানহা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। প্রতিটা ধাপে যেন তার পা ভারী হয়ে যাচ্ছে।
মাঝখানে একবার থামলো। হালকা করে পিছনে তাকাল।
আমাদের চোখাচোখি হলো। সেই এক ঝলক দৃষ্টিতে কত কথা যে লুকানো ছিল—অভিমান, মায়া, অক্ষমতা, আর না বলা ভালোবাসা।
আমি এক পা এগোতে গিয়েও থেমে গেলাম। ডাকতে চেয়েও ডাকলাম না।
তানহা খুব হালকা একটা হাসি দিলো। সেই হাসিটা ছিল অশ্রুজলে ভেজা। তারপর আর একবারও পিছনে না তাকিয়ে সে নিচে নেমে গেল।
ছাদের ওপর আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম। হাতের মুঠোয় তখনো তার স্পর্শ লেগে আছে। আকাশটা অদ্ভুত রকম নীরব। বাতাসে যেন তানহার গন্ধ আটকে আছে।
চোখের কোণ দিয়ে অজান্তেই পানি গড়িয়ে পড়লো। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললাম—
–“আপনি পথিক নন তানহা..
আপনি সেই পথ,
যে পথে হেঁটে আমি মানসিক শান্তি পায়………….
#চলবে……
#প্রেমাতাল
#পর্ব–১০
#Fatema_Aktar_mim
রুদ্র থেমে গেল। কথাগুলো বলতে বলতে কখন যে চোখের কোণে পানি জমে উঠেছে, সে নিজেও টের পায়নি।
শুভ ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখলো। রিফাত রুদ্রের দিকে একটা পানির বোতল এগিয়ে দিল।তারপর রিফাত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
–“সব কিছু ঠিক আছে,কিন্তু তুই আনমলকে কেন মেনে নিতে পারছিস না?এত ছোট বাচ্চার উপর তোর রাগের কারণ কি?
রুদ্র হালকা একটা হাসি দিল।তারপর চোখ মুখে পানির ছিটা দিয়ে বলে উঠলো,
–আনমলের প্রতি রাগ আমার কোনো কালেই ছিলো না।সব হয়েছে তার মায়ের জন্য।জানিস,যখন তানহা ডিভোর্স নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে,তখন আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম।যে এবার অন্তত আমি আমার প্রিয় মানুষটাকে পাবো।তানহাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে, আমার সাথে ভালোই আচরণ করতো।কিন্তু যখন শুনেছে সে প্রেগন্যান্ট, তখন থেকে শুরু হয়েছে তার আচরণের পরিবর্তন।
সে তার ছেলেকে একাই মানুষ করবে,দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যের ঘরের বোঝা সে তার ছেলেকে হতে দেবে না। আমি অনেক বুঝিয়েছি,কিন্তু লাভ হয়না,সে আনমলকে রেখে কখনো দ্বিতীয় বিয়ে করবে না।আর আমাকে তো আরও আগে না,কারণ তার জবানিতে আমি এখনো বাচ্চা।
এখন তোরাই বল আনমলের প্রতি আমার রাগ তো হবেই।তার মা তো তাকেই ভালোবাসে,আমায় তো একটুও ভালোবাসে না,আমার জন্য একটুও মায়া তার ভেতর নেই।আমার হিংসা হয় এইটুকু বাচ্চার প্রতি।সেইজন্য একটু রাগ দেখায়।
_________________
চোখ খুলতেই আনমল ঝাপসা আলো দেখতে পেলো।চারপাশে স্যাঁতসেঁতে মদের গন্ধ।হাত-পা বাধা।গলায় কিছু বলতে গিয়ে বুঝলো মুখে কামড় গুজে রাখা।
নিজেকে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় আর আশেপাশে এত হিংস্র মানুষ দেখে তার চোখ ভিজে উঠলো।
–আম্মু..!
মনের ভেতরে শুধু এই একটায় শব্দ।যা মুখে কাপড় গুজে থাকায় বের হচ্ছে না।শুধু আশেপাশে ছলছল নয়নে চেয়ে আছে।
হঠাৎ দরজা খুলে আহনাফ শেখ আনমলের সামনে এসে দাঁড়াল।ঠোঁটে বিশ্রী হাসি আর হাতে মদের বোতল নিয়ে বলে উঠে,
–ভয় পাচ্ছো?
আনমল মাথা নাড়ায়।যার অর্থ সে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে।
–তোর মায়ের জন্যই এতক্ষণ ধরে তোকে আটকে রাখা।মহিলা খুব জেদি ফোন ধরছে না।ফোন ধরলে এতক্ষণ তুই তোর মায়ের কোলে ঘুমাইতি।তোরে এভাবে আটকে রাখতে আমারও খারাপ লাগছে,হাজার হোক নিজের রক্ত,খুব খারাপ লাগছে বাবা।কিন্তু তোরে ছেরে দিলেই কান্নাকাটি করে কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছিস।যা আমার বিরক্ত লাগছে।তাই একটু কষ্ট কর, আমার টাকা পেলেই তোকে ছেরে দেব প্রমিস।
–তাই নাকি আহনাফ শেখ?
পিছন থেকে কারো ভারি কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠল আহনাফ।কে এসেছে তা দেখার জন্য ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়,,ভ্রু কুটি করে বলে উঠে,
–তোরা ?
রুদ্র, রিফাত আর শুভ তিনজন পকেটে হাত গুজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আশেপাশে তার সমস্ত লোক জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পরে আছে।কিছুক্ষণ আগে ঘুমন্ত মানুষের উপর ক্লোরোফর্ম দিয়ে তারা অজ্ঞান করে দিয়েছে।আহনাফকে দেখে শুভ ফিক করে হেসে ফেলল,,
–এই বালের চেহারা নিয়ে কিডনাপ করতে আসিস?হাউ ফানি।
আহনাফ শেখ কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইলো। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অচেতন লোকগুলো দেখেই পরিস্থিতি আন্দাজ করতে ভুল করলো না। পকেট থেকে বন্দুক বের করে ক্ষিপ্ত গলায় বলে উঠে,
–তোমরা এখানে কেন এসেছিস?
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই রুদ্র ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। চোখে একরাশ আগুন, কিন্তু কণ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
–কেন এসেছি সেটা তোর জানার দরকার নেই।শুধু এইটুকু বল…
রুদ্র আঙুল তুলে আনমলের দিকে ইশারা করলো,
–অর এই অবস্থা কেন করেছিস?আমি তো ভেবেছিলাম বাপের কাছে তার সন্তান আছে,,নিশ্চয়ই আদর যত্নে আছে।তাই বন্ধুদের সাথে একটু সুখ দুঃখের গল্প করছিলাম।কিন্তু অমা,এখানে এসে আমি তো অবাক।কেমন বাপ তুই?নিজের সন্তানের প্রতি তোর মায়া নেই?
আহনাফ হেসে উঠলো, হাসিটা কাঁপা কাঁপা।
–পুরুষ হয়ে জন্ম নিছি এমন বাচ্চা হাজারটা জন্ম দিতে পারবো।আমার কোনো সন্তান চাইনা, আমার শুধু টাকা চাই, টাকা।টাকার জন্য আমি সব করতে পারি।যেখানে নিজের বাপরেই খু*ন করে ফেলছি।সেখানে নিজের এই সামান্য রক্ত কিছুই না।
রুদ্র গর্জে উঠে,
–চুপ কর জানোয়ার,এটাকে পুরুষ বলে না,কাপুরষ বলে।তুই সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ না।তোর ব্যবস্থা আজকেই নিচ্ছি।যাস্ট অয়েট কর।
–কি করবি তোরা, পুলিশ ডাকবি?—
রিফাত পকেট থেকে ফোন বের করে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেললো।
–অলরেডি ডাকা হয়ে গেছে। তোর লোকেশন, তোর নাম, সব পাঠানো হয়েছে। এখন তোর হাতে সময় আছে সর্বোচ্চ দুই মিনিট।
শুভ ধীরে ধীরে চেয়ারটার কাছে গিয়ে আনমলের মুখের কাপড় খুলে দিল। ছোট্ট ছেলেটা ফুঁপিয়ে উঠলো।
–আম্মু..
কাঁপা গলায় শুধু এইটুকুই বের হলো।
রুদ্র আর থাকতে পারলো না।এই ছোট শিশুর আর্তনাদ তার বুকে সুচের মতো ফুটছে।সে দৌড়ে এসে আনমলকে বুকে টেনে নিল। হাত-পা খুলে দিতে দিতে কণ্ঠ ভেঙে গেল।
–কিছু হয়নি বাবা..আমি আছি…তোমার পঁচা আংকেল আছে তোমার সাথে। কিছু হবে না।আমি এখনি তোমার আম্মুর কাছে নিয়ে যাচ্ছি তোমায়।
–পাপা..পাপা..!
আনমলের মুখে পাপা ডাক শুনে রুদ্র চমকে উঠল।নিজের কানে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।এটা কি আদোও সম্ভব।হয়তো অতিরিক্ত ভয় পেয়ে ছেলেটা তার বাবাকে ডাকছে।কিন্তু এই নিশপাপ বাচ্চাকে কে বুঝাবে,,তার জন্মদাতা পিতাই যে তাকে বেধে রেখেছে।রুদ্রের হাত কাঁপছে।কোনো মতে আনমলকে ছাড়িয়ে নিলো,।ছাড়া পেয়ে আনমল রুদ্রের গলায় ঝাপিয়ে পড়ল,
–পাপা…!
এই প্রথম আনমল শক্ত করে রুদ্রকে জড়িয়ে ধরলো। তার ছোট্ট হাতের সেই আঁকড়ে ধরায় রুদ্রের বুকের ভেতর জমে থাকা সব হিংসা, সব রাগ মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।রুদ্র নিজেও আনমলকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
না চাইতেও চোখে জমা হলো অশ্রু।এই ডাক শোনার জন্য সে কতো পাগলামি করছে।আজ যখন আনমল নিজে থেকে তাকে ডাকছে,,তখন তার হ্রদয়ের মধ্যে কিছু একটা ঢুকে গেল।হয়তো আনমল সেখানে যায়গা করে নিয়েছে।কই সে যখন আনমলকে ধমক দিয়ে বাপ ডাক শেখায়,তখন তো এত শান্তি লাগে না।তাহলে আজ এত শান্তি লাগছে কেন।
আহনাফ বন্দুক হাতে পেছাতে পেছাতে বললো,
–কেউ এখান থেকে এক পা-ও নড়বি না।আমার টাকা দে,তারপর এই আপদ নিয়ে বিদায় হও।ছয় ঘন্টা ধরে এর চিল্লাফাল্লা শুনতাছি।অত্যাচারে আমি অতিষ্ঠ। এর পরের বার ভাবছি,তানহার দাদিরে কিডনাপ করমু।শালা বুড়ি তো কথাও কইতে পারে না।শান্তি মতো ব্ল্যাকমেইল করতে পারবো।
রুদ্র আনমলকে নিয়ে রিফাতের দিকে এগিয়ে আসে।আনমলকে রিফাতের কোলে দিতে চাইলে আনমল যেতে চায়না।অনেক বুঝিয়ে সুনিয়ে রিফাতের কোলে তাকে তুলে দেয়।
–রিফাত,আনমলকে অর মায়ের কাছে নিয়ে যা।হয়তো এতক্ষণ জ্ঞান ফিরেও এসেছে।আবার পাগলের মতো ছুটাছুটি করে গাড়ির গ্লাস ভেঙে বেরিয়ে আসবে…
–তার আর প্রয়োজন নেই!
তানহার কন্ঠস্বর শুনে সবাই অবাক হয়ে সেদিকে তাকায়।তানহা বারবার ঝিমুচ্ছে,দু’হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আনমলের দিকে এগোচ্ছে।তার ঠিক পিছনে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।
তানহা এগিয়ে এসে আনমলকে কোলে তুলে নেয়।আনমল তার মাকে জরিয়ে ধরে ফিকে ফিকে কেঁদে উঠে।শরীর দুর্বল থাকায় তানহা পড়ে যেতে নিলে রুদ্র তাকে ধরে ফেলে।তারপর একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়।
আহনাফ চিৎকার করে বলে উঠে,
–আমায় কি তোদের দর্শক মনে হচ্ছে?বসে বসে তোদের শুটিং দেখবো?শালা আমি কিডনাপার!কেউ তো পাত্তা দে।আমি কিন্তু সত্যি গুলি করে দেবো।
–তার আর দরকার নেই,ইউর আন্ডার এরেস্ট মিস্টার আহনাফ শেক,সেলেন্ডার করুন।
পুলিশের কথাটা শেষ হতেই চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
আহনাফ শেখের হাত কাঁপছে। বন্দুকটা ঠিকভাবে ধরেও রাখতে পারছে না। চারদিক থেকে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে।
–গুলি নামাও!
কঠোর কণ্ঠে আবারও নির্দেশ এলো।
আহনাফ হাসতে চাইল, কিন্তু সেই হাসি আর বের হলো না। চোখে-মুখে একরাশ ভয়। শেষমেশ বন্দুকটা মেঝেতে ফেলে দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো।
–ওকে…ওকে সেলেন্ডার করছি।
পুলিশ এগিয়ে এসে হাতকড়া পরিয়ে নিলো তাকে। বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় আহনাফ একবার আনমলের দিকে তাকালো। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল শুধু হেরে যাওয়ার রাগ।
আনমল মায়ের বুকে মুখ গুঁজে রেখেছে। এখনো ছোট্ট শরীরটা কাঁপছে। তানহা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।যেন এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে দিলে ছেলেটা আবার হারিয়ে যাবে।ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্ক সচল হতে শুরু করলো।আশেপাশের সবকিছু এখন পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে।
পুলিশ অফিসার আহনাফকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে তানহা গম্ভীর গলায় বলে উঠে।
–এক মিনিট স্যার।হিসাব এখনো মিলে নাই,একটু মিলে দেই।
বলেই তানহা আনমলকে রুদ্রের কোলে তুলে দেয়।তারপর আহনাফ শেখের সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়ায়।আহনাফ তার ক্ষিপ্ত আখিজোরা দেখে ভয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।মুহূর্তেই তানহা আহনাফের মুখে থাপ্পড় দিয়ে থুথু মারে।
–এবার হিসাব মিলছে না শুভ?
–হ্যাঁ আপু।
তারপর তানহা হুংকার দিয়ে বলে উঠলো,,
–তোর সাহস হলো কিভাবে আমার সন্তানকে এভাবে বেধে রাখার?নূন্যতম মনুষ্যত্ব তোর ভেতর নেই।অতীত ভুলে গেছিস?তোর ঠিক কি হাল করছিলাম,চোখ বন্ধ করে একবার ভেবে দেখতি।তারপর দুঃসাহস দেখাইতি আনমলকে কিডনাপ করার।
আমার ছেলেকে আমি তার বাপের পরিচয় ছাড়াই বড়ো করছি,কারণ সে যেন কখনো জানতে না পারে তার জন্মদাতা একজন কাপুরষ।তোকে দেখলে আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।মন চাচ্ছে খুন করে আমি জেলে যাই।অফিসার এই পশুকে আমার সামনে থেকে নিয়ে যান।
কথাগুলো বলেই তানহা রুদ্রের দিকে এগিয়ে আসে।
রুদ্র হাসিমুখে আনমলকে তার কোলে তুলে দেয়।তারপর মুচকি হেসে বলে উঠে,
–সরি তানহা আমার উচিত ছিলো আনমলকে আর একটু দেখে রাখার। আসলে আমি সত্যি ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম।বুঝতে পারি নাই এমন কিছু হবে।সরি আপনাকে এত কষ্ট দেওয়ার জন্য।
তানহা মুখ প্রসারিত করে বলে উঠে,
–সরি তো আমার বলা উচিত রুদ্র।বিনা কারণেই তোমায় কতো কথা শুনিয়ে দিলাম।এমন তো আমার বাড়ি থেকেও হতে পারতো।আর আমি সেটাই বুঝলাম না,।আসলে মা তো,সন্তান হারিয়ে যাওয়ায় মাথা এলোমেলো হয়ে গেছিলো।আমায় ক্ষমা করে দিও।আর আমি খুব কৃতজ্ঞ তোমাদের কাছে।তোমরা না থাকলে এই অমানুষটা আমায় ব্লেকমেল করে কি করতো তা আমি নিজেও জানিনা…….
#চলবে……
