Saturday, June 6, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রেমাতালপ্রেমাতাল পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

প্রেমাতাল পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

#প্রেমাতাল
#অন্তিম_পর্ব
#Fatema_Aktar_mim

সময় চলে যায় প্রবহমান নদীর মতো। দেখতে দেখতে কেটে গেল নয়টা বছর। আনমল এখন আর সেই ছোট্ট আনমল নেই—অনেকটাই বড় হয়ে গেছে। এবার সে ক্লাস এইটে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাবা–মায়ের মতোই সে খুব ভালো স্টুডেন্ট। প্রতিবারই স্কুল টপার হয়। তবে দুষ্টুমিতে একশো একশো—ঠিক রুদ্রের মতো। আবার তানহার গুণও তার মাঝে স্পষ্ট। সব সময় চোখ-মুখ গম্ভীর আর তীক্ষ্ণ করে রাখে। যার কারণে ক্লাসের অধিকাংশ স্টুডেন্টই তাকে দেখে ভয় পায়।

রুদ্র সকালে স্নান সেরে স্যুট বুট পরে রেডি হয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দারিয়ে হাতে ঘড়ি পড়ছিল।হঠাৎ তার চোখ চলে গেল ঘুমন্ত তানহার দিকে।সঙ্গে সঙ্গে তার কপাল কুচকে এলো,

“তানহার এক হাত পেটের ওপর ,আরেক হাত বালিশের ওপর রাখা।মাথাটা বালিশ থেকে খানিকটা নিচে নেমে এসেছে।কাঁধ একদম বাঁকা করে সুয়ে আছে।যার কারণে রুদ্রের ভেতর অজানা অস্বস্তি আর রাগ দুটোই জমে উঠলো।এখন সে আর একা না,তার ভেতরেও আরেকটা প্রাণ বড়ো হচ্ছে।অথচ সে এখনো ঠিকমতো নিজের খেয়াল রাখে না।

রুদ্র কখনোই দ্বিতীয় সন্তান চায়নি। বাচ্চা নিয়ে সে কী করবে! একটা সন্তান তো আছেই তার। তাছাড়া আনমলকে সে ভীষণ ভালোবাসে। ছেলেটাকে সে কোনোদিন এটা ফিল করাতে চায় না যে তার বাবা তাকে কম ভালোবাসে। দুই সন্তানের মাঝে সব সময়ই একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলে—কে বেশি তার বাবা-মায়ের আদরের।ছেলে বলে,”আমার মা-বাবা আমায় বেশি ভালোবাসে না,সব সময় বোনকে ভালোবাসে।আবার বোন বলে সব সময় ভাইকে বেশি ভালোবাসে। এই ঝামেলা মার্জিয়া আর রুদ্র নিজেরাও করে এসেছে, এমনকি এখনও করে। মার্জিয়া তো সন্তানের মা হয়েও রুদ্রের সঙ্গে মারামারি করে বসে।

আর আনমল যেন কোনোদিন বুঝতে না পারে—সে তার জন্মদাতা পিতা না। সেই ভয় থেকেই ছেলেটাকে সে একটু বেশিই আগলে রাখে।এই কারণেই তানহাকে দ্বিতীয় সন্তান নিতে দেয়নি।

কিন্তু আনমল জেদ ধরে বসে আছে—তার বোন লাগবে। কান্নাকাটি করে বাড়ি মাথায় তোলে। সব সময় তানহাকে বলত,
“আম্মু, আমায় একটা বোন এনে দাও না, প্লিজ। সবার বোন আছে, অথচ আমার নাই।”
এমনকি সে এটাও বলত,
“আমার বোনকে আমিই কোলে নেবো। তোমাকে নিতে হবে না। তাও একটা বোন এনে দাও।”

এসব বলে সে প্রায়ই রাগে রুদ্রের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিত, না খেয়ে থাকত। ছেলের এমন পাগলামি দেখে শেষমেশ তানহা রুদ্রকে না জানিয়েই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ রুদ্র কখনোই রাজি হতো না। এমনকি প্রেগন্যান্সির খবর শোনার পরও সে রাগারাগি করেছে।

~রুদ্র এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো।তারপর ধীরে ধীরে তানহার পাশে গিয়ে বসলো।রাগ হলেও চোখে-মুখে সেটা ধরে রাখতে পারলো না।ঘুমন্ত তানহাকে দেখলেই তার সমস্ত বিরক্তি গলে যায়।নয়টা বছর আগের সেই দুরন্ত, একরোখা মেয়েটা এখন মাতৃত্বের ভারে আরও কোমল হয়ে উঠেছে।

সে খুব সাবধানে তানহার মাথাটা তুলে নিজের হাতে এনে বালিশটা ঠিক করে দিল।গায়ে ভালো ভাবে কাঁথা টেনে দিল।তারপর পেটের ওপর রাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো।গোল হয়ে ওঠা পেটটা যেন ওর দিকে তাকিয়ে নীরবে বলছে—

–আমি আসছি পাপা।

রুদ্র আলতো করে তানহার পেটের ওপর হাত রাখলো।তানহা কিছুটা নড়েচড়ে উঠল।রুদ্র পেটের উপর একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,

–তারাতারি চলে এসো আম্মু,আনমল তোমার অপেক্ষায় আছে।

রুদ্র আবার চুমু খেল।তানহার ঘুম ছুটে গেল।সে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে রুদ্রকে দেখে মৃদু হাসলো।রুদ্র তার পেট নিয়ে খেলছে,যেন সে কোনো বাচ্চার সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে।তানহা এমন কান্ড দেখে না হেসে পারলো না।মৃদু স্বরে বলল,

–আনমলের বাপ,কখন উঠলে তুমি?

রুদ্র চোখ তুলে তানহার দিকে তাকালো।তারপর ঝুঁকে পড়ে কপালে একটা হালকা চুমু দিল।তানহা অবাক হলো না,”কারণ এটা রুদ্রের প্রতিদিনের রুটিন।অফিসে যাওয়ার আগে তার কপালে চুম্বন একে দেওয়া,অফিসে গিয়ে ঘন ঘন ফোন দিয়ে খোজ নেয়।এই নয় বছরে রুদ্রের ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি।সে এখনো তানহার পাগল।
হাজার ব্যস্ততার মাঝেও সে তার প্রিয় মানুষের খোজ নিতে ভোলে না।

তানহা ধীরে ধীরে পিঠে বালিশ ঠেলে উঠে বসলো।রুদ্র তানহাকে বসিয়ে দিয়ে কপালে হাত রেখে বলল,

— শরীর এখন কেমন লাগছে?রাতে নাকি পেটে হালকা পেইন ছিলো।সকালে খাবার খেয়ে মায়ের সাথে চুপচাপ ক্লিনিকে যাবে!কোনো অজুহাত আর শুনবো না আমি।দিন দিন খুব বেয়াদব হয়ে যাচ্ছো তুমি।নিজের শরীরের একটুও যত্ন নেও না।

তানহা ড্যাবড্যাব করে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,

–এখন ব্যথা নেই।তাই ক্লিনিকে যাব না।তাছাড়া ডেট এখনো সাত দিন পর।এমনি একটু আধটু পেইন হবে এখন।তাই চিন্তা করা লাগবে না তোমার।তুমি এখন অফিস যাও।

রুদ্র তানহার কথায় ভ্রু কুচকে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,

–কথা না শুনলে মেজাজ গরম হয়।সারারাত পেট নিয়ে সাপের মতো মোচড়ামুচড়ি করলে।আর এখন বলছো দাক্তারের কাছে যাবে না?সিরিয়াসলি তানহা,আপনার মাথায় কি কিমরি উঠেছে?যে পাগলের মতো আবল তাবল বোকছো?আমি যেন এসে শুনি ক্লিনিকে গেছো তুমি।

তানহাকে পাগল বলায় কথাটা তার গায়ে লাগলো খুব।সে রাগে গাল ফুলিয়ে বলল,

–পাগল বললে কেন?এখন আমি আরো আগে যাব না ক্লিনিকে।দেখি কে নিয়ে যায় আমায়।

রুদ্র হাতে ফাইলের ব্যাগ নিয়ে পকেটে এক হাত গুজে বলল,

–আনমল জানলে তোমার কি করবে ভেবে দেখেছো?তুমি কি চাও ছেলের কান অব্দি কথাটা পৌছাক।তাই চুপচাপ উঠে ফ্রেস হয়ে নেও।আমার কাজ না থাকলে আমিই নিয়ে যেতাম।

তানহা বিরক্ত হয়ে বলল,

— যাব না আমি।ক্লিনিকের গন্ধ আমার সহ্য হয় না।

রুদ্র মেজাজ হারিয়ে ক্ষেপে গিয়ে বলল,

–তানহা তুমি কিন্তু…..

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ভারি গলার স্বর ভেসে এলো।

–আম্মু! তুমি উঠছো না কেন?

রুদ্র দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,

–এসো,দরজা খোলা আছে।

দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো আনমল।স্কুল ড্রেস পরে,কাঁধে ব্যাগ।চোখমুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব,কিন্তু চোখে লুকানো উত্তেজনা।সে সরাসরি তানহার পাশে গিয়ে বসে পড়ল।পেটের দিকে তাকিয়ে বলল,

–আম্মু আজ কি বেবি আসবে?!

ছেলের এমন কথা শুনে তানহা হেসে উঠল।আনমল প্রতিদিন তার মায়ের কাছে এসে এই একই কথা বলে। আম্মু বেবি কবে আসবে,এত দেরি করছে কেন,আসছে না কেন ইত্যাদি বলে তানহার মাথা খেয়ে ফেলে।তানহা মুচকি হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

— না রে বাবা,এখনো অনেক সময় আছে।

আনমল মুখ ভার করে বলল,

–সবসময় তো শুধু বলো “সময় আছে”।আমি আর কতো অপেক্ষা করবো।ধুর!

রুদ্র দৃশ্যটা দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেললো।সে এগিয়ে এসে আনমলের কাঁধে হাত রেখে বলল,

–এতো তারা কিসের?বোন এলে তো,আর কাউকে তার পাশে ঘেঁসতেও দিবে না!

আনমল মুখ প্রসারিত করে বলল,

–না পাপা,আমি আম্মুর সাথে ওকে শেয়ার করবো।তবে বোনটা শুধু আমার।আমি ওকে পড়াবো, ঘুম পারিয়ে দেব,খাইয়ে দেব,নিয়ে ঘুরতে যাব।আর খুব শাসন করবো,হুম।

এইটুকু বলেই আনমল তানহার পেটের দিকে তাকালো।খুব যত্নে হাত রাখলো পেটে,যাতে ভেতরের প্রাণটা আঘাত না পায়।সে মৃদু স্বরে বলল,

–আমি পরীক্ষা দিতে গেলাম বোনু,তুমি সাবধানে থেকো কেমন।আর তারাতাড়ি আমার কাছে চলে এসো।

ঠিক তখনই তানহার পেটে আবার ব্যথা শুরু হলো।সে ফ্যাকাসে মুখে রুদ্রের দিকে তাকালো।রুদ্র বুঝে গেল তানহার আবার অসুবিধা হচ্ছে।তাই সে তানহাকে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠালো।গলা ফাটিয়ে তার মাকে ডাকলো।আনমল বিচলিত হয়ে বলল,

–তোমার কি খুব খারাপ লাগছে আম্মু?

তানহা ছেলের মাথায় আদুরে হাত রেখে বলল,

–সামান্য পেইন হচ্ছে শুধু।সমস্যা নেই। তুমি শুধু ভালো ভাবে পরীক্ষা দিও কেমন।একদম আমাকে নিয়ে চিন্তা করবে না।আমি দাক্তারের কাছে যাচ্ছি।তুমি তোমার বাবার সাথে স্কুলে যাও কেমন।

______________________

পরের দিন সকালবেলা তালুকদার বাড়িটা আবারও কোলাহলে ভরে উঠেছে।বাড়িতে অনেক মেহমান এসেছে।রুদ্রের বন্ধু শুভ এসেছে তার বউ বাচ্চা নিয়ে।শুভর একটা মেয়ে হয়েছে।বয়স তিন বছর।তানহাকে দেখতে এসেছে তারা।শুভর বউ আবার তানহার কাজিন হয়।সেইজন্য মেয়েটা তার অসুস্থতার কথা শুনে ছুটে এসেছে।

তানহাকে কাল ক্লিনিকে নিয়ে জানা গেছে গ্যাস্টিকের কারণে তার পেটে পেইন হচ্ছে।তাই দাক্তার তাকে এই সময় ভাজাপোড়া খেতে বারণ করছে।আনমলও খুব রেগে আছে তার মায়ের উপর।তারা এতো মানা করে,ভাজা,ভর্তা খেতে।তবুও তানহা মরিচ বেশি করে দিয়ে ঝাল ঝাল ভর্তা খায়।যার কারণে গ্যাস্টিক এর সমস্যা হয়ে গেছে।কাল থেকে রুদ্র তাকে আর অইসব খেতে দিচ্ছে না।আর দাক্তার বলেছে দুই একেই সিজার করানো যাবে।রুদ্র আর দেরি করবে না,হয়তো কালকেই সিজার করাবে।

ড্রয়িং রুমে সবাই গল্প করতে ব্যস্ত।রুদ্র আজ অফিসে যায়নি।তার পরিবর্তে রায়হান তালুকদার গেছেন।সে শুধু তানহার পাশে পাশে থাকছে।

~স্কুলের ইউনিফর্ম পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে জেল লাগাচ্ছে আনমল। আয়নায় নিজেকে দেখে একবার ভ্রু নাচায়, একবার দাঁত বের করে হাসে।চুল ভাজ করতে করতে ভাব নিয়ে নিজেই নিজেকে বলে উঠে,

–হ্যান্ডসাম তো পুরা বাবার কপি!”

ঠিক তখনই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলে ওঠে,

–এই ব্যাটা! তাড়াতাড়ি কর। স্কুল মিস হয়ে যাবে।”

–উফফ! আংকেল তোমরা আমায় শান্তিতে একটু সাজতেও দিবে না।ভাল্লাগে না।

বলেই আনমল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হয়।গেটের সামনে গিয়ে দাড়ালো।ড্রাইভার কাকা গাড়ি নিয়ে আসতেই আনমল উঠতে গেলে হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশের বাড়ির কলেজ পড়ুয়া সিনিয়র আপুর উপর।

আনমল হালকা হাসি দিয়ে বলে,

–আপু, আজকে তো আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে।

আপু ফিক করে হেসে ফেলে।আনমলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

–তাই নাকি পিচ্চি?

পিচ্চি বলায় আনমলের রাগ হলো।তবুও সে মুখে হাসি নিয়ে বলল

–অপ্সরা লাগছে আপু।মনে হচ্ছে দিনে দুপুরে আসমান থেকে কোনো পরি নেমে এসেছে।একদম হুর পরি।

ঠিক সেই মুহূর্তেই—

–এইইই!

শুভ এক ঝটকায় আনমলের কান মলে দেয়।

–এইসব কী শিখছিস হা? ক্লাস এইটে পড়ে এসব!?

–আহ্!ছাড়ো আংকেল ব্যথা লাগছে।পাপার কাছে কিন্তু বিচার দেব,ছারো আমায়।

শুভ কপাল কুচকে বললো,

–যেমন বাপ তেমন তার পোলা।একদম বাপ ব্যাটা ৪২০।

আনমল ব্যথায় বিরক্ত হয়ে রাগে ফুসতে ফুসতে বলল,

–তাতে তোমার কি?তুমি আমায় ছাড়বে নাকি আমি আমার হাত কেটে রক্ত দেখিয়ে পাপাকে বলবো,তুমি কেটে দিয়েছো?!

শুভ চোখ বড় করে তাকায়,

–তোর বাপ আমার কি করবে রে?ছাড়বো না আমি দেখি তুই কি করিস?

–পাপা…..!

শুভ ভয়ে আজমল কান ছেরে দিলো।আনমল ছাড়া পেয়ে বিরক্ত হয়ে কানে হাত দিল।গরম হয়ে আছে কান।ইচ্ছে করছে পাগল ছেলের মাথা ফাটাই দিতে।বেয়াদব আংকেল।

–পাপা…

ডাকতে ডাকতে আনমল উল্টো দিকে ঘাটা নেয়।বাড়ির চৌকাটে পা রাখতেই যাবে তখনই শুভ হাত ধরে টেনে আনলো,

–এই কথা তোর বাবাকে বলিস না।আমাকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে।তুই যা চাস আমি তোকে তাই দেব।তবুও বলিস না বাপ।

আনমল ভ্রু কুচকে বললো,

–সত্যি তো?যা চাইবো দেবে?

— হুম।

–তাহলে তোমার মেয়েটাকে আমার হাতে তুলে দেও!

–আনমলের বাচ্চা…..!

আনমল কথাটা বলে নাচতে নাচতে গাড়িতে উঠে গেল।শুভ কপাল কুচকে দাঁড়িয়ে আছে।শুভর দিকে তাকিয়ে আনমল ঠোঁট কামড়ে বলল,

— শশুর আব্বা! আপনার মেয়ে কিন্তু মাশআল্লাহ।

গাড়ি চলে গেল শুভর পাশ দিয়ে।শুভ রাগে বিরবির করছে। পাশ থেকে রুদ্র হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাবে এমন অবস্থা।শুভ চোখ রাঙিয়ে বলল,

–যেমন বাপ তেমন তার ছা।

_______________

বাড়ির ভেতর অদ্ভুত ব্যস্ততা। হুট করে তানহা ব্যথায় কুঁকড়ে আছে।মনে হচ্ছে আজকেই বাচ্চা ডেলিভারি হবে।অসম্ভব যন্ত্রণায় তানহা আর্তনাদ করছে।রুদ্র বিচলিত হয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আবার তানহার হাত ধরে সাহস দিচ্ছে।

–কিছু হবে না। আমি আছি।

বাড়ির সবাই মিলে ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার হলো।

স্কুল ছুটির পর আনমলকে শুভ সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে আসে। গাড়িতে বসে আনমল প্রথমবারের মতো চুপচাপ।গলা তার আটকে যাচ্ছে ভয়ে।চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে,

–আম্মু ঠিক আছে তক আংকেল?”
কাঁপা গলায় প্রশ্নটা করে সে।

শুভ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

–ইনশাআল্লাহ। কাঁদে না বাবা,তোমার মায়ের কিছু হবে না।

হাসপাতালের করিডরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। আনমল বেঞ্চে বসে দুই হাত মুঠো করে দোয়া করে।রুদ্রের চোখ প্রায় ভিজে এসেছে।না চাইতেই তানহার কষ্ট দেখে কেঁদে ফেলছে।তারপর দাক্তার জানিয়েছে বাচ্চা নাকি উল্টো দিকে ঘুরে আছে।যার কারণে তানহার কষ্টটা বেশি হচ্ছে।বেশ অনেকখানি পেট কাটতে হবে।রুদ্র বারবার পায়চারি করছে আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে।

হঠাৎ—

ডেলিভারি রুমের দরজা খুলে যায়।আনমল চমকে উঠল।বুকের ভেতর কেমন ধকধক করছে।সবাই উঠে সেখানে এসে দাড়ালো।মার্জিয়া জিজ্ঞেস করলো আমাদের প্রেসেন্ট?

নার্স হাসিমুখে বলে,

–“কংগ্র্যাচুলেশনস! একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।”

রুদ্র কথাটা কানে না নিয়েই বলল,

–তানহা কেমন আছে?আমার ওয়াইফ?

নার্স: আলহামদুলিল্লাহ মা ও সন্তান দুজনেই সুস্থ।

রুদ্রের চোখ ভিজে ওঠে।যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
আর আনমল যেন নিজ কানে বিশ্বাস করতে পারছে না।

সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকল,

–আমার বোন?

তারপর হঠাৎ চোখ চকচক করে ওঠে।

কিছুক্ষণ পর—

বাচ্চাকে একজন নার্স এসে দিয়ে যায়।রেহানা বেগম নাতিকে কোলে নিয়ে দোয়া পড়তে শুরু করলো।আনমল ভয়ে কোলে নিতে পারছে না।শুধু কাছ থেকে দেখছে।ভয়ে হাত দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না।যদি তার বোন ব্যথা পায়?রুদ্র চলে গেছে তানহার কাছে।সবাই বাচ্চা নিয়ে তানহার কেবিনে ছুটে গেল।

তানহা ঘুমিয়ে আছে।রুদ্র পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।মার্জিয়া বলল,

–ভাই,এখন অন্তত মেয়েকে কোলে নে?দেখ কি ফুটফুটে হয়েছে আনমলের বোন!

রুদ্র উঠে দাড়ালো তারপর তার মায়ের কাছ থেকে আস্তে আস্তে নিজের কোলে বাচ্চাকে নিয়ে কিছুক্ষণ সোহাগ করলো।আনমল কোলে নিতে না পেরে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে।সবাই আনমলের ফেস দেখে হেসে ফেলে।

শুভ ধীরে ধীরে আনমলকে রুদ্রের কাছে নিয়ে আসে।

–কোলে নাও… তোর বোনকে।

কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,

–ব্যথা পাবে না তো আমার বোন?

শুভ হেসে বলে,

–নিজের উপর বিশ্বাস রাখো।তারপর কোলে তুলে নেও।কিছু হবেনা।

আনমল প্রথমে ভয় পায়।

–আমি ধরতে পারবো?

রুদ্র মুচকি হেসে আলতো করে মেয়েকে তার কোলে দেয়।নার্স এসে সাহায্য করে শিশুটাকে ধরতে।আনমল খুব সাবধানে কোলে তুলে নেয়।

ছোট্ট মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে। ফরসা গায়ের রঙ,গোলাপি ঠোঁট , ছোট ছোট আঙুল।

আনমল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর ফিসফিস করে বলে,

–আমার চোখের মণি আমি তোমায় সারাজীবন আগলে রাখবো।আমি থাকতে কেউ একটা ফুলের টোকাও তোমায় দিতে পারবে না।

তানহার জ্ঞান ফিরে আনমল বাচ্চাকে কোলে নিয়ে তার মায়ের পাশে এসে বলে,

–আম্মু দেখো আমার বোন।

তানহার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।রুদ্র তানহার কপালে চুমু খেয়ে বলল,

–কান্না করো না পাগলি।মেয়ে খুব সুন্দর হয়েছে, বিয়ের সময় যৌতুক দেওয়া লাগবে না।

রুদ্রের কথা শুনে তানহা ফিক করে হেসে উঠে।অদ্ভুত ছেলেটা সারাক্ষণ মজা করে।এমন এমন কথা বলে না চাইতেও হেসে ফেলে সবাই।তানহাকে হাসতে দেখে রুদ্রও হেসে ফেলে।তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠে,

–ভালোবাসি আনমলের মা,আমনাকে অসম্ভব ভালোবাসি।

তানহা হালকা হেসে বলল,

–ভালোবাসি আনমলের বাপ,আমিও আপনাকে আকাশ সমান ভালোবাসি!

~আনমল কারো কোলে আর বাচ্চা দিচ্ছে না।সে তার বোনকে কোলে নিয়ে বকবক করতে করতে শুভর কাছে গেল।শুভর কোলে তার মেয়ে শায়না আছে।আনমল তার বোনকে দোলাতে দোলাতে শায়নকে দেখিয়ে বলল,

–দেখ বোনু তোর ননদ এটা!তোর পছন্দ হয়েছে?

শুভ দাঁত চিবিয়ে বলল,

–আনমলের বাচ্চা..!

আনমল হেয়ালি করে বলল,

–শশুর আব্বা…! আসসালামু আলাইকুম!

সমাপ্ত❤️

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ