#প্রেমাতাল
#পর্ব–১৬
#Fatema_Aktar_mim
রুদ্র চলে যাওয়ার পর পোড়া বাড়ির চারপাশে যেন হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
নদীর পানি আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তানহার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেছে।
শুভ ধীরে ধীরে তানহার কাছে এগিয়ে এলো।
–আপু..আপনি ঠিক আছেন?
তানহা কোনো উত্তর দিল না। চোখের পানি মুছে ফেলল,কিন্তু গাল বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়েই যাছে।বরাবরের মতোই নিজেকে শক্ত রাখার চেস্টা করছে কিন্তু পারছে না।আজ যেন সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে।এতো বছরের জমে থাকা কান্না সব চিৎকার করে বেড়িয়ে আসতে চাইছে।অন্ধকার পোড়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
–সত্যি রুদ্র আমি খুব স্বার্থপর।এতোটাই স্বার্থপর যে নিজের প্রিয় মানুষের ভালোর জন্য তাকেই ছেরে দিলাম।আমায় ক্ষমা করা যায় না।প্রচন্ড অহংকারী আমি।
রিফাত নিচু স্বরে বলল,
–আপু আপনি কষ্ট পায়েন না,রুদ্রের মাথা ঠিক নাই জন্য আবল তাবল বলে ফেলছে।আপনি দেইখেন সে আবার আপনাকে জ্বালাতে আসবে।আর আমার বিশ্বাস সে জুইকে কিছুতেই বিয়ে করবে না।
তানহা এবার ছলছল নয়নে রিফাতের দিকে তাকালো। তারপর মৃদু স্বরে বলল।গলা ভারী, কিন্তু দৃঢ়।
–আরে তোমরা শোনো নাই,সে কি বলল?সে আর তার অনুভূতি প্রকাশ করবে না।তার অনুভূতি নাকি আমার কাছে নাটক মনে হয়।নাটকই তো।সে তো নাটক ই করে,তাছাড়া সে কখনো কি আমার গভীরতা পড়ার চেস্টা করেছে।সে নাকি বুঝে আমি তাকে ভালোবাসি,অথচ ইগনোর কেন করি এটা খুজে বের করতে পারে না।জীবনে কখনো দেখছো তোমরা,নিজের প্রিয় মানুষকে কেউ বারবার দুরে সরিয়ে দেয়?আমি দিয়েছি।কেন দিয়েছি সে তা কখনো তালাস করলো না।আমি মুখে বলি আনমল,সেটাই বিশ্বাস করে আনমলের উপর হিংসা করে।আসল গভীরতাটা খোজার চেস্টাই কখনো করলো না।এমন নাটকবাজ ছেলেকে আমি কেন বিয়ে করবো।মুখে বলাই যায় ভালোবাসি,কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকে কইজন প্রমাণ করে?রুদ্রের ভ্রম আজ কেটে গেল।সে জুইয়ের সাথে সংসার পাতবে।আর, আমি আর আনমল তাদের জীবনে দুইদিনের অতিথি মাত্র।যা অতিথি পাখির মতো হারিয়ে যায়।
তানহার মুখে এমন কথা শুনে শুভ আর রিফাত স্তব্ধ বনে গেল।তারা এতোদিন জানতো রুদ্র তানহার জন্য পাগল।কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তানহাও রুদ্রের জন্য পাগল।যা কোনো এক কারণে চাপা পরে আছে।কিন্তু আসল কারণ কি হতে পারে?সেটা তারা ভেবে পায় না।একমাত্র রুদ্র তা জানে।হয়তো রুদ্রের ব্রেইন সেভাবে কখনো ভেবে দেখেনি।গভীর ভাবে ভেবে দেখলে হয়তো আনমলের এতোদিন ভাই কিংবা বোন হয়ে যেত।
__________
রুদ্র যখন বাড়িতে ফিরল, তখন চারপাশ আলোয় ঝলমল করছে।হাসি, গান, হলুদের গন্ধ—সবকিছুই আছে।শুধু তার ভেতরে শূন্যতা।
মা এগিয়ে এসে বললেন,
–কোথায় ছিলি তুই? সবাই চিন্তায়……
রুদ্র মায়ের চোখের দিকে তাকালো না পর্যন্ত হনহন করে উপরের ঘরে চলে গেলো।
রায়হান তালুকদার কঠিন গলায় বললেন,
–কোনো প্রশ্ন করা হচ্ছে তোকে।উত্তর না দিয়ে চলে যাওয়া এটা কোন ধরনের বেয়াদবি রুদ্র?
রুদ্র যেতে যেতে গম্ভীর স্বরে বলল,
–তোমার ছেলে কুরবানী হওয়ার জন্য প্রস্তুত আব্বা।প্রিয় মানুষের খুশির জন্য নিজেকে না হয় কুরবানী দিলাম তোমাদের কাছে।এখন তোমরা তাকে কেটে পিস পিস করে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলো।তারপর সবাই মিলে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠো।পারলে ছেলের জানাজা টাও করে ফেলো।কারণ তোমাদের ছেলে তখনই মরে গেছে,যখন এই হাতে তানহাকে আঘাত করেছে।তোমাদের কি?তোমারা এনজয় করো।
রুদ্র চলে গেলো নিজের রুমে। সবাই নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।রুদ্রের মা ছেলের কথায় ডুকরে কেঁদে উঠলো।মুখে আঁচল ধরে স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
–তোমার ছেলে এসব কি বলে গেলো?অর জানাজা করবো মানে?মা হয়ে অর কুরবানী দিচ্ছি মানে?কি হলো কিছু বলছো না যে?
রায়হান তালুকদার স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
–কিছু হয়নি এমনি সব ঠিক হয়ে যাবে।এটা তোমার ছেলের আবেগ….
— সিরিয়াসলি বাবা,এটা তোমার আবেগ মনে হচ্ছে? রুদ্রের কি এটা আবেগের বয়স?ভুলে যেওনা সে এখন যতেষ্ট ম্যাচিউর।তাই শাক দিয়ে মাছ ঢাকা তোমরা বন্ধ করো প্লিজ।আমার ভাইকে আর কেউ কষ্ট দিও না।তার এই ছোট জীবন নিয়ে খেলা দয়া করে বন্ধ করো।সে মানুষ কোনো রোবট নয়।
মার্জিয়ার কথায় রায়হান তালুকদার ধমক দিয়ে বলল,
–আমি যা করছি ছেলের ভালোর জন্যই করছি।তোমার আর জ্ঞান দেওয়া লাগবে না।দয়া করে সবাই শান্ত হও।নিজের ভাইকে গিয়ে বোঝাও ঝোকের বসে কোনো সম্পর্ক ভালো না।তাই জুইকে যেন সে মন থেকে মেনে নেয়।
রুদ্রের বাড়িতে অনেক প্রতিবেশী আর আত্মিয়স্বজন ছিলো। তারা ইতিমধ্যে সব শুনে নিয়েছে।তাদের ধারণা তানহার সাথে রুদ্রের সম্পর্ক রয়েছে।তারা কানাকানি শুরু করে দিল,”তানহা নাকি রুদ্রকে ফাসিয়ে প্রেমের জালে ফেলেছে।রুদ্রের জন্য স্বামীর ঘর ছেরে এসেছে।রুদ্রকে ফাসিয়ে এখন বিয়ে করতে চাইছে।সেইজন্য রুদ্র এতো তানহার বাড়িতে আশা যাওয়া করে।আনমলকে সব সময় কোলে নিয়ে ঘুরে।এক বাচ্চার মা হয়ে বয়সে ছোট একটা ছেলেকে খারাপ মেয়েটা ফাসিয়েছে।একজন মহিলা তো বলেই ফেলল,”তাদের নাকি ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছে সে।তাদের এখন সন্দেহ হচ্ছে,”আনমল রুদ্র আর তানহার অবৈধ সন্তান।”
আর তখনই তানহার হুংকার ভেসে আসলো।সবাই চমকে গিয়ে সেদিকে তাকালো।তানহা ভীরের মধ্যে দিয়ে এসে মহিলা টার সামনাসামনি দাড়ালো।চোখে তার আগুন জ্বলছে,ক্ষিপ্ত চোখে মজিলা টিকে দেখে মার্জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–আনমলকে দিয়ে যা মার্জু।
মার্জিয়া আনমলকে তানহার কোলে তুলে দিলো।আনমল এতো মানুষের আজেবাজে কথা শুনে ভয় পেয়ে তার মায়ের গলা জরিয়ে ধরলো।ছেলেটা কেমন কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে।তানহা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত করলো।তারপর ক্ষিপ্ত চোখে মহিলার দিকে তাকিয়ে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
–হাউ ডেয়ার ইউ! আপনার সাহস হয় কিভাবে আমার ছেলেকে অবৈধ বলার?
মহিলাটা ভয়ে থতমত খেয়ে বলল,
–তো কি বলবো,হাটুর বয়সী ছেলের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করো।আমরা কিছু বললেই দোষ। কে জানে এই ছেলের বাপ কে?আমার তো মনে হয় রুদ্রও না….
মুহুর্তেই তানহা শক্ত হাতের থাপ্পড় মারে মহিলার গালে।
আশেপাশের মানুষ তানহার ক্ষিপ্ত চোখ দেখে ভয়ে পিছিয়ে যায়।কেউ আর কিছু বলার সাহস পেলো না।রাগে আর ক্রোধে তানহার চোয়াল কাঁপছে।সে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
–আপনি আমার বয়সে বড়ো ভাবি,তাই এতক্ষণ চুপচাপ ছিলাম কিছু বলিনি।আপনি আমায় দশটা বাজে কথা বলেন সমস্যা নাই।কিন্তু আপনি আমার নিশ্বপাপ ছেলের দিকে আঙ্গুল তুলছেন।তাও তাকে দুই দুইবার অবৈধ বলছেন,প্রথমবার ভুল করে বলছেন ভেবে ছেরে দিতাম।কিন্তু একই কথা আমার সামনে দারিয়ে বুক ফুলিয়ে বলার সাহস আপনাকে কে দিলো?এই তানহাকে খানকে আপনাদের হালকা মনে হয়?যে আঙ্গুল আমার ছেলের দিকে তুলবেন সেই আঙ্গুলটায় আমি ভেঙে ফেলবো।
তানহার কথায় মহিলাটা স্তব্ধ হয়ে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।যেন সে যতেষ্ট ভয় পেয়েছে।কথা বলার শক্তিও তার মধ্যে নেই।তানহা আনমলকে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
–আর আপনাদের বলি,আপনাদের কে বলছে আমি রুদ্রের সাথে প্রেম করি?কখনো আমার মুখে শুনছেন?আমি কখনো বলছি রুদ্রকে আমি ভালোবাসি,তাকে আমি বিয়ে করবো।তাহলে আপনারা আমার ঘারে ছেলে ফাসানোর দোষ দিচ্ছেন কেন?যে বলছে আমায় ভালো বাসে তাকে কথা শোনান।আমি কেন এসব আজাইরা কথা হজম করবো।নেক্সট টাইম এসব শুনলে জিভ টেনে ছিরে ফেলবো।
কথাগুলো বলেই তানহা আনমলকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।মুহুর্তেই হলের মধ্যে যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো।রায়হান তালুকদার ক্ষেপে গিয়ে সব প্রতিবেশীদের বাইরে চলে যেতে বললো।ঠিক তখনই রুদ্রের গলা শোনা যায়।
ফ্রেশ হয়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে,পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে সিরি দিয়ে নিচে নামছে।আর কাটকাট গলায় বলল,
–আপনাদের কি মাথা খারাপ?প্রতিবেশী মানেই কুটনীতিতে সেরা।এখানে আমি বলছি তানহাকে আমি ভালোবাসি,তাকে আমি বিয়ে করতে চাই,এটা আমার কথা।তাহলে আপনারা তানহাকে কেন কটু কথা শোনান?বরং আমায় কটু কথা বলেন,”আমি তানহাকে বারবার উত্ত্যক্ত করি,আনমলকে পাপা ডাক শেখায়।এমনকি জোর করে বিয়েও করতে চাইছি আমি,অন্য মেয়ে হলে আমার মুখে জুতা মারতো।তানহা জন্য কিছু বলে নাই,সুন্দর করে আমার ছেলেমানুষী বুঝিয়েছে। আর আপনারা আসছেন সমালোচনা করতে?এখুনি বের হন সব আমার বাড়ি থেকে।
___________________
জেদের বসে রুদ্র জুইকে বিয়ে করতে চাইলেও মন থেকে কিছুতে মেনে নিতে পারছে না।আজ সন্ধ্যায় বিয়ে আর রুদ্রের সে খেয়াল নেই।রুদ্র কাল রাত থেকে গায়ে সেই একই পাঞ্জাবি পরে আছে,শরীরে মদ আর বমির গন্ধ লেগে আছে।যে ছেলে জীবনে কোনো দিন এসব পানীয় ছুয়ে দেখেনি,সেই ছেলে আজ সারা রাতে অসংখ্য মদের বোতল শেষ করেছে।খালি পেটে মদ সেবন করায় মাঝরাতে বুক আর পেটে জ্বালা পোরা শুরু হয়,এবং গলগল করে বমি করে দেয়।
ছাদের ফ্লোরে উপর হয়ে শুয়ে আছে রুদ্র।আর তার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে মদের বোতল আর অংসখ্য সিগারেটের প্যাকেট।আর পাশে গলা দিয়ে নির্গত নালা জাতীয় তরল পদার্থ ছিটিয়ে আছে।ছাদের এখন যা-তা অবস্থা।যা দেখে যে কারোই গা গুলিয়ে আসবে।
সারাদিন রুদ্রের খোজ না পেয়ে সন্ধ্যার দিকে মার্জিয়া ছাদে এসে আঁতকে উঠলো।ভাইয়ের এমন করুন অবস্থা দেখে গলা ফেটে চিৎকার করলো মার্জু।চিৎকার শুনে নিচ থেকে রুদ্রের মা-বাবা ছুটে এলো ছাদে।মুহুর্তেই সবাই আতকে উঠলো।রুদ্রের মা মুখে আঁচল চেপে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে ছেলের এমন অবস্থা দেখে।মার্জিয়া দৌড়ে গিয়ে রুদ্রকে টেনে তুলে ঘুম থেকে।রুদ্র দুর্বল শরীরে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায়।তারপর কপাল কুচকে বলে,
–কি হয়েছে?
–ভাই তুই কাল থেকে এখানেই ছিলি?
রুদ্র কপাল ভাজ করে কিছু একটা ভেবে বলে,
–সকাল হয়ে গেছে তাই না?!আর একটু ঘুমায় সবাই যা এখান থেকে!বিরক্ত করিস না।
–ভাই এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
–অহ!
বলেই রুদ্র পাক খেয়ে উঠে দারায়।তারপর হেলেদুলে হেটে নিচের দিকে যেতে যেতে বলে উঠে,
–চলো সবাই বরযাত্রি পৌছাতে আবার দেরি হয়ে যাবে।
বলেই রুদ্র গান গাইতে গাইতে নিচে নেমে গেলো।রুদ্রের মা রায়হান তালুকদারের বুকে মাথা রেখে কেঁদে কেঁদে বলে উঠে,
–আর কতো নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিবেন?এবার বন্ধ করেন এই মরণ খেলা।আমার ছেলেটা শেষ হয়ে যাচ্ছে।তার কষ্ট কি আপনার চোখে পড়ছে না।আপনি তো এমন ছিলেন না।ছেলের সুখের জন্য সব করতে পারেন।তাহলে আজ এমন করছেন কেন।
~জুইকে লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ির সাথে ভারি গহনা পরে দারুন সুন্দর লাগছে।শ্যামলা শরীরে লাল খয়েরী শাড়ি একদম ফুটে উঠেছে,এতে তার সৌন্দর্য্য দ্বিগুণ গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।মুখে তার লেগে আছে রাজ্যের হাসি,জিতে যাওয়া এক রহস্যময় হাসি।অবশেষে সে তার ভালোবাসার মানুষকে চার কালেমা পরে নিজের করে নিয়েছে।একজন মেয়ের কাছে পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর মুহুর্ত আর কিছু হতে পারে না…………..
#চলবে……..
#প্রেমাতাল
#পর্ব–১৭
#Fatema_Aktar_mim
শহরের নিরিবিলি রাস্তাটা যেন আজ তানহার মতোই ক্লান্ত।হালকা হলুদ স্ট্রিটলাইটের নিচে একা বসে আছে সে—রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে।শুধু দু একটা গাড়ি যাওয়া আসা করছে কেবল।
তানহা এক পা ভাঁজ করে, অন্য পা ছড়িয়ে মনমরা হয়ে বসে আছে ফুটপাতে।কোলে আজ আনমল নেই,বাড়িতে তার দাদা-দাদির কাছে রেখে এসেছে।অফিসে তার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো,সেইজন্য সকালের দিকেই সে অফিসে ছুটেছিল।
অফিস তো একটা বাহানা মাত্র,আসলে রুদ্রের বিয়ে থেকে সে একটু দুরে থাকতে চাইছিলো।এখন তো রুদ্রের বিয়ে হয়ে গেছে,কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছে তার।
ফুটপাতের সামনে গাড়ি থামিয়ে নিজেকে একটু শান্ত করার চেস্টা করছে সে।কারণ বাড়িতে তো আনমলের সামনে সে কান্না করতে পারবে না।এখন একটু কেঁদেই না হয় নিজেকে হালকা করে নিক।সে-ও তো মানুষ অনুভূতি তার-ও আছে।অনুভূতি দমিয়ে রাখতে রাখতে আজ সে খুব ক্লান্ত।বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা আজ সরিয়ে সে শরীরের ব্যালেন্স হারিয়ে বসে পরেছে রাস্তায়।
–ফাইনালি,রুদ্রের বিয়ে হয়ে গেছে!
কথাটা ভেবে চোখের পানি আর আটকাতে পারছে না তানহা।
চুপচাপ গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল।কোনো হাহাকার নেই, কোনো শব্দ নেই—শুধু চাপা কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছে তার।যেন এতদিন ধরে জমে থাকা কষ্ট আজ নিশব্দে বেরিয়ে আসছে।তানহার শরীরে আর এক ফোটাও শক্তি নেই যে এখান থেকে দু এক কদম ধাপ সে ফেলাবে।সে অসহায় টলমলে চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
–কেন করলে এমন রুদ্র?আমাকে দুর্বল করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারলে?তুমি না আমায় ভালো বাসো,এই তোমার ভালোবাসা?আমি তো আগেই বলেছিলাম এটা তোমার ভ্রম,তবুও তুমি কেন আমায় কথার জালে ফাসিয়ে তোমার মায়ায় ফেললে।দেখ না, তুমি আবেগে আমার পিছু ছুটতে আর আমি মুচকি হেসে নির্লজ্জের মতো একটু একটু করে নিজের মনে অনুভূতি তৈরি করলাম।আমি জানতাম এই সম্পর্ক কেউ মেনে নিবে না,তবুও আমি বেহায়ার মতো তোমাকেই ভালো বাসলাম।কি লজ্জার কথা তাই না?এক বাচ্চার মা হয়ে হাটুর বয়সী ছেলের প্রেমে পরলাম।হাহা,আসলেই লজ্জাজনক।সমাজ কর্তৃক যা গৃহিত না।তোমার আবেগ ছুটে গিয়ে তুমি তা সংসার পেলে,কিন্তু আমি পেলাম সারাজীবনের জন্য প্রিয় মানুষ হারানোর বেদনা।চিন্তা করো না,আনমলকে নিয়ে হ্যাপিই থাকবো আমি।
কথাগুলো বলেই তানহা আবার চিৎকার করে মাটিতে আঘাত করতে থাকে।পাগলের মতো হাত পা ছড়াছড়ি শুরু করে দিলো।বর্ষনের ধারার ন্যায় হু হু করে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।ম্যাচিউর মেয়েটা যেন আজ সম্পুর্ন টিনএজ দের মতো আচরণ করছে।যাকে আটকানোর মতো এই নিরিবিলি রাস্তায় কেউ নেই।দুর থেকে মানুষ পাগল ভেবে ভয়ে দৌড় দিবে।তানহা মন খুলে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে নিজের মাথার চুল নিজেই টেনে ছিরছে,
–ভালোবাসা মাই ফুট।এটা কোন ধরনের ভালোবাসা?আমার জন্য নাকি কয়েক বছর ধরে অপেক্ষা করছে,,অথচ আজ অন্য কাউকে বিয়ে করে নিলো।অপেক্ষা না ছাই,অটা তো শুধু লোক দেখানো নমুনা,,এক কথায় ফ্লার্ট করেছে আমার সাথে।আর আমি বোকা এসব ভালোবাসা ভেবে হাবুডুবু খাচ্ছি।ছ্যাহ!কি নোংরা আমি।প্রতিবেশী ঠিকই বলে,আসলেই আমি খারাপ মেয়ে,নাহলে এভাবে যারতার প্রেমে কেউ পরে।খুব খারাপ আমি।
–কুল তানহা,এসব ছেলের জন্য কষ্ট পাস না।তুইও তো অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছিলি,তাহলে রুদ্র বিয়ে করলে কি সে তোকে ভালো বাসে না?তুই যেমন পরিস্থিতির স্বীকার ছিলি,তেমন রুদ্রও তো?তাহলে তুই রুদ্রকে কেন দোষ দিচ্ছিস?সে তো শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে চায়নি,তোর জন্য করতে বাধ্য হয়েছে।তোর এতো জেদ কিসের?আমার তো মনে হয় রুদ্রের টিনএজ বয়স না তোর?
–চুপ করো আমি পরিস্থিতির স্বীকার ছিলাম রুদ্র না।সে চাইলে সমাজের সাথে লড়াই করতে পারতো।কারণ একটা মেয়ে যা পাড়ে না,তা একটা ছেলে পারে।সে আমার পাশে থেকে আমাকে আশ্বাস দিতে পারতো সারাজীবন একসাথে থাকার।কিন্তু সে তা করলো না,ক্রাশকে বিয়ে করলো।
–কিন্তু তুই রুদ্রকে সেই সুযোগ দিলি কই?রুদ্রকে তো পাশে থাকার সুযোগটাই কখনো দিস নাই।তাহলে সে তোকে আশ্বাস দিবে কিভাবে?
–সুযোগ না দিলেও সুযোগ করে নিতো।
–আর কয় বছরে বলতে পারিস?
তানহা চিৎকার করে নিজেই নিজেকে বলল,
–চুপ কর তুই,সে চেস্টা করলে আমার বিয়ে কখনো অন্য কোথাও হতো না।বেশি জ্ঞান দিতে আসিস না।
মুহুর্তেই তার ছায়ার মতো প্রতিচ্ছবি অট্টহাসিতে ফেটে পরলো।যা তানহার কানে তীব্র আকার ধারণ করেছে।যেন কান এখন ফেটেই যাবে।তানহা দুই কানে হাত দিয়ে পানির বোতল সেদিকে ছুরে দিয়ে চিৎকার করে উঠে,
–চুপ কর,সে প্রতারক, বেইমান,অভিনেতা,সে ভালোবাসা বুঝে না,বুঝলে কোথাও বিয়ে করতো না।আমি বিয়ে করেছি পরিস্থিতিতে, কিন্তু সে নিজেকে পরিস্থিতি মুক্ত করতে পারতো।কারণ সে পুরুষ মানুষ। সব সে পারে।আবার নাও পারতে পারে।সেও তো মানুষ।
মুহুর্তেই তানহা আবার কান্নায় ভেঙে পরে।তার হ্যালুসিনেশন কুয়াশার মতো তলিয়ে যায়।সে চুপচাপ বসে ফিকে ফিকে কান্না করছে।
হঠাৎ তার সামনে একটা গাড়ির শব্দ থেমে যায়।
তানহা খেয়াল করে না।শুধু দম টেনে টেনে কান্না করেই যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর ভারী একটা কন্ঠস্বর শোনা গেল,
–তানহা…
এই একটামাত্র পরিচিত ডাকেই তার বুক কেঁপে ওঠল।
এই কণ্ঠ সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনতে পারে।অভিমানে তানহা মাথা তোলে না।দ্রুত চোখ মুছে গলা শক্ত করে বলে,
— এখানে কেন এসেছো?আজ তো তোমার বাসর রাত।বউকে ফেলে আমায় বিরক্ত করতে চলে এলে?এখন অন্তত ভালো হয়ে যাও।
রুদ্র তানহার সামনে এসে দাঁড়ায়।তানহা না চাইতেও চোখ তুলে তাকায়।মুহুর্তেই তার বুক কেঁপে উঠলো।একি হাল করেছে ছেলেটা নিজের চেহারার। সদ্য হওয়া বলিষ্ঠ দেহ শুকিয়ে গেছে একদম।শরীরে বিয়ের শেরওয়ানি, চুল এলোমেলো, চোখ লাল, কিন্তু কণ্ঠ আজ অদ্ভুতভাবে শান্ত।
— আপনি কাঁদছেন কেন তানহা?কি হয়েছে আপনার? আপনি ঠিক আছেন তো?রাস্তার ধারে কেউ এভাবে পরে থেকে কাদে।উঠুন তারাতাড়ি।
তানহা হেসে ফেলে—কাঁদতে কাঁদতে হেসে ওঠা সেই ভয়ংকর হাসি।
–কেন কাঁদছি সেই কৈফিয়ত আমি তোমায় দেব নাকি?নিজের চরকায় তেল দেও।ফুটো এখান থেকে।
রুদ্র ধীরে ধীরে তার সামনে হাটু ভাজ করে বসে পড়ে।কারণ রুদ্র হাজারবার বললেও জেদি মেয়ে উঠবে না,এখানেই পরে থাকবে।তাই সে নিজেই বসে পরলো।তারপর দু’হাত কপালে রেখে বলে,
–বউ দেখাতে নিয়ে আসলাম আপু।
–মানে?
রুদ্র কপাল কুচকে বলে উঠে,
–মানে বউ দেখে আমাদের আশিরবাদ করেন সিনিয়র আপু।হাজার হোক আপনি ঘটক মানুষ। আপনার দোয়া হলে দাম্পত্য জীবন সুখের হবে।
তানহা বিরক্ত হয়ে বলল,
–বাজে বোকা বন্ধ করো।সরো সামনে থেকে।
বলেই তানহা রুদ্রকে ধাক্কা মেরে যেতে চাইলে রুদ্র তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলে।তানহা চোখ গরম করে তার দিকে তাকায়।রুদ্র বহুদিন পর তার সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি দিয়ে এক হাত বামদিকে উঁচু করে তুলে বলে উঠে,
–আগে বউ দেখেন!তারপর যাবেন
তানহা হাত ছাড়ানোর জন্য মোচরামুচরি করে দাঁত পিষে বলে উঠে,
–দেখবো না আমি।ছাড়ো আমায়?
রুদ্র আরও শক্ত করে ধরে বলে উঠে,
–কেন কষ্ট হচ্ছে?দেখতে তো হবেই আপনাকে।
তানহা হেসে বলে উঠে,
–দেখবো না আমি।
রুদ্র চোখ বন্ধ করে বলে উঠে।
–তানহা,আমাকে রাগায়েন না,চুপচাপ সামনে তাকান,নাহলে খুব খারাপ হবে।
তানহা না চাইতেও বিরক্ত হয়ে সামনে তাকালো।কারণ না তাকালে রুদ্র তাকে কখনোই ছারবে না।সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো।জুই লাল বেনারসি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে।মুখে তার মিষ্টি হাসি।দেখে তাকে বেশ ভালোই লাগছে।
–লাল বেনারসিতে নতুন বউকে খুব সুন্দর লাগছে তাইনা?আপনাকে একদম মানায় না,কেমন যেন ব্রয়লার মুরগির মতো সাদা লাগে।আর জুই কি মিষ্টি দেখতে মায়াবতী।
–হয়েছে দেখা।এখন ছাড় আমায়।বাসর ঘরে গিয়ে নিজের বউয়ের প্রসংশা কর গিয়ে।আমার সাথে কেন মরিস।ছার বলছি।
তানহার রাগী লুক দেখে।রুদ্র হেসে বলল,
–ছাড়বো এবার বড়টা দেখ?
–দেখেছি তো তোকে।এবার ছাড়।
–আমাকে না,অই দিকে….!
–মানে![তানহা অবাক হয়ে বলল]
রুদ্র হাত দিয়ে ইশারা করে শুধালো,
–অইজে দেখ জামাই।
তানহা অবাক হয়ে সামনে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।নিজের চোখে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।সে কি আদোও সত্যি দেখছে?
রিফাত শেরওয়ানি গায়ে বড় সেজে দাঁড়িয়ে আছে জুইয়ের পাশে।একদম জুইয়ের কাঁধে হাত রেখে।আর বত্রিশ টা দাঁত বের করে হাসছে।তানহার মাথা যেন চক্কর দিয়ে উঠলো।সে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
–মা-মানে, রি-রিফাত..?
রুদ্র মাথা নেড়ে বলে,
— হুম রিফাতের সঙ্গে জুইয়ের বিয়ে হয়েছে।জুই আমায় ঠকিয়ে রিফাতকে বিয়ে করে নিয়েছে গো।এবার আমায় কে বিয়ে করবে?এই বিয়ে ভাঙা ছেলের কি আর বিয়ে হবে।এইজে ঘটক আপা,”আপনি তো আছেন,আমার জন্য একটা পাত্রি খুজে দিয়েন প্লিজ।বন্ধুর আগে বাসর না করতে পারলে তীব্র অপমানে আমি শহীদ হয়ে যাব।আপনি কিছু করেন ঘটক আপায়ায়া!
তানহা রাগে রুদ্রের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়।থাপ্পড় খেয়ে রুদ্র গালে হাত দিয়ে তানহাকে এক ধমক দেয়,
–আপনার জন্য আমি বিয়ে না করে ফিরে আসলাম।আর আপনি আমায় মারছেন?কিসের কি আমায় বুকের সাথে জরিয়ে নিয়ে এতক্ষণ যেভাবে কাঁদছিলেন,ঠিক সেভাবে হাউমাউ করে কাঁদবেন।আমি মাথায় হাত রেখে সান্তনা দেব।আহা!কি সুন্দর রোমান্টিক সিন হইতো তানহা।আর আপনি কি করলেন এটা?মারতে পারলেন….
–ঠাসস….!
–আহ…!তানহা..?
আরো একটা থাপ্পড় পরলো।তানহা রাগে নাক ছিটকালো।তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে রাগে উল্টো দিকে হাটা ধরলো।
পিছনে পিছনে রুদ্র ছুটতে লাগলো।আর চিৎকার করে বলছে,
–এম সরি তানহা! আমি আরও আগে সত্যিটা খোজ না করার করার জন্য সরি।আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য সরি।আমার জন্য আপনার গায়ে কলংক লাগছে,তার জন্য আমি সরি।আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে সব কলংক মুছে দেব আই প্রমিস।আপনার জন্য শুধু ফ্যামিলি আর সমাজ কেন,পুরো দুনিয়ার সাথে লড়বো।তবুও আপনাকে ছাড়ব না।আপনার প্রতি আমার এই মন সারাজীবন মাতাল তানহা।আপনি একটা নেশা,আর সেই নেশায় মাতাল আমি।আপনি কি হবেন আমার জীবনের সঙ্গি?
তানহা রুদ্রের কথায় পাত্তা না দিয়ে বেশ খানিকটা পথ চলে গেছে। রুদ্র এতক্ষন দারিয়ে প্রপোজ করলো।জেদি মেয়ে পাত্তাই দিলো না।রুদ্র রাগে দৌড়ে গিয়ে তানহার সামনে দারায়।একদম বুক টান করে।তানহা আরচোখে রুদ্রের দিকে তাকায়।মুহুর্তে দুজনের চোখাচোখি হয়।রুদ্র তানহার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
–আনমলের মা?
— হুম?
–আপনি কি বানাবেন আমায় আনমলের বাপ?
রাগে চোয়াল শক্ত করে কটমট চোখে রুদ্রের দিকে তাকায়।তারপর মারার জন্য হাত তুলতেই রুদ্র চোখ বন্ধ করে নেয়।হঠাৎ সে বুঝতে পারলো কারো নরম অধরের ছোঁয়া তার গালে।রুদ্র চোখ খুলে তাকায়।দেখে তানহা তার গালে চুমু খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন সে এই মুহুর্তে কিছুই করেনি।রুদ্র গালে হাত দিয়ে হা হয়ে তাকিয়ে আছে তানহার দিকে। তানহা সামনে যেতে যেতে বলল,
–আপনি কি স্বেচ্ছায় আনমলের বাপ হতে রাজি আছেন?যদি থাকেন, তাহলে চলুন কাজি অফিসে।আর নাহলে অন্য পথ দিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
রুদ্র যেন নিজ কানে বিশ্বাস করতে পারছে না।সে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকলো।সে ভুল শুনলো না তো?তানহা ফের ডাকলো।
–কই গো আনমলের আব্বা।তারাতাড়ি চলুন,আনমল যে অপেক্ষা করছে তার পাপার জন্য।
রুদ্র আর দেরি করলো না,ছুটে গেল তানহার কাছে।চট করে তানহার হাত ধরে ফেললো।তানহা তাকালে রুদ্র কিছুটা ভয়ও পায়,কিন্তু ছেরে দেয় না।রাজ্য জয় করার মতো হাসি দিয়ে বুক ফুলিয়ে তানহার সাথে হাটছে। মনের সাথে পরেও কথা বলা যাবে।আগে তানহার সাথে বিয়েটা করে নেয়,বলা তো যায়না ঘোর থেকে ফিরে বলবে,আমি তোমায় কখন বলছি বিয়ের কথা?!…………..
#চলবে………..
