#প্রেমাতাল
#পর্ব-৩
#Fatema_Aktar_mim
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে।তানহা আনমলকে নিয়ে ছাদের এক কোণায় দোলনায় বসে আছে।
শহরের শব্দ এখনো পুরোপুরি থেমে যায়নি,,যানবাহন চলাচলের আওয়াজ এখনো বেজে চলছে।তার সাথে বেজে চলছে বাতাসের হালকা শোঁ শোঁ শব্দ।
পুরাতন আমলের বাড়িটা রাতের আলোয় আরও যেন রহস্যময় লাগছে।
তানহার বাড়ির ছাদটা বেশ বড়, আর চার পাশে পুরনো কার্নিশ,ছোট বড়ো নানা ফুলে ভরা।
আর ঠিক তার পাশেই রুদ্রদের বাড়ির ছাদ—দুটো ছাদের মাঝখানে শুধু একটা নিচু সীমানা দেয়াল।খুব সহজেই এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফিয়ে আশা যাবে এমন পরিস্থিতি।
~আনমলের ঘুম ভেঙে গেলেই ছাদে এসে তারা দেখার জন্য বায়না করে।এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। যদি তার আবদার না শোনা হয়,তাহলে কেঁদে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলবে।তখন উপায় না পেয়ে রাজ্যের সকল ক্লান্তি ভুলে ছেলেকে কোলে নিয়ে আকাশের তারা দেখতে হয় তানহাকে।এই ছোট ছোট তারার মাঝেই যেন আনমল আনন্দ খুজে পায়।
আনমল তার ছোট দু’হাতে তানহার গলা জরিয়ে ধরে,আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,,
–“আম্মু….অইটা..অইটা পিস্তা তালা!
তানহা হেসে উঠলো,, আনমলকে কোলের মধ্যে মিশিয়ে নিয়ে গালে চুমু খেয়ে বলল,,
–“অইটা পিস্তা তারা না বাবা…ওটা বড়ো তারা!”
আনমল গাল ফুলিয়ে মাথা নাড়ালো,,
–‘না, ওটা পিস্তা..পিস্তা তালা।
–“না, বড়ো তারা।
–“তুমি মিথ্যা বলছো,,ওটা বলো তালা না,পিস্তা তালা,,তুমি খুব পচা মাম্মা।
আনমলের কাঁদো কাঁদো ফেস দেখে তানহা হেসে ফেললো। হাল ছেরে দিয়ে বললো,
–“আচ্ছা বাবা.. ওটা পিস্তা তারা।এবার খুশি।
আনমল আঙ্গুল তুলে আকাশ দেখাতে লাগল,,
তানহা কপাল কুচকে আনমলের হাতের ইশারায় আকাশের দিকে তাকালো।আনমল দুটো জ্বলন্ত তারা দেখিয়ে বলল,
–“আম্মু…ওটা তুমি.. আর এটা আমি! তাহলে আমাল পাপ্পা কই।বলো না আম্মু পাপ্পা কথায় লুকিয়ে আছে।
মুহুর্তেই তানহার মুখের হাসি সন্ধ্যা আকাশের তারার মতো বিলিন হয়ে গেল।মুখে ফুটে উঠল বিষন্নতা,, আনমলের অসহায়ত্ব মুখ দেখে, তানহা নিরবে একটা দীর্ঘশাস ফেলে।
সব হয়েছে অই রুদ্রের জন্য, সে মাঝে মধ্যে আনমলকে এসব শেখায়। নাহলে আনমল তার বাবার কথা আগে কখনো বলতো না।কিন্তু ইদানীং ছেলেটা তার বাবাকে খুব মিস করে।বাবার কাছে যাওয়ার জন্য খুব কান্না করে,,মাঝে মধ্যে জেদ ধরে না খেয়ে থাকে। তখন ছেলেকে সামলাতে তার বেশ হিমসিম খেতে হয়।
আনমল সেই ছেলে,যে জন্মের পর থেকে কখনো তার বাবার মুখটা পর্যন্ত দেখেনি।
তানহা আনমলের কান্না থামাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় ছাদের অন্য পাশ থেকে গিটারের টুংটাং শব্দ কানে ভেসে আসছে।
তানহা বিরক্ত হলো না,একটুও চমকালো না পর্যন্ত।কারণ সে জানে এই সময় ঠিক কে ছাদের কার্নিশে বসে গিটারের সুর তুলছে।
গিটারের সুর অনুসরণ করে আনমল সেদিকে তাকালো।গোল গোল চোখে রুদ্রকে দেখে বলল,
–“আম্মু..অই পঁচা আংকেল তা..আমায় শুধু মালে,,বাজে ভাষা শেখায়,,,!
তানহা না চাইতেও গিটারের বিকট শব্দে বিরক্ত হয়ে আরচোখে রুদ্রের দিকে তাকালো,
রুদ্রের শরীরে কালো রঙ্গা ঢিলা টিশার্ট আর তাওজার পড়া।লম্বাচওড়া সুদর্শন ছেলেটার মুখে কোনো দাড়ির ছিটেফোঁটাও নেই,একদম ক্লিন সেভ করা..মৃদু বাতাসে কপালের লেপ্টে থাকা সিলকি চুল আপন মনে উড়ে চলছে। তার শীতল দৃষ্টি তানহার দিকে তাক করা,,মুখে লেগে আছে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি।
~রুদ্রের হাসি দেখে তানহা গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এই ছেলেটাকে এত অপমান করা হয়,তবুও দিনের মধ্যে দুই-তিন বার তার সামনে আসবে,,সাথে করে নিয়ে আসবে নানা অজুহাত। নিহাত প্রতিবেশীর ছেলে জন্য তানহা তেমন কিছু বলেনা। কিন্তু এখন দিনকে দিন রুদ্র তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।আগে তাকে শুধু দুর থেকে দেখতো,কাছে আসার সাহস পেতো না..এক কথায় ভয় পেতো।তবে এখন সরাসরি তাকে প্রপোজ করে।
রুদ্রের জন্য কি তানহার মনে কোনো অনুভূতি নেই? হয়তো আছে,তানহা সেটা প্রকাশ করে না।তার একমাত্র কারণ হতে পারে তাদের বয়স আর পরিস্থিতি।
~রুদ্র গিটার বাজাতে বাজাতে ধীরে বলল,,
–“এতো রাতে মা ছেলে মিলে ছাদে কি করছেন,হ্যাঁ?ঘুমান না আপনারা?
তানহা ঠাণ্ডা গলায়,
–“সেটা তোমাকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না। আমাদের থেকে দুরে থাকো তুমি।ভুলেও যেন আমার ছেলের আশেপাশে তোমায় না দেখি।
কথাগুলো বলেই রাগে আনমলকে নিয়ে অন্য পাশে ঘুরে বসলো সে।
রুদ্র হাসল।
তার সেই বিখ্যাত—বেহায়া হাসি।
ছাদের কার্নিশে বসেই,দূর থেকেই গিটার বাজিয়ে হালকা সুর ধরল।
–“i love you.
আম গাছে আম ফলে!
কুমড়ো ফলে চালে,
দুর থেকে কিস দিলাম,
তুলে নাও গালে…!🤭
তানহার শরীর রাগে গজগজ করে উঠলো। রুদ্রের দিকে তাকিয়ে, ক্ষেপে গিয়ে গানের মাঝেই বলে উঠল,
–“স্টপ রুদ্র। আমি তোমার সমবয়সী না, যে আমার সাথে সব সময় ফাজলামো করবে।চুপচাপ বসে থাকো,,,মাথা গরম কোরো না।
রুদ্র গিটার থামাল না।
বরং চোখ নিচু করে আরও নরম স্বরে গান চালাল,,
–“যদি বারে বারে একি সুরে,
প্রেম তোমায় কাঁদায়,
তবে প্রেমিকা কথায় আর প্রেমই বা কথায়..!
রুদ্রের গলার সুরটা আরো নরম হয়ে এলো।যেন চারদিকের নিস্তব্ধ রাতটাকে মুড়িয়ে ধরেছে তার কন্ঠ।তানহা বিরক্ত হয়ে রুদ্রের দিকে আর তাকাচ্ছে না,,মানে সে আর দেখতে চাইছেনা তাকে।
কিন্তু তার বেহায়া হ্রদয়ের গহিনে ঢুকে যাচ্ছে সেই মিষ্টি প্রেমের সুর।
আনমল ভয় পেয়ে তার মায়ের গলা জরিয়ে ধরে বলল,,,
–“আম্মু.. পঁচা আংকেল গান গাইছে, তুমি মাইল দিবা না!মালো আম্মু!
তানহা রাগ চেপে আনমলকে কোলে নিয়ে উঠে দাড়ালো। আনমলকে আস্তে করে বলল,
–“পাগল ছেলে,যা খুশি করুক। চলো আমরা নিচে যাই।
বলেই তানহা আনমলকে নিয়ে হাটা ধরে দরজার দিকে।
পিছন থেকে রুদ্র চেচিয়ে উঠে,
–“তানহা….!
তানহার বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো।অজানা শিহরণ ছেয়ে গেল তার সমস্ত সত্তা জুরে। কিন্তু সে তার অনুভুতিকে প্রাধান্য দিলো না।একটা নিশ্বাস ফেলে
আনমলকে শক্ত করে কোলে চেপে ধরে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু রুদ্রের কণ্ঠস্বর যেন পেছন থেকে তাকে টেনে ধরল।
–“ওইই তানহা…আনমলের মা..একবার শুনেন না আমার কথা?সরি বলার একটা সুযোগ তো দেন।
তানহা থমকে দাঁড়াল। রাগের চোটে শরীরটা কাঁপছে। সে আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল, চোখে আগুনের মতো দৃষ্টি।
–“এই ছেলে, ….নাম ধরে ডাকছো কেন?আমি তোমার থেকে বয়সে অনেক বড়ো রুদ্র?অসভ্যতামীর একটা সীমা থাকে..!বড়ো দের রেসপেক্ট করতে শেখো।
রুদ্র উঠে দাঁড়াল। গিটারটা এক পাশে রেখে ধীরে ধীরে তানহার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি নেই। বরং চোখে একধরনের গম্ভীরতা।
–“রেসপেক্ট করি জন্য এখনো আপনি করে বলছি।আর আপনি আমার বড়ো হলে কি নাম ধরে ডাকতে পারবো না?আপনি তো আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ না।তাই নাম ধরে ডাকতেই পারি।
–“আমি তোমার বোনের বয়সী, আর তোমার বোনের মতো। তাই নাম ধরে ডাকতে পারবা না।
–“আপনি আমার কোনো বোন না তানহা।আপনি শুধু আমার বুকের বা পাশে লুকিয়ে থাকা হ্রদপৃন্ড! আর হ্রদপৃন্ড ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। আপনাকে ছাড়া আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তানহা..আপনি কেন বুঝেন না…
কথাগুলো বলে রুদ্র তানহার সামনাসামনি এসে দাড়ালো।
তানহা হাত তুলে রুদ্রকে থামিয়ে দিল।
–“পিছনে যা-ও রুদ্র..কাছে এসো না।চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। এটা তোমার প্রেমের বয়স না,,এই বয়সে সবারই একটু আতটু এমন হয়..বয়স কেটে গেলে আবেগও কেটে যাবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো..!
–“আর কতো তানহা..ঠিক আর কত বছর পর আবেগ কেটে যাবে?এতগুলো বছর হয়ে গেলো এখনো তো এক ফোটাও আবেগ কমলো না!তাহলে কিসের বয়সের দোষ দিচ্ছেন আপনি,তানহা..!
তানহার ঠোঁট কেঁপে উঠল। বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।বুকের বা পাশে চিনচিন ব্যথা অনুভব করলো। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
–“তুমি যা ভাবছো, সেটা কখনো সম্ভব নয় রুদ্র। তুমি আমাকে ভুলে যাও,রুদ্র। এটা তোমার ঘোর,এমনি কেটে যাবে। আর দয়া করে, আমার ছেলের কাছ থেকে দূরে থেকো,।”
তানহা কোনো সুযোগ না দিয়ে আনমলকে নিয়ে দ্রুত পায়ে ছাদ থেকে নেমে গেল। রুদ্র স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে একধরনের অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে নিজের মনে তাচ্ছিল্য স্বরে বলল,
–“আমি এইবার তোমায় আর হারাতে পারবো না তানহা।তোমাকে আমি আমার করেই ছাড়বো।পৃথিবীর কোনো শক্তি আর আমায় আটকাতে পারবে না।তোমার পিছু আমি ছাড়ছি না।
রাতের বাতাসে তার কথাগুলো যেন ভেসে গেল। আর আকাশের তারাগুলো একে একে জ্বলে উঠল, ঠিক তানহা আর আনমলের মতো………
#চলবে…
#প্রেমাতাল
#পর্ব-৪
#Fatema_Aktar_mim
তানহা এবার মাস্টার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি সে তার দাদার বিজনেস সামলায়। তার দাদা, মোজাম্মেল খান, যথেষ্ট বয়স্ক। এই বয়সে তিনি সবকিছু থেকে পুরোপুরি অবসর নিতে পারেন নি,,ঘরে বসে সময় কাটানোর সময়ে তিনি সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করছে।তানহার মা-বাবা এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর,সকল দ্বায়িত্ব এসে পড়েছে যেন এই বুড়ো মানষটার ওপর। কিন্তু তানহার উপস্থিতি তার জীবনে নতুন এক রঙের মতো।
তানহা মাস্টার্স শেষ করবে আগে, তারপর পুরোপুরি কোম্পানিতে মনোযোগ দিবে। তবে ইদানীং বেশি সময় তার কোম্পানিকে দিতে হয়। সেই সুবাদে অনেক দিন পর ফ্রি হয়ে আজকে তানহা চলছে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে।কিছু গুরুত্বপূর্ণ নট আর ফাংশন নিয়ে কথা বলতে।আনমলকে বর্ণা আর মায়িশার কাছে রেখে এসেছে।অরা দুইজন খুব ভালোভাবে আনমলের দেখাশোনা করে।
~তানহার গাড়িটা এসে থেমেছে ভার্সিটির সদর দরজার সামনে।দু পাশে দুজন দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে লাঠি হাতে। গাড়ি থেকে নেমে তানহা ভার্সিটির ভেতরে ঢুকে পড়লো। বিশাল আকারের ভার্সিটির চারপাশে খোলামেলা যায়গার অভাব নেই। ছেলেমেয়েরা গাছের ছায়ায় গোল হয়ে বসে খোশগল্পে মেতে উঠেছে। তানহা একপলক আশেপাশে তাকালো,হঠাৎ তার চোখজোরা থেমে যায় সামনে রুদ্রকে দেখে।
রুদ্র বাইকের সাথে পিট ঠেলে দাঁড়িয়ে ফোনে গেইম খেলছিলো।পাশে দারিয়ে বকবক করছে তার সাঙ্গপাঙ্গ রিফাত আর শুভ,সাথে একজন মেয়েও আছে! মেয়েটা তাদের ফ্রেন্ড নাদিয়া। তানহাকে দেখে শুভ রুদ্রকে হাতের কুনোই দিয়ে গুতা মারে।রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,,
–মেয়েদের মতো এভাবে গায়ে পড়ছিস কেন?সমস্যা কি তোর?
শুভ রুদ্রের কাধে হাত রেখে চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে উঠলো,,
–তোর ক্রাশ এসেছে,লাল টুকটুকে পরি সেজে।
রুদ্র চোখ তুলে তাকাল। তার ভ্রু কুঁচকে গেল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই সেই পরিচিত বাঁকা হাসি তার ঠোঁটে ফুটে উঠল। তানহাকে দেখে যেন আজ সে চোখ সরাতে পারছে না,__ফরসা শরীরে লাল টুকটুকে চুরিদারি যেন ফুটে উঠেছে,,চুল বাধা,তবে সামনের ছোট ছোট চুল বাতাসে উড়ছে।
রুদ্রের চোখে মুগ্ধতার ঝিলিক, তবে সেই মুগ্ধতাকে চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করল।পাশ থেকে নাদিয়া রুদ্রের দৃষ্টি দেখে হেসে বলল,
–ভাই,তোর এই লাল পরি ক্রাশের জন্যই কি আজকাল এত ফর্মে থাকিস?
রুদ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
–ক্রাশ আর ভালোবাসার মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে, নাদিয়া। আর তানহা আমার ক্রাশ না, এটা তোরা খুব ভালো করেই জানিস।
শুভ হেসে বলল,
–কিন্তু তানহা আপু তোকে তো পাত্তা দেয়না। আর কতো বেহায়ার মতো পিছন পিছন ঘুরবি?
রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,
–সে যতোদিন আমার না হবে,ঠিক ততোদিন আমি তার পিছু নেবো।দরকার হলে সারাজীবন পিছনে পিছনে ঘুরবো, তাতে তোর কি!?
রুদ্র আর কিছু না বলে হাসলো। তবে তার চোখে একধরনের গোপন দৃঢ়তা ছিল। সে বাইকের পাশ থেকে সরে দাঁড়াল এবং তার ফোনটা পকেটে রেখে তানহার দিকে এগিয়ে গেল।
তানহা তখনও রুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। রুদ্রকে তার সামনে আসতে দেখে,সে দ্রুত পায়ে ভার্সিটির করিডোরে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু রুদ্র তাকে থামিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। তানহা রুদ্রকে ডিঙিয়ে ভেতরে যেতে চাচ্ছে,কিন্তু রুদ্র ঘুরেফিরে তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।তানহা রাগে চোয়াল শক্ত করে বলল,
–সমস্যা কি তোমার?এভাবে পথ আটকাচ্ছো কেন?
–এত সেজেগুজে ভার্সিটিতে এসেছেন কেন?
–আমার যেভাবে ইচ্ছে আমি সেভাবে আসবো, তাতে তোমার কি?
–কিছু না! তবে সুন্দর লাগছে আপনাকে! চুল খোলা রাখলে আরো সুন্দর লাগতো।
–রুদ্র ভালো করে বলছি নিজের লিমিটে থাকো!রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াও!
–ইয়ে মা,আপনার গাল এতো লাল হয়ে আছে কেন?ইসস..ইচ্ছে করছে টুস করে একটা চুমু খায়!
তানহার চোখ গুলো বড়ো বড়ো হয়ে গেলো।অজানা শিহরণে শরীরটা কেঁপে উঠলো।মুহুর্তে তার ধৈর্যের সব বাঁধ যেন ভেঙে গেল। চোখে রাগ স্পষ্ট, কিন্তু তার গাল আরও লাল হয়ে উঠল, হয়তো রাগে বা অস্বস্তিতে। সে এক পা এগিয়ে রুদ্রের দিকে ঝুঁকে বলল,
–বাজে কথা বন্ধ করো ইডিয়ট! আমি কিন্তু এইসব বেয়াদবি আর সহ্য করব না।নেহাত তোমার মায়ের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক জন্য কিছু বলছি না। লাস্ট একটা সুযোগ দিচ্ছি ভালো হয়ে যাও। নাহলে আমি সরাসরি তোমার ফ্যামিলির কাছে কমপ্লেইন করব!
রুদ্র তার বাঁকা হাসি ধরে রেখেই বলল,
–সে আপনি কমপ্লেইন করতেই পারেন…তার আগে এটা বলুন,”আপনি কি সত্যি আমায় ভালো বাসেন না?আপনার মনে কি আমার জন্য কোনো ফিলিংস নেই?
তানহার চোখ আরও বড় হয়ে গেল। সে রাগে গটগট করে পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। রুদ্র এবার আর পথ আটকানোর চেষ্টা করল না। সে শুধু দাঁড়িয়ে থেকে তানহার চলে যাওয়া দেখল।
পাশ থেকে শুভ আর রিফাত হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। শুভ বলল,
–দোস্ত,দিন দিন তোর সাহস খুব বেড়ে যাচ্ছে!আমি শুধু ভাবছি তানহা আপু তোকে থাপ্পড় মারলো না কেন?
পাশ থেকে রিফাতও বলে উঠলো,,
–আমিও তো ভাবছি,থাপ্পড়ে এতক্ষণ তোর চোয়াল বাঁকা হয়ে যাওয়ার কথা।কিন্তু আপু তোকে কিছু বললো না কেন?
রুদ্র হেসে শান্ত গলায় বলল,
–ও যতই রাগ করুক, আমি জানি, তার রাগের পেছনে অন্য কিছু লুকিয়ে আছে।সে শুধু মুখে বলে আমায় ভালোবাসে না,কিন্তু তার অন্তর অন্য কিছু বলে।সে একদিন আমার জন্য পাগল হবেই,দেখিস তোরা।
_________________
ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজতেই তানহা ব্যাগটা গুছিয়ে নিল। আজ লাইব্রেরিতে গিয়ে কিছু রেফারেন্স নোট দেখবে—আগে ঠিক করা ছিল। করিডোর পেরিয়ে লাইব্রেরির বড় কাঁচের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই সে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি টের পেল। যেন কেউ তাকে দেখছে, অনুসরণ করছে।
তানহা মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাটা সরিয়ে দিল,
–ডিস্কাস্টিক, আমি এতো রুদ্রকে নিয়ে ভাবছি কেন?না..না তার প্রতি দুর্বল হলে চলবে না,আমার রুদ্রের সাথে খোলাখুলি কথা বলতে হবে।তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে।
রুদ্র এবার অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।আর তানহা মাস্টার্স প্রথম বর্ষের।কমপক্ষে তিন বছরের রেফারেন্স তাদের বয়সের। বয়স কোনো মেটার না,,কিন্তু তানহা যে ডিভোর্সি, সেটাও না হয় মেনে নেওয়া যেতো।কিন্তু তানহার যে একটা সন্তান আছে। এটা সমাজ কিছুতে মেনে নিবে না।সবাই বাঁকা আঙ্গুল তুলবে তার দিকে,,,যে এক বাচ্চার মা হয়ে হাটুর বয়সী একটা ছেলেকে ফাসিয়েছে।সমাজের মানুষের নানা কটু কথার সম্মুখীন হতে হবে তাকে।যেটা তানহা একদম চায়না।আর তার থেকে বড়ো কথা,এই সবকিছুর প্রভাব এসে পড়বে আনমলের উপর। সবাই অকারণে বাচ্চাটাকে আঘাত করবে,খোটা দিবে,,যা তানহা মা হয়ে মেনে নিতে পারবে না।
~কথাগুলো ভেবে তানহা লাইব্রেরির ভেতরে প্রবেশ করতেই হালকা ঠান্ডা বাতাস লাগল। ভেতরে খুব একটা ভিড় নেই, কয়েকজন স্টুডেন্ট নীরবে বই পড়ছে। তানহা চুপচাপ নিজের পছন্দের টেবিলে গিয়ে বসলো। ব্যাগ থেকে নোট, পেন—সব বের করে মন দিয়ে পড়তে শুরু করল।
প্রায় দশ মিনিটের মতো সময় হয়েছে,সে এখানে বসে পড়ছে।সবাই একে একে রুম ফাকা করে চলে গেলো, শুধু একা পড়ে রইলো তানহা।
হঠাৎ লাইব্রেরির দরজা ধাক করে বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
তানহা চমকে পেছনে তাকালো।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র।শরীরে সাদা শার্ট-প্যান্ট, গলায় টাই ঝুলানো, চুলগুলো মৃদু বাতাসে উড়ছে।মুখে সেই দুষ্টু হাসি,
হাতে লাইব্রেরির চাবি নিয়ে ঘোরাচ্ছে,,
বিরক্তিতে তানহার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল।
–ক-কি করছো তুমি? দরজা লক করলে কেন?
রুদ্র চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে, গম্ভীর গলায় বলল,
–কেন ভয় পাচ্ছেন..যদি কিছু করে ফেলি?আরে ভয় পাবেন না,কিছু করবো না,,শুধু আমার উত্তর জেনে চলে যাবো।
তানহার শরীর ভারি হয়ে এসেছে।হাজার হোক রুদ্র তার ছোট,, কিন্তু এখন তো সে ছোট না,,প্রাপ্ত বয়স্ক একজন ছেলে।সে যখন এত কাছাকাছি চলে এসেছে..তাহলে ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক। তানহা অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলে নিলো। ঠোঁট কামড়ে রাগ চেপে বলল,
–রুদ্র! এসবের মানে কি? দরজা খুলে দেও প্লিজ,মানুষ খারাপ ভাব্বে আমায়।তোমার সাথে আমি বাসায় ফিরে কথা বলবো।
রুদ্র কোনো কথা না বলে তানহার টেবিলের দিকে আরেক পা এগিয়ে বলল,
–আপনি আমার থেকে শুধু পালিয়ে যান.. তাই ভাবলাম আজ একটু ভিন্নি ভাবে নিজের প্রশ্নের উত্তর গুলো জেনে নেই।
তানহা উঠে দাঁড়াল।রাগে চোয়াল শক্ত করে বলল,
–লিমিট পার করছো তুমি রুদ্র!
রুদ্র মাথা নিচু করে হেসে বলল,
–আপনি রেগে গেলে আরও সুন্দর লাগে। সত্যি বলছি।
তানহার গাল আবার লাল হয়ে উঠল,রেগেমেগে রুদ্রকে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতেই রুদ্র তার সামনে এসে দাঁড়াল। ইচ্ছাকৃতভাবে নয়—তবে খুব কাছাকাছি। এতটাই কাছে যে তানহার নিশ্বাস তার বুক ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনেই থমকে গেল।তানহা চোখ তুলে রুদ্রের দিকে তাকালো,মুহুর্তে দুজনের চোখাচোখি হলো।
রুদ্র নিচু স্বরে বলল,
–আপনি যতই আমাকে এড়িয়ে চলেন না কেন,আমি আপনার চোখের ভাষা পড়তে পারি! আপনি আমায় ভালোবাসেন তাহলে কেন মেনে নিচ্ছেন না?কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন?
–তুমি আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট জানো নিশ্চয়ই,?
–ভালোবাসা বয়স মানে না,এই সামান্য বয়সে আমার যায় আসে না।আমি আপনি নামক মানুষটাকে ভালোবাসি,বয়স নিয়ে ভাবার সময় নেই আমার।
–কিন্তু আমার আছে।সমাজে আমার একটা রেপুটেশন আছে।পরিবারের মান ইজ্জত আমি ডুবাতে পারবো না।সমাজের মানুষের প্রভাব পরবে আমার উপর,, তুমি ছোট তাই পার পেয়ে যাবে।কিন্তু সব ঝড় বয়ে যাবে আমার আর আনমলের ওপর।আমি আমার ছেলেকে নিয়ে যতেষ্ট হ্যাপি আছি।তাই দয়া করে আমার পিছু নেওয়া বন্ধ করো।আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দেও।
রুদ্রের চোখ রাগে জ্বলজ্বল করছে।চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে প্রায়।কথাগুলো বলেই তানহা রুদ্রের দিকে না তাকিয়ে দরজার দিকে যেতে যাবে, ঠিক তখনই রুদ্র ঝড়ের গতিতে তানহাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে………
#চলবে…….
