Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রণয় প্রহেলিকাপ্রণয় প্রহেলিকা পর্ব-৩১+৩২

প্রণয় প্রহেলিকা পর্ব-৩১+৩২

#প্রণয়_প্রহেলিকা (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৩১তম_পর্ব

সকলের একটাই কথা,
“শেষমেশ বাচ্চার কাছেই হৃদয় হারালি?”

অনল তখন গর্বের সাথে বললো,
“তাহলে বুঝে দেখ আমার বউটি কতো গুণী, আমার হৃদয় চুরি করা যার তার কাজ নয়।”

ধারা তো লজ্জায় পারলে মিশে যায়৷ না চাইতেও এতোবড় অনুষ্ঠানের মধ্যমনি সে৷ এর মাঝেই একজন বলে উঠে,
“অনন্যা দেশে ফিরেছে, জানিস?”

অনন্যার কথাটা কর্ণপাত হতেই অনলের হাসিটা মিলিয়ে গেলো। হাসিখুশি মুখখানা হয়ে উঠলো গম্ভীর। নামটিকে যেনো সহ্য হয় না তার। এতোটা বিরক্তিও কোনো মানুষের প্রতি আসতে পারে জানা ছিলো না। ঈষৎ বিরক্তিভরা কন্ঠে বললো,
“তা আমি কি করবো?”

যে ব্যাক্তিটি কথাটা বললো সে অনলের প্রত্যুত্তোরে খানিকটা ভড়কালো, ঘাবড়ালো। রয়ে সয়ে বললো,
“ও এখানে আসছে তো তাই বললাম। আসলে পরশু ওর সাথে ফোনে কথা হলো। সপ্তাহ খানেক হয়েছে দেশে এসেছে। রি-ইউনিয়নের কথা উঠতেই উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলো। আমিও বললাম চলে আয়। ও এখন অন দ্যা ওয়ে”

কথাটা শেষ হতে হতেই ব্যাক্তিটি বললো,
“নাম নিলাম আর অনন্যা হাজির”

বলেই রুমের গেটের দিকে তাকালো। কালো শাড়ি পরিহিত নারীর আগমন ঘটলো। সৌন্দর্য জিনিসটা চোখের ধাঁধা। কিন্তু মেয়েটির সৌন্দর্যটি চোখের ধাঁধা নয়। হলুদ ফর্সা বর্ণের নারীটির টানা টানা চোখের প্রেমে অনেক পুরুষই তার হৃদয় দিয়েছিলো। পাতলা ঠোঁটের টোল পড়া হাসির কাতর অনুভূতিতে মগ্ন ছিলো অনেকেই। ঘন কালো চুলগুলো খোঁপায় আটকে রেখেছে। এখনো মনে হচ্ছে নারীটি তার যৌবনের শীর্ষে আছে। নারীটি ই অনন্যা। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তার ক্রাশ লিস্ট গুনে শেষ করা যায় না। ধারা অপলক নজরে তাকিয়ে রইলো নারীটির দিকে। আভিজাত্য তার চলনে। সত্যি ই যেনো কেট মিডেল্টন। ধারা আড়চোখে তাকালো অনলের দিকে। তার ভ্রু কুঞ্চিত৷ মুখশ্রী কঠিন। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। কি চলছে তার মনে! তখন ই স্মৃতি তার হাত ধরে বললো,
“এখানে এদের মাঝে বোর হবে ধারা। এদিকে আসো”

তার সাথে রবিনের বান্ধবী তানিও ছিলো। ধারা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। তারপর তাদের সাথে প্রস্থান করলো। তবে অনন্যার সাথে কথা বলার ইচ্ছেটা রয়েই গেলো।

অনল এখনো চেয়ে রয়েছে অনন্যার দিকে। মেয়েটিকে বহুবছর দেখছে সে। কিন্তু অন্তস্থলে জড়ো অসীম ক্রোধগুলো যেনো এখনো জীবন্ত৷ স্মৃতিগুলো এখনো তপ্ত। বাহ্যিক সৌন্দর্য্যে মানুষ মোহিত হয় কিন্তু ভেতরের কুৎসিত হৃদয়টা এড়িয়ে যায়। অনন্যার ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য। চিন্তার ঘোরে ছেদ পড়ে যখন রবিন তার ঘাড়ে হাত রেখে বিদ্রুপের স্বরে বললো,
“তাহলে অনন্যার সাথে দেখাটা হবেই। ভাই তুই তো গেছিস! এক দিকে বউ অন্য দিকে প্রাক্তন!”

রবিনের কথায় ভ্রু কুঞ্চিত হলো অনলের৷ কাঠ কাঠ গলায় বললো,
“প্রাক্তন মানে? শুধু বান্ধবী! তাও কিছুদিনের”
“তাই নাকি! তা ওই যে রান্না করে আনতো! তোর পেছনে ঘুরতো! লাইব্রেরির মূহুর্ত!”

রবিনের কথা শেষ হতেই অনল আড়চোখে ধারার দিকে তাকায়। সে তানি এবং স্মৃতির কাছে গল্পে মশগুল। অর্থাৎ রবিনের আজগুবি কথাগুলো সে শুনে নি। অনল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“তোর মতো বন্ধু থাকলে শত্রুর অভাব হয় না। চুপ করে যা! নয়তো তোমার কলস ভাঙ্গতে সময় লাগবে না। তানি জানে লেডিস হোস্টেলের নিচে দাঁড়িয়ে শশীর জন্য মেডিসিন কিনে দেওয়া? নোট পাস করা! জানে?”

এবার কেশে উঠলো রবিন৷ মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বললো,
“ছাড় না, অতীত তো!”
“ও, তোমার বেলায় অতীত। আর আমার বেলায় প্রাক্তন, তাই না? কান খুলে শুনে রাখ, অনন্যা শুধু আমার বান্ধবী ছিলো৷ ও আমাকে পছন্দ করতো এটা ওর ব্যাপার। আমার মাথা ব্যাথা নয়। শুধু শুধু আমার ছোট বউ এর মাথায় আজাইরা কিছু ঢুকাবি না। নয়তো তোর বিয়ে হবার আগেই ভেঙ্গে দিবো”

অনলের হু’ম’কি কাজে দিলো। প্লাবণ এবং ইকরাম হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার অবস্থা। রবিনটাকে কখনোই নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। কিন্তু প্রেমে পড়ে আজ সেও কাঠির মতো সোজা হয়ে গেছে। প্লাবণ টপিক বদলায়। কারণ সে জানে অনন্যার টপিক আরেকবার উঠলে অনলের মেজাজ বিগড়াবে৷ দেখা যাবে সব ছেড়ে বাড়ি চলে যাবে। অনল ও আর মাথা ঘামালো না। জীবনে এমন অনেক মূহুর্ত আসে যখন চরম অপছন্দের মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। এটা তো হবার ই ছিলো। তাই বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ায় বুদ্ধিমানের। এতো সুন্দর সন্ধ্যা নষ্ট করার মানে নেই।

দেখতে দেখতে সময় পেরিয়ে গেলো। খাওয়া দাওয়া সেরে অনল ধারার হাতটি নিজের মুঠোবন্দি করে বললো,
“কেমন লাগলো?”
“ভালো”
“তাহলে যাওয়া যাক”
“হু”

অনল এবং ধারা সকলকে বিদায় দিয়ে প্রস্থান ই করবে এমন সময় একটি চিকন নারী কন্ঠ শোনা গেলো,
“অনল”

কথাটা শুনতেই পিছনে ফিরলো ধারা। অনন্যা তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। ধারা তার শার্ট টেনে বললো,
“আপুটা তোমাকে ডাকছে বোধ হয়”

অনল তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো অনন্যার দিকে। না চাইতেও এখন ভদ্রতার খাতিরে কথাটা বলতেই হবে। অনন্যা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে স্মিত হাসলো। তারপর বললো,
“তুই চলে যাচ্ছিস? অথচ আমাদের তো কথাই হলো না।”

অনল উত্তর দিলো না। তার মেজাজ সংবরণ করা কঠিন হয়ে গিয়েছে। অনন্যা অনলকে মৌন থাকতে দেখে ধারার দিকে তাকালো। কৌতুহলী কন্ঠে বললো,
“তুমি অনলের বউ?”
“জ্বী, আমি ধারা”
“আমি অনন্যা। তোমার স্বামীর খুব ভালো বন্ধু, যদিও একটু মনোমালিন্য চলছে। তোমার বর একটু রেগে আছে আমার উপর”

বলেই হাত বাড়িয়ে দিলো। ধারাও তার সাথে হাত মিলালো। অনল এখন ও মৌন। অনন্যা একটু থেমে বললো,
“এখনো আমার উপর রাগ করে আছিস? ব্যাপার না৷ দেশে যখন ফিরেছি তোর রাগটাও ভাঙ্গিয়ে দিবো। ভুল আমার ছিলো। আমি মানছি। কিন্তু এই পুরোনো কথাগুলো ছেড়ে দে। আমরা আবার ফ্রেন্ড হতেই পারি।”
“আমার যে স্বার্থপর মানুষ পছন্দ নয় অনন্যা। যারা আমার মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খায় তাদের থেকে আমি দূরে থাকি। চল ধারা। মাথা ব্যাথা করছে”

কাঠ কাঠ কন্ঠে কথাগুলো বললো অনল। তারপর ধারার হাত ধরে বেড়িয়ে গেলো। অনন্যা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। ভেবেছিলো সকলের সম্মুখে অনলের সাথে কথা বললে হয়তো অনল বাধ্য হয়ে তার সাথে কথা বলবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বরং উপস্থিত সবাই এর মাঝে গুঞ্জন শুরু হলো। অনল এবং অনন্যার কথাটা প্রায় সকলের ই জানা। অনলের এমন ব্যাবহারে তারা নিশ্চুত হলো তাদের মাঝে কিছু একটা তো ঘটনা আছেই। প্লাবণ এবং রবিন মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। অনলের রাগ সম্পর্কে তারা বেশ ভালোভাবেই অবগত।

হোটেল থেকে বের হবার পর থেকেই চুপ করে রয়েছে অনল। তার মুখে কোনো কথা নেই। কঠিন মুখে বাইক চালাচ্ছে। চোখ পিচঢালা রাস্তার দিকে। ধারার মনে হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। প্রশ্নগুলো অনন্যাকে ঘিরে। অনল এবং অনন্যার মাঝে কি এমন মহাকান্ড ঘটেছিলো যে প্রিন্স উইলিয়াম কেট মিডেল্টনের মুখ দর্শনেও বিরক্ত। তাদের বন্ধুত্বে ফাটল বাধলো কেনো! সেও কি দিগন্তের মতো কান্ড করেছে! কথাটা ভাবতেই স্নায়ুকোষে দিগন্ত নামটি উদয় হলো। ধারাদের বন্ধুমহলেও ফাটল ধরেছে। দিগন্তকে সকল জায়গা থেকে ব্লক করে রেখেছে। কোনোভাবেই যোগাযোগ করার সুযোগ রাখে নি। মাহির সাথে দু-তিনবার কথা হয়েছে। সে ইনিয়ে বিনিয়ে এক-দুবার দিগন্তের হয়ে আর্জি গিয়েছিলো। কারণ পাঁচজনের মধ্যে দুজনের ঝামেলা হলে বাকি তিনজন হয়ে যায় অনাথ। তারা এই পক্ষেও যেতে পারে না আবার ওই পক্ষেও যেতে পারে না। ফলে তারা চায় যেনো এই গ্যা’ঞ্জা’মে’র একটা সমাধান হোক। অভীক, নীরব এবং মাহিও চায় এই মনোমালিন্য দূর হোক। পাঁচজনের বন্ধুমহল টা অক্ষত থাকুক। অভীক এবং নীরব সুপারিশ করতে আসলে ধারা তাদের আস্তো রাখবে না। ফলে তারাই মাহিকে ওকালতি করার পরামর্শ দিয়েছে। দিগন্ত ও বেশ অনুতপ্ত তবে ধারার সাথে কথা বলার উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। কিন্তু ধারা মাহিকেও ফিরিয়ে দিয়েছে। সরাসরি মানা করে দিয়েছে সে। যে মানুষ বন্ধুত্বের মর্ম বুঝে না, তাকে বন্ধু বলে মানে না ধারা। হঠাৎ স্পিড ব্রেকারের কারণে বাইক নড়ে উঠলো। সাথে সাথেই চিন্তার ঘোর ভাঙ্গলো ধারার। টাল সামলাতে না পেরে আকড়ে ধরলো অনলের শার্ট। তখন ই অনলের গম্ভীর পুরুষালী স্বর কানে আসলো,
“ধরে বয়, একটা মোড় নিলেই তো কুমড়োর মতো গড়িয়ে পড়বি”
“খেয়াল করি নি”
“তা করবি কেনো? ভাবনায় তো ম্যাডাম তখন জাহাজ বানাচ্ছিলেন।”

ধারা উত্তর দিলো না। শুধু শক্ত করে অনলকে ধরে বসলো। মাথা ঠেকালো অনলের কাধে। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস অনলের শার্ট ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছে। মৃদু বাতাস বইছে। আকাশে নিকষকালো মেঘের আনাগোনা। চাঁদটি নেই। ফলে আঁধার যেনো আরোও ঘন। রোড লাইটের সোডিয়াম আলোটুকুই পড়ছে ধারার মুখে। আলো আধারীর মায়ায় ধারাকে ফ্রন্ট মিররে দেখতে ভীষন মায়াবতী লাগছে। যেনো মায়ানগরীর কোনো সিন্ধুপুষ্প। অনল হাসলো। মসৃণ, স্মিত হাসি। বা হাত টা ব্রেক থেকে সরিয়ে কোমড়ে থাকা ধারার হাতটি ছুলো আলতো ভাবে। অমলিন কন্ঠে বললো,
“তুমি প্রণয়ে বাধিবে
নাকি প্রহেলিকায় রাখবে?
আমি প্রণয়ন তোমায় চাই
প্রহেলিকার দ্বার খোল
চলো হৃদয়ে হারাই” (জান্নাতুল মিতু)

ধারা আরোও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অনলকে। তার মুখে স্নিগ্ধ হাসি। হাসিটি তৃপ্তির, হাসিটি সিন্ধুসমান সুখ প্রাপ্তির__________

********

পড়ন্ত বিকেল। কফি হাতে দাঁড়িয়ে আছে দীপ্ত। তার নজর রক্তিম সূর্যের দিকে৷ নীল আকাশ তার শেষ প্রান্তের চাকতির ন্যায় রক্তিম অস্তগামী সূর্য। পাখিরা উড়ে যাচ্ছে নিজ নিজ নীড়ে৷ দীপ্ত তখন গরম কফিতে চুমুক দিচ্ছে। ধুলোউড়ানো উষ্ণ, ব্যাস্ত দিনের অবসান। ব্যাস্ত শহরের কোলাহল এখন শেষ হবে। কিন্তু তার জীবনের কোলাহলগুলো থামার নাম নেই। রোকসানা আন্টি অতীষ্ট এই ঢাকার জ্বালাময়ী উত্তাপে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েদারে অভ্যস্ত নারী ঢাকার এই উত্তাপকে নাকোচ করছে। তারপর এতো ছোট বাসায় সে থাকতে পারছে না। তার পারি চার ভাগের এক ভাগ ও নয় এই বাসা। উপরন্তু পানির সমস্যা আলাদা৷ এসিও লাগান নি সেলিম সাহেব। তার মনে হচ্ছে অহেতুক খরচা। এখানে তো ঘর বাঁধতে আসা হয় নি৷ আর পুরোনো বাসা হওয়ায় এসি লাগাবার সিস্টেম নেই। মিস্ত্রী এনে লাইন করা, হাবিজাবি— কি দরকার! ফলে রোকসানার নাকি দমবন্ধ হয়ে আসে। উপরন্তু ইঁদুরের উৎপাত। কোথা থেকে তাদের তিনজনের কাপড়ের বক্সে ইঁদুর ছানার উপদ্রব হয়েছে কে জানে। প্রতিটি জামা কেটে ফালাফালা। ফলে আবারো জামা কিনে হয়েছে। কিন্তু ইঁদুর সমস্যার নিস্পত্তি হয় নি। প্রায় অন্ধকার রুমে তাদের আনাগোনার আভাষ পাওয়া যায়। দীপ্ত বহুবার ঔষধ ও এনেছে। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। মরে যেনো আবার আসে তারা৷ যেনো কেউ প্রতিনিয়িত নিয়ম করে তাদের বাড়ি ইঁদুর সাপ্লাই করছে। ব্যাপারটা সন্দেহীন। কিন্তু দীপ্তের কিছু যায় আসছে না। সে নির্বিকার। সে বরং ইঞ্জয় করছে। যখন রোকসানা ইঁদুর দেখে ছুটে সোফার উপর উঠছে তখন দীপ্তের মনে হচ্ছে সে কোনো মিউট কমেডি স্কেচ দেখছে। ভাবতেই আয়েশ করে কফির মগে চুমুক দিলো দীপ্ত। ঠিক সেই সময়েই রোকসানার আগমন ঘটলো। তার মুখশ্রী রক্তিম এবং কঠিন। তেজী স্বরে বললো,
“আমি দেশে ফিরবো। আমার এখানে আর ভালো লাগছে না”
“তাহলে কবের টিকিট কাটবো?”
“আজকের ই”
“আচ্ছা”

নির্বিকার স্বরে বললো দীপ্ত। রোকসানা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো,
“কেনো যেতে চাচ্ছি শুনবে না?”
“ইঁদুর, গরম বা দমবন্ধ লাগার জন্য?”
“না, তোমার আংকেলের উইল পড়েছি। জানো সে উইলে কি লিখেছে?”
“কি?”
“তার মৃত্যুর পর তার সকল সম্পত্তির চার ভাগের দু ভাগ পাবে ধারা, এক ভাগ আমি এবং এক ভাগ তুমি। এটার কোনো মানে হয়? যে মেয়ে তাকে উঠতে বসতে অপমান করছে তার জন্য সে সম্পত্তিও রাখছে। উপরন্তু আমাকে আর তোমাকে কষ্ট ও দিচ্ছে। এর বিহিত হওয়া চাই না?”

দীপ্ত চুপ করে রইলো কিছু সময়৷ তারপর চিন্তার ভাব করে বললো,
“ঠিক বলেছেন আন্টি। এর তো বিহিত হওয়াই চাই। উনি শুধু শুধু আমাকে উনার উইলে কেনো জড়িয়েছেন? আমার অংশটিও তো ধারার প্রাপ্য”
“কি বলছো তুমি দীপ্ত!”
“ভুল কি বললাম। আংকেলের লিজিট ডটার তো ধারা। আই এম নোওয়ান। আমাকে কেনো ইনভলভ করা হচ্ছে! আই হ্যাভ টু স্কিপ উইথ হিম”

রোকসানা ভ্রু কুঞ্চিত করে বিস্মিত নজরে চেয়ে রইলো দীপ্তের দিকে। দীপ্ত নির্লিপ্ত। ফলে বাধ্য হয়ে বললো,
“তাহলে তুমি তার সাথেই থাকছো?”
“কাজ না হওয়া অবধি আমি এখানেই থাকছি। আপনার টিকিট করে দিচ্ছি। শুধু শুধু কেনো এই ঝঞ্জাটে থাকবেন”
“লাগবে না”

বলেই রোকসানা নিজ ঘরে চলে গেলো। ঠাস করে দরজা আটকে দিলো সে। দীপ্ত নির্লিপ্ত হাসলো। রোকসানার এই স্বভাব তার জানা। সে যাবে না, কারণ তার ভয় আমে দুধে যদি মিলে যায়________

*******

অবশেষে নিজ ভার্সিটিতে পা রাখলো ধারা। এখন সে সেকেন্ড ইয়ারে। নতুন নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে ভার্সিটির প্রাঙ্গনে। বেশ জড়ো সড়ো হয়ে কচি মুখগুলো ছুটছে নিজ নিজ ক্লাসে। স্বপ্ন পূরনের যুদ্ধে এবার নবযাত্রী এসেছে। কৃষ্ণচূড়া গাছটি এখন আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। সে গাছের নিচেই দাঁড়িয়ে আছে ধারা। অপেক্ষা মাহির আগমনের৷ মাহি আসলেই একত্রে নতুন ক্লাসে পা রাখবে। তপ্ত রোদের নিচে কপালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ধারা৷ সূর্যমামার উত্তাপে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। সাদা ওড়নাড়ি দিয়ে কপাল মুছে নিলো সে। তখন ই আগমন ঘটলো মাহির। উত্তাপে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য যেই ক্রোধবানী উগরাবে তার আগেই খেয়াল করলো নীরব, অভিক এবং দিগন্ত তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। দিগন্তকে দেখতেই ধারা উলটো দিক হাটা দেবার প্রস্তুতি নিলো। শান্ত আগ্নেয়গিরির লাভা আবারোও তার প্রচন্ড রুপ নেবার আগেই সরে যাওয়া শ্রেয়। কিন্তু তার আগেই দিগন্ত অসহায় কন্ঠে বললো,
“আমাকে ক্ষমা করে দে ধারা। আমি সেদিন সত্যি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম”…………..

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

#প্রণয়_প্রহেলিকা (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৩২তম_পর্ব

দিগন্তকে দেখতেই ধারা উলটো দিক হাটা দেবার প্রস্তুতি নিলো। শান্ত আগ্নেয়গিরির লাভা আবারোও তার প্রচন্ড রুপ নেবার আগেই সরে যাওয়া শ্রেয়। কিন্তু তার আগেই দিগন্ত অসহায় কন্ঠে বললো,
“আমাকে ক্ষমা করে দে ধারা। আমি সেদিন সত্যি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম”

দিগন্তের কথাটা স্নায়ুকোষে প্রবেশ করতেই রেষারেষি শুরু হলো। সে কি শুধু বাড়াবাড়ি করেছিলো! হয়তো শুধু বাড়াবাড়ি হলে ধারা তাকে ক্ষমা করে দিতো। কিন্তু সে রীতিমতো ধারাকে অপমান করেছে তাও ডিপার্টমেন্ট করিডোরে বহু মানুষের মাঝে। শুধু ধারাকে নয় সে অনলের সততাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বহুবার। উপস্থিত সকলের মনে না চাইতেও অনল স্যারের সততা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। এই মানুষটাকে ক্ষমা করা যায় কি! আচ্ছা, আঘাত করে ক্ষমা চাইলেই কি আঘাতের ক্ষত দূর হয়ে যায়! ধারা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো৷ একটা কথাও বললো না, শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দিগন্তের দিকে। হ্যা! বন্ধুত্ব সত্যি অদ্ভুত একটা সম্পর্ক৷ সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে পরিবারটা বেছে দেন। পরিবার, আত্নীয় বাছাই করার উপায় মানুষের থাকে না। কিন্তু এই বন্ধুর নির্বাচন মানুষ নিজে করে৷ তারা তাদের মনের সাথে মিলে এমন বন্ধু বাছাই করে। কিছু কিছু বন্ধুত্ব তো পরিবারের মতো হয়৷ ধারার বন্ধুমহল টিও ঠিক তেমন ছিলো। দিগন্তের সাথে তার বন্ধুত্বটি একটা বছরের৷ কিন্তু এই এক বছরে সুন্দর মূহুর্ত অগণিত। এই সকল সুন্দর মূহুর্তগুলো তিক্ততায় পরিণত করেছে সেদিনের উক্তিগুলো৷ চাইলেও মস্তিষ্ক সেই উক্তিগুলো ভোলাতে পারছে না। হয়লো প্রিয় বন্ধুটি এমন কটুক্তি করেছিলো বলেই আঘাতটা গভীর। ধারাকে নিশ্চুপ দেখে দিগন্ত নরম কন্ঠে বললো,
“ধারা আমি সত্যি অনুতপ্ত৷ সেদিন আমি তোকে এতো বাজে কথাগুলো বলেছি, আমি নিজেই লজ্জিত। আসলে আমার অনেক রাগ হয়েছিলো। প্রথমত অনল স্যারকে আমি অপছন্দ করি। দ্বিতীয়ত আমার কিছু ব্যক্তিগত কারণ ছিলো, যা তোকে বলা সম্ভব নয়। ফলে ক্রোধে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার কথাগুলো তোর কাছে অযুহাত মনে হবে। ক্রোধের বশে তোকে অপমান করাটা যৌক্তিক নয়৷ কিন্তু ওই সময় আমার মানসিক অবস্থাটা তোকে বোঝাতে পারবো না। যখন তুই আমার সাথে কথা বলা ছেড়ে দিলি, মুখ ঘুরিয়ে নিলি তখন বুঝলাম আমি কি অমূল্য জিনিস হারিয়েছি। আমি অতিরিক্ত লোভী হয়ে উঠেছিলাম। এই বন্ধুত্বটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিলো। আমাদের পাঁচজনের কাটানো প্রতিটি মূহুর্ত আমার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য মূহুর্ত। আমি তোর বন্ধুত্ব হারাতে চাই না ধারা। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে”
“দিগন্ত, বন্ধুর দ্বারা অপমানিত হবার থেকে জঘন্য জিনিস আর কিছুই হয় না। সেই আঘাত গুলো মনে দাগ কেটে যায়। তুই আমার উপর রাগ দেখালে হয়তো আমি কিছুই মনে করতাম না৷ কিন্তু তুই শুধু আমাকে না অনল স্যারকেও অপমান করেছিস। সেদিন যে যে সেখানে উপস্থিত ছিলো তুই কি তাদের মন থেকে সব কিছু মুছিয়ে দিতে পারবি। আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা বদলাতে পারবি? পারবি না। কাঁচ ভাঙ্গলে সেটা জোড়া ঠিক ই লাগে তবে দাগ থেকে যায়।”

ধারা শান্ত কন্ঠে কথাগুলো বললো৷ দিগন্ত নত মস্তক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। লজ্জার জন্য তাকাতেও পারছে না সে। বুকের ভেতর কাতর অনুভূতিগুলো অস্থির হয়ে উঠেছে। চিনচিনে বিষাদেরা পাথরের মতো চেপে আছে বুকের উপর। না চাইতেও বার বার হানা দিচ্ছে বন্ধুত্ব চুরমার হবার আশঙ্কা। ধারা দাঁড়ালো না। সে পা বাড়ালো ক্লাসের দিক। মাহিও তার পিছু নিলো। নীরব এবং অভিক রইলো দিগন্তের সাথে। অভিক স্বান্তনা দিলো,
“ধারার অভিমান হয়েছে। এখন এই অভিমানিটা তোর ই ভাঙ্গাতে হবে। ভুল যেহেতু করেছিস সুতরাং সেটার মাশুল ও গুনতে হবে”
“দোস্ত আমাদের বন্ধুমহলটা আমার জন্য নষ্ট হয়ে গেলো”
“যদি বন্ধুমহলের জোড় এতো ঠুঙ্কো হয় তবে আমার মনে হয় তা ভেঙ্গে যাওয়া শ্রেয়। আর আমাদের বন্ধুত্বের জোড় যদি কঠিন থাকে তবে এই ঝড় তুফানেও তা অক্ষত থাকবে। জীবনটাতো মসৃণ নয়। মুখ লম্বা করে দাঁড়িয়ে থাকিস না। চল ক্লাসে”

শান্ত কন্ঠে নীরব কথাটা বললো। নীরবের কথাগুলো সর্বদাই আধ্যাত্মিক ধরণের হয়৷ তবে তার কথাগুলোর মর্ম যৌক্তিক। অভীক বলে উঠলো,
“যথাআজ্ঞা নীরব বাবা, চলেন। আপনাকে এই গাছের নিচে একটা গেরুয়া রঙ্গের লুঙ্গি পড়িয়ে বসিয়ে দিতে হবে। আপনি বাণী বকবেন আর আমি টাকা ইনকাম করবো”
“ফাজলামি কর, কিন্তু এই নীরব বাবার কথাই খাটে”

কথা বলতে বলতে পা বাড়ালো ক্লাসের দিকে। দিগন্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। মাথা তুলে তাকালো নীলাম্বরের দিকে। সাদা তুলোর মতো মেঘেরা এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। কেউ ঠিক বলেছিলো,
“বিশ্বাস ভাঙ্গা সহজ, গড়া বহু দুষ্কর”

*******

অবশেষে উৎসাহীত মনকে সম্পূর্ণ নাকানিচুবানি খাওয়িয়ে শেষ হলো সেকেন্ড ইয়ারের প্রথম ক্লাস। এখন দুপুর ১.২০। সেকেন্ড ইয়ারের প্রথম ক্লাসটি এতোটা ক্লান্তময়ী হবে কে জানতো! বিষয়গুলো আরোও দ্বিগুন কঠিন। উপরন্তু এই সেমিস্টারে অনলের একটি ক্লাস ও নেই। সুতরাং যা একটু ক্লাসের ফাঁকে কাতর নয়নগুলো মুগ্ধ মনের মানুষটিকে দেখবে সেই উপায়টিও নেই। ক্লান্ত ধারা বের হলো ক্লাস থেকে। মাহি উদাস কন্ঠে বললো,
“এবার ফেল নিশ্চিত”

মাহির কথাটি কর্ণপাত হলো না ধারার। কারণ তার নজর সিড়ির কাছে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে। শার্টের হাতা গুটিয়ে রেখেছে সে। ডানহাত পকেটে, বারবার বাম হাতের ঘড়িটিকে দেখে যাচ্ছে কিছুসময় পর পর। তারপর কপালে আসা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে আবারো শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে প্রণয়িনীর অপেক্ষায়। ঘামে নীল শার্টটি ভিজে চুপচুপে অবস্থা। তবুও মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই ধারার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। মাহিকে উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেলো সে। এখন আর লুকোচুরি নেই, সকলে জানে তার এই পা’গ’লে’টে মানুষটির কথা। ধারা আসতে দেখে স্মিত হেসে এগিয়ে গেলো অনল। বেশ সময় ধরে অপেক্ষা করছিলো তার জন্যই৷ বিকেলে ল্যাব স্যাশন আছে তার। তাই দুপুরের খাবারটি বউ এর সাথেই খাবে। নরম গলায় বললো,
“ল্যাব আছে?”
“আছে”
“আমারোও আছে, চল খেয়ে নেই”
“কোথায় যাবো?”
“আশেপাশে কোথাও”
“তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে বুঝি!”
“সব জেনেও যখন অবুঝ সাজিস কেনো?”
“ভালো লাগে, অবুঝ মনের আবদারও বলতে পারো”

অনল ধারার নিষ্পাপ স্বীকারোক্তিতে হাসে শুধু। তারপর আদুরে কন্ঠে বলে,
“আমার দশটা না পাঁচটা না, একটা বউ। অপেক্ষা না করে উপায় আছে?”

অনলের উক্তিটি শুনতেই বুকের ভেতর অনুভূতিরা ঝড় তুললো। অজস্র সুখ জেনো তার হাতের ভেতর চলে এসেছে। হৃদস্পন্দনটা কিঞ্চিত বেড়ে গেলো৷ এ যেনো এক অদ্ভুত ভালোলাগা। সে জানে অনল এমন মোহনীয় কিছু একটা বলবে! তবুও বেহায়া হৃদয় বারবার তা শুনতে চায়। এবং এই একই রকম ভালোলাগাটা প্রতিবারেই ধারার অনুভূত হয়। প্রতিবার ই হৃদস্পন্দন বাড়ে, প্রতিবার ই ভীষন লজ্জায় দৃষ্টি নেমে যায়। তবুও শুনতে ইচ্ছে হয় কথাগুলো। এ যেনো এক অদ্ভুত অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। এর মাঝে অভীক বলে উঠলো,
“আজ একটা বউ থাকলে আমরাও তাকে নিয়ে খেতে যেতাম। আহারে কষ্ট”

মাহি এবং নীরব হেসে উঠলো। ধারা লজ্জা পেলো ঠিক ই কিন্তু পরমূহুর্তেই অনলের হাতের ফাঁকে নিজের হাত গলিয়ে দিলো। অনলও শক্ত করে হাতটি ধরলো। পাছে ছুটে না যায়। রুক্ষ্ম হাতের মাঝে এই নরম হাতের স্পর্শটি মন্দ লাগে না বরং এক সাগর অনুভূতিগুলো মাথাচাড়া দেয়। একেই বুঝি ভালোবাসা বলে। ধারা এবং অনল চলে গেলো নিজ গন্তব্যে। পিছনে দুটো কাতর নয়ন ঠিক ই চেয়ে রইলো। অনুভূতিগুলো আর্তনাদ করছে। তপ্ত হৃদয়টা বার বার বেহায়ার মতো প্রশ্ন করছে, “আমার মাঝে কি নেই! কেনো আমায় ভালোবাসা যায় না”। দিগন্ত তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো। পা বাড়ালো লাইব্রেরির দিকে। কেউ সেটা খেয়াল না করলেও মাহি ঠিক ই খেয়াল করলো। কিছু একটা ভেবে সেও পিছু নিলো তার।

লাইব্রেরির শেষ ভাগে গিয়ে বসলো দিগন্ত। মাথা বেঞ্চে ঠেকিয়ে রাখলো। না চাইতেও চোখের কোন ভিজে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় চেয়ার টানার শব্দ কানে এলো। মাথা তুলে তাকালে মাহিকে দেখতে পেলো সে। বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“তুই এখানে?”
“আসলাম! দুপুর পর্যন্ত রোদে ঘোরা ভালো লাগছে না”
“খাবি না?”
“তুই ও তো খাস নি”

দিগন্ত উত্তর দিলো না। সে পুনরায় মাথা নামিয়ে রাখলো। মাহিও নজর বাহিরের দিকে দিলো। লাইব্রেরির এই প্রান্তে থাই গ্লাস থেকে ভার্সিটির মাঠটা দেখা যাচ্ছে। মাহি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো মাঠটির দিকে। তারপর মলিন কন্ঠে বললো,
“অবুঝ মনটা নীল অম্বরের ফুটন্ত আতশবাজির মতো, মূহুর্তেই রঙ্গিন আবার মূহুর্তের মাঝেই বিলীন”

কথাটা কর্ণপাত হতেই মুখ তুলে চাইলো দিগন্ত। বিস্মিত চোখে তাকালো সে মাহির দিকে। মাহি নিস্প্রভ কন্ঠে বললো,
“ভালোবাসাটা খারাপ নয়, শুধু ভালোবাসায় জোর করাটা খারাপ”
“তোকে কে বলেছে আমি কাউকে ভালোবাসি?”
“তুই ধারাকে ভালোবাসিস, কি মিথ্যে বললাম?”

দিগন্ত উত্তর দিলো না। শুধু কাঠের নির্জীব টেবিলটির দিকে চেয়ে রইলো। মাহি আবারও হাসলো। তারপর বাহিরে মাঠের দিকে রোদের মাঝে কাঠের অংশ আর রাবারের ফাঁটা বল দিয়ে খেলতে থাকা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
“আমাদের জীবনে সবাই কাউকে না কাউকে, কোনো না কোনো সময় পছন্দ করে। সেই পছন্দের সময়সীমা থাকে, কিছু পছন্দ ক্ষণিকের আবেগ তো কিছু পছন্দ স্থায়ী। আমি তোর ভালোবাসাকে ক্ষণিকের আবেগ কিংবা স্থায়ী কাতর অনুভূতি নামক আখ্যা দিবো না। শুধু বলবো, যতদিন এই বিষাদ আগলে রাখবি ভেতরটা বারবার তিক্ত হয়ে উঠবে৷ জানি যন্ত্রণা টা অসহনীয়। কিন্তু সহ্য করার ক্ষমতাটাও অসীম। সময়ের থেকে বড় ঔষধ আর হয় না”
“তুই এতোটা শান্ত কিভাবে? কষ্ট হয় না তোর?”

দিগন্তের প্রশ্নে মাহি আবারো হাসলো। বিচিত্র দূর্বোধ্য সেই হাসি। তারপর বললো,
“কষ্ট হয়, সবার হয়৷ মানুষ তো। শান্ত ঠিক ই কিন্তু অনুভূতি গুলো তো সজীব। জড়ো বস্তু হলে হয়তো কষ্ট হতো না। কিন্তু কি জানিস, সেই কষ্টটা স্থায়ী নয়। কারণ যা পাবার নয় তার জন্য যা পেয়েছি তা হারাতে চাই না। যে মানুষটার হৃদয়ে আমার স্থান নেই, তার প্রতি লোভ করে নিজের এতো স্নিগ্ধ বন্ধুত্ব জ্বলাঞ্জলি দেই কি করে!”

মাহির দৃষ্টি এখনো মাঠের দিকে। আর দিগন্তের দৃষ্টি মাহির দিকে। মেয়েটি এতো সুন্দর করে কথা বলতে পারে জানা ছিলো না দিগন্তের। বিস্মিত নজরে সামনে থাকা চরম ঝগড়ুটে, মারকুটে, অভদ্র মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে; যার সাথে তার ছত্রিশের আখড়া। অথচ এই মেয়েটিকেই আজ মুগ্ধ হয়ে দেখছে দিগন্ত। মেয়েটি কি বরাবর ই এতোটা সরল, সুন্দর, মোহনীয়। কে জানে!________

এশা আশা হাটু গেড়ে বসে আছে সেলিম সাহেবের বাসার সদর দরজায়। দরজার পাশে ছোট একটা ছিদ্র করেছে তারা। কিভাবে করেছে সেটা একটা বিশাল কৌতুহল। কিন্তু তারা সক্ষম এই ছিদ্র করতে। তারা প্রতিদিন এই ছিদ্র দিয়ে ইঁদুরের সাপ্লাই করে। আজ অন্য কিছু সাপ্লাই করবে। কারণ ইঁদুরের সংকট দেখা গেছে। তারা তো ইঁদুর কিনে এনে সাপ্লাই করতে পারবে না। ইঁদুররা ও ভয়ে তাদের ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ফলে এখন তেলাপোকা সঞ্চার শুরু করেছে। আপাতত আর কোনো ফর্মুলা কাজে লাগানোটি দুষ্কর। ফলে তেলাপোকা সঞ্চার করাটাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য। এশা যখন খুব নিপুন ভাবে শেষ তেলাপোকাটি ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢোকাচ্ছিলো। তখন ই কানে এলো,
“তোমরা এখানে কি করছো?”………

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ