Friday, June 5, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রণয় প্রহেলিকাপ্রণয় প্রহেলিকা পর্ব-৩৯+৪০

প্রণয় প্রহেলিকা পর্ব-৩৯+৪০

#প্রণয়_প্রহেলিকা (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৩৯তম_পর্ব

লাগাতার কলিংবেল বাজছে। কেউ খুলছে না দরজা। জ্বরে ক্লান্ত দীপ্ত বাধ্য হয়ে উঠলো। গতকালের কান্ডের পর তার জ্বর এসেছে। ধুম জ্বর। সে কোনো মতে উঠে দরজা খুললো। খুলতেই খানিকটা চমকে উঠলো, কারণ বাহিরে ধারা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখশ্রী শক্ত, চোখ থেকে গেলো জ্বলন্ত অগ্নি বর্ষিত হচ্ছে। ক্ষীপ্ত দৃষ্টিতে সে দীপ্তের দিকে তাকিয়ে আছে। ধারাকে দেখে কিছুসময় বিমূঢ় রইলো দীপ্ত। কারণ ধারার এখানে আসার ব্যাপারটি বেশ আশ্চর্যজনক। নিজেকে কিছুসময় বাদে সামলে দীপ্ত জিজ্ঞাসু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ধারা তুমি হঠাৎ?”

ধারা তপ্ত নিশ্বাস ফেললো, সংযত, শীতল কন্ঠে বললো,
“সেলিম আহমেদ কোথায়?”

ধারার এরুপ প্রশ্নে আরোও একবার থতমত খেয়ে গেলো দীপ্ত। ধারার শীতল কন্ঠে একরাশ ক্রোধ সুপ্ত। দীপ্ত চিন্তিত কন্ঠে বললো,
“ধারা কি হয়েছে? তুমি এরকম বিহেভ কেনো করছো?”
“কি হয়েছে সেটা আমি আপনাকে বলবো না, আমি এখানে সেলিম আহমেদের সাথে কথা বলতে এসেছি। দয়া করে তাকে ডেকে দিন নয়তো আপনাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকতে আমি বাধ্য হব”

দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষীপ্ত কন্ঠে কথাটা বললো ধারা। দীপ্ত ও আর কথা বাড়ালো না। আন্দাজ কিছু একটা করেছে ঠিক ই কিন্তু বাবা মেয়ের মাঝে তার প্রবেশ অযৌক্তিক। ফলে সে দরজা ছেড়ে দিলো। মলিন কন্ঠে বললো,
“তুমি ভেতরে এসে বসো, আমি আংকেলকে ডেকে দিচ্ছি”
“আমি এখানে বসতে আসি নি, উনাকে তাড়াতাড়ি ডাকুন”

দীপ্তের কষ্ট করে ডাকার প্রয়োজন হলো না, সেলিম সাহেব নিজেই হেটে এলেন বসার ঘরে। তাকে দেখতেই চোখজোড়া ধপ করে জ্বলে উঠলো। অসামান্য ঘৃণা, ক্রোধে, বিষাদে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লো সে। নিজেকে সংযত রাখা যেনো অসম্ভব হয়ে পড়লো। তার মুখোমুখি হয়ে তীব্র কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
“আমার সুখের জীবন মূহুর্তের মধ্যে এলোমেলো করে কি লাভ হলো আপনার? অনলভাইকে সকলের সামনে অপমানিত করে কি সুখ পেয়েছেন? একজন সৎ মানুষকে অপবাদ দিয়ে কি প্রমাণ করতে চাইছেন?”
“এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কেনো বলছো? সরাসরি জিজ্ঞেস করো”
“তাহলে সরাসরি বলছি, আপনি মাধবীকে কেনো টাকা দিয়েছিলেন? টাকা দিয়ে অনলভাই এর নামে কমপ্লেইন করিয়েছেন আপনি? আপনি ভালো করেই জানতেন এমন কিছুতে তার চাকরি হারাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কি জানতেন না?”

সেলিম সাহেব উত্তর দিলেন না শুধু শান্ত চিত্তে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। ধারা রীতিমতো কাঁপছে, তার রাগ সংযমহারা হয়ে উঠেছে। ক্রোধ, বিশ্বাসভাঙ্গার কষ্টে জর্জরিত ধারা আজ উ’ম্মা’দ প্রায়। তার কণ্ঠ কাঁপছে। ঠোঁট কামড়ে কিছু সময় ঘনঘন শ্বাস নিলো সে। তারপর কাঁপা স্বরে বললো,
“আমি একটা বই তে পড়েছিলাম জানেন, “পৃথিবীতে অনেক খারাপ পুরুষ রয়েছে কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই” লেখক ভুল ছিলেন। আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বাবা। যে নিজের মেয়ের সুখ দেখতে পারেন না”
“আমি তো বলেছিলাম, আমি তার পরীক্ষা নিব। পরীক্ষা কি সহজ হয় ধারা?”
“কি প্রমাণ করতে চাইছেন বলুন তো? আপনি আমাকে খুব স্নেহ করেন? আমার জন্য আপনি খুব চিন্তিত? এসব করে কিচ্ছু প্রমাণিত হয় না সেলিম আহমেদ। আরোও আমার চোখে আজ নিচে নেমে গেছেন আপনি। আমি আপনাকে ঘৃণা করতেও ঘৃণা করি। আফসোস হয় আমার আপনি আমার বাবা। কোথায় ছিলো এই স্নেহ যখন আমি পা ভেঙ্গে বিছানায় পড়ে ছিলাম? এই ভালোবাসাগুলো কোথায় ছিলো যখন আমার মার মৃ’ত্যুর পর পর ওই মহিলাকে নিয়ে হাজির হয়েছিলেন? কোথায় ছিলো যখন আমি আমার জন্মদিনে আপনার অপেক্ষা করতাম? কোথায় ছিলো এই ভালোবাসা? ভালোবাসা জোর করলেই হয় না, সেটা অনুভূতির ব্যাপার। যা আপনি কখনোই বুঝবেন না। এখন এই সব আমার বিরক্তিকর লাগছে। বিরক্তিকর। আচ্ছা, একটিবার আপনার মনে হলো না সেই মানুষটিকে তো আমি ভালোবাসি, এখন আমি কিভাবে তার সম্মুখে দাঁড়াবো? আজ আমার জন্য মানুষটিকে এতোটা অপমানিত হতে হচ্ছে। অনলভাই এর মুখোমুখি কিভাবে হবো আমি?”
“সে যদি সত্যি তোমাকে ভালোবাসে তবে কি এসবে কিছু যায় আসবে?”

এবার মুখ খুললেন সেলিম সাহেব। তার কন্ঠ শান্ত, তার কপালে ভাঁজ নেই। শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সে। তার উক্তিটি শুনে যেনো আরোও নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে পড়লো ধারা, সুপ্ত রাগগুলো অগ্নিরুপে ঝড়লো,
“ভালোবাসা আপনি শিখাবেন আমাকে? যে কিনা শুধু আমার মা একটু সেকেলে, সরলসোজা ছিলো বলে তাকে ঠ’কা’তে একটিবার ও ভাবে নি। আপনি আমাকে শিখাবেন? লজ্জা করছে না? আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় মার বদলে আপনি মা’রা গেলেন না কেনো? অনাথ হওয়াও অনেক ভালো ছিলো এর চেয়ে”
“ধারা, কি বলছো?”

দীপ্ত সাথে সাথে বাঁধ সাধলো। ধারা কঠিন চোখে তার দিকে তাকাতেই সে চুপ হয়ে গেলো। সেলিম সাহেব এখনো শান্ত। সে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন শান্ত দৃষ্টিতে। ধারা দু হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো, অশ্রুরা বাঁধ মানছে না। ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,
“আমি কিভাবে অনলভাইকে মুখ দেখাবো, কিভাবে চোখে চোখ রাখবো? পরীক্ষার নামে আমাদের সম্পর্কে ছেদ করিয়ে শান্তি পেয়েছেন আপনি? এটাই তো চেয়েছিলেন। আজ অনল ভাই হারে নি আমি হেরে গেছি। আমি হেরে গেছি”
“কেনো মুখ দেখাতে পারবি না তুই? কেউ কি তোর মুখে কালি লাগিয়ে দিয়েছে? নাকি আমার চোখে নে’বা হয়েছে?”

কথাটা কর্ণপাত হতেই পেছনে তাকালো ধারা, ঝাপসা নয়নে দেখলো দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে অনল। ধারা বিস্মিত নজরে তাকিয়ে থাকলো অনলের দিকে। অনলকে দেখে সেলিম সাহেবের ভ্রু কুঞ্চিত হয়। মাহিকে ফোন করতেই মাহি সবকিছু খুলে বলে অনলকে। এবং এটাও বলে ধারা রাগ মাথায় ভার্সিটি ছেড়েছে। অনলের বুঝতে বাকি নেই তার বউটি কোথায়! সময় নষ্ট না করেই সে সেলিম সাহেবের বাসায় উপস্থিত হয়। দীপ্ত দরজা না দেবার কারণে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকতেই ধারা এবং সেলিম সাহেবের অনেক কথোপকথন ই শুনতে পায়। বাবা মেয়ের মাঝে প্রবেশ করার ইচ্ছে তার ও ছিলো না। কিন্তু ধারাকে এভাবে বিধ্বস্ত ও দেখতে পারছে না সে। তাই বাধ্য হয়েই কথাটা বলে। অনল কারোর অনুমতি ছাড়াই ভেতরে প্রবেশ করে, ধারার ডানহাতটা নিজের হাতের ফাঁকের মাঝে গলিয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলে,
“আমার ভালোবাসা এতোটা ঠুঙ্কো নয়, সামান্য ব্যাপারে তার ভিত্তি নড়ে যাবে। যখন বলেছি ভালোবাসি তার মানে শেষ নিঃশ্বাস অবধি ভালোবাসি তোকে”

আর সেলিম সাহেবের দিকে তাকায় সে। তার চোখে চোখ রেখে নির্লিপ্ত কন্ঠ বলে,
“আমার বউকে নিয়ে যাচ্ছি। আর থাকলো পরীক্ষা– আমি সারাজীবন প্রথম হওয়া ছাত্র, হারতে আমি শিখিনি। আপনার পরীক্ষাতেও ফুল মার্ক নিয়েই পাশ করবো”

বলেই ধারাকে নিয়ে বেড়িয়ে যায় অনল। অনলরা চলে গেলে দীপ্ত উৎকুন্ঠিত হয়ে বলে,
“সত্যটা কেনো বললেন না আংকেল?”
“সত্য সবসমইয় আপেক্ষিক দীপ্ত, এটা ব্যাক্তিবিশেষের উপর নির্ভর করে। তোমার কি মনে হয় ধারা বুঝতো? উলটো ওর ক্ষোভ বাড়তো। তবে তুমি ঠিক বলেছিলে, অনল ছেলেটার দম আছে। হয়তো এবার আমি হেরে যাবো”

সেলিম সাহেবের ঠোঁটের কোনায় মলিন হাসি ফুটে উঠলো। দীপ্ত সত্যি বুঝে না, লোকটি এমন কেনো? এভাবে মেয়ের চোখে নিচে নেমে কি সুখ?

********
ধারাকে নিয়ে নিজ ঘরে আসলো অনল। ধারা কেঁদেকেটে ফোলা মুখখানার জন্য বসার ঘরে দাদাজানের কাছে প্রশ্নের স্বীকার হতে হয়েছে অনলের। সুভাসিনী তো ধারার মুখ দেখেই চিন্তায় এক শেষ। বারবার একই প্রশ্ন,
“এই অনল, তুই কি করেছিস? সত্যি করে বল নয়তো আমি কিন্তু বয়স দেখবো না এখনই আমার বেলন নিয়ে আসবো”

বেলনটা সুভাসিনীর প্রিয় অ’স্ত্র। ছোটবেলায় এই বেলনের মা’র কম খায় নি অনল। যখন ই তিল থেকে তাল খসেছে সুভাসিনীর হাতে বেলন আর অনলের পা দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুত। জামাল সাহেবও কম নন। তিনি তো ত্যাজ্য নাতী করার হুমকি দিয়েই বসলেন,
“ওর বাপ একটা হা’রা’মী, আমার ধারারাণীরে শান্তি দিচ্ছে না। আর তুই ও ওরে কষ্ট দিচ্ছোস? আমি এখনো ম’রি নি। রুবি আমার লাঠি কই?”

এই পাগল পরিবারকে কি করে বোঝায় কান্ডটিতে তার হাত নেই। একটা সময় বিরক্ত হয়ে অনল বলে উঠলো,
“তোমরা কি থামবা? আমার বউ একেই কেঁদে ভেসে যাচ্ছে উপর থেকে তোমরা এক এক জন কি শুরু করছো? আগে আমি জানি আমার বউ কাঁদছে কেনো? তারপর না হয় তোমরা আমাকে পি’টা’ও”

বলেই ধারাকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে এসেছে সে। ধারা এখনো নিঃশব্দে কাঁদছে। ঠোঁট কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে সে। অনল তার কাছে যেতেই সে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো,
“আমাকে ক্ষমা দিও”

ধারার কথায় বিস্মিত হলো অনল। বিমূঢ় কন্ঠে বললো,
“কেনো?”
“আজ আমি যদি ঐ লোকটাকে চ্যালেঞ্জ না করতাম তোমার সাথে এমন হতো না। আজ আমার জন্য তোমার জীবনে এতো ঝড়। আমাকে ক্ষমা করে দাও। আসলে আমি ই অপায়া, যার জীবনের সাথে জড়াই তার জীবনেই দূর্ভোগ বয়ে আনি। তাই তো মাকেও হারিয়েছি। আজ যদি তোমার জীবনে আমি না থাকতাম তোমার সাথে এমন কিছুই হতো না। সব আমার জন্য। এর চেয়ে তো আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়াটাই শ্রেয় ছিলো…”

কথাটা শেষ হবার আগেই অনলের উষ্ণ ঠোঁটজোড়া চেপে ধরলো ধারার পাতলা ঠোঁটজোড়া। আকস্মিক ঘটনায় থমকে গেলো ধারা। উষ্ণ ঠোঁটের ছোয়ায় কেঁপে উঠলো সে। মেরুদন্ড বেয়ে বয়ে গেলো উষ্ণ রক্তের প্রবাহ। হৃদস্পন্দন হয়ে উঠলো বেসামাল। আবেশে চোখ বুঝে এলো। সাথে সাথে গড়িয়ে পড়লো জমে থাকা নোনা বিষাদ। তপ্ত অনুভূতির প্রহর কাঁটলো। অনল তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,
“বড্ড বেশি বকিস, এর পর থেকে এই প্রক্রিয়াটাই খাটাবো আমি”

ধারা কিছু বললো না। শুধু নতমস্তক দাঁড়িয়ে রইলো। অনল আলতো হাতে তার মুখখানা তুললো। ঘোরলাগা মাদকতাপূর্ণ কন্ঠে বললো,
“তোর জন্য সব পরীক্ষা সই। এমন হাজারো অপবাদ নিতে পারি আমি। যদিও একটু ফিল্মী ডায়ালগ, কিন্তু আমি সত্যি পারবো। আর কোনোদিন আমার থেকে আলাদা হবার কথা বলবি না। আর আমার কাছে উত্তর চেয়েছিলি না, উত্তরটা হলো, আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে””

ধারা মাথা তুলে তাকালো অনলের গভীর নয়নজোড়ায়। অবাধ্য মায়া, কিছু দূর্লভ ইচ্ছে, নিষিদ্ধ আবেগ। ধারার হৃদয়ও হয়ে উঠলো নড়বড়ে। পায়ের পাতায় ভর করে বাহুর বেষ্টনীতে বাঁধলো অনলের গলা। তপ্ত ঠোঁটের স্পর্শে ছুয়ে দিলো অনলের কপাল, মুখশ্রী। স্পর্শ প্রগাঢ় হলো। নিয়ন্ত্রণ হারা হলো কামনা। অধৈর্য্য হলো দুটো হৃদয়। আদিমলীলায় মাতলো তারা। বাহিরে কেবল সাঁজ। চন্দ্রমাও মেঘের কোল থেকে বের হয় নি। মেঘেদের গর্জন শোনা যাচ্ছে। আবারো বৃষ্টি নামবে আঁধারে ঘেরা নগরীতে। অন্যপাশে প্রণয়লীলা মত্ত হৃদয়জোড়ার হুশ নেই। কিছু তপ্ত নিঃশ্বাস, কিছু আর্তনাদ আর একসমুদ্র সুখ। তাদের প্রণয় প্রহেলিকা ডূবন্ত শীতল কক্ষ_______

ক্লান্ত ধারার ঘুমন্ত মুখখানায় অপলক মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে অনল। কাঁদার জন্য ঈষৎ ফুলে গেছে মুখ, তবুও যেনো অসামান্য মায়া জড়িয়ে আছে। আলো আধারের মায়ায় এক অদ্ভুত মাদকতা। যে মাদকতায় অনল শতবারো ডুবতে রাজি। ভাঁজ পড়া কপালে চুমু খেলো সে। কানে মুখ ঠেকিয়ে ধীর স্বরে বললো,
“তোরে ছেড়ে আমিও যে অপুর্ণ ধারা, কিভাবে আলাদা হই?”

তখন ই নিস্তব্ধতা বেধ করে বেজে উঠলো মোবাইলটা। বিরক্ত হলো অনল। ধারাও নড়ে উঠলো। সাথে সাথেই ফোনের সাউন্ড কমিয়ে দিলো অনল। ধারা শান্ত হয়ে গেলো। ভাঁজটা মিলিয়ে গেলো কপালের। অনলে নিঃশব্দে হাসলো। তারপর টিশার্ট্ এ গলা ঢুকিয়ে ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। রিসিভ করে সালাম দিতেই অপরপাশ থেকে শুনলো,
“অনল, তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছে”……………………………

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

#প্রণয়_প্রহেলিকা (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৪০তম_পর্ব

তখন ই নিস্তব্ধতা বেধ করে বেজে উঠলো মোবাইলটা। বিরক্ত হলো অনল। ধারাও নড়ে উঠলো। সাথে সাথেই ফোনের সাউন্ড কমিয়ে দিলো অনল। ধারা শান্ত হয়ে গেলো। ভাঁজটা মিলিয়ে গেলো কপালের। অনল নিঃশব্দে হাসলো। তারপর টিশার্ট এ গলা ঢুকিয়ে ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। রিসিভ করে সালাম দিতেই অপরপাশ থেকে শুনলো,
“অনল, তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছে”
“কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?”

স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্নটি করলো অনল। অপরপাশ থেকে তার কলিগ শিহাব বললো,
“ওরা কোনো প্রমাণ পায় নি। প্রতিটি খাতা পুনরায় চেক করা হয়েছে। বিশেষ করে ধারার খাতা। তোমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পায় নি। আজ স্যারদের মিটিং হয়েছিলো। আমার মনে হয় তারা ধারার পরীক্ষাটি আরেকবার নিবে। এই প্রস্তাব আনসারী স্যার ই দিলেন। যেহেতু প্রতিটা স্টুডেন্ট এখানে জড়িত নয় সুতরাং শুধু ধারার পরীক্ষাটি নেওয়াটাই উনি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন। বাকি স্যাররাও মত দিয়েছেন। ধারাকে প্রস্তুত রাখো। প্রশ্ন আনসারী স্যার নিজে করবেন”
“আচ্ছা, আমি দেখছি”
“আর একটা কথা, যদি ধারা একই গ্রেড না পায় এই এক্সামে তবে হয়তো ধারাকে এক বছরের জন্য রাস্টিকেট করা হবে”

অনল কিছু সময় চুপ করে থাকলো। ঘাড় ফিরিয়ে ঘুমন্ত প্রণয়িনীকে এক নজর দেখলো নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে। মেয়েটি ঘুমিয়ে আছে। বাহিরের সোডিয়ামের লাইটের একাংশ প্রবেশ করছে আঁধারী নগরীতে। আবছা হলদে আলোতে কোমল মুখখানা দেখতেই এক শান্ত প্রশান্তি বয়ে গেলো মনে। এখন ভয় হচ্ছে না। যা হবে দেখা যাবে। মানুষ তো বাঁচেই একবার, এভাবে থমকে থমকে বাঁচার কি মানে! এতো কিসের ভয়! যখন যোদ্ধাই ভয় পাচ্ছে না, তাহলে সেনাপতির ভয় পাওয়া কি সাজে? সাজে না। নিঃশব্দে হাসলো অনল। তার চোখ ও যেনো হাসছে। শিহাবের কথার প্রত্যুত্তরে বললো,
“শিহাব ভাই, আমার বউটি মারাত্মক সাহসী। যে এসব পরীক্ষাতে ভয় পায় না। তাই যাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেনো সে তৈরি। আর আমি তো আছি, আমার ছোট যোদ্ধাটিকে ঠিক ই পার করে দিবো”

অনলের উত্তর শুনে শিহাব হাসলো। তারপর বললো,
“তোমার থেকে এমন উত্তর ই আসা করছিলাম, থাকো রাখলাম”

ফোন কেটে দিলো শিহাব। অনল মাথা তুলে তাকালো মেঘাচ্ছন্ন কালো অম্বরের দিকে। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। তারপর একটা মেইল করলো অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানিতে, এখন সেখানের সময় সকাল ৯টা। তাই মেইলটা এখন ই পাঠানো প্রয়োজন। কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনল। মেইলটা করার পর ফিরে গেলো বিছানায়। ঘুমন্ত রমনীকে বুকে তুলে নিলো। প্রগাঢ়ভাবে লেপ্টে রাখলো নিজের সাথে, কৃষ্ণ চুলের মাঝে নাক ডুবিয়ে বললো,
“আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি যুগলপ্রেমের স্রোতে
অনাদি কালের হৃদয়-উৎস হতে”
********

ভাদ্রের প্রথম সকাল, নীল অম্বরে তুলোর ন্যায় সাদা মেঘের ভেলা ছুটছে। ফকফকে নীর্মল রোদে প্রজ্বলিত শহর। শরতের আভা যেমন বাতাসেও। শিউলির মৃদু গন্ধ মিশে গেছে সমীরে। এই নির্মল সকালে কৃষ্ণাচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ধারা৷ অবশেষে পরীক্ষাখানা হচ্ছে। একটু পর তা শুরু হবে। কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। একটু ভয় হচ্ছে, না অনেক ভয় হচ্ছে। এই ক দিন অনল তাকে সর্বোচ্চ দিয়ে প্রস্তুত করেছে। তবে ভয় তো থাকেই৷ ধারা ভেবেছিলো অনল ভাই হয়তো ভার্সিটিতে দিয়ে যাবে কিন্তু তার একটি জরুরি কাজ পড়ে যাবার দরুণ সে আসতে পারে নি। তবে ধারা ভয় পাবে না। তাকে এই যুদ্ধে জিততেই হবে। নিজের জন্য নয়, অনলের জন্য। উপরন্তু ওই মানুষটির মুখে ঝা’মা ঘ’ষে দেবার ইচ্ছে যে মনে অফুরন্ত। যখন ধারা এই পরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করবে তখন সে ওই লোকটির সম্মুখে দাঁড়াবে। মুখ্যম জবাব দিবে সে। এর মাঝেই বন্ধুমহলের আগমণ ঘটে। বন্ধুমহলকে দেখেই মুখে হাসি ফুটে উঠে ধারা। নীরব এগিয়ে এসে শান্ত কন্ঠে বলে,
“ভয় পাবি না, যাই প্রশ্ন আসুক তুই পারবি ইনশাআল্লাহ”

ধারা কিছুই বলে না শুধু মাথা নাড়ায়। মাহি ধারাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আমরা তোর জন্য অপেক্ষা করবো। অল দ্যা বেস্ট”

ধারা অমলিন হাসে। তারপর পা বাড়ায় পরীক্ষাহলের দিকে। বন্ধুমহল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। অভীক খানিকটা থমথমে কন্ঠে বলে,
“পরীক্ষা ধারার, ভয় আমার হচ্ছে”
“আমার বিশ্বাস ও পারবেই, ওর জিদ তো জানি। ঠিক পারবে।”

বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে দিগন্ত কথাটি বলে। দিগন্তের কথায় শুনে মাহি বলে উঠে,
“আজকাল আমাদের বিবিসি বেশ বড় হয়ে গেছে দেখেছিস। আগের মতো আর বাচ্চামি করে না”
“ধারার গু’তা’নি খেয়ে ঠিক হয়ে গেছে”

নীরব হেসে কথাটা বলে উঠে। তখন নিঃশব্দে হাসে দিগন্ত। তারপর বেশ ভাব নিয়ে বলে উঠে,
“জীবনের নাম ই পরিবর্তন৷ মানুষ বদলায়, অনুভূতি বদলায়। আরোও কতকিছু বদলায়”
“তোর অনুভূতি বদলে গেছে?”

নীরবের প্রশ্ন আবারো হাসে দিগন্ত। দূর্বোধ্য সেই হাসি। উত্তর না দিয়েই পা বাড়ায় ক্লাসের দিকে।

ধারার পরীক্ষা শেষ হয় যথাসময়ে। পরীক্ষা হল থেকে বের হয় থমথমে মুখ নিয়ে। প্রশ্নটি বেশ কঠিন ছিলো বটে। তবে ধারা একটি মার্ক ও ছাড়ে নি। সব উত্তর দিয়ে এসেছে। তবুও একটা সূক্ষ্ণ ভয় হচ্ছেই। পরীক্ষা হল থেকে বের হতেই বন্ধুমহলের দেখা পেলো। তারা অপেক্ষা করছিলো তার জন্য। তবে যার অপেক্ষায় সে ছিলো সেই মানুষটি এখনো আসে নি। মাহি চিন্তিত কন্ঠে বললো,
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে? সব লিখেছিস?”
“হয়েছে খারাপ না। স্যাররা বললেন রেজাল্ট নাকি বিকেলেই দিয়ে দিবেন”
“চিন্তা করিস না। ইনশাআল্লাহ কিচ্ছু খারাপ হবে না”

ধারা নিস্প্রভ হাসলো। চিন্তা না করতে চাইলেও অজস্র চিন্তারা মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে। নিকষকালো বিশ্রী ভয় তার ভেতরটাকে বারবার দূর্বল করে দিচ্ছে। এর মাঝেই ধারার ফোনটা বেজে উঠলো। অচেনা নম্বরটি দেখতেই ভ্রু কুঞ্চিত হলো তার। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটি রিসিভ করলো।
“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম”
“ওয়ালাইকুম সালাম, আমি দীপ্ত বলছি”

দীপ্তের কন্ঠ শুনতেই অকল্পনীয় বিরজতি এসে ভর করলো তারা মুখশ্রীতে। সে বিনা বাক্যে ফোনটি কেটে দিতে উদ্ধত হলে দীপ্ত বলে উঠলো,
“ধারা, একমিনিট আমার কথাটা শুনো। ফোন কেটো না”
“কি শুনাবেন? আর কিছু শোনবার বাকি আছে?”
“হ্যা, অনেককিছু বাকি আছে। প্লিজ তুমি একটু তোমাদের ভার্সিটির শহীদ মিনারের এই দিকটা আসবে? আমি ওখানেই আছি। প্লিজ”

ধারা কিছু উত্তর দিলো না। সাথে সাথেই ফোনটা কেঁটে দিলো। ধারার পরিবর্তিত মুখভঙ্গি দেখে অভীক শুধালো,
“কি হয়েছে?”

ধারা উত্তর দিলো না। শুধু ভ্রু কুচকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেঝের দিকে।

********
ভার্সিটির গেট থেকে পশ্চিমে শহীদ মিনারটি অবস্থিত। শহীদ মিনারের শেষ সিড়িতে নগ্ন পায়ে বসে রয়েছে দীপ্ত। সে প্রতিক্ষিত ধারার জন্য। আজ কারোর কথায় এখানে আসে নি দীপ্ত। নিজের ইচ্ছেতেই এসেছে। এই কদিন যাবৎ নিজের মধ্যেই বেশ এলোমেলো হয়ে আছে সে। অনুতাপ জিনিসটি ভীষণ খারাপ, এই অনুতাপের দরুন ই বাধ্য হয়ে এখানে আসা। কিছু কথা যে এখনো না বলাই থেকে গেলো। সেই কথাগুলো হয়তো বলে লাভ হবে না, কিন্তু বলাটা প্রয়োজন। এর মাঝেই একটি চিকন তীক্ষ্ণ কন্ঠ কানে আসে দীপ্তের,
“কি কথা বলবেন? আমি মাত্র দশ মিনিট সময় দিবো আপনাকে”

দীপ্ত মাথা তুলে তাকালো, ক্ষুদ্ধ নয়নে ধারা তার দিকে তাকিয়ে আছে। খানিকটা হাফ ছাড়লো সে, ভেবেছিলো ধারা হয়তো তার সাথে দেখা করবে না। দীপ্ত উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে আসলো ধারার দিকে। মৃদু হেসে বললো,
“কেমন আছো?”
“আমার খালি সময় নেই, যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন”

তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো দীপ্ত। তার কথাগুলো কিভাবে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারলো না। এলোমেলো চিন্তা গুলো ধারা কতটুকু বুঝবে তাও বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু পকেট থেকে কিছু কাগজ বের করলো। বেশ যত্নে ভাঁজ করে রাখা কাগজ। ধারার ভ্রু কুঞ্চিত হলো, কন্ঠে এক রাশ কৌতুহল নিয়ে শুধালো,
“এগুলো কি?”
“চিঠি”
“কার?”
“একজন অনুতপ্ত ব্যাক্তির”

হেয়ালীটা ধরতে পারলো ধারা, বিরক্তিভরা কন্ঠে বললো,
“এসব ঢং নিজের কাছে রাখুন”
“আমি জানি তুমি আংকেলের উপর ভীষণ ক্ষুদ্ধ, হওয়াটাই যৌক্তিক। আসলে আমার বাবা আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে আমিও এমন রিয়েক্ট ই করতাম। কিন্তু কি জানো! আংকেল তোমাকে খুব ভালোবাসে”
“ভালোবাসার নমুনা আমি দেখেছি”
“মাধবীর সাথে ঘটিত ব্যাপারটার একাংশ ই জানো তুমি। বাকিটুকু একটু শুনবে? তুমি যেদিন আমার সাথে ঘোরাঘুরি করেছিলে সেদিন কথায় কথায় তুমি মাধবীর কথা বলেছিলে। সেখান থেকেই মাধবীর ব্যাপারটা আমার মাথায় গাঁথে। আংকেলের সাথে তোমার চ্যালেঞ্জের পর আংকেল প্লান করেন, যে অনলের চাকরির একটা প্রবলেম তৈরি করবেন এবং আমাদের কোম্পানির একটা সাব কোম্পানী থেকে খুব বড় একখানা অফার দিবেন। এখন যদি কোনো তার চাকরির সমস্যা না হয় এই কোম্পানির অফারটি নেবার কোনো কারণ নেই অনলের। এখন চাকরিতে কিভাবে প্রবলেম করা যায় সেই উপায় খুঁজতে খুঁজতে আমি মাধবীকে খুঁজে বের করি। মাধবীর সাথে আমি কথা বলে এটা বুঝতে পারি যে ওর তোমার প্রতি অসম্ভব রাগ বা ঈর্ষা। সে এমনেও তোমার আর অনলের সম্পর্কের ব্যাপারে ক্ষুদ্ধ ছিলো, উপরন্তু তোমার রেজাল্ট ও ভালো হয়। সে এমনেই কমপ্লেইনটা করতো। মাধবীর পরিবারে হুট করে অর্থনৈতিক ঝামেলা হবার কারণে মাধবী কাজের খোঁজও করছিলো। তাই আমরা ওর সাথে একটা ডিল করি, ও প্রথমে অনলের নামে কমপ্লেইন করবে। যদি অনলের কোনো সমস্যা হয় তবে আমরা ওকে কোম্পানির অফারটা দিবো। অনল এক্সসেপ্ট করুক বা না করুক মাধবী তার কমপ্লেইনটা ফেরত নিবে এবং ওর মোটিভ যে খারাপ সেটা সে অথোরিটিকে জানাবে। হয়তো ওর বিরুদ্ধে একশন নেওয়া হবে। ওকে রাস্টিকেট করা হবে। সেটা আমরা বুঝে নিবো। ওর জব বা টাকা পয়সার ঝামেলা হবে না। যেহেতু খুব বড় এমাউণ্ট তাই মাধবীও রাজি হয়ে যায়। আর কথা অনুযায়ী আগামী সপ্তাহেই মাধবী কাজটা করতো। কিন্তু এর মাঝেই তুমি দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতে রাজি হয়ে গেছো। আমাদের প্লান সম্পর্কে জেনে গেছো। অনলকে অলরেডি অফারটা দেওয়াও হয়ে গেছে। ধারা আংকেলের পদ্ধতি খুব বিশ্রী, অসহনীয়। কিন্তু সে কখনোই তোমার সংসার ভাঙ্গতে চাননি। শুধু পরীক্ষা করতে চেয়েছেন অনলকে। কারণ সে চায় না তার মেয়ে সেটা ভুগুক যা সুরাইয়া আন্টি ভুগেছে। সে অনুতপ্ত ধারা। ঐ সময়ে করা ভুল তার প্রতি মূহুর্তটকে হেল এ পরিণত করেছে। রোকসানা আন্টিকে সে বিয়ে করেছিলো নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য। যার শাস্তি সে পাচ্ছে, হয়তো সারাজীবন পাবে। আর থাকলো তোমাকে প্রত্যাখ্যান করার কথা, সে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে নি। তোমার নানাবাড়ি ই কখনো তোমাকে নিতে দেয় নি। আর তুমি এখানে যতটা ভালো ছিলে সেলিম আংকেলের সাথে থাকতে না। তাই কখনো সেলিম আংকেল তোমাকে জোর করে নি। এখন তুমি জিজ্ঞেস করতেই পারো আমি কিভাবে এতো কিছু জানি, কারণ আমি সেই মানুষটির সাথে বিগত বারো বছর আছি। আমার বয়স তখন পনেরো, সেলিম আংকেলের একটি এক্সিডেন্ট হয়। উনি তো প্রাণে বেঁচে যায় কিন্তু ওই গাড়িতে বাকি যারা ছিলেন তারা মা’রা যান। ওখানে আমার প্যারেন্টস ছিলো। এককথায় ধরতে গেলে আমার অনাথ হবার কিছুটা দোষ তার। সেই অনুতাপে আমাকে সে এডোপ্ট করেন। সেই থেকে আমি উনার সাথে। উনাকে আমি বুঝি না, উনার মন আমি পড়তে পারি না। তবে প্রতিরাতে আঁকাশের নিচে তোমাদের ছবি হাতে ঠিক ই দেখি আমি। আমি বলবো না তাকে ক্ষমা করে দাও, শুধু বলবো এতোটা অভিমান পুষো না। অভিমানের অস্তিত্ব মানুষটি পর্যন্ত ই”

ধারা একটিও বাক্য বললো না। শুধু শান্ত ভাবে কথাগুলো শুনলো। তারপর সেই কাগজগুলো হাতে নিলো। মনের মাঝে ঝড় চলছে। গাঢ় অভিমানের প্রলেপের ভেতর মূর্ছাপ্রায় ছোট মেয়েটি বাবার স্নেহের কাঙ্গাল হৃদয়টা বারবার হাহাকার করছে। মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে আছে। কিছু বলার আগেই অনলের কঠিন হাতজোড়া দীপ্তের কলার টেনে ধরল। হিনহিনে কন্ঠে বললো,
“কি চাই এখানে?”

দীপ্ত উত্তর দেবার আগেই মেয়েলি কন্ঠের তীব্র স্বর শোনা যায়,
“দীপ্ত স্কা’উ’ন’ড্রে’ল, রা’স’কে’ল”

মেয়েটির স্বর কর্ণপাত হতেই তিনজন বিস্মিত নজরে পেছনে তাকালো। তাদের কিছু বুঝার আগেই মেয়েটি ছুটে এলো দীপ্তের দিকে। সজোরে চ”ড় বসিয়ে দিলো দীপ্তের গালে। অনল পরিস্থিতি দেখে ছেড়ে দিলো দীপ্তের কলার। মেয়েটি সেই সুযোগে দীপ্তের কলার টেনে ধরলো। ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বললো,
“তুমি কি ভেবেছো, বাংলাদেশে আসলে আমি তোমার কীর্তি জানবো না। তুমি আমাকে ছেড়ে এখানে অন্য মেয়ের সাথে আ’কা’ম করতেছো। এভাবে ঠ’কা’লে আমাকে?”
“তুমি ভুল ভাবছো তিশা”
“ও আমার চোখ কি অন্ধ, আমি বুঝি না। কে এই মেয়ে। বল কে এই মেয়ে, নয়তো আমি তোমার ছা’ল তুলে নিবো”

মেয়েটির ক্রোধ বাড়লো, সে কলার ছেড়ে দীপ্তের ঝাঁকরা চুল টে’নে ধরলো। এদিকে অনল এবং ধারা হা হয়ে তাকিয়ে আছে দীপ্ত এবং মেয়েটির দিকে। মেয়েটি ক্রমেই তার চুল টেনেই যাচ্ছে। দীপ্ত আর না পেরে বলেই উঠলো,
“আরে, ও ধারা। আমার ওর সাথে কিছু নাই। লিভ মি প্লিজ, ইটস হা’টিং তিশু”

এবার মেয়েটি থামলো। ভ্রু কুচকে কঠিন দৃষ্টি প্রয়োগ করলো সে ধারার দিকে। কাঠ কাঠ কন্ঠে বললো,
“তুমি ধারা?”
“হ্যা”

ভীত কন্ঠে উত্তর দিলো ধারা। অনল এখনো বিস্মিত। হচ্ছেটা কি বুঝতে পারছে না সে। দীপ্ত তার কাঁকের বাসা চুলগুলো কে ঠিক করে বললো,
“ও তিশা, আমার ফিয়ান্সে। একটূ এরকম”

দীপ্তের কথায় চোখ বিস্ফারিত হলো অনলের। সে ভেবেছিলো দীপ্ত হয়তো ধারাকে পছন্দ করে। অথবা তার খারাপ কোনো মনোবাঞ্ছা রয়েছে। এখন দেখছে তার বাগদত্তাও আছে। ফলে আরোও ক্রোধিত হলো অনল,
“তোমার মতো পুরুষ তো আমি দেখি নি, হবু বউ থাকা স্বত্তেও আমার বউ কে লাইন মারো”
“নো, নো, নো। আমি ধারাকে কখনোই লাইন মারি। তিশু ট্রাস্ট মি। আমি ধারাকে বোনের নজরে দেখি”

দীপ্তের কথা শুনে মেয়েটি একটু লজ্জিত হলো। দীপ্তের চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললো,
“সরি, আমি বুঝি নি ও ধারা। আসলে কিছুদিন যাবৎ কিছু আইডি থেকে আমাকে ম্যাসেজ করা হচ্ছিলো। ফার্স্টে ইগ্নোর করলেও তোমার আর ধারার ছবি দেখে আমি টেম্পার রাখতে পারি নি। আসলে ওর নাম শুনেছি শুধু। কখনো ছবি তো দেখি নি। তাই তো কালকের প্রথম ফ্লাইটেই চলে এলাম। সরি, লেগেছে?”

অনল এবং ধারার বুঝতে বাকি রইলো না কাজটি কাদের। কিন্তু বি’চ্ছু দুটো তিশাকে কিভাবে খুঁজে নিলো বিশাল বিস্ময়ের ব্যাপার। অনল আর অপেক্ষা করলো। দীপ্ত এবং তিশার কাছ থেকে বিদায় নিয়েই ধারাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো। ধারা সারা রাস্তা নিশ্চুপ ই ছিলো। নিজের সাথেই নিজের যুদ্ধ করতে হচ্ছে। বাসায় ফিরতেই সকলকে জড়ো করলো অনল। ধারাও বুঝে পেলো না কি হয়েছে। জামাল সাহেব, রাজ্জাক, ইলিয়াস রুবি, জমজদ্বয় বেশ অবাক। কৌতুহলের বশে সুভাসিনী বলে উঠলেন,
“কি হয়েছে?”
“আমার সবাইকে কিছু বলার আছে। আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি”……………

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ