Friday, June 5, 2026







পরী পর্ব ১২

পরী পর্ব ১২

জুমার নামাজ পড়তে আমি ভাইয়া এবং সজীবের সাথে মসজিদে যাই। মসজিদ থেকে বেরুলে আমার নজর কবরস্থানের দিকে পড়ল। ওখানেও শুয়ে আছে একটি অতৃপ্ত আত্মা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি আর ভাইয়ারা কবরটায় যিয়ারত করতে গেলাম। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমরা বেশ ভ্যাবাচ্যাকায় পড়ে যাই। হতভম্ব হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পড়লাম ফাঁকা কবর দেখে। কবরটি খালি, তাতে কোনো লাশ নেই। অথচ তা আমরা নিজ হাতেই দাফন করেছিলাম।
গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে ফাঁকা কবরের দিকে সবাই নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম। গাছের ফাঁক দিয়ে একখোশ রোদ কবরের পাশে মাটির উপর পড়েছে। হঠাৎ ওখানে সাদা কিছু একটা ঝিকঝিক করতে দেখলাম। তড়িঘড়ি করে আমি ওখানের মাটি সরালাম। একটি নূপুর আবিষ্কার করেছি। সেটি হাতে নিয়ে ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখলাম। আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। এটি সাবিলাকে দেওয়া নূপুরের হুবহু একটি!
আমি নূপুরটা পকেটে ঢুকিয়ে ভাইয়ার সাথে মসজিদে গেলাম, যেখানে ইমাম সাহেব থাকেন। ওখান থেকে জানালা দিয়ে স্পষ্ট ফাঁকা কবরটা দেখা যাচ্ছে। ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম কবরের কথা। তিনি বললেন, ‘বাবারা, আমি তো এখানে সবসময় থাকি। শুক্রবার থেকেই তো কবর ফাঁকা দেখেছি। আর এই মসজিদের আশেপাশে তেমন লোকের আসা-যাওয়াও নেই। কে বা নিবে?’
‘লাশ তো আমরা বৃহস্পতিবার দাফন করেছিলাম।’ ভাইয়া আমাকে বলল। ‘তার মানে এর পরদিনই লাশ চুরি হয়ে গিয়েছিল।’
‘শুক্রবার আপনি ঠিক কয়টায় কবরটা ফাঁকা দেখেছিলেন?’, হুঁজুরকে ইঙ্গিত করে বললাম।
‘আমি ফজরের আজান দিতে পাঁচটার দিকে জাগি। এরপর এখানে কোরআন পড়ি। গত শুক্রবারেও এমনটাই হয়েছিল। আমি তো তখন থেকেই কবরটা ফাঁকা দেখছি।’
‘তার মানে আমরা লাশটা দাফন করার পর থেকে নিয়ে ফজরের পাঁচটার আগে লাশকে গায়েব করা হয়েছে। কিন্তু কে এই কাজ করবে?’, ভাইয়াকে চিন্তিত দেখাল। আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম।
বাসায় এসে সোফায় কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। নাঈমা চা এনে দিয়েছে। আমি নূপুরটার দিকে চেয়ে আছি। ভাইয়া গত দু’দিন আগের জমানো পত্রিকা পড়ছে। সাবিলা যাওয়ার পর থেকে কারও মন ভালো ছিল না। কাজেই আনন্দগুলো মিটমিট করেও জ্বলে না। পত্রিকা বড় করে পড়া ভাইয়ার স্বভাব। ওর ভাষ্যমতে, পত্রিকা নিজে পড়ে অন্যকে পড়াও। অন্যজন যদি না পড়ে, তবে বড় করে পড়ে শোনাও। সে পড়ছে, ‘হাজিরাপুর গ্রামে শুক্রবার সকাল এগারোটার দিকে জঙ্গলে একটি লাশ পাওয়া যায়। কে যেন খঞ্জর দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তার লাশ একটি গর্ত থেকে উদ্ধার করা হয়। হোসেন নামের এক ব্যক্তি জঙ্গল দিয়ে যাওয়ার সময় লাশের সন্ধান পেয়ে পুলিশকে জানালো। পুলিশ তদন্ত করে কিছুই জানতে পারেনি। অবশেষে তার পরিবারকে খুঁজে বের করে জানা যায়, এটা এক পঙ্গু ব্যক্তি ছিলেন। নাম: মোহাম্মদ পারভেজ(৪৩)। এই পঙ্গু ব্যক্তির খুনের পেছনে রহস্য কী তা পুলিশরা এখনও তদন্ত করছে। রিপোর্টার: এমদাদুল করিম।’
ভাইয়া একনাগাড়ে পড়ে থেমেছে। কিন্তু সে জানে না সে কী পড়ে ফেলেছে। আমার কানে এখনও প্রতিধ্বনি করছে, পারভেজ ও খঞ্জর এই দুটো শব্দ। আমি ভাইয়ার কাছ থেকে পেপারটা নিই। একপাশে মৃত ব্যক্তির ছবি ও খঞ্জরের ছবি। লাশের চেহারা ভালো করে দেখে বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘আরে ইনি তো আমার স্বপ্নে দেখা সেই মুখোশ পরিহিত ব্যক্তি। দেখ্, খঞ্জরটাতে একটা অস্পষ্ট স্টার মার্ক দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের পাওয়া খঞ্জরটায় ছিল। ভাইয়া, খঞ্জরটি কোথায়?’
‘ওটা তো রান্নাঘরের একটি ড্রয়ারে রেখেছি।’
তৎক্ষণাৎ দু’জন রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে গেলাম। ড্রয়ারে কোনো খঞ্জর নেই। ভাবীর কাছে জিজ্ঞেস করলে সে বলেছে এখানে কোনো খঞ্জর সে দেখেনি।
‘আবির,’ ভাইয়া অস্থির হয়ে বলল, ‘আমার একদম ভালো করে মনে আছে, আমি খঞ্জরটি এই ড্রয়ারেই রেখেছিলাম। সাবিলা পানি খেতে এসেছিল। আমার একদম সবই মনে আছে।’
‘হোল্ড অন। তুই কী বলেছিস, আবার বল তো।’
‘বলেছি আমি এটি ড্রয়ারে রেখেছিলাম।’
‘না। এর পরে কী যেন বলেছিস?’
‘সাবিলা পানি খেতে এসেছিল।’
‘তাহলে সে আর তুই ছাড়া কেউ জানতো না কোথায় সেটি রাখা হয়েছিল। তার মানে..’, কথা শেষ না করে চিন্তিত হয়ে নূপুরটি বের করে দেখতে লাগলাম।
‘আবির, সেই কখন থেকে তুই এই নূপুরটাই দেখছিস। এটি কার?’
‘সাবিলাকে আমি এটি সেইরাতে পরিয়ে দিয়েছিলাম। আর আজকে এটি কবরের পাশের মাটিতে পেয়েছি।’
‘হোয়াট? কিছুই তো বুঝছি না। সবকিছুই জট পাকাচ্ছে। সে রাতে সাবিলার চলে যাওয়া, কবর থেকে লাশের গায়েব হয়ে যাওয়া, খঞ্জরেরও গায়েব হয়ে যাওয়া, কবরের পাশে সাবিলার নূপুর পাওয়া, আমাদের টার্গেট সেলিম আর পারভেজের একজনের খুন হয়ে যাওয়া তাও খঞ্জর দিয়ে। এসব শুক্রবারেই ঘটে। তোর কাছে কিছু উদ্ভট লাগছে না?’
‘লাগছে বটে। এসবে সাবিলার কী সম্পর্ক? স্বেচ্ছায় সে চিঠি লিখে কোনো কাজে কেন গিয়েছে? যাওয়ার আগের দিন সে আমাকে কী যেন বলতে চেয়েছিল। এরপরের দিন এতোকিছু হয়ে যাওয়া। উফফ, মাথায় কিছুই আসছে না।’

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

মাথা চুলকিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। কয়েকবার ঝেড়ে ঝেড়ে মুখটা ধুলাম। হঠাৎই সজাগ হয়ে খেয়াল করলাম, আমি কলের দিকে ঝুঁকে এতো নড়াচড়া করছি, আয়নাতে আমার প্রতিবিম্বের নড়াচড়ার আভাস কেন পাচ্ছি না? কলের দিকে কুঁজো হয়ে থাকা অবস্থায়ই চোখ ওপরে তুলে তাকালাম। একি! আমার প্রতিবিম্ব দাঁড়িয়ে আছে। চোখগুলো তার সম্পূর্ণ কালো। মণিটা যেন সম্পূর্ণ কোটর জুড়ে। আতঙ্কে আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতে গিয়ে পিছনে ফিরে দেখি কিছু নেই। এখন আমার প্রতিবিম্বটাও স্বাভাবিক। আমার চিৎকারে ভাইয়ারা দৌড়ে এলো। আমি তাদের সবকিছুই বললাম।
সোফায় এসে বসে পড়লাম। এখনও হাঁপাচ্ছি। তোতা পাখিটা আমার ঘাড়ে এসে বসেছে। ওকে আদর করে হাতে নিলাম। সে বলতে লাগল, ‘আবির অনেক ভালোবাসি তোমাকে। আবির অনেক ভালোবাসি তোমাকে।’ বোধ হয়, সাবিলার মুখ থেকে শুনেছিল। আমি তোতাকে বললাম, ‘আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ তার এখনের করণীয়টা আমার জানা। তোতা এখন চুপ হয়ে গিয়ে চারিদিকে তাকাচ্ছে। যাকে কথাটা বলতে হবে তাকে সে দেখছে না। অগত্যা বসেই রয়েছে আমার হাতে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। ভাইয়া এসে পাশে বসে বলল, ‘ভেবেছি, আমরা আকবর সাহেবের কেসটা সলভ্ করার পর এই বাড়ির, আর আত্মাটির রহস্য বের করব। কিন্তু কেসটা সলভ না হতেই কত কিছুই না হয়ে গেল! এরপর লতিফের সাথে জড়িত খুনিদের বের করার কাজ এসে পড়ে গেছে। উফফ।’
‘না ভাইয়া, আলাদা কিছু নয়, সবকিছু একসূত্রে গাঁথা। হাজিরাপুরের পারভেজ কী করে জানলো এখানের ডায়েরির কথা? ডায়েরিটা কোথায় বা পেয়েছিল? পরী যেহেতু এখানে থাকতো, ওর শক্তির সম্বন্ধে লেখা ডায়েরিটি নিশ্চয়ই এখানে ছিল। হয়তো এই বাড়ির সাথে পারভেজের আগে থেকেই কোনো সম্পর্ক ছিল। আর এখানে আমার বহুরূপীর লাশ পাওয়া যায়। আমার সাথে এসবের কী সম্পর্ক? কেনই বা আমি স্বপ্নটি দেখলাম, যেটা একদম পুরোপুরি বাস্তবের সাথে মিলে গেছে? লতিফের বলা কাহিনির মতে ওরা পরীকে নিয়ে যাওয়ার সময় একটা লোককে খুন করেছিল। তার অতৃপ্ত কঙ্কাল এখন জঙ্গলে আছে। আমি স্বপ্নে জানালা দিয়ে পরীকে কেবল নিয়ে যেতে দেখেছিলাম। আমার হাতের যে তাবিজ উড়ে গিয়েছিল, সাবিলার কাছে কোত্থেকে আসে এই তাবিজ? তাও দুটো। আমাকে স্বপ্নে যেই গর্তে পুতে ফেলা হয়, সেখানে আমার বহুরূপীর লাশের সন্ধান। এটা আমার বহুরূপীর কাহিনি নয় তো, যে কিনা এখানে থাকা আত্মাটিই।’
‘এখানে থাকা আত্মাটি মানে? এই বাড়ির আত্মাটি তোর বহুরূপীর পাওয়া লাশেরই তা কে বলেছে তোকে?’
‘লাশটা থেকে যে সুগন্ধ বেরিয়েছিল, অনুরূপ একই সুগন্ধ এই বাড়ির আত্মাটি থেকেও পেয়েছি।’
‘মানে?’
‘তোরা জানিস না, আমি অনেকবার ওই আত্মাটির উপস্থিতি টের পেয়েছি বিভিন্ন জায়গায়। তাকে প্রায় সময় আমাদের আশেপাশে বসতে খেয়াল করেছি। এমনকি সে একবার আমার কানে কানেও বলেছিল, “আবির ঘুমিয়ে পড়, আমি তোমাদের কিছু করব না।” এরপর থেকে যেদিকেই আত্মাটির উপস্থিতি লক্ষ করি, সেদিকে একই সুগন্ধ ছড়িয়ে থাকে। সে একই ধরনের সুগন্ধটাই আমার বহুরূপীর লাশের কাছেও পেয়েছিলাম। তাই ধারণা করেছি, লাশটা আর কারো নয়, এই বাড়ির আত্মাটির।’
‘দ্যাট মিনস, ছেলেটিকে খুন করা হয়েছিল বিধায় এখন সে এক অতৃপ্ত আত্মা। তোর স্বপ্ন অনুযায়ী তার খুন করেছিল পারভেজ। তাকে যে খঞ্জর দিয়ে খুন করা হয়েছিল, ঠিক একই খঞ্জর দিয়ে পারভেজের মৃত্যু। খঞ্জরটা কোথায় রেখেছি সাবিলা ছাড়া আর কেউ দেখেনি। এসবের পেছনে কিছু একটা তো আছে যা আমরা দেখছি না। আর আত্মাটি তো চাইলে আমাদের মেরে ফেলতে পারতো। সেরাতে আত্মাটি তোর কথায় আমাকে ছেড়ে দেয় কেন? সে আকবর সাহেবকে তো ছাড়েনি। তিনি তো আজানের কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন। এসব কিছু কী ইঙ্গিত করে?’
‘আমাকে দেখে হয়তো তার সহানুভূতি জেগেছিল। কারণ আমি তার বহুরূপী। সেদিন আমার মুখে তুই আমার ভাই শোনে হয়তো আত্মাটি তোকে ছেড়ে দিয়েছে।’
‘বাড়ির সবকিছুই তো স্বাভাবিক।’, সজীব বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে না এখানে কোনোকিছু পাব।’
‘আমরা সবকিছু দেখলেও একটি রুম অবশিষ্ট আছে।’
‘আবির,’ ভাইয়া বলল, ‘তুই উপরের তালাবন্ধ রুমটা খোলার ধান্দা করছিস না তো?’
‘এছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না। ওই ডায়রিতেই হয়তো সব রহস্য মেলবে। সবাই আমার দিকে কী তাকিয়ে আছ? চলো ওই রুমে।’
‘আবির?’ ভাইয়া ডাকল, ‘কাজটা কি ঠিক হবে? গতবার সাবিলা থাকার পর দরজাটা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এটা অন্যকিছু বুঝায় না তো? আমরা রুমটা খুললে যদি কোনো ক্ষতি হয়?’
আমি দাঁত চেপে বললাম, ‘আমার স্ত্রী সাবিলা দুই সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। আমি এভাবে ভয় পেয়ে কতদিন বসে থাকব? ওর জন্য আমি যেকোনো রিস্ক নিতে রাজি আছি। তোরা না গেলে আমি একাই যাব।’
কারো কথা শোনার প্রত্যাশা না রেখে আমি রুমটার উদ্দেশ্যে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম। একে একে সবাই পিছু পিছু এসে আমার সাথে দেয়।
‘এই লড়াই কেবল তোর একার নয়,’ ভাইয়া বলল, ‘আমরা সবাই দলবদ্ধ হয়ে কাজ করব। সাবিলা কেবল তোর বউ নয়, আমাদেরও কিছু না কিছু হয়।’
ছলছল চোখে ওদের দিকে তাকালাম। আমার কষ্টেরই যেন প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে তাদের মুখে। ফের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম। সবাই এসে তালাবন্ধ রুমটার সামনে উপস্থিত হলে আমি সেই পরিচিত সুগন্ধটা পেয়ে ভয় পেয়ে উঠলাম। বললাম; ‘আমাদের চলে যাওয়া উচিত। আত্মাটি এখানে এসেছে। হয়তো কারো ক্ষতি করতে চায়। সবাই ফিরে চল।’
তড়িঘড়ি করে আমরা সবাই সিঁড়ি বেয়ে নামতে উদ্যত হলাম। এমন সময় মৃদু খটখট এক আওয়াজ পরক্ষণে টা টা আওয়াজ করে মিলিয়ে গেল। আওয়াজ শুনে সবাই পেছনে ফিরে তাকালাম। দরজাটা আপনিই খুলে গেছে! তালাটাও খুলে মাটিতে পড়ে গেছে। আমরা সবাই একে অপরকে চাওয়া-চাওয়ি করলাম।
‘আবির,’ নাঈমা বলল, ‘এটা কোনো বিপদের সংকেত নয়তো?’
‘তোমরা একদম ভয় পেয়ো না।’ বললাম, ‘আমার মনে হচ্ছে আত্মাটিই দরজাটি খুলেছে। সে হয়তো আমাদের কিছু একটা ইঙ্গিত করতে চাইছে। চলো সবাই ভেতরে যাই।’
কান খাঁড়া করে সন্তর্পণে পা রেখে আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই রুমের মধ্যে বিকট সব আওয়াজ হতে শুরু করল। চিল্লাচিল্লি, হাসাহাসি, বাচ্চার কান্নাকাটির মতো সব আওয়াজ মিশ্রিত হয়ে বিকট শব্দ। সবাই ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। ভেতরে সবকিছু ধোঁয়াটে ধোঁয়াটে হয়ে আছে জানালা বন্ধ থাকায়। তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সামান্য এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, কিছু পুতুল ও বাচ্চাদের খেলনা পড়ে আছে। আরও এগুলে আলমারি, চেয়ার, সোফা সবই দেখলাম। আর হ্যাঁ, একটি বুক শেলফও আছে, যেখানে ভ্রমণকাহিনি বিষয়ক হরেক রকম বই রাখা আছে। এগুলো সবই পুরানো, এবং আমি অনেক আগে পড়েছি। এখন আওয়াজগুলো মিলিয়ে গিয়ে রুমটি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। এসব কিসের ইঙ্গিত?
রুমটি ধোঁয়াটে হওয়ায় সামান্য এগুলেই একটু-আধটু দেখছি। রুমটি অন্যান্য রুমের তুলনায় একটু ভিন্ন। বেশ সজ্জিত। আরেকটু সামনে এগুলে বামদিকের দেয়ালে চোখ আটকালো একটি ফটোফ্রেমে। ছবিটা দেখে সবাই হতবাক হয়ে পড়লাম।
‘ভাইয়া,’ আমি বললাম, ‘আমাকে একটা চিমটি কাট তো। আমি বোধহয় ভুল দেখছি ছবিতে।’
‘না ব্রো,’ সজীব বলল, ‘আমিও একই জিনিস দেখছি।’
ফটোতে আমি এবং আমার পাশে অপূর্ব এক মেয়ে। ওটা আমি বললে ভুল হবে। কারণ আমার এক বহুরূপী এখানে ছিল। হয়তো এটা সে এবং পাশেরটি তার স্ত্রী। হয়তো এটিই সে পরী। আহ্! পরীটা একদম নজরকাঁড়া সুন্দর আই মিন সুন্দরী। সবাই পরীটির নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম। তার রূপ সত্যিই অবিশ্বাস্য। দেখেই লাগছে, সে মানুষ হতে পারে না।
‘আবির,’ নাদিয়া বলল, ‘তোর ডুপ্লিকেটের হাসিটাও তোর মতো। হাসলে গালের দু’পাশে টোল পড়ে।’
আরেকটু এগিয়ে আমরা রুমের শেষ প্রান্তে গেলাম। সেখানে যেতেই ধক করে বুকের ভেতরের তল পড়ে গেল। কেবল আমার নয়, সবারই একই অবস্থা। সামনের পুরো দেয়াল জুড়ে রক্ত দিয়ে কিছু একটা লেখা। ভয়ঙ্কর এক দৃশ্য। লেখাটা যেই দেয়াল থেকে শুরু হয়েছে আমি সেখান থেকে পড়তে লাগলাম। অক্ষরগুলো বেশ বড় বড় করেই লেখা। প্রথম শব্দ পড়তেই আমরা চমকে গেলাম। বাইরে ভয়ঙ্কর বজ্রপাত হয়ে মুশলধারে বৃষ্টি হওয়া শুরু করেছে। মুহূর্তেই চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। দেয়ালের লেখা বড় করে পড়লাম।
‘সাবিলা, মা তুমি এখান থেকে চলে যাও। এখানের মানুষগুলো খুব খারাপ। ওরা তোমাকে কিছু করে ফেলবে। তুমি এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাও, যেখানে তোমাকে কেউ চিনবে না। মনে রেখো, তোমাকে তোমার নিয়তি একদিন এখানে আবার আনবে আমাদের মুক্তির জন্য। আমি জানি, আমার সাবিলা মানুষদের মতো ভয় পায় না। তোমাকে একদিন এখানে আসতেই হবে। আমাদের মুক্তি তোমার হাতে। তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে নাও। জানালার পাশে যাও। ওখানে তোমার মা-বাবার ব্যান্ড দুটো আছে। ওগুলো পরে কেউ না দেখে মতো ধীরপায়ে চলে যাও। যাওয়ার সময় রুমে তালা লাগিয়ে যেও। নিজের খেয়াল রেখো মা।’
সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লাম।
‘আবির,’ ভাইয়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল, ‘সাবিলা তো এখানে দুইবার থেকেছিল। সে কি এসব লেখা দেখেনি? দেখেও সে এখানে কীভাবে থেকেছে? তার কি ভয় করেনি? আর দেয়ালে যেই সাবিলাকে নির্দেশ করা হয়েছে, সে কি আমাদের সাবিলা?’
সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ। আসলে সাবিলা কে ছিল? আমি যাকে সাধারণ একটি মেয়ে ভাবতাম, যাকে ভালোবেসেছিলাম আসলে কে সে? প্রথম যখন ওর সাথে দেখা হয়, সে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি দিয়ে বলেছিল, আমি তো সবকিছুই জানি। সেদিনের মতো আজও অপ্রকৃতস্থ বোধ করছি। আসলে কে সে? সে কি এই বাড়ির রহস্যগুলো জানে? সে এখন কোথায়? কোন কাজে গিয়েছে? দেয়ালের লেখাগুলো আমি বারবার পড়লাম। বারবার একটি শব্দে এসে আটকে যাই। তা হলো নিয়তি। এই শব্দ ওর লেখা চিঠিতেও ছিল।
‘ভাইয়া,’ নম্রভাবে বললাম, ‘এই সাবিলা আর কেউ নয়, আমাদেরই সাবিলা, যাকে আমরা এক সাধারণ মেয়ে ভেবেছি। মেয়েটির মাঝে কত রহস্যই না লুকিয়ে আছে!’
(চলবে..)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ