#তুমি_মায়ের_মতোই_ভালো
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
Feminine Wisdom
আয়নার সামনে বসে চুলে চিরুনিটা বোলাতে বোলাতে হোয়াটসঅ্যাপে অফিসের গ্রুপের কথাবার্তাগুলো পড়ছিল তৃণা। প্রত্যেকে একটা টপিক নিয়ে আলোচনা করছে, তাই ও কিছুতেই লিখতে পারছে না কালকের ছুটির কথা।
তৃণা একটা এম.এন.সি-তে কাজ করে, বেশ উঁচু পদেই চাকরি, কিন্তু অতটা উঁচু নয় যে নিজের ইচ্ছেমতো একটা মেসেজ দিয়ে ছুটি নিতে পারবে। রীতিমতো পারমিশন নিতে হয় ডিরেক্টর লেভেল থেকে।©️অনিন্দিতা
“তৃণা! কই গেলি?” — তৃণা ঘরে বসেই শুনছে, ওর শাশুড়ি ডাকতে ডাকতে এদিকেই আসছেন। তৃণা তাড়াতাড়ি ফোনটা রেখে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। পুরোটা যাওয়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়ালেন মৌসুমীদেবী। কোনো ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি বললেন —
“কাল কিন্তু সকাল সকাল স্নান করে ঠাকুরঘরে ঢুকে যাবি। আমি সেরকমই কথা দিয়ে এসেছি নিচে। তুই আর মৌ—তোরা গিয়ে ঠাকুরঘর মুছে আল্পনাটা দিয়ে নিবি, আমরা ততক্ষণে ভোগের জোগাড় করব। আর মৌ বলেছে খিচুড়িটা ও রাঁধবে, তাই অগত্যা আমিও কথা দিয়ে ফেললাম—পায়েসটা তুই বানাবি।”
তৃণা পুরো স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে! কী শুনছে এসব ও! আল্পনা, পায়েস — হায় ভগবান! এসব তো পেটে লাথি মারলেও ওর থেকে বেরোবে না! যখন এসব শেখার কথা, তখনই মা মারা গেছে ওর।
বাড়িতে ঠাকুর বলতে ছিল একটা লোকনাথ বাবার ছবি আর মায়ের ছবি। লোকনাথ বাবা মানে মিছরি, আর মা তো যা দেবে তাই সোনামুখ করে খেয়ে নেয়! তাই পায়েস-খিচুড়ি এসব কখনোই হয়নি ওদের বাড়িতে।©️অনিন্দিতা
কী থেকে যে কী হয়ে গেল! এত বড় বাড়িতে পিসিমনি বিয়ে ঠিক করে ফেললেন ওর। কোনো আলোচনা নেই — বাবাও বললেন, “মিনু যা করবে, তোর ভালোর জন্যই করবে।”
আর তখনই রাহুলও ব্রেক আপ করে দিল। কী করত আর তৃণা? কার ভরসায় বলত যে ও বিয়ে করবে না! ভাবতেই কান্না পেয়ে যাচ্ছে। কাল যে ওর জীবনে কী সকাল আসতে চলেছে, মা লক্ষ্মীই জানেন!
“কথা কানে যাচ্ছে?” — খুব জোরে বললেন মৌসুমীদেবী। তৃণা চমকে ‘হুম’ বলতেই উনি বললেন —
“কাল আবার এসব ছাইপাঁশ পরে নিচে নামিস না। শাড়ি পরে, চুলটা খোঁপা করে নামবি। দেখিস, কাল আমার নাকটা কাটিস না। মৌকে নিয়ে বড়দির গর্বের শেষ নেই — যেমন রূপে লক্ষ্মী, তেমন গুণে সরস্বতী।”
বলেই চলে গেলেন পাশের ঘরে।
পুরো দোতালা জুড়ে ওরা থাকে এই বাড়িতে। এক ঘরে তৃণারা, পাশের ঘরে ওর শাশুড়ি-শ্বশুর। আরেকটা ঘর ফাঁকা। নিচে থাকে বড়মা — মানে মৌসুমীদেবীর বড় জা — আর ওনার দুই ছেলে। বড় ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় দু’বছর আগে। তারই বউ মৌ। ছোট ছেলের এখনো বিয়ে হয়নি।
ছোটমা — মানে মৌসুমীদেবীর ছোট জা — থাকেন ওপরে, তিনতলায়। ওনার এক ছেলে, এক মেয়ে — দুজনেই পড়াশোনা করছে।
তৃণার প্রতিদ্বন্দ্বী এখন মূলত ওই মৌ। আর এসব বিশেষ দিনে প্রতিযোগিতা চরম তুঙ্গে থাকে। বাকি দিনগুলো যার যার, তার তার।©️অনিন্দিতা
তৃণা এ বাড়িতে এসেছে ছয় মাস হলো। এই সময়ের মধ্যে দু’বার এরকম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছে। এক ছিল জামাইষষ্ঠী, আরেক জন্মাষ্টমী। এবার আসছে লক্ষ্মীপুজো।
প্রথমবার ও বাড়ি ছিল না — বেঁচে গেছিল। দ্বিতীয়বার তালের বড়া, তালের ক্ষীর, তালের পিঠে — সবেতেই ফ্লপ! তার ওপর সেদিন অফিসেও গিয়েছিল, তাই পুরোই ‘জিরো’।
আবার কালকের দিন! সেই এক সমস্যা — অফিস আছে। ওদের এম.এন.সি-তে লক্ষ্মীপুজোয় কোনো ছুটি নেই। আগে থেকে ছুটি নেবার কথাও বলতে পারেনি, কারণ সেখানে ওর বয়স মাত্র আট মাস। নতুন অফিসে ঢুকেই পনেরো দিনের ছুটি নিয়েছিল বিয়ের জন্য — ওই অন্যায়ের যেন আজও ক্ষমা হয়নি ওদের কাছে।
ছুটির কথা ভাবতেই ফোনটা তুলল তৃণা। দেখল, অফিসের গ্রুপে ওর বস লিখেছে —
> “কাল একটু আগে অফিসে আসবে, একটা প্রজেক্ট সাবমিট করতে হবে।”
মেসেজটা দেখেই কান্না পেয়ে গেল তৃণার। একদিকে শাশুড়ি, অন্যদিকে বস — কোথাও শান্তি নেই। কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল।
লোকে বলে সিগারেট খাওয়া খারাপ, কিন্তু তৃণা বোঝে — এতে কী শান্তি! এত টেনশন যেন ধোঁয়া হয়ে বেরিয়ে যায়!
“এই তুমি, শোওনি এখনো?” — ঘরে ঢুকে দেখল সোম এসেছে।
এই সোমের সাথেই প্রায় ছয় মাস আগে এই গুহায় এসে ঢুকেছে তৃণা। এখানে এত মানুষ থাকে যে, তৃণার নিজের বিয়ের দিনেও এত লোক ওদের বাড়িতে আসেনি।
“না ঘুমাইনি, এই তো যাব,” — তৃণা বলতেই সোম বলল,
“দরজা ভেজিয়ে সিগারেট খাচ্ছ? কেউ দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।” বলতে বলতে দরজায় খিল তুলে দিল সোম। তারপর আস্তে বলল,
“এত টেনশন কেন? মুখটা শুকিয়ে গেছে!”
সোমের গলায় নরম ভাব পেয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল তৃণা —
“আমি কী করব বলো, কাল অফিসে সকাল সকাল প্রজেক্ট সাবমিশন, যেতেই হবে! আবার মা বলছে সকালে আল্পনা দিতে, পায়েস রাঁধতে! আমি তো এসব পারি না!”©️অনিন্দিতা
সোম কাছে এসে বলল —
“আস্তে আস্তে শিখে যাবে। কাল সকাল সকাল উঠে স্নান করে ঠাকুরঘরে যাস, বৌদিভাইকে সব বলে দিস তুমি এসব পারো না — ও ঠিক হেল্প করবে। বৌদিভাই ভীষণ ভালো মানুষ। তাড়াতাড়ি কাজ গুছিয়ে চলে যাস অফিসে। আমারও অফিস আছে। লক্ষ্মীপুজোয় তো খুব কম অফিস বন্ধ থাকে।
কিন্তু কাল তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, সাড়ে পাঁচটায় ঠাকুরমশাই আসবে।”
কথাগুলো বলার সময় সোমের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল তৃণা। ছয় মাসে এই প্রথম নিজের মনের কথা শেয়ার করল সে। সোম মন দিয়ে শুনল — খারাপ না ও।
আর বৌদিভাই মানে ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মৌ — সেও সত্যিই ভালো। এই বাড়িতে প্রথমদিন এসে ওর পাশেই শুয়েছিল তৃণা। কত যত্ন করেছিল সেদিন — পুরো দিদির মতো।
এই ভেবে বেশ শান্তি লাগল তৃণার। নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেল সে।
বাইক করে যখন বাড়ির সামনে নামল তৃণা, ঘড়িতে সাড়ে পাঁচটা বাজে।
অফিসের কাজ কিছুতেই যেন শেষ হতে চায় না। ছটায় ছুটি, সেখানে সাড়ে চারটাতেই বেরোতে পাগল পাগল অবস্থা। দেরি হয়ে যাবে বলে সরাসরি বাইক বুক করে নিয়েছিল তৃণা। ওর বিশ্বাস, একমাত্র এটাই পারবে সময়মতো বাড়ি পৌঁছে দিতে।
বাইক থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির গেটের কাছে এসেই থমকে দাঁড়াল তৃণা।
দরজার মুখে দাঁড়িয়ে দাদাভাই—মানে মৌয়ের বর—আর তৃণার শ্বশুর উজ্জ্বলবাবু।
কি জানি, বাইকে করে এসেছে দেখে কি ভাবল ওরা! একটা মেয়ে বাইক বুক করে অফিস থেকে ফিরল—এতে যে কেউ খারাপ ভাবতে পারে, এটা এই বাড়িতে আসার আগে ভাবতেই পারেনি তৃণা।
এই বাড়িতে বৌদের জিন্স পরা, ছেলেদের বাইকে চড়ে ফেরা, তারপর সিগারেট—ভাবতেই যেন ধাক্কা খায় তৃণা।
ও যেন এখন এসব ভাবতেই ভয় পায়, কিন্তু বন্ধ করেনি। আজ সকালেও সাধ্যমতো করে জিন্স পরেই বেরিয়ে গেছে। তাতে যদি ওকে অলক্ষ্মী বলা হয়, তবু পরোয়া নেই!©️অনিন্দিতা
“কি বাবা, এখানে দাঁড়িয়ে আছো?” — সামনে উজ্জ্বলবাবুকে দেখে জিজ্ঞেস করল তৃণা।
চলবে।
