#তুমি_মায়ের_মতোই_ভালো
#শেষপর্ব
#অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা
Feminine Wisdom
উজ্জ্বলবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই ধ্রুব—মানে সোমের জেঠতুতো দাদা—বলে উঠল,
“আর বোলো না, ঠাকুরমশাইয়ের সোয়া পাঁচটায় আসার কথা, এখন পৌনে ছটা বাজে। ফোনটাও সুইচ অফ! কি যে করি! ওদিকে মা-মেজোমা খেপে উঠেছে!”
সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বলবাবু বললেন,
“শোন, ঘরে ঢুকে মা যদি কিছু বলে, চুপচাপ শুনে নিস। এমনিতেই উপোস করে মাথা গরম আছে, তারপর যা কান্ড করেছিস তুই!”
বলতেই ধ্রুব হেসে ফেলল।
সোমের এই দাদাটাকে বেশ লাগে তৃণার—সবসময় হাসিখুশি, মজার মানুষ।
ধ্রুবর হাসি দেখে তৃণাও হেসে বলল,
“কি হয়েছে গো?”
সাথে সাথে উজ্জ্বলবাবু বললেন,
“কি হয়েছে? আল্পনা দিয়ে দরজাটা আটকাসনি! মিনি গিয়ে পায়ে পায়ে পুরোটা ঘেটে দিয়েছে!”
ধ্রুব আবার হেসে বলল,
“মেজোমা তারপর পুরো ঘর মুছে আবার আল্পনা দিয়েছে। তারপর পায়েস রান্না করেছো—ওখানেও মিনি গিয়ে মুখ দিয়েছে!”
এই কথায় তৃণার মনে পড়ল সকালের আল্পনা আর পায়েসের কথা।
ঘুম থেকে উঠে ছটায় স্নান করে নেমেছিল ঠাকুরঘরে। তখন মৌয়ের স্নান হয়নি, ওর কথাতেই আল্পনা দিয়ে পায়েস করে রেখে অফিসে চলে গেছিল তৃণা।
“নেহাত মেজোমার প্রাণের প্রিয় ওই মিনি, না হলে আজ মিনির কপালে ছিল!” — ধ্রুব হেসে বলল।
বিয়ের পর থেকে মিনিকে অসহ্য লাগে তৃণার—সারাদিন পায়ের সামনে মিয়াও-মিয়াও, আর মৌসুমীদেবীর আদিখ্যেতা!
আজ হঠাৎ খুব ভালো লাগল মিনিকে। ভাগ্যিস আল্পনাটা ঘেটে দিল! না হলে ওর দেওয়া আল্পনা দেখে মৌসুমীদেবী অজ্ঞান হয়ে যেতেন!
আর পায়েস? ইউটিউব দেখে বসিয়েছে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝে গেছিল—পায়েস থেকে পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। ওটাই ঢেকে রেখে অফিসে গেছিল তৃণা। কারণ আর একবার করলে সেটা ভালো হবে, এমন গ্যারান্টি ছিল না!
“জেঠু, দাদাভাই, শিগগির চলো! ঠাকুরমশাই ফোন করেছিলেন—উনি আসবেন না, শরীর খারাপ!
আরে বৌমনি, তুমিও এসে গেছো? চলো, সবাই চলো! মেজোমা-মা-বড়মা সবাই রেগে আছে!”
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রিতু, সোমের ছোটোকাকার মেয়ে—এবাড়ির সবচেয়ে ছোট সদস্য।
তৃণার খুব প্রিয় এই মেয়েটা, মিষ্টি করে ডাকে “বৌমনি”।
ওর ডাকে সবাই ঘরে গিয়ে দেখল, ঠাকুরঘর জুড়ে ভিড়।
তিন জা মাটিতে বসে আছে, মৌ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
বাড়ির ছেলেরা উঠোন জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সবার মুখে চিন্তার ছাপ—যেন বাড়ির কেউ অসুস্থ।
সামান্য লক্ষ্মীপুজো নিয়ে এমন করছে যেন বিশ্বজয় হবে!
“বড়মা, আমার বন্ধুর বাড়ির ঠাকুরমশাই পুজো করে চলে গেছেন। আরেকজনকে বললাম, উনিও রাজি নন!” — রিজু এসে খবর দিল।
সাথে সাথে মৌ বলল,
“আজ কান্ড হয়েছে! ঠাকুরমশাই পাওয়া মুশকিল—ভরা পূর্ণিমা, সব পুরোহিতরা ব্যস্ত!”
“কি বলছো? পুজো হবে না?” — গলা শুনে মনটা আনন্দে ভরে গেল তৃণার। সবার চোখেমুখে চিন্তা হলেও তৃনার মনে ফুর্তি! হবে না! এই গলা কতদিন পর শুনল!
যত বিপদেই থাক এই গলা শুনলে মন ভালো হয়ে যায়। আর শ্বশুর বাড়িতে বসে বাবার গলা পেলে মনটা খুশি তো হবেই! ধুতি পাঞ্জাবী পরে সেজেগুঁজে তমালবাবু হাজির! মেয়ের বাড়ির লক্ষীপুজোর নেমন্তন্ন বলে কথা!
কমলবাবু, সোমের ছোটোকাকা, বললেন,
“ তমালদা, ঠাকুরমশাই পাওয়া যাচ্ছে না! আমাদেরজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে!পুজো কী করে হবে জানিনা ”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সোম এসে জানাল,
“কোনো পুরোহিত রাজি হচ্ছে না। একজন বলেছে আটটার পর করবে।”
হাউহাউ করে উঠলেন মৌসুমীদেবী,
“সেকি কথা! সাতটা পঞ্চাশে তো পূর্ণিমা শেষ হয়ে যাবে!”
তমালবাবু কোনোরকম ভূমিকা না করে বললেন,
“তৃণা মা, তুমি পুজোটা সেরে দাও না! তুমি তো কি সুন্দর পুজো করতে! তোমার মা বলতেন, মেয়ে আমাদের লক্ষ্মী, কী সুন্দর গুছিয়ে পুজো করে !”
তৃণার মনে হলো, ভগবান যেন এই মুহূর্তে বাবাকে বোবা করে দেন!হাঁড়ির খবর গুলো হাটের মাঝে না বললেই নয়!
এ বাড়ির কেউই সেরকম তৃনাকে কাজের ভাবে না। সংসারের কাজ খুব ভালো না জানলে সে কী আদৌ কাজের হয়! কিন্তু তাও এখন সবাই কেমন যেন তাকিয়ে আছে তৃনার দিকে! অগত্যার গতি ভাবছে বোধহয়!
সোম উজ্জ্বল বাবুকে বলল,
“হ্যাঁ গো বাবা, ও গীতা চ্যান্ট করে প্রথম হয়েছিল, বেলুড় মঠ থেকে মেডেল পেয়েছিল!”
তমালবাবু যোগ করলেন,
“সব কটা কোর্সেই প্রথম!এমন মন্ত্র পড়বে, মা লক্ষ্মী না এসে পারবে না!”
তৃণা দেখল, বাবার শুরু করা কথার ধাক্কায় আর পালাবার পথ নেই।তারপর আবার সোম ও প্রতিযোগিতায় নেমেছে বাবার সাথে — তৃনার সম্পর্কে জানার বিষয়ে কে কাকে টপকাবে এটাই দেখার!বিয়ের পর বোধহয় স্বামীরা একটু আধটু শ্বশুরের সাথে এরকম প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়।মেয়ে আগে না বউ! সেই সূত্র ধরেই সোম বলল,
“আমাদের বিয়ের দিন পুরোহিতের আগে আগে সব মন্ত্র পড়ছিল এই মেয়ে!”
সবাই তাকিয়ে আছে – শ্বশুর, কাকা শ্বশুর রা, ভাসুর এমনকি মৌও! পুজোটা হলে যে ও হেরে যেতে পারে তাই নিয়ে একটুও মাথাব্যথা নেই এই মুহূর্তে।চোখেমুখে এমন একটা ভাব নে বাঁচা আমায়! এমনকি খিচুড়ি, পায়েস — সব যেন তাকিয়ে আছে তৃণার দিকে, যেন বলছে,
“নে, উদ্ধার কর আমাদের! ”
মিনতিদেবী বললেন,
“যা পারিস কর, মা! আমি আর পারছি না!”
উনি বলেছেন মানে, আর কেউ আটকাতে পারবে না।
সবাই রাজি হলেও মৌসুমীদেবীর চোখে এখনও দ্বিধা।
তৃণা বলল,
“বড়মা, না গো, আমি সেরকম কিছু পারি না!”
মৌ সাথে সাথে বলল,
“চুপ করো! সারাদিন এক কথা পারি না, পারি না! সকালে কত সুন্দর আল্পনা দিয়েছো, মেজোমা নিজে বলেছে! পায়েসের গন্ধে আমার মন ভালো হয়ে গেছিলো। শুধু মিনির জন্য আবার খেটে মরতে হলো!দরজাটা যদি একটু বন্ধ করে যেতে! ”মৌয়ের গলায় আক্ষেপ।
তৃণা দেখল, পায়ের কাছে বসে মিনি মিয়াও-মিয়াও করছে।
মনে হলো দৌড়ে গিয়ে প্রণাম করে, যেন সেই মিনিই আজ লক্ষ্মীদেবী! ভাগ্যিস পায়েসটা পাড়িয়ে দিয়েছিল!
“যাও, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এসো! সত্যি আর পারছি না!” — ছোটোমা বলতেই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল তৃণা। সবাই বললেও মৌসুমীদেবী একদম চুপ! বোঝা যাচ্ছে ভরসা করতে পারছে না তৃনাকে! কিন্তু তৃনা জানে এই কাজটা ও এমন করতে পারে যে সবার ভুল ভেঙে যাবে।একটা কিন্তু কিন্তু করছে মনটা
আজ দুপুরে অফিসে বিরিয়ানি খেয়েছে। কী করবে ও! কাজ করতে করতে এমন খিদে পেলো আর অফিসে সেই সময় বিরিয়ানি অর্ডার নিচ্ছিলো! ভুলেই গেছিলো যে ও লক্ষী পুজোর অফিসে আছে। মনে পড়লো এক চামচ মুখে ঢোকানোর পর।
সাথে সাথে সোমকে হোয়াটসঅ্যাপ করল।
উত্তরে সোম লিখল,
“মা লক্ষ্মী খুব লক্ষ্মী! কোনো চাপ নিও না। খেয়ে নাও! আজ দিনটা খুব কঠিন দিন তোমার, দিনটা ভালোয় ভালোয় শেষ হলে আমাকে কাল বিরিয়ানি খাইয়ো — মা লক্ষ্মী ক্ষমা করে দেবে!”
সোমের কথা গুলো মনে পড়তেই হাসতে হাসতে তৃণা স্নানে যেতে যাচ্ছিল, দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মৌসুমীদেবী।
“মন্ত্রটাও কি আল্পনা বা পায়েসের মতো পারিস?” গম্ভীর মুখে তাকিয়ে তৃনার দিকে।সকালে কি ভাগ্যিস উঠে ঠাকুরঘরে দেখতে গেছিলাম।, যা আল্পনা দিয়েছিলি — বাপরে বাপ! তাড়াতাড়ি মুছে মিনির নামে দোষ দিলাম! আর পায়েসে পোড়া গন্ধ! সে যে কীভাবে সামলেছি আমি জানি! দিদি নিজের বৌয়ের এত প্রশংসা করে, আর আমি?কপালটাই খারাপ আমার ”
কান্না চলে এল তৃণার চোখে।
যে কাজটা করতে যাচ্ছে, সেটা ও সত্যি পারে।
কিন্তু তাও আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে না — যদি আবার অপমান হয়!
“হ্যা ঠাকুরঝি, বলো! না না, আর পুজো নয়! ঠাকুরমশাই এলোই না! শেষমেশ আমার তৃণা পুজো করতে যাচ্ছে। ও তো জানো, কী সুন্দর মন্ত্র বলে! কত প্রাইজ পেয়েছে! অফিস থেকে এসেই স্নান সেরে নিচে নামবে!”
তৃণা অবাক হয়ে শুনছে।তৃনাকে বকতে বকতেই হাতের ফোন বাজলো! সোমের পিসি বোধহয়! তাঁকে
কি বলছেন মৌসুমীদেবী ফোনে!
এরকমভাবে তো ছোটবেলায় কোনো দোষ করলে মা বাঁচাতেন!
এই মানুষটা তো “শাশুড়ি”, অন্য মানুষ যে খালি বৌয়ের দোষ ধরলেই বাঁচে। কিন্তু এঁকে আজ কেন যেন মায়ের মতো লাগছে তৃণার।
“হুম, তাই তো বলছি ! বৌটা আমার সত্যি লক্ষ্মী!” — বলেই ফোনটা রেখে তৃণার দিকে তাকালেন মৌসুমীদেবী।
“বললি না তো, মন্ত্রটা কি পায়েস আর আল্পনার মতোই পারিস?”
তৃণা মাথা নাড়িয়ে না বলতেই মৌসুমীদেবী নরম গলায় বললেন,
“দেখিস বাবা, এটা আমি আর বাঁচাতে পারব না। এটা আমি একদম পারি না!”
তৃণা সাহস করে বলল,
“মা, আমি দিদিভাইয়ের মতো লক্ষ্মী নই, কিন্তু এটা আমি পারি। ভালোই পারি। শুধু একটা নিয়মাবলী দিও — অনেক আগে করেছি। আর তুমি যদি এভাবেই পাশে থাকো, তাহলে আমি খুব তাড়াতাড়ি লক্ষ্মী হয়ে যাবো।”
তৃণার গলায় কম্পন।
মৌসুমীদেবী বললেন,
“তুই তোর মতো থাক, শুধু বিশেষ দিনগুলোতে লক্ষ্মী হলেই হবে। যা, স্নান করে আয়। আমি শাড়িটা পরিয়ে দিই—সেটাও তো পরতে পারিস না। কিযে লজ্জা তোর জন্য! সবার সামনে বাঁচিয়ে চলতে চলতে একদিন ঠিক শিখে যাবি, জানি। কিন্তু সেসব দেখে যেতে পারলে হয় আমার!”
কথাগুলো একদম মায়ের মতো শোনাল।
আর না পেরে তৃণা জড়িয়ে ধরল মৌসুমীদেবীকে।
উনিও জড়িয়ে ধরলেন তৃণাকে।
ফিসফিস করে তৃণা বলল,
“তুমি মায়ের মতোই ভালো।”
মৌসুমীদেবী হেসে ফেললেন।
আর মেঝেতে বসে মিয়াও-মিয়াও করছে মিনি — স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে।
চলবে।
