#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা (ফ্যান্টাসী)
#শারমিন_প্রিয়া(২১)
রুদ্রাণী একফোঁটা ঘুমাননি। সারারাত হাঁসফাঁস করেছেন শুধু। অপেক্ষা করেছেন কখন সকাল হবে, আর কখন আরশী, নজরুল উঠবে—তাদেরকে খবর জানাবেন। তারপর যত দ্রুত সম্ভব এ বাড়ি ত্যাগ করবেন। কিন্তু… কিন্তু আরহামের এত বড় প্রাসাদ, এত বড় বাড়ি—সে কি তার বাপের সম্পত্তি রেখে চলে যাবে? রুদ্রাণীর এ নিয়ে টেনশন বাড়ল।ল
ভোরের আলো ফুটে উঠতেই তিনি রান্নাঘরে এসে রান্নাবান্না শুরু করে দিলেন। সচরাচর তিনি এত তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে আসেন না। আজ ইচ্ছে করেই এসেছেন, যাতে কড়াই-তাওয়ার টুংটাং শব্দে সবার ঘুম ভাঙে। হলোও তাই—একটু পর আরশী উঠে হাই তুলতে তুলতে রান্নাঘরে এসে ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—আজ এত তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে আসছো কেন মা? তোমার টুংটাং শব্দে ঘুম এলোমেলো হয়ে গেল ।
রুদ্রাণী হেসে বললেন,
—তোর জন্য তাড়াতাড়ি ওঠা ভালো। সকালে হাঁটলে শরীর ভালো থাকবে, ডেলিভারিতে কষ্ট কম হবে। তা, জামাই কই? উঠেনি?
—না মা, সে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
রুদ্রাণী এবার ফিসফিস করে বললেন,
—তোকে কিছু বলার আছে। বাইরে চল।
তারা দুজন নজরুলের দরজায় গিয়ে টোকা মারে। নজরুল উঠলে তাকে নিয়েও রুদ্রাণী এগোলেন। আরশী আর নজরুলকে নিয়ে করিডোরের ওদিক দিয়ে যেতে যেতে পৌঁছালেন দেয়ালের কাছে।
আরশী আর নজরুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—এসব কী? আমাদের এখানে নিয়ে আসছো কেন?
রুদ্রাণী নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ফিসফিস করে বললেন,
—চুপ!
মেয়ে-বাবা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল।
—খুলে বলো না মা, এখানে কেন নিয়ে আসছো?
রুদ্রাণী গভীর নিঃশ্বাস ফেলে দেয়ালের ওই জায়গার ছোট লোহার কড়াটা দেখিয়ে বললেন,
—এই যে, এটা দেখতো। এর ভেতর একটা গুহা আছে। গোপন কক্ষ আছে।
কথাটা শুনে আরশী আর নজরুল স্থির হয়ে গেল। চোখ বড় বড় হয়ে গেল তাদের।
রুদ্রাণী তাদের হাত ধরে বললেন,
—বাড়ি চলো। সব বলব। এখানে কেউ দেখে ফেলবে।
তারা তাড়াতাড়ি করিডোর ত্যাগ করে উঠোনে এল। দুতলার দিকে মুখ করে উঠোনের বেঞ্চে বসলেন—যাতে আরহাম উঠলে কথা থামিয়ে দিতে পারেন।
আরশী ছটফট করতে লাগল। বলল,
—বলো না মা। ওখানে গোপন কক্ষ কেন? আমার মাথায় কিছু আসছে না।
—রাক্ষস কায়ানরা রাতে ওখানে তাদের আস্তানা বানিয়েছে।
বুক ধড়ফড় করে উঠল আরশী আর নজরুলের। তারা নড়ে চড়ে বসল।
রুদ্রাণী কাঁপা কন্ঠে বলতে লাগলেন,
—কতদিন ধরে তারা এখানে আস্তানা বানিয়েছে জানি না। ভাবতে পারছো? আমাদের বাড়িতেই তারা বসবাস করছে! কতটা বিপদ নিয়ে আমরা থেকেছি। আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল—নজরুল ভাইয়ের উপর তারাই অ্যাটাক করেছে। আরশীকেও তারা অ্যাটাক করেছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব এ বাড়ি থেকে সরে যেতে হবে আমাদের।
আরশী থ হয়ে বসে রইল। তার হৃদস্পন্দন বাড়ছে। এতদিন তারা রাক্ষসদের সাথেই থেকেছে। যদি তার অনাগত বাচ্চার ক্ষতি করে? না না—ভাবতেই পারছে না আরশী।
নজরুল রুদ্রাণীকে জিজ্ঞেস করলেন,
—কীভাবে বুঝলে তুমি যে গুহায় তারা থাকে?
রুদ্রাণী গতরাতে ঘটে যাওয়া সব বললেন।
নজরুল বললেন,
—তাহলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ছাড়তে হবে আমাদের।
আরশী তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
—বাড়ি ছেড়ে যাব কোথায়? যেখানে যাব সেখানেই তো তারা আমাদের পিছু নেবে। তাছাড়া আরহামকে কি বলব? তোমাদের কি মনে হয় আরহাম বাড়ি ছাড়বে? আমার মন বলে, ছাড়বে না। আমরা এখন তাদের মুখোমুখি হব মা। তোমার যাদুর ছুরি আর অন্য অস্ত্র আছে তো? ভয় কেন? আমরা মোকাবিলা করব।
রুদ্রাণী হতচকিত হয়ে বললেন,
—রাক্ষস রাজাকে আক্রমণ করব?
—হ্যাঁ, করব! সে আমাদের ছাড়ছে না কেন? যা ক্ষতি করার সে করেছে। তাহলে এখন আর আমাদের—বাবা-মেয়েকে—বাঁচতে দেবে না? আর কত পালাবো মা?
রুদ্রাণী অসহায়ভাবে বললেন, __তোর অনাগত বাচ্চার কথা ভেবে আমার দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে আরশী।
আরশী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর কিছু বলল না।
রুদ্রাণী আবার বললেন,
—আজ থেকে ছুরি সঙ্গে রাখবে সবাই। আর আরহামকে কি সব সত্য বলে দেব? বললে হয়তো সে বাড়িটা ছাড়বে। আপাতত বাড়ি ছাড়াটাই সেফ।
আরশী কিছু বলল না। হুট করে আরহামকে কীভাবে এত সত্য বলবে—বলা কঠিন। আবার না বলেও উপায় নেই।
বেলা একটু বাড়লে আরহাম উঠল। রুদ্রাণীরা উপরে উঠলেন। আরশী খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। আরহাম ফ্রেশ হয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
—কি হয়েছে? মুখে চিন্তার ছাপ কেন?
আরশী স্মিত হেসে বলল,
—কিছু না। শরীর খারাপ লাগছে।
আরহাম কাছে এসে বলল,
—শরীর খারাপ মানে? বেশি খারাপ? তোমার ডেট আর ক’দিন?
—এক সপ্তাহের ভেতর কিছু একটা হবে।
—তাহলে তো রিস্ক আছে। আমি কি ধাত্রী নিয়ে আসব?
—না না, এত তাড়াহুড়ো করতে হবে না। তুমি নাশতা করো গিয়ে, যাও।
আরহাম নাশতা করে বাহিরে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেল। তারপর পিছন দিক দিয়ে গুহায় গিয়ে অগ্নীমাকে জিজ্ঞেস করল,
—তুই কি ডেলিভারি করতে পারিস?
অগ্নীমা থেমে বলল,
—অতো পারি না।
রাভান ঘুমোচ্ছিল। কায়ান তাকে ডেকে তুলে বলল,
—যত দ্রুত সম্ভব আরশীদের পুরনো বাড়ির গুহায় যা। গিয়ে দ্রাভীনাকে নিয়ে আয়। সে এসব পারে। আরশীর বাচ্চা চার-পাঁচ দিনের ভেতরই হয়ে যাবে। যখন তখন ব্যথা উঠতে পারে। যতদিন না বাচ্চা জন্মায়, দ্রাভীনা এখানে থাকবে। রাভান, দ্রুত যা—নিয়ে আয়।
রাভানকে এই আদেশ দিয়েই কায়ান অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাভান চিন্তিত স্বরে দ্রোহানকে বলল,
—বাচ্চা হলে তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে ভাই! যদি বাচ্চা রাক্ষস হয়?
দ্রোহান নিশ্চিন্ত ভাব নিয়ে বলল, —আরশী তো মানুষ, বাচ্চা দুরুপে আসতে পারে। দুরুপে এলে শক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ টের পাবে না যে বাচ্চা রাক্ষস। আপাতত টেনশন নাই। তুই দ্রুত যা।
অগ্নীমা চুপচাপ বসে শুনছিল সব।
রাভান বেরিয়ে গেলে সে দাঁড়িয়ে বলল,
—আমি রাজ্যে চলে যাচ্ছি।
দ্রোহান চমকে উঠল।
—চলে যাচ্ছেন মানে? হুট করে? সর্দারকে বলে যাবেন না?
অগ্নীমা মুখ বাকিয়ে বলল,
—সে আমার কী? তাকে বলে যাব? কায়ানকে আমি আর চিনি না।
দ্রোহান বলল,
—ওসব অভিমানে বলছেন। আপনি তো তাঁকে মন থেকে ভালোবাসেন।
—যে অন্য কাউকে ভালোবাসে, তাকে আমি কেন ভালোবাসতে যাব? ভালোবাসা উচিত?
—না, উচিত না। তবে.. আপনি সত্যিই সর্দারকে ভালোবাসেন না?
অগ্নীমা মলিন হাসলো। কিছু বলল না।
দ্রোহান প্রসঙ্গ বদলে বলল,
—আপনি যাবেন না। এখানেই থাকুন। আমরা আছি তো।
অগ্নীমা কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। ফিরে তাকালও না।
সে বেরিয়ে গেলে বুক মোচড় দিয়ে উঠল দ্রোহানের। হাঁসফাঁস করতে লাগল। মনে হলো কেউ তার ভেতর ছুরি বসিয়েছে। নিজের উপর বিরক্ত হল দ্রোহান। নিজে নিজেকে বলল, অগ্নীমা গেলে তার কেন খারাপ লাগবে? কে সে তার? কেউ না।
কিন্তু মনকে শান্ত করতে পারল না দ্রোহান। মাটিতে বসে চোখ বন্ধ করল। চোখের কোণায় জমে থাকা দুফোঁটা জ্বল হাতের তালু দিয়ে মুছলো।
একটু পর তার কাঁধে কারও হাতের ছোঁয়া পেল। চমকে উঠে ফিরে তাকিয়ে দেখে সামনে অগ্নীমা। দ্রোহান দাঁড়িয়ে গেল। আপনাআপনি তার মুখ উচ্ছ্বসিত হলো। অগ্নীমা ভ্রুজোড়া তুলে হাসলে সে বাস্তবে ফিরে এল। হাসি থেমে গেল। জিজ্ঞেস করলো, —আপনি ফিরে এলেন? যাবেন না?
অগ্নীমা মাথা নেড়ে না বলল, __যাব না।
—কেন যাবেন না?
—বিয়ে করে তারপর যাব।
— কাকে বিয়ে করবেন?
—যে আমাকে চায় তাকে।
দ্রোহান শুকনো গলায় বলল,
—কে সে?
—জানো না তুমি?
—না তো?
অগ্নীমা মুখ টিপে হাসলো। মনে মনে বললো পুরুষ এত বোকা হয় কী করে? দ্রোহানকে উত্তর দিলো, —তাহলে থাক, জানতে হবে না।
—না না, বলুন কাকে বিয়ে করবেন?
অগ্নীমা চোখ ছোট করে, মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বলল, —এমন একজনকে, যে এখন এই মুহুর্তে আমার জন্য অস্থিরতায় ডুবছে। মন আনচান করছে।
দ্রোহান নড়ে উঠল। ভয় পেল সে, তার দূর্বলতা অগ্নীমা বুঝে ফেলল নাকি?
অগ্নীমা এবার সরাসরি অফার করলো দ্রোহানকে, —তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
দ্রোহান স্তব্ধ হলো । এমন সরাসরি এ কথা শুনবে ভাবেনি সে। বুক দপদপ করতে লাগল। শ্বাস ভারি হয়ে এল।
অগ্নীমা হাসতে লাগলো তার আচরণে। কাছে এসে দ্রোহানের হাত চেপে ধরল, —শান্ত হও। পুরুষের এত নড়বড়ে হওয়া মানায় না।
—আ…সলে আ…মি.. আমতা আমতা করতে লাগলো দ্রোহান।
অগ্নীমা তার আঙুল দিয়ে চেপে ধরলো দ্রোহানের ঠোঁট। —শশশ… কিছু বলতে হবে না। তোমার সব কথা তোমার চোখেই লেখা। আমি পড়ে নিয়েছি। এবার বলো—বিয়ে করবে?
দ্রোহান নিজেকে সামলে বলল, —আমি কীভাবে আপনাকে বিয়ে করব? আপনার সাথে আমাকে মানায় না ম্যাডাম।
—মানায় না বুজলাম৷ তাহলে আমাকে কেন মনে জায়গা দিলে? আমি চলে গেলে দুঃখ পাও কেন?
দ্রোহান ঠোঁট কামড়ে মৃদু করে বলে, —মন তো এত কথা মানে না। জানি না কেমনে কেমনে আপনার প্রতি টান হয়ে গেছে। আপনি চলে গেলে সেটা বুঝতে পারলাম।
—তাহলে বিয়ে করতে আপত্তি কোথায়? আমি তো এমন কাউকে চাই, যার দিকে তাকিয়ে সব অতীত ভুলে যাব। কষ্ট কমে যাবে। যে আমাকে আগলে রাখবে। আর সে তুমি।
দ্রোহান মাথা নিচু করে বলল, —আপনি বড় বংশের আর আমি নিচু।
—দূর! এসব কে দেখে? মনে মন মিললেই হয়।
দ্রোহান স্মিত হেসে বলল, — তাহলে আমি রাজি।
অগ্নীমা মুচকি হাসল। বলল, —কায়ান চেয়েছিল এটা। কায়ানকে বলে দ্রুত আমরা বিয়ে করব। সারাজীবন একসাথে থাকব।
দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে হাসল। চোখে চোখ স্থির হল অনেকক্ষণ। অগ্নীমা মনে মনে বলল —যে আমার না, তার জন্য কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। এখন যে আমাকে ভালোবাসে, তাকে ভালোবাসার চেষ্টা করব। তার সাথেই সুখী হব। এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
____________
আরশীর অল্প অল্প ব্যথা হচ্ছে৷ এটা দেখে রুদ্রাণী আরহামকে বললেন, “চলো না বাবা, ভালো একটা মেডিকেলে চলে যাই আরশীকে নিয়ে। ডেট তো এগিয়ে আসছে। যখন তখন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। আগে ভাগে মেডিকেল গেলে কোনো টেনশন থাকলো না।” রুদ্রাণী মনে মনে চাইছিলেন এই বাহানায় অন্তত বাড়ি থেকে বের হতে। কিন্তু আরহাম বলল, “না, মেডিকেল লাগবে না। অভিজ্ঞ ধাত্রী আমি বাড়িতে নিয়ে আসছি। আপনারা কেউ টেনশন নিবেন না।”
রুদ্রাণী আরহামের এ কথায় সন্তুষ্ট নয়। তিনি আরশীর কাছে গিয়ে বললেন, “কেমন বর তোর আরশী? সে কেন তোকে বাইরে ডাক্তারের কাছে যেতে দেয় না? চেকআপও করালো বাড়িতে ডাক্তার এনে। এখন ডেলিভারি করাবে বাড়িতে! যদি বিপদ-আপদ কিছু একটা হয়ে যায় তখন? মেডিকেলে হলে তো সব হাতের কাছেই পাওয়া যাবে। জামাই এমন করে কেন? আমার কিন্তু বেশ সন্দেহ হচ্ছে জামাইকে।”
আরশী হেসে মায়ের কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল, “কি যে বলো মা! সন্দেহ করার আর মানুষ পেলে না? আমার এত ভালো বরকে সন্দেহ করছো?
অনেক বর এরকম থাকে মা, যারা বউকে বাইরে যেতে দেয় না, সবসময় নিজের কাছে আগলে রাখে। আমার এতে সমস্যা হয় না। বরং প্রাউড হয় এমন স্বামী পেয়ে। আর সে এমন কিছু করবে না যাতে আমার ক্ষতি হয় কিংবা আমি বিপদে পড়ি। সো, আমার কোনো টেনশন নেই—তুমিও খামাখা টেনশন করো না।”
রুদ্রাণী চুপ হয়ে গেলেন। সত্যি উনার মাথাটা গেছে—যাকে তাকে সন্দেহ করে বসছেন। আর করবেনই বা না কেন? চারদিকে যে সন্দেহের মানুষে ভরা। তিনি মেয়ের ঘর থেকে উঠে চলে গেলেন। মনে মনে ঠিক করলেন, দিনের বেলা আমি ঘুমাব, রাতে আর ঘুমাব না। বাড়ি পাহারা দেবো। আমার মেয়েকে পাহারা দেবো।
সারা বাড়ি ঘুমিয়ে গেলে আরশী আরহামের বুকে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আচ্ছা, বাচ্চা হতে গিয়ে যদি আমি মরে যাই—আপনি কি আরেকটা বিয়ে করবেন?”
আরশীর বলা কথাটা বজ্রের মতো লাগলো আরহামের কানে। সে ধমকে উঠল “এইইইই..” বলে। চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “তোমার এত সাহস হলো কি করে আরশী, এটা বলার? তুমি জানো না? বোঝো না? কতটা দুর্বলতা তুমি আমার? তোমাকে ছাড়া নিঃস্ব হয়ে যাব আমি। তোমার কিছু হবে না, দেখো।”
“বলা তো যায় না, যদি হয়ে যায়?”
আরহাম একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি মরে যাব।”
আরশী মাথা দুলিয়ে বলল, “এটা পছন্দ হলো না! আপনি মরবেন কেন? আপনি মরলে আমার বাচ্চাকে কে দেখবে?”
আরহাম দুষ্টুমি করে বলল, “ঠিক আছে, মরব না। আরেকটা বিয়ে করে বউকে বলব বাচ্চাকে দেখো।”
আরশী কিল-ঘুষি শুরু করে দিলো আরহামকে।
আরহাম হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “এত জেলাসি তোমার আমাকে নিয়ে?”
আরশী আরহামের বুকের লোম আলতো টানতে টানতে অভিমানী গলায় বলল, “আপনি আমার ব্যক্তিগত মানুষ। আমি ছাড়া এই পৃথিবীর কারও অধিকার নেই আপনাকে ছোঁয়ার, আপনার সাথে বেড শেয়ার করার, আপনার চোখে চোখ রেখে স্বপ্ন দেখার, আপনার বুকে মাথা রাখার।”
আরহাম আরশীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি চিন্তা করো না আরশী। আমি তোমার ব্যক্তিগত মানুষ—আছি, থাকব, আর রয়ে যাব।”
চলমান…..!
#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা(ফ্যান্টাসি রোমান্টিক)
#শারমিন_প্রিয়া(২২)
কায়ান পরদিন গুহায় গিয়ে দেখে, রায়ান ফিরে এসেছে দ্রাভীনাকে নিয়ে। দ্রাভীনা মাথা নিচু করে সম্মান জানায়। কায়ান তার চেয়ারে বসে পড়ে। গম্ভীর কণ্ঠে ডাকে— “অগ্নীমা।”
অগ্নীমা এগিয়ে আসে। আজ তার মুখে কোনো মলিনতা নেই, বরং ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক চিলতে ঝকঝকে হাসি। কায়ান তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে— “আজ তোকে হাসিখুশি দেখাচ্ছে। কী ব্যাপার?”
অগ্নীমা ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে— “তুমি কী মনে করেছ? তোমাকে না পেয়ে সারাজীবন কাঁদব?”
কায়ান চোয়াল শক্ত করে বলে— “মারবো একটা শয়তান ছুঁড়ি! কিছু জিজ্ঞেস করলে ডবল কথা বলিস কেন?”
অগ্নীমা এবার গম্ভীর হয়ে যায়। কণ্ঠ শক্ত করে বলে— “রাখো তোমার এসব কথা। প্রয়োজনীয় কথা আছে তোমার সঙ্গে।”
“বল, কী বলবি?”—কায়ান শ্বাস ফেলে বলে।
অগ্নীমা চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট বলে—“আমি বিয়ে করব।”
কায়ান চমকে যায়। এক মুহূর্ত থেমে অবিশ্বাসের সুরে বলে—“কাকে?”
অগ্নীমা ঠোঁট বাকায়, “তোমাকে না। অন্যজনকে।”
কায়ান নড়েচড়ে বসে, ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “জানি আমাকে না। কিন্তু কে সে?”
অগ্নীমা ধীরে চোখ সরিয়ে দ্রোহানের দিকে তাকায়— “যাকে তুমি চুজ করেছ।”
কায়ান এবার দ্রোহানের দিকে তাকিয়ে বলে— “দ্রোহান?”
অগ্নীমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
হঠাৎ কায়ান আসন ছেড়ে উঠে অগ্নীমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। স্বস্তির দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলে— “আমার চিন্তা কমলো। তোর জন্য খুব টেনশন হচ্ছিল। তোকে মনমরা দেখতে পারছিলাম না। এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস—ভালো করেছিস। দ্রোহান খুব ভালো ছেলে। তোকে সুখে রাখবে।”
গুহার সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে কায়ানের এই রূপ দেখছে। দূরে দাঁড়িয়ে দ্রোহান মিটিমিটি হাসছে।
কায়ান এগিয়ে গিয়ে দ্রোহানের হাত ধরে আবেগভরা গলায় বলে— “তোকে ছোটবেলা থেকে চিনি। তুই ভালো ছেলে। আমার অগ্নীমাও খুব ভালো, খুব ইমোশনাল। ওকে কখনও কষ্ট দিস না। আমি অনেক কাঁদিয়েছি ওকে। এই কান্না যেন ওর শেষ কান্না হয়।”
দ্রোহানের চোখ ভিজে ওঠে। গলা ধরে আসে। সে ধীরে বলে, “আমি কখনও উনাকে দুঃখ দেব না। আগলে রাখব সবসময়।”
কায়ান চারদিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে— “তাহলে আজ রাতেই বিয়ে হবে অগ্নীমা আর দ্রোহানের। রাভান, আয়োজন কর।”
রাভান এতক্ষণ শুধু দেখছিল, শুনছিল। এই মুহুর্তে সে দ্রোহানকে কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে বলে— “আমি যেই গেলাম, অমনি এত কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললা?”
দ্রোহান চোখ পাকিয়ে উত্তর দেয়— “মনের মিল কি বলে কয়ে হয়? হয়ে গেছে।”
“ওই মেয়ে তো সরদারকে ভালোবাসত! আর তুমি ওকে বিয়ে করবে?”
“তাতে কী? ঠকে যাওয়া মানুষকে বিয়ে করা কি অপরাধ?”
“না, তা নয়। কিন্তু জেনেশুনে কেন?”
“অগ্নীমা নিজেই প্রস্তাব দিয়েছে।”
রাভান অবাক হয়ে বলে— “ওমা! তাই নাকি! নারীরা ভালো অভিনয় করতে পারে ভাই—সাবধান।”
কায়ান ধমকে ওঠে— “চুপ কর রায়ান। বেশি কথা না। যা, আয়োজন কর।”
রাভান ত্যাক্ত স্বরে, “যাচ্ছি বাবা।”
বলে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কায়ানের বুক থেকে যেন এক বিশাল বোঝা নেমে যায়। তার ভয় ছিল—অগ্নীমা যদি হিংসা থেকে আরশীর ক্ষতি করে বসে। আজ সে ভয় কেটে গেল। মনে মনে সে চায়, অগ্নীমা সত্যিই সুখী হোক। তার মতো সুখী হোক। এটাই চায় কায়ান। আজ তাদের বিয়ে সে নিজেই উপস্থিত থেকে দিয়ে দেবে। কিন্তু সেখানে অন্তত দুই ঘণ্টা লাগবে। রাতের বেলা কায়ান সাধারণত তেমন বের হয় না। এখন এতক্ষণ বাইরে থাকতে হলে অবশ্যই আরশীকে কিছু বলে যেতে হবে। তার ওপর ধ্যান রাখতে হবে—কখন আবার আরশীর ব্যথা উঠবে, কে জানে।
কায়ান কৌশলে আরশীকে ম্যানেজ করে ফেলল। স্বাভাবিক গলায় বলল, “বন্ধুরা আজ একটা স্পেশাল পার্টি দিচ্ছে। না গেলে খুব রাগ করবে। যেতেই হবে। আমি কি যাব? তুমি অনুমতি দিলে যাব?
আরশী হেসে উঠল। কায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এমনভাবে বলছো কেন? পারমিশন না দিলে তুমি যাবে না নাকি? বাড়িতে মা আছেন, বাবা আছেন। তুমি যাও। তবে বেশি রাত হওয়ার আগে চলে এসো।
কায়ান হালকা হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রুদ্রাণীকে আরশীর ঘরে রেখে সে বাইরে বের হলো। সেখান থেকেই সোজা গুহার পথে।
মা–মেয়ে বেশ কিছুক্ষণ গল্পগুজব করল। এরপর রুদ্রাণী নরম স্বরে বললেন, “তুমি এখন ঘুমিয়ে পড়ো, আরশী। আমি রাতে ঘুমাই না। এই বাড়িতে রাক্ষস আছে জানার পর থেকে আমি দিনে ঘুমাই। জানি না কখন, কোন সময় বিপদ আসে—আগে থেকেই সতর্ক থাকা ভালো।”
আরশীর সত্যিই খুব ঘুম পাচ্ছিল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে সে বলল, “আমি ঘুমালাম মা। আরহামের আসতে দেরি হলে তুমি ফোন করো।”
রাভান, দ্রাভীনা আর দ্রোহান মিলে যতটুকু পারে গুহাটা সাজিয়েছে। দ্রাভীনা খুব যত্ন করে অগ্নীমাকে সাজিয়ে তুলেছে। দ্রোহান এক পলকও চোখ সরাচ্ছে না অগ্নীমার দিক থেকে। রাভানের দৃশ্যটা ভালো লাগছে।
কায়ান উপস্থিত হলে, সে নিজেই তাদের বিয়ে পড়িয়ে দিল। গুহার এক কোণায় রাভান সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো একটি বিছানা বানিয়ে দিল। যেখানে ফুলসজ্জা হবে।
বিয়ে শেষে সবাই মিলে তাদের জন্য তৈরি বিশেষ খাবার খেল। খাবারের মেনুতে মানুষ ছাড়া সবই ছিল।
যে কায়ান আগে সপ্তাহে কয়েকজন মানুষ খেত, মানুষের রক্ত পান করত—সে কায়ান এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। তারা এখন অন্য জীব খেয়েই বেঁচে আছে। এভাবেই বদলে যাচ্ছে তার তাদের জীবনযাত্রা।
_________________
রুদ্রাণী কাচুমাচু হয়ে শুয়ে আছেন। রাত জাগলেই অতীত এসে ভিড় করে। ক’দিন ধরেই প্রতিরাতে অতীত চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসে। কখনো তিনি হেসে উঠেন, কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
একটানা একা আর কতক্ষণ রাত জাগা যায়! শেষমেশ তিনি উঠে বাইরে বেরোলেন। সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে চারপাশে চোখ বুলালেন। বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছেন—আরহাম ফিরল কি না। আরহামের জন্যও তাঁর টেনশন কাজ করছে। রাক্ষসরা যেন ছেলেটার কোনো ক্ষতি না করে।
কেন যে রাক্ষসরা তাদের পিছু ছাড়ছে না, সেটা রুদ্রাণীর বোধগম্য হয় না। মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করলেন— এবার যদি রাক্ষসরা পিছু লাগে, হারি বা জিতি, মোকাবিলা করব। তুমুল যুদ্ধ হবে। হয় বাঁচব, নয় মরব।
চারদিকে দেখে তিনি রাক্ষস রূপ ধারণ করে পেছনের দেয়ালের বাইরে চলে গেলেন। ছোট্ট কড়াটা ধীরে খুলে দু’সিঁড়ি নামতেই তুমুল কথাবার্তা আর আলোর ঝলকানি চোখে পড়ল। রুদ্রাণী থমকে গেলেন।
আর সামনে এগোলেন না। গেলে যে কেউ তাঁকে দেখতে পাবে। আর তখন বিপদ অনিবার্য। রুদ্রানী সাবধানে পিছু হটলেন। মনে প্রশ্ন জাগল উনার, রাক্ষসের গুহায় এত আলো, এত শব্দ কেন? কোনো মানুষ ধরে এনে ফূর্তি করে খাচ্ছে নাকি?
রুদ্রাণীর বুক ধক করে উঠল। আরহাম তো এখনো বাইরে… ও ঠিক আছে তো?
এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি ফিরে এলেন বাড়িতে। আরহামের নম্বরে কল করলেন। দু’বার রিং যেতেই ফোন ধরল আরহাম। বলল, “এসে গেছি মা। গেটের কাছেই।”
রুদ্রাণী তাকিয়ে দেখলেন, সত্যিই আরহাম আসছে। তিনি শান্তির নিশ্বাস ফেললেন।
আরহাম ঘরে ঢুকতেই রুদ্রাণী নিশ্চিন্ত হয়ে নিজের ঘরে গেলেন। শরীর ক্লান্ত, ঘুম পাচ্ছে খুব। কম্বল গায়ে দিতে যাবেন—এমন সময় আরহামের ডাক, “মা… মা… এদিকে আসবেন একটু?”
রুদ্রাণী দৌড়ে গেলেন মেয়ের ঘরে। গিয়ে দেখেন, আরশী কাতরাচ্ছে।
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে আরহাম বলল,
“আরশীর ব্যথা করছে মা। আমি কি ডাক্তার আনতে যাব?”
রুদ্রাণী চিন্তিত হয়ে বললেন,
“ডাক্তার তো আনতেই হবে। কিন্তু এত রাতে তুমি কীভাবে যাবে? বরং আমরা হাসপাতালে যাই।”
“না মা। ডাক্তার কাছেই। আমি গাড়ি নিয়ে যাব, নিয়ে আসব” —এই বলে আরহাম বেরিয়ে গেল।
আরশীর ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকল। চিৎকারে ভেঙে পড়ছে সে। কিছুক্ষণ পর আরহাম ফিরে এল—দ্রাভীনাকে নিয়ে। সঙ্গে দ্রোহানও এল।
মহিলারা আরশীকে ঘিরে ধরল। আরহাম অস্থির হয়ে বারান্দার এপাশ–ওপাশ হাঁটছে। মনে মনে প্রার্থনা করছে— আমার আরশীর যেন কিছু না হয়। ও আমার জীবন। ওর কিছু হলে আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে যাব।
তার অস্থিরতা দেখে দ্রোহান শান্তনা দিলো,
“সর্দার, আপনি চিন্তা করবেন না। দেখবেন সর্দারনী’র কিছু হবে না।
আরহাম অসহায় হয়ে দ্রোহানের হাত ধরে বলল,
“তাই যেন হয়, দ্রোহান। তাই যেন হয়।”
আরহামের সবচেয়ে বেশি ভয় হচ্ছে একটাই, বাচ্চাটা কী হবে? মানুষ, না রাক্ষস?
এরকম কিছু হলে আজই সব শেষ। আরশীকে হারাতে হবে… ঠিক তখনই আরহামের সব ভয় ভেঙে দিয়ে জন্ম নিল নতুন অতিথি।
বাচ্চার কান্না শুনে আরহামের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে রুমের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে—সব ঠিক আছে কি না বোঝার চেষ্টা করলো। ভেতর থেকে রুদ্রাণী উচ্ছ্বসিত হয়ে ডাকলেন, “আরহাম! এসো। তোমার ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।”
আরহাম গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। হাসিমুখে ঘরে ঢুকল। খুশির আলো চোখে–মুখে উপচে পড়ছে। রুদ্রাণী মেয়েটাকে কাঁথায় জড়িয়ে তার কোলে তুলে দিলেন।
আরহাম আগে একবার আরশীর দিকে তাকাল। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “শরীর ঠিক আছে তো, আরশী?”
আরশী মাথা কাত করে মৃদু হেসে বলল,
“আমি ঠিক আছি।”
আরহাম মেয়েকে কোলে নিল। অপলক তাকিয়ে রইল কতক্ষণ। মেয়ের আঙ্গুলে ছুঁয়ে ছুয়ে দেখল। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল তার। সে নিচু হয়ে মেয়ের কপালে আলতো করে চুমু খেল।
এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার। বাবা হওয়ায় যে এত আনন্দ, তা সে আগে জানত না!
গভীর নিশ্বাস ফেলে আরহাম আরশীর দিকে তাকাল। এই আরশী, যে তাকে দুনিয়ার সেরা সব অনুভূতি দিচ্ছে। যে গোটা জীবনটাকে সুখে ভরে দিয়েছে। যখন প্রথম আরশীকে দেখেছিল, তখনই তার পৃথিবী উলটপালট হয়ে গিয়েছিল। আর আজ ফুটফুটে একটা মেয়ে উপহার দিয়ে সেই পৃথিবীকেই স্বর্গ বানিয়ে ফেলেছে।
চোখের কোণে জমে ওঠা মৃদু জল মুছে নিল আরহাম। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
আমাদের সুখে যেন কারও নজর না লাগে।
সারারাত এই বাড়ির আর কেউ ঘুমায়নি। নজরুল, রুদ্রাণী, আরশী আর আরহাম—সবার রাত কেটেছে ছোট্ট বাচ্চাটাকে ঘিরে।
আরহাম মেয়ের নাম রেখেছে “অরাইয়া এলহা।” নামটা সবারই পছন্দ হয়েছে।
দ্রোহান চলে গেছে। দ্রাভীনা আলাদা ঘরে শুয়ে পড়েছে। এত রাতে চলে গেলে সন্দেহ হতে পারে—তাই কায়ান তাকে যেতে বাধা দিয়েছে।
রুদ্রাণী ঝিমাচ্ছিলেন। সেটা লক্ষ্য করে আরহাম বলল, “আপনি গিয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়ুন মা। আমি আছি তো।”
আরহামের জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত রুদ্রাণী চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন,
“কোনো সমস্যা হলে আমাকে ডেকে নিও।”
রুদ্রাণী চলে যেতেই আরহাম ধীরে আরশীর কাছে এগিয়ে গেল। স্নেহভরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আরশীর চোখ বন্ধ ছিল। আরহামের ছোঁয়া পেতেই সে চোখ খুলল। মৃদু হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে।
আরহাম ঝুঁকে কপালে চুমু খেয়ে,
“খুব কষ্ট হয়েছে না?”
আরশী শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“তা তো হবেই। কিন্তু মেয়ের মুখ দেখেই সব কষ্ট উধাও হয়ে গেছে। ও আপনার আর আমার ভালোবাসার চিহ্ন।”
আরহাম মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল,
“কি কিউট হয়েছে দেখতে। একদম তোমার মতো।”
আরশী সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানাল,
“না, আপনার মতো হয়েছে।”
আরহাম ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি কিউট নাকি?”
আরশী হাসলো, “আপনি নিজেও জানেন না—আপনি কতটা কিউট।”
অরাইয়া তখন গভীর ঘুমে। আরহাম সাবধানে মেয়েটাকে এক পাশে শুইয়ে দিল। তারপর আরশীকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল।
আরশী চোখ বড় বড় করে বলল,
“এটা কী হলো? আমার মেয়েকে আলাদা রাখলেন কেন?”
আরহাম হাসতে হাসতে বলল,
“আলাদা কই? তোমার পাশেই তো। তুমি কত কষ্ট করেছ। একটু জড়িয়ে ধরে রাখি। বুকটা ঠান্ডা হলে আবার মেয়ের দিকে ফিরব। আর মেয়েটাও এখন শান্তই আছে।”
আরশী আরহামের মাথায় আলতো টোকা দিয়ে বলল, “আপনি সত্যিই পাগল।”
আরহাম আরশীর বুকে মুখ ঘষে ফিসফিস করে বলল, “হুম… তোমার জন্য।তুমি জানো? তোমার গায়ের গন্ধ পেলেই আমি মাতাল হয়ে যাই। তোমাকে দেখলে আমার সেন্স কাজ করে না।….”
ঠিক তখনই আরিয়ানা কেঁদে উঠল। আরহাম উঠে কোলে নিতে যেতেই আরশী বলল,
“আমার কাছে দাও। ও খাবে।”
আরহাম দুষ্টুমি করে বলল,
“কি খাবে?”
আরশী চোখ ছোট করলো,
“জানেন না?”
আরহাম মাথা নাড়ল,
“না তো।”
আরশী হাসল,
“ফাজিল একটা।”
আরহাম মেয়ের নাকে আলতো টিপে অরাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার খাবারে তুমি ভাগ বসাতে এসেছো? হু?”
এই কথা শুনে আরশী লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
মেয়ের কান্না বাড়লে সে আগে খাইয়ে নেয়। আরহাম চুপচাপ পাশে বসে থাকে।
ব্রেস্ট ফিডিং শেষ হলে আরহাম বলল, “তোমার ওপর দখল গেছে আরশী। তুমি রেস্ট নাও। আমি অরাইয়াকে নিয়ে হাঁটব। ঘুম এলে শুইয়ে দেব।”
“আপনি পারবেন?”
“অবশ্যই।”
আরশী আর কিছু বলল না। শরীরটা সত্যিই খুব ক্লান্ত। সে ঘুমিয়ে পড়ল।
আরহাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অরাইয়াকে দেখল। কোথাও কোনো রাক্ষসের চিহ্ন আছে কি না—খুঁজল। আপাতত কিছুই চোখে পড়ল না।
পরের দিন আরহাম বাজারে গিয়ে মেয়ের যাবতীয় সবকিছু কিনে আনল। মিষ্টি কিনে সবাইকে খাওয়াল। গুহাতেও নিয়ে গেল। অগ্নীমার হাতে দিয়ে এল। অগ্নীমা হাসিমুখে অভিনন্দন জানাল।
কায়ান গুহায় বেশিক্ষণ থাকল না। দ্রুত বাড়ি ফিরে এল।
_______
এক মাস কেটে গেল। অরাইয়া এখন শব্দ করে হাসে, হাত-পা নাড়ায়, খেলাধুলা করে। এসব দেখে রুদ্রাণী হেসে আরশীকে বলেন, “কেমন মেয়েরে তোর, আরশী! এই বয়সেই বাচ্চারা এত প্রাণোচ্ছল হয় কেমনে? কী সুন্দর করে হাসে। সামনে যে থাকে তাকেই পাগল করে তুলে। সব বাচ্চাদের থেকে আলাদা।”
আরশী গর্বের হাসি হেসে বলে,
“আমার মেয়ে স্পেশাল, মা।”
________
অগ্নীমা রাজ্যে গিয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে। দ্রোহান আর অগ্নীমার সংসার ভালোই চলছে। দ্রোহান যে এত ভালো মানুষ—অগ্নীমা আগে বুঝতেই পারেনি। তার দুঃখী জীবনটাকে সে একেবারে স্বর্গ বানিয়ে দিয়েছে। কায়ানের জন্য এখন অগ্নীমার আর কোনো টান নেই। সে মন-প্রাণ দিয়ে তার স্বামীকেই ভালোবাসে।
রাজ্য থেকে অগ্নীমা ভয়ংকর খবর নিয়ে এসেছে। কায়ান মানুষ মেয়েকে বিয়ে করেছে—এ খবর নাকি তলেতলে সবাই জেনে ফেলেছে। অন্য রাজ্য থেকে এ নিয়ে যুদ্ধের ঘোষণা আসতে পারে। কায়ানের বাবা-ও কায়ানের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ। এই খবর দ্রুত কায়ানকে জানানো দরকার।
মেয়ে হওয়ার পর থেকে কায়ান গুহায় যাওয়া প্রায় কমিয়ে দিয়েছে। তাই দ্রোহান রাকেশ সেজে কায়ানের বাড়িতে গিয়ে এক ফাঁকে কায়ানকে গুহায় আসতে বলে।
রাতে কায়ান গুহায় যায়। অগ্নীমা সব খুলে বলে। সব শুনে কায়ান চিন্তায় পড়ে যায়। কথাগুলো সত্যি হলে বড় ঝামেলা লেগে যাবে। রাক্ষসের আসন দখলের জন্য ওই রাজ্য পাগল। এই সুযোগে তারা কায়ানের রাজ্য লুটে নেবে। কতজনের প্রাণ যাবে—কে জানে!
কিন্তু এই খবর রাজ্যে পাঠালো কে?
দ্রোহান যখন লুকোচুরি করে কায়ানকে এসব জানাচ্ছিল, রুদ্রাণী সেটা লক্ষ্য করেন। পুরোটা না শুনলেও ‘যুদ্ধ লাগবে’—এই কথাটা স্পষ্ট শুনতে পান তিনি। আরহামকে ঘিরে তার মনে কেমন একটা সন্দেহ দানা বাঁধে। আরহামের হাবভাব মাঝেমধ্যেই তার কাছে অস্বাভাবিক লাগে।
রাত একটু গভীর। অরাইয়া আর আরশী ঘরে ঘুমাচ্ছে। আরহামের ফিরতে দেরি হওয়ায় রুদ্রাণী এদিক–ওদিক হাঁটছিলেন। মূলত প্রতিদিনের মতোই বাড়িটা পরখ করছিলেন। ঘরে একটা ছোট বাচ্চা—সবসময়ই তার ভয় কাজ করে, কখন না জানি রাক্ষসরা হামলা করে বসে।
মনের ভেতর সিদ্ধান্ত নিলেন—আজ আরহাম ফিরলেই তাকে সামনে বসিয়ে সব সত্যি জানাতে হবে। সব সত্যি বের হলে, তবেই আরহাম এই বাড়ি ছাড়বে।
রুদ্রাণী নিচে নেমে এলেন। গেট পর্যন্ত হাঁটলেন। করিডোরে যাওয়ার ইচ্ছে হলে তিনি করিডোরে গেলেন। দেয়াল পার হয়ে দেখলেন, লোহার কড়াটা খোলা। তার মানে কেউ নিশ্চয়ই ভেতরে ঢুকেছে বা বাহিরে এসেছে। এত রাতে কে হতে পারে?
তিনি দ্রুত ঘরে ফিরে নজরুলকে ডেকে তুললেন। আরশীর ঘরে বসিয়ে তার হাতে যাদুর ছুরি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আমি একটুখানি পরেই আসছি। দরজা বন্ধ রেখো। কেউ ডাকলেও খুলবে না। শুধু আরহাম এলে খুলে দিও।”
তারপর তিনি আবার ফিরে এসে একটা গাছের ডালে উঠে বসলেন। লোহার কড়ার দরজাটা তখনও খোলা। কেউ এখনও বেরোয়নি। হয়তো মানুষ শিকার করতে গেছে।
ঠিক তখনই সিঁড়িতে ভারী পায়ের শব্দ পেলেন। শব্দটা ওপরের দিকে আসছে। একসঙ্গে দুজন উঠে এল। রুদ্রাণী চিনে ফেললেন—কায়ান রাত্রেশ আর দ্রোহানকে। কিছু কথাবার্তার পর দ্রোহান চলে গেল।
কায়ান এদিক–ওদিক তাকিয়ে ধীরে ধীরে কালো ছাইয়ের মতো হয়ে গেল। তারপর মুহূর্তেই সে সুদর্শন এক মানুষের রূপ নিল।
রুদ্রাণী তার পেছন দেখে থমকে গেলেন।
তার মানে, কায়ান রাত্রেশ মানুষের রূপে মানুষের সঙ্গেই মিশে আছে! কিন্তু কোথায় থাকে সে? নাকি রাত হলে মানুষরূপে বের হয়?
তিনি সামনে গিয়ে মুখটা দেখার কথা ভাবলেন। ভাবলেন, কায়ানের মুখোমুখি হয়ে বলবেন, আমাদের পেছন ছাড়ুন, সর্দার। আমাদের বাঁচতে দিন। চলে যান এখান থেকে।
বুকভরা সাহস নিয়ে এগোতে যাবেন—ঠিক তখনই কায়ান উড়াল দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
রুদ্রাণী থরথর করে কেঁপে উঠলেন।
সর্বনাশ! রাক্ষস বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েছে। আমার মেয়ে, আমার নাতনী—সবাই একা!
এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনিও উড়ে এসে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। কায়ানের ছায়া অনুসরণ করলেন। কায়ান কিছু একটা টের পেয়ে থমকে দাঁড়াল।
এবার রুদ্রাণী আর ভয় পেলেন না। যেখানে তার মেয়ে আর নাতনীর ওপর সরাসরি আক্রমণের আশঙ্কা—সেখানে ভয় পেলে চলে না।
তিনি কোমর থেকে বাবার দেওয়া বিশেষ ছুরিটা বের করলেন। কাঁপা কাঁপা পায়ে সামনে এগোলেন।
ঠিক তখনই কায়ান ফিরে তাকাল।
আরহামের রুপে কায়ানকে দেখে রুদ্রাণী চিৎকার করতে গেলেন, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। শরীর অবশ হয়ে গেল। হাঁটু ভেঙে বসে পড়লেন।
চোখের সামনে যা দেখছেন—তা কি সত্যি?
রাক্ষস রাজা কায়ান রাত্রেশ… তবে কি আরহাম?
আরহাম সেজেই এতদিন তাদের সঙ্গে ছিল? কেমনে সম্ভব…?
চলমান……!
