#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
পর্ব-২৩
রুদ্রাণীর এরকম আচরণে কায়ান ভড়কে গেল। সে প্রথমে বুঝতে চাইল—ব্যাপারটা কী? রুদ্রাণী এমন করছেন কেন? সে হাত বাড়িয়ে রুদ্রাণীকে তুলতে গেলে রুদ্রাণী নিজে উঠে সরে দাঁড়ান। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে কাঁপা গলায় বলেন,ন
“আ…প…নি আ…প…নি কায়ান সর্দার। আ…প…নি আরহাম নন।”
কথাটা শুনতেই পৃথিবী ঘুরে উঠল আরহামের। এই মহিলা এসব দেখল কীভাবে?
আরহাম মৃদু হেসে বলল,
“কিসব বলছেন মা?”
“মা বলবে না। আমি সব দেখেছি। আপনি কায়ান সর্দার। আপনি ধোঁকা দিয়েছেন। আমি এখনই গিয়ে আরশীকে সব বলছি।”
কায়ান এবার সিরিয়াস হয়। বুঝে যায়—সত্যিই এই রুদ্রাণী হয়তো সব দেখেছে। সে হাত লম্বা করে রুদ্রাণীর গলা ধরে। কাছে টেনে নিয়ে এসে বলে,
“আমাকে হিংস্র হতে বাধ্য করো না। যা দেখেছ, এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখো। ভুলেও আরশীকে বলার কথা ভাবলে, তোমাকে মেরে ফেলতে আমার সময় লাগবে না।”
রুদ্রাণী কখনও কল্পনাতেও ভাবেনি, শক্তিশালী কায়ানকে তিনি কখনও আঘাত করবেন। কিন্তু এখন তিনি নিরুপায়। জল অনেক দূর গড়িয়েছে—এখনই সব সামাল না দিলে আরশীর বিপদ হতে পারে। কায়ানের পাশাপাশি তাকেও হিংস্র হতে হবে।
তিনি হাতে থাকা যাদুর ছুরি দিয়ে কায়ানের হাতে আঘাত করেন। হুট করে এমন আঘাতে কায়ান ছিটকে সরে যায়। হাত শিথিল হয়। এই সুযোগে রুদ্রাণী দৌড়ে উপরে চলে যান।
কায়ান সময় নেয় না। সেও সঙ্গে সঙ্গে উপরে চলে আসে। রুদ্রাণী আরশীর রুমে ঢুকতে যাবেন—সে পেছন থেকে খামচে ধরে রুদ্রাণীকে। রুদ্রাণী গুঙানির মতো শব্দ করে ওঠেন। কায়ান তাঁকে শূন্যে তুলে নিয়ে নিচে নামিয়ে আনে। আগুনচোখে বলে,
“তোর এত বড় সাহস? বারবার না বলা সত্ত্বেও তুই আমার আরশীকে বলতে যাচ্ছিস! জানিস তাকে আমি কত ভালোবাসি!”
“আপনার মতো হিংস্র প্রাণী ভালোবাসতে পারে না। আপনি আমার আরশীকে খেয়ে ছাড়বেন। আমি তা হতে দেব না।”
‘আরশী’ বলে রুদ্রাণী শব্দ বের করার আগেই কায়ান মুখ টিপে ধরে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“চেষ্টা করেছি তোকে বাঁচিয়ে রাখতে, তবে সেটা আর সম্ভব না। এখনই তোকে মেরে ফেলব আমি।”
রুদ্রাণীর ভয়ডর সব উধাও হয়ে যায়। তিনি হাতে থাকা ছুরি দিয়ে চপাঘাত করতে থাকেন কায়ানকে। কায়ানের এতে আঘাত লাগলেও তাকে থামানো যায় না। বরং সে আরও বেশি রাগান্বিত হয়। তার ভয়ংকর রূপ জেগে ওঠে। সে ভুলে যায়—সে বাড়িতে আছে। সে আসল রূপে এসে জানোয়ারের মতো আঘাত করতে থাকে রুদ্রাণীকে। আর বলতে থাকে,
“রাক্ষস রাজার সঙ্গে এরকম কথা বলার দুঃসাহস হলো কী করে?”
রুদ্রাণী থেমে যান। কাহিল হয়ে পড়েন। কায়ানের শক্তির সঙ্গে তার শক্তি একেবারেই নগণ্য। কায়ান তার সারা শরীর কামড়ে আর খামচে দেয়। রক্তে জবুথবু পুরো উঠোন।
রুদ্রাণী ঠোঁট নাড়িয়ে শুধু বলেন,
“আরশী… আরশী…”
ঘুম ভাঙে আরশীর। অরাইয়ার জন্মের পর থেকে কতক্ষণ পরপর আপনাআপনি তার ঘুম ভেঙে যায়। মেয়েটা ঠিক আছে কিনা—এই চিন্তায় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে আরশীর। সে ঘড়িতে সময় দেখে—রাত তিনটা বাজতে গেছে। এদিকে দরজা খোলা। আরহাম কোথায়? ফেরেনি? নাকি বাইরে গেছে?
আরশী উঠে বারান্দায় যায়। গুঙানির শব্দ আর ঘ্ররর..হ্রা..আ..আ এরকম অদ্ভুত বিকৃত গর্জন শব্দ শুনে সে নিচে তাকায়। লাইটের মৃদু আলোয় উঁচু, বড়, পাহাড়ের মতো অদ্ভুত এক জন্তু দেখে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। জন্তুটার মুখ স্পষ্ট নয়। তার লম্বা হাত প্রায় বড় গাছের মতো। জন্তুটার নিচে রক্তে লাল মাকে দেখে সে চিৎকার করে ওঠে,
“মা!”
কায়ানের কানে আরশীর চিৎকার পৌঁছানো মাত্র কায়ান ফুরুৎ করে হাওয়া হয়ে যায়।
আরশী পাগলের মতো দৌড়ে নিচে নামে। চারদিকে এত এত রক্ত দেখে তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। রক্তমাখা উঠোনে হাটু গেড়ে বসে মায়ের মুখে হাত দিয়ে ডাকে,
“মা… মা… ও মা! কী হয়েছে? কে মেরেছে তোমাকে?”
রুদ্রাণী হাঁপাচ্ছেন। রক্তে ভেজা হাত দিয়ে তিনি আরশীর হাত চেপে ধরে কাঁপতে থাকা ঠোঁট ফাঁক করে ফিসফিসানি সুরে বলেন,
“আ..র..হা..ম… আরহাম…”
আরশীর বুকের ভেতর কেঁপে উঠে। সে অস্থির গলায় বলে,
“হে মা, বলো—আরহাম কী?”
“আরহাম আসলে—”
রুদ্রাণী বলতে যাবেন, তখনই একটা হাত এসে রুদ্রাণীর মুখ আটকাতে চায়। আরশী মাকে আড়াল করে নিজের শরীর দিয়ে ঢেকে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হাতটা থেমে যায়, মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।
রুদ্রাণী আবার কষ্ট করে বলতে থাকেন,
“আরহাম আসলে মানুষ নয়, আরশী। ও রাক্ষস। রাক্ষস কায়ান রাত্রেশ। সে মানুষের বেশে তোকে বিয়ে করেছে। আমি এটা তোকে বলতে যাচ্ছিলাম, এজন্য সে আমাকে মেরে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি এ বাড়ি থেকে চলে যা মা। এ বাড়ির পাতালে রাক্ষসরা থাকে।”
মায়ের মুখ থেকে এসব কথা শুনে থ বনে যায় আরশী। তার শরীর হিম হয়ে যায়। সে স্ট্যাচুর মতো নড়াচড়া না করে বসে থাকে। চোখ ঘুরিয়ে এপাশ-ওপাশ দেখে। কোথাও কেউ নেই।
মায়ের দিকে ঝুঁকে বলে,
“ও আমার আরহাম মা। ও রাক্ষস হবে কীভাবে? কী যা-তা বলছ?”
“ও রাক্ষস, মা। ও তোকে খেয়ে ফেলবে।”
আরশী মাথা ঝাকিয়ে উঠে
“এটা হতে পারে না। পারে না হতে!”
“এ…টাই সত্যি সোনা। পালিয়ে যা।”
রুদ্রাণী অচল হয়ে পড়েন। চোখদুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। আরশী কোলে তুলে নেয় রুদ্রাণীর মাথা। কেঁদে কেঁদে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“তোমাকে কীভাবে বাঁচাব মা? তুমি নিস্তেজ হয়ে পড়ছ কেন? তুমি ছাড়া আমার গতি নেই মা। তুমি চলে গেলে কে আমাকে রাক্ষসের হাত থেকে বাঁচাবে? মা, ও মা… কীভাবে বাঁচাব বলো না। কোনো উপায় তো আছে। দেখো—কীভাবে জানোয়ার তোমাকে খাবলে দিয়েছে। রক্তের বন্যা বানিয়ে ফেলেছে।”
রুদ্রাণীর নিঃশ্বাস থেমে যায়। তিনি চলে যান এ দুনিয়া ছেড়ে। ধীরে ধীরে ছাই হতে থাকে রুদ্রাণীর শরীর। আরশী সেটা দেখে উন্মাদের মতো আঁকড়ে ধরে রুদ্রাণীর হাত।
“এমন হচ্ছে কেন মা? তুমি ছাই হয়ে যাচ্ছ কেন? কোথাও চলে যাচ্ছ আমাকে ছেড়ে? আমি কি আর কোনোদিন তোমাকে দেখতে পাব না? তোমার কোনো চিহ্ন থাকবে না আমার কাছে?”
রুদ্রাণী পুরোপুরি মিলিয়ে যান। তাঁর ছাইও বাতাসে মিলিয়ে যায়। আরশী বুকফাটা আর্তনাদ করে। লাল-কালো রক্তে হাত ডুবিয়ে আহাজারি করে,
“ছোট্ট থেকে তোমার এই আরশীকে আগলে রেখেছ তুমি। আমার জন্য রাজ্য ছেড়েছ, মা–বাবা, আত্মীয় ছেড়েছ। কুমারী থেকেছ। আমার জন্য সব করেছ—সেই তুমি আমাকে এভাবে মাঝপথে রেখে কীভাবে চলে যেতে পারো মা? কে আমায় রক্ষা করবে? কে আমার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে? আমাকে বড্ড একা করে দিলে মা! এত বড় অন্ধকারে আমাকে একা করে দিয়ে চলে গেলে কেন? মা…!”
হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে আরশী।
নজরুল নিচে নেমে আসেন। মেয়ের কান্না আর এত রক্ত দেখে তিনি পুরো ঘটনা বুঝতে পারেন না, তবে ভয়ংকর কিছু যে ঘটেছে—তা টের পান। মেয়ের কাছে যেতেই আরশীর কান্না আরও বেড়ে যায়। ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে,
“মা মারা গেছেন বাবা। আমার মা মারা গেছেন।”
নজরুল চমকে ওঠেন।
“কই? রুদ্রাণী কই?”
“উনি ছাই হয়ে মিশে গেছেন বাবা। এই যে—এই যে আমার মায়ের তাজা রক্ত। আমি আর কোনোদিন মাকে দেখতে পাব না বাবা। কোনোদিন না। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। যন্ত্রণা হচ্ছে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।”
নজরুল শান্তনা দেন,
“কান্না থামাও, আরশী। কান্না না থামালে বুঝব কী করে কী হয়েছে? কে মেরেছে রুদ্রাণীকে?”
আরশী কাতর দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে থাকে। তারপর ভালো করে চোখ মুছে আরশী। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবাকে বলে,
“আমরা যার ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, সে এতদিন ধরে সবসময় আমাদের সঙ্গেই ছিল। আমার সঙ্গে চিট করেছে বাবা। ভালোবাসার নাটক করেছে। তার টার্গেট ছিল তুমি, আমি, মা। সে আমাদের এমনিতেই মেরে ফেলতে পারত বাবা। তবে কেন আমার সঙ্গে ভালোবাসার নাটক করল? পৃথিবীর সবথেকে বড় যন্ত্রণা যে এ যন্ত্রণা। আমি কীভাবে এতকিছু সইব বাবা?”
নজরুল মেয়েকে থামাতে চাইলেন,
“কী বলছিস? কে সে?”
“ আরহাম। আরহাম মাকে মেরেছে, বাবা।”
স্তব্ধ হয়ে যান নজরুল।
“কী! কী বলছিস?”
“হ্যাঁ বাবা। মা তাই বলেছেন। আর রাক্ষস কায়ান রাত্রেশ নাকি আরহাম।”
নজরুল এবার প্রচণ্ড ভড়কে গেলেন। উত্তেজনায় কাঁপতে লাগলেন।
“সত্যি নাকি?”
“মা মিথ্যা বলার মানুষ না বাবা। এটা সত্যি। সে ছদ্মবেশে এতদিন আমাদের সঙ্গেই ছিল। এ বাড়ির পাতালে নাকি তাদের আস্তানাও আছে।”
নজরুলের কাছে এবার সব স্পষ্ট হয়ে গেল। তার মানে, নজরুলকে এ বাড়ির আস্তানাতেই কেউ আটকে রাখছিল। ভয় পেয়ে তাঁর হাত-পা ঠান্ডা হতে শুরু করল। তিনি আরশীকে বললেন,
“তাড়াতাড়ি এ বাড়ি ছাড়তে হবে, আরশী।”
আরশী মাথা ঝাঁকিয়ে না বলে,
“আমি যাব না বাবা। আমার মায়ের হত্যার প্রতিশোধ আমি নিয়ে ছাড়ব। তাতে বাঁচি বা মরি। এখান থেকে পালিয়ে যেখানে যাব, সেখানেও তারা আমাদের পিছু নেবে। কী দরকার?”
আরশীর কথা নজরুলের পছন্দ হয় না। তিনি ভাবেন—মেয়ে এখন কষ্টে আছে। পরে তাকে বুঝিয়ে সরিয়ে নেওয়া যাবে। এত রাতে উঠোনে থাকতে তাঁর ভয় কাজ করছে। আশেপাশে রাক্ষস কেউ আছে কিনা—এই ভাবনাতেই কলিজা ঠান্ডা হয়ে আসছে। তিনি আরশীকে একপ্রকার জোর করেই ঘরে নিয়ে যান।
আরশী মেঝেতে বসে পড়ে। অদ্ভুতভাবে তার কোনো ভয় কাজ করছে না। তার কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে রুদ্রাণীর জন্য। কীভাবে সে মাকে ছাড়া থাকবে? মায়ের মৃতু্তে সে শুধু একজন মাকে হারায়নি, সে হারিয়েছে তার শেষ আশ্রয়, শেষ সাহস, শেষ নিরাপত্তা। মা কী এমন ক্ষতি করলো রাক্ষসের, যে আমার মাকেই তার মেরে ফেলতে হলো। রুদ্রাণীর জন্য যেমন কষ্ট হচ্ছে রুদ্রাণীর, তেমন রাগ হচ্ছে আরহামের ওপর। জেদ বাড়ছে। যে ভালোবাসার উপর সে জীবন গড়ে তুলছিল, সেই ভালোবাসাই তার মাকে কেড়ে নিয়েছে – এই উপলব্ধিটা তার ভেতর বিষের মতো ছড়িয়ে পড়লো। প্রতিশোধের কথা বারবার মাথায় আসছে তার। কীভাবে জানোয়ারটা শুরু থেকে অভিনয় করতে করতে এই অব্দি এসে পৌঁছাল! আমার মায়ের যতটুকু রক্ত বের হয়েছে, ততটুকু রক্ত আমি তার শরীর থেকে ঝরাব। সে আমাকে দশটা আঘাত করলে আমি অন্তত তাকে একটা করব। আর ভয় পাব না। মায়ের রেখে যাওয়া সব অস্ত্র কাজে লাগাব।
___________
অরাইয়া এলহা অনেকক্ষণ ধরে কাঁদছে। কেউ তাকে কোলে তুলে না নেওয়ায় তার কান্না আরও ঝাঁঝালো হয়ে উঠেছে। নজরুল অরাইয়াকে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তিনি আরশীকে বলেন,
“মেয়েটাকে কোলে নেও। খাওয়াও। খিদে লাগছে বোধহয়।”
আরশী কিছু বলে না। চুপচাপ থাকে।
নজরুল অরাইয়াকে আরশীর কাছে এনে কোলে দিতে গেলে আরশী চেঁচিয়ে ওঠে,
“সরাও বলছি বাবা! ও রাক্ষসের বাচ্চা। ও জানোয়ারের বাচ্চা। ও আমার কিছু না। ওকে আমার সামনে নিয়ে এসো না বাবা।”
নজরুল আরশীর আচরণ দেখে অবাক হন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন,
“এটা তোমার মেয়ে, আরশী। তোমার গর্ভ থেকেই ওর জন্ম হয়েছে। আরহামের প্রতি রাগ দেখিয়ে ওকে ত্যাগ করতে পারো না। নাও মা, কোলে নাও। একটু খাওয়াও মেয়েটাকে। কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে আসছে ওর।”
“বাবা, ওর শরীরে রাক্ষসের রক্ত। রাক্ষসের রক্ত বাবা। ও বড় হয়ে ছুরি মারবে। ও রাক্ষস হবে। আমি ওকে মেনে নিতে পারব না।”
কায়ান রাত্রেশ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব অদৃশ্য হয়ে দেখছিল। রুদ্রাণীর জন্য আরশীর কান্না দেখে সে নিজেও ব্যথিত হলো। তখন তার সেন্স কাজ করেনি। আসল রূপ ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। তাছাড়া রুদ্রাণী যেভাবে বাড়াবাড়ি শুরু করেছিলেন—আরশীকে সব বলে দিতেন। আরশীর কাছ থেকে সব লুকানোর জন্য কায়ানের এটা করতেই হয়েছিল। কিন্তু সে একবারও ভাবেনি, রুদ্রাণী সব বলে দেবেন।
সে তো এমনভাবে আঘাত করেছিল যে রুদ্রাণী নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। ভেবেছিল—সেকেন্ডের ভেতর প্রাণপাখি ফুরুৎ করে উড়াল দেবে। কিন্তু সেই মুহূর্তে আরশীর চলে আসা, দেখে ফেলা—রুদ্রাণীর সব বলে দেওয়া—সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।
তারপর সে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরশীর সামনে কীভাবে যাবে, কী বলবে—এইসব ভাবতে ভাবতেই সময় যাচ্ছিল। আরশীর মুখে নজরুলকে তার ব্যাপারে সব কথা বলতে শুনেছে। যে ভয় সে এতদিন ধরে পাচ্ছিল, সেই ভয়টাই সত্যি হলো। তার প্রতি আরশীর ঘৃণা জেগে উঠেছে।
কায়ান একবার ভাবছিল—সব জেনে গেছে যখন, তখন সামনে আসবে। আবার ভাবছিল—চলে যাবে, হারিয়ে যাবে। কিন্তু সে সেটা পারবে না। আরশীকে রেখে, মেয়েকে রেখে সে উধাও হয়ে যেতে পারে না। বরং সামনে গিয়ে মোকাবিলা করাই দরকার।
নিচ থেকে সে মেয়ের কান্না শুনছিল। উপরে উঠে আড়ালে দাঁড়িয়ে আরশী আর নজরুলের সব কথা শুনল। এদিকে অরাইয়া কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে, আরশী তাকে কোলে নিচ্ছে না—বরং দূরে ঠেলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর কায়ানের আর সহ্য হলো না। মেয়ের প্রতিটা কান্না তার বুকে তীরের মতো বিঁধছে।
সে সব ভয়ডর একপাশে ফেলে সোজা গিয়ে রুমে ঢুকে পড়ে।
তাকে দেখে নজরুল আর আরশী দুজনেই অবাক হন। আরশী আগে যতই বলুক—ভয় পাবে না, প্রতিশোধ নেবে—এখন সামনে দেখে তার হাঁটু কাঁপছে। একটা রাক্ষস ঘরে ঢুকেছে—এই ভাবনাতেই গা হিম হয়ে যাচ্ছে।
নজরুল অরাইয়াকে খাটে রেখে একপাশে গিয়ে দাঁড়ান। আরশী বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। বড় বড় চোখজোড়া আরহামের দিকে নিবদ্ধ করে। আরহাম কারও দিকে না তাকিয়ে অরাইয়াকে কোলে তুলে নেয়।
“কাঁদে না, সোনা,” বলে হাঁটতে থাকে।
তাও কান্না বন্ধ না হলে আরশীর কোলে জোর করে তুলে দেয়। ধমকে বলে,
“আমার মেয়েকে এখনই খাওয়াও। ওর কান্না থামাও।”
আরশী অনেক কিছু বলতে চায়, কিন্তু তার গলা ধরে আসে। কিছু বলতে পারে না। সে অরাইয়াকে কোলে নিয়ে বসে। অরাইয়ার দিকে না তাকিয়ে ব্রেস্টফিডিং করায়। সঙ্গে সঙ্গে অরাইয়ার কান্না থেমে যায়।
আরশী অরাইয়াকে খাটে শুইয়ে দেয়। অরাইয়া হাসছে, খেলছে, মুখ দিয়ে শব্দ করছে। আরশী ফিরেও তাকায় না। নজরুল এখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর ভেতরেও অস্থিরতা আর ভয় দলা বেঁধে আছে। নড়ার সাহস পাচ্ছেন না।
কায়ান কারও দিকে তাকায় না। মেয়ের সঙ্গে গল্প করতে শুরু করে। অরাইয়া বাবার সঙ্গ পেয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায় আর জোরে জোরে হাসে।
চলমান….
#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
২৪.
আরশীর মাথায় কিলবিল করতে থাকে কথারা। সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে আরহামের ওপর। কিন্তু সাহস হচ্ছে না। তার বাবা এখনও দাঁড়িয়ে আছেন কোণায়। আরশী চোখের ইশারায় বাবাকে চলে যেতে বলে। নজরুল চুপচাপ বের হয়ে যান রুম থেকে। অরাইয়া আরহামের সঙ্গে খেলছে।
আরশী হাঁটুতে মাথা রেখে বাইরে তাকিয়ে থাকে। চোখ বেয়ে পড়ছে নীরব ধারায় অশ্রু। সে কোনোভাবেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। জোরে জোরে কান্না করলে হয়তো তার ব্যথাটা একটু কমত। কিন্তু তারও উপায় নেই। মাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে সে সবচেয়ে বেশি অসহায় অনুভব করছে।
কায়ান সরাসরি আরশীর দিকে তাকাচ্ছে না। কিন্তু আরশীর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি সে পর্যবেক্ষণ করছে। তার ভেতরে উত্তেজনা, বেদনা আর অপরাধবোধ জট বেঁধে আছে। কীভাবে সে আরশীর মুখোমুখি হবে, কথা বলবে—কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। আরশীর অবিরাম কান্না তার বুকের ভেতর ছুরি চালাচ্ছে।
অরাইয়া এলহা ঘুমিয়ে পড়েছে। আরহাম মেয়েকে শুইয়ে দিয়ে ঘরের লাইট অফ করে দেয়। বাইরের লাইটের মৃদু আলো দেয়াল আর বিছানার মাঝে ছায়া ফেলেছে। সেই ছায়া এসে পড়েছে আরশীর খোলা চুলেও।
আরহাম ধীর পায়ে আরশীর দিকে এগোয়। আরশীর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে আরশীকে ধরতে গিয়েও থেমে যায় সে। কয়েকবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। আলতো করে হাত রাখে আরশীর কাঁধে।
আরশী চমকে ওঠে। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। আরহামকে দেখে তার কলিজা কেঁপে ওঠে। সে পিছু হটে। আরহাম চেপে ধরে আরশীর কোমর, টেনে নিয়ে আসে কাছে। আরশী চোখ বড় বড় করে তাকায়। দুজনের চোখে চোখ পড়ে। আরশী চোখ ফিরিয়ে নেয়। সরে যেতে চায়। কায়ান আরও চেপে ধরে।
আরশীর মায়ের রক্তে ভেজা শরীর চোখে ভাসে। আরশী শক্ত হয়ে যায়। রাগে কাঁপতে থাকে। শক্ত করে ধরে আরহামের টি-শার্ট, ঝাঁকিয়ে বলে, “আপনি রাক্ষস কায়ান রাত্রেশ? মানুষরুপে আরহাম হয়ে আমাকে বিয়ে করেছেন? এটা সত্যি?”
আরহাম হ্যাসূচক মাথা ঝাকায়।আরশী চিৎকার করে,
“আমার মাকে কেন মেরেছেন? কী ক্ষতি করেছিল আমার মা? আমাকে খেতে দিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন? আমাকে খেয়ে ফেলতে চান? মেরে ফেলতে চান? মারুন। এখনই মেরে ফেলুন। আমাকে মেরে ফেলতে তো আপনি এমনিতেই পারতেন। কেন সেখানে এত অভিনয় করলেন? ভালোবাসার কথা বললেন কেন? কেন আমার মাকে মারলেন? উত্তর দিন। দিন উত্তর। কেন মাকে মারলেন… কেন—” বলতে বলতে আরশী হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
কায়ান ঢোক গিলে আরশীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল,
“তোমাকে আমি সত্যিই ভালোবাসি, আরশী। এই পৃথিবী যেমন সত্য, চন্দ্র-সূর্য যেমন সত্য, তেমনি আমার ভালোবাসাও সত্য। কোনো খাদ নেই এ ভালোবাসায়।”
“চুপ করুন আপনি। চুপ করুন। আপনি ছোট থেকেই আমাকে খেতে চেয়েছেন, এখনও। দয়া করে ভালোবাসার কথা বলবেন না। মাকে কেন মারলেন—উত্তর দিন।”
“মা সত্যিটা দেখে ফেলেছিলেন। উনি তোমাকে সব বলে দিতেন। আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু রুদ্রাণী শোনেনি। আমি মারতে চাইনি, বাধ্য হয়েছি মারতে।”
আরশী আরহামের শার্ট খামচে ধরে আরও কাছে টেনে আনে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“এটা কোনো কারণ হলো মাকে মেরে ফেলার? একজন মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই? এত সস্তা জীবন? উনি আমার মা ছিলেন—আমার সব ছিলেন। আমাকে ভালোবাসলে আমার মাকে কখনও আঘাত করতে পারতে না।
তোমরা আমার পুরো বংশকে শেষ করেছ। আমার বাড়ি নিয়েছ। আমার দুই মাকে মেরেছ। আমার বাবার পেছনে লেগেছ। কী এমন নেই যা তুমি করোনি? এখন বাকি থাকলাম শুধু বাবা আর আমি। দেরি কেন? আমাকে এখনই শেষ করে দাও। আমাকে বাঁচিয়ে রেখে তোমার ভালো হবে না। নইলে আমি আমার মাকে হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়ব। বুঝেছ তুমি?” ভয়ংকর শোনায় আরশীর বলা কথাগুলো।
আরহামের বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ে। সে বুঝে যায়—আজ থেকে যুদ্ধটা বাইরে না, যুদ্ধটা শুরু হয়ে গেছে আরশীর ভেতরে।
আরহাম আরশীর দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি আমাকে মারবে? মারতে পারবে?
তুমি না আমায় ভালোবাসো, আরশী?”
“কীসের ভালোবাসা? কোনো রাক্ষসের প্রতি আমার ভালোবাসা নেই। যে আমার সব আপনজনকে ছিনিয়ে নিয়েছে, সব জানার পরেও তাকে আমি ভালোবাসব—এতটা মাতাল আমি নই। বুঝলেন?”
“আমাকে মেরে ফেলুন। দেরিতে মারবেন কেন? আগেই মেরে ফেলুন। খেয়ে ফেলুন। বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখবেন না আমাকে। নইলে আপনার শেষ হবে আমার হাতে।”
আরহাম অট্টহাস্যে হেসে ওঠে। দুলে দুলে হাসে। হাসতে হাসতে তার চোখে পানি চলে আসে।
“তুমি আমাকে মারবে? তুমি? রাক্ষস রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজাকে?”
কায়ানের এমন হাসিতে আরশীর ভয় লাগে। সে আর কোনো কথা বলে না। যা হবে হবে—এই ভঙ্গিতে সে খাটের ওপর বসে পড়ে। অরাইয়ার ছোট ছোট নিঃশ্বাস চলছে। বুক উঠানামা করছে। আরশীর চোখ পড়তেই সে তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নেয়। ওর দিকে তাকানো যাবে না। ওর গায়ে আরহামের রক্ত। ও রাক্ষস। ও বড় হয়ে কতটা ভয়ানক বিপজ্জনক হবে, কেউ বলতে পারে না। সবাই তো আর রুদ্রাণীর মতো হয় না।
আরশীর চোখ বুজে আসে। সে মাথা এলিয়ে দেয় বালিশে।
আরহাম বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মাথায় আকাশ-পাতাল চিন্তা ঘুরতে থাকে। হুট করে কী থেকে কী হয়ে গেল। সব ওলট-পালট হয়ে গেল। আরশী তার হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আরশীর ভেতরে প্রতিশোধ জন্ম নিচ্ছে।
আরশী তাকে ভুল বুঝছে। আরশী তাকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। আরহাম ভাবে, এটা কি সত্যি, নাকি রাগের কথা? যদি রাগ হয়, সময় গেলে কমে যাবে। আর যদি ঘৃণা থেকে বলা হয়—তাহলে আরশীই জিতে যাবে। কারণ এই পৃথিবীর সবার বিরুদ্ধে আমি যেতে পারব, সবাইকে নির্মমভাবে খুন করতে পারব, কিন্তু আরশীকে কিছু করতে পারব না। আরশী যদি আমাকে আঘাত করতে করতে মরার মতো অবস্থায়ও ফেলে, তবু নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে আরশীকে আঘাত করতে পারব না।
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে,
“বলো তো আকাশ, বলো তো চাঁদ—এই মেয়েটার প্রতি আমার এত ভালোবাসা কেন? কেন মানুষ মেয়েটা আমাকে প্রভাবিত করে রেখেছে? আসক্ত করে রেখেছে? এর উত্তর কি তুমি দিতে পারবে?”
জানি, পারবে না। কেউ পারবে না। এটা অলৌকিক। আমার ধ্বংস অনিবার্য বলেই আরশীকে আমি মনেপ্রাণে ভালোবাসি।
ভোর হতে চলেছে। দূর দূর শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ কান্নার সুর ভেসে আসে। আরশীর ঘুম ভেঙে যায়। সে আঁতকে উঠে বসে। লাইট জ্বালায়। ঘরে কায়ান নেই। অরাইয়া কান্না করছে। এতক্ষণ তো মেয়েটা ঘুমাচ্ছিল। এখন এই অস্বাভাবিকভাবে কাঁদছে কেন? এ কান্না স্বাভাবিক না, খুব তীক্ষ্ণ, খুব কর্কশ। শিশুর কান্না মনে হচ্ছে না এটা।
কান্নার তেজ সহ্য করতে না পেরে আরশী দোলনার কাছে যায়। অরাইয়া লাল হয়ে আছে। চোখ বন্ধ, কিন্তু মুখ হাঁ করে কান্না করছে। ঠিক তখনই ঘরের বাতিটা হঠাৎ ফ্লিকার করে। টুক… টুক… টুক… শব্দ হয়। টেবিলে রাখা কাচের পানির গ্লাসটা নিচে পড়ে ফেটে যায়।
আরশী জমে যায়। সে নড়তে পারে না। চারপাশে তাকায়। কোনো বাতাস নেই। জানালা বন্ধ। অথচ কাচটা নিজে থেকেই ভেঙে পড়েছে। আরশীর বুক ধক করে ওঠে। ভয় পেয়ে সে মেয়েটাকে কোলে নেয়।
অরাইয়ার কান্না আরও বেড়ে যায়। আরশীর কোলের ভেতর অরাইয়ার শরীর হঠাৎ অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। জ্বরের গরম না, এটা যেন ভেতর থেকে ওঠা তাপ।
“না… না… এটা কিছু না,” নিজেকে বোঝায় আরশী।
অরাইয়া চোখ খুলে তাকায়। আরশীর বুকের ভেতর ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। তার মেয়ের চোখ এমন না। চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়। কালো মনির ভেতর হালকা লালচে আভা। খুব ক্ষণিকের জন্য, এক নিশ্বাসের সমান সময় এমন চোখ থাকে। তারপর চোখ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আরশীর হাত কেঁপে ওঠে।
আরশী ভাবে, এসব হচ্ছে কেন? নাকি অরাইয়া রাক্ষস রূপ ধারণ করছে? নিশ্বাস আটকে আসে তার। সে অরাইয়াকে ছুড়ে ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারে না। শক্ত করে বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে,
“না… তুই এমন হতে পারিস না। তুই আমার মেয়ে। তোর গায়ে আমারও রক্ত।”
অরাইয়া ছোট্ট হাতে আরশীর গলা ছুঁয়ে দেয়। হাত লাগতেই সেখানে হালকা পোড়া দাগের মতো লালচে ছাপ ফুটে ওঠে। আরশী আহ্ বলে শব্দ করে উঠে। তারপর মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। খুব মায়া লাগে তার। এই মেয়েকে নিয়ে কত বিকেল-সন্ধ্যা স্বপ্ন লিখে রেখেছিল ডায়েরির পাতায়। সেই মেয়েকে কীভাবে ছুড়ে ফেলবে সে? চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড রাগ আর ঘৃণা হয় তার কায়ানের প্রতি। এই কায়ানের জন্যই তার জীবন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তার গর্ভ থেকে একটি সুস্থ সন্তান জন্ম নিতে পারত। জীবন টা স্বাভাবিক আট দশটা মানুষের মতো হতে পারত। আজ কায়ানের জন্যই তার সন্তান সংসার দুটোই অস্বাভাবিক।
দরজার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিল কায়ান। সে ঘটে যাওয়া সব দেখে ফেলে, কাচ ভাঙা, বাতির ফ্লিকার, অরাইয়ার চোখ। তার মুখ শক্ত হয়ে যায়। এই লক্ষণ সে চেনে। শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে যায় তার।
ছোটবেলায় পড়া পুরোনো এক গ্রন্থের কথা তার মনে করে। সেখানে লেখা ছিল—
রাক্ষস রাজ্যে এমন এক শিশু জন্ম নেবে, যে রাজ্য, সিংহাসন, নিয়ম, সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকবে। তার রাগে, তার কষ্টে জাগবে ধ্বংস। ভালোবাসা পেলে সব ঠিক থাকবে, আর অবহেলা পেলে সব শেষ হয়ে যাবে।
আরহাম ফিসফিস করে বলে,
“অরাইয়া কি তবে সেই শিশু, যাকে নিয়ে রাক্ষস রাজ্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ভয় পেয়ে এসেছে?”
আরশী এমনিতেই অরাইয়াকে পছন্দ করছে না। আর যদি এসব জানতে পারে, তাহলে সে নিজেই মেয়েটাকে মেরে ফেলবে।
আমি কী করব? করব কী?
চলমান….!
