#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
#পর্ব_১১
ভোরের আলো ফুটতেই পাখির কিচিরমিচির শব্দে আরশী চমকে জেগে উঠে। সারারাত তার বেলকনিতে কেটেছে। হঠাৎ চোখ লেগে আসছিল। সূর্যের রেখা তার চোখে এসে পড়েছে। সে হাই তুলতে তুলতে উঠে দাড়ায়।য়
বাড়িটা নিস্তব্ধ। দরজার ফাঁক দিয়ে মায়ের ঘরে উঁকি মেরে দেখে মা ঘুমাচ্ছেন। আরশী গেট পেরিয়ে বাইরে গিয়ে হাঁটলো অনেকক্ষণ। রাস্তা একদম ফাঁকা। মাটিতে সকালের কুয়াশা নেমে আছে পাতলা তুলোর মতো। কয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে দৌড়ে যাচ্ছে। এছাড়া আর কারও সাড়া–শব্দ নেই। মনে মনে তার চোখ পাগলটাকে খুঁজছিলো। কোথাও দেখতে পেলো না। আরশী মনে মনে ভাবছিল পাগলটাকে আজ পেলে আর ছাড়বে না। সব জেনে তবেই মুক্তি দেবে। কিন্তু পাওয়া আর হলো না।
আরশী বাড়ি যায়। মা এখনও উঠেননি। সে মা উঠার অপেক্ষা করে। একা একা চিন্তা করে অনেকক্ষণ। মায়ের সাথে কি সম্পর্ক হতে পারে পাগলটার? যদি না হয়, তাহলে এত রাতে মা কেন পাগলের সাথে কথা বললেন? আরশী শান্তি পায় না। মায়ের খাটে গিয়ে বসে। ডাকে— উঠোনা মা। আর কত ঘুমাবে?
এভাবে কতক্ষণ ডাকার পর রুদ্রাণী উঠেন। মেয়েকে বিধ্বস্ত মুখে খাটে বসে থাকতে দেখে রুদ্রাণী প্রশ্ন ছুড়েন, “তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন আরশী?”
“কিছু না মা। তুমি এসো ফ্রেশ হয়ে।”
আরশী দম ছাড়ে বারবার। সে মাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করবে আজ। মা উত্তর না দিলে সে সত্যি অনেক কঠিন কিছু বলে ফেলবে।
রুদ্রাণী টাওয়াল দিয়ে হাত–মুখ মুছতে মুছতে বলেন, “কিছু বলবি আমাকে? এভাবে তো বসে থাকিস না।”
আরশী চোখ তুলে বলে, “বলো, গত রাতে পাগলটার সাথে তোমার কি কথা হয়েছিল মা?”
রুদ্রাণী থমকে গেলেন। হৃদয় ছ্যাত করে উঠলেও মুখে হাসি টেনে বললেন, “কিছু না তো।”
আরশীর রাগ হঠাৎ উথলে উঠে। সে জোর গলায় বলে, “মিথ্যা বলবে না মা। তোমার এত এত মিথ্যা আমি আর নিতে পারছি না। দয়া করে সত্যিটা বলো। এত রাতে পাগলটার সাথে কি কথা থাকতে পারে তোমার? আমার তো মনে হচ্ছে পাগলটা তোমার লোক। আর কত টেনশন দেবে আমাকে মা? দুদিন পরপর তোমার এত এত রহস্য। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
রুদ্রাণী ঘাবড়ালেন। আরশী এত উত্তেজিত সহজে হয় না। আজ এত কেন হচ্ছে? তিনি কীভাবে ঠান্ডা করবেন মেয়েকে?
আরশী দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “তুমি সত্যি কথা না বললে আমাকে হারাবে। আমি আর টলারেট করব না এসব। মা হয়েছো বলে সব করতে পারো না!”
রুদ্রাণী বড্ড অবাক হলেন। আরশীকে যেন আজ তিনি নতুন করে দেখতে পাচ্ছেন। আরশীর রক্তিম মুখে রাগ যেন উপচে পড়ছে।
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? বলো না মা? কি লুকাচ্ছো? কে ওই পাগলটা?” —গর্জে উঠলো আরশী।
রুদ্রাণী এক নিশ্বাসে বলে ফেললেন, “তোমার বাবা।”
আরশী মাথা ঝাঁকায়, “কে বাবা?”
রুদ্রাণী ঢোক গিলে বলেন, “ওই পাগলটাই তোমার বাবা।”
আরশীর হৃদয় কেঁপে উঠে। দুপা পিছনে সরে দাঁড়ায়। থেমে থেমে বলে, “কি ব..ল…ছো মা? উনি আমার বা…বা কীভাবে হবেন?”
রুদ্রাণী বসে পড়েন।। উনার ভেতরে তোলপাড় হচ্ছে। কেন তিনি বলতে গেলেন পাগলটা আরশীর বাবা? এই সত্যি বলতে গিয়ে কতকিছু বলতে হবে উনার। তাতে তিনি নিকৃষ্ট হয়ে উঠবেন আরশীর কাছে। যদি আরশী ত্যাগ করে উনাকে— এই পৃথিবীতে কি নিয়ে বাঁচবেন তিনি?
পরপর ফোঁস করে শ্বাস ছাড়েন তিনি। আরশী তীক্ষ্ণ চোখে অপেক্ষা করে আছে মায়ের কথা শোনার।
“উনি আমার বাবা কীভাবে? একজন পাগল কীভাবে আমার বাবা হয়? নতুন নাটক শুরু করছো নাতো মা?”
“মানুষটা পাগল নয়। তোমার বাবাই। এত বছর ধরে পাগলের বেশে আছেন।”
আরশী চমকায়। সাথে অদ্ভুত অনুভূতি হয় তার। না জানি কত সত্যি এখনও তার জানার বাহিরে। এমন রহস্যময় জীবন কেন তার?
মায়ের হাত ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, “তুমি মিথ্যা বলছো নাতো? সত্যি কি উনি আমার বাবা?”
রুদ্রাণী মাথা নাড়ালেন, “হু, তোমার বাবা। চরম সত্যি এটা।”
“তুমি চিনতে উনি আমার বাবা?”
অপরাধী ভঙ্গিতে মাথা ওপর–নিচ করলেন রুদ্রাণী।
আরশীর রাগ হয় প্রচণ্ড। থরথর করে কাঁপে সে। চোখে পানি টলমল করে। কাঁদো–কাঁদো গলায় চিৎকার করে উঠে, “তাহলে তুমি আমাকে বলোনি কেন? উনি আমার বাবা! উত্তর দাও!”
রুদ্রাণীর চোখেও পানি জমে। আরশীকে এমন রাগান্বিত দেখে। সেই ছোট্ট আরশী আজ এত বড় হয়ে গেল, তার উপরেই গর্জে উঠছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “অনেক কিছু এখনও তোমার জানার বাকি আছে আরশী।”
“তাহলে বলো। যা যা জানার বাকি আছে সব বলো। কিছুই লুকাবে না প্লিজ।”
“সব শুনলে তুমি আমাকে আর মা-ই ডাকবে না আরশী?”
আরশীর কপালে ভাঁজ পড়লো, “কি এমন কথা? যা শুনলে তোমাকে মা’ই বলব না?”
রুদ্রাণী মনে মনে ভাবলেন, বারবার যখন সবকিছু আরশীর সামনে আসছে, তাহলে আর লুকানো ঠিক হবে না। সে বড় হয়েছে— তার জানার অধিকার আছে। আমাকে মেনে নিক বা না নিক।
তিনি দম ছেড়ে বলতে লাগলেন, “আমি তোমার মা নই আরশী!”
“কি?” —দ্বিতীয়বার শক খেলো আরশী। এটা ভয়ংকর ধরনের শক। মেনে না নেওয়ার মতো। তার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে।
মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “এটা সত্যি না মা! তুমিই আমার মা। তোমাকে মা হিসাবে ছোট থেকে চিনে আসছি। এটা মিথ্যা কথা!”
টপটপ করে রুদ্রাণীর চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল পড়ে গাল বেয়ে। তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলেন, “এটা সত্যি। আমি তোমার মা নই। তবে দু’মাস বয়স থেকে তোমাকে লালন–পালন করছি আমি। মায়ের মতো ভালোবাসা দিয়েছি। প্রচণ্ড ভালোবেসেছি। এই পৃথিবীতে একমাত্র আপন কেউ হলে তুমি।”
আরশী হা করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কি রিয়েক্ট করবে বুঝতে পারছে না। এটাও কি বিশ্বাস করার মতো?
“এটা মিথ্যে মা? বলো?”
“না সোনা, মিথ্যা নয়। সত্যি।”
“তাহলে আমার মা কোথায়?”
রুদ্রাণী দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। এই তো মূল কথা। আরশীর মা কোথায়— এটা বলতে গেলেই রুদ্রাণী হয়তো চিরদিনের জন্য আরশীকে হারাবেন। তবু সাহস নিয়ে বলতে লাগলেন—
“তুমি আগে আমার কথা শুনবে। তারপর ধীরে সুস্থে ডিসিশন নিবে। তোমাদের একটা সুন্দর পরিবার ছিলো। অনেক মানুষজন ছিলো। জমিদার মানুষ ছিলো তোমার বাবা–চাচা সবাই। জমিদার বাড়ির পাশেই ছিলো বড় জঙ্গল। রাক্ষসপুরী সেখানে ছিল। রাক্ষসদের নজর সবসময় তোমাদের বাড়িতে থাকত। বাড়িটা দখল করতে চাইতো। রাক্ষসরা মানুষরূপে তোমার বাপ–দাদাদের সাথে মিশতো। একদিন তাদের সামনে ঝগড়া বাধে তোমার দাদার। তারা আসল রুপে আসে। তারপর তোমার দাদা অনেক জনকে সঙ্গে নিয়ে ফাঁদ পেতে মেরে ফেলেন বড় দুজন রাক্ষসকে। তোমার দাদা ভাবছিলেন, বাকিরা ভয় পেয়ে চলে যাবে। কিন্তু উলটো হলো, অন্য রাজ্য থেকে আরও রাক্ষস আসলো। সবাই খেপে গেল। এক মধ্যরাতে সবাই হামলা করে তোমাদের বাড়িতে। সবাইকে গুহায় টেনে নিয়ে জীবন্ত রক্ত খায়। যে যার মতো দৌড়ায় এদিক–সেদিক। তোমার মা লুকিয়ে থাকে এক জায়গায় তোমাকে নিয়ে। তুমি কান্না করে উঠো, তখন একজন তোমার মাকে ধরে ফেলে। তোমাকে মাটিতে রাখে। তখন তোমার বাবা লুকিয়ে কোথাও একটা ছিলেন, তোমাদের দেখেননি।
একটা রাক্ষস ছেলে তোমাকে কোলে তুলে নিলো। খুব সুন্দর করে তাকিয়ে ছিলে তুমি। সে আবদার করে বসলো— সে তোমাকে খাবে। একজন রাক্ষস মেয়ে তাতে সায় দিলো। কিন্তু তখন তুমি হেসে উঠলে। সুন্দর করে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকালে। তোমার তাকানো, হাত–পা ছড়ানো দেখে মেয়েটার মন কেমন করে পাল্টে গেল। সে হুট করে তোমাকে ছিনিয়ে নিলো ছেলেটার হাত থেকে। তারপর সবার সাথে যুদ্ধ করে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখল। মেয়েটা তোমার জন্য তার মা–বাবা তার জগৎ ছেড়েছে। তোমার হাসিতে, তোমার তাকানোতে এমন জাদু ছিলো,মেয়েটা ঘায়েল হয়ে সবার বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য হলো।
তোমার মনে আছে আরশী, আমাদের আগের বাড়ির জঙ্গলের কথা? সেখানের সর্দার রাক্ষস কায়ান রাত্রেশ তোমাকে ছোটবেলায় খেতে চেয়েছিল। যখন পারল না, তখন বলে দিলো, বড় হয়ে তোমাকে সে খাবেই। কিন্তু ভাগ্য ভালো তুমি বেঁচে গেলে।”
“কে আমাকে বাঁচালো? আর তুমি কীভাবে আমাকে পেলে?”
রুদ্রাণী চোখ মুছলেন। বড় বড় চোখে তাকালেন আরশীর দিকে। আরশী খেয়াল করে শুনছে সব।
“বলো মা”— আরশী তাড়া দিলো।
“আমি তোমাকে বাঁচিয়েছি।”
আরশী অবাক হলো, “তুমি! রাক্ষসদের সাথে তুমি পারলে কীভাবে?”
যা লুকিয়ে এসেছেন এতদিন ধরে, যে কথা বললে আরশী ভয় পাবে, উত্তেজিত হবে, মা স্বীকার করবে না… সেই কথাটা রুদ্রাণী এখন আরশীকে বলবেন।
তিনি চোখ ফিরিয়ে বললেন, “আ…মি আ…মি আসলে পুরোপুরি মানুষ নয়। আমি অর্ধ মানব আর অর্ধ রাক্ষস।”
এ যেন আরশীর জীবনের তৃতীয় ভূমিকম্প। জীবনের সবথেকে বড় ধাক্কা খেলো আরশী এ কথা শুনে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো তার। সে খাটের হাতল ধরে দাঁড়ালো। রুদ্রাণীর কাছে গিয়ে ছুঁলো রুদ্রাণীকে। আমতা–আমতা করে বলল, “ তুমি মিথ্যা বলছো? তুমি আমার মা। কীভাবে তুমি রাক্ষস হতে পারো? রাক্ষস হয়ে তুমি এতদিন থাকতে পারলে কেমন করে? আমার মনে হচ্ছে সব মিথ্যে। বলো না মা, এসব মিথ্যে!”
রুদ্রাণী চোখের পানি মুছে শক্ত হয়ে বললেন, “সব সত্যি। আমি সব খুলে বললাম। আমি অর্ধ মানব–অর্ধ রাক্ষস। কিন্তু একজন মায়ের মমতা দিয়ে আমি তোমাকে বড় করেছি। ভালোবেসেছি। তোমাকে বাঁচিয়েছি রাক্ষসের হাত থেকে।”
আরশী রাগে–দুঃখে দপদপ করতে লাগলো। সাথে ভয় করতে লাগলো রুদ্রাণীকে। রুদ্রাণীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো— “তুমি… তুমি মানুষ নও! তুমি খেয়ে ফেলবে আমাকে! তুমি আমাকে খাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই বড় করেছো। হুট করে একদিন খেয়ে ফেলবে! তোমরা আমার পুরো পরিবারকে খেয়েছো। মানুষখেকো জানোয়ার তোমরা!”
রুদ্রাণী এগিয়ে যেতে চাইলেন আরশীর কাছে। আরশী ভয়ে দৌড়ে কেঁদে কেঁদে সে জায়গা প্রস্থান করে বের হয়ে গেল……!
চলমান…..!(আরশীর কি করা উচিত?)
#তুই_আমার_শেষ_ক্ষুধা
#শারমিন_প্রিয়া
১২
আরশী গেটের বাইরে এসে থামে। হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ মুখ মুছে। গভীর নিশ্বাস ফেলে অবাক হয়— একজন রাক্ষসের সাথে সে এতগুলো বছর ছিল। কী ভয়ংকর কাণ্ড! ভাবাও যাচ্ছে না এসব। বাসায় ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। বাবার কথা মনে পড়তেই আরশী কেঁপে ওঠে, আশেপাশে চোখ বুলায়, বাবা কোথাও নেই। রাক্ষসের ভয়ে বাবা এখনও পালিয়ে পাগলের ভেসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হয়তো এই রক্তের টানের জন্যই পাগলটার প্রতি একটা টান ছিল আরশীর। কিন্তু বাবাকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে? যদি রাক্ষস খেয়ে নেয়? বাসায় ফিরে যাব কীভাবে? আর না গেলে বাবাকে খুঁজে পাব কীভাবে? বাবা যদি আগের মতো এসে অপেক্ষা করেন?ন
আরশী মাথার চুল মুঠো ধরে দাঁত-মুখ খিচে বলে,
“করবটা কী আমি? আমার মাথায় কিছু কাজ করছে না।”
তারপর সে উঁকি দেয় বাসার দিকে। দেখে রুদ্রাণী হাত বাড়িয়ে অসহায়ের মতো এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। সে ধীরে ধীরে পা চালিয়ে উঠোনে যায়। রুদ্রাণী এগিয়ে আসতে গেলে আরশী হাত উঁচু করে বলে,
“দয়া করে আমার সামনে আসবে না। আমার ঘর থেকে আমার পার্সটা শুধু দাও।”
রুদ্রাণী কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
“তুমি যাবে কেন আরশী? তুমি আমাকে মেনে নিতে না পারলে আমিই চলে যাচ্ছি।”
আরশী তিক্ত কণ্ঠে বলে,
“তোমার মতলব কি আমার বোঝা হয়ে গেছে। আমি থাকব না তোমার সাথে। দয়া করে পার্সটা দাও।”
রুদ্রাণী পার্সটা এনে আরশীর দিকে আসতে গেলে আরশী আবার বাধা দিল,
“তোমার আসতে হবে না। ছুড়ে মেরে দাও।”
রুদ্রাণী পার্সটা ছুড়ে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। আর্তনাদ করে বললেন,
“আমি তোমার মা হই আরশী। সেই দুমাস বয়স থেকে তোমাকে যত্ন করে, ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছি। ভালোবেসেছি। তোমার জন্য সব হারিয়েছি। তোমার জন্য একের পর এক অপরাধ করেছি। তোমার জন্য যৌবন হারিয়েছি, সংসার করিনি। তোমার গায়ে একটু আঁচ লাগতে দেইনি। এতকিছুর পরেও তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে আরশী? তোমার খারাপ লাগবে না?”
আরশী এক সেকেন্ডের জন্য ইমোশনাল হয়ে পড়ে, তারপর আবার বিগড়ে যায়। ভাবে— তাকে আটকানোর জন্যই এমনটা বলা হচ্ছে। রুদ্রাণীকে বলে,
“সব করেছো নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য আছে। আমি রাক্ষসের সাথে থাকব না। আর হ্যাঁ, আমার বাবার কোনো ক্ষতি করবে না। আমি খুঁজে নেব উনাকে।”
আরশী আর থামে না। ওড়না ভালো করে জড়িয়ে নেয়। হাতের তালু দিয়ে চোখ মুখ মুছে স্বাভাবিক হয়। দ্রুত হেঁটে গাড়ির স্ট্যান্ডে যায়।
রুদ্রাণী অসাড় হয়ে বসে পড়েন দরজার কাছে। হাউমাউ করে কাঁদেন। কলিজা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তাঁর। তিনি বিড়বিড় করেন,
“মেয়েকে ছাড়া কীভাবে থাকব আমি? মেয়েটা আমাকে ছেড়ে যেতে একবারও ভাবলো না। মানলাম আমি রাক্ষস, তাই বলে আমার স্নেহ, ভালোবাসা— এসবের কি কোনো মূল্য নেই তার কাছে? তাকে ছাড়া যে এ আমি গোটা পৃথিবীতে বড্ড শূন্য, একা। রাক্ষস রাজ্যও আমার জন্য নিষিদ্ধ।”
রুদ্রাণীর খুব করে মনে পড়ছে আজ তাঁর মায়ের বলা একটি সতর্কবাণী। তিনি বলেছিলেন,
“মানুষেরা অকৃতজ্ঞ হয়। যে মেয়েটার জন্য তুই সবকিছু ছাড়ছিস, সেই মেয়েটা যখন জানবে তুই তার আসল মা নস, আর তুই একজন রাক্ষস— তখন চিরদিনের জন্য তোকে ঘৃণা করবে।”
রুদ্রাণী তখন মাকে বলেছিলেন,
“এই বাচ্চা মেয়েটাকে আমি একা ফেলে দিতে পারিনা। যখন তখন তোমরা ছিঁড়ে খেয়ে নিবে তাকে। মেয়েটাকে আমি মায়ের মমতা দিয়ে মানুষ করব। নিশ্চয়ই সে আমাকে ভালোবাসবে। আমার আসল পরিচয় জেনে রাগ করলেও ছুড়ে ফেলে দেবে না।”
রুদ্রাণী আরশীর যাওয়ার দিকে চেয়ে চিৎকার করলেন,
“তোমার কথা সত্যি মা। আমি হেরে গেছি। আমার মেয়ের কাছে হেরে গেছি।”
________
আরশী নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে আরহামের প্রাসাদে ঢোকে। বাড়িটা শান্ত নিরিবিলি। আরশী দুতলায় উঠে সোজা রুমে যায়। আরহাম খাটের উপর শোয়া ছিল। আরশীকে দেখে সে হেসে উঠে দাঁড়ায়। জড়িয়ে ধরে বলে,
“উফ, মনে হলো কতকাল তোমাকে দেখিনি। জড়িয়ে ধরিনি। বুকটা চিনচিন করে ব্যথা করছিল। কলিজা বউ আমার।”
আরশীর মুড অফ। আরহামের এসবেও তার মন গলছে না। তার মনের ভেতর দিয়ে পাহাড়সম ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আরশীর থেকে কোনো রেসপন্স না পেয়ে আরহামের হাত শিথিল হয়ে আসে। আলিঙ্গন মুক্ত করে আরশীর দিকে ভালো করে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“তুমি কান্না করেছো? কে কি বলছে তোমায়? তোমার মা কিছু বলেছে? রাস্তায় কেউ কিছু বলেছে?”
আরহাম নিয়ন্ত্রণ হারায়। কঠিন কণ্ঠে বলে,
“বলছো না কেন, আরশী? তোমার চোখে পানি আমি সহ্য করতে পারিনা। কে কি করেছে, বলো?”
আরশী আরহামের হাত ধরে,
“শান্ত হন আপনি। কেউ কিছু বলেনি। মাথা ধরছিল খুব।”
“মাথা ধরলো আর তোমার মা তোমাকে আসতে দিলো?”
“মা কিছু বলেননি। আমার সত্যি মাথা ধরেছে।”
আরহাম আর প্রশ্ন করলো না। সে বুঝে গেছে অনেক কিছু। আরশী খাটে উঠে চোখ বুজে শুয়ে থাকে। কাজের খালা বসে আছেন তার ঘরে। আরহাম উনাকে ডাকলো না। সে নিজে গিয়ে আরশীর জন্য এক কাপ গরম কফি বানালো। আরশীর জন্য যে কোনো কিছু করতে তার খুব ভালো লাগে। তৈরি করে এনে বলল,
“উঠো, কফিটা খাও।”
আরশীকে সে ধরে তোলে। মাথা টিপে দেয়। আরশী ভেতর ফেটে আসছে। সে সহ্য করতে পারে না। আরহামকে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
“হলোটা কি আরশী? নিশ্চয় কিছু হয়েছে, বলো আমাকে। প্লিজ লুকিয়ো না।”
আরশী বলে,
“জানেন? আমার মা যিনি, তিনি আমার মা নন। তিনি আমাকে বড় করেছেন, এই শুধু। আর আমার বাবা বেঁচে আছেন।”
আরহাম থমকে যায়। কিছু একটা আঁচ করেছে সে। “কি বললে?”
“হুঁ। উনি আমার মা নন, আর আমার বাবা বেঁচে আছেন।”
আরহাম এবার পুরো ব্যাপারটা ক্লিয়ার বুঝে। ভাবে, আরশী হয়তো রুদ্রাণীর সব সত্য জেনে গেছে। এজন্যই সে এত আপসেট।
না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করে,
“কি সব বলো আরশী। উনি তোমার মা নয়?”
আরশী মাথা নাড়িয়ে বলে,
“না।”
“তাহলে তোমার মা কোথায়?”
“উনি বেঁচে নেই।”
আরহাম শান্ত কণ্ঠে বলে,
“এরকম তো অহরহ ঘটনা হয়, আরশী। অনেকের মা বেঁচে থাকেন না। তারা অন্য নারীর কাছে বড় হয়। তোমার বেলাতেও তাই হয়েছে। তোমার খারাপ লাগছে। কিন্তু এত কান্নার কি আছে, আরশী? তুমি বাচ্চা নও।”
আরশী চেয়েও বলতে পারলো না তার কান্নার আসল কারণ। আরহাম যদি সেটা শুনে, নিশ্চয় ছেড়ে দেবে তাকে। সে শুধু বলল,
“এমনি খারাপ লাগছে। কান্না পাচ্ছে খুব।”
আরহাম জিজ্ঞেস করল,
“তোমার বাবা কোথায়, আরশী?”
“বাবা! একজন পাগল আছেন যাকে আমি ছোট থেকে চিনি। এখনও তিনি আছেন। আমি আজ জানতে পারলাম, উনি আমার বাবা। কিন্তু উনাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”
আরহামের চোখ বড় বড় হয়। চোয়াল তীক্ষ্ণ হয়। মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে সে।
“তাহলে উনি তোমাকে কাছ থেকে দেখেও পরিচয় দেননি কেন?”
আরশী বলতে চেয়েও বলেনি। সব শুনলে আরহাম তাকে ত্যাগ করবে।
“জানি না আমি।”
আরহাম মাথা ঝাঁকিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” সব বুঝলাম। তোমার মা তোমাকে যত্ন করে বড় করেননি? ভালোবাসেননি? নিজের মা না হলেও তো নিজের মেয়ের মতোই তোমাকে ভালোবেসেছেন। যত্ন করেছেন। তাহলে এত কান্না করছ কেন? উনার মতো কজন মা আছে বলো তো, যারা এরকম করবে? তোমার তো কৃতজ্ঞ থাকা উচিত উনার প্রতি।”
আরশী চুপ থাকে। কফিটা খেয়ে নেয়। তারপর বলে,
“বাবাকে খুঁজতে সাহায্য করবে আমাকে?”
আরহাম আরশীর হাত চাপ দিয়ে বলে, “কেন নয়। অবশ্যই। কাল থেকে বাবাকে খুঁজব। ঠিক আছে?”
“হুঁ।”
“আমার মনে হচ্ছে মায়ের সাথে তোমার মন কষাকষি হয়েছে। আমি বলব কী? মিটিয়ে নাও। উনি তোমাকে যতটা আদর-যত্ন দিয়ে বড় করেছেন— সেটা কজন করে? আমি যাচ্ছি। একটু কাজ আছে। রেস্ট নাও। টেনশন নিও না।”
আরহাম ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আরশী চিন্তিত মুখে বসে রইল।
আরহাম নিচে নেমে বুকের ভেতরকার অস্বস্তি কমাতে গুহার দিকে এগোয়। দ্রোহান আর রাভান কী এক গল্পে মত্ত ছিল। কায়ান রাত্রেশ আসল চেহারায় আসে। বড় কালো জামাটা গুটিয়ে বসে, গলাঘষা গম্ভীর স্বরে বলে,
“সুখবর আছে।”
দ্রোহান-রাভান এটা শুনে কায়ানের কাছাকাছি আসে,
“কি হয়েছে সর্দার? কী সুখবর?”
কায়ান ধীরে হাসে।
“নজরুল— আরশীর বাবা। আমার দাদার একজন খুনি। ওর খোঁজ পেয়েছি আজ। ও পাগলের বেশে বেঁচে আছে।”
দ্রোহান-রাভান বিস্মিত হয়ে বলে,
“আপনি এ খোঁজ পেলেন কোথায়, সর্দার?”
কায়ান রাত্রেশ অদ্ভুত এক শব্দ করে বলে,
“আমার একমাত্র বউয়ের কাছে। সে বলেছে।”
দ্রোহান থমকে যায়। জিজ্ঞেস করে,
“আপনি কী করতে চান সর্দার? নজরুল কিন্তু আরশীর বাবা।”
লম্বা দাঁত বের করে বিচ্ছিরি এক হাসি হাসল কায়ান। গুহার মুখে গিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চেটেপুটে খাব।”
দ্রোহান স্তব্ধ। আমতা আমতা করে বলল,
“সর্দার… আপনি ভুলে যাচ্ছেন? ও আরশীর বাবা।”
কায়ান গর্জে ওঠে,
“তো? তো কি হয়েছে?”
ভ্রুকুটি তুলে বলে,
“আমি আরশীকে ভালোবাসি। আরশীকে রক্ষা করব— ছাড় দেব না। আর কাউকে না। তার বাবাকেও না। আমার শত্রুকে আমি মেরেই ফেলব।”
দ্রোহানের কণ্ঠ নেমে আসে,
“যদি আরশী সেটা জানতে পারে?”
“কখনও জানবে না। আর হ্যাঁ— ওর নাম ধরে ডাকার সাহস কোথায় পাও তুমি? ওকে ‘সর্দারনী’ বলে সম্বোধন করবে। নেক্সট বার শুনলে জিহ্বা কেটে ফেলব।”
দ্রোহান ঘাড় নেড়ে বলল,
“আর ডাকবে না।”
চলমান……!
