Friday, June 5, 2026







ঝরে_যাওয়া_বেলীফুল পর্ব_১৯

ঝরে_যাওয়া_বেলীফুল
পর্ব_১৯
লেখিকা : আফরোজা আক্তার

সকালবেলা ঘুম ভেঙেই বেলীর মুখটা দেখতে পায় ইরফান । চুপটি করে গালে হাত দিয়ে ঘুমাচ্ছিল মেয়েটা । বেলীর মুখের মাঝে কিছু তো আছে যার মায়ায় বার বার পড়ে যাচ্ছে ইরফান । ইরফানের ভালো লাগা , মন্দ লাগা , ভালো থাকা , মন্দ থাকা সবটাই যেনো এখন বেলীকে ঘিরে । ঘড়িতে নজর দিয়ে দেখে সকাল সাড়ে ৮ টা বাজে । আজ লেট হয়ে গেছে তার । ডান হাত দিয়ে বেলীর কপাল ছুয়ে দেয় সে , নাহ এখনও জ্বর ছাড়ে নি তবে তেমনও জ্বর নেই । কাল রাতের মেডিসিনটা একটু হলেও কাজ করেছে । তারপর নিজের বুকের উপর থেকে বেলীর বাম হাতটা আস্তে করে সরিয়ে নেয় ইরফান । আস্তে করে বেলীর পাশ থেকে উঠে যায় সে । ফ্রেশ হতে হবে তাকে , অফিসেও যেতে হবে ।
আস্তে করে দরজা খুলে নিজের রুমে যায় ইরফান । গিয়ে অনেকটাই অবাক হয়ে যায় ইরফান । আজ রুবি সজাগ , যেই রুবি দিন ১০ টা বাজেও ঘুম থেকে উঠে না , সেই রুবি সকাল ৯ টা বাজতে উঠে গেল কিভাবে ? ইরফান ততটা পাত্তা দেয় নি । টাওয়াল নিয়ে ওয়াসরুমের দিকে পা বাড়াতে নিলে রুবি আটকায় তাকে ।

– গোসল করবা ?
– মানে কি ?
– সারা রাত তো তার সাথে কাটাইলা , তা এখন তো ফরজ গোসল করতেই হবে তাই না ?

রুবির মন মানসিকতা বার বার ওইদিকেই ইংগিত করে । যা ইরফানের মোটেই ভালো লাগে না । সে কিভাবে এইসব কথা বলতে পারে এইটাই ইরফানের মাথায় আসে না ।

– রুবি , তুমি কি শুধু এক সাথে থাকা মানে সেক্সই বুঝো ?
– সত্যি বললাম বলে জ্বালা ধরে গেছে তাই না ?
– এটা মোটেও সত্যি না , রুবি বেলী অসুস্থ , খুব অসুস্থ । তুমি ভাবলে কি করে এই অবস্থাতে আমি আর ও । রুবি মাঝে মাঝে একটু বেশিই ভেবে বসো তুমি ।
– যাক ভালো , সত্যিকে মিথ্যা বানিয়ে সত্যি বানাতে ভালোই পারো দেখছি ।
– তোমার সমস্যা কোথায় হচ্ছে রুবি ? তোমাকে সহ্য করে বেলী যদি এই ৭ মাস তেকই ছাদের নিচে থাকতে পারে তাহলে আমি একটা রাত শুধু ওর রুমে থেকেছি বলে তুমি এমন হুলস্থূল কান্ড বাধাচ্ছো ।
– কারণ আমি বেলী নই , আর তুমি ওই গাইয়া মেয়ের সাথে আমার কম্পেয়ার করবা না ।
– ও গাইয়া , ও মূর্খ কিন্তু তোমার মত এত আবাল না । ও গাইয়া , ও মূর্খ কিন্তু তোমার মত এত লেইম না রুবি ।
– ওহ রিয়েলি ?
– ইয়েস , রুবি এমন আচরণ করো না যাতে তোমার দিক থেকে আমাকে মুখ ফেরাতে হয় ।
– তাহলে বিয়ে কেন করেছো আমাকে ?
– লাইক সিরিয়াসলি রুবি ? আমি তোমাকে বিয়ে করেছি ? নাকি বিয়েটা দুজনের সম্মতিতে হয়েছিল , কোনটা ?
– যাই হোক , হয়েছিল তো ?
– আজ আর অফিস যাবো না আমি , তোমার সাথে কিছু কথা বলবো আজ আমি । আমি প্রশ্ন করবো , তুমি শুধু উত্তর দিয়ে যাবে ।
– আমার প্রয়োজন নেই ।
– কেন রুবি ? আমি ওয়াসরুমে যাবো ফ্রেশ হতে আর তুমি ফরজ গোসল নিয়ে আসছো । তুমি তো এই ৭ মাস আমার সাথে শুয়েছো , তুমি দেখো নি আমি কখন ফ্রেশ হই কখন গোসল করি ? ওহ সরি সরি , তুমি দেখবে কিভাবে তুমি তো দিন ১২ টা অবদি ঘুমে থাকো ।
– ইরফান বেশি বেশি হচ্ছে ।
– কোনটা বেশি বেশি , কি বেশি বেশি ? আমি যতদিন তোমার সাথে থেকেছি আমাদের মাঝে সেক্স কতবার হয়েছে বলো , সপ্তাহে দুইবার কি তিনবার আবার কোন সপ্তাহে একবারের জন্যেও না । যখন এইসব হতো না তখনও কি আমি ফ্রেশ হইনি ?
-………………
– লুক এট মি রুবি , এইসব নোংরা কথা কেন বলো , বলতে পারো । আমার অপরাধ একটাই আমি কেন দ্বিতীয় বিয়ে করলাম ।
– ওহ এখন অপরাধ হয়ে গেছে , সাধু পুরুষ তুমি ?
– মোটেও না , আমি নিজেকে সাধু কখনও ভাবি নি আর ভাববোও না । একটা কথার জবাব দাও তো রুবি , আমি যে বিবাহিত ছিলাম তুমি কি তা জানতে না ?
– জানতাম তো ?
– আমি কি তোমাকে জোর করে বিয়ে করেছিলাম , নাকি তোমাকে তুলে নিয়ে এসেছিলাম ? তুমি সব জানতে , আমি বিবাহিত আমার বউ আছে সব সব । তবুও কেন পা বাড়ালে ।
– বাহ বাহ , এখন আমি অপরাধী হয়ে গেলাম । চাঞ্চ তুমি নেও নাই ?
– চাঞ্চ দিলে কে না নেয় রুবি ? বলো আমায় কে না নেয় । তুমি চাঞ্চ দিয়েছো , আমি অমানুষ চাঞ্চ নিয়েছি । আর এইসবের মাঝে থেকে ওই নিষ্পাপ মেয়েটা এতদিন কষ্ট পেয়ে গেছে । বিনিময়ে মুখ খুলে নি । কত মেরেছি , এক একবার মেরে অজ্ঞান করে রেখেছি , শরীরের ব্যাথায় মেয়েটা উঠে দাড়াতে পর্যন্ত পারে নি তখন আমি তোমার কাছে খুব ভালো ছিলাম । আর আজ আমি তার একটু সেবা করাতে আমি খুব খারাপ হয়ে গেলাম ।
-…………………
– তুমি মেয়ে সেও মেয়ে । তুমি আমার স্ত্রী এটা যেমন সত্যি , সেও আমার স্ত্রী এটা আরও বড় সত্যি । সব থেকে বড় কথা তুমি একজন মানুষ । কিন্তু তুমি মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষের মৃত্যু কামনা করো । নিজে একজন মেয়ে হয়ে অন্য আরেকজন মেয়েকে গালিগালাজ করো , এইসব কি ঠিক করো ? তোমার ভাষণ অনুযায়ী তুমি শিক্ষিত আর বেলী মূর্খ । যেহেতু তুমি এত শিক্ষিত তাহলে মূর্খের মত কথা বলো কেন যে আমায় তাবিজ করা হয়েছে । তার মানে কি আমি বলতে পারি না তুমি এইসবে বিশ্বাস করো ?
– আমি একটা জিনিসই চাই , বেলী নামক কীটপতঙ্গ আমাদের জীবনে থাকবে না ।
– ও-কে কীটপতঙ্গ বলো না । মেয়েটা ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে , আল্লাহর কালাম পবিত্র কোরআন পড়ে , ওর সব চলাফেরা শরীয়তের দায়রার মাঝে পড়ে । আমি অধম হয়তো আগে কিছুই দেখিনি ওর । কারণ আমি তো পাগল ছিলাম তাই আসল হিরাকে কাঁচ ভেবেছি আর কাঁচকে হিরা ।
– বাহ বাহ , ও আমার বাল । বুঝলা তুমি ও আমার বাল । আই ডোন্ট কেয়ার এনি বেলী ফেলী ।
– ওকে , তুমি যে কেমন আমি হারে হারে বুঝে গেছি ।
– তাহলে আমায় বিয়ে করেছো কেন ?
– আবারও এক কথা বলে ? বিয়ে কি আমি একা করেছি নাকি তুমিও করেছো । তুমি তো জানতে আমি বিবাহিত , তুমি তো জানতে স্বামীর ভাগ তোমাকেও করতে হতে পারে , তুমি তো জানতে তোমাকে সতীন নিয়ে থাকতে হবে , তাহলে রাজি হলে কেন ? আর বিয়ের কথা আগে কে কাকে বলেছে ভেবে দেখো তো রুবি । তুমি তো চাইলেই পারতে আমায় ইগনোর করতে , তুমি তো চাইলেই পারতে আমায় ছাড়তে , কই তুমি তো ছাড়ার বদলে আরও চেপে ধরেছিলে । বেলী তো এইসব কিছুই জানতো না , তুমি তো জানতে , তাহলে ? তুমি মেয়ে হয়ে অন্যের স্বামীর দিকে হাত বাড়িয়েছো আর আমি শুধু হাতটা ধরেছি কেবল ।
– কি বলতে চাও তুমি ?
– কিছুই না , আমি চাই একটু শান্তি । যা আমি বেলীর কাছ থেকে পাই , আর তোমার কাছ থেকে পেইন পাই । তুমি অন্যের ঘর ভেঙে তার স্বামীকে নিয়ে সুখে থাকার স্বপ্ন যেমন দেখো তদ্রুপ সেই নারীও কখনো না কখনো তার নিজের স্বামীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ।

রুবি আর ইরফানের কথোপকথনের মাঝে হঠাৎই ইরফানের ফোন বেজে ওঠে । রুবির দিক থেকে ধ্যান সরিয়ে মোবাইলের দিকে তাকায় ইরফান । মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে অফিস থেকে ফোন , ওইদিকে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে ৯ টার উপরে বেজে গেছে । কথা বলতে বলতে সময় কোন দিক দিয়ে পার হয়ে গেছে বলতেও পারবে না সে ।

– আসসালামু আলাইকুম , কামাল ভাই বলুন !
– কোথায় আছেন ভাই ?
– এইতো ভাই বাসায় আছি ।
– অফিস আসবেন না , এত লেট কেন ?
– ভাই ওয়াইফ অসুস্থ ছিল , আর কিছুক্ষনের মাঝেই বের হবো ।
– ওকে ভাই , আসেন তাহলে ।
– জ্বি ভাই ।

ইরফানের কথা শুনে রুবি আরও জ্বলে উঠে যখন ইরফান তার কলিগকে বলেছে ওয়াইফ অসুস্থ । এটা রুবি ঠিক হজম করতে পারেনি । তাই সেও চুপ থাকে নি ,

– আমি তো অসুস্থ নই ।
– তো ?
– তাহলে ওনাকে কেন বললা যে ওয়াইফ অসুস্থ ?
– আরে আজব তো , বউ কি শুধু তুমি একা নাকি বউ তো আরও একজন আছে আমার , সে অসুস্থ । তার কথাই বলছি ।
– আর অন্যকিছু ছিল না ?
– কি ছিল , এত সহজ ভাবে কথা বললাম আর সে বলে আর অন্যকিছু ছিল না ? কি বলা উচিত ছিল আমার , যে ভাই আমার দ্বিতীয় স্ত্রী আমার আর আমার প্রথম স্ত্রীর মাঝে কাল রাতে সেক্স হয়েছে কিনা তার তদারকি করছে । এইটা বলা উচিত ছিল কি ?

ইরফানের এমন কথায় একদম চুপ হয়ে যায় রুবি । রুবি কোন দিক দিয়েই ইরফানকে জব্দ করতে পারছে না । রুবি বার বার ডাইরেক্টলি ইন্ডাইরেক্টলি বেলীকেই টার্গেট করছে । সে বার বার এত কিছু বলেও কোন কাজ করতে পারছে না । আপাতত চুপ হয়ে যায় সে ।
অন্যদিকে আজ মিনু-ই একা একা নাস্তা বানিয়ে রাখে টেবিলে । ইরফান রেডি হয়ে নাস্তার টেবিলে আসে । মিনু সব সামনে সাজিয়ে রেখেছে । তবুও কিছু একটা মিসিং । ইরফান টেবিলে ভালো মত চোখ বুলায় , কিছু তো মিসিং পাচ্ছে সে ।

– কিও ভাই খান না কা ?
– কিছু জিনিস মিসিং ।
– হেইডা কি ?
– মানে কিছু জিনিস দেস নাই তুই ।
– তা কি দেই নাই কন , সবই তো দিছি । খাইয়া লন দেহি ।
– খাচ্ছি , বেলী উঠছে ?
– হু ,
– কখন ?
– আপনে যখন রুমে গেছেন তার পরখানেই উঠছে ।
– মুখ ধুয়েছে ?
– হ ,
– নাস্তা দিছিস ?
– দিয়াইছি , খাইতো না কয় । আমি দিয়াইছি ।
– আচ্ছা ,

ইরফান আজ তেমন কিছু খায়নি । একটা ব্রেড খেয়েছে তাও শুকনো সাথে একটা ডিম । পানি খেয়ে সোজা বেলীর রুমে যায় সে ।
বেলী তখন বিছানায় বসে নাস্তার ট্রে টা দেখছিল । কেমন যেনো ঘিন ঘিন লাগছে তার কাছে এটা তার চোখে মুখেই বুঝা যাচ্ছে যা ইরফানের চোখে সহজেই ধরা পড়ে যায় । সে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বেলীর । বেলী তখন নাস্তার ট্রে থেকে নজর সরিয়ে ইরফানের দিকে তাকায় ।
এক নজরে ইরফানের দিকে চেয়ে আছে সে । ইরফান আজ সাদা শার্ট পড়েছে তাও কালো জিন্স দিয়ে । ইন করা শার্টের আবার হাতা গুলোও ফোল্ড করা । একেবারে ক্লীন সেভও না আবার একেবারে দাড়িতেও ভরে নেই ইরফানের গাল জোড়া । এইভাবেই ভালো লাগছিল তার কাছে তার স্বামীকে । বেলী চেয়ে আছে তার স্বামীর দিকে । আর মনে মনে বলছে ,

– মাশা-আল্লাহ , একদম রাজপুত্র আমার স্বামী । কত সুন্দর দেখায় তাকে ।

বেলীর ভাবনায় ছেদ পড়ে ইরফানের ডাকে । ধ্যান ভেঙে সামনে তাকায় বেলী । ততক্ষণে ইরফান বেলীর পাশে এসে বসে গেছে । নাস্তার ট্রে টা সাইডে রেখে বেলীর কপালে হাত রাখে ইরফান । জ্বর মোটামুটি আছে শরীরে । তবে দেখে মনে হচ্ছে অনেক দুর্বল সে । ইরফান বেলীর গালে আলতো করে ছুয়ে দেয় । আর বলে ,

– কি ব্যাপার , খাচ্ছো না কেন ?
– এইগুলা খাবো না ।
– এইগুলা তো তুমিই রোজ বানাও , ডিম মামলেট , পরোটা , ভাজি , খাও তারপর সকালের মেডিসিনটাও তো খেতে হবে ।
– ডিম ডুম খাবো না , এইগুলাতে গন্ধ । সরান এইগুলা , মিনু কই ?
– কিসের গন্ধ , কি সব বলো তুমি বেলী ।
– ডিম খাবো না ,
– তাহলে শুধু পরোটা আর ভাজি খাও , তাড়াতাড়ি করো ।

বেলী তার নাক সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠিয়ে ফেলে ভাজি দেখে । কেন যেনো বেলী সব কিছুতেই ক্ষুত ধরছে ।

– ভাজি এমন ভর্তা ভর্তা কেন ?

এইবার ইরফানের মেজাজ খারাপ হচ্ছে । বেলী অহেতুক বাচ্চামো করতেছে । না খাওয়ার ধান্দা এইসব বেলীর । মোট কথা সে খাবে না , তাই এইসব করছে । এইদিকে ইরফানেরও অনেক দেরী হয়ে যাচ্ছে অফিসে । বেলীকে খাইয়ে দিয়ে মেডিসিন দিয়ে তারপর সে অফিসে যাবে । আর কোন কথা শুনেনি ইরফান । সোজা পরোটা ছিড়ে ভাজি নিয়ে বেলীর মুখের মধ্যে পুড়ে দেয় সে । তারপরও বেলী তা মুখের মধ্যে রেখেই চাবায় গিলে আর না । তারপর ইরফান পানি দিয়ে গিলতে বলে । বেলীও পানি দিয়ে গিলতে মাত্র একটা পরোটা খায় । ইরফান বেলীকে মেডিসিন দিয়ে মিনুকে ডাকে ।

– জ্বে ভাই ,
– আমি তো এখন অফিসে যাবো , ও-কে দেখে রাখিস ।
– আইচ্ছা ,
– দুপুরে যাতে ও ভাত খায় । কেমন ?
– আরে মাতারি এইডা খবিশ , পোলাপাইনের লাহান করে । খাইতে কইলেও খায় না ।
– আহহহহ , কিসব ভাষা ব্যবহার করিস তুই । যা বলছি তাই করিস ।
– আইচ্ছা , তা এই ডিম খানায় কি দোষ কচ্চিলো , খান নাই কিলিগা ভাবী ?
– তুই এইগুলা নিয়ে যা , ধর ।
– দেন ,

মিনু ট্রে নিয়ে চলে যায় । আর ইরফান বেলীর গালে আলতো করে ছুয়ে দিবে বেলীর দিকে তাকিয়ে থাকে ।

– আমি তোমার কাছে তো ২৪ ঘন্টা বসে থাকতে পারবো না তাই না ? অফিস আছে তো আমার । তুমি খেয়ে নিবে দুপুরে , কেমন ?
– হু ,
– আর হ্যাঁ ,
– কি ?
– কিছু না , ভালোবাসি,,,,,,

এই বলে বেলীর কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে দেয় ইরফান । তারপর মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে ,

– একটা কথা বলি ?
– হু ,
– রুবি যদি এই রুমে আসে বা তোমাকে কিছু বলে , চুপ করে থাকার প্রয়োজন নেই । নিজের জন্যে স্ট্যান্ড নিতে শিখো আজ থেকে । আমি যেই ভুল করেছি তা হয়তো শুধরাতে টাইম লাগবে । তবে নিজের জন্যে ভাববে আজ থেকে । অন্যের জন্য নয় এমনকি আমার জন্যেও না । মনে যাতে থাকে , কেমন ?
-…………………
– চুপ করে থাকতে বলি নি তোমাকে , কিছু বলেছি তার উত্তর দেও ।
-………………….

বেলীর চুপ থাকা দেখে ইরফান আর বেশি কিছুই বলে নি । ইরফান জানে বেলীকে যদি রুবি মেরেও যায় তবুও সে কিছু বলবে না । কারণ বেলী এমন এক আল্লাহর বান্দা যে কিনা শত কষ্ট সহ্য করবে কিন্তু পালটা কাউকে কিছু বলবে না । ইরফান আল্লাহ হাফেজ বলে বিদায় নেয় বেলীর কাছ থেকে ।

ইরফান চলে যাওয়ার পর বেলী কেন জানি চুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে । ইরফানকে ভেবে যাচ্ছে সে । বার বার ইরফানের মুখটা ভেসে আসছে তার সামনে । স্বামীর ভালোবাসা কি সে বিয়ের পর থেকে জানতো না । এই দুই দিনে সে বুঝেছে কেন মেয়েরা স্বামীর ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে থাকে । ইরফান সত্যিই তাহলে বদলে গেছে , এইসব ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমের ঘোরে চলে যায় বেলী ।

অন্যদিকে , অফিসে বসে থেকেও কাজে মন বসছে না ইরফানের । কেমন আছে বেলী , দুপুরও হয়ে গেছে কি করছে সে এখন , খেয়েছে কিনা , মেডিসিন নিয়েছে কিনা , সব মিলিয়ে এখন এই মুহুর্তে তার মাইন্ড শুধুই বেলীকে ঘিরে চলছে । একটা খোঁজ নিতে পারলে ভালো হতো । অথচ নেয়ার উপায় নেই । বেলীর ফোনও নেই যে ফোন করবে । আবার রুবির ফোনে ফোন দিয়ে বেলীর খবর নেয়া মানে ৪র্থ বিশ্ব যুদ্ধকে যেচে আমন্ত্রণ করা । তাই আর এইসব ফোনের ব্যাপারে ভাবে নি ইরফান ।

বাসায় মিনু বেলীকে ঘুম থেকে তুলে ফ্রেশ করিয়ে ভাত খেতে দেয় । বেলী যেই না ভাতে হাত দিয়েছে ওমনি রুবি হাজির সেখানে । বেলীর সামনে ভাত দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে রুবি ।

– জ্বর একটু হয়েছে , কত নাটক করলি তুই ?
-……………..
– এত অভিনয় কই থেকে শিখছিস ?
-……………..
– ভালো অভিনেত্রী হবি তো তুই ?
-……………..
– কিভাবে স্বামী কেড়ে নিতে হয় তুই ভালোই জানিস , নিজেকে আয়নায় দেখছিস ? কি যোগ্যতা আছে রে তোর ইরফানের সাথে থাকার ?
-……………….
– হ্যাঁ , গিল গিল ভাত গিল । গিলে গিলে হাতি হয়ে যা । তারপর মোটা শরীর দিয়ে ইরফানকে আরও বশ করতে পারবি ।

এইবার বেলীও মুখ খুলতে বাধ্য হয় । একে তো জ্বর দুয়ে শরীর ভালো নেই তার উপর এত কিছু বলছে রুবি । রুবির প্রতিটা কথাই নোংরা ইংগিত সম্পন্ন কথা । সব মিলিয়ে সেও বিরক্ত ।

– রুবি আপু আমি না করতেছি অভিনয় না করলাম নাটক । ওইটা আপনার কাছে মনে হচ্ছে আমার কিছু করার নাই । আর অন্যের স্বামী আমি কেড়ে নিচ্ছি না । আমি যদি বলি আপনি আমার স্বামী কেড়ে নিয়েছেন তখন কি হবে ? আর আমি ভাত এতটাও খাইনা যে হাতি হবো । যদি বলি শরীর দেখিয়ে আমার স্বামীকে আপনি বশ করেছেন , তখন কি হবে ? এতটাও খারাপ কথা বলবেন না যাতে পরবর্তীতে আপনার সাথে কথা বলতে গেলেও রুচিতে বাঁধে ।
– চুপ একদম , একদম চুপ ।
– আমার শরীর আসলেই ভালো নেই , আপনি আপনার রুমে যান ।
– ওহ আমি আসাতে এখন শরীর ভালো না তাই না ?
– দেখেন আপু আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না । আপনি আপনার স্বামীকে আপনার আঁচলের তলায় বেঁধে রাখুন । দেখুন আটকে রাখতে পারেন কিনা ? আমি তো আর তাকে বলি না যে আমার কাছে আসো এই সেই । সে আসে এতে আমার হাত নেই । আর হ্যাঁ স্বামীটা আমারও । আমি চুপ থাকি তার মানে এই না যে আমি বলতে পারি না । আমিও বলতে পারি আপু শুধু বলি না ।

বেলীর কথায় রুবির মুখ বন্ধ হয়ে যায় । বেলীর তাকে কথা বলা কথা গুলো জায়গা মত গিয়ে লাগে তার । এতটা বাড়াবাড়ি করে এই রুবি যে একে চুপ করানোর জন্যে অন্য কাউকেও এর মত ভাষা ব্যবহার করতে হয় । আদারওয়াইজ এই আল্লাহর বান্দি থামার পাত্রী না । রাগে ফুলতে ফুলতে বেলীর রুম থেকে বের হয়ে যায় রুবি । রুবি যাওয়ার পর পরই মিনু সেখানে হাজির । মিনুর মুখের ভঙ্গিমাই জানান দিচ্ছে যে সে সব শুনেছে । তাই বেলীও মিনুর হা করার আগেই বলে দিয়েছে ,

– মিনু এখন কিছু বলো না , খুব খারাপ লাগতেছে আমার কাছে । সো কিছু বলো না আর ।
– আমি কি কইতাম আর । সব আপনেই তো কইলেন । উফফফফ ভাবী যা কইলেন না , ওর থোতা মুখ আপনে ভোতা বানাইয়া দিছেন এক্কেরে ভালা করছেন ভাবী এক্কেরে ভালা করছেন । শয়তানি একটা , হেয় এহন পাগল হইয়া গেছে । শয়তানের হাফেজ । হেরফরে খুশি হমু ভাইয়ে এইডারে লাথি মাইরা ঘর থিকা বাইর কইরা দিলে ।
– আহহ মিনু , কি সব বলো । লাথি কেন মারবে তোমার ভাই । ও কি সংসার করতে আসে নাই ? ও কি আমার মত পাগল নাকি যে নিজের স্বামীকে অন্যের হাতে তুলে দিবে । পাগলেও আজকাল নিজের স্বামীর ভাগ দেয় না । সেই জায়গায় ও তো মানুষ ।
– তা আপনে কি ? মানুষ না ? আপনে দিছেন কেমতে ?
– আমার এই কপাল টা আছে না , এই কপালটার দোষ । আমার ভাগ্যে ছিল স্বামীর অবহেলা পাবো পাইতেছি । আমার ভাগ্যে ছিল সতীন নিয়ে ঘর করবো করতেছি । প্রতিনিয়ত এদের কথা শুনতে হবে শুনতেছি । আর কি লাগে ।
– হাত ধুইলেন যে ভাবী , খাইয়া লন ।
– নাহ এইসব নিয়ে যাও আমি আর খাবো না , পেট ভরে গেছে । আর খুব বেশি দরকার ছাড়া আমাকে জাগিও না ।

এই বলে বেলী হাত ধুয়ে ফেলে । এক লোকমা ভাতও পেটে যায়নি মেয়েটার । চুপ করে শুয়ে আছে , আর দুচোখ বেয়ে তার আপনা আপনি পানি পড়ে যাচ্ছে । আজ রুবির কথা গুলোয় আসলেই অনেক কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা । ইরফান বাসায় আসলে ইরফানকে কিছু কথা বলবে বেলী , এটা ভেবেই আস্ত্র আস্তে ঘুমিয়ে যায় সে ।

সারাদিন বেলী রুম থেকে বের হয় নি । রুবিও সোজা দুপুরের পর না খেয়েই বাপের বাড়ি চলে গেছে । সে এখানে এক মুহুর্তের জন্যও থাকবে না । তাই সে চলে যায় ।
রাত প্রায় ৮ টা নাগাদ ইরফান বাসায় আসে । মিনু দরজা খুলেই ইরফানকে সব বলে দেয় । রুবি বেলীকে কি কি বলেছে , বেলী রুবিকে কি কি বলেছে , রুবির চলে যাওয়া , বেলীর সারাদিন না খেয়ে থাকা সব সব বলে দিয়েছে মিনু ।

– মিনু আমার মাথাটা অনেক ধরে আছে , তুই আমার জন্যে কফি বানা । আমি আগে গোসল করবো তারপর বেলীর কাছে যাবো ।
– আইচ্ছা ।

ইরফান গোসল করে ফ্রেশ হয়ে বের হতে হতে মিনুও কফি নিয়ে হাজির হয় ইরফানের রুমে । কফিতে চুমুক দিতে দিতে ইরফান বেলীর রুমে যায় । গিয়ে দেখে বেলী ওপাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে । ইরফান বেলীর পাশে গিয়ে বসে বেলীর কাঁধে হাত রাখে । তখনই বেলী চোখ খুলে একটা কথা-ই বলে দেয় ,

– আপনি চলে যান রুবি আপুর কাছে । আমার কপালে আপনার ভালোবাসা নেই আমি অভাগী এইভাবেই একদিন শেষ হয়ে যাবো । এভাবেই আমায় জীবনের শেষদিন অবদি কাতড়াতে হবে । কষ্ট পাইতেছি আর পাইতে হবে । তবুও পারবো না অন্য কোন নারীকে কষ্ট দিতে । আপনি রুবি আপুর কাছে চলে যান । আমি আপনাকে ভালোবাসি অনেক কিন্তু আপনাকে বেঁধে রাখতে পারবো না । মন জমিনে আপনার নাম আজীবন থাকবে তবুও অন্য কারো চোখের পানির কারণ হতে পারবো না ।

এই কথাগুলো বলে হু হু করে কেঁদে উঠে বেলী । তখন কেন জানি ইরফানের চোখ দিয়েও পানির স্রোত বয়ে যায় ।

.
.

চলবে…………………..

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ